খিদিরপুর ডকের ভৌতিক রহস্য
শশীভূষণ
এক রবিবারে ডাকলেন তাঁর বন্ধু, জনান্তিক ও
অর্ণবকে। এমনি হয়, ছুটির দিনগুলিতে তিন বন্ধু এক
সাথে বসে আড্ডা জমান। আড্ডার সঙ্গে থাকে চা ও ভাজিয়া। আজও তেমনি আড্ডা চলছিল
বন্ধুদের। বিকেল হলেও চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। বাইরে শীতের দিন হলেও অকাল
বৃষ্টি ঝরছে, দিনে ঘরের আলো জ্বেলে চলছিল তিন
বন্ধুর খোশগল্প। এক সময় শশীভুষণ বলে উঠলেন, কলকাতার ডক, মানে খিদিরপুর, বুঝলি ?চল এক দিন ও দিকটায় ঘুরে আসা যাক !
জনান্তিক
বলে উঠলেন, আবার ভূতের সন্ধান পেলি নাকি ?
অর্ণব বলে
উঠলেন, আবার ভূতের সন্ধান ! আমাদের ভূতের হাতেই দেখছি মৃত্যু হবে !
শশীভূষণ
বললেন, চল তা হলে নবাবকে একবার দেখে আসি--না এখানে শনিবার বা অমাবস্যার প্রয়োজন নেই। নবাবের ছায়া
নাকি রাতের যে কোন সময় হঠাৎ এসে আবির্ভূত হয়। তবে তাঁর সবার সঙ্গে তো শত্রুতা নেই, যারা তাঁর বা ডকের ক্ষতি করেছে বা করতে চায় তার পেছনে নবাবের আক্রোশ দেখতে পাওয়া
যায়।
ঠিক হল, আগামী রবিবার ওরা বেরিয়ে পড়বে খিদিরপুর ডকের দিকে। এখানে ভয়ের জোরালো কিছু
নেই বটে, ইউ টিউবে হন্টেড কাহিনীর শেষ ভাগে সংক্ষিপ্ত ভাবে এখানকার ঘটনার কথা এভাবে বলা
হয়েছে--
কলকাতার
ডক বা খিদিরপুর ডক নির্মিত হয়েছিল নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহর সময় কালে। এই ডক
নির্মাণে নবাবের নাকি অনেক অবদান ছিল। দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে ব্যবসা
করার সময় তিনি ব্রিটিশদের দ্বারা চরম ভাবে নির্যাতিত হয়ে ছিলেন।
নবাবের
মৃত্যুর পর ডকের ব্রিটিশ ব্যবসায়ী এবং কর্মচারীরা ডক এলাকায় রোমিং (নবাবের
ছায়া হিসাবে পড়া) দেখেছে।
সে ছায়া নাকি ওয়াজিদ আলী শাহরই। নবাব তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ব্রিটিশদের
থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে প্রায় রাতেই নাকি ছায়ার মত এখানে ঘুরে বেড়ান।
এই স্থান
সম্পর্কে ভূতের ফলাও করে বলার মত ভয়ের বিশেষ কোন গল্প ছিল না।
তখন বেশি
রাত হয়নি, তিন বন্ধু খিদিরপুর ডকে এসে পৌঁছালেন। শশীভূষণ তার মোবাইল টিপে দেখলেন রাত
দশটা বাজে। দশটা থেকে
এগারোটা পর্যন্ত এখানে এই এক ঘণ্টাতেই হয়ে যাবে তাদের ভূত দর্শন পরিক্রমা। এর মধ্যেই ধরে নেওয়া
যাবে যে এখানকার ভূত বা ভৌতিক আবহাওয়ার কথা। গঙ্গা ঘাটের এ দিকটা ঝকঝকে আলোকিত, এত আলো ভূতরা সহ্য করতে পারে না।
--এই আলোতে ভূত থাকে? অর্ণব মুখ খুললেন।
--আমরা তা হলে ওই দিকটায় যাই, চল, শশীভূষণ আঙুল তুলে একটা অন্ধকার দিক দেখিয়ে বললেন। শশীভূষণ বন্ধুদের নিয়ে ডক
ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন নদীর কিনারায়। ডকের শেষ দিকে বিস্তৃত অনেকটা জাগা নিয়ে আলো-আঁধার
ছড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখানকার আলোকে অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে। অথবা এটাও হতে
পারে যে এ দিকের কিছু কিছু বাল্ব হয়ত খারাপ হয়ে আছে।
বাবা, চারদিকে কি ঘুটঘুটে অন্ধকার, অর্ণব এবার ভয় পেয়ে বলে উঠলেন।
জনান্তিক
বললেন, অন্ধকারেই তো ভূতের বাস, তুই তো জানিস ?
