গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১৮

অনিমেষ গুপ্ত

কবিতার হিম


      ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে কান্তি ছিল আমার সব চেয়ে কাছের, হয়ত ঘনিষ্ঠতম ।  কোলকাতা ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাক্টরির চাকরি করে কোনমতে বৃদ্ধ বাবা আর নিজের খরচ চালাত কান্তি কিন্তু এই নিতান্ত সাধারণ পরিচয়ের বাইরে কোথাও লুকিয়ে ছিল তার এক কবিতা-পাগল অস্তিত্ব ।  ট্রাম কোম্পানির কাজ আর দুজনের সামান্য রান্না, এছাড়া কান্তির সময় কাটত কবিতা লিখে আর বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় পাঠিয়ে। আমি ছিলাম তার কবিতার অনুরাগী এবং সমালোচক । দু একটা লেখা অনামা পত্র পত্রিকায় প্রকাশ পেলেও কান্তির বেশিরভাগ কবিতাই অমনোনীত থেকে যেত । তবুও তার অস্বীকৃতি আমার মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারেনি আদৌ । আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম তার কবিসত্ত্বার সম্বন্ধে । মনে হত নিশ্চিত একদিন কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কান্তি ।

        নানান উচ্চাশা থাকে মানুষের... অর্থ, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি, সুন্দরী বৌ । কান্তির কোন উচ্চাশা ছিলনা ।    পলেস্তারা খসা নোনাধরা পুরনো বাড়ী আর ট্রাম কোম্পানির চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল কান্তি । ঘনিষ্ঠদের মধ্যে কেবল আমিই জানতাম তার গোপন আশার কথা । নামহীন সামান্য জীবনের ব্যর্থতা কান্তি ঢাকতে চেয়েছিল তার কবিতা দিয়ে ।    
    
         ভবানীপুরে কান্তিদের বাড়ীতে গেলে দেখতাম অন্ধকারাচ্ছন্ন দেড়-তলার বারান্দার একচিলতে টিনে ঘেরা এলাকা । উত্তরদিকের সেই আশ্রয়টুকুতে কেবল দু ইঞ্চি রোদ্দুরের আশায় পুরো শীতটা হাপিত্যেশ করে  বসে থাকতেন কান্তির বাবা । খুব ফর্সা আর রোগা সত্তোরার্ধ এক বৃদ্ধ । কোলকাতার শীতের সঙ্গে এক ভারি অসম যুদ্ধে তাঁর হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে বেঁকে উঠত সময় সময় । আমায়  দেখতে পেলেও কোনদিন কুশল জিজ্ঞাসা করেননি । শুধু বিড়বিড় করে বলতেন, বড় ঠান্ডা, তাই না ! যতক্ষণ থাকতাম ততক্ষণই কান্তিদের আঁধারিয়া বাড়ী, নির্জন স্যাঁতসেঁতে বারান্দার এককোণে বসে থাকা ওর বাবার অসম্ভব শীত কাতরতা এবং কান্তির অস্বীকৃত কবিত্ব... সব মিলিয়ে একটা শিরশিরে ধারণার দিকে ঠেলে দিত আমাকে ।   

ক্রমশঃ আমার বাড়তে থাকা ব্যস্ততায় কান্তির সঙ্গে দেখা করার সময় কমে যাচ্ছিল । বুঝতে পারতাম ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যাচ্ছে কান্তি ।  আমি ছাড়া আর কারো কাছেই সে মেলে ধরতে পারেনা নিজেকে। এরই মধ্যে বিমর্ষ কান্তি এক আচ্ছন্ন শীতের দরজায় কড়া নেড়ে ডেকে তুলল আমায় । ভোরের কুয়াশার হিম ঢুকে কান্তির গভীর চোখ দুটোকে অস্বচ্ছ করে রেখেছিল । তার গলার স্বর কেমন যেন আকুল । এক ধরণের আত্মধিক্কার, আক্ষেপ আর বিলাপ মেশান ছিল তার কথায়...   
     
         অনি রে, বড় অন্যায় হয়ে গেল । কী ঝোঁকে যে কাল বলে ফেললাম... বাবা, সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে ওই রোদটুকু আঁকড়ে আছেন, এবার একটু আমার কথা ভাবুন । আমারই বা কি আছে ! ট্রাম কোম্পানির চাকরি, বৌ-ছেলেপুলে নেই । ঝুঁকে পড়ে মাথা রাখার মতো কোন কাঁধই নেই । নিজের বলতে দিনে দিনে অন্ধকার হয়ে আসা এই প্রায় ধ্বসে-পড়া বাড়ী ।  প্রতিদিন রাতের বেলা কিংবা মিইয়ে আসা ছুটির দুপুরগুলোয়  অদৃশ্য ঠাকুর্দা, বড়দাদা এবং আরো অনেকের ফ্যাসফেসে গলার আওয়াজ শুনতে পাই ।  তাঁরা  রোজ বলেন... তোর বাবার কাছ থেকে চেয়ে নে ওই জায়গাটুকু । রোদ্দুর তো তোরও প্রয়োজন ! রোজ রোজ ট্রামের ঘন্টির দড়ি টেনে ক্ষয়ে যাচ্ছিস । এই বাড়ীর ঠান্ডা আর সব প্রকাশ না পাওয়া কবিতার হিম তোর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে একটু একটু করে ।

        বিশ্বাস কর অনি, আঘাত করতে চাইনি শুধু আমার যন্ত্রণাগুলো শেয়ার করতে চাইছিলাম কিন্তু বাবার মুখটা হঠাৎ কেমন কাতর আর ফ্যাকাসে হয়ে গেল । বললেন... আমার বাপ-ঠাকুর্দার কন্ঠ শুনেছো । হয়ত ঠিকই শুনেছো ।  সমাজের না পাওয়ার দলে পড়ি আমরা,  বংশ পরম্পরায় এই রোদ্দুরটুকুই যা হস্তান্তর হয়ে এসেছে এতদিন ।   হয়ত ঠিকই বলেছেন ওঁরা । কথা বলতে বলতে আমার হাত চেপে ধরল কান্তি... অনি, যেতে পারবি আমার সঙ্গে? আজ শেষ রাতে দেখলাম বিছানায় বাবা... একদম  ঠান্ডা।

        কান্তির বাবা মারা গেলেন আর তারপর থেকে কান্তিকে দেখেছি স্বেচ্ছায় ওদের বাড়ীর সেই একচিলতে বারান্দা আঁকড়ে পড়ে থাকতে । আমার জ্যোতিষ্ক চমকাচ্ছিল । পদোন্নতি, বাড়ী গাড়ী, টাকা পয়সা সবই বাড়ছিল সংখ্যায় এবং আয়তনে । কান্তির বসবাস ছিল তার নিজের জগতে । সময় আর ব্যস্ততার চাপে দেখা হতনা তেমন তবে আমি গেলেই চঞ্চল হয়ে পড়ত কান্তি, বলত... আগে বুঝতাম না কিন্তু এখন টের পাই জানিস, এই বাড়ী আর আমার অসফল কবিতাগুলো কি ভীষণ ঠান্ডা ।    


প্রচন্ড ব্যস্ততায় প্রায় বছরখানেক দেখা হয়নি কান্তির সঙ্গে । কান্তি একলাই হোয়াটস আপ করত মাঝে মাঝে ।  এক সকালে কান্তির মেসেজ পেলাম । গোষ্ঠগোপাল দাসের বিখ্যাত গানের এক কলি... বন্ধু, তুমি আসিও খবর পাইয়া । মন আকুলি বিকুলি করে উঠল । পরের রবিবারেই গেলাম । একবছরে কিছুই বদলায়নি । বাড়ীটা সেই একই রকম নোনাধরা, স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা । পড়ন্ত বেলার একতিল রোদ্দুরের জন্য চেয়ার টেনে লড়াই করছিল কান্তি আর ভারি অদ্ভুৎ, অপ্রাকৃত ভাবে কান্তিকে দেখাচ্ছিল ঠিক তার বাবার মতো । চোখের নীচে পুঁটুলির মতো ফোলা আর দুটো ভেতরে ঢোকা, চিপসানো গাল । হাতে হাত ঘষছিল কান্তি আর আঙুলগুলো বেঁকে উঠছিল অবিকল তার বাবার মতো ।  বুঝলাম কান্তি খুবই অসুস্থ । আমাকে দেখে তার মুখে সেই পুরনো অমলিন হাসি । বলল... মেসেজ পেয়ে এলি ? কাল অবধি চালিয়ে নিচ্ছিলাম সব, আজ ভোরে মনে হল বোধহয় সময় হয়ে গ্যাছে ।

       প্রিয়সঙ্গীকে হারানোর সম্ভাব্য বেদনা আমার চোখের জল ঠেলে তুলছিল ওপরে । ফিসফিসে গলায় কান্তি বলল, আমার একটা কাজ করে দিবি অনি ? কান্তি হাফাচ্ছিল, তার চোখদুটো আগের থেকে তীক্ষ্ণ অনেক । একই রকম স্বরে সে বলল, এখন আর কবিতা লিখিনা ।  এখন চোখের সামনে রোজ নিজের নিয়তিকে দেখি । শেষদিন অবধি আমাকে এই বাড়ী আর বারান্দার সঙ্গে লড়াই করতে হবে ইঞ্চি ইঞ্চি রোদ্দুরের জন্য আর আমার কবিতাগুলো ঠান্ডা হয়ে যাবে আরো ।

কান্তির চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি । বলল, সব জেনেও কবিতাগুলোকে প্রাণে ধরে নষ্ট করতে পারিনি । ওগুলো তুই রেখে দিবি তোর কাছে ?  যেকটা দিন আছি ওগুলো থাক তোর কাছে, তারপরে ফেলতে হলে ফেলবি, রাখতে হলে রেখে দিবি এক সামান্য বন্ধুর উপহার হিসেবে । কান্তির কথাগুলো কখনো  প্রলাপ, কখনো রহস্যময় বলে মনে হচ্ছিল আমার । সারাজীবন ধরে কবিতা লিখে স্বীকৃতি না পাওয়া, সামান্য আয়ে মনুষ্যেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হওয়া, অপারগতা আর এক পুরনো বাড়ীর নোনাধরা দেওয়াল, বারান্দার অন্ধকার কোণে জমে থাকা বহুযুগের হিম কি তার মাথার সুক্ষ শিরা, তন্তুর মধ্যে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত করেছে কোনভাবে ! 


এর দুদিন পরে মারা গেল কান্তি । শেষকৃত্য সেরে বাড়ী ফিরতে কান্তির কবিতাগুলোর কথা মনে হল, যেগুলো তার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলাম সেদিন । স্নান সেরে, এককাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসে খুললাম সেই কবিতার তোড়া । 
        বসন্তের হাওয়ায় ছোঁয়াচলাগা উষ্ণতা । কান্তির চলে যাওয়া যেন ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে আমায় । কবিতাগুলো পড়তে পড়তে অনেকদিনের জানা, পুরনো হয়ে যাওয়া একটা সাধারণ প্রশ্ন ধাক্কা দিচ্ছিল  আমার মনে... কবিতা কি বরাবরই মানুষকে এমন পাগল, অহেতুক করে দেয়! ছাড়াও যায়না আবার ধরে থাকাও যায়না !   

       চা শেষ । ব্যালকনির থেকে বয়ে আসা হাওয়া যেন শোক ভোলানোর প্রলেপ দিচ্ছিল আমার শরীরে, হঠাৎই মনে হল এক অচেনা হিম স্রোত যেন কবিতার পান্ডুলিপি থেকে বেরিয়ে আমার হাত বেয়ে কাঁধ, কাঁধ বেয়ে গলা আর বুকে ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ ।      



সুধাংশু চক্রবর্তী

বলিদান

দীননাথকে খড়্গ হস্তে ছাগশিশুটির দিকে অগ্রসর হতে দেখিয়া তাহারই চার বৎসরের শিশু কন্যা দীপশিখা রুদ্ধশ্বাসে ক্রন্দন করিতে করিতে আধো আধো বুলিতে কহিলো কিন্নরীকে হত্যা করিও না পিতা । কিন্নরীকে হত্যা করিও না । উহাতে তোমার পাপ হইবে । কিন্নরীকে হত্যা করিতে হইলে পুর্বে আমাকে হত্যা করিতে হইবে ।

শিশুকন্যার ক্রন্দনে দীননাথের হৃদয় বিগলিত হইলো বটে তবে তাহা মুহূর্তকালের জন্য । সে থমকাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িয়াছিলো ক্ষণকালের জন্য । সেই অবসরে খড়্গখানি তাহার হস্তচ্যুত হইয়া ভূলিণ্ঠিত হইলো । দীননাথ সেইমুহূর্তে ভাবিয়া দেখিলো যে, সে একটি কশাই মাত্র । নিষ্পাপ জীব হত্যা করিয়া অর্থ উপার্জন করা তাহার গ্রাসাচ্ছাদনের একমাত্র অবলম্বন । সে যখন জ্ঞানপূর্বক জীব হত্যার ভার গ্রহণ করিয়াছে , তখন তাহার পাপ হইবে না । দীননাথ এইমতো ভাবিয়া আত্মতুষ্টি লাভ করিয়া নিজ মনে বিড়বিড় করিলো , ‘পৃথিবীর যাবতীয় সুখ-সুবিধা কেবলমাত্র মনুষ্যগণেরই প্রাপ্য । অতএব ছাগশিশু কিন্নরীকে হত্যা করিয়া আমি কোনো পাপ কর্ম করিতেছি না ।

দীননাথ ইহা ভাবিয়া নিজ চারিপার্শ্বে রক্ষার প্রাচীর গড়িয়া তুলিলো । ছাগশিশুটি অনতিদূরে হাড়িকাষ্ঠে গলা ডুবাইয়া করুণ স্বরে ব্যা-ব্যারব তুলিতেছে । ইতিমধ্যে কতিপয় ক্রেতা আসিয়া দীননাথকে তাগাদা দিয়া কহিলো ওহে  দীননাথ , বৃথা কাল হরণ না করিয়া ছাগশিশুটিকে কর্তন করো । আমরা মাংস ক্রয় করিয়া দ্রুত গৃহে গমন করি ।

লজ্জিত দীননাথ ভূলুণ্ঠিত খড়্গটি দ্রুত হস্তে তুলিয়া ধরিলো । তাহা দেখিয়া শিশুকন্যা দীপশিখা পুনরায় ক্রন্দন করিয়া কহিলো কিন্নরীকে হত্যা করিও না পিতা । উহাকে হত্যা করিলে আমিও বাঁচিবো না ।

দীননাথ কন্যাবাক্য অগ্রাহ্য করিয়া ছাগশিশুটির নিকটে আসিয়া দাঁড়াইলো । শানিত খড়্গখানি মস্তকের ওপর তুলিয়া ধরিয়া চক্ষুমুদিয়া ভক্তিপূর্বক স্বীয় ঈশ্বরকে যখন স্মরণ করিতেছে তখনই ক্রেতাদের মধ্যে গুঞ্জন রব উঠিলো । দীননাথ তাহা শ্রবণ করিয়া ভাবিলো বৃথা কাল হরণ করিলে ক্রেতাগণ বিরূপ হইয়া ফিরিয়া যাইবে এবং আমাদিগকে অনশনে দিন কাটাইতে হইবে । এমত ভাবিয়া উদ্যত খড়্গখানি ছাগশিশুটির গণ্ডদেশ লক্ষ্য করিয়া সবলে আঘাত হানিতে গিয়া দেখিলো তাহারই শিশুকন্যা দীপশিখা মস্তক রাখিয়াছে হাড়িকাষ্ঠে এবং ছাগশিশুটি আশ্রয় লাভ করিয়াছে তাহার বক্ষে !

অমিতাভ দাশ

ব্লেড

হাতে ওটা কি ? -ব্লেড । কেন ব্লেড কেন ? কি করবে ব্লেড দিয়ে ? -হাতটা কাটবো । সে কি !  কেন ? জানতে চাইলো প্রত্যয় । -তুমি যদি আমায় ভালো না বাস তো ব্লেড দিয়ে হাতটা কাটবো কিন্তু... বলে বা হাতের ওপর ব্লেডটা ঘসতে লাগলো তপস্যা । তারপর প্রেম । ভিক্টোরিয়া । নন্দন । বাংলা আকাদেমি । চা-কফি-ব ইমেলা । দশ বছর আগের কথা । তপস্যা দিল্লি থাকে । বর আমেরিকায় ।প্রত্যয় সেই এক ই রকম ।একটুও বদলায় নি ।ছাত্র পড়ায় ।আর একটা ইন্সুরেন্স কোম্পানির এজেন্ট । অন্যের জীবন সুরক্ষিত করে ।শুধু বদল বলতে চুলে সামান্য পাক ধরেছে এই যা । দাড়ি কাটছিল ।হঠাত্ গালটা কেটে গেল ।বিছানায় পড়ছিল সুমি । প্রত্যয়ের তিন বছরের মেয়ে । --বাবা তোমার গালটা কেটে গেছে । রক্ত পড়ছে । --হ্যাঁ মা , ব্লেডটায় বড্ড বেশী ধার ছিল ।

পাত্রী চাই

ভাইয়ের বিয়ের জন্য খবরের কাগজ দেখে পাত্রীর বাড়িতে ফোন করছি । --হ্যাঁ আমি পাত্রের দাদা । --ওপ্রান্ত থেকে উত্তর এলো ,কোথা থেকে বলছেন ? -- গুমা থেকে । --বেহালার মেয়ে এত দূরে থাকবে কী করে ! না না এখানে হবে না । দ্বিতীয় বাড়ি । --আমি পাত্রের দাদা । আমরা গুমাতে থাকি ,এত দূরে বিয়েতে আপত্তি নেই তো ? উত্তর এলো, না না ।আচ্ছা ছেলে কি করে ? --প্রাইভেট কোম্পানীতে... --ওহ্ বেসরকারী । না আমরা সরকারী চাকুরে ছেলে চাই । তৃতীয় বাড়ি । --আমি গুমা থেকে বলছি ছেলের দাদা ,ভাই বেসরকারী চাকুরে ,যদি আপত্তি না থাকে তো কথা বলি... মেয়ের বাবা বললে ,সে সব ঠিক আছে ।চলবে ।আজকাল কয়টা সরকারী চাকরি আছে ।তা আপনার ভাইয়ের গনটা কি ? --রাক্ষস গন । --এই তো মুসকিল । আমরা এসব খুব মানি ।এখানে হবে না ভাই ।আমার মেয়ের নর গন । চতুর্থ বাড়ি । --পাত্রের দাদা বলছি । ভাই রাক্ষস গন । বেসরকারী চাকরি । গুমাতে থাকি । আপত্তি না থাকলে কথা বলা যেতে পারে... উত্তর পেলাম,সে সব হবে ক্ষন ।আগে বলুন ,আপনারা ঘটি না বাঙাল ? আমরা ঘটি ছাড়া বিয়ে দেব না । মেজাজ ঠিক রাখা গেল না । বললাম , আমরা ঘটিও না বাঙ্গালও না । আমরা হলাম বাটি ।বলে ফোনটা কেটে দিলাম ।


নীহার চক্রবর্তী

দিগন্তিনী 

স্বামী মারা যাওয়ার মাস চারেক পরে অঞ্জলি ওর মেয়ে দিব্যার সঙ্গে বিউটি-পার্লারে যাচ্ছে । দুজনের সারা মুখে তখন অম্লান-হাসি । এক প্রতিবেশী মহিলার সঙ্গে ওদের পথে দেখা ।
সে এগিয়ে এসে একমুখ হেসে জিজ্ঞেস করলো,''তা মা-মেয়ের একসঙ্গে যাওয়া হচ্ছে কোথায় ? বেশ লাগছে কিন্তু ।''
তার কথা শুনে দিব্যা মুচকি হেসে জবাব দিলো,''আর কিছু পরে দেখবেন আরও কত সুন্দর লাগছে আমাদের । তবে মাকে আমার চেয়ে বেশী সুন্দর লাগবে ।''
অঞ্জলি শুনে বেশ লজ্জা পেলো । সারা মুখে হাসি নিয়ে অন্যদিকে চেয়ে থাকলো ।
সেই মহিলা অবাক হয়ে বলল,''বুঝলাম না ব্যাপারটা । একটু খুলে বল দেখি ।''
তখন দিব্যা মুখ খুলল দুষ্টু-দুষ্টু হেসে ।
ও বলল তাকে,''আমরা বিউটি-পার্লারে যাচ্ছি । মা কি আর আসতে চায় ? একরকম জোর করেই আনলাম । মাকে আজ নতুন করে সাজাবো ।''
দিব্যার কথা শুনে যেন বিস্তৃত অম্বর মহিলার মাথায় ভেঙে পড়লো ।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর ভ্রূ-কুঁচকে বলে উঠলো,''এ আবার কেমন কথা ? তুমি মাকে সাজাবে ? এই কিছুদিন...''
সাথে-সাথে সোল্লাসে ফেটে পড়ে দিব্যা বলল তাকে,''এমা ! আপনি বুঝি জানেন না ? আমি মাকে তো নিজের হাতে বিয়ে দেবো । আমিই তো মার এখন অভিভাবক ।''
অঞ্জলি লজ্জায় তখন জড়সড় ।
দিব্যাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে নিচু-গলায় বলল,''তুই পাগল হলি নাকি ? এমন কথা বলতে হয় ?''
''খুব বলতে হয় । খুবই বলতে হয় গো । এর মনোভাবের উদ্দেশ্য বোঝো ? ছাই বোঝো । এবার কথা ছড়াবে । সে ছড়াক । শুভ বার্তাই ছড়াক । তুমি তৈরি হও নতুন দিনের জন্য ''
মার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দিব্যা কথাগুলো বলছিল । তারপরেই সেই মহিলার দিকে ঘুরতেই দেখল সে হাওয়া...
তবে সে হাওয়াকেও দেখা গেলো একটু দূরে । তার চলার গতি বেশ থমকে থমকে । বোধহয় সে তখন ভেবেই যাচ্ছে ।
এ হয় ? এ হতে পারে ? এ কেমন মেয়ে ? এত নষ্টা দুজন ?
এসব ভাবনা আর কি তার মধ্যে তখন ।
দিব্যা এরপর মার হাত ধরে বেশ বলিষ্ঠ গলায় বলল,''বেশ বলিষ্ঠভাবে আমার হাত ধর । হাত ছেড়ো না কিন্তু । এ হাত দিয়েই তোমাকে নব-দিগন্ত দেখাবো ।''
অঞ্জলি দিব্যার হাত ধরে চলতে চলতে মেঘের মধ্যে থেকে নিজেকে একটু-একটু করে সরাতে থাকলোতাই মুখ তুলতেই দেখা গেলো হাসিরা নহবত বসিয়েছে সারা মুখ-জুড়ে ।


রত্না ঘোষ

ইমেজ


        বিয়ে করব না করব না করে বেশ কয়েকটা বসন্ত পার করে দিলাম। আত্মীয়-পরিজনের ঠেলায় শুরু করলাম সন্মন্ধ দেখতে। আমার জন্য পাত্র দেখার কারো সময় নেই। তাই তারা বলল ----" তুমি অন্য বোনদের জন্য যেভাবে সন্মন্ধ দেখেছো সেভাবে নিজেরটাও দেখোনা। আমরা তোমায় সমর্থন কবর।" আমার ও বিয়ে করার ষোলোআনা ইচ্ছে ছিল, তাই প্রতি রবিবার' 'পাত্রী চাই' কলাম এ টিক্ দিই সময় করে ফোন করি। যদি পাত্র নিজে ফোন ধরে তবে আমি সত্য পরিচয় দি। আর অন্য কেউ ধরলে নিজেকে 'পাত্রী র দিদি বলে পরিচয় দেই। এমনই একটি বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করায় ওপ্রান্ত থেকে এক ভদ্রলোক জানান , তিনি স্বয়ং পাত্র । তিনি ইংলিশ.এ এম.এ. বর্তমানে আরও পড়াশুনা করছেন অর্থাৎ, পি.এইচ.ডি.করছেন। একটি এইচ.এস. সরকারী স্কুলের শিক্ষক বয়স 43 . দেখলাম বয়সটা আমার থেকে দশ বছর বেশী । তবে ভাবলাম বয়সের পার্থক্য থাকলে প্রেম জমবে ভালো। তাছাড়া ভদ্রলোক সাতিত্যের ছাত্রী হওয়াতে মনে করলাম সাহিত্য আলোচনা হবে ভালো। তাই ওনার বায়োডাটা আমার পছন্দ হোল। ফোনের ওপ্রান্ত থেকে ভদ্রলোক তাঁর বায়োডাটা এক নিঃশ্বাসে বলার পর একটু থামলেন। তারপর কিছুক্ষনের জন্য দম নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,-----"আপনি কে?" আমি বেশ নম্র ভাবে বললাম----" আমি 'পাত্রী' তিনি প্রায় লাফিয়ে উঠে ( অনুভব করলাম) বললেন---"আরে আপনি তো বেশ স্মার্ট ! আমার এমন মেয়েই পছন্দ।" আমার সম্পূর্ণ বায়োডাটা জেনে বললেন----" আমি পরে ফোন করছি।"

