গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০১৫

প্রদীপ ভূষণ রায়

রঙবেরঙ 
    

  ঝোঁকের মাথায় কাজটা করে ফেলা ঠিক হয়নি । এখন রথিন বুঝতে পারে ‘ ভাবিয়া করিও কাজ’ কথাটা কতখানি সত্যি । অফিসেও কানাঘুষো ছিল যে কোনও সময়ে ভি আর এস আসতে পারে । আগুপিছু না ভেবে দুম করে সিদ্ধান্তটা না নিলেই ভালো হত । সেদিন তনিমা নাচতে নাচতে এসে বলল ওর কয়েকজন কলিগ গড়িয়ার কাছে যে নতুন নতