গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

বুধবার, ২৭ মে, ২০১৫

ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী

বিশ্বাস

    কোন এক শহর । অন্ধকার রাত্রি প্রায় ১১টা বাজে। যায়গাটা সাব আর্বান।  প্রায় লোকজন নেই বললেই হয়।  তার ওপর রবিবার ।  একটি কম বয়েসি মেয়ে হাতে বই খাতা পিঠে একটা ল্যাপ টপ । মেয়েটি এদিক ওদিক   তাকাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে এগুচ্ছে । মাঝে মাঝে ঘড়ি দেখছে । দেখেই মনে হবে খুব ভয় পাচ্ছে । কারুর অপেক্ষায় ছিল কিন্তু সে না আসাতে নিজেই রাস্তায় বেরিয়েছে মনেহয়। রাস্তায় তখন অটো কিম্বা বাস নেই বললেই হয়। তবুও বাস স্টপের কাছে যায় । ওখানে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু ভরসা পায় কিন্তু কথা বলেনা ছেলেটির সঙ্গে । 
 ছেলেটি এগিয়ে এসে বলে কোথায় যাবে বোন ?” 
মেয়েটি কিছুই উত্তর না দিয়ে ঘড়ি দ্যাখে ।
ছেলেটি আবার বলে , ”আমাকে বিশ্বাস করতে পার। আমি তোমার বড় দাদার মতন । তুমি বাসে না ওঠা পর্যন্ত আমার দায়িত্ব তোমার কাছে থাকা , তুমি গেলে তবেই আমি যাব এখান থেকে।  
মেয়েটি অবাক চোখে তাকায় ছেলেটির দিকে । মুখে তবুও কিছু বলেনা । মনে সন্দেহ কিন্তু মুখ বন্দ । 
এই সময় একটি অটো আসে তাতে এক মহিলা ও আরেকজন সহ যাত্রী ।
মেয়েটি তার গন্তব্য স্থানের কথা বলে । অটোওয়ালা বলে , নির্দ্বিধায় আসুন আমি ছেড়ে দেব ভাড়া যা দেওয়ার দেবেন । 
অগত্যা মেয়েটি উঠে পড়ে । সঙ্গে ওই ছেলেটি । 
মেয়েটি সন্দেহ করে ছেলেটিকে । কিন্তু মুখে কিছু বলে না । 
কিছুদূর গিয়ে সামনের মহিলাটি নেমে পড়েন। 
অটোতে এবারে তিনজন পুরুষ ।  সঙ্গে ওই মেয়েটি আর কেউ নেই ।

মেয়েটি সত্যি ভয় পাচ্ছিল । 
অটোওয়ালা বলে , "মা আমার একটি মেয়ে আছে তোমার বয়সী "। সঙ্গের ছেলেটি বলে , "বোন আমার তোমার বয়সী একটি বোন আছে । আমি দেখছি তুমি খুব ভয় পাচ্ছ । কেন এই ভয় ? নিজেকে এত অসহায় মনে কোরনা" । আমরা দুষ্টু লোক নই । আমাদের বিশ্বাস কর। 
মেয়েটি এবার মুখ খোলে , ‘ধন্যবাদ। মনে মনে ভাবে  ওই 'বিশ্বাস' শব্দটা শব্দকোষ থেকে উঠে গিয়েছে     
এর মধ্যে ওর বাড়ির রাস্তা এসেযায়। মেয়েটি দ্রুত পায়ে নেমে পড়ে । অটো বালা এবং ছেলেটির প্রতি কৃতজ্ঞতা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় এবং বলে, "আপনার না থাকলে আমি সত্যি খুব অসুবিধেতে পড়তাম । আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। । আমি আপনাদের সত্যি ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু ......" । 
ছেলেটি ও অটোচালক একসঙ্গে  বলে , "না না এটাত আমাদের দায়িত্ব । তুমি আর রাতে বেরিওনা বোন ।
   মেয়েটি  এরপর ভাড়া মিটিয়ে চলে যায় । মেয়েটি ভাবে , "না সকলে খারাপ লোক নয় , সকলকে অবিশ্বাস করা উচিৎ নয়। কিছু ভাল লোক এখন ও এই পৃথিবীতে আছেন । মেয়েটি তার ব্যবহারে লজ্জিত হল।"  
 তার যাওয়ার রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকে অটো ড্রাইভার এবং ছেলেটি ।  একটি তৃপ্তির নিঃশ্বাস নেয় দুজনে। আসলে ওরা দুজনেই বাবা ছেলে ।



সীমা ব্যানার্জী রায়

লিপি কথাকলি (গল্প হলেও সত্যি)

()

মেমোরিয়াল ডে-এর লঙ উইক এন্ডের শনিবার সকাল। ঘুম থেকে উঠে সবে একটু হাত পা ছড়িয়ে পেছনের প্যাটিও-তে বসে আয়েস করছি। এই মে মাসটা-কে তো 'বৃষ্টিমাস' বলা চলে। কি ভাগ্যিস আজ সকালটা এক্কেবারে ফুরফুরাইয়া। মাথার ওপর হাসিমুন সূর্‍্য্য। তার ওপর পুরো সপ্তাহ তো ঘোড়দৌড়ের মধ্যেই থাকি। তাই একটু আলসেমির সাথে শনিবার সকাল-কে ওয়েল্কাম করা। হঠাত সক্কাল সক্কাল একেবারে ফোন । ফোন টা ধরে হ্যালো বলতেই, ওপাশ থেকে:

-ও দিভাই আমার কি হবে উপায়, রে? জানি না বাব্বাঃ আমার ভাগ্যে কি আছে?
-কেন কি হয়েছে আবার?
 কোন ঝামেলা পাকালি নাকি? 
-আচ্ছা!
 আমি কি সব সময় ঝামেলা পাকাই নাকি? হ্যাঁ, তুই কি রে? তোর বন্ধু কাম ছোট্ট বোন আমি। কোথায় আমাকে সাহারা দিবি তা না- আমাকেই দোষ দিস সময় পেলে? একটু দাঁড়া, আগে একটু জিরিয়ে নি । এক একটা ঘটনাকে সুন্দর করে বলার অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারিণী এই লিপি। ওর ফোন মানেই মন ভালো করে দেওয়া ফোন।
একঘেয়েমিগিরি না করে সব মজার কথা বলে । এই আভিবাসী দেশে ওকে নাকি ওর বান্ধবীরা
 'শান্তিনিকেতনী' বলে রাগায়। যদিও সে আদৌ কলকাতার মেয়ে নয়। একেবারে খাস মুম্বাইয়া। এই শান্তিনিকেতনী ডাক শুনেও ও নাকি রেগে বম্ হয়ে যায়। তবে ১০ মিনিটের জন্য যে রাগটা হয়, তাও বলে দিল। যাই হোক্, কোথা থেকে যে কোথায় চলে যাই। এই আমার মস্ত বড় দোষ । কাজের কথা বলতে গিয়ে তার নাড়িনক্ষত্র নিয়ে টানাটানি করি। লিপির কথায় আসি। লিপি এবার শান্ত হয়ে আমায় বলে যেঃ

-জানিস ভাল করে যে, তোকে না বললে আমার পেটের ভাত হজম হয় না। তোর সময় আছে তো? তাহলে একটু বলে আমার টেনশনটা কমাই।
হেসে বললাম তোর কথা শোনার জন্য তোর এই বান্দা দিদি সব সময় হাজির। এইবার নাটক না করে বলে ফ্যাল চটজলদি। কতক্ষণ আর সময় চাই তোর ? ১ ঘণ্টা - 2 ঘণ্টা?
সে তো তখনঃ “-ওরে বাব্বা!
 আমার আবার ফলস হার্ট এ্যটাক হচ্ছে দেখছি। একটুও নাটক না রে দিভাই! কাল স্কুলে শোনার পর থেকে সেই যে মাথা বনবন করে ঘুরছে তো ঘুরেই যাচ্ছে রে। আমার ছেলেমেয়ের কি হবে জানি না রে, দিভাই? একমাত্র মেয়ে হওয়া যে কত দুঃখের তা তুই বুঝবি না। তাও এখানে তোর মতন একটা দিভাই পেয়েছি ভাগ্যিস। একটু মনের কথা বলে হালকা হই।
বললাম একটু কড়া মেজাজে, “দেখ বলে ফ্যাল সরাসরি । আমার তো আর বাড়ি বসে থাকলে চলে না ? তাই না? কাজেই শুভস্য শীঘ্রম্... কাজ হাসিল কর কুইক। আমি খুব একসাইটেড কিন্তু শোনার জন্য। আমার দ্বারা যদি কোন কাজ হয় বা তোর কোন উপকার হয় তাহলে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব দেখিস। একটু শান্ত হল বোঝা গেল। আচ্ছা বলছি তাহলে শোন, 'গতকাল প্রি স্কুল থেকে মেয়ে এসে বলে,
-মা আমাকে ইতকুলে মিত আস্ক কলেতে-"হাউ মেনি ব্লাদাল এ্যন্ড
 তিতটালস ডু ইউ হ্যাভ ?আমি বলেতি: -মি এ্যন্ড মাই আপকামিং ব্লাদাল। মিত আরো আস্ক কলেতে: -ডিড ইউ টুস
এনি নেম ফর হিম? ও কি ই বলেছে!- কি জানিস?
-
 আই উইল কল হিম লাবন!
মিস নাকি আরো প্রশ্ন
 করেছে ওকে-- বড় হয়ে সে কি হবে? বলেছে সে নাকি বড় হয়ে হলিউদ ইসটাল হবে। আমি যখন মেয়েকে আনতে যাই স্কুল থেকে ওর মিস আমাকে চোখ মেরে বলে, " হেই লিপি! ওয়ান ডে, ইয়োর ডটার উইল বি আ হলিউদ স্টার, মাইন্ড ইট। ইটস রিয়েলি ইন্টেরেস্টিং এ্যন্ড অলসো এ্যান এ্যামেজিং।"
লিপির কথা শুনেতো এদিকে আমার ফিকফিকানি হাসি শুরু হয়ে গেছিল। লিপি বললঃ
-
 আগেই হাসিস না। এইজন্য আমার রাগ ধরে তোর ওপরে। ভাবি বলব না । না বলেও পারি না যে । হাসির কিচ্ছু নেই। চুপটি করে শোন আমার অবস্থা। লিপি বলে চলল-
আমি খালি হাসলাম ওর মিস-এর দিকে তাকিয়ে। কি-
 ই বা বলা যায় এর উত্তরে তুই বল আমায় । মনে মনে খালি বলেছিলাম, বাড়ি চল- আজ দেখাচ্ছি মজা। তাই ইয়া ইয়া করে কোনরকমে পাশ কাটিয়ে বাড়িতে এসে গেছি । বাড়িতে নিয়ে এসে মেয়েকে জিগেস করেছিলাম:
-হ্যাঁরে,
 মিমি? মিস কে কেন বলেছিস যে, হলিউদ ইসটাল হবি ?
মেয়ের উত্তর শুনে আমি তো থ এক্কেবারে। ওরে দিভাই আমি কি করব রে?
-তুমিই তো সব সময় অলিউদ অলিউদ কলো। আমি ইসটাল হলে তুমি আলো আমায় ভালবাতবে তাই না,
 মাম্মা ?
- “ওরে আমি কি করি বল না এই মেয়েকে নিয়ে ?
 কি দশা হবে আমার বুঝতে পারছিস এবার ।লিপির কথা বলার ধরণ কিন্তু খুব ইন্টেরেস্টিং । সত্যি এইটুকু মেয়ে কি বা বোঝে ? হলিউডের ব্যাপার -স্যাপার!
-আরো শোন, আমি বললাম মেয়েকে যে... তুই না হয় হলিউদ ইসটাল হবি কিন্তু ভাইয়ের নাম রাবন রাখবি কেন? মেয়ের `চটজলদি জবাব শুনলে না তোরও মাথা ঘুরে যাবে।
-ওই যে লাবন বদমাইতদেল-কে মেলে ফ্যালে আর তুমিই তো পাপাকে বলছিলে যে,লাবন খুউব বাআলো-তাই আমাল ভাইয়ের নাম লাবন রাখব। আজকাল যেই বদমাইতি কলবে তাকেই মেলে ফেলবে আমাল ভাই লাবন।
আমি বলেছি মিমিকে যে, তোমরা দুটি ভাইবোনে আমাকে নাচাবে সারাজীবন, তা আমি খুবই ভালভাবে জেনে গেলাম। ওরে আমার প্রিয় জি টিভি দেখাও কি বন্ধ করতে হবে এদের জন্য, বলতে পারিস? বাড়িতে কথাবার্তাও কি ভেবে চিনতে বলতে হবে? ওরে আমি কি করি বল? একজন হলিউদ ইসটাল আর একজন রাবন!-এদের কে নিয়ে আমি কি করব? ওদের পাপাকে বললাম, সে হেসে কুটোপাটি করল। শাসন করা তো দূরের কথা।
আমার হাসি আগেই শুরু হয়েছিল ভাগ্যিস ফোন-এর এর এপারে ছিলাম। এবার আর থাকতে না পেরে হা হা হা হা করে হেসে ফেলেছি। বললাম ওকে যে,
খুব সম্ভব যথা সম্ভব যদি সম্ভব হয়-
যারা হাম্বল তথা কম্বল, হতভম্বল রয়-”
-দেখ লিপি!
 মিমি হলিউদ ইসটাল হলে আমাকে ভুলে যাস না যেন! আর রাবণ তো ভালো, আজকালকার যুগে রাবণের খুব দরকার।
লিপি বলে: - “তার মানে তুইও ওর দলে আছিস নাকি ?”
দুম্ করে ফোন এর লাইন কেটে দিল। ভাবনার কিছু নেই-কিছুদিনের মধ্যে আবার ফোন আসবে। ততদিন একটু জিরিয়ে নি। মানুষের মন তো এক অভাবনীয় বস্তু। অনেক বড় ঘটনা যেমন বিস্মৃতির অতলজলে হারিয়ে যায় তেমনি আবার সামান্য কোন ঘটনা স্মৃ্তিপটে চিরকালের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। তেমনই এই উপরের ছোট্ট ঘটনা চোখ বুজলে আমি যেন স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পাই।


শাঁওলি দে

স্বীকৃতি

আলোচনাটা শুনে মন ভরে গেল আজকে। এত সুন্দর ভাবে কথা বলতে কবে শিখল কে জানে!ভাবতে অবাক লাগে যে এই মেয়েকে জন্ম দিয়েছিল ও।এই মেয়ের জন্য. . .! দুচোখ জলে ভরে গেছে গর্বে আজ।একটু অহংকারও কি হচ্ছে না!এই যে সবাই কতকিছু বলাবলি করছে,বাহবা দিচ্ছে একি পরক্ষোভাবে তারই প্রশংসা নয়!অবশ্যই তাই!অথচ ক'বছর আগেও ওকে দেখলে লজ্জা আর রাগ ছাড়া কিচ্ছু হত না।পরিচয়টা পর্যন্ত দিতে ইচ্ছে করত না যে এ আমারই ঔরসজাত সন্তান।কি জানি কোন গ্রহের ফেরে এতবড় ভুলটা হয়েগিয়েছিল। আজ আয়নার দিকে তাকাতে বড় লজ্জা বোধ হয়। নিজের মুখোমুখি হওয়া কি এতটাই কঠিন! জন্মানোর পরের দিনগুলো আজ ও মনে পড়ে স্পষ্ট;দুঃখ,চেষ্টা,হতাশা ক্রমে ক্রমে উদাসীনতায় পরিণত হয়েছিল নিজের অজান্তেই। অস্বীকার করতে কোন দ্বিধা নেই আজ যে নিজের সন্তানের প্রতি তাকাতেও অসহ্য লাগত সে সময়।কিভাবে যে দিনগুলো কেটেছে!যেটা ভবিতব্য তা কোনদিনই মেনে নিতে পারিনি...শুধু নিজেকে অযথা বন্দী করে রেখেছিলাম অনাবশ্যক এক কারাগারে।কিন্তু আজ সব কিছু অন্যরকম।সত্যি কী ভাগ্য করেছিলাম যে আজ এমন একটি মেয়ের বাবা বলে পরিচিতি পাচ্ছি। পেছন দিকে তাকাতে আর সাহস হয়না আজ কাল।উফ্‍!কী অবহেলা!অথচ এই অবহেলা আর তাচ্ছিল্যের মধ্যে কখন যে মেয়েটা. . .
হাততালির শব্দে হঠাৎ ঘোরটা কেটে গেল।মাইকে তখন ঘোষণা হচ্ছে ওর নাম। আমি দেখছি দুচোখ ভরে আমার আত্মজাকে।বুকের ভেতরটা যদি কেটে কাউকে দেখাতে পারতাম!একটু পরই আমার মেয়ে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মঞ্চে পুরস্কার নিতে উঠবে,নাম ঘোষণা করছেন ঘোষক।মেয়ে আস্তে আস্তে মঞ্চের দিকে এগুচ্ছে ওর মায়ের হাত ধরে। আমি দেখছি দুচোখ ভরে।মাইক হাতে নিয়েই আমার মেয়ে,হ্যাঁ আমারই তো ...আমাকে আরো একবারের মত অবাক করে বলে উঠল "এই পুরস্কার ও সন্মান আমার প্রাপ্য নয় এটা আমার বাবা মায়ের জন্য যারা আমাকে এই পৃথিবীতে এনেছেন!"ঘনঘন হাততালির শব্দে পরের কথাগুলো আর শোনা যাচ্ছিল না। আমি শোনার চেষ্টাও করছিলাম না,আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে এলাম।যে জন্মান্ধ মেয়েকে কোনদিন স্বীকার করিনি সেই আজ আমায় স্বীকৃতি দিয়ে গেল পৃথিবীর কাছে।


বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

বর্ষ ৪ সংখ্যা১২।।১৩ই মে ২০১৫

এই সংখ্যার লেখকসূচি – সম্বুদ্ধ সান্যাল, সুবীর কুমার রায়, সৌরেন চট্টোপাধ্যায়, সপ্তর্ষি মাজি, সীমা ব্যানার্জী রায়, ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী, উৎসব দত্ত, শমিতা চ্যাটার্জী ও  দেবাশিস সেনগুপ্ত 

                                 সূচিপত্রে ক্লিক করুন

সম্বুদ্ধ সান্যাল

আত্মশুদ্ধি

হাত দিয়ে কপালটা ঘষতেই কেমন যেন বালিময় লাগলো। কতক্ষণ এভাবে বসে আছি জানিনা। পেছন থেকে আরো একটা লোকাল ট্রেন বেড়িয়ে গেলো। ক’টা বাজে তাও জানিনা। রেললাইনের অপর পাশে বাড়ির গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে সূর্য্যটা নিভু নিভু। বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম খানিক। মাথাটা বড় ঝিমঝিম করছে।
বাচ্চাদুটো খেলছিলো যে, তারাও বোধ হয় চলে গেছে। ভাইবোনই হবেমনে হয়। ছোট ছেলেটা বানিয়ে দিচ্ছিলো বোনের রান্নাবাটির ঘর। কচি কচাপাতার মাংস, তাতে শাদা কষের ঝোল, সাথে বালির ভাত। ছোট্ট মেয়েটা দাদাকে ডাকছিলো খেতে। কানে বেজেছিলো, “তুই আগে বলে আসবি তো দাদা, আরো অনেক কিছু বানাতাম।” বলেছিলাম, “আজ কনফারেন্সটা সেরে এদিক দিয়ে যেতে যেতেই হটাৎ তোর বাড়ির কথা মনে পড়লো।” সবার মত করেই সেই একই উত্তর, “তোর শুধু কাজ আর কাজ। অনেক পালটে গেছিস দাদা।

প্লাস্টিকের গ্লাস খানিক দূরে পড়ে আছে বুকের মধ্যে একটা ফিল্টার ঠেকে যাওয়া পোড়া ফ্লেক নিয়ে। আগুনে পুড়ে যাওয়া শরীর আর কারোর কাজে লাগবে না। বহুদিন বাদে আই.বি. পাওয়া গেছিলো। ব্ল্যাক-এ। কিন্তু লেবেলটা আজ আর দেখতে চাইছি না। “কি মিষ্টার আচারিয়া, আজ কি ফাঁকা আছেন? একটা রেয়ার কোয়ালিটির রাম পাওয়া গেছে। ভিনটেজ। কত জানেন? সিক্সটি ইয়ারস।আসুনই না, আপনার জন্য আরও একটা ভালো অফার আছে।” তাকে না করতে পারিনি।

আইত্তারা, কে এসেচে দ্যাক। চিনিস ওকে? রাহুলদা। ওই যে বিশাল ব্যবসা কোলকাতায়, আমাদের পুজোয় প্রতিবার পঁচিস হাজার গোনা মাইরী।”  কানে আসাতে গর্ব্ব হ’ল না লজ্জা, ঠিক বুঝতে পারিনি তখন। তবে মাঝে মাঝেই শুনতে পাই এমন কথা। বহুদিন শ্মশানে আসিনি।এই জায়গাটা এককালে খুব প্রিয় ছিলো আমার। বিরাট জামগাছটার তলে গোল করে বাঁধানো শ্মশানবন্ধুদের ‘ওয়েট’ করার জায়গা। তাও ভেঙ্গে পড়ছে। নদীর জলটাও শুকিয়ে গেছে। মাঝের কালো জলে কয়েকটা বাঁশ পোঁতা। পঞ্চায়েত থেকে একটা টিউবয়েল লাগিয়ে রেখেছে চিতা নেভানোর জন্য। আগেও ছিলো, তবে তা ব্যবহার হতযখন গাঁজা টেনে গলা শুকিয়ে যেত।

এইখানে প্রথম আসি দুলালের সাথে। ক্লাসমেট। “ক্লাস কেটে যার সাথে মিট করতে হয়, সেই হল ক্লাসমেট।” না, এটা আমার কথা নয়, যদুদার। এই জামতলার নীচে বাঁধানো জায়গাটায় বসে গাঁজার ছিলিমে টান দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করেছিলো, “দুলালের সাথে চেনা কি করে?” আস্তে আস্তে যদুদার গান কি করে মনে বসে গেছিলো। স্কুল পালানোর সময় দুলাল বলেছিলো, “আজ এমন জায়গায় নিয়ে যাব তোকে যে নেশা লেগে যাবে।

যদুদা ছিলো এই শ্মশানের অধিপতি। মড়ার কাঠওয়ালাদের সাথে দড়াদড়ি থেকে শুরু করে পুলিশের সাথেগলাগলি পর্যন্ত। জামগাছের নীচে তার ছায়ায় আমাদের বড় হয়ে ওঠা। গাঁজা দু’দমচলার পর তার গান আর রাজাদার ঢোল। আশ্চর্য প্রতিভা মানুষটার, বাউলগানগুলো রাত জেগে নিজেই বানাতো, আর সুর দিত রাজাদা কে সঙ্গে নিয়ে। তার আগের জীবননিয়ে যেটুকু জানতাম তা হল লোকগীতি নিয়ে বাংলা ব্যান্ড খুলতে চেয়েছিলো, কিছুহিটও দিয়েছিলো, কিন্তু কোনদিন না জানতে চাওয়া কোনও কারনে ব্যাপারটা ভেঙেযায়। তারপর থেকেই সে ‘যদু গাঁজাখোর’ বলে পরিচিত। তার সঙ্গ মানে বাবারবকুনি।
কলেজ শেষ অবধি এখানেই থেকেছি, ঠেকেছিও। চাকরীটা আমার দ্বারা হতনা। পড়াশোনা শেখার থেকেও বেশি শিখতে ইচ্ছা করত যা সিলেবাসে নিষিদ্ধ। কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার আগের দিনও বাঙলাদেশ থেকে বীরভূমে বাউলগান কি করে প্রবেশ করলো তা জানতেই বেশি আগ্রহী ছিলাম। আর তার রসদ একমেবাদ্বিতীয়ম যদুদা। অনেক স্টক ছিল তার। তার ভাষায়, “যার স্টক আছে, তার টক আছে।” আর আমাদের ছিলো যদুদার টাকার মদ-গাঁজা। এমন এক সন্ধ্যায় সেই আমায় বলে, “তোর সুর না থাক, ইচ্ছে আছে। খেয়ে পড়ে বাঁচবি ব্যাটা।

পুরোপুরি কোলকাতাবাসী হওয়ার আগে যদুদা দেখা করতে বলেছিলো। সঙ্গে ওখানকার বন্ধুরাছিলো বলে আর শ্মশানে আসিনি। মাঝে গ্রামের বাড়িতেও এসেছি কয়েকবার। ক্লাসমেট বলতে মাঝে মাঝে অগ্নিশ্বরের সাথে ফোনে কথা হয় আর দুলালের মুদীখানার থেকেকিছু কিনতে গেলে তার সাথে ওই পর্যন্তই। দুলালই মাঝে মাঝে যদুদার খোঁজ আমায়দিত, আর আমার খোঁজ যদুদাকে। “যাকে খুঁজবি, তাকে পাবিই।” মিউজিক স্টুডিওতে বসে সারাদিন প্রতিভা খুঁজে বেড়াতে আর ইচ্ছা করে না। প্রতিভা এখন নিজেরাই ধরা দেয়। যদুদার কথাটা আজকাল মরচে পড়া মত শোনাত।

- “দাদা, দুলালদা তোমায় খুঁজছে।
- “হুম, বল গিয়ে আমি আসছি। কার্তিক কোথায় রে?”
- “ওই যে, মড়ার মাথাটা এখন ফাটাচ্ছে।
- “মড়া কাকে বললি? তুই মড়া কাকে বললি? জানিস ও কে? জানিস ও কে ছিলো? একটা চড় মারবো শালা শুওর।
- “এ রাহুল, কার সাথে ঝামেলা করছিস? ও বাচ্চা ছেলে একটা। ছাড়, ওদিকে চল।
- “বাচ্চা ছেলে হলে কি জানবে না ও কাকে কি বলছে? শুওরের বাচ্চার জানা উচিত কাকে কি বলতে হয়।
- “কি হয়েছে গো দুলালদা?”
- “কিছু হয়নি, এই কলটা একটু কেও পাম্প কর, মাথায় জল দিই, তারপর মন্দিরে শুইয়ে দিই, ঘুমোক।
- “এই যদুদার জন্য কি করেছি আমি, কি করেছি, তুই বল দুলাল, কি করেছি? সারাজীবন লোকটার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছি। আমি শালা কত বেফালতু মেয়ের সাথে শুয়ে তাকে সিঙ্গার বানিয়েছি, আর যদুদার যোগ্যতার কথাই মনে রাখিনি...
- কি হচ্ছে রে ওখানে?
- কে জানে সালা, মাল খেয়ে যত বাওয়াল, এতদিন পরে যদুদার জন্যে প্রেম জেগে উঠেচে। লোকটার যকন মুকে রক্ত উটতো, তখন কোথায় ছিলো? সবই একন লোক দেখানো মাইরী।
আজ আবার গলাটা শুকনো লাগছে।


সৌরেন চট্টোপাধ্যায়

চিঠিচাপাটি


   আমাদের বলাই, অর্থাৎ পাতিয়ালার বলবিন্দর সিং ওর নতুন কেনা স্করপিওর স্টিয়ারিং-এর পিছনে বসে সুরেলা গলায় গুনগুন করে রবীন্দ্রসংগীত গাইছে। শান্তিনিকেতন থেকে বাংলায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বলবিন্দরকে গুরুদেবের গান আর কবিতার একজন বিশেষজ্ঞই বলা যায়। ওর ভরাট গলার আবৃত্তি শুনে অনেককেই বলতে শুনেছি, ‘বলাইবাবুর দাড়ি আর পাগড়ি এক্কেবারে ঠিক আসল পাঞ্জাবীদের মত’। বলাই-এর পাশের সিটটা এখনও ফাঁকা, পিছনের সিটে রেণু, ভানু আর আমি দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছি। কারণটা আর কিছুই নয়, একটা পুরো হপ্তা কেটে গেল অথচ আমরা আমাদের অতি প্রিয় ভুলোদা ওরফে  ভোলানাথ সমাদ্দারকে তাতাতে পারিনি। ক’ দিন ধরেই ভুলোদা যেন একটা হাসিখুশির মুখোশ পরে আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে চলেছেন, আর আমরা চারজন যেন বাসি মুড়ির মত মিয়ে যাচ্ছি। এভাবে চললে আমাদের এমন আড্ডাটারই যে সাড়ে বারোটা বেজে যাবে! একটা হেস্তনেস্ত এবার করতেই হবে।    
আজ শনিবার। রেণু মানে বিজ্ঞানের অধ্যাপিকা রেণুকা বসু আর উকিল ভানু মিত্তিরের আজ আধলা ছুটি; শ্যামবাজারে বলাই-এর শাঁসালো মোটর পার্টসের পৈতৃক ব্যবসা, বিশ্বাসী কর্মচারী আছে, অতয়েব কাজে ফাঁকি দেবার অভিযোগ ওঠার সম্ভাবনা নেই; আর আমার আর ভুলোদার তো সব বারই রোববার!     
   বলাই-এর নতুন গাড়িটার উদ্বোধন করতে ডায়মন্ড হারবারের দিকে হাওয়া খেতে যাবার প্রস্তাবটা ভুলোদাই দিয়েছিলেন। বদ্ধ ঘরে বেশিদিন একনাগারে থাকলে তাঁর নাকি স্মৃতিশক্তির কম্পিউটারটা হ্যাং করে যায়! ন্যাশানাল লাইব্রেরির সামনে ভুলোদার দাঁড়ানোর কথা। বাঁক ঘুরতেই ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি-পায়জামা আর চোখে সোনালি রিমলেশ চশমা-শোভিত বনেদী চেহারাটা চোখে পড়তেই আমরা টানটান হয়ে গেলুম। বলাইও গান থামিয়ে ঘন দাড়ি-গোঁফের আড়ালে হাসি লুকিয়ে ফেলেছে। ‘ভাজা মাছটি উল্টে খেতে না জানা’ হাসি মুখে নিয়ে এগিয়ে এসে বলাই-এর পাশে উঠে বসলেন ভুলোদা, গাড়ি ছুটল মোহনার দিকে। মিনিট পাঁচেক সবাই চুপচাপ। হু হু করে হাওয়া আসছে খোলা জানালা দিয়ে, দেখা যাক এই দখিনা বাতাসে ভুলোদার কম্পিউটার কি রকম কাজ করে!   
   বিপক্ষ ফিলডিং টিমের আমরা তিনজন ওৎ পেতে আছি, ব্যাট-প্যাডের মধ্যে একটু ফাঁক বা একটা হাফ চান্সের ক্যাচও যদি ওঠে! কিন্তু ভুলোদার যা শক্ত ডিফেন্স! --যেন ‘রাহুল দ্রাবিড় দ্য ওয়াল’। মুখে  প্রগাঢ় গাম্ভীর্যের প্যাড-হেলমেটে মুখ ঢেকে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে বাইরের অপসৃয়মান দৃশ্য দেখে যাচ্ছেন ভুলোদা; প্ল্যান অনুযায়ী বোলিং শুরু করল রেণু। পিছনে হাত ঘুরিয়ে হট বক্সটা টেনে নিয়ে বের করল গরম গরম মাছের কচুরি আর কাশ্মিরী আলুর দমের বাউন্সার। ভানু আর আমি কাগজের প্লেটে সাজিয়ে যত্ন করে এগিয়ে দিলুম। ভুলোদা নির্বিকার চিত্তে সেগুলো হুক করে যথাস্থানে পাঠিয়ে দিলেন। চশমার পিছনে চিকচিকে চোখদুটো দেখে মনে  হল আমাদের স্ট্র্যাটেজি কিছুটা যেন আঁচ করেছেন। পরের ওভারে ভানুর অমন নকুড়ের জলভরা সন্দেশগুলোও বাউন্ডারি পেরিয়ে চলে গেল।   
আচমকা বলাই বাঁ হাতের তিন আঙ্গুলে নকুড় ঘোরাতে ঘোরাতে আর স্টিয়ারিং-এ দাদরার তাল দিতে দিতে উদাসী গলায় গেয়ে গেয়ে উঠল ‘ আমি চঞ্চল হেএএএ ... আমি সুদূরেরও পিয়াসীইইই ...।’  
এবার একেবারে টপ স্পিন! ভুলোদা নড়েচড়ে বসলেন।
   হেসে বললেন, কি হে বলাইচন্দর, হঠাৎ এমন চঞ্চল হয়ে সুদূরের পিয়াস হয়ে উঠলে যে বড়!  
--- না হয়ে আর উপায় কি বল! পিছন থেকে কীপার ভানু ওকালতি করল, মাসখানেক হল ওর সর্দারনী গোঁসা করে বাপের বাড়ি হরিয়ানার গ্রামে গিয়ে বসে আছে। বলাই বেচারা সুস্বামীর মত করে হাফ দিস্তা পাতা ভর্তি রবি ঠাকুরের গান-কবিতার কোটেশন সমেত সপ্তাহে দুটো করে চিঠি দিয়ে যাচ্ছে, অথচ নিঠুরা সর্দারণী প্রতি দুটো চিঠির জবাবে একটা করে নিরস এস.এম.এস পাঠাচ্ছে, বোঝো কাণ্ড!   
--- চিঠির চরিত্র বড়ই বিচিত্র, ফার্স্ট স্লিপ থেকে আমি বেশ কায়দা করে খেলিয়ে বললুম, পিয়নের ঝুলিতে কত যে রহস্য, কত যে হাসি-কান্না লুকিয়ে থাকে তার ইয়ত্তা নেই। কি বল ভুলোদা!     
--- চিঠির মর্ম ভুলোদা কি জানে, যে বলবে! রেণুর স্লেজিং, একা মানুষ, বে-থা করেননি, তার ওপর চিঠি-পত্তর লেখার মত আত্মীয়-স্বজনও তো ত্যামন নেই, সারা জীবনে কটাই বা চিঠি পেয়েছেন ভুলোদা! আর এখন এই হোয়াটসঅ্যাপ আর এফ.বি-র যুগে কে আর চিঠি লিখে সময় নষ্ট করে!    
--- কিন্তু ভুলোদা কত বই-পত্তর পড়েন, কত জ্ঞান, কত ইয়ে..., আমি শিশুর সারল্য নিয়ে ভুলদার যেন পক্ষ নিলুম।
--- আরে ইয়ার, কিতাব পড়ে কি আর চিটঠির মজা মেলে? চিটঠি হল চিটঠি, ওর মতলবও আলগ আছে। বলাই আড়চোখে ভুলোদাকে দেখে ফুট কাটল। 
--- বলাই ঠিকই বলেছে। ভানু উকিলি গলায় জ্ঞান ছিটালো, চিঠির ভাষা, হাতের লেখা, মায় কাগজ আর কালির নমুনা দেখেও লেখকের চরিত্র, মনের ভাব বোঝা যায় তা জানো!    
--- তা বলে কি ভুলোদা চিঠির ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলতে চাস! আমি মুখে চোখে যতটা সম্ভব রাগ ফুটিয়ে বললুম, কত বিখ্যাত লোকের চিঠি, পত্রাবলী আছে, ভুলোদা কি সে সব কিছু পড়েননি!    
--- কি বাজে কথা বলছিস! ভুলোদা পড়বেন পরের চিঠি! তাহলেই হয়েছে! রেণু মুখ ঘুরিয়ে মুখ ঝামটা দিল, পরের চিঠি পড়া যে অভদ্রতা এটাও কি জানিস না! কি ভুলোদা ঠিক বলি নি?    
বলাই সিং-এর স্পিন, আর তিন দিকে আমরা ক্লোজ ফিল্ডার  শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায়।    
--- ঠিক, আবার ঠিক নয়ও। ভুলোদা গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বললেন।
জয় মা! বরফ গলেছে!  
---পরের চিঠি আমি পড়িনা ঠিকই, তবে বিখ্যাত মানুষদের যে সব চিঠি প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো কিন্তু পড়তে ছাড়িনা।
--- বিখ্যাত লোকেদের চিঠিও বিখ্যাত বলতে হবে তাহলে?! আমি বললুম।
--- অবশ্যই। ভুলদা বললেন, ওই যে ভানু বলল না, চিঠি পড়ে মানুষটাকে বোঝা যায়! একদমখাঁটি কথা। স্বামীজী, কবিগুরু, নেতাজী, গান্ধিজী, নেহেরু -- এদের চিঠির কথাই ভাবো! কি সব অমূল্য দলিল! আবার এমন মানুষও আছেন যাঁরা তাদের চিঠির জন্যই শুধু বিখ্যাত হয়েছেন।  
--- সেটা কি রকম? রেণু শুধালো।   
ব্যস! আর পাশ কাটানোর উপায় নেই, বেশ ভালো রকমই জড়িয়ে ফেলা গিয়েছে এবারে।
--- বলাই-এর সর্দারণীর অনারে প্রেমপত্র দিয়েই তাহলে আরম্ভ করা যাক, সাধের রূপোর সিগারেট কেস থেকে সিগারেট বাছতে বাছতে শুরু করলেন ভুলোদা।
--- ইংল্যাণ্ডের কেন্ট অঞ্চলের অ্যালান ফোরম্যান নামে এক ভদ্রলোক তাঁর বউ জ্যানেটকে একতা চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৮২ সালের ৩রা জানুয়ারী , লেখা শেষ হয় ১৯৮৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী। প্রায় দু বছর ধরে লেখা সেই চিঠিতে মোট ১৪,০২৩৪৪ (১৪ লক্ষ ২ হাজার ৩ শো ৪৪)-টা শব্দ আছে।  
--- ওঃ, কি ভাগ্যবতী বউ গো! পিছন থেকে রেণুর মন্তব্য।
--- ওটা পড়ে ওর বউ ডিভোর্সের মামলা করে নি? ভানু উকিল যোগ করল।
--- তা বলতে পারব না, আচ্ছা আর একটা শোনো, জানালা দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন ভুলোদা, নরফোকের ডিস শহরের বাসিন্দা ক্যানন বিল কুক আর তাঁর স্ত্রী হেলেনকে কোন কারণে ১৯৪২ সালের মার্চ থেকে ১৯৪৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আলাদা থাকতে হয়েছিল। চার বছরের বেশী এই সময়ে তাঁরা দুজন দুজনকে ৬ হাজার প্রেমপত্র বিনিময় করেছিলেন, অর্থাৎ গড়ে দিনে চারটে করে চিঠি লিখেছিলেন দুজনে।
--- ওরে বলাই শোন শোন, এই সব টেস্ট প্লেয়ারের কাছে তুই তো ব্যাটা একটা দুগ্ধপোষ্য শিশু রে! আমি আর না বলে পারলুম না।      
--- আর একজন প্রেমিক স্বামীর কথা জানি, ভুলোদা এখন টপ ফর্মে, তিনি হলেন জাপানের অর্থ দপ্তরের এক সময়ের উপমন্ত্রী উ চি নেদা।  ঘরে শয্যাশায়ী স্ত্রী মিৎসু, অথচ সরকারি কাজে সারা পৃথিবী চষে বেড়াতে হয় তাঁকে। ১৯৬১ সালের জুলাই থেকে ১৯৮৫ সালের মার্চে স্ত্রীর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি মোট ১৩০৭টি দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিগুলোতে অসুস্থ মিৎসুর খবরাখবর ও দাম্পত্য জীবনের সাধারণ কথা ছাড়াও তাঁর কর্মময় জীবনের পরিচিত অপরিচিত পাঁচ লক্ষ মানুষের কথা লেখা আছে। অমূল্য এই চিঠিগুলো ১২৪০৪ পৃষ্ঠায় মোট ২৫টা খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।  
   একটা কেতাবি কভার ড্রাইভ, একটা স্কোয়ার কাটে বাউণ্ডারি আর লং অনের ওপর দিয়ে একটা ‘বাপি বাড়ি যা’ মার্কা ওভার বাউণ্ডারি হাঁকিয়ে আমাদের মত চারটে এলেবেলে ফিল্ডারকে একেবারে শুইয়ে দিলেন  ভুলোদা।
   মাষ্টারণীর চশমা ঝুলে পড়েছে নাকের ডগায়, ভানু উকিল বিড়বিড়  করে কি সব হিসেব কষছে, আমার নিজের মাথাটাকে মনে হচ্ছে যেন একটা ভীমরুলের চাক, গাদা গাদা সংখ্যার ভীমরুল ভোঁ ভোঁ করছে। অমন যে দশাসই বলবিন্দর, সেও কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছে। প্রায় ঘাড়ের ওপর গুঁতো মারতে আসা একোটা গুণ্ডা মিনিবাসকে কোনরকমে পাশ দিয়ে গাড়িটাকে একটা শরবতের দোকানের সামনে দাঁড় করিয়ে বাংলা ভুলে বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় বলল, চিটঠি কোঈ মামুলি চিজ নেহি হ্যায় জী, ইয়ে হাম আজ মান গিয়া, অব থোড়া লস্যি উস্যি পিনেকা ইজাজৎ দিজিয়ে দাদা।
   ভুলোদা হাসিমুখে মাথা নাড়তে আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এ সময় ড্রিঙ্কসের বিরতিটা খুবই দরকার ছিল।   
   দু-গ্লাস করে লস্যি শেষ হলে আবার গাড়ি ছুটল। ভুলোদা মন দিয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য-টৃশ্য দেখছেন। রেণু ফিসফিস করে ভানুকে বলল, কি রে, খেলা কি এখানেই শেষ না কি?
--- আরে নাহ! ভানুও চাপা গলায় বলল, চাম্পিয়ান ব্যাটসম্যান, খেলতে যখন নেমেছে অত সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না। 
   হঠাৎ পিছন আর পাশে মুখ ঘুরিয়ে সেই চিকচিকে চোখে আমাদের মুখগুলো দেখে নিয়ে ভুলোদা শুরু করলেন, --- চিঠি দেওয়ার কথা তো শুনলে, চিঠি পাওয়ার কথাও একটা শোনো। আমেরিকার পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী , বিখ্যাত বেসবল খেলোয়াড় হাঙ্ক অ্যারোঁ ১৯৭৪ সালে ৯ লক্ষ চিঠি পেয়েছিলেন। আর দামী চিঠির কথা যদি বল তো ১৮১৮ সালে ইহুদীদের কুসংস্কারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের সই করা চিঠিটার কথা বলতে হবে। ১৯৮৬ সালে ২৯শে অক্টোবর নিউইয়র্কে সথবীর নিলামে ৩,৬০০০০ (৩ লক্ষ ৬০ হাজার) ডলার মানে আজকের টাকার অঙ্কে প্রায় ১৮ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
   আমাদের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে বোধ হয় একটু মায়া হল ভুলোদার। বললেন, একটা ছোট্ট চিঠির কথা বলে এবারের মত ছেড়ে দিচ্ছি তোমাদের। বিখ্যাত ফরাসী নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগোর নাম তো তোমরা শুনেছো! ১৮৬২ সালে হার্স্ট অ্যাণ্ড ব্রাকেট কোম্পানি তাঁর সুবিখ্যাত ‘লা মিজারেবল’ উপন্যাসটি প্রকাশ করে। সে সময়ে ছুটি কাটাতে শহরের বাইরে গিয়েছিলেন হুগো। পাঠকেরা উপন্যাসটি কি ভাবে গ্রহণ করেছে বা বিক্রি কেমন জানার জন্য প্রকাশককে একটা চিঠি লিখলেন তিনি। কি লিখেছিলেন সেই চিঠিতে জানো? শুধু একটা জিজ্ঞাসার চিহ্ন (?)। প্রকাশক মশাইও সমান রসিক, তিনি জবাব দিয়েছিলেন একটা বিস্ময় চিহ্ন (!) লিখে।
   গাড়ি ডায়মন্ড হারবারে ঢুকছে, ভুলোদাও একটা ঝোড়ো ইনিংস খেলে আপাতত ডিক্লেয়ার করে দিলেন। আর আমরা চারজন গুণমুগ্ধ অনেকক্ষণ পরে প্রাণ খুলে হাসতে হাসতে হাততালি দিলাম।    
       