        পরেরদিন সকাল নটা নাগাদ ফোনে বললেন---"আমি আর আমার বোন আজই আপনাকে দেখতে আসছি।" সময় বললেন বিকাল চারটা নাগাদ। বাড়ি তে দিদি জামাইবাবু আছেন কদিন ধরে তাই তারাই সব আয়োজন করলেন অভ্যাগতদের আতিথেয়তার। আমি মস্তিতে রূপচর্চা করতে লাগলাম। আমার সাজগোজ শেষ হওয়ার আগেই বিকাল তিনটা নাগাদ তারা এসে উপস্থিত। উপস্থিত বাড়ির সকলে আপ্যায়নে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর ওই ঘরে আমার প্রবেশ । ভদ্রলোক অন্যদিকে মুখ করে জামাইবাবু র সাথে গল্প করছিলেন। আমি প্রবেশ করায় আমার দিকে মুখ করলেন । দেখতে মন্দ নয় তবে চশমার পাওয়ার আমার চোখকেও ঝলসে দিচ্ছিল। যাই হোক, দেখা হোল, কথা হোল। যাওয়ার সময় বললেন--- "ফোন করব"। বাড়ি পৌঁছেই ভদ্রলোক ফোন করলেন। বললেন-----" আপনাকে আমার বেশ ভালো লেগেছে। আপনাকে একটা অনুরোধ করব রাখবেন?" আমি সম্মতি দেওয়ায় উনি বললেন-----" আমার জন্য একটু অপেক্ষা করবেন ?" আমি চুপ করে থাকায় বললেন----" উত্তরটাতো পেলাম না।" আমি বললাম ----"কারনটা তো জানিনা।" উনি বললেন----" আসলে আমি একটু পার্টির কাজে ব্যস্ত।" তিনি আরও জানালেন তিনি এক শিক্ষক সংগঠনের একজন নামকরা সদস্য, রুলিং পার্টির একজন কেউকেটা, অনেক উপর মহল পর্যন্ত ওনার যাতায়াত ইত্যাদি ইত্যাদি । আমি ছোট্ট একটা হ্যা ছাড়া কছুই বললাম না। উনি বললেন ----"তাহলে অপেক্ষা করছেন?" আমি বললাম---"হু"। ভদ্রলোক দু-একদিন অন্তর অন্তর কুশল জিজ্ঞাসা করেন। দিন পনেরো বাদে বললেন----"আমার দিদি আর বোন কাল আপনাদের ওখানে যাচ্ছে। ।"

        সময়টা দুপুরবেলা হওয়ায় আমরা একটু ডালভাতের ব্যবস্থা। করলাম। ওনারা খুব খুশি হলেন আমাদের আতিথেয়তায়। সেদিন সন্ধ্যাবেলা তিনি ফোন করে বলেন-----" দিদির আপনাকে ভালো লেগেছে। । আর শুনুন আপনি রক্তটা পরীক্ষা করান। এইচ.আই.ভি. থ্যালাসেমিয়া এসব আর কি।" আমি বললাম---"ঠিক আছে। আপনার টা করেছেন?" " কি?" বললাম---" রক্ত পরীক্ষা? " ফোনের ওপ্রান্ত চুপচাপ। আমি হ্যালো ,হ্যালো করি কোনো সাড়া পাইনা। দেখি কল এণ্ডেড আবার রিং করি ,রিং হয়ে যায় কেউ ধরে না। দুদিন পর লোকটির দিদি ফোনে আমার ঠিকানা চান আমার ফটো পাঠাবেন বলে। ঠিকানা লিখে উনি বলেন----" তোমাকে আমাদের ভালো লেগেছিল কিন্তু তোমার পাকামোর জন্য এগোতে পারছিনা। তুমি জান, আমার ভাইয়ের পজিশন ? তোমায় রক্ত পরীক্ষা করতে বলায় তুমি উল্টে ওকে রক্ত পরীক্ষা করতে বল। একজন টিচার এর সাথে এভাবে কেউ কথা বলে? এই তোমার শিক্ষা দীক্ষা?" ওনার কথা বলার ধরনে আমার মনটা বেশ উত্তপ্ত হলেও যথেষ্ট ভদ্রভাবে বললাম---" দিদি, উনি যে আমার শিক্ষক তা জানতাম না। ওনার সাথে আমার বিয়ে হলে আমি ওনার স্ত্রী হোতাম। ছাত্রী তো নয়!" বলে ফোনটা কেটে দিলাম। মা পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। বললেন---"বেঁচে গেছিস। অপরিচিত এক মেয়েকে যারা ধমকাতে পারে তারা বিয়ের পর সব করতে পারে।

        এর বছর সাতেক পর ননদের জন্য বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করি। বায়োডাটা টা বেশ চেনা চেনা লাগছে। সেই এক নিঃশ্বাসে নিজের ঢাক নিজে পেটানো। খুব আগ্রহের সাথে নাম জিজ্ঞাসা করায় তাও মিলল। বুঝলাম ,অর্ধ শতক পার করেও ভদ্রলোক একজন ছাত্রী রূপ স্ত্রী পেলেন না ।


আফরোজা অদিতি

একটি স্ক্র্যাবারের  মনকথা


আমি একটি স্ক্র্যাবার। অনেক রঙের আছে আমার সমব্যথিতেরা; তাদের আমার ভাই বন্ধু বলা যায়। আমরা বিভিন্ন রঙের হতে পারি, তবে আমার রঙ সবুজ; আমি সবুজ রঙের স্ক্র্যাবার। সবুজ রঙ বাংলাদেশের পতাকার রঙ; এই রঙ বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের রঙ। এই রঙ শুধু বাংলাদেশের রঙ বা এই দেশের মানুষের প্রিয় রঙ তা নয় অন্য দেশের অন্য মানুষের অনেকেরই প্রিয় রঙ আছে এই সবুজ। আমি বাংলাদেশের সঙ্গে একাত্ম তাই বাংলাদেশের রঙেই আমার রঙ। যদিও আমার মা নেই, তবুও বলি, আামার মায়ের লালটিপ বুকে নিয়ে ওড়ে যে পতাকা সেই পতাকার রঙেই আমার প্রকাশ। বাংলাদেশ আমার প্রিয় দেশ। ১৯৪৭-এ দ্বিজাতি তত্ত্বে ভাগ হয়েছিল ভারত-পাকিস্তান তারপর থেকেই তো শুরু জাতিভেদ, ভাষাভেদ, সাম্প্রদায়িকতা। আমি রাজনীতি করি না, রাজনীতি বুঝি না তবুও বলব, যে মাটিতে ১৯৫২ তে ভাষার জন্য ঝরল তাজা প্রাণ, ১৯৭১ এ স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য রঞ্জিত হলো যে দেশের মাটি, আমি সেই সাহসী দেশের স্ক্র্যাবার অর্থাৎ মাজুনি। এই দেশের একটি ছোট্ট কারখানাতে আমার জন্ম।

আমার মুখের ভাষা নেই, কথা বলতে পারি না। কথা বলতে পারি না অধিকাংশ নির্যাতিত মানুষের মতো! এই অধম স্ক্র্যাবারের মুখে ভাষা নেই কিন্তু অনেক অনেক মানুষ আছে যাদের মুখে ভাষা থাকা সত্ত্বেও, কথা বলতে পারা সত্ত্বেও তারা কথা বলতে পারে না কারণ কথা বলার স্বাধীনতা নেই তাদের! স্বাধীন হয়েও তারা পরাধীন। তারা অত্যাচারিত হয় অহরহ কিন' প্রতিবাদ করতে পারে না! একটি সাধারণ কথাও মুখ ফুটে বলতে পারে না তারা; তারা বলতে পারে না তাদের চাওয়া-পাওয়ার কথা, অধিকারের কথা। ওরা শুধু ব্যবহৃত হয়; ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে, ব্যবহৃত হয় পোশাক কারখানায়, ব্যবহৃত হয় ওয়েল্ডিং-এর কাজে, বাসাবাড়িতে! এই বাসাবাড়িই আমার কর্মক্ষেত্র!
  কৃষিকাজে লাঙল দেওয়া, বীজ বপন, ফসল কাটা, ঝাড়াই-মাড়াই করা, পোশাক কারখানা আর ওয়েল্ডিং-এর কাজ একই রকম! যেখারকার যে কাজ তা সবসময় সে কাজ একভাবেই সম্পন্ন করতে হয় বা করা যায়। কিন' বাসাবাড়ির কাজ? হরেক কিসিমের কাজ হয় বাসা বাড়িতে; ঘর ঝাড়-, ঘর মোছা, রান্না-বান্না, থালাবাসন পরিস্কার করাসহ আরও হরেক রকম কাজ; আমি এই থালাবাসন পরিস্কার করার কাজে ব্যবহৃত হই। মাঝেমধ্যে আবার ঘরের মেঝে পরিস্কারের কাজে, বাথরূমের মেঝে ধোয়র কাজে ব্যবহার করা হয় আমাকে; ব্যবহার করে কারা? ওরা! যারা নির্যাতিত, নিপীড়িত ওরাই ব্যবহার করে আমাকে! ওরা ছেড়ে দেয় না আমাকে। কারণ ছেড়ে দেওয়ার কথা উঠতেই পারে না। আমাকে ব্যবহার না করলেও কাপড়ের টুকরা, নেটের ব্যাগ দিয়েও ওরা মাজুনি বানিয়ে ব্যবহার করবেই। আমি না ব্যবহৃত হই ব্যবহৃত হবেই আমার জ্ঞাতি-গুষ্ঠিরই কেউ! ওরা ব্যবহার করবেই আর আমাকে ব্যবহৃত হতেই হবে আর আমাকে ব্যবহার করবে তারাই যারা আমারই মতো নির্যাতিত, নিপীড়িত। ওরা খুব ব্যথা দিয়ে কাজ করে। মাঝেমধ্যে ময়লা গাদায় ফেলে দেয়! উঃ দুর্গন্ধে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে! অবশ্য মাঝেসাঝে নিপীড়কেরাও ব্যবহার করে; তবে তারা সীমিত! নিপীড়িত, নির্যাতিত যারা, তারাই ব্যবহার করে সকল সময়; এই আমার নিয়তি! 
আমার নিয়তি যাই হোক, কথা বলতে পারি বা নাই পারি, মনের কথা জানাতে পারি বা নাই পারি যাই হোক, সকল সময় মনে মনে বলি যে কথা তা হলো; অত্যাচারিত, নিপীড়িত মানুষেরা শোন, আমি যে শুধু অন্যায় অবিচার অত্যাচার হতে দেখি তা নয়, আমি জানি দেখ তোমরাও! তোমরা জান যেমন আমি অত্যাচারিত হই তেমনই তোমরাও অত্যাচারিত হও। একটি পরিবারে স্বামী নিপীড়ন করে তার স্ত্রীকে, শ্বশুর শাশুড়ি অত্যাচার করে তাদের বউমাকে! বউমা আর স্ত্রীর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে সন্তানের ওপর কখনও বাড়িতে রাখা কাজের বুয়াদের ওপর। আর বুয়ারা নিজের তেজ দেখায় মাজুনিদের ওপর। মানুষের ধর্ম এইরকম; তাদের সমস্ত রাগ-জিদ-তেজ গিয়ে পড়ে তার অধস্তনের ওপর। আমরা মিটিং মিছিল করতে পারি না, তোমরা পারো, মাঝেমধ্যে করো; মিছিল করো, আন্দোলন করো কিন্তু তোমাদের ওপর জলকামানের জল ছিটিয়ে, ছররা মেরে, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে আহত করা হয়! কখনও কখনও লাঠিপেটা করে টেনে-হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় তোমাদের। তখন আমার সঙ্গে পার্থক্য থাকে না তোমাদের! 
এই তো সেদিন ছাত্রী হোস্টেল থেকে দেখলাম গভীর রাতে ছাত্রীদের বের করে দেওয়া হলো। প্রতিবাদ করতে পারতো, ওরা বলতে পারতো এতো রাতে আমরা যাবো না, কিন্তু তারা বলতে পারেনি কারণ তাদের মুখ বন্ধ, কথা বলার অধিকার নেই তাদের। আমি অধম আমারও তো সেই একই অবস্থা। আমি তো আবার এক কাঠি সরেসলাফিয়ে চলে যেতে পারি না। তোমরা মাঝেমধ্যে তো প্যাকিং-স্যাকিং করে বিদেশ পাঠিয়ে দাও, চলে যাই কিছুই বলতে পারি না; মুখ বন্ধ আমার। তোমাদের ওপর রাগ হয় কিন্তু পরমুহূর্তেই ভাবি তোমাদের করণীয় নেই কিছুই আমারও নেই! আমি তখন মেনে নেই আমার ভবিতব্য; অধিকাংশ নির্যাতিত, নিপীড়িত জন তাই তো ভাবে, নিজেদের তারা ছেড়ে দেয় ভাগ্যের হাতে, ঈশ্বরের হাতে! 

যাকগে, আমি একটি স্ক্র্যাবার, বড়ই ঘরোয়া পরিবেশে থাকি। তৈরি হওয়ার পরে হাত বদল হয়; হাত বদল হতে হতে চলে আসি একদিন কারো রান্নাঘরের সিংক-এ। তারপর নির্যাতন সহ্য করতে করতে একদিন পৌঁছে যাই ভাগাড়ে! এই আমার নিয়তি। নিয়তির হাতের পুতুল এই বিশ্বব্রম্মান্ডের সবকিছু! আমি সবুজ রঙের স্ক্র্যাবার। পৃথক রঙেরও আছে, আছে ছোট কিংবা বড়, গোল কিংবা লম্বা, পাতলা কিংবা মোটা। ঘচঘচে তীক্ষ্ণ ধারের তারের স্ক্র্যাবার আছে, আছে নরম ফোমের!
  তোমাদের মতো আমাদের মধ্যেও রকমফের আছে, থাকবেই। যতোই আমাদের রকমফের থাকুক না কেন কাজ সেই একই-নির্যাতিত হওয়া। আমরা দেশ-বিদেশ সর্বত্র নির্যাতিত হই! আমরা এই জগতের নির্যাতিত মানুষের প্রতিভূ।        

মনোজিৎকুমার দাস

দুধের কারবারী  সিধু গোয়ালা

 শহরতলী ছাড়িয়ে গোয়ালাদের পাড়া । গরু বাছুরের পাল , খড়ে গাদা, এখানে ওখানে ছড়ানে গবর । এখানকার গোয়ালারা শহরে দুধ সরবরাহ করে । দুধে পানি মেশানোর দুর্নাম ওদের চৌদ্দ পুরুষের সিধু গোয়ালা স্বীকার করতে এখন আর দ্ধিধা করে না ।
সে এক সময় নিজেও দুধে পানি মিশাতো । বছর পাঁচেক আগের কখা , সিধুর মা তখনো বেঁচে । বোন দুটোর তখনো বিয়ে হয় নি । বোনদের বিয়ে না দিয়ে সে নিজে বিয়েথা করতে পারছিল না । রাধু ও মানু বোন দুটোর জন্য সিধুর পেরাশানী কম ছিল ।গাভীদুটো খাবার দাবার থেকে শুরু করে গাভীর দুধ দোয়ানোর কাজ দুবোনেই করতো ।সেবার গন্ডগোলটা  করে বসে সিধু নিজেই ।
 বোনরা মামা বাড়ি । আজ সব কাজ তাকেই করতে হবে । সিধু দুধে জল মেশাতে গিয়ে একটু বেশি মাত্রাই মিশিয়ে ফেলে ।ভাগ্যের এমনই ফের ওইদিন দুধের হাটে কল নামে । সিধু দুধে জল মেশানোর মোটা অংকের জরিমানা করে মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট । তারপর থেকেই সিধুর নামে দুধে জল মেশানোর ঘটনা চাউড় হয়ে পড়ে । মিঠাই তৈরির দোকানদারয়া সিধু দুধ কেনা থেকে বিরত থাকে । সিধুর দুধে কারবার লাটে ওঠে ।
সিধুর মা গাল পাড়ে । অনেক ভেবে চিন্তে সিধুর মাথার একটা বুদ্ধি আসে ।সে ভাবে , গাই বাছুর বাড়ি বাড়ি নিয়ে দুধ দুইয়ে দিয়ে এলে তো আর জল মেশানো কথা উঠবে না । যেমন ভাবনা তেমন কাজ ।সিধু গোয়ালার দুধে চাহিদা বাড়তে দেরি হয় না । বাজার দরের চেয়ে বেশি দামে সে দুঘ বিক্রি করে তার অবস্থা একদিন ফেরে ।
বোন দুটোর বিয়ে দেয় ,সে নিজেও সেন গ্রামের নিবারণ গোয়ালার মেয়েকে বিয়ে করে । ঘরে এখন দুটো বাচ্চা । সিধুকে এখন আর বাড়ি গিয়ে গাই নিয়ে দুধ দুইয়ে দিয়ে আসতে হয় না । তার দুধের বড়ই কদর ।খদ্দেররা নিজেরা তার বাড়িতে আসে বাচ্চা দুটোর জন্য লিচু কিনতে গিয়ে সিধু ভাবে ফরমালিন দিয়ে  লিচু পাকায়নি তো! তার সন্দেহ হয় । তাই সে বাজার থেকে লিচু না কিনে নিজের গ্রামের নিধুমন্ডলে গাছ থেকে সদ্য পাড়া লিচু কিনে বাড়ি ফেরে। সে এক সময় দুধে জল মেশাতো! ফরমালিন দিয়ে  লিচু পাকানো যে দিন ধরা পড়বে সেদিন লিচুর ব্যাপারিরা বুঝবে কত ধানে কত চাল।



তাপসকিরণ রায়

ধারাবাহিক হ্যান্টেড কাহিনী

কলকাতার আকাশবাণী ভবনের অলৌকিকতা

কলকাতার ভৌতিক ইমারতগুলির মধ্যে গ্যারিস্টন প্লেসের আকাশবাণী ভবনের নাম না করলেই নয়। এই ভবনে একটা সময় ছিল যখন রেডিও স্টেশনের খুব জনপ্রিয়তা ছিল। এখানকার বিল্ডিঙে ছিল বিরাট লম্বা লন। এখানে বেশ কয়েকটি স্টুডিওও ছিল।

এক সময়ের জনপ্রিয় এই রেডিও স্টেশনে নাকি ভূত বাসা বেঁধে ছিল। এখানকার কর্মীরা কিংবা কোন কোন শিল্পীরা নাকি সামান্য রাতেও দেখেছেন, হ্যাট কোট পরিহিত এক সাহেবকে হেঁটে যেতে। তার মুখে ধরা থাকতো জ্বলন্ত এক সিগারেট। কখনও কখনও রাত বেশী হলে সাহেবকে দেখা যেত রেডিও অফিসের ঘরে প্রবেশ করে রেকর্ড, ফাইল-পত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে।
এখানকার কর্মচারীরা বলেন যে রেডিও স্টেশনে নাকি দুটি ভূতের দেখা মিলত,  তার মধ্যে একজন ভারতীয় আর একজন নাকি ব্রিটিশ নাগরিক ছিল।
যেদিন সামান্য রাতেই স্টুডিও এলাকা খানিক নির্জন হয়ে পড়ত, স্টুডিওতে কোন গানের প্রোগ্রাম বা রেকর্ডিং চলতে থাকত সেদিন প্রায়ই কোন অশরীরী বা তার ছায়া নাকি বাইরের রেকর্ডিং রুমের বারান্দায় বা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনোযোগ সহকারে তা শুনে যেত !
আবার গভীর রাতে মাঝে মাঝে আরও একটা ব্যাপার নাকি এখানে প্রায়ই ঘটত। রেডিও স্টেশনে কোন সুমধুর সঙ্গীত ধ্বনিত হতে থাকত। না, সে সঙ্গীত ধ্বনি কোন মানুষের সৃষ্ট হত না কিংবা স্টুডিওর সৃষ্ট কোন মিউজিক যন্ত্রেরও থাকত না। সে অলৌকিক সুরধ্বনি কি ভাবে বেজে উঠত তা কিন্তু কেউ বলতে পারত না !

