গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭

রুখসানা কাজল

চিরকালীন

ঘুঁটে বানানো গোবর কুড়ানি মেয়েটা পদ্মবিলের ধারে কাছেই চরে বেড়ায় সারাদিন। কাজলি ধবলীরা গোবর দেয় , পদ্মপাতায় জমা রাখে কুড়ানি মেয়ে। ক্ষুধায় পেট জ্বলে উঠলে পুরাণো পদ্মের ঘোট খুলে বিচি খায়। ঘোটগুলো কচরমচর খেয়ে ফেলে কাজলি ধবলী। কখনো বিলের জলে ইরি আটাশের ভাজা চাল গামছায় বেঁধে চুবিয়ে রাখে। ভিজে ফুলে উঠলে কাঁচা মরিচ ভেঙ্গে এ গাল ওগাল করে আস্তে আস্তে লালা মিশিয়ে খেয়ে নেয়। ও জানে যত আস্তে খাবে তত আস্তে আস্তে শেষ হবে খাবার । মাঝে মাঝে যকু দারোগা পেতল বাঁধানো লাঠি দেখিয়ে হুঁসিয়ার করে দেয়, অই ফুল ছিঁড়লি কিন্তুক ---- ফুল ও ছেঁড়ে না । তবে কোনো কোনো ভাইয়া আপু বেড়াতে আসে এখানে। তারা ফুল ছিঁড়ে ওকে পাঁচ দশ টাকা দিয়ে যায়। সেই টাকায় ও সালু মুদির দোকান থেকে এটাসেটা কিনে খায়।

ওরা থাকে যকু দারোগার পুরোন বাড়ির ভাঙা ঘরে। নতুন বাড়িতে দালান ঘর তুলে চলে গেছে যকু দারোগারা। মাঝে মাঝে কুড়ানির মার কাছে আসে । মাগরিবের আজান শেষে যখন প্রকৃতি থির ধরে থাকে সেই সময় মসজিদ ফেরত যকু দারোগা এসে বলে, কেমন আছিস কেংকু? ওরা মায়ে ঝিয়ে তখন ঘুঁটে তুলছে। মার একহাত বাঁকা বলে গ্রামের কেউ কেউ কেংকু বলে ডাকে। শেষ রোদ্দুরের গন্ধ ভাসা উঠোনের জামরুলগাছের নিচে যকু দারোগাকে তখন জিনের মত লাগে। কুড়ানির মনে হয় কোনো জিন মাথায় টুপি, সোনালি রঙ চশমা আর শাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে  যকু দারোগার চেহারা নিয়ে নেমে এসেছে জামরুলগাছ থেকে। 
  
 মা মাথায় ঘোমটা টেনে দেয়, ভাল আছি ভাইজান। পিতলের লাঠিটা ঘরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে যকু দারোগা বলে, ভালো আছিস। তা বেশ! চল তো ঘরে চল, দেখি কেমন ভাল আছিস।   কুড়ানি তখন একা উঠোনে ঘুঁটে তোলে। দু একটা আধকাঁচা জামরুলপাতা পড়ে থাকে উঠোনে। কাজলি ধবলি ঘুঁটে ঘরের চিলতে বারান্দায় বসে ডুবে যাওয়া সূর্য দেখে। ওদের চোখ ম্লান, ভেজা।  ঘুঁটে তোলা শেষ হলে কুড়ানি গিয়ে বসে থাকে কাজলি ধবলির পাশে। লাল রঙ ছড়িয়ে ডুবে যাচ্ছে সূর্য। মা বলেছিল, চাল ডাল আনিছি রে কুসুম। তোরে আজকে খেচোড়ি করি দিবানি। কুসুম খুশিতে লাফিয়ে উঠতেই মা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলেছিল, ডিম ভাজি দে খেচোড়ি খাতি কেমন লাগে রে কুসুমরাণি ? কুড়ানি জানে মা এতক্ষণ ভাল ছিল। এবার খারাপ থাকবে, থু থু ফেলবে হাজারবার। রান্নাঘরে ঢুকবেও না। এরপর চলে যাবে কুমোরপাড়া। সুবলকাকার দু একটা কাঁচা হাঁড়ি ভাঙবে। কতক্ষণ খিস্তি করবে। কাকা তুলি রেখে বলবে, আয় ক্ষেপি। কাছে এসে বস তো দেখি! এত ক্ষেপিছিস ক্যান !  কুড়ানির মা তখন কিচ্ছু বলতে পারবে না। কেবল মার খাওয়া  কাজলি ধবলির মত অবোধ চোখে জল নিয়ে চেয়ে থাকবে। সুবলকাকা একহাতে মার হাত জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে বুলিয়ে দেবে আদর। আর তখন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে মা। প্রকৃতি নড়েচড়ে জেগে উঠবে। ঘরের পেছনের বাবলা গাছ থেকে হুশ করে ধেয়ে আসবে বাতাস। সুবলকাকার বুড়ি কাকি, বাতের ব্যাথায় প্রায় অচল, মাকে দেখে ডাক দেবে, ও সুফি সুফিরে এড্ডু ধর দিকিনি মা। আলোডা জ্বালি দিয়ি আসি। 
 
কোনো কোনো দিন কুড়ানিও চলে আসে মার সাথে। সুবলকাকা ওকে বুকের কাছে ধরে রাখে। কিযে ভাল লাগে তখন । সন্ধ্যা উতরে গেলে এ শাক ও শাক, কচুর গোট, লতির তরকারির ঘ্যাট আর একটা ডিম চার ভাগ করে চারজনে খেয়ে বসে থাকে বারান্দায়। সুবলকাকা গান ধরে, দোলা, হে দোলা, হে দোলা, হে দোলা আঁকাবাঁকা পথে মোরা কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই-- বুড়ি কাকি খুনখুন করে কাঁদে, চেরডা কাল এমনি গেলো ! এমনি কাটিছে রাতদিন! ত্যাল আছে ত নুন নাই, নুন আছে ত পিন্দনের কাপুড় নাই---  

অনেক রাতে সুবলকাকার বুকের ভেতর থেকে ঘুমন্ত কুড়ানিকে ছিনিয়ে নিয়ে সুফি হিসহিস করে, কইছিলা দিন আসপে, আসপেই। আর আসিছে। মিথ্যুক কোহানকার!
সুবলকাকা উধাও হয়ে যায়। যকু দারোগার লাঠি সুবলকাকাদের উঠোনে ঝলকে উঠে, শালার কুমোরপাড়াই শ্মশান করে দেবো। চুতিয়া হারামির জাত। বন্ধুর বউয়ের সাথে আশনাই করো শালা। মুসলমানের দ্যাশে বসি মুর্তি গড়ি ভাত খাও, চেনো না আমারে!

এগিয়ে আসে জালাল মাষ্টার, চাচা ইডা কি কলেন আপনি ? তুই থাম । এই ঘটনা ইন্ডিয়াতে হলি দুডোরেই পোড়াইয়ে মারত । খবর পাস না বুঝি ? জালাল মাষ্টার একটু দমকা খায়। অশত্থের পাতার মত সুন্দর মুখ কেঁপে উঠে উত্তরের বাতাসে। সুবল পালের বুড়ি কাকির হাত ধরে দাওয়ায় বসিয়ে ফিরে আসে, ধর্ম ধর্ম করি মেলা অধর্মের খেলা খেলিছেন আপনারা । এবার থামেন কলাম চাচা।
যকু দারোগার দৃষ্টি পিছল খায়। তার ঘরেই বিভীষণ! নাকি সুবল পাল !