(এই লেখার প্রতিটি তথ্যই ‘গিনেস বুক অব রেকর্ড ১৯৯১’ থেকে নেওয়া। বিঃদ্রঃ- ২০০১ সালে সাহিত্য তীর্থ (প্রকাশক)-র প্রকাশিত আমার লেখা জানা-অজানা ১০০১ বইটি এ ধরণের বহু তথ্যে সমৃদ্ধ।)     

        

সুবীর কুমার রায়

নিয়তি

অরুণাচল নামে নতুন রাজ্যের তখনও জন্ম হয় নি। সংক্ষেপে নেফা (N.E.F.A.) নামেই তার পরিচয়। জোরকদমে নতুন রাজ্য গঠনের কাজ চলছে। দুর্গম এলাকা, বহির্জগতের সাথে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, যানবাহন ব্যবস্থা প্রায় নেই, সর্বপরি সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় অনুমতিসাপেক্ষ যাতায়াত। এইরকম একটা অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী, সিভিল-ইঞ্জিনীয়ার স্বপনবাবু কর্মসুত্রে ওখানে গিয়ে হাজির হলেন। দৈনন্দিন জীবন ধারণের অস্বাচ্ছন্দ, এমনকী খাবার বা অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য আকাশপথে সরবরাহ করা হলেও, অন্যান্য সুযোগ সুবিধার কোন কার্পণ্য, সরকার করেন নি। গাড়ি, ভাল কোয়ার্টার্স, চাকর, বাবুর্চী, মালি, ইত্যাদি কোনকিছুরই অভাব নেই। অবিবাহিত স্বপনবাবু তাঁর কাজকর্ম নিয়ে পাহাড়ের কোলে ভালই ছিলেন।
এরমধ্যে স্বপনবাবু বোনের বিয়ে উপলক্ষে বাড়ি আসার জন্য ছুটির দরখাস্ত করলেন। এই বোনকে তিনি ভীষণ ভালবাসেন। ছোটবেলা থেকে সুখে-দুঃখে তাঁরা একসাথে বড় হয়েছেন। শুধু কী তাই? জন্মের আগে মাতৃগর্ভেও ভাই-বোন পাশাপাশি দশ মাস থেকেছেন। তাঁর বোন তাঁর থেকে মিনিট কয়েকের মাত্র ছোট। তাই ছুটি পাওয়া মুশকিল হলেও, অনেক চেষ্টায় সে ব্যবস্থাও করে ফেলেছেন। রিলিভার চার্জ বুঝে নিলেই তিনি গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন।
বাড়ি আসার ঠিক আগে তাঁর সবসময়ের সঙ্গী প্রেমজী তাঁর সাথে আসার বায়না ধরলো। প্রেমজী সরকারী মাইনেতে তাঁর বাড়ির কাজকর্ম করে, বাগান পরিচর্যা করে। আদপে নেপালের অধিবাসী এই যুবকটি সর্বক্ষণ তাঁর কাছেই থাকে। স্ত্রী স্থানীয় কোন গ্রামে বসবাস করে। স্বপনবাবু তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবার নানান অসুবিধার কথা বলেও, তাকে ক্ষান্ত করতে পারলেন না। সে তার মনিবের বহিনের সাদিতে যাবেই, সেইসঙ্গে কলকাতা শহরটাও ঘুরে দেখবে। বাধ্য হয়ে স্বপনবাবু তাঁর রিলিভার ভদ্রলোকটিকে সব খুলে বলে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন এইক’টা দিন হাজিরা খাতায় প্রেমজীকে হাজির দেখিয়ে দেন। কারণ প্রেমজী অত্যন্ত গরীব ও সৎ। নো ওয়ার্ক নো পে-র নিয়ম অনুযায়ী প্রেমজী এই ক’দিনের মাইনে না পেলে, তার পক্ষে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়বে। নতুন রিলিভার ভদ্রলোকটি সম্মতিসুচক মাথা নাড়ায়, অসুবিধার আর কোন কারণ থাকলো ন। নির্দিষ্ট দিনে প্রেমজীকে বগলদাবা করে স্বপনবাবু দেশের বাড়ির পথে পা বাড়ালেন।  
স্বপনবাবুর পৈত্রিক বাড়িটি ন্যাশনাল হাইওয়ের পাশে, প্রায় কুড়ি-বাইশ বিঘা জমির ওপর। রাস্তার ধারে বড়  গেট। গেটের পরে ফুলগাছ ঘেরা একটু মোরাম ঢালা রাস্তা, তারপর পাকা বাড়ি। বাড়ির দুপাশে ও পিছনে, কলম করা নানা ফলের গাছ, সবজী বাগান। তাছাড়া বাড়ির পিছনে তিনটি পুকুর। বিয়ে বাড়ির মাছ এই পুকুর থেকেই তোলা হবে। মনিবের বাড়িতে এসে প্রেমজীর মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম। এত জমি, এত গাছ, এত ফল, এত ফুল একটা বাড়িতে থাকতে পারে, একথা সে ভাবতেই পারছে না। পুকুর জিনিসটা তার আগে দেখার সৌভাগ্য হয় নি। হবার কথাও নয়। ছোটবেলা থেকে সে নেপালে পাহাড়ের কোলে বড় হয়েছে। সেখানে এ জিনিসটা দেখার সুযোগ ছিল না। বড় হয়ে নেফার জঙ্গলে। সেখানেও এ জিনিস চোখে পড়ে নি। অল্প সময়ের মধ্যে সে বাড়ির সবার আপনজন হয়ে গেল। বাড়ির সব কাজ, এমনকী বিয়েবাড়ি সংক্রান্ত কাজও সে একা হাতে করে দিতে চায়। স্বপনবাবু বাড়ির সকলকে বারবার সাবধান করে দেন— প্রেমজী এখানকার কোন জায়গা চেনে না, এত গাড়িঘোড়াও সে কখনও দেখে নি, তাই তাকে যেন বাড়ির বাইরে দোকান বাজার করতে পাঠানো না হয়।
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল। ভোর থেকে প্রেমজীর ব্যস্ততার শেষ নেই। বিয়েটা সুষ্ঠভাবে সুসম্পন্ন করতে কন্যাকর্তার থেকে তার চিন্তা যেন অনেক বেশী বলেই মনে হচ্ছে। পুকুর থেকে মাছ তোলা হ’ল। প্রেমজী নিজ হাতে বড় বড় মাছগুলো একপাশে সাজিয়ে রাখলো। মাছধরা শেষ হলে মাছগুলোর সংখ্যা ও ওজন পরিমাপ করে বাড়ির ভিতর রান্নার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হ’ল। প্রেমজী হাসিমুখে সবাইকে জলখাবার ও চা পরিবেশন করে যাচ্ছে। সকলেই প্রেমজীকে সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য, স্বপনবাবুকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।
হঠাৎ বিয়েবাড়ির রান্নার জায়গা থেকে একটা চিৎকার চেঁচামিচি শোনা গেল। সকলের গলা ছাপিয়ে প্রেমজীর গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কী হয়েছে বুঝতে না পেরে স্বপনবাবু ছুটলেন গোলমালের জায়গায়। পিছন পিছন আরও অনেকেই বিপদের আশঙ্কায় স্বপনবাবুকে অনুসরণ করলেন। অকুস্থলে গিয়ে দেখা গেল গোলমালের কারণ মাছ চুরি। রান্নার কাজে ব্যস্ত ঠাকুর ও তার দলবল, তাকে মাছের লেজার দিকে আঙ্গুল দিয়ে গুণে  দেখালেও সে বিশ্বাস করছে না। তাকে গুণে দেখতে বললে সে বলছে যে সে বার বার গুণে দেখেছে দুটো  মাছ কম। স্বপনবাবু সব শুনে তাকে গুণে দেখতে বললে, সে আবার মাছের মুড়োগুলো গুণে দেখালো যে দুটো মাছ কম। এতক্ষণে আসল রহস্য প্রকাশ পেল। যতগুলো মাছ পুকুর থেকে ধরে আনা হয়েছিল, গুণতিতে সবকটা মাছ থাকলেও দুটো মাছ মুড়োহীন। দেহের প্রায় অর্ধেক অংশ নিয়ে তারা আর সব মাছের সঙ্গে একই জায়গায় শুয়ে আছে। আসলে ঐ দুটো মাছের মুড়ো অন্যান্য মাছের দেহের নীচে ঢুকে থাকায় তার হিসাব মিলছিলো না। একটা একটা করে সব মাছ তার সামনে গুণে দেখানোর পরে, সে তার অডিট পর্ব সম্পন্ন করে শান্ত হয়ে ফিরে এল।
সারাটা দিন হৈচৈ ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল। বিকালের দিকে প্রেমজীর খোঁজ পড়লো। বাড়িতে, বাগানে, পুকুর পাড়ে, রান্নার জায়গায়, বড় রাস্তার কোন দোকানে, কোথাও তার দেখা মিললো না। ক্রমে খোঁজার ধরন বদলে গেল। বাড়ির অতিথিরা, বিশেষ করে মেয়েরা, সে কিছু হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। সকলের মন জয় করে কার বাড়ির কোন চাকর কিভাবে জিনিস হাতড়ে পালিয়েছে, তার বর্ণনায় ছোটখাটো একটা মহাভারতের আকার নিতে, বাড়ির মেয়েরা প্রেমজীকে খোঁজা ছেড়ে, নিজের পরিবারের কিছু খোয়া গেছে কিনা খুঁজতে বসে গেল।  
এইভাবে আরও অনেকটা সময় কেটে গেল। স্বপনবাবু এবার সত্যিই ভয় পেলেন। কোথায় যেতে পারে, ও তো এখানকার কিছুই চেনে না। এমন সময় একজন এসে খবর দিল, পুকুর পাড়ের সিঁড়িতে একটা লাইফবয় সাবান রাখা আছে। স্বপনবাবু ছুটলেন পুকুর পাড়ে। পিছন পিছন অনেকেই ছুটে গেলেন। কোথাও কিছু দেখা গেল না। স্বপনবাবুর নির্দেশে দু’জন মালি পুকুরে নামলো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রায় সিঁড়ির কাছ থেকেই প্রেমজীর দেহটা তুলে আনলো। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকা হ’ল। ডাক্তার জানালেন তার দেহে প্রাণ নেই। পুলিশে খবর দেওয়া হ’ল। পুলিশ না আসলে মৃতদেহ কোথাও নিয়ে যাওয়াও যাবে না। অথচ গোধুলি লগ্নে বিয়ে হওয়ায়, পাত্র আসার সময় হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে পুলিশ এসে প্রাথমিক তদন্ত শেষ করে মৃতদেহ নিয়ে চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই পাত্রপক্ষ এসে হাজির হ’ল।
স্বপনবাবু পাগলের মতো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। প্রেমজী যে তাঁর সাথে এসেছে, এটা তাঁর রিলিভার ছাড়া আর কেউ জানে না। প্রেমজীর স্ত্রীকেও বলতে বারণ করা হয়েছিল, কারণ তাকে হাজিরা খাতায় হাজির দেখানোর ব্যবস্থা করে আসা হয়েছে। প্রেমজী তার স্ত্রীকে বলেছে কী না তাও জানা নেই। যাহোক শ্মশানের নীরবতায় বিবাহ সম্পন্ন হ’ল। রাত কাটলো, ক্রমে পাত্রপক্ষের ফিরে যাবার সময় হয়ে গেল। স্বপন বাবু কাল থেকে জল পর্যন্ত স্পর্শ করেন নি। তাঁর মুখ থেকে একটা কথাই বার বার শোনা যচ্ছে— “কোন মুখ নিয়ে ওখানে ফিরে যাব? ওর স্ত্রীকে কী জবাব দেব? অফিসেই বা কী বলবো”?
তিনদিন এভাবে কেটে গেল। বিবাহপর্ব সম্পন্ন হলে স্বপনবাবু রিলভারকে সমস্ত কথা ফোনে জানালেন। উত্তরে রিলিভার তাঁকে দ্রুত ফিরে আসতে উপদেশ দিলেন। একা ফিরে যাওয়ায় তাঁর ঝুঁকি কতটা, তাই নিয়ে বাড়িতে বিস্তর আলোচনা হলেও, এই অবস্থায় ঠিক কী করণীয়, কেউই ঠিক করে উঠতে পারলেন না। হুট করে ওখানে অন্য কারো যাওয়াও সহজসাধ্য নয়। শেষে ঠিক হ’ল প্রথমে স্বপনবাবুর দাদা ওখানে যাবেন। পরিস্থিতি বুঝে তারপর স্বপনবাবু নিজে যাবেন।
স্বপনবাবুর এক ভগ্নীপতি বনবিভাগের কর্মসুত্রে বনগাইগাঁও থাকেন। তিনি চোরা পথে সরকারী অনুমতি ছাড়াই স্বপনবাবুর দাদাকে নিয়ে একজন পরিচিত স্বানীয় লোকের সাথে ওখানে যাবার ব্যবস্থা পাকা করে ফেললেন। স্বপনবাবু তাঁর দাদার হাতে রিলিভারের উদ্দেশ্যে একটি চিঠিও লিখে দিলেন।
বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ওরা দু’জন এক বিকালে স্বপনবাবুর অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলেন। রিলিভার ভদ্রলোক  তখন কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত। এদের দু’জনকে দেখে তিনি বাইরে একটু অপেক্ষা করতে বললেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে আলোচনা শেষে সবাই চলে গেলে, রিলিভার ভদ্রলোক এদের দু’জনকে ডেকে বসতে বললেন। স্বপনবাবুর দাদা ও ভগ্নীপতি স্বপনবাবুর চিঠিটা তাঁর হাতে দিয়ে নিজেদের পরিচয় দিলেন। ভদ্রলোক চিঠিটা পড়ে বললেন, “আমি অবশ্য প্রেমজীকে হাজিরা খাতায় একদিনও হাজির দেখাই নি। অবশ্য অনুপস্থিত হিসাবে অ্যাবসেন্ট্ মার্কিংও করি নি। আমি ভেবেছিলাম ফিরে এসে কাজে যোগ দিলে, স্বপনবাবু যা ভাল বোঝেন করবেন। এখনতো মনে হচ্ছে হাজির না দেখিয়ে ভালই হয়েছে, তা নাহলে বিপদে পড়তে হ’ত”।
জানা গেল প্রেমজীর মৃত্যু সংবাদ তার স্ত্রীকে জানানো হয়েছে। তার স্ত্রী একদিন এসে খুব কান্নাকাটি করে গেছে। যাহোক্, তার স্ত্রীকে খবর পাঠানো হ’ল। অনেক্ষণ পরে তার স্ত্রী আরও দু’চারজনকে সঙ্গে করে অফিসে এসে হাজির হলে স্বপনবাবুর দাদা তাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। প্রেমজীর স্ত্রী বললো, যে তার স্বামী স্বপনবাবুকে ভীষণ ভালবাসতো বলে সে তাঁর সাথে কলকাতা যাওয়ায় কোন আপত্তি করে নি। তার কপাল মন্দ, তাই সেটাই তার শেষ যাওয়া হ’ল। তার হাতে বেশ কিছু টাকা সাহায্য হিসাবে দিয়ে স্বপনবাবুর দাদা বললেন যে তিনি তাঁর ভাইকে বলবেন, যাতে তার কোন একটা কাজের ব্যবস্থা করা যায়।
কোনরকম ঝামেলা না হওয়ায় পরদিন তাঁরা আবার আগের মতো চোরাপথেই বনগাইগাঁও যাত্রা করলেন। যথাসময়ে স্বপনবাবু কাজে যোগ দিলেন।  
                          