বুধবার, ৬ জুন, ২০১৮

৭ম বর্ষ ১২তম সংখ্যা ৭ই জুন ২০১৮

এই সংখ্যায় ৯টি গল্প - লিখেছেন তাপসকিরণ রায়, সুবীরকুমার রায়, সুবর্ণা রায়, শুধাংশু চক্রবর্তী, দীপলেখা মুখার্জী, নীহার চক্রবর্তী, পার্থ রায়, আফরোজা অদিতি ও দেবাশিস কোনার ।

তাপসকিরণ রায়


ধারাবাহিক হ্যান্টেড কাহিনী

কলকাতার পুতুল বাড়ির রহস্য
    
কলকাতার মহাশ্মশান নিমতলা ঘাটের কাছাকাছির পুতুল বাড়ির কথা আমরা অনেকেই জানি। পুতুল বাড়ি আজ পড়ো পরিত্যক্ত হলেও একটা সময় ছিল যখন এ বাড়ি এক অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসাবে পরিচিত ছিল। একে বাড়ি বললেও আসলে এটা হল অতীতের বিখ্যাত খাঁটি রোমান স্থাপত্য প্রদর্শিত এক প্রাসাদ। এই বহুতলীয় ইমারতের সর্বাঙ্গ সাজানো ছিল নানা রকমের পুতুলের মূর্তিতে। প্রাসাদের দেওয়াল সজ্জার প্রতি স্তরেই প্রতিফলিত হয় প্রাচীন রোমান শিল্পকলা।
শোভাবাজারের জেটির কাছে গঙ্গার খাতকে পেছনে রেখে আহিরীটোলার হরচন্দ্র মল্লিক লেনে এই পুতুল বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতা পুরসভার হেরিটেজ চিহ্নিত এ বাড়ি কে বা করা তৈরি করিয়ে ছিল এ ব্যাপারে ইতিহাস স্পষ্ট কিছুই বলেনি। গঙ্গার পাশের এ প্রাসাদ আসলে ছিল জমিদারদের প্রমোদ ভবন। সে সময় জুড়িগাড়ি, পালকি কিংবা নৌকাবিলাসে এখানে জড়ো হত সব বিত্তবান জমিদাররা। রাত বাড়তেই পুতুল বাড়ির সারা ঘরে জ্বলে উঠত সুসজ্জিত সব ঝাড়বাতি। প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে ধ্বনিত হয়ে উঠত বাঈজীদের ঘুঙ্ঘুরু। আসলে এটা তো ছিল জমিদার বা বিত্তবানের আমোদ-প্রমোদ ভবন।  বহুতলীয় পুতুল বাড়ির দ্বিতল থেকে শুরু হত সব নাচঘর--বিলাসিতার রঙমহল। শোনা যায় শুধু বাঈজী নয় গরীব পরিবার থেকে কিনে বা ধরে নিয়ে আসা মেয়েদের নিয়েও এখানে ভোগ-বাসনার তৃপ্তি ঘটান হত। প্রতিবাদী মেয়েদের অনেক সময় মেরে ফেলা হত। এখানে খামখেয়ালী, বদমেজাজি বাবুরা নাকি অনেক মেয়েদের নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে।
সে দিন ছিল পূর্ণিমা রাত, এক সুন্দরী নর্তকী দীর্ঘ সময় ধরে নেচে যাচ্ছিল। শোনা যায় সে খুব পরিশ্রান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়েছিল। কিন্তু মদমত্ত বিলাসীদল তাকে বারবার নাচতে হুকুম করছিল। শেষে নাচতে না পারায় সেই নর্তকীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আর তখন থেকেই পুতুল বাড়িতে শুরু হয়েছিল ভৌতিক উপাখ্যানের সূত্রপাত। সে নর্তকীর হত্যা হবার পর প্রতি পূর্ণিমা রাতে সে নাকি নাচঘরে আবার ফিরে আসে। সে নাচে, তার ঘুঙ্ঘুরের আওয়াজে সারা প্রাসাদ গুঞ্জরিত হয়ে ওঠে !
তখনও পুতুল বাড়ির নিচের তলায় কিছু লোক বাস করত। সন্ধ্যের পর ওপরের তলায় কেউ উঠতে সাহস পেত না। এখানকার লোকরা বলে, অনেক মহিলা আত্মারা নাকি বাড়ির ওপর তালার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়। এখানে এক বিত্তশালী জমিদার নাকি মহিলাদের ওপর শারীরিক নারকীয় নির্যাতন চালাত। এদের মধ্যে কারও কারওকে খুনও করা হয়েছে। বাড়ির বারান্দার ওপর তালার কুঠুরিতে নাকি এসব আত্মারই রাতে ঘোরা ফেরা করে বেড়ায়।
পরবর্তী কোন এক সময় এখানে এক বড়লোক মনিবের অনেক দাসী রাখা ছিল। দাসীদের ওপর মনিবের যৌন সম্পর্ক ছিল। কিছু দাসী মনিবের অত্যাচারের প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর সে জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপিত করত। প্রবল প্রতিবাদের জন্যে নাকি মনিব কিছু দাসীদের হত্যা করে বাড়ির পেছনে তাদের লাশ মটি চাপা দিয়ে দিয়েছিল। তারপর একটা সময় রাজাদের হস্তক্ষেপে এইসব নারী নির্যাতন বন্ধ হয়। কিন্তু নির্যাতিতা ও খুন হওয়া নারীদের হাহাকারে পুতুলবাড়ি একটা অভিশপ্ত বাড়িতে পরিণত হয়।
এই অভিশপ্ত বাড়িতে রাতের বেলা অচেনা নারীর কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। কখনও কখনও আচমকা মেয়েলী হাসির শব্দ, চীৎকার, কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। অনেকেই বাড়ির বিভিন্ন স্থানে সাদা পোশাক পরা নারীর ছায়াকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।
এ সব জমিদারী বিত্তশালীদের ইতিহাসের পর কত কাল পার হয়ে গেলো কিন্তু আজও মাঝ রাতে মাঝে মাঝে এখানে অশরীরী মেয়েলী  কণ্ঠের কান্না শুনতে পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের ধারণা জমিদার বা মনিবদের এই পাপের কারণে এখনো পুতুল বাড়িতে অশরীরীদের আনাগোনা লেগে আছে। এই ভয়ঙ্কর পুতুল বাড়ি নিয়ে সত্যজিৎ রায় ও লীলা মজুমদারের বাংলা কিছু ভয়ংকর গল্পও রয়েছে।
এভাবেই পুতুল বাড়ি কলকাতার এক রহস্যময় স্থান হয়ে উঠেছে। গভীর রাতে তো বটেই এমন কি ভর দুপুরেও নাকি এখনও এখানে কিছু অশরীরী আত্মার উপদ্রব রয়েছে।