গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

বুধবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৮

তাপসকিরণ রায়

ধারাবাহিক হ্যান্টেড কাহিনী--১৭

ইন্দোরের স্বস্তিক ইমারত

ইন্দোরের স্বস্তিক ইমারত তখন তৈরি হচ্ছিলো। সেখানে অনেক লেবার, রাজমিস্ত্রি, ঠিকাদার মিলে ইমারত তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। দিন সারা চলতে থাকতো কাজকর্ম সেই সঙ্গে লোকজনের শোরগোলও। পাহারার কাজেও ছিল বেশ কিছু গার্ড। গার্ডের মধ্যে একজনের নাম ছিল ইকবাল। ইকবালের আর্থিক অবস্থা একেবারে খারাপ  ছিল না কিন্তু তার ছিল পানের দোষ। আর হাতে দু চারটে উপরি টাকা এলো তো ব্যাস, সে  বসে যেত জুয়ার আড্ডায়। এ সব কারণে এমন একটা দিন এলো যখন তার সংসার আর চলতে চাইলো না, ধার দেনায় সে ডুবে গেলো। ফলত মনের দিক থেকে সব সময় সে অস্থির থাকত।
এমনি একদিনের কথা। সে দিন সে বোধহয় স্বাভাবিক থেকে একটু বেশীই পান করে নিয়েছিল। ডিউটিতে এসেই চৌকিদারকে চারদিক একবার ঘুরে দেখে নিতে হয় তখনকার জিনিসপত্র কোনটা কোথায় আছে বলে। ইকবাল সেদিন গ্রাউন্ডের সব কিছুই দেখে নিয়ে তারপর ছাদে গেলো। সেখানে কি কি আছে না আছে তাই হবে সে দেখতে গিয়েছিল। টলতে টলতে সিঁড়ি বেয়ে তো সে ছাদে গিয়ে হাজির হল। ইকবাল আর একজন চৌকিদার তখন ছাদে ছিল। এর মধ্যে ইকবাল নাকি ছাদ থেকে উঁকি মেরে  কিছু দেখার চেষ্টা করছিল আর ঠিক এমনি সময় পা তার হড়কে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে আঃ  আঃ  আঃ  শব্দের পরেই ভয়ানক একটা মৃত্যু চীৎকার শোনা গেলো। ইকবালের শরীরটা ছাদ থেকে একেবারে নিচে গিয়ে পড়ল। বেশ কিছু স্থানীয় লেবার ও লোকজন এসে দেখল, ইকবালের মৃত দেহ রক্তাক্ত হয়ে থেঁতলে পড়ে আছে। দেহটা তার চারদিক থেকে ফেটে গেছে, মাথায় চির খেয়েছে। একটা হাত, শরীরের কিছু মাংসের টুকরো এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য। এতটা হবার কারণ ছিল।  তার দেহটা প্রথমে এসে পড়েছিল ভূতলে রাখা এক কঠিন পাথরের ওপর, সেই পাথরের আঘাতে ইকবালের দেহটা এমনি বিকৃত আকার ধারণ করেছিল।
এ মৃত্যু নিয়ে নানা লোকে নানা কথা বলে, কেউ বলে ইকবাল আত্মহত্যা করেছে। ও নাকি চরম অশান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। আবার কেউ বলে, সেদিন ছাদে তার সঙ্গে যে চৌকিদার ছিল সেই নাকি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। আবার কেউ এও বলে যে ওসব কিছু না--অতিরিক্ত নেশা করার ফলে শরীরের তাল রাখতে না পেরে এমনি ঘটনা ঘটে গেছে।
সে যাই হোক, ইকবাল অকালে, অস্বাভাবিক ভাবে মারা গেছে এটাই সত্যি ছিল। তারপর বেশ কটা বছর কেটে গেছে। স্বস্তিক বিল্ডিং এখন মার্কেট কমপ্লেক্স। অনেক দোকানপাট রয়েছে এতে সে সঙ্গে আছে একাধিক এ.টি.এম. চেম্বারও। এ জাগায় দিনভর লোকজনের আনাগোনা, চহল-পহল চলতে থাকে। রাত নটার পর থেকে চুপচাপ হতে শুরু করে। দিনের পাহারার জন্যে কিছু গার্ড নিযুক্ত আছে। আর রাতের পাহারায় থাকে কিছু নাইট গার্ড । এখানে প্রায় সবাই জানে যে ইকবাল মারা যাবার পর থেকে বিল্ডিঙে কিছু কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে চলছিল। কিন্তু সে সব ছিল ছুট-ছাট ঘটনা। যার জন্যে বাইরে তার প্রচার-প্রসার বিশেষ একটা ছিল না।
মার্কেট শুরু হবার বছর খানেক পরে ঘটলো একটা ঘটনা। রাজভান দিনের বেলায় শুয়ে ছিল, মানে দুপুরে খেয়ে একটু দেওয়াল ঘেঁষা নিদ্রা নিচ্ছিল, ঠিক এমনি সময় একটা লোক এলো, বলল এই ডিউটিতে ঘুমাবি না। রাজভান ঘুমের মধ্যেই তাকে গালি দিয়ে উঠলো। তারপর ঝিম ঘুমের মধ্যে ওর মনে হল লোকটা ওর পা ধরে টানছে। ওকে টেনে প্রায় এক হাত দূরে নিয়ে গেল।  রাজভান, এই, এই, ছাড়, ছাড়, বলে উঠে বসল। সে তার সামনে একটা ছায়া আকৃতির  লোককে দেখল। ওকে কিছু বলতে যেতেই লোকটা ভেনিস হয়ে গেলো !
অন্য এক গার্ড মনোজ একদিন রাজভানকে বলল, একটা লোককে দেখলি, তাকে দেখে কেমন যেন মনে হল, লোকটার শরীরের রং কেমন যেন বদলে যাচ্ছিলো। লাইটের নিচে তাকে কেমন ফেকাসে লাগছিল। আবার অন্ধকারে দাঁড়ালে তাকে ভীষণ কালো লাগছিলো, যেন শুধু একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছিল !
রাজভান বলেছিল--আমি জানি এ ইমারতে ভূত আছে। কেউ রাতে হঠাৎ হঠাৎ আলো জ্বালায়-নিভায়। জানিস তো এখানকার লিফ্ট বেশী রাতে হলে আপনি আপনি চলে, আপনি আপনি থেমে যায়।  
মনোজ বলে--আমি তো তা জানি না, আমি তো ভাই দু দিন আগেই এখানে জয়েন করেছি। তবে একটা গল্প এক জনের কাছে শুনলাম, এই বিল্ডিঙে নাকি ইকবালের ভূত থাকে। ও বিল্ডিং তৈরির সময়ে ছাদ থেকে পড়ে মরে ছিল। ও এখানকার চৌকিদার, গার্ডকে নাকি দিনের বেলাতেও ভয় দেখায় !
তার এক দিন পরের কথা। মনোজ দুপুরে ঘর থেকে আনা খাবার খেয়ে  একটা চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছিল। ঝিমানোর মাঝেই সেই কালকের লোকটা এসে তাঁর সামনে দাঁড়ালো। সে চীৎকার করে বলে উঠলো, এই ঘুমাচ্ছিস কেন রে ! বলার সাথে সাথে লোকটা থাপ্পড় দেবার জন্যে তার একটা হাত মনোজের গালের কাছে নিয়ে এলো। কিন্তু সে চেষ্টা করেও মনোজের গাল ছুঁতে পারছিল না। মনোজের ঝিমঘুমে দেখতে পারছিল সব কিছু। তার সম্পূর্ণ ঘুম ভাঙতেই লোকটা দ্রুত পায়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো ! পরে মনোজের মনে হয়েছিল লোকটা ইকবালের ভূত হবে। তার হাতে মন্ত্রপূত তাবিজ ছিল বলে তাকে আর থাপ্পড় মারতে পারে নি।
এরপর আরও এক দিনের কথা। এটাই এখানকার সবচে বড় ঘটনা। সে দিন চৌহান নামের একজন গার্ড  রাতের ডিউটিতে ছিল। রাত তখন এগারটা বেজেছে। একটা কালো মত লোক তার সামনে এসে বলল, আমায় টপ ফ্লোরে যেতে হবে। লিফটটা চালু করে দেবে ?
চৌহান তার সঙ্গে গেলো। লিফটের পাশের দেওয়াল থেকে কানেকশনের সুইচ ও অন করে দিয়ে বলল, এবার যান !
--তুমি আমার সঙ্গে একটু চলো, আগন্তুক লোকটা বলল।
চৌহান তাকে সাহায্য করতে লিফটে ওর সঙ্গে চড়ে বসলো।  ও বলল, ক’তলায় যাবেন ?
লোকটা এবার বলল, ছ’তলায়--
চৌহান বলে উঠলো, না লিফ্ট তো পাঁচ তালা অবধি আছে, ছয় তালা তো ছাদ ?
আগন্তুক লোকটা বলে উঠলো, তবে ছয় তালার সুইচ লাগা কেন ?
ছয় তালার সুইচ ? আশ্চর্য হল চৌহান, এই পাঁচ  তালা বিল্ডিঙে ছ’তলার সুইচ এলো কি করে ! ওর চোখের সামনে ছয় নম্বরের সুইচটা অন্য নম্বরের সাথে জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল। ততক্ষণে চৌহানের সামনে লোকটা ছ’তালার সুইচ চেপে দিয়েছে। সাঁই সাঁই করে লিফ্ট ওপরে উঠে চলেছে। চৌহানের চোখ এবার ভাল ভাবে লোকটার দিকে পড়লো। ও তৎক্ষণাৎ ভয়ে কেঁপে উঠলো, লোকটার শরীর নেই, শুধু একটা ছায়া ধারণ করে আছে। ভয়ে চীৎকার দিয়ে উঠলো চৌহান, কে তুমি ?
লোকটাকে তখন মাতাল বলে মনে হল, ও বলল, এসো, আমি কে আমি দেখাচ্ছি তোমায়।
চৌহান যেন স্বপ্ন দেখছে, লিফ্ট একেবারে খোলা ছাদে উঠে এসেছে। ছায়াধারী আগন্তুক তখন চৌহানকে ধমকে উঠল, এই আয় এখানে। আমার নাম তুই শুনেছিস ? আমি আজ সাত বছর ধরে এখানে আছি। আয় দেখবি, তুমি, থেকে একেবারে তুই’তে ছলে গেছে লোকটা !  
চৌহানের মনে হল, সে যেন আর নিজের সত্ত্বায় নেই, সে লোকটার পেছনে পেছনে এগিয়ে গেলো। লোকটা ছাদের এক কিনারায় এসে বলল, আমি ইকবাল, ছাদের এই কিনারায় আমায় রোজ আসতে হয়।
স্তব্ধ হয়ে চৌহান দাঁড়িয়ে আছে। তাকে কেউ যেন চারদিক থেকে বেঁধে দিয়েছে। ও নড়াচড়া করতে পারছিল না। ও যেন শুধু মাত্র দর্শকের ভূমিকা পালন করতে এখানে এসেছে।   
ইকবালের প্রেতাত্মা আরও এগিয়ে গেল, ছাদের রেলিং ধরে বারবার উঁকি মারতে লাগলো।  
চৌহান কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। ও দেখতে পেলো, লোকটা, লোকটা হাওয়ার মত তার দু’পা রেলিঙের ওপর তুলে দিয়েছে !
অনেক কষ্টে চৌহানের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, এই, এই, আরে...
দেখতে দেখতে চৌহানের সামনে লোকটা ঝাঁপ দিলো, আঃ আঃ আঃ শব্দ হল, লোকটা ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে, মুহূর্ত পরে  ভীষণ জোরে একটা আর্তনাদ চৌহানের কান যেন বিদীর্ণ করে গেলো। তারপর আর কিছু তার মনে নেই।
পরদিন সকালে চৌহানের যখন জ্ঞান ফিরল ও নিজেকে একটা হাসপাতালে পেলো। সহকর্মী কয়েকজন গার্ড তাকে ঘিরে আছে।
রাজভান প্রশ্ন করল, কি হয়েছিল তোমার ?
চৌহান চিন্তা করতে থাকলো।  
--কি হয়েছিল তোমার ? মনোজ চৌহানের একটা হাতে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠলো।
--হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ছে তার নাম--ইক-বাল, লোকটা মরে গেছে ? চৌহান উল্টো প্রশ্ন করলো।
রাজভান কিছুই বুঝতে পারল না, বলল, কে মরে গেছে ?
--ইকবাল আমার সামনে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলো। ওর মরার চীৎকার আমি শুনেছি, ভয়ের সুর নিয়ে চৌহান বলে উঠলো।  
সঙ্গের এক সিনিয়র গার্ড গম্ভীর গলায় বলল, ওকে এখন বিশ্রাম করতে দে। আমি ধারণা করতে পারছি ওর কি হয়েছিল।
সমাপ্ত                 



পার্থ রায়

মা

কাল বড়দিন। দেখতে দেখতে আর একটা খ্রিষ্টমাস চলে এল। আলোর রোশনাইতে সেজে ওঠা পার্ক স্ট্রীট, চারদিকে উৎসবের ছোঁয়া, কাছেই সেন্ট জেভিয়ারস কলেজ থেকে ভেসে আসা ক্যারোল সংগীতের মূর্ছনা এসব কিছুই বিশাল বেকারির আলো ছায়া ঘরে অন্যদের সাথে কাজ করতে থাকা মারিয়া ডিসুজার সুন্দর মুখে রেখাপাত করতে পারছে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আনমনা হয়ে ভাবে-বাড়ীতে একা ওর মেয়ে সুজান আর বৃদ্ধা, অথর্ব মা। আজ রাতে ওর লিটিল এঞ্জেল একা থাকবে। ভাবনা হয়, শি ইজ আ টিন এজার। এই বয়েসটা খুব খারাপ, তায় আবার মেয়েটা…......। আজ মারিয়ার বাড়ি ফেরা হবে না। বারবি ডলরা যেমন ফ্রিল দেওয়া ফ্রক পড়ে, ওর জন্য তেমনি একটা পিঙ্ক ফ্রক কিনেছে, আর একটা আমন্ড কেক নিতে হবে। আর কিছু ভাবতে পারে না। সুজানের চোখের জ্যোতি ফেরাতে অনেক টাকার দরকার। ওর বাবার তো জন্ম দিয়ে দায়িত্ব খালাস। শোনা যায় সেখানে আর একটা বিয়ে করেছে। ধনী বেকারি মালিক জন ডিকোস্টা সব জানে। লোভী দৃষ্টি দিয়ে মারিয়াকে চাটে আর শেকারি বেড়ালের মত ছোঁকছোঁক করে। মেয়ের চিকিৎসার জন্য টাকা ধার চেয়েছিল, দেবে বলেছে কিন্তু বিনিময়ে গোটা মারিয়াকে চেয়েছে। আ ন্যাসটি ডেমন! পুরুষ জাতটাই কি এমন? যীশুও তো পুরুষ। ক্রিস্টমাসের আগের দিন ওর আত্মবলির উৎসবে সামিল হতে জনের বেডরুমে ঢোকার মুখে যীশুকে স্মরণ করল মারিয়া, “ও জিসাস! মাই লর্ড! ফরগিভ মি। বুঝিনা প্রভু তোমার খেলা। ভাগ্যিস আমার সুজান এখন দেখতে পায় না, তাহলে হয়ত মায়ের শরীরে নোংরা চিহ্ন দেখে ফেলত। বাট ওকে তুমি ঠিক করে দিও, আই প্রমিস আই উইল বি আ গুড মাদার”। 

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

 অন্যপথ

মনোবিদ দাসগুপ্তের আজ এটাই শেষ রোগী। দরজা খুলে ঢুকলেন চল্লিশ শেষের দিকের এক মহিলা। চেনা মুখ। স্বাভাবিক সৌজন্যের হাসি দিয়ে বসতে বললেন  মনোবিদ দাসগুপ্ত।ভদ্র মহিলা কে চিনতে পারলেন, মেয়ের সহপাঠীর মা। ইনার ছেলেটির খাতা প্রায় তাঁর আদুরে মেয়ের লাগতো। বার কয়েক পাশের আবাসনে মেয়ে কে নিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে।সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবার। চা খেতে হয়েছে একবার। গায়ে পড়া অতিথি পরায়ণ একটু মফস্বলের আচরণ। ভদ্রমহিলা কে অত্যন্ত স্বাভাবিক একজন মানুষ বলেই তো তাঁর মনে হয়েছে।
“ আরে আপনি ...নাম লিখিয়ে আসার কি দরকার... কার সমস্যা?” মনোবিদ দাসগুপ্ত মানবিক হবার চেষ্টা করলেন। খুব অস্বস্তি নিয়ে ভদ্র মহিলা বললেন , “ আমার ... মানে ঠিক আর কাউকে  চিনি না তো... আপনাকে একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে”। 
-“ কি সমস্যা ...বলুন”।
- “ আমি ডিপ্রেশনের রুগি এইটা একটু একটা প্রেস্‌কিপসানে লিখে দিন না...মানে লিখুন খুব মানসিক ভাবে অবসাদ গ্রস্থ ... এই ভাবে”। 
-“ কি অসুবিধা হচ্ছে বলুন।... ঘুম হচ্ছে না...মন খারাপ থাকছে?”
- “আসলে প্রেস্‌কিপসানে ওটা লিখে দিন আমি ডিপ্রেশনের রুগি।ওটাই চাইছি। তাহলেই হয়ে যাবে।”
- “হ্যা লিখে দেবো কিন্তু কি কি অসুবিধা সেটা বলুন? আমি সাহায্য করতে পারবো”।
- “ আমার কোন অসুবিধা নেই। ”
- “তাহলে প্রেস্‌কিপসানে আমি লিখবো কেন? আর সাথে কাউকে আনেন নি কেন? আমি অকারণে এভাবে লিখতে পারি না।”পেশাদার দাসগুপ্ত বিনীত অথচ পরিষ্কার ভাবে বল্লেন।
- “ আমার অবস্থা টা বোঝাতে পারছি না। মানে আমাকে অন্য কারোর কাছে যেতে হবে তাহলে...”।“আপনার কি সমস্যা একটু খুলে বলুন”একটু দৃঢ়তার সাথে বলেন মনোবিদ দাসগুপ্ত।
-“ আসলে আমি সংসার ছেড়ে চলে যেতে চাইছি। আমি এবার সত্যি আর এভাবে বাঁচতে চাইছি না।”
মনোবিদ দাসগুপ্ত এবার ধরলেন,অসুস্থ দাম্পত্য। “ হ্যা বলুন কি কি সমস্যা। আপনার স্বামীর সাথে কবে থেকে, ?”
-“ আমার স্বামী খুব সোজা মানুষ জানেন। খুব ভালো। সেই জন্যেই চাইছি। আমি চলে গেলে যাতে কোন সমস্যার মধ্যে না পড়েন। লোকজন যেন তাঁকে কিছু না বলেন।”
মনোবিদ দাসগুপ্ত অবাক হলেন ভদ্রমহিলার কথায় একটু অবাক হলেন। “  আপনার ছেলে এ বছর চাকরি পেল তো...কোথায় যেন আছে? আপনি কোথায়  যাবেন?”
“ আমাকে তো সংসারে আর দরকার নেই। আমি চলে যাবো।”
“মানে ছেলে স্বামী এদের কে আপনি তো ভালবাসেন আপনি যাবেন কেন?আর দরকার নেই এই কথা ভাবছেন কেন।?”
খুব সোজা চোখে তাকালেন রোগিণী। একটু বেশী ঋজু শিরদাঁড়ায়।
“ আমাকে মা খুব যত্ন করে গান শিখিয়ে ছিলেন জানেন।কষ্টের সংসারে গান শেখানো।ঐ গান দেখেই আমার বিয়ের ঠিক হয় । কিন্তু বিয়ে হবার পর আমি কেবল সংসার করেছি। রান্না, ঘরের অন্যকাজ, শ্বশুর  -শ্বাশুরী ,অতিথি আপ্যায়ন, ছেলে মানুষ করা যা একজন বাড়ির বউ কে করতে হয়।”ভদ্রমহিলা  চুপ করলেন সামনের গ্লাস থেকে জল খেলেন। “ জানেন সব্বাই কেমন যেন ভুলে গেল যে আমি গান করতাম। চারমাস আগের ঘটনা জানেন ডঃ দাসগুপ্ত , বাড়িতে এলেন পণ্ডিত ধীমান সেন। উনি কি করে জানলেন আমি গান জানি। আমাকে রান্না ঘর থেকে ডেকে পাঠালেন। আমি তো লজ্জায় এক শেষ। হাতের হলুদ ভালো করে ধুয়ে আসিনি।সাথে উনার এক অল্প বয়সী ছাত্রী। সে কি সমস্যা। উনি  মুলতানি  গাইতে শুরু করলেন। আমার ঐ বন্ধিস টি জানা। আমি চারপাশ ভুলে গিয়ে গেয়ে ফেললাম। বাড়ির সব্বাই একটু অবাক । উনি হারমোনিয়ামের বেলো লক্‌ করে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। কোথায় শিখেছি কত দিন শিখেছি। আমাকে বল্লেন আমি আমি ভীমপলশ্রী জানি কিনা। আমি কেমন লজ্জাহীন হয়ে গেয়ে দিলাম।” ডঃ দাসগুপ্ত চুপ করে শুনছেন। মাথা নিচু করে ছিলেন ভদ্র মহিলা। এবার ডঃ এর দিকে তাকালেন। “ হ্যাঁ বলুন ।গান করলেন তারপর কি হল ”।“ ওটা ফোনে রেকর্ড করেছিল ভাগ্নের বাচ্চা ছেলে। সে ফেসবুকে দিয়ে দিল।তারপর সেটা আর বলার নয় ।প্রচুর মানুষ ভালো বল্ল...... ” । “ বাহ এতো দারুউউন ব্যাপার খুব আনন্দের।” বললেন ডঃ দাসগুপ্ত। হঠাৎ বড্ড ভারী এবং জটিল হয়ে উঠল রোগিণীর চোখ। নীচের ঠোঁটে ফুঁসে উঠছে তীব্র আবেগ।“ আমার স্বামী খুব ভালো মানুষ জানেন খুব নাম। সব্বাই বলে উনার দয়ার হৃদয়।জানেন...” আর বলতে পারছেন না রোগিণী। শব্দ হীন হয়ে থাকলো সংলাপ।ডঃ দাসগুপ্ত শান্ত হয়ে অপেক্ষা করলেন। “ আমার গান নিয়ে উনি কিছু বললেন না। আমি ভাবলাম উনি এই বয়সে জানাতে লজ্জা পাচ্ছেন।এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে সব্বাই এসেছে।আমার বাপের বাড়ির কেউ তো নেই।  আমি এটাকেই তো বাড়ি মনে করি।কিন্তু......” এবার চোখ দিয়ে জল বার হয়ে এলো।“ জানেন সব্বাই আমার গান নিয়ে ঠাট্টা করছিল। আমি জানতাম এটাই হবে। প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু উনি হঠাৎ বাজে মুখ ভঙ্গি করে বললেন যে , উহ কি বাইজীদের মতো গান। অসহ্য।”
ডঃ দাসগুপ্ত বললেন, “কিন্তু আপনি ওদের জানান যে এটা আপনার খারাপ লেগেছে। তাই না।এতো দিনের ঘর,আপনার তৈরি করা সংসার।”
“আপনি লিখে দিন না আমার অবসাদ আছে। একটু সাহায্য করুন। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। হরিদ্বারে  গঙ্গামার আশ্রমে আমার এক চেনা মানুষ আছেন।ওখানে গান করার সুযোগ ও আছে।ওদের সাথে কথা বলা আছে আমার। আমি গয়নাগাঁটি কিছু নেব না। চুপচাপ চলে যাব। বয়স হয়েছে আর তো অন্য কিছু ভয় নেই। আমি গান করবো আর নিজের জন্যে বাঁচবো। প্রেস্কিপ্সানে  লেখা থাকবে আমি অবসাদগ্রস্থ ।ওটা সামনে রেখে যাব।ওরা কিছু দিন খুঁজবে। তারপর ভাববে পাগল হয়ে হারিয়ে গেছে। দিন না লিখে ডাক্তার বাবু”।



প্রদীপ ঘটক

কাজললতা

মাঝরাতে হঠাৎই ঘুম ভেঙে যায় সুপর্ণার। মশারি তুলে হাত বাড়িয়ে জলের বোতলটা নিতে গিয়েই চোখ চলে যায় ড্রেসিংটেবিলের দিকে। আঁতকে ওঠে।
সুমিতকে ঠেলে তোলে "এই শোনো, ওঠো ওঠো।"
সুপর্ণার ভয়ার্ত গলায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে সুমিত "কি হয়েছে? বল কি হয়েছে?"
সুপর্ণা হাঁফাচ্ছে। সুমিত আবার জিজ্ঞাসা করে "কি হল তোমার?"
স্থির চোখ। ফ্যাকাশে মুখে সুপর্ণা বলে "ড্রেসিংটেবিলের সামনেটা দেখো।"
"কই, কিছু নেই তো?" আলো জ্বালিয়ে চারিদিক ভাল করে দেখে সুমিত।
"এখনই আমি দেখলাম।"
"কি দেখলে?"
"দেখলাম কাজললতাটা খোলা আর……"
"আর?"
"আর তার ভিতরে দুটো চোখ,হ্যাঁ হ্যাঁ দুটো চোখ। ঠিক ঠিক তার মত।"
"কার মত" ব্যগ্র হয়ে জিজ্ঞাসা করে সুমিত।
সুপর্ণা কাঁদতে কাঁদতে সুমিতের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে "আমি স্পষ্ট দেখেছি।"
সুপর্ণাকে শান্ত করে কিছুটা জল খাইয়ে দেয় সুমিত। নিজেও কিছুটা খায়। তারপর বলে "শুয়ে পড়ো। ওটা তোমার মনের ভুল।"

বাচ্ছাটা হওয়ার আগেই সুপর্ণা কাজললতাটা কিনে এনেছিল। মা বলেছিলেন, ছেলেমেয়েদের কাজল পরালে টানা টানা চোখ হয়। আর ডানদিকের জুলফির কাছে একটা কাজলের ফোঁটা দিলে নজর লাগে না। তাই আঁতুর থেকেই ছেলেকে কাজল পরাত সুপর্ণা। তারপর বাঁ-হাতের কড়ে আঙুল কামড়ে দিত।
জন্ডিস নিয়ে জন্মে ছেলেটা বাঁচেনি। তারপর থেকেই সুপর্ণা অন্যরকম হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন ডিপ্রেসেনের চিকিৎসা চলছে ডাক্তার গুহনিয়োগীর কাছে। সুপর্ণা এখন দিনরাত ঘুমোয়। তবু মাঝরাতে মাঝে মাঝেই ও কাজললতায় বাচ্ছার চোখ দেখে। ডাঃ গুহনিয়োগী আশ্বাস দিয়েছেন। সুপর্ণাকে বাড়িতে একা রাখতে সাহস হয় না সুমিতের। তাই অফিস যাবার সময় পাশের দত্তবাবুর স্ত্রীর কাছে রেখে যায়।

আজ অফিসে কাজের প্রচুর চাপ। অন্যমনষ্ক থাকার জন্য বেশ কয়েকদিন বসের কাছে বকুনিও খেয়েছে সুমিত। কম্পিউটার থেকে উঠে বাথরুমে গিয়েছিল সুমিত। মোবাইল বেজে উঠল,দত্তবাবুর স্ত্রীর ফোন "সুমিত, তাড়াতাড়ি বাড়ি এস। সুপর্ণা কেমন করছে।"

অফিসের বসকে বলতেই তিনিই গাড়ি করে বাড়ি পাঠিয়ে দেন সুমিতকে। বাড়িতে ঢুকে দেখেন দত্তবাবুর স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে গোঁ গোঁ করে আওয়াজ করছে।
দত্তবাবুর স্ত্রী বলেন "কি একটা দরকারে বাড়ি এল। অনেকক্ষণ ফিরছে না দেখে আমি দেখতে আসি।"
"কি হয়েছে সুপর্ণা, কি হয়েছে?" ব্যকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে সুমিত।
অর্দ্ধোন্মীলিত চোখে সুমিতের দিকে তাকিয়ে সুপর্ণা ড্রেসিংটেবিলের দিকে আঙুল বাড়ায়। তারপরই জ্ঞান হারায়।
ডাক্তারবাবু সব পরীক্ষা করে বললেন "সুখবর আছে সুমিতবাবু। কনগ্র্যাচুলেসন।"



মনোজিৎকুমার দাস

উতল মন

সে আমাকে প্রথম ভালবাসতে শিখিয়েছিল।  কতই বা তখন আমার বয়স । আমি সবেমাত্র সাত ক্লাস পাশ করে আট ক্লাসে উঠেছি, ও আমার থেকে দু’ক্লাস উপরে পড়তো। একই পাড়াতেই আমরা থাকি। ক্লাস সেভেন থেকে আমি প্রথম হয়ে এইটে উঠলাম। আর ও ক্লাস নাইন থেকে প্রথম হয়ে টেনে প্রমোশন পেল। একই স্কুল বাসে আমরা রোজ স্কুলে যেতাম , ও কিন্তু আমার সঙ্গে যেতে আলাপ করতে আসেনি একদিনও ।  উপর ক্লাসের ছাত্রদের সাথে কথা বলার সাহস আমার সে বয়সে ছিল না। 
মিরপুরে ১০ নম্বর গোলচত্ত্বর থেকে আমরা স্কুলে যাওয়ার  জন্যে স্কুল বাসে উঠতাম ,আর স্কুল শেষে আবার ওখানটাতে বাস থেকে নামতাম। আমাদের মধ্যে সুশোভন ও থাকতো। স্কুলবাসের প্রায়  সবাই আমাকে চিনে , আমি মনে মনে ভাবতাম।  প্রতি ক্লাসে সুশোভন  প্রথম হওয়ায় সবাই সুশোভনকে যেমন চিনতো, আমিও তেমন ভাবেই চিনতাম।  সুশোভন আমাকে চিনতো তবে তেমনভাবে চিনতো কিনা জানি না।
স্বাস্থ্যচেহারায় আমি আর পাঁচজনের চাইতে ভাল এটা আমি নিজেও বুঝতাম । সত্যি কথা বলতে নজর কারার মতো চেহারা আমার ,তা আমাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের বুঝতে কষ্ট হয়নি।  একই পাড়ায় বাস করে, একই স্কুলবাসে যাতায়াত করেও আমার চোখ কিন্তু সুশোভনের  দিকে পড়েনি ।
আমাদের স্কুলের অডিটোরিয়ামে বার্ষিক পরীক্ষাফল ঘোষণা করেছিলেন হেডস্যার। অন্যান্য স্যার ছিলেন,ছিলেন  অভিভাবকেরাসহ অনেক গুণীজন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেডস্যার ক্লাস নাইন থেকে ফল ঘোষণা করতে শুরু করলেন। সুশোভনের নামটা তার মুখ থেকে প্রথমে উচ্চারিত হলো। সুশোভন ডেক্স চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালো।
আমি তার মুখটা দেখেই চিনে ফেললাম। ওতো আমাদের পাড়ার , আমরা একই স্কুল বাসে যাতায়াত করি,আমি মনে মনে বললাম। আমাদের স্কুলটা ঢাকার নাম করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এক এক ক্লাসে চার পাঁচটা করে সেকশন । একই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের চেনার উপায় নেই। এক সময় আমাদের ক্লাসের রেজাল্ট ঘোষণার পালা এলো। ক্লাসের প্রথম হিসাবে আমার নাম হেডস্যার ঘোষণা করলেন। আমার আশা ছিল আমি প্রথম না হলেও সেকেন্ড হবো।আমার রেজাল্ট আমি উল্লাসিত। রেজাল্ট ঘোষণার অনুষ্ঠান শেষে ফটো তোলার হিড়িক পড়ে গেল। সুশোভনই প্রথম এগিয়ে এসে আমাকে বললো “কনগ্রাচুলেশন অন ইওর এক্সসেলেন্ট রেজাল্ট, সুরঞ্জনা।”  আমার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো “সেম টু ইউ । উইথ গুড উইসেস।” ওটাই ছিল আমাদের প্রথম কথা বলা। তারপর থেকে আমাদের দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা পড়ে উঠলো।
তারপর সুশোভন এক বছরের কয়েক মাস বেশি স্কুলে থাকলো। ক্লাস টেনের টেস্টের পরও এস.এস.সি. পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা একসাথেই স্কুলে যেতাম ।ওদের পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার পরও ওর সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। পরীক্ষা দেবার পর প্রায় প্রায়ই ও আমাদের বাড়ি আসতো। আমার বাবামা আর ভাইবোনেরা তাকে ভালচোখেই দেখতো।আমার মা আর েেছাট বোনটির সাথে আমিও দু’তিন বার ওদের বাসায়ও গিয়েছি।
ওর বাবা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউভিট পদে প্রমোশন পেয়ে মিরপুর থেকে  সিলেটে শহরে বদলী হওয়ায় বাবা মা ভাইবোনের সঙ্গে সুশোভনকেও  সিলেট শহরে চলে  যেতে হলো। সেই থেকে  সুশোভনের সঙ্গে আমার সর্ম্পকের ছেদ পড়লো।
ও আমাকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল। সত্যি এক সময় আমরা পরষ্পর পরষ্পরকে ভালবেসে ফেলি ।  বয়:সন্ধিক্ষণের দু’জন তরুণতরুণীর মধ্যে নিষ্কাম প্রেমের একটা সম্পর্ক আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল।
তারপর কয়েক বছর কেটে গেছে । ওর  দেখা পাইনি। সে সময়  মোবাইল ফোন থাকলে এমনটা হয়তো হতো না।  মনের অজান্তে একদিন ওকে ভুলে গেলাম।
এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি ইংরেজিতে। অনার্সে ভাল রেজাল্ট করেছি। মাস্টার্স শেষ করে বের হয়ে যাব অল্পদিনের মধ্যে ।
বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরিয়ে আসার বছর দু’তিন পর  ডিপার্টমেন্টের একটা ছেলের সঙ্গে আমার প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠায় আমাদের দিন ভালই কাটছিল । এখন আমাকে পূর্ণ যৌবনা তরুণীই বলতে হয় । এখন আমার ভালোমন্দ বুঝবার ক্ষমতা আমার আছে বলে মনে হয় ।
 হঠাৎ করে একদিন সুশোভন আগমন ঘটলো। “এতদিন কোথায় ছিলে সুশোভন ?” এতদিন পরে তার সাথে প্রথম সাক্ষাতে আমার প্রশ্ন । ও আমতা আমতা করে কি যেন বলতে চাইলো ।
ওকে এড়িয়ে যেতে চাইলাম, এখনো এড়িয়েই যেতে চাচ্ছি। কিন্তু ওকে এড়িয়ে যেতে পারছি না,আসলে কিন্তু ওইতো প্রথম আমাকে ভালবাসা কাকে বলে শিখিয়েছিল। আমাকে ছাড়া ও এক সময় যেন নিঃশ্বাস নিতে পারতো না।
ওর সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে প্রতিদিনই এখনো । ওকে কাছে পেলে এখনো আমার খুব ভাল লাগে । এদিকে, ডিপার্টমেন্টের ছেলেটিকে  আমি কী বলবো ; ভেবে পাচ্ছি না। এখন আমি কী  করবো!




ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী

ইন্দ্রজাল

যখন এক অজানা চোখের সঙ্গে আরেকটি চোখের মিলন হলে বেড়ে যায় হৃদ স্পন্দন মন বলে, “হ্যাঁ এই সেই ছবিযাকে কল্পনায় বারে বারে আঁকি কিন্তু তবুও অস্পষ্ট থেকে যায় আবার পরক্ষণে তাকে সামনে দেখে মণ আকুল হয় তাকে পাওয়ার জন্য” । তবে কি সেটাই প্রেমের নিদর্শন নাকি  অবাস্তব এক কল্পনা মাত্র ! কিন্তু তাকেই যে আপনার করার জন্য মন হয় ব্যাকুল যে কিনা সহজে ধরা দেয় না ।  কিশোর মনের এক চঞ্চলতা আচ্ছন্ন করে তবুও ছোটে আলেয়ার পেছনে সেই কল্পনার প্রতিচ্ছবিকে ছুঁতে । সব অসাধ্যকে সাধন করার অদম্য ইচ্ছা ! কিন্তু সত্যি কি তাতে সে সফল হবে ? ................. এই গল্পটা সেইরকম এক নিরবচ্ছিন্ন প্রেমের গল্প ।
অয়ন কলেজের সামনে লাইব্রেরীর দিকে যেতে যেতে এক স্বপ্নের ইন্দ্রজালে বশীভূত হওয়ার মত নানা রঙিন স্বপ্নে বিভোর । স্বভাবতই দেবযানী র প্রতি এক অজানা আকর্ষণে লাইব্রেরীর দিকে নিজের অজান্তেই চলে এসেছে ……
হ্যাঁ দেবযানী নতুন এসেছে এই কলেজে ।  সাইন্স ব্লকে তাকে প্রথম দ্যাখাতেই অয়নের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে তারঅপরূপ চোখ ধাঁধানো রূপে । ওর রূপের এক আকর্ষণ আছে যা অন্য মেয়েদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । লম্বা ছিপছিপে , টানা টান চোখ , মেদ হীন চেহারা অথচ লাবণ্যে ভরা। দেবযানীর সুন্দর মুখশ্রী সত্যি যে কোন পুরুষ কেআকৃষ্ট করতে বাধ্য। অয়ন সত্যি এই প্রথম বার  কারু প্রেমে পড়ল। ভেবে কূল কিনারা পায়না তার এই পরিবর্তনের জন্য  রবিঠাকুরের লেখা গান আপনা হতে গুন গুন করে গাইতে ইচ্ছে হবে দেবযানী কে দেখলে ঃ    “ একি লাবণ্যে পূর্ণ  প্রাণ, প্রাণেশ হে, আনন্দ বসন্তস মাগমে ॥ বিকশিত প্রীতি-কুসুম হে পুলকিত চিতকাননে ॥ জীবনলতাঅবনতা তব চরণে। হরষ গীত উচ্ছ্বসিত হে কিরণ-মগন গগনে।” কবির সৃষ্টি বোধ হয় এইরকম ই কোন অপরূপার জন্য ।
অয়ন কলেজের ক্রিকেট টিমের  ক্যাপ্টেন।
অয়ন খেলা ধুলোয় ভালো বিশেষ করে ক্রিকেট তার স্বপ্ন ।  ইউনিভার্সিটি রিপ্রেজেন্ট করেছে এই বছর । টপস্কোরার হিসেবে তার নাম আছে এই কলেজে । তার লম্বাটে গড়ন এবং পুরুষালী ব্যক্তিত্ব অনেক মেয়ের হৃদয়েরস্পন্দন বাড়ায় । খেলার মাঠে ব্যাট হাতে নামলে অনেক ছেলে মেয়েকেই দেখা যায় করতালি দিতে এবং সঙ্গে “আপআপ অয়ন”  চিৎকার। অয়ন খেলার সময় বোলারের হাতের বলটা “অর্জুনের লক্ষ ভেদের সেই মাছের চোখের মত”দেখে পারফেক্ট টাইমে ব্যাট ঘোরায় । বল কানেক্ট হলেই হয় চৌকা নয় ছক্কা । হাত তালিতে গ্যালারি ফেটে পড়ে ।অয়ন বিচলিত না হয়ে ফের পরের বল ফেস করে।
কিন্তু দেবযানীকে দেখার পর থেকে ওকে বেশ অন্যমনস্ক  দেখায় । বন্ধুরা অয়নের পরিবর্তন  লক্ষ্য করে কিন্তু কিছুই বলেনা। সামনে ইন্টার কলেজ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি । এই কলেজের অয়ন ই  ভরসা । উইকেটে অয়ন টিকলেই রান গড়গড় করে বেড়ে চলে স্কোর বোর্ডে । অয়নের পার্টনার ‘অমিত’ সেকেন্ড ডাউনে এলে ওদের জুড়ি বাজি মাত  করে।পনেরো দিন বাদ টুর্নামেন্ট । এই খেলা দেখতে খোদ মুখ্যমন্ত্রী আসবেন । কলেজের সুনাম বজায় রাখা অনেকটা অয়নের-অমিতের জুড়ীর ওপর নির্ভর করে । এই সময় ওকে অনেক  প্র্যাকটিস করতে হবে । কলেজের কোচপ্রত্যেক দিন নেট প্র্যাকটিস করাচ্ছেন । ফিজিক্যাল ফিটনেসের টিপস দিচ্ছেন আর ফিল্ডিং করাচ্ছেন। সব ছেলেদেরমধ্যে আশা উদ্দীপনা এবারে তারা চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়ে কলেজে আসবেই । কলেজের প্রিন্সিপাল ডঃ কমলেশ ভট্টাচার্য কলেজের সকল ক্রিকেটার দের এক টি পার্টিতে  আমন্ত্রণ করেন । ওই পার্টিতে দেবযানী , পুষ্প গুচ্ছ দিয়ে প্রত্যেক প্লেয়ার কে স্বাদর অভ্যর্থনা করে। অয়নের কাছে দেবযানী এলে দুজনে দুজনের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে। অয়নের , দেবযানী কে দেখে এক অজানা আকর্ষণে ওর চোখটা স্থির হয়ে যায় ওর মুখের দিকে  তাকিয়ে।
“এটাই বোধহয় ওদের প্রথম শুভ দৃষ্টি”.... এটা অয়নের ভাবনা, দেবযানীর কিনা জানিনা!
কলেজের লাইব্রেরীর দিকে নিজের অজান্তেই চলে এসেছে অয়ন। দেবযানী প্রত্যেক দিন আসে তাই ও চলে আসেএই সময় । লাইব্রেরী কার্ড টা এনেছ কিনা দেখেনিল অয়ন । হ্যাঁ সঙ্গে আছে তবে কোনদিন বই নেয়নি । কলেজলাইব্রেরীতে ওকে দেখে কিছু ছেলে মেয়ে একে অপরের দিকে দ্যাখে কিন্তু নীরবতার জন্য মুখে কিছু প্রকাশ করে না।সকলের ই কৌতূহল অয়নের আগমের উদ্দেশ্য নিয়ে ।
অয়ন খুব স্থির পদক্ষেপে দেবযানীর দিকে এগোয় । ওর পাসে বসে বলে ‘হায়’ কেমন আছ।
একটু ইতস্তত ভাবে দেবযানী অয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ‘তুমি ! এখানে!!’
কেন আমায় কি আসতে নেই !
না তা নয় । তবে ..... !!
তবে কি ?
দেবযানী লক্ষ্য করল সকলের চোখ ওদের দিকে । খুব অপ্রস্তুত মনে হল নিজেকে।
অয়ন পরিস্থিতি বুঝে একটাই কথা বলে “বাইরে লনে অপেক্ষা করছি । আশা করি না বলবে না।” এই বলে উঠেপড়ে ।
খুব অপ্রস্তুতে পড়ে দেবযানী । সকলে কি ভাবছে কি জানি ! মনে মনে ভাবে সত্যি ই ছেলেটা হ্যান্ড-সাম কিন্তু তারমানে এই নয় সোজা লাইব্রেরীতে এসে আমার পাসে বসে পড়বে! এটা খুব খারাপ মনে হল । বন্ধুরা টিটকিরি নাআরম্ভ করে ওকে নিয়ে। ওকে দ্যাখা করে করে বলবে ও  যেন আর এরকম না করে। কিছু বই আর নিজের নোটনিয়ে উঠে পড়ে । অয়নের কথাটা মনে  করে কলেজের লন এ এগুচ্ছিল হটাৎ অয়ন সামনে এসে একটা গোলাপ দিয়ে ওকে প্রপোজ করে বসে।

দেবযানী অয়নের এই ব্যাবহারে ক্ষুব্ধ হয় । গোলাপ টা ছুঁড়ে ফেলে বলে , “কি মনে কর নিজেকে ?” আমি এসব একদম পছন্দ করিনা। তুমি হয়ত ভাল ক্রিকেট খেল কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমার প্রেমে আমি পাগল হব। আমাকে আর কখন বিরক্ত করবেনা। এই বলে দেবযানী গট গট করে সেখান থেকে চলে যায় অয়নের উত্তরেরঅপেক্ষা না করে।
এইরকম অপ্রস্তুতে পড়তে হবে অয়ন কে ও ঘুণাক্ষরেও বোঝেনি । ওর নিজের কনফিডেন্স লেভেল টা অনেক বেশিতাই হটাত এই অপ্রত্যাশিত আচরণে চকিত হয়ে যায়।  কোন উত্তর দেওয়ার আগেই দেবযানী চলে যায়।  অয়নফ্যাল ফ্যাল করে দেবযানীর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এটা কি হচ্ছে তার ! সে না প্লেয়ার । প্লেয়ারদের শরীর চর্চা , জগিং , জিম এইসব নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা । নারীসংগ অবাঞ্ছনীয় ।  যদিও ভালো প্লেয়ারদের গার্ল ফ্রেন্ডের অভাব থাকে না। কিন্তু দেবযানী অন্য ধাতের মেয়ে। ওরপ্রতি আকর্ষণ টা কেন যে হল ভেবে কুল কিনারা পায়না অয়ন। ওর ভাবনা তে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে অমিতের ডাকে।
কিরে কি ভাবছিস? চল ফিল্ডে যাই ।
না’রে আজ বাড়ি যাব । এই বলে ওখান থেকে চলে যাচ্ছিল।
কি হল গুরু ? কেস টা কি বলত ?
কিছু না ! কি আর হবে ?
কিছু ত আছে। আমি জানি সেই জন্যই এলাম ।
অয়ন অপ্রস্তুতে পড়ে .....  মানে ?
মানে আবার কি ! অয়ন - দেবযানীর প্রেমের উপাখ্যান এর শুভারম্ভ । চিন্তা করিস না । সব ঠিক হয়ে যাবে । আমারওপর ছেড়ে দে । কিন্তু এখন চল গুরু প্র্যাকটিস করি । এটাই তোর আমার পরীক্ষা । এখানে কোন গোলমাল হলে প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন ....!
অগত্যা অয়ন বাধ্য ছেলের মতন ফিল্ডে যায় নেট প্র্যাকটিস করতে । অমিত বোলিং করে । অফ স্পিন বল । কখনআউট সুইঙ্গার কখন ইন সুইঙ্গার । স্পিন ভালোই করতে পারে অমিত । প্রথম বলটাই অয়ন মিস করে ।
এ কি হচ্ছে ? মেয়েটা ত আচ্ছা মাথা খেল তার পার্টনারের । কাছে এসে বলে গুরু এ কি হচ্ছে? এ্যাঁ ।
না আমি আজ খেলতে পারবোনা ।
এদিকে আর মাত্র ১৫ দিন বাকি টুর্নামেন্টের । কি হবে ? মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে খেলা সম্ভব নয় সে যত বড়প্লেয়ার ই হোক না কেন !
অয়ন আজ খুব অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল । অমিত বেশ বুঝতে পাচ্ছিল সেটা । কিছু একটা বুদ্ধি বার করতে হবে ....পার্টনার বলে কথা ! ও এখন কলেজের ভবিষ্যৎ । ফিল্ডে ও না থাকলে রান রেট বাড়বে না জেতার ও চান্স কম । ওথাকলে খেলোয়াড়দের মনে জৌলুশ থাকে । সেটা অন্য কেউ দিতে পারবে না। না না .. এ রিস্ক কিছুতেই নিতে পারেনা অমিত।
ভাবনাতে পূর্ণচ্ছেদ পড়লো , অয়নের ডাকে। আমি আজ যাচ্ছিরে । আমার শরীর ভালো নেই । মাথাটা যন্ত্রণা করছে। বাড়ি যাই । এই বলে অমিতকে বাই বলে চলে যায় ফিল্ড থেকে।
অমিত অন্য প্লেয়ারদের সাথে খেলা নিয়ে আলোচনা করে। আজকের ঘটনার সাক্ষী এক মাত্র অমিত।  কিন্তু এ বিষয় কাউকে কিছু বলে না।
৭ দিন পর:-
ক্রিকেটার অয়নের প্রেমের প্রস্তাব কে ছক্কা মেরে বাউন্ডারি পার করে দিয়েছিল দেবযানী। কিন্তু  নাছোড়বান্দা জিদ-খোর অয়ন হাল ছাড়ে নি । সেদিনের অপমান কে শার্ট থেকে ধুলো ঝাড়ার মতন ঝেড়ে ফেলে  বন্ধুদের দিয়ে সুপারিশ করিয়েও যখন কাজ হল না, নিজেই দেবযানীকে  দিল আবার বন্ধুত্বের প্রস্তাব “ফ্রেন্ডশিপ ডে”  তে । দেবযানীর কাছেপ্রেম ট্রেমের  চেয়ে ফ্রেন্ডশিপ টা  অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হল। কিন্তু সে কি জানত, বন্ধুত্বের ইন্দ্রজালে আটকা পড়বে অয়নের  বাকি জীবনের গল্পর সঙ্গে ! হ্যাঁ কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবে অয়নের বন্ধুত্বের ডাকে সাড়া দেয় দেবযানী । নিছক বন্ধুত্বের খাতিরে কলজের ক্যাপ্টেন এর প্রিয়তমা না হোক বন্ধু হতে আপত্তি ছিলোনা তার। তাইখেলা দেখার ছলে বন্ধুর ক্রিকেট পারদর্শিতা কে অগ্রাহ্য করতে পারলনা ।
সেই থেকে শুরু .............
এখন অয়ন কে আর পায় কে ! হাতে চাঁদ পেয়ে অয়ন বেশ খুশি খুশি মেজাজে অমিত কে বলে আজ আমি পার্টি দেব। চল সবাই বন্ধুরা মিলে যাই ক্যানটিনে । স্মিতা , রোজি , দেবযানী , মৌসুমি , অনুষ্কা , প্রিয়াঙ্কা , অম্লান , প্রিতম ,দেবজিৎ, অমিত, অয়ন । মোট এগারো জনের পার্টি । সকলেই ঠিক সময় এল দেবযানী একটু দেরিতে পৌঁছল ।দেবযানী কে দেখে অয়নের ধড়ে প্রাণ এল । কিন্তু মুখে কিছু না বলে দেবযানীর  দিকে মেনু কার্ড টা এগিয়ে দিয়ে বলে আজ তোমার অনারে আমি এই পার্টি দিচ্ছি । তোমাকেই মেনু ঠিক করতে হবে ।
ও মা সেকি ! আমি এসবের কিছু বুঝি না ।
তবুও তুমি ..... অয়ন বলে ।
আরে দিয়েই ফেল না কিন্তু কিন্তু করছিস কেন ? প্রিয়াঙ্কা র কথায় সকলে সায় দিয়ে বলে হ্যাঁ হ্যাঁ , অয়ন যখন এত করে বলছে ........
ঠিক আছে এই বলে দেবযানী খাবার অর্ডার দেয়।
“কে বলে তুই কিছু জানিস না ?”  প্রিয়াঙ্কা বলে ।
দেবযানী ঃ   মানে ?
প্রিয়াঙ্কা ঃ মানে তুই সুন্দর মেনু চয়েস করেছিস । আমরা সকলে এনজয়  করব । কি বল অয়ন ?
হ্যাঁ নিশ্চয় নিশ্চয় বলে অয়ন দেবযানীর দিকে তাকায় .....
দেবযানী বোঝে ওকে এইসব বলে ওর মন পাওয়ার চেষ্টা চলেছে। অয়নের হুক সর্টে দেবযানী কুপোকাত হওয়ার মেয়ে নয় । দেখা জাগ কোথাকার জল কোথায় জায়। তবে ওরা সংখ্যায় বেশি এবং অয়নের নিকট বন্ধু তাই চুপ থাকাই শ্রেয় ।
আজ খুব ফুর্তি সকলের মনে । কেন জানিনা আজ দেবযানী ও খোস মেজাজে আছে। সারাদিন পড়াশুনো করতে তারও ভালো লাগে না । মাঝে মাঝে একটু ব্যতিক্রম হলে ক্ষতি কি ? এই বলে নিজেকে বোঝায় ।
দেবযানী: বেশ কাটল দিনটা । লাঞ্চ এর জন্য অশেষ ধন্যবাদ । পাওনা রইল টুর্নামেন্ট জিতলে ।
অয়ন: তোমাকেও ধন্যবাদ তুমি আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে কষ্ট করে এসেছ । তোমার জন্য আরও বেশি সুন্দর কাটল আমাদের সকলের দিনটা । হ্যাঁ টুর্নামেন্ট আমাকে জিততেই হবে। এটা কলেজের তথা আমাদের সকলের সম্মানের ব্যাপার । বড়দের আশীর্বাদ আর তোমাদের শুভেচ্ছা  থাকলে আমরা নিশ্চয় ট্রফি আনবো ।
হ্যাঁ সেতো নিশ্চয় । তোমার প্র্যাকটিস টার গুরুত্ব বেশি । সেটা কি হচ্ছে ? ট্রফি তোমাকে আনতেই হবে । এটাকলেজের এবং আমাদের সকলের সম্মানের ব্যাপার । কথাটা খেয়াল রেখ কিন্তু।
তুমি প্রার্থনা কর ভগবানের কাছে ।
তা করব বই কি ! চলি । সকলের দিকে হাত নাড়িয়ে বাই বলে উঠে পড়ে দেবযানী ।
বা..ই..ইইই সকলে এক স্বরে বলে ।
সকলে একে একে যে যার গন্তব্য স্থলে চলে যায়। অয়ন দেবযানীর কথাগুলো মনে করে , “তোমার প্র্যাকটিস টার গুরুত্ব বেশি । সেটা কি হচ্ছে ? ট্রফি তোমাকে আনতেই হবে। এটা কলেজের এবং আমাদের সকলের সম্মানের ব্যাপার । কথাটা খেয়াল রেখ কিন্তু।”
অয়ন ভোরে উঠেই মাঠে দৌড়োয়। নিজের ফিজিক্যাল ফিটনেস টা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন । সকাল ৮ টা অবধি নানা ব্যায়াম ।

তার পর নেট প্র্যাকটিস , ফিল্ডিং ইত্যাদি। বিকেল চারটের থেকে আবার খেলা। অয়ন এবং তাদের টিম সারা দিনফিল্ডে কাটায়। কলেজের ছেলে মেয়েরা উৎসাহ দেয় সকলকে । পরিশ্রমের ফল কখন বৃথা যায় না ।
ফাইনাল টুর্ণামেন্ট ঃ
আজ ফাইনাল । ইন্টার কলেজ টুর্নামেন্ট । ফাইনালে দুটি কলেজ । টিম এ তে অয়নদের কলেজ টিম বি তে বর্ধমান কলেজ ।
খেলাটা মূলত টিম এ vs টিম বি  ।
টস জিতে  টিম ‘এ’ , টিম ‘বি’ কে ব্যাটিং এ আমন্ত্রণ করে । দর্শক মহলে জোর হাত তালি ।
দেবযানী বন্ধুদের সঙ্গে তাদের কলেজের টিম ‘এ’ র খেলা দেখছিল । সকলের সঙ্গে ও খেলা দেখছিল । সম্ভবত কিছুক্ষণ টাইম ব্রেক মানে লাঞ্চ । সব  খেলোয়াড় রা প্যাভিলিয়নে ফিরে যায় । তাদের লাঞ্চের ব্যবস্থা ডাইনিং হলে করা হয়ে ছিল। হোষ্ট হিসেবে টিম ‘এ’ কলেজ সব আয়োজন করে।
লাঞ্চের পর অয়ন কে ব্যাট হাতে ফিল্ডে যেতে দেখে দেবযানীর কৌতূহল বেড়ে যায়।  এই তার প্রথম কোন খেলোয়াড়ের স্বচক্ষে ক্রিকেট খেলা দেখার সুযোগ ।
য়নের পঞ্চাশ করার সুবাদে ওদের টিম চ্যাম্পিয়ন হল । সারা মাঠে কলেজের ছেলে মেয়েরা অয়ন, অমিত , অম্লান ও প্রিতম কে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানায় । খুশির ফোয়ারা বয়ে যায় শ্যাম্পেনের বোতল খুলে ।   এর বোতল খোলা মানা , তা নাহলে ছেলেরা সেটাও খুলে সেলিব্রেট করত ।
অয়ন কেবল একজনকেই মনে মনে খুঁজছিল সে আর কেউনা দেবযানী । কোথায় সে ? সে কি আসেনি ! তার প্রেরণা আজ সফল করেছে এই ট্রফি জিততে । সেকি জানে ?
ট্রফি নিয়ে পুরো টিম লাফালাফি করে সারা ফিল্ড চক্কর দেয়। ম্যান অফ দি ম্যাচ ‘অয়ন’ কে দেওয়া হয় দ্রুত রানের জন্য। সবাই সেলিব্রেট করতে ব্যস্ত। অয়ন বড় ক্লান্ত । আজ সে ভগবানকে প্রাণ ভরে ডাকবে । এই সফলতার জন্য তাঁর আশীর্বাদ , দেবযানীর প্রেরণা এবং কলেজের সকলের প্রার্থনাই দায়ী । কিন্তু একজন  কে কেন দেখল না ! সেটাই প্রশ্ন করে নিজেকে।
ক্লান্ত অয়ন প্যাভিলিয়ন থেকে ফিরে যায় ড্রেসিং রুমের দিকে। সামনে দেবযানীকে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়।
তুমি ? কোথায় ছিলে ? আমি কত খুঁজেছি তোমায় ! আসলে  আমি তোমার পুরো খেলা দেখেছি । অভিনন্দন . তুমি সত্যি চ্যাম্পিয়ন। আমি আপ্লুত ।  এই বলে জড়িয়ে ধরে। অয়নের মুখ থেকে একটাই কথা স্বতস্ফুর্ত উচ্চারিত হয় , “আমি তোমাকে ভালোবাসি”
দুজনে দুজনের দিকে গভীর ভালোবাসায় তাকায় যেন হারান নিধি খুঁজে পেয়েছে দুজনে ।




মনোজ ভৌমিক

অপরাহ্ন বেলায়


অনিন্দ বার বার টোকা দিয়েছিল মাধবীলতার মনের দরজায়।মাধবীলতা দরজা খোলেনি। প্রাচুর্য আর সমৃদ্ধিতে ভরা ছিল তার মন। কেন খুলবে সে মনের দরজা! বয়েই গেছে!
বেশ কয়েকদিন পর অনিন্দ সকালের ঈশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে পার্কের গেটের মুখে মাধবীলতার মুখোমুখি। আবার অনিন্দের অনুনয়। মাধবীলতা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল," অপরাহ্নে এসো।"ভিখারী মন নিয়ে অনিন্দ হতবাক হয়ে ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে রইল।
বেলা গড়িয়ে গেছে। সময়ের স্রোতকে বুকের  পাঁজরে ভরে নিয়ে,অনিন্দ জীবনের পথটাকে ভাবনার জুতো দিয়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে এগিয়ে চলছে কোনোক্রমে।
বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে। সকালের ঈশ্বরটা অপরাহ্নের পথ বেয়ে সন্ধ্যার মাটিকে ছুঁতে যাচ্ছিল। অনিন্দ একবার বেখায়ালী মনে পার্কের দিকে তাকালো। দেখল,কে যেন তাকে ইশারাতে ডাকছে। অনিন্দ এগিয়ে গেল। সামনা সামনি গিয়ে হতবাক! চিনেও যেন সে চিনতে পারছে না। প্রশ্ন করে বসে," কে আপনি! " ভাঙা কন্ঠে উত্তর," আমি মাধবীলতা। আমায় চিনতে পারছ না অনিন্দ! আজ আমি থ্যালাসেমিয়া গ্রস্ত অনিন্দ।" অনিন্দ যেন আকাশ থেকে পড়ল! নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। অনিন্দের চোখে বাদল মেঘের ছায়া।ভাবনার কালো পাহাড়ে ঢাকতে চলেছে তার চিন্তাশক্তি। সেই সুশ্রী -সুন্দর -মহীয়সী নারীর চেহারা,একটা সামান্য রোগ, খুলে দিতে পারে তার মনের দরজাটাকে! অনিন্দ পাগলের মত জড়িয়ে ধরে মাধবীলতাকে। দু'চোখের অজস্র বারিধারায় সিক্ত হয়ে ওঠে অপরাহ্নের পার্কের মাটি। ঈশ্বর ঘুমিয়ে যায় সন্ধ্যার অন্ধকারে।