তাপসকিরণ রায়

মান্ডালার হ্যান্টেড কাহিনী--

ছায়াবৃত্ত


ঘটনাটা ছিল ২০০০ সালের। স্থান কাল ঠিক রেখে পাত্রকে একটু পালটে দিলাম মাত্র--
মধ্যপ্রদেশ জবলপুরের সাতপুলা ব্রীজ। দিবালোকে লোকজনের আনাগোনা চলতেই থাকে। ব্যস্ত রাস্তা। রাত নটার পর থেকে ধীরে ধীরে চহলপহল কমে আসে।
সেদিন রাত এগারটা ছিল। বেলা তিনটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত ডিউটি ছিল ধীর বাবুর। এমনি সময়ের ডিউটির শেষে তার সঙ্গী থাকে হরলাল। ওরা দু জনেই রাঞ্ঝি এলাকার। সাতপুলা ব্রীজ তাদের পেরোতে হয় না, গান ক্যারেজ ফ্যাক্টরির গেট থেকে বেরিয়ে কুয়াটার কিলোমিটার রাস্তা পার করতে হয়। তারপর টার্ন নিয়ে প্রায় পুল ঘেঁষে ওদেরকে ডান দিকের মেন রোড ধরে নিজেদের ঘর, রাঞ্ঝির  দিয়ে চলতে হয়।
ধীর বাবু আর হরলাল গান ক্যারেজ ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। সাইকেলেই দুজনের যাতায়াত। কিন্তু আজকের দিনটা ধীর বাবু একা। হরলাল আজ ছুটিতে। এমনটা আজই প্রথম। এই ধরনের নাইট ডিউটি ধীর বাবু মাস তিন ধরে করছেন। তিন মাস আগেই তিনি সুপারভাইজারের পোস্টে প্রমোশন পান। আর হরলাল অল্প বয়সের ছেলে। সে মাস চার আগে এই ফ্যাক্টরিতে মজদুর শ্রেণীর কাজে জয়েন করেছে।
অসুবিধা তো হচ্ছিলই ধীর বাবুর। একে তো রাত এগারটা বেজে গেছে তার ওপর সঙ্গের হরলাল আজ নেই। সাইকেলে একটু বেশী স্পীড দিয়েছেন তিনি। এখান থেকে কুয়াটার কিলোমিটার গেলে আসবে সাতপুলা ব্রীজ। সেখান থেকে রাস্তা বেশ চওড়া। একেবারে আশপাশে কোন লোকালয় নেই। কিছুটা দূরে আছে ছোট বস্তি এলাকা, সেখানে কয়েক ঘরের বাস।
ধীর বাবু জানেন, এ রাস্তায় জোরালো লাইট থাকে না।  আর দুশ মিটারের মত এগোলেই  পৌঁছবেন সাতপুলা পুলের কাছে। গান ক্যারেজ ফ্যাক্টরি থেকে সাতপুলা ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তাটুকু বেশী নির্জন। আধ আলো, আধ অন্ধকার রাস্তা।  রাস্তায় লাইট আছে তবে তত জোরালো নয়। এ রাস্তার এক পাশে গান ক্যারেজ ফ্যাক্টরির উঁচু লম্বা দেওয়াল অন্য পাশে পাতলা জঙ্গল। হ্যাঁ, জঙ্গলের দিক থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ কানে আসছিলো, আর মাঝে মাঝে জোনাকির আলো জ্বলছিল নিভছিল। ধীর বাবু বড় একাকীত্ব অনুভব করছিলেন সে সঙ্গে সামান্য হলেও ভয় ভয় ভাব লেগে ছিল তাঁর মনে। না, তিনি মনে করতে পারলেন না এই রাস্তার ব্যাপারে কোন দিন কারও কাছ থেকে কোন রকম বদনাম শুনেছেন বলে। কাজেই রাতের নির্জনতা আর একাকীত্বের ভয়টুকুই তাঁর মনে লেগে ছিল।
ধীর বাবুর হঠাৎই চমকে উঠলেন, একি তার পেছন থেকেই একটা কেমন ধরণের সাঁই সাঁই শব্দ আসছে না ! যেন বেশ স্পীডে একটা সাইকেল আসছে তার দিকেই। ধীর ঘাড় ফিরিয়ে তাকাবার চেষ্টা করলেন। চোর ডাকাত নয় তো ? কিংবা তার মতই একাকী পড়ে যাওয়া কোন ঘর ফিরতি যাত্রী ? পেছনের যাত্রী প্রায় এসে পড়ল বলে, তিনি সাইকেলে আরও একটু স্পীড নিলেন। সামনে তাকিয়ে দেখলেন, সাতপুলার রাস্তা দেখা যাচ্ছে কিন্তু সেখানেও এত অস্পষ্ট আলো কেন ? ওখানে তো বেশ জোরালো পাওয়ারের লাইট থাকে !
হ্যাঁ, আওয়াজে মনে হচ্ছে পেছনের সাইকেল আরোহী তার পাশটাতে এসে পড়েছে। একবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখবার চেষ্টা করলেন ধীর। মনের ভেতরে তাঁর একটু ভয় ভয় করছিলো বৈ কি ! ছায়া, একটা ছায়াই তার নজরে এলো। একটা লোক সাইকেল চালাচ্ছে বটে, কিন্তু এতটা ছায়া ছায়া তার শরীর মনে হচ্ছে কেন ? লাইট কম আছে ঠিকই কিন্তু একটা মানুষের পূর্ণ  আকৃতির ছায়া ছবিটুকু তো টের পাওয়া যাবে ! অথবা লোকটার সাদা বা অন্য রঙের পোশাক চোখে ধরা পড়ার কথা। না, ঠিক বুঝতে পারছিলেন না তিনি। ধীর বাবু এবার ধীর স্বরে বলে উঠলেন --কাঁহা জানা হায় ?
না, কোন উত্তর নেইচারদিকের স্তব্ধতা যেন আরও বেড়ে গেল। ধীর বাবু ভাবলেন, হয়ত তার গলার আওয়াজ ভয়ে ধীর হয়ে গিয়ে থাকবে, পাশের লোকটার কান পর্যন্ত তা পৌঁছাতে পারেনি হবে। এসে গেলো সাতপুলা ব্রিজ। ব্যাস, অনেকটা সস্তি পেলেন যেন তিনি, ডানদিকে মোর নিলেন, পুলের একদিকের প্রধান রাস্তা রাঞ্ঝির দিকে চলে গেছে। ধীর বাবুর হঠাৎ খেয়াল এলো যে স্ট্রীট লাইট জ্বলছে না। এমনটা তো হবার কথা নয়, পরক্ষণেই ভাবলেন, হতে পারে, কোন কারণে কারেন্ট চলে গেছে। পাশের লোকটা কথা বলছে না, তার পাশ দিয়েই সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। চলতে চলতে ধীর বাবু আর একবার ওর দিকে তাকাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এ কি ! এখনও একটা ছায়া ? চমকালেন ধীর বাবু। সাইকেলের ব্যালেন্স হারাতে হারাতে কোন মত তাল সামলালেন। দূরে চার পাঁচটা পোস্ট ছাড়িয়ে রাস্তায় লাইট আছে বলে মনে হল। দুটি সাইকেল সাঁই সাঁই পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে। যেন সাইকেল দৌড় প্রতিযোগিতা চলছেধীর বাবু ঠিক বুঝে গেছেন, ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু হবে। কোন ভৌতিক ব্যাপার নয় তো ? তাই তো ! আর একটু সামনে গেলেই পথের উজ্বল আলোয় তিনি এসে পড়বেন। আর পারছিলেন না তিনি, বেশ কিছু সময় ধরে যেন সাইকেলটাও জাম চলছে। এবার তিনি টের পেলেন, পাশের সাইকেলটা একটু পেছনে পড়ে গেছে। ব্যাস, হাঁপাতে হাঁপাতে লাইট পোস্টের তলে এসে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। আর তাঁর চলার মত ক্ষমতাই যেন ছিল না। পেছনের সাইকেলের শব্দ আর নেই। ধীর বাবু কৌতূহল বসে আরও একটু সাহস জুগিয়ে আর একবার পেছনের দিকে ফিরলেন। এবারের দৃশ্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীর কেঁপে উঠলএ কি দেখছেন তিনি ? তাঁর পেছনে হাত দশ পনের দূরে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে কালো ছায়াটা তার মাথা কোথায় ? তিনি স্পষ্ট দেখলেন, মুণ্ডু বিহীন একটা লোকের কালো ছায়া। সাইকেল হাতে তার দিকেই ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে ও পালাবার তাড়নায় ধীর বাবু খানিক সাইকেল হাতে নিয়েই ছুটে চললেন, তারপর পড়ি মরি করে আবার সাইকেলে চেপে বসলেন। আর তিনি পেছন দিকে তাকাবার সাহস করলেন না। তিনি নিজের মনে একবার আওড়ে নিলেনস্কন্ধকাটা !
ধীর বাবু সাইকেলের প্যাডেলে শরীরের সমস্ত জোর লাগিয়ে এগিয়ে চললেন রাঞ্ঝির দিকে।
                                                                                         
                                                                       





    

সপ্তাশ্ব ভৌমিক


উৎসারিত আলো

প্রসন্ননগর পাবলিক ক্লাবের হলঘরে 'রবীন্দ্র-জয়ন্তী' - অনুষ্ঠান চলছে। হঠাৎ করেই নকশাল নেতা চম্পকদা এসে লাঠির ঘায়ে রবীন্দ্রনাথের ফোটো ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিলেন। দর্শকরা পালাতে শুরু করল। প্রায় সকলেই নিমেষে হাওয়া। আমাদের শৈশবে এটাই খেলা হয়ে উঠল। ভাঙা টালি বা অ্যাসবেস্টসের টুকরো হত ফোটোর প্রতীক। তার মধ্যে কিছু টগর ফুল ছড়িয়ে দিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন। হঠাৎ করে একজন এসে সব ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেবে। কদিন পর নিজস্ব নিয়মেই এ খেলা বন্ধ হল। কিন্তু ফোটো ভাঙার স্মৃতি কেন যেন অটুট থেকে গেল। এখন আমি আর চম্পকদা দুজনেই জলপাইগুড়িতে থাকি। কিছুদিন আগে রূপ-মায়াসিনেমা হলের সামনে দেখা। ৬৫ বছরেও বলিষ্ঠ চেহারা। অকারণেই জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘চম্পকদা, তুমি রবীন্দ্রনাথের ফোটো ভেঙেছিলে কেন? চম্পকদা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘কিছু কি আর বুঝেশুঝে করেছিলাম। চারিদিকে ভাঙচুর চলছে, ভাঙলেই হিরো।বললাম এখন তোমার অনুতাপ হয় না। চম্পকদা বললেন – ‘একটুও না। আমরা তো দাদাদের কথা শুনে কম বয়সে অবুঝের মতো কাজ করেছিলাম। যখন ধান্দাবাজ নেতা, কোরাপ্টেড মন্ত্রী, আত্মপ্রচার-সর্বস্ব শিল্পী ঘটা করে রবীন্দ্র বন্দনা করে তখন কি আর কবির গায়ে চোট লাগে না’? 

আমি আর কথা বাড়ালাম না। রাতে বিছানায় শোয়ার একটু পরেই গোলমাল শুনে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি আলখাল্লা পরা এক বৃদ্ধকে অনেকে মিলে আঘাত করছে। হয়তো সমস্ত শরীর রক্তাক্ত। নির্বিকার বৃদ্ধ তবু গান করে চলেছেন – ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো। নিরাপদ দূরত্বে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকরা ফিসফিস করে বলছে – ‘এ অন্যায়, ঘোর অন্যায়। কিন্তু কোনো সরব প্রতিবাদ নেই। হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের আলো বৃদ্ধের মুখে পড়তেই আঁতকে উঠলাম। অবিকল রবীন্দ্রনাথের মুখ। এ সময়ে কাঁধে এক জনের হাতের স্পর্শ পেলাম। মুখ ফিরিয়ে দেখি চম্পকদা! আমার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে বললেন –‘ভয় নেই, আমরা আঘাত করে কিছু করতে পারিনি, ওরাও পারবে না। এ গান কিছুতেই বন্ধ হবে না।কথা শেষ হতেই ঘুম ভেঙে গেল।



হরপ্রসাদ রায়

অব্যক্ত

রবিবারের ট্রেনের কামরায় হঠাৎ দেখা কলেজমেট অর্ণব আর অন্বেষার। সময়টা হঠাৎ একযুগ পিছিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় যেন। নীরবতার কয়েকটা মুহূর্তকে ব্যস্ততায় ডিঙিয়ে অন্বেষাই প্রথম কথা বলে,
-তুমি?
-হ্যাঁ। তুমিও তো।
 
হাসে অর্ণব।
- একা?
-একাই।
বলে, আবার হাসে অর্ণব। অন্বেষাকে কিছু প্রশ্ন করার আগেই অন্বেষার প্রশ্ন
-কেন, বিয়ে করনি?
-না, পছন্দের কাউকে আর পাইনি তো! অর্ণব আবার হাসে।
-'আর' মানে! আগে তেমন কেউ ছিল নাকি?
 
ঘনিষ্ঠ কৌতূহলী চোখে তাকায় করে অন্বেষা।
-ছিল তো।
 
কে?
 
গলায় খননের গাম্ভীর্য।
-তুমিও চেনো তাকে।
 
কে?
উদ্গ্রীব কণ্ঠস্বর অন্বেষার।
 
-- ঠিক তোমার মতই দেখতে,
 
কথা কেড়ে নিয়ে অন্বেষা বলে
-ধ্যাৎ, মজা করছ।
-মনটাও একদম তোমার মত। আসক্তিহীন গলায় উত্তর অর্ণবের।
-তারপর?
 
-ব্যস্! বলা হয়নি।
 
ঠোঁটের কোনায় হাসি টেনে রাখে অর্ণব।
কয়েকটা মুহূর্ত কারো ইচ্ছে ছাড়াই যেন ঠোঁটে তর্জনী রেখে দেয়।
-তুমি? 
-বেশ আছি
অন্বেষা বলে।
-মানে?
-ওই তো, ভাল আছি! তাই বললাম।
-তোমার স্বামী?
-হয়নি!
ঠোঁটের কোণায় অভিমানের হাসি এঁকে দেয়।
-মানে?
 
-বলা হয়নি আমারও।
একটা ঝটকা দিয়ে গাড়ীটা থেমে যায়।
-ওহ্! বালিগঞ্জ? নামছি।
নেমে গেল অন্বেষা।
অর্ণব যাদবপুর নামবে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা অন্বেষাকে জানালার পিছনে ফেলে গতি নিল ট্রেনটা---
চলছে সেই স্বাভাবিক ছন্দেই।