সীমা ব্যানার্জী রায়

লাপ্পু


ক্যারাটে শেখে একটা ৬ বছরের ছেলে লাপ্পু, এই নামেই সে বেশি পরিচিত সবার কাছে। লাপ্পু থাকে নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে। ১১ বছরের টুকিদিদি আর ছোট্ট ভাই যায় ক্যারাটে শিখতে...দিদি হলুদ বেল্ট পেয়েছে । তাই দিদির ক্লাশ ১ ঘন্টা বেশী। প্রথম প্রথম খুব কেঁদেছে লাপ্পু, কারণ দিদি কেন বেশি করবে আর দিদির বেল্ট এর রং কেন হলুদ। সে তো কালো বেল্ট পরে। দিদি আবার ছোড়া নিয়েও কি সুন্দর খেলা শেখে। মাথায় হেলমেট পরে। একটা বডি গার্ডদের মতন আবার ব্লেজার গায়ে দেয়, হাতে থাকে কি সুন্দর গ্লাভস। কিন্তু ও তো সবার ছোট তাই লাপ্পুর ড্যাডির ইচ্ছে নয় ওর চেয়ে বড়দের সাথে ও শিখুক। পরীক্ষাও দিতে হবে। তাই লাপ্পুর মাম্মি-ড্যাডি আর গা করেন নি। লাপ্পুর আধ ঘন্টার ক্লাশ হয়। আর দিদি করে এক ঘন্টা। ওই সময় দিদির শেখার ঘরেই এক কোণে লাপ্পু বসে থাকে মাম্মির সাথে একটা লম্বা স্টুলে। আরো অনেকজন থাকে সেখানে। একদিন ক্যারাটে স্কুলর ইনচার্জ মিঃ রবার্ট পাওনে এসে লাপ্পুর পাশে বসলেন। নাদুস-নুদুস ছেলেটাকে যেই দেখে সেই ভালবেসে ফেলে। কাজেই উনি এসেই লাপ্পুর পাশটিতে বসলেন। এইবার লাপ্পুর সাথে গল্প জুড়ে দিলেন। তোমার স্কুলের নাম কি? তুমি কোন ক্লাশে পড়ো? পড়তে ভালো লাগে তোমার? কোথায় থাকো? বাড়িতে কে কে আছে? তোমার জন্মদিন কবে?” লাপ্পু তো কুটুস কুটুস করে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। জন্মদিন তার ১৪ই এপ্রিল তাও বলেছে। তখন মিঃ পাওনে ওকে জিগেস করেছে্ন তাহলে জন্মদিন তো চলে গেছে। তুমি কি করেছ তোমার জন্মদিনে। লাপ্পু আবার টুক টুক করে বলেছে, সে ড্যাডির সাথে সকালে বলিং করতে গেছিল বাড়ির সামনের পার্কে। তারপর সেখান থেকে সুইমিং করে, আর সব ওর বন্ধুদের সাথে 'চাকি চীজ' এ খেয়েছে পিসজা আর চকলেট আইস্ক্রিম। সে চকলেট আইস্ক্রিম খেতে খুব ভালবাসে তাও বলে নিয়েছে। তখন মিঃ পাওনে আবার জিগেস করেছেন, “তুমি গিফট ভালবাসো?” -হ্যাঁ, আমি অনেক গিফট পেয়েছি। -তোমার কোন গিফট টা সবচেয়ে ভালো লেগেছে? বলবে? একটু চুপ থেকে লাপ্পুর তুড়ুক জবাবঃ -আমার কাকু এসেছিল, ওটাই আমার বেস্ট গিফট।
মিঃ পাওনে 'কাকু' মানে বুঝতে পারেন নি। লাপ্পুর মাম্মিকে জিগেস করেছেন, “ কাকু কথাটার মানে কি?” মাম্মি বলেছেন ওর আঙ্কল হয়। তখন মিঃ পাওনের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। অবাক হয়ে জিগেস করেছেন? “কেন ওর কাকু কি আসেন না?” মাম্মির উত্তর,- “আসলে কাকু ত ডাক্তার । তাই আসতে পারেন না ৮ ঘন্টা ড্রাইভ করে সব সময়।অবাক হয়ে মিঃ পাওনের আবার প্রশ্ন লাপ্পুকেঃ কেন তুমি অন্য গিফট এর চেয়ে তোমার কাকুর আসার গিফট টা বেস্ট? বলবে্” -ছোট্ট লাপ্পু আর দেরী করল না। ভাবার সময়ও দিল না নিজেকে, বললঃআমি ভালবাসি কাকুকে। তাই কাকু আমার বেস্ট গিফট।সত্যি এর ওপর আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না। রবিঠাকুর থাকলে বলতাম তোমার প্রশ্ন ছিল, “ভালবাসা কারে কয়?” ভালবাসার কোন সঠিক ভোকাবোলারি নেই, রবিঠাকুর। এর কোন ব্যাখ্যা নেই। কে বলল ছোটদের মানবিকতা প্রকাশ পায় না। তাহলে না শেখালেও কিভাবে বলল ৬ বছরের লাপ্পু। দুনিয়াটা কি আবার আগের যায়গায় ফিরে যাচ্ছে? রবীন্দ্রনাথ এক যায়গায় বলেছিলেনঃ শিশুদের বুদ্ধির কাছে আমাদের ও হার মানতে হয় মাঝে মাঝে

গুড্ডু

গুড্ডু থাকে টেক্সাস এর ফ্রিস্কোতে। সেদিন ওর বাড়ির সামনের বাড়িতে ছিল একটা জন্মদিনের পার্টি। গুড্ডুর বন্ধু হল আয়ন। আয়নের দিদি মিস্টির ১৩ বছরের জন্মদিন। মিস্টির এক মাসী থাকে ফ্রিস্কো থেকে বেশ একটু দূরে । মাসী আর মেসো ড্রাইভ করে আসবেন মিস্টির জন্মদিন উপলক্ষ্যে। মিস্টির ড্যাডি গিয়ে ওনাদের নিয়ে আসবেন। কথা সেই রকম কথা হয়ে আছে। নির্দ্দিষ্ট দিনে ওনারা মিস্টির ড্যাডির সাথে গিয়ে পৌঁছলেন বাড়িতে। মাসী যেই গাড়ি থেকে নেমেছেন হঠাৎ ধুপ করে একটা প্রণাম এসে পরল পায়ে। সব কিছুই কিন্তু চোখের নিমেষে ঘটে গেল। মাসী ভাবলেন, আয়ন বোধহয়। তাই এদিক ওদিক তাকিয়ে কোথাও আয়নকে আর দেখতে পেলেন না। একটা ছিপছিপে গড়নের ছেলে ওনারা কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। মাসী মেসো ত অবাক। মাসীর ছোট বোন তখন দিদি জামাইবাবুকে আপ্যায়ন করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু মাসীর চোখ সেই খুদেটার দিকে।। -হ্যাঁরে বনু! এই ছেলেটা কে তো চিনতে পারলাম না রে। কে রে, এই সোনা ছেলেটা? -ওহ! গুড্ডু? ও আমাদের বাড়ির সামনে থাকে। ওরা পাজ্ঞাবী। আয়নেরই বয়সি। -তাই নাকি? হঠাত আমাকে প্রণাম করল কেন রে? -জানি না অতসব! তোমার হয়েছে সবটাতেই খুঁটিনাটি জানতে হবে। চলো তো ভেতরে। মাসী গুড্ডুকে বুকে চেপে ধরলেন চোখভরা জলে। মনে মনে ভাবলেন, আজকাল তো প্রণাম এর চল উঠে গেছে। এমন কি ফোনেও একটু প্রণাম, তাও বলতে পেছপা হয় আজকালকার জেনারাশন। সেখানে এমন সুন্দর ভাবে প্রণাম, একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। চলে গেলেন সেই আগেকার দিনে। বাড়িতে বড় কেউ এলেই বাড়ির সবাই আগে প্রণাম দিয়ে আপ্যায়ন করত। আর এখন তো দেখাই যায় না বাড়ির ছোটদের। জন্মদিনেও দেখা যায় বাচ্ছারা এসে চুপচাপ চলে যায় বন্ধুদের ঘরে। যেন একটা সোজা ইকোয়েশন। এইবার এল গুড্ডুর মা। গুড্ডূর মার নাম সুপ্রিয়া। ওর সাথে আলাপ করিয়ে দিল। মিস্টি্র মাসী বরাবরই কলকাতার বাইরের প্রবাসি বাঙালি। হিন্দিটা মোটামুটি ভালই পারেন বলতে। আলাপ জমে উঠল।মাসী এবা রজিগেস করলেন সুপ্রিয়া কে, “ আমি অবাক হয়ে গেছি তোমার ওইটুকু ছেলের কান্ড দেখে। সে তো ঘাবড়ে গিয়ে বলে ওঠে, “কোই খাস বাত হ্যায় , দিদি?” -না না...উস্কো প্রণাম কিসনে শিখায়া সুপ্রিয়া? -ম্যানে দিদি। বলিঃ কোই শাড়ি পহেনকে আয়ে গি তো প্রণাম করনা বেটা। -আমি ওকেও জড়িয়ে দরলাম। বল্লাম, আমি তো স্ট্রেঞ্জার, কিন্তু ও তোমার কথা রেখেছে। খুব খুশি হয়েছি সুপ্রিয়া। দুজনের চোখেই তখন জল।


সপ্তর্ষি মাজি

বৃশ্চিককাহিনী (কমলাকান্ত অনুসরণে)


বাহিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়িতেছেএমনদিনে মৌতাত বেশ জমেকমলাকান্তের ন্যায় আফিঙ্গ না থাক, গঞ্জিকা আছেকল্যাণী ঘোষপাড়া হইতে আনা গঞ্জিকার প্রথম কুণ্ডলী শেষ করিয়া দ্বিতীয়টার দিকে হাত বাড়াইব এমন সময় মনে হইল আমার ঘরে যেন একটি রেলগাড়ি চলিতেছেপ্রথমেই মনে হইল গঞ্জিকার প্রভাবমস্তিষ্কে ধুঁয়া আজ বড্ড বেশি চলিয়া গিয়াছেআর সেই গঞ্জিকাপ্রসূত ধুঁয়া রেলগাড়ির আকার ধারণ করিয়া ঘরময় বিচরণ করিতেছেতাহা না হইলে রেলগাড়ি কল্যাণী ষ্টেশন ছাড়িয়া আমার ঘরে স্থান লইবে কেনকিন্তু উহা যে প্রকৃতই কি তাহা জানিবার বড়ই ইচ্ছা হইলতাই নিকটে গিয়া নিরীক্ষণ করিতে লাগিলামকিয়তক্ষন নিরীক্ষণ করিবার পর যাহা দেখিলাম তাহাতে মস্তিস্ক রক্তশূন্য হইয়া উঠিলআমি কোনক্রমে বিছানায় গিয়া আশ্রয় লইলামইতিমধ্যে আমার হৃৎপিণ্ড বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছেউহাকে বলিলাম, দেখ ভাই, আমি কোনক্রমে এই ধরণীর শস্যক্ষেত্র হইতে পটল তুলিলে তোমারও পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হইবেসুতরাং কার্য বন্ধ করিয়ো নাতাহারপর বিছানা হইতেই ভালো করিয়া পর্যবেক্ষণ করিয়া দেখিলাম উহা কোন রেলগাড়ি নহে, উহা একটি ভয়ানক বৃশ্চিকপ্রচলিত বাংলায় যাহাকে বলে তেঁতুলবিছা, উহা তাইই
আমার গৃহসঙ্গীকে বৃশ্চিকটির ব্যাপারে অবগত করিলামউহার বিকট আকৃতি দেখিয়া তাহার দেহকম্প শুরু হইয়া গিয়াছেতাহাকে জানাইলাম আমি ইহার উপর নজর রাখিতেছিতুমি বাহিরে গিয়া আরক্ষাবাহিনীকে এই সংবাদ প্রদান করসে দ্রুতবেগে চলিয়া যাইলকী করিব ভাবিতেছি এমন সময় দেখি সেটি আলমারির নীচে আশ্রয় গ্রহণ করিবার জন্য অগ্রসর হইতেছেউহা একবার কোনক্রমে আলমারির নীচে আশ্রয় গ্রহণ করিলে উহাকে দ্বিতীয়বার বাহির করা অসম্ভব কার্য বলিয়া বিবেচিত হইবেসুতরাং আমি তৎপর হইয়া একটি দণ্ড লইয়া ধাবমান হইলামকিয়ৎক্ষন ছুটাছুটির পর উহা ক্লান্ত হইয়া গৃহের একটি কোনে আশ্রয় লইলইতিমধ্যে আরক্ষাবাহিনীর প্রধান আমার গৃহে উপস্থিততাহাকে দেখাইতেই তিনি তাঁহার দণ্ড দিয়ে উহাকে তীব্র বেগে ঠাসিয়া ধরিলেনইহার কারনে আমার সাধের মৌতাত ভঙ্গ হইয়াছেশুধু তাহাই নহে, আমার হৃৎপিণ্ড বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছেসুতরাং ইহার মৃত্যুদণ্ড আবশ্যক স্থির করিয়া উহার ভবলীলা সাঙ্গ করিতে আদেশ করিলামতিনি তাঁহার দণ্ড দিয়া উহাকে বারংবার আঘাত করিতে উহা মৃত্যুমুখে পতিত হইলতাহার পর উনি আমাদিগকে আশ্বস্ত করিয়া চলিয়া গেলেন
ইহাকে তো আর গৃহে স্থান দেওয়া যায় নাঠিক করিলাম বাহিরে ফেলিবার পূর্বে একটি ফটো লইয়া রাখিআমার ফেসবুকীয় বন্ধুদের জানাইতে পারিব কত বড় বিপদ ঘটিতে যাইতেছিল আমার! সদ্য ক্রীত ডিএসএলআর যন্ত্রটি বাহির করিয়া সেই মহামূল্যবান কার্যটি সমাধা করিতে যাইব এমন সময় মনে হইল মৃত বৃশ্চিকটি যেন একটু নড়িয়া উঠলআমি ভীত হইয়া তিন পা পিছাইয়া আসিলামহঠাৎ মনে হইল বৃশ্চিকটি বলিয়া উঠিল, 'তোমার বীরত্ব জ্ঞাত হইল' আমি বিস্ময়ে অভিভূত হইলামএতক্ষন তো গঞ্জিকার আবেশ থাকিবার কথা নহেতাহা হইলে কি...
ঈষৎ সাহস সংগ্রহ করিয়া আমি উহার নিকটে উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, 'তুমি কথা বলিতে পারো?'
পুনরায় শুনিতে পারিলাম সে বলিয়া উঠিল, 'শুধু কথা বলিতে পারি  তাহা নহে, আমার মধ্যে এখনো যে পরিমান বিষ আছে তাহাতে  তোমার বাক্যফুর্তি সারাজীবনের মত বন্ধ করিয়াও দিতে পারি'
বলে কী? আমি দণ্ড লইয়া তাহাকে আঘাত করিতে উদ্যত হইলামসে বলিয়া উঠিল, 'থাক, আর অর্ধমৃত প্রানীর উপর বীরত্ব দেখাইতে হইবে নাখুব শীঘ্রই আমার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটিবেতাহা ছাড়া আমরা তোমাদের মনুষ্যের ন্যায় হিংস্র প্রানী নহে যে যখনই সুযোগ পাইব বিষ ঢালিয়া দিববঙ্কিমচন্দ্রই তো বলিয়াছেন, তুমি অধম তাহা হইলে আমি উত্তম না হইব কেন? সুতরাং আমা হইতে তোমার আশঙ্কার কোন কারন নাই'
আমি পুনর্বার জিজ্ঞাসা করিলাম, 'নিশ্চিত করিয়া বলিতেছ তো?'
--তোমরা মনুষ্য প্রজাতি অত্যন্ত সংশয় প্রবনএই কারনেই তোমাদের মধ্যে হানাহানি এত বৃদ্ধি পাইয়াছেএকটা মুমূর্ষু প্রানী কী কারনে মিথ্যাভাষ করিবে?
--প্রতিশোধস্পৃহা
--আমরা বৃশ্চিকগণ কোন প্রকারেই প্রতিশোধস্পৃহ নইপ্রতিশোধ জিনিসটি তোমাদের মনুষ্যজাতির মজ্জাগত এবং জন্মগত হইয়া গিয়াছেযে কারনে তোমরা আজ এত নীচে নামিয়া গিয়াছতাহা না হইলে তো আমি ভান করিয়া পড়িয়া থাকিয়া আমার মৃত্যুর প্রতিশোধ লইতে পারিতাম'
আমি প্রতিবাদ করিয়া উঠিলাম, 'আমি তোমার মৃত্যু ঘটাই নাইতাহা হইলে আমার উপর প্রতিশোধের কারন কী?'
--কিন্তু তুমি ভীত না হইয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকিলে ইহা হইত নাতুমি তাহা না করিয়া আরক্ষাবাহিনীর সাহায্য লইয়া আমাকে হত্যা করিলেবল এইবার, তুমি আমার মৃত্যু ঘটাও নাই?
--সে ত্রুটি তোমার চরিত্রেরতুমি যাহাকে তাহাকে যখন তখন দংশন করিয়া বেড়াও
--দেখ, চরিত্র তুলিয়া গালি দিও নাতোমাদিগের চরিত্র লইয়া আমি শুরু করিলে রামায়ণ-মহাভারত-ইলিয়াড-ওডিসি লিখিয়াও শেষ হইবে নাযাহা হউক, আমরা বিনা কারনে কাহাকেও দংশন করি নাতুমি তোমার প্রতিবেশীদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিও, কয়জনকে আমরা দংশন করিয়াছি আর কয়জন আমাদের হত্যা করিয়াছে
--তাহা হইলে গত মাসে ঘোষবাবুর অমন সুন্দর সন্তানটিকে দংশন করিয়াছিলে কেন? বেচারাকে এক পক্ষকাল শুশ্রূষালয়ে কাটাইতে হইয়াছিল!
--তোমরা যদি জানিতে সেই গুণধর বালক কী করিয়াছিলআমার সেই বৃশ্চিক বন্ধুটিকে দংশনের পূর্বে তিনবার বিনা কারনে জলপাত্র দিয়া আঘাত করিয়াছিলতাহার বিনিময়ে তোমরা কী করিলে? তাহাকে হত্যা তো করিলেইআমাদের গর্তে অ্যাসিড ঢালিয়া আমাদের পুরো বংশকে হত্যা করিলেতোমরা এতটাই হিংস্র
শেষে আর থাকিতে না পাড়িয়া বলিয়া উঠিলাম, 'দেখ বৃশ্চিকবর, তোমরা অত্যন্ত নিম্নজাতীয় প্রাণীআমরা বিদ্যা-বুদ্ধিতে তোমাদিগ হইতে অনেক আগাইয়া আছিসুতরাং, আমাদের বিচারই সর্বোত্তম বলিয়া গন্য হইবে
--সে তোমাদিগের বিদ্যার বহর মুমূর্ষু প্রানীকে হত্যার প্রচেষ্টার মধ্যেই বোঝা গিয়াছেএক্ষণে আর তর্ক করিয়ো নাবুদ্ধি যদি বল, বা কূটবুদ্ধি, তাহাতে তোমরা আমাদিগ হইতে অনেক আগাইয়া আছসে প্রভাবেই তোমরা আজ সর্বেসর্বা হইয়াছকিন্তু ভাবিয়া দেখিয়াছ কি, আমরাও ভীত হইলে যাহার ভয়ে ভীত তাহাকে হত্যা করিবার নীতি গ্রহণ করিলে কী হইত! গান্ধীজী বলিয়াছিলেন, 'চোখের বদলে চোখ এই যদি নীতি হয় তাহলে সমগ্র বিশ্বটাই অন্ধ হইয়া যাইবে
বুঝিলাম আমি যদি বুনো ওল ভক্ষক হই তবে এও বাঘা তেতুল বিছাবঙ্কিম থেকে গান্ধী, রামায়ণ থেকে ইলিয়াড, সর্বত্র ইহার যাতায়াতআমার কোন যুক্তিই ইহার কাছে টিকিবে নাতাই কোন যোগ্য উত্তর না পাইয়া শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করিলাম , 'কী কারনে তুমি ভান করিয়া পড়িয়াছিলে তখন?'
--তুমি গঞ্জিকা ভক্ষকতাহা ছাড়া তোমাকে অন্য কোন নেশা করিতে দেখিনাইসুতরাং তুমি উত্তম মনুষ্য উত্তম বিচারকতাই ইচ্ছা হইয়াছিল তোমাকে মৃত্যুর পূর্বে কিছু বলিয়া যাই
--বলিয়া ফেলআমি আদেশ করিলাম
--দেখ, তোমরা শক্তিমান ঠিকই কিন্তু সর্বশক্তিমান নওসর্বশক্তিমান একজনই, তিনি পরমেশ্বরতাহা ছাড়া শক্তিমান মাত্রেই স্বৈরতন্ত্রী নহেএক্ষণে আমরা যদি তোমাদের শয়নকালে দংশন করিয়া যাই তাহা হইলে তোমার নিদ্রা আর ভাঙ্গিবে নাকিন্তু আমরা অত্যন্ত সহনশীল সৎ বলিয়াই বিশ্ব এখনো টিকিয়া আছেতাই আমার বিনীত অনুরোধ, সর্বক্ষেত্রে বিচক্ষনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়োআমাদের হিংস্র হইতে বাধ্য করিয়ো নাতোমরা আমাদিগ হইতে যে পরিমান উৎকৃষ্ট তাহা বজায় রাখিওএই বলিয়া বৃশ্চিক ক্ষান্ত হইল
আমি ভাবিলাম মরিয়া গিয়াছে হয়তপুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, 'বাঁচিয়া আছ?' সে উত্তর করিল, 'বাঁচিয়া আছি তবে আর কতক্ষন থাকিব নিশ্চিতভাবে বলিতে পারিতেছি নাআমার প্রাণবায়ু নির্গত হইলে আমাকে মৃত্তিকাতে রাখিয়া আসিওপিপীলিকা আসিয়া আমার শেষকৃত্য সম্পন্ন করিবেআমাদিগকে দেখিয়া শিখিয়া লইয়আমরা মৃত্যুর পরও নিজেদের উৎসর্গ করিয়া পুন্যার্জন করিতেছিএই বলিয়া বৃশ্চিক চিরতরে চুপ হইল
বৃশ্চিকের চক্ষু মুদিত হইল বটে কিন্তু আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হইলআমি পরেরদিন দোকান হইতে একটি কার্বলিক অ্যাসিডের শিশি কিনিয়া ঘরে ফিরিলাম।।