--কেন? আলোর মাঝেও তো আমরা ভূত দেখেছি, অর্ণব বলে উঠলেন।
--কিন্তু ভূতরা অন্ধকার পছন্দ করে, অন্ধকারে ওরা অনেকটা স্বাভাবিক ভাবে ঘুরে ফিরে বেড়াতে পারে, শশীবাবু বললেন।
ওঁরা ধীর
পায়ে এগিয়ে গেলেন, এখানে অন্ধকার আর আলো মিলেমিশে
আছে, তাই বুঝি এক অদ্ভুত আলোছায়া এখানে খেলা করে বেড়াচ্ছে ! এখানে ভৌতিক কিছু থাক বা না থাক, একটা ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। এক দিকে জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর অন্য দিকে স্বল্প আলো অন্ধকারের খেলা। অর্ণব
আর থাকতে পারলেন না, তিনি শশীভূষণ ও জনান্তিকে ঠেলে
দিয়ে ওঁদের দুজনের মাঝখানটায় নিজের স্থান করে নিলেন। শশীভূষণ বা জনান্তিক এ
ব্যাপারে কিছু বললেন না। ওরা বন্ধু অর্ণবের ভীতু প্রকৃতির কথা তো ভালো ভাবেই
জানেন। ধারে কাছে জেটির আবছা ছায়া পড়েছে, সেগুলো মাঝে মধ্যে ভয়ের উদ্বেগ করছে। সে ছায়াগুলি থেকে থেকে দুলে উঠছে। অর্ণব তা দেখে ভয় পেয়ে বলে উঠলেন, ওই দেখ, ওই দেখ, ছায়া নড়ছে !
জনান্তিকও
থমকে গিয়েছিলেন। শশী বাবু দাঁড়িয়ে পরক্ষণেই বলে উঠলেন, না রে, ভয়ের কিছু নেই, জেটি আর তার সঙ্গে দাঁড় করানো স্টিমারগুলির ছায়া এগুলি। জলের ঢেউ
ওগুলিকে সামান্য দোলাচ্ছে। আর তার জন্যই আমরা ছায়াগুলিকে নড়তে চড়তে দেখছি।
অর্ণবের
বিশ্বাস হল না, তিনি কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, আমার ভালো লাগছে না--চল, এবার চল--
--এই তো এলাম আমরা, শশী বলে উঠলেন।
জনান্তিক
বললেন, এখানে কিছু আছে বলে তো মনে হচ্ছে না--
ওরা এবার
ডকের দিকে এগিয়ে গেলেন। লোকজনের মধ্যে দু-তিনজন গার্ড ঘুরে বেড়াচ্ছে হবে। এ ছাড়া দু-একজন লোক এখানে চলা-ফেরা
করছিল। এখন জাহাজঘাটার ব্যস্ততা নেই, বরং তার উল্টোটা, মানে নীরবতা নেমে এসেছে। এক জন
গার্ড ওদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। শশী বাবু তাকে ডাক দিলেন উঠলেন। গার্ড এগিয়ে
এলো. বলুন ?
--আমরা এখানে একটু ঘুরতে এসেছি, শশীভূষণ বললেন।
--এত রাতে? প্রশ্ন করল গার্ড।
শশীভূষণ
কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই জনান্তিক বলে উঠলেন,আপনাদের এখানে ভূতের কথা
শুনেছিলাম।
গার্ড বলল, না, ভয় নেই, ও নবাবের আত্মা।
মাঝখান
থেকে অর্ণব বলে উঠলেন, তার মানে ভূত আছে ?
গার্ড বলল, হ্যাঁ, তবে ভয়ের কিছু নেই--
--তা হলে আজ আমরা দেখতে পাবো? জনান্তিক প্রশ্ন করলেন।
গার্ড বলল--তা বলতে
পারছি না, তবে আমরা প্রায় রাতেই একটা ছায়া দেখতে পাই--
শশীভূষণ
বললেন, শুনেছি ওটা নাকি নবাবের ছায়া ?
গার্ড বলল--আমিও
শুনেছি, তবে ছায়া দেখে কার ছায়া তা চেনা যায় না--
--দেখি, আমরা একটু ঘুরে দেখি, শশীভূষণ বলে উঠলেন।
গার্ড আর
কোন কথা না বলে চলে গেল।
তিন বন্ধু
আস্তে আস্তে হেঁটে চলেছেন। আর একটু এগোলে জোরালো আলোর জাগা এসে যাবে। এই ছায়া ছায়া
জায়গায় ছায়ার দেখা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না, ওরা ডকের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। রাত এগারটার কাছাকাছি হবে। হঠাৎ অর্ণব, গোঁ গোঁ, শব্দ করে উঠলেন। শশী দেখলেন, অর্ণব পেছন মুড়ে দেখতে গিয়ে কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছেন। তিনি বলে উঠলেন, কি হল অর্ণব ?
--ওই ওই? অর্ণব ভাল ভাবে কথা বলতে পারছিলেন না।
--কি? জনান্তিক প্রশ্ন করলেন।
--ছায়া, ছায়া--বলতে বলতে অর্ণব কেঁপে উঠলেন।
শশীভূষণ
দেখলেন, মাটিতে স্থির দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়া। সাধারণ ছায়া থেকে অনেকটা গাঢ়। প্রথমটা
মনে হল, হতে পারে সামনে ডকের আলো ওদের গায়ে এসে পড়েছে তাই পেছনে ওঁদের ছায়া পড়েছে।
কিন্তু ওরা তো তিন জন, তবে গাঢ় ছায়া একটা কেন ? ছায়ার দিকে তাকিয়ে তিনজন ঘুরে
দাঁড়ালেন। কোন অলৌকিক ছায়া বলেই মনে হচ্ছে ওঁদের। এমনি সময় স্পষ্ট ছায়ার হাত
দুটো নড়ে উঠলো। এবার ছায়ার মাথা এ দিক ও দিক হচ্ছে। না, ওঁদের ছায়া এটা হতে পারে না। হঠাৎ জনান্তিক ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন, কে ? কে আপনি ?
স্থির
হয়ে গেল ছায়াটা--আর সেটা নড়ছে চড়ছে না।
শশী বাবু
বলে উঠলেন, আপনি কি নবাবের ছায়া ? কে আপনি ? স্থির দাঁড়িয়ে আছে ছায়া, তার কোন উত্তর নেই। তারপর হঠাৎই
বন্ধুদের চমকে দিয়ে সে ছায়া ধীরে ধীরে ডকের দিকে চলতে লাগল। অর্ণব ভয় পেয়ে কেঁপে
উঠলেন। তাঁর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাবার আগে শশী ও জনান্তিক তাঁকে ধরে ফেললেন।
ব্যাস, আর সে ছায়া নেই ! অর্ণব সুস্থ হলে ওঁরা ডকের দিকে এগিয়ে গেলেন। সে ছায়ার সন্ধান আর তাঁরা পেলেন
না।
বন্ধুরা
ফিরে আসছেন। ডক পার হয়ে রাস্তায় উঠলেন ওঁরা। শশীভূষণ একবার পেছন ফিরে তাকালেন, না কিছু নেই, তবে ডকের আশপাশটা একেবারে
শুনশান। একটা গা-ছমছম অদ্ভূৎ ভয় শিহরণ ভাব ওঁদের মনকে রোমাঞ্চিত করে তুলল।