আফরোজা অদিতি

অচেনা পথ তবুও

    মাঝরাত। সংজ্ঞা ফিরেছে রুণার। চারদিক চোখ ঘুরিয়েও বুঝতে পারলো না কোথায় আছে!  বুকের ওপর ভাজ করা ডান হাত ব্যথা করছে; পাশে রাখতে ঠাণ্ডা স্পর্শে গা শিরশির করে ওঠে। তেষ্টা পেয়েছে খুব। ঠাণ্ডা বাতাস লাগছে শরীরে। মেঝের ঠাণ্ডা,শরীরে ঠাণ্ডা বাতাস; এতো ঠাণ্ডা-শীত-শীত লাগছে কেন তা বুঝতে সময় লাগে ওর! দরোজা খুলে রেখে ঘুমিয়েছে ভেবে,মাকে ডাকলো, ‘মা,মাগো,দরোজা দিয়ে দাও না মা, আমি উঠতে পারছি না হাত ব্যথা করছে! খুব আলসেমী লাগছে মা; ও মা,শোন না। তুমি এসো না মা!’ এভাবে মাকে ডেকে গেল একনাগাড়ে; বারবার।
    ওর ডাকে সাড়া দিলো না মা;কোথায় গেল মা! ভাবতে ভাবতে বসতে গিয়ে বুঝতে পারলো পুরো শরীর জুড়ে ব্যথা। এতো ব্যথা কেন শরীরে!উঃ! বলে বুকের ওপর হাত রাখতে গিয়ে বুঝতে পারলো বুকে কাপড় নেই;পাশে হাত রেখে বুঝলো শক্ত মেঝে। খালি গায়ে শুয়েছে কেন? মেঝেতেই বা কেন?ভাবলো কিছুক্ষণ। কী হয়েছে মনে করতে পারলো না। মায়ের ওপর রাগ হলো। এইভাবে খালি গায়ে উদোম হয়ে শুয়ে আছে মেঝেতে আর মা ডাকেনি ওকে। মা তো এমন নয়! সব সময় খেয়াল রাখে;কেন এভাবে শুয়েছে?ঘরের বাতি নিভছে না জ্বেলছে? কিন্তু আজ কী হয়েছে মায়ের! আবার ডাকলো মাকে।মা, শোন,ও  মা, মাগো।
    এলো না মা। মায়ের ওপর অভিমানে ভাইকে ডাকলো, ডাকলো বোনকে। সবশেষে ডাকলো,    ‘বাবা, বাবাগো, ও বাবা। আমার তেষ্টা পেয়েছে, জল দাও।’ ওর বিশ্বাস ওর ডাকে কেউ না আসুক বাবা আসবেই, আসবেই বাবা। বাবার আদরের মেয়ে। প্রায়ই সকালে চা খেতে খেতে মা-কে ডেকে বাবা বলেন,  ‘আমাদের রুণা একদিন নামিদামি কেউকেটা হবে দেখবে। বড় লক্ষ্ণী মেয়ে।’কখনও বলে ওকে, ‘তোকে আমি ম্যাজিস্ট্রেট বানাবো রে। তুই সকল নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নিবি। কখনও পিছ পা হবি না।’
    রুণা চোখের জলে ডাকে, ‘বাবা, বাবা, বাবাগো।’ এলো না বাবা। কেউ এলো না যখন তখন দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদলো, অনেকক্ষণ কাঁদলো; কাঁদতে কাঁদতে হালকা হলে মনে পড়লো সব। কী ঘটেছে ওর সঙ্গে;বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে কান্না বন্ধ হয়ে গেল। জ্বলে উঠলো চোখ।
    ঘটনা মনে পড়লো; কয়েকদিনের বৃষ্টি থামলেও সকাল থেকে গুমোট ছিল আকাশ। চারদিক থইথই বন্যা। বন্যার জল ডুকেছে শহরে, জলাবদ্ধ শহর। কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি লক্ষ্য করে মা বলেছিলেন, সারারাত বৃষ্টি হয়েছে, এখনও গুমোট মেঘলা আকাশ; বৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া জলাবদ্ধতায় রিকশা পাবি না। আজ কলেজে যাস না।’ মাকে জড়িয়ে বলেছিল, ‘মা, ভেবো না, ঠিক যেতে পারবো, আবার আসতেও পারবো। ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে মা, না গেলে বুঝতে অসুবিধা হবে! তুমি চিন্তা করো না মা। নৌকা করে কিছুদূর গেলে ঠিকই রিকশা পেয়ে যাবো।’
    মায়ের বারণ না মেনে ভুল করেছে রুণা। কলেজে পৌঁছানোর পরেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। চার ঘণ্টা এক নাগাড়ে ঝরলো, তারপরে থামলো। ওদের ক্লাসটাও হলো না। বৃষ্টি একটু ধরে এলে পথে নামে। থৈথৈ রাস্তা। রিকশা নেই। কলেজে মেয়ে এসেছে কয়েকজন। যে কয়েকজন এসেছিল তারা অন্য এলাকার। চলে গেছে ওরা। রুণা অপেক্ষা করতে থাকে রিকশার জন্য; একা একা ভয় লাগে ওর। নির্জন রাস্তা; জল জমা রাস্তাতে ছপছপ শব্দে হাঁটতে থাকে। কিছুদূর হেঁটে একটা রিকশা পেয়ে উঠে পড়ে। চলেছে রিকশা; হঠাৎ খেয়াল হয় ভাড়া মিটানো হয়নি। ভাড়া মিটানোর কথা মনেও হয়নি, রিকশা পেয়েছে উঠে পড়েছে। খেয়াল হতে ভাড়ার কথা বলতে যাবে ঠিক তখনই থেমে গেল রিকশা।

    ‘তুমি থামলে কেন?’ওর কথা রিকশাওয়ালা গাছের আড়াল দেখায় আঙুল তুলে। রুণা ভাবলো রিকশাওয়ালা বুঝি প্রকৃতির ডাকে যাচ্ছে। একটু লক্ষ্য করলে বুঝতে পারতো ওর ধারণা কতো ভুল! বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে আবার। বিরক্ত লাগছে রিকশাওয়ালার ওপর। মায়ের রাগের কথা ভাবছে; মা খুব বকা দিবে। মায়েরা সব সময় ঠিক কথা বলে; মায়ের বারণ না শুনে খুব ভুল করেছে; নিজেকেই বকা দিতে ইচ্ছা করছে। রিকশাওয়ালা দেরি করছে কেন? কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে;বিপদের গন্ধ আসছে।‘এই রিকশাওয়ালা গেলে কোথায়...’ বলতেই লক্ষ্য করে আসছে রিকশাওয়ালার পেছনে আরও চারজন। ওরা কারা?

    ভয় পায় রুণা। তাড়াতাড়ি আসতে বলে রিকশাওয়ালাকে; আসে না সে, আসে ওরা চারজন। নাকে রুমাল চেপে ধরে। তারপর আর মনে নেই। প্রতিদিন পাশের বাড়ির শীলা আর ও আসে-যায় একত্রে। আজ শীলা আসেনি; ওর জ্বর। শীলার কথা মনে হতেই মনে পড়ে অমিতের কথা। অমিত বিসিএস দিয়ে কাস্টম্‌স অফিসার হিসেবে জয়েন করেছে। অনার্স শেষে বিয়ে হবে ওদের। বিয়ের কথা মনে হতেই ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। এই শরীর তো শরীর নেই; নষ্ট হয়ে গেছে। শরীর শেষ হলেও জীবন তো শেষ হয়নি। তাছাড়া রোমাঞ্চের কথা ভাবার সময় নয় এখন, এখন যুদ্ধের সময়। সে যুদ্ধের জন্য সময় এবং প্রস্তুতি দুটোরই প্রয়োজন;তৈরী হতে হবে ওকে।
    অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ায় রুণা। গায়ে কাপড় নেই। এদিক-ওদিক হাতড়ে ঘরের এককোণে খুঁজে পায় ছেঁড়াফাটা জামা-পাজামা-ওড়না। ওগুলো কোনমতে গায়ে পেঁচিয়ে পথে নামে। কোথায় ওকে এনেছে,কোথায় আছে অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবুও পায়ে পায়ে এগুতে থাকে।
    পথ যতো অচেনাই হোক,শরীর যতো ক্লান্ত,অবশ,এই অবস্থাতে পথ চলতে অসমর্থ হোক না কেন রাত শেষ হওয়ার আগেই ঘরে ফিরতে হবে-ই ওকে; যেভাবেই হোক।           











ব্রততী সান্যাল

স্বপ্নপূরণ
   

নাঃ এ
জীবনে আর কোন চাকরি পাবে বলে আশা করে না শুভ্র। খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র না হলেও মোটামুটি রেজাল্ট করে গুটিগুটি পায়ে কলেজের গণ্ডিটা তো ঠিকই পেরিয়েছিল। তারপর বেশ কয়েক বছর ধরে প্রায় রোজই দইয়ের ফোঁটা কপালে লাগিয়ে চাকরি খুঁজতে গেছে,কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভাগ্য প্রসন্ন হয় নি,আজকাল তো আর চেষ্টা করতেও ইচ্ছে করে না। দু-একটা টিউশনি আছে হাতে,ওই যা সম্বল!

-“কত কষ্ট করে,কত টাকাপয়সা খরচা করে, নিজের শখসাধ বিসর্জন দিয়ে ছেলেকে কলেজে পড়ালাম,অথচ সে এখনো একটা চাকরি জোটাতে পারলো না, কি মন্দ কপাল আমার!”,
বাবার এই সংলাপগুলো শুভ্রর আজকাল মুখস্থ হয়ে গেছে,খাওয়ার থালাটা একপাশে সরিয়ে মাথা নিচু করে উঠে পড়ে সে। মায়ের অসহায় ও করুণ মুখটা চোখ এড়ায় না শুভ্র, কিন্তু সে নিরুপায়, চুপচাপ খালি পেটে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।

দুই

চাকরি না পেলেও কবিতাটা মন্দ লেখে না শুভ্র,ইন ফ্যাক্ট,কাব্য চর্চা না করলে রাতে ঘুমই আসতে চায় না ওর। ফেসবুকে শুভ্রর কবিতা বেশ জনপ্রিয় একটা ছোটখাটো পেজও আছে ওর।

ফেসবুক থেকেই একটি প্রকাশনার সঙ্গে সম্প্রতি আলাপ হয়েছিল,ওরা তরুণ লেখকদের কবিতার বই প্রকাশ করছে,তবে বেশ কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে,যা শুভ্রর কাছে এই মুহূর্তে নেই।

শুভ্রর খুব ইচ্ছে,ওর একটা কবিতার বই বেরোক,জনগণ ওর কবিতা পড়ুক, ওকে চিনুক। লজ্জার মাথা খেয়ে বাবার কাছে টাকা চাইতে যায়,বাবা ঝেঁঝে ওঠে,
-“একটা চাকরি পাওয়ার নাম নেই,আবার বই প্রকাশের টাকা চাইতে এসেছো নির্লজ্জের মতো? আমার কত স্বপ্ন ছিল,তুমি বড় চাকরি করবে,গর্বে আমাদের বুক ফুলে উঠবে! সেই স্বপ্ন কি পূরণ করেছো তুমি? তবে কোন মুখে আশা করো যে আমি তোমার স্বপ্নপূরণ করবো?”
শুভ্র চুপচাপ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়,আজ সত্যিই কিছু বলার নেই ওর।

তিন

অবশেষে একটা চাকরি পেলো শুভ্র। ছোট চাকরি, মাইনে খুব বেশি নয়,তবু যেন আনন্দ বাঁধ মানছে না তার। অবশেষে বাবার স্বপ্নপূরণ তো করতে পেরেছে সে। ইন্টারভিউয়ের শেষে তাড়াতাড়ি বাড়ির পথে পা বাড়াতে থাকে, বাবা-মাকে সুখবরটা জানাতে আর যেন তর সয় না তার!

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ে,বইপ্রকাশের জন্য টাকা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ দুদিন আগেই অতিবাহিত হয়ে গেছে,এখন আর কোন উপায় নেই। মনটা যেন আবার নতুন করে ভেঙে যায় শুভ্রর। ঈশ এমন সুযোগটা হাত ফসকে গেল!

হঠাৎই বেজে ওঠে মুঠোফোনটা,স্ক্রিনে দেখে প্রকাশনার নম্বর। অবাক হয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সম্পাদক বলে ওঠেন,“টাকাটা পেয়ে গেছি আমরা,আপনার বই শীঘ্রই প্রকাশিত হবে!

শুভ্র যেন আকাশ থেকে পড়ে,হতবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
-“কে দিলো টাকা!?”
-“আরে আপনার বাবাই তো পরশু এসে দিয়ে গেলেন ! আপনি জানেন না?”,সম্পাদক মহাশয়ের উত্তর।

শুভ্রর চোখে জল এসে যায়। সত্যিই তো,বাবা-মা যতই বাহ্যিক অনাদর দেখান, তাঁরা কি কখনো সন্তানের স্বপ্ন অপূর্ণ রাখতে পারেন? আপন মনেই হাসতে থাকে সে, অবশেষে পিতাপুত্র দুজনেই পরস্পরের স্বপ্ন পূর্ণ করলো তবে!

ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী

বাদুড় পূর্ণিমা

এমনিতে সুব্রতর আটটা হয়ে যায় ফিরতে ফিরতে। টালিগঙ্গের অটো লাইন বড় থাকলে আরও দেরি  হয়। পার্ক স্ট্রীট থেকে মেট্রো করে সোজা চলে আসে টালিগঞ্জ (ত্রুটি মার্জনীয়, থুড়ি উত্তমকুমার, যদিও পার্ক স্ট্রীট মেট্রো স্টেশনের নতুন নামটা মনে পড়ছে না)। সুব্রত তারপর অটো নেয়, এবং অটোর সাথে সদ্য বেড়ে ওঠা মধ্যপ্রদেশ কে নিয়ে বাড়ি ফেরে। ফিরেই ব্যাগ, ট্যাগ  খাটে ছড়িয়ে জুতো দুমদাম খুলে সবাইকে উদ্ধার করে। প্রবল প্রতাপে জগৎ উদ্ধার করে পৈত্রিক তিনতলার বাড়িটিতে সে পদার্পণ করে। জলখাবার খেয়েই সোজা চলে যায় তার তিনতলার ঘরে। এখানে পাঠকের মনে অলীক কল্পনা হতে পারে যে সে বোধহয় নিজের স্টাডি রুমে যাচ্ছে। সুব্রতর সে সব অভ্যাস নেই। কেন যায়। কি জন্য যায় সেটা উহ্য থাক। বুদ্ধিমান পাঠকের জন্য  কিছু অংশ রাখতে হয়, সেটা মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হল সেই ঘরটি যেখান থেকে এই গল্পের সূত্রপাত (এতটা ভণিতা করার জন্য দুঃখিত; কিন্তু চরিত্র সম্বন্ধে একটু না বললে, আমাদের সুব্রতর প্রতি অন্যায় করা হত)।

২১/১০/২০১১

(পঞ্জিকা মতে এই দিনে আদৌ পূর্ণিমা ছিল কিনা আমি নিশ্চিত নই, তবে গল্পের খাতিরে গরু গাছে উঠতেই পারে)। যাই হোক ধরে নেওয়া যাক যে এই দিনে পূর্ণিমা ছিল। সুব্রত যথারীতি বাড়ি ফিরে হুঙ্কার টুঙ্কার দিয়ে সোজা তিন তলায় চলে যায়। গিয়েই বিপত্তি।   ঘরের পাশে...
পাশে ছিল ছাদ...
ছাদে ছিল চাঁদ ( তাও পূর্ণ )।
আর ঘরে ছিল বাদুড়। আলো জ্বালতেই সে বাদুড় আনন্দের আতিশয্যে ঘরময় ঘুরতে থাকে। তাতে সুব্রত ভীষণ ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে ওঠে। তার একাকীত্বের গোপন সংসারে কার এই প্রবেশ? তার মনের মধ্যে কেমন একটা ইয়ের সৃষ্টি হয়। কেমন যেন ব্যাপারটা - ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড় । কেমন কেমন করে উঠল।

ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...

সেদিন সুব্রত নেমে আসে। আর উপরে যায়নি সেদিন। পরেরদিন অবশ্য অফিসে গিয়ে একটা খচখচানি  তৈরি হয় । সহকর্মী জিতেন নাকি আগের দিন রাতে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। বেঁচে যায়, কিন্তু সাঙ্ঘাতিক রকম ভাবে আহত হয়।





১২/৫/২০১২

আগের ঘটনাতে এই কাহিনী শেষ হলে, এই কাহিনী হত না। আরেকটি পূর্ণিমার দিন। সুব্রতর মাথা থেকে পুরো ব্যাপারটা মুছে যায়। যাই হোক সেদিনও ছিল পূর্ণিমা। সুব্রত তিন তলায় গিয়ে দেখে একই উপস্থিতি। ইতিহাস বারবার ফিরে আসে।

ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...

এই বার সে বেশ ভয় পেয়ে যায়, বাদুড় উড়তে শুরু করলে তাড়াতাড়ি লাইট নিভিয়ে নিচে নেমে আসে। এবং কি আশ্চর্য পরেরদিন অফিসে গেলে বাড়ির  থেকে ফোন আসে, যে পিসিমার যায় যায় অবস্থা। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। পিসিমা অবশ্য যাননি, কিন্তু কেমন যেন একটা যোগসূত্র স্থাপন হয়ে গেছিল।

১৯/১২/২০১৩

সেদিনও... এই নিয়ে তিনবার।
রীতিমত আতঙ্ক নিয়ে সুব্রত ছাদ থেকে নেমে আসে।
সেই...।।

ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...

আবার সেই অফিসে গিয়ে শোনে পাড়ায় ভীষণ মারামারি হয়েছে, বোম পড়েছে। আর ছোট ভাইঝিটার হাতে ভীষণ লেগেছে।...
আর কি অপেক্ষা করছে? চাঁদ টপকে সুব্রত প্রশ্ন করে।

৭/১০/২০১৫


এই নিয়ে টানা চতুর্থ বার। সারা শরীর হিম হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। অদ্ভুত সেই দৃশ্য।

ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...
ছাদে চাঁদ, ঘরে বাদুড়...

পরের দিন সে অফিসে যেতে চাইছিলনা। বাড়ির লোকেরা তাকে জোর করে পাঠায়। অফিসে গিয়ে সে  বুঝতে পারে সবাই তার দিকে কেমন ভাবে দেখছে। সুব্রতর সারা শরীর ঘামতে থাকে। একটু পরে বেয়ারা এসে বলে যায় বড় সাহেব তাকে ডাকছে। সুব্রত স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার পা কাঁপছে, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। বড়বাবুর অফিস থেকে বের হবার পর সুব্রতর হাতে একটা চিঠি ভর্তি খাম ধরা ছিল। সুব্রতর পদোন্নতি হয়েছে। সবাই সুব্রতকে ঘিরে ধরে। ওরা বোধহয় আগের থেকে জানত।





জ্যোৎস্না রহমান

অন্তরালে

মেয়েকে স্কুল থেকে আনার পথে অটোতে উঠে ড্রাইভারকে বললাম...  আইবুড়ো মোড়ে নামিয়ে দেবেন।  পাশে বসে থাকা  মহিলা শুনে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন..   "ওই বাড়ির চার ভাইবোনের আজও কি বিয়ে হয়নি ?..  আমি বললাম..  'না ' শুনে..  অবাক হয়ে বললেন...  "সে কি! বড়োটার তো এই  পঞ্চান্ন বছর.. আমি আর ও একসাথে পড়তাম।" আমি কিছু না বলে মুচকি হেসে...  ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নেমে পড়লাম মেয়েকে নিয়ে। 

বাইরে  থেকে এসে..  খুব গরম লাগছিল..  তাই দখিনের জানলাটা খুলে দিলাম...  এই জানলাটি রজত খুলতে বারণ করে রেখেছে।  কারণ...  জানলা খুললেই আইবুড়ো বাড়ির অন্দরমহল দেখা যায়... যেখান থেকে  গালিগালাজ ভেসে আসে সবসময়।  কিন্তু আজ খুলতেই দেখি অন্যরকম আবহাওয়া...  সব ছুটোছুটি করছে আর   একটা অনুষ্ঠানের গন্ধ পাচ্ছি।  সব উৎসাহ দমন করে জানলাটা বন্ধ করে দিতেই কাজের বৌ ঘর মুছতে মুছতে জানালো...  " জানো বৌদি...  বুড়ো খোকনের আজ বিয়ে ।  যাক্ এতদিন পর ও বাড়ির আইবুড়ো বদমান টা ঘুচবে।  এরপর যদি বোন দুটোর বিয়ে  হয়...  ওদের বয়স তো প্রায় পঞ্চাশ হতে গেলো।  কে নেবে বলো দেখি!  তার উপর যা ঝগড়ুটে!"   আমি শুনে বকা দিয়ে বললাম..  " এসব ফালতু না বকে কাজে মন দাও। "  

মাসকয়েক পর বিকালে জানলাটা খুলে দাঁড়াতেই দেখি...  বৌটা একমনে কাজ করছে। মুখটা খুব মিষ্টি।  দেখে মনে হয়...  বছর কুড়ি   বয়স।  জানলা খুললেই...  ও আমাকে দেখে হাসে..  আর ওর চোখ মুখ দেখলে মনে হয়...  আমায় কি যেন বলতে চায়।  আজও দেখে তেমনি মনে হল।  আমি ইশারায় বাড়িতে আসতে বললাম।  ও খুব খুশি হয়ে ইশারায় বলল...  "আসছি"।  কিছুক্ষণ পর একটা কলসি নিয়ে বেরিয়ে এলো।  আমি বুঝতে পেরে জানলাটা বন্ধ করে সামনের বারান্দার গেট খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।  বৌটি..  এদিক ওদিক দেখে বাইরের গেট খুলে..  বারান্দায় এসে বসল।  তারপর কথায় কথায় যা জানতে পারলাম...  সেটা শুনে আমি ভীষণ রকম অবাক হলাম।  

বৌটির নাম স্বপ্না..  ভীষণ গরিবের ঘরের তিন নম্বর মেয়ে।  এর পরেও দুটো বোন আছে। বুড়ো হলেও দু'বেলা পেট পুরে খেতে তো পারবে...  এই আশায় তাকে এই বাড়িতে পাঠিয়েছে।  স্বপ্না ভেবেছিল...  কত বুড়ো তো বৌ এর সব চাহিদা পূরণ করে..  আর উনি তো মাত্র পঞ্চান্ন।  কিন্তু বিয়ের রাতে বুঝেছে...  এ বাড়িতে পেট পুরে খাওয়া ছাড়া..  দেহের কোনো স্বাদ মিটবে না।  বহু কান্নাকাটি করে..  নিজেকে বুঝিয়ে..  সংসারে গাধার মত খাটতে লাগল আর  ননদদের অত্যাচার সহ্য করে পড়ে রইল শুধু তিনবেলা খাওয়ার  জন্য।  একদিন ওর স্বামী মাঝ রাতে তার ছোট ভাই তপন কে ঘরে এনে..  ওকে ঘুম থেকে তুলে জানালো.. যত দিন তার পেটে বাচ্চা না আসে..  ততদিন মাঝরাতে তপন এসে তার পাশে শোবে।  সে ঘুম চোখে...  চুপচাপ বসে রইল..  আর ভাবতে থাকলো...  "এও কি সম্ভব!"  এভাবেই প্রতিরাতে একসাথে থাকতে থাকতে..  দুইজন দুজনকে ভালোবেসে ফেলে।  এদিকে পেটে বাচ্চা আসার পর থেকে..  তার স্বামী আর ওদের এক সাথে থাকতে দেয় না।  কিন্তু স্বপ্না  যে সত্যি তপন কে ভালোবেসে ফেলেছে।  এখন সে কি করবে ভেবেই পাচ্ছে না।

কিছুদিন  পর হঠাৎ মাঝ রাতে ওই বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পেয়ে...  
রজতকে ডেকে বললাম.. " একটু দেখবে কি হল ওদের বাড়ি "! শুনে আমায় ধমক দিয়ে বলল..  " ঘুমাও তো!  ওদের বাড়ি সব সময় এমন নাটক চলতেই থাকে। "  আমি ধমক খেয়ে শুয়ে পড়লাম।  পরের দিন কাজের বৌটা এসে জানালো...  " ও বাড়ির নতুন বৌ  স্বামীকে খুন করেছে।  রাতেই নাকি তাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।" শুনে মনে মনে ভাবলাম...  " শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার জন্য স্বামীকে খুন করল!"  

তিন মাস পর মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছি...  এমন সময় পথে স্বপ্নার  সাথে দেখা।  আমি না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলাম...  পিছন থেকে বৌদি বলে ডাক দিয়ে বলল...  " তুমিও আমায় ভুল বুঝলে! " কথাটা শুনে আর পা বাড়াতে পারলাম না।  পিছন ফিরে জানতে চাইলাম..  " কি এমন হল যে..  খুন করলে! "  শুনে ও কাঁদতে কাঁদতে বলল... "  আমি খুন করিনি।  সেদিন রাতে আমার ঘরে ঢুকেছিল তপন...  তখন ওর দাদা ওকে বাধা দেয়..  আর ঘর থেকে বার করে দিতে যায়।  কিন্তু চল্লিশ বছরের যুবকের কাছে ও পারবে কেমন করে..  সেও ধাক্বা দেয়..  ও সামলাতে না পেরে...  দেওয়ালে মাথা ঠুকে যায়।  যেখানে গাঁথা ছিল  লোহার হুক.. সেটা মাথায় ফুটে গেলে  রক্তে ভেসে যায় আর সাথে সাথে  অজ্ঞান হয়ে যায়।  অনেক চেষ্টা করেও আর জ্ঞান ফেরেনি।  ডাক্তার যখন এলেন...  তখন সব শেষ।  আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম...  "তাহলে পুলিশ তোমায় ধরল কেনো?"  ... স্বপ্না  হেসে জানালো... "আমার মত গরিব ঘরের মেয়েদের তো শুধু দু মুঠো ভাত হলেই চলে যায়..  তা সে জেলের ভাত হলে ক্ষতি কি!  আর তুমি বলো...  যাকে এত ভালোবাসি..  তাকে কেমন করে জেলে পাঠাই! " শুনে আমি জিজ্ঞাসা করলাম...  "তপন তোমার খোঁজ নিয়েছে? " স্বপ্না বহু কষ্টে চোখের জলকে দমন করে বলল...  "একটি   জেল খাটা মেয়েকে কখনও কি আর ভালোবাসা যায়?" আমি আর কোন কথা বলতে পারলাম না..  শুধু মাথায় হাত রেখে বললাম.. "ভালো থেকো।"


বৃহস্পতিবার, ১১ মে, ২০১৭

৬ষ্ঠ বর্ষ ১৩তম সংখ্যা ।। ১২ মে ২০১৭

এই সংখ্যায় ১০টি গল্প । লিখেছেন - সুবীর কুমার রায়, সৌমিত্র চক্রবর্তী, তাপসকিরণ রায়, উদয় চক্রবর্তী, নিবেদিতা পুণ্যি, তৈমুর খান, উত্তম বিশ্বাস, মৌমিতা ঘোষ, জয়িতা ভট্টাচার্য ও ব্রততী সান্যাল ।
     লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন

সুবীর কুমার রায়

একাল-সেকাল

ছেলের চাকরির জন্য তার মার্কশীট ও অ্যাডমিট কার্ডের কপির অ্যাটেষ্টেশনের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল তার চারিত্রিক প্রশংসা পত্রের। তাঁদের সময় তাঁরা এগুলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা কলেজের অধ্যক্ষকে দিয়েই করিয়ে নিতেন। কিন্তু অনেকেই জানালো যে এখন নাকি তাঁদের দিয়ে কাজটা করালে, গ্রহণযোগ্য হিসাবে বিবেচিত হয় না। কিন্ত ছেলের অসুস্থতার জন্য কাজটা সুদীপ বাবুকেই করতে হবে, আর হাতে সময়ও বিশেষ না থাকায়, ছেলের স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দিয়েই কাজটি করাবার মনস্থ করে ওর স্কুলে গিয়ে হাজির হলেন। সুদীপ বাবুর ধারণা কাজটা প্রধান শিক্ষককে দিয়ে করিয়ে নিতে তাঁকে বিশেষ কোন বেগ পেতে হবে না, কারণ ঐ স্কুল থেকেই তাঁর ছেলে অত্যন্ত ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি নিজেও তো ঐ স্কুল থেকেই একসময় পাশ করেছিলেন। স্কুলের সকলেই তাঁকে চেনেন, সম্মান করেন।

স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলে বেয়ারা জানালো যে প্রধান শিক্ষক একটা মিটিং-এ ব্যস্ত আছেন, তিনি যেন পরে আসেন। সুদীপ বাবু তাকে একটু জেনে আসতে অনুরোধ করলেন যে কখন তিনি আসবেন। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে তাঁকে প্রধান শিক্ষকের ঘরে যেতে বলায়, সুদীপ বাবু তাঁর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
ঘরে প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকরা ছাড়া আরও জনা পাঁচ-ছয় ব্যক্তি আলোচনায় ব্যস্ত। এদের মধ্যে একজনকে তিনি চিনতে পারলেন, তিনি স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে গিয়ে চার শত টাকাকে fore hundred লিখে হাসির খোরাক হয়েছিলেন। সুদীপ বাবুর উপস্থিতিতেও তাঁদের আলোচনা বন্ধ না হওয়ায়, তিনি তাঁর প্রয়োজনের কথা বলে কাগজগুলো প্রধান শিক্ষকের হাতে দিলেন। প্রধান শিক্ষক তাঁর অনুরোধ রক্ষা করে, তাঁর কাজটি করার অবসরে উপস্থিত সকলের বক্তব্য সুদীপ বাবুর কানে গেল।

স্কুলের একটি নবম শ্রেণীর ছাত্রের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার হওয়ায় অঙ্কের শিক্ষক মৃগেন বাবু তাকে গোটা কতক চড় কষিয়ে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখায়, অভিভাবকরা যারপরনাই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ। বেশিরভাগ শিক্ষক ও অভিভাবকরা এর তীব্র নিন্দা করে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় রীতিমতো তাঁকে ধমক দিচ্ছেন। পরিচিত ভদ্রলোকটি দীপ্ত ভাষায় জানালেন, যে মৃগেন বাবু তাঁর স্কুলের শিক্ষক হলে সরকারি নিয়মের বিরোধিতা করে ছাত্রের গায়ে হাত তোলার জন্য তিনি কী কী করতেন। সুদীপ বাবুর মনে হ’ল, তিনি বোধহয় কোন অভিভাবক অথবা এই স্কুল কমিটির সদস্য।
  
বৃদ্ধ মৃগেন বাবু, যাঁর হাত দিয়ে স্কুলের বহু ছাত্র অঙ্কে অসাধারণ সব মার্কস নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, ন্যায় বিচারের আশায় চুপ করে মাথা নীচু করে খুনের আসামির মতো বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখ দুটি চিক্ চিক্ করছে। শিক্ষিত, ভদ্র, নম্র, প্রধান শিক্ষকও বোধহয় ঐ প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মতো ডাকাবুকো না হওয়ায় আদালত অবমাননার ভয়ে অসহায়, নীরব।
 
কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এতদিন পরে সুদীপ বাবুর হঠাৎ বেত হাতে নবীন বাবুর মুখটা মনে পড়ে গেলো। অত্যন্ত বদ রাগি নবীন বাবু তাঁদের বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে সবাই ভয় করলেও, শ্রদ্ধা করতো শুধুমাত্র তাঁর ছাত্রদের আন্তরিক ভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য। একদিন ছুটির সময় শ্রেণী কক্ষে বেঞ্চ ভাঙ্গার অপরাধে পরদিন তিনি সুদীপ বাবুকে তিনি দোষী সাব্যস্ত করে ভীষণ ভাবে বেত্রাঘাত করেন। সুদীপ বাবু তাঁকে বোঝাবার সুযোগই পেলেন না, যে গতকাল তিনি স্কুলেই আসেন নি।

ঘটনার দিন দুয়েক পরে টিফিনের সময় তাঁকে দেখে সমস্ত ছাত্র ও শিক্ষকদের সামনেই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “আমি জানতাম না রে যে তুই সেদিন স্কুলেই আসিস নি। পরে শুনে আমি রাতে ঘুমোতে পারি নি। তুই আমায় ভুল বুঝিস না। রাগ করিস না রে, তুই আমার ছেলের মতো, তবু পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস”।
বিষণ্ণ মনে সুদীপ বাবু দ্রুত পায়ে বাড়ির পথ ধরলেন।




তাপসকিরণ রায়

মান্ডলার হান্টেড কাহিনী--

ওরা কারা !
(অলৌকিক, সত্য ঘটনা আধারিত)
                               

ভিলাই থেকে জবলপুরের দিকে ট্যাক্সি ছুটে চলেছে। ট্যাক্সিতে আমার মেয়ে, জামাই, ছেলে আর দুই নাতনী। তখন রাত প্রায় বারটার কাছাকাছি। ড্রাইভার পথ ভুলে শর্টকাট ছেড়ে লম্বা রাস্তা ধরে ছিল। ওরা তখন নয়ন পুরের কাছাকাছি, নয়নপুর মান্ডলা  জেলার এক তহসীল শহর। মানে, জবলপুর তখনও আড়াই শ কিলোমিটার দূরে। ওদের ট্যাক্সির পেছনে পেছনে নেভিব্লু রঙের একটা মিনি ট্রাক বেশ কিছু সময় ধরে পিছু পিছু আসছিল।   

হঠাৎ এক জাগায় ওদের রাস্তা ব্লক দেখা গেল ! সামনে রাস্তা জুড়ে উঁচু ঢাই মারা বালির স্তূপ। পেছনের গাড়িটাও দাঁড়িয়ে গেল। দেখা গেল, রাস্তার পাশে ডান দিক কেটে একটা কাঁচা অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তা চলে গেছে। অগত্যা ট্যাক্সি ঘুরিয়ে ড্রাইভার সেই কাঁচা রাস্তায় এসে নাবল।  
কাঁচা পথ ধরে গাড়ি চলেছে। এত সময় ট্যাক্সির সবাই হালকা ঘুম দিয়ে নিয়ে ছিল। এখন সবাই সজাগ। গাড়ি ধীরে ধীরে চলেছে। পেছনে নীলাভ গাড়িটাও আসছিল। কিন্তু এ কি ! এক গ্রামের কাছে এসে রাস্তা যে শেষ হয়ে গেল! ওদের সামনে ঘুমন্ত এক গ্রাম--একেবারে নিঝুম পড়ে আছে। গ্রামের এক পাশ ধরে কয়েকটি কবর চোখে পড়ল—সাদা বর্গাকৃতি স্মৃতিসৌধ। আবছা চাঁদের আলোয় সব কিছু দেখা যাচ্ছিল। চারদিক নিঃশব্দ—জনপ্রাণীর টু সাড়াটুকু নেই ! মনে হল কোন প্রাক ঐতিহাসিক কালের কোন মৃত গ্রাম ওদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে আছে।

ঠিক এমনি সময় হঠাৎই যেন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে এলো। শন শন হওয়া, ঝড় শুরু হয়ে গেল। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো। এদিকে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো সে সাথে বাজ পড়ার শব্দ হল । এবার কি হবে ? সবার মনে সে প্রশ্নই নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে দেখা গেল সেই কাঁচা রাস্তার ডান দিকে একটা ট্রাক ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। তার মানে ও দিকে আরও একটা রাস্তা আছে হবে। সেই রাস্তার কাছাকাছি এসে ট্যাক্সি দাঁড় করালো ড্রাইভার। হয় তো দেখে নিতে চাইল বাস্তবেই কোন রাস্তা আছে কি না। পেছনে নীল রঙের গাড়িটাও এসে দাঁড়িয়েছে। নীল রঙের গাড়িটা আসলে ছিল মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ভেন। 

ঝড় ঝাপটার মধ্যে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, মাঝে মধ্যে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে এক আধবার বজ্র পাতের আওয়াজ হচ্ছে। ঠিক এমনি সময় গুড় গুড় গুড় ভারী একটা আওয়াজ পেছন দিকের সেই মৃত গ্রামের দিক থেকে আসছিল। কিসের শব্দ শুরুতে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। ট্যাক্সি একটু সময় আগে ট্রাক নেমে যাওয়া রাস্তায় মোড় নিতে গিয়েও থেমে গেল। তখন পেছনের গুড় গুড় শব্দে বোঝা যাচ্ছিল কোন গাড়ি আসছে বলে। সেই আগত, অজ্ঞাত গাড়িটিকে পাস করে যাবার সময় দিয়ে থাকবে ড্রাইভার। খড়র খড়র খটারা গাড়ির শব্দ করে একটা এম্বাসেডর গাড়ি এসে থামল ট্যাক্সির ডান দিকের পাশটাতে। জামাই তখন তন্দ্রাতে ছিল,নাতনী দুজন তখন ঘুমিয়ে। মেয়ে, আমার ছেলে, আর ড্রাইভার এক সাথে ভয়ে আঁতকে উঠল পাশে এসে দাঁড়ান এম্বাসেডরের দিকে তাকিয়ে। গাড়িটার এ কি অবস্থা--সমস্ত গাড়িটা ভেঙ্গে চুরে দুমড়ে আছে !

গাড়ির ওপরে ছাদ নেই আর ওরা করা বসে আছে তার মধ্যে ? সবার শরীর সাদা ব্যান্ডেজে ঢাকা--পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা প্লাস্টারে মোড়া। সবার তখন পিলে চমকানো অবস্থা। ডাকাত ! এবার কি তবে ডাকাতের পাল্লায় পরেছে ওরা ? তা না হলে এমন পোশাক কেন ? পাঁচ পাঁচটা লোক বসে আছে এম্বাসেডরে, তাদের প্রত্যেকের চেহারা লম্বা-চওড়া, চোখ দুটো ছাড়া বাকি দেহ ব্যান্ডেজে একেবারে প্যাক করা!

ভয়ে ট্যাক্সির দর্শকরা বোবা হয়ে গেছে--স্বপ্ন আর বাস্তবতার এক মাখামাখি অবস্থা। শারীরিক অনুভূতি সবার মধ্যে যেন অনেক কমে গেছে। একদম সামনে ডান দিকের সিটে বসে ছিল আমার মেয়ে। ভয়ে তার মুখের কথা ফুরিয়ে গেছে, আমার ছেলে ড্রাইভারের বাম পাশে বসে, সে অজানা কোন আশঙ্কায় মুহূর্ত গুনে চলছিল--এই বুঝি কোন অঘটন ঘটে যাবে--এমনি অবস্থা। এ দিকে ঝড়জল, বিদ্যুৎ চমক, বজ্রপাত সব কিছু হয়ে চলেছে। জামাই পেছনের দিকে বামদিকের সিটে বসে--তাঁর ঘুমের ঝিম ঝিম ভাব ছিল—এ দৃশ্য-চমকের বাইরেই ছিল সে। নাতনীরা ঘুমে তখন অচেতন। ড্রাইভার নির্বাক, সেও ভয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তোবড়ান গাড়ি আর প্ল্যাসটার জড়ান তার পাঁচ আরোহীর দিকে। এমনি অবস্থায় একবার সেই অলৌকিক গাড়ির ড্রাইভার ওদের ট্যাক্সির দিকে মুখ ফেরালো। তার শুধু মাত্র দু চোখের অংশটুকু খোলা। এমনিতে চোখ দেখা যাচ্ছিল না, তাকাবার পরে মনে হল দুটো ঘোলাটে চোখ জ্বলে উঠে আমার নিভে গেল। আর কয়েক মুহূর্ত পর হুস শব্দ করে চোখের সামনে দিয়ে সে গাড়ি সামনের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল!

কিছু সময় সবাই স্তম্ভিত হয়ে ছিল। সম্বিত ফিরতে ট্যাক্সির ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ডানদিকে মুড়ে আগের চলে যাওয়া ট্রাকের পথ অনুসরণ করল। গাড়িতে বেশ স্পিড--এবড়ো খেবড়ো কাদা মাটির মেঠো রাস্তা ঘুরে শেষে আবার পাকা রাস্তায় গিয়ে উঠেছে। ভয়ে ভয়ে সবার চোখ বারবার ফিরে তাকাচ্ছে পেছনের দিকে, সেই তোবড়ানো এম্বাস্যাডার ওদের পিছু তো করছে না! না কাউকে দেখা গেল না, কেবল সেই নীল গাড়িটা তখনও পিছে পিছে আসছে। আর আশ্চর্য, আকাশে তখন একটুও মেঘ নেই, একটু আগে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত হয়ে গেছে কে বলবে ! পাকা রাস্তায় এসে কিছুটা ভয়ের জড়তা কাটিয়ে নেবার চেষ্টা করে মেয়ে আমার ছেলেকে ডেকে ভীত চাপা স্বরে বলেছিল, ভাই, দেখলি ? 
ভাই তখন ভয় পেয়েছে খুব, সে চাপা গলায় বলল, এখন কথা না--ড্রাইভারকে বলল, গাড়ি তেজ ভাগও ! 
জামাই তখনও বোধহয় ঘুমের মধ্যেই ছিল। ট্যাক্সি তখন খালি রাস্তা পেয়ে শ কিলোমিটার স্পীডে ছুটে চলেছে। পেছনের নীল গাড়ি তার চেয়েও বেশী স্পীডে ট্যাক্সিকে পাস করে আগে আগে ছুটছে। ব্যাস, এই পর্যন্ত ঘটনা।  

এখন প্রশ্ন হল--ওরা কারা ? সমস্ত শরীর ওদের প্লাস্টারে মোড়া কেন ছিল ? ওরা কি ডাকাত ছিল ? আতঙ্কবাদী ছিল ? ডাকু বা আতঙ্কবাদী হলে অমন ভাবে প্লাস্টারে সারা শরীর মুরে থাকবে কেন ? বেশী হলে চিনে নেবার ভয়ে মুখ ঢেকে আসবে। আর এম্বাস্যাডার তো ও রকম ভাংচুরের পর সচল থাকার কোন কথাই নয়! ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে একাকার--জড়ো বস্তুর মতই দেখাচ্ছিল ওটাকে। চলছিল, তাই গাড়ির আকৃতি ভেবে নিতে পেরেছিল সবাই। তাও আবার সে গাড়ির মাথার দিক নেই সব কটা লোককে সশরীরে দেখা যাচ্ছিল! তবে কি কখনও কোন দিন এখানে ভয়ঙ্কর কোন এক্সিডেন্ট ঘটে ছিল—যাতে কিনা ওই ড্রাইভার সহ ওই পাঁচজনই মারা গিয়েছিল! কি এর আসল রহস্য তা এখনও পর্যন্ত মনের মাঝে প্রশ্ন হয়েই থেকে গেছে--ওরা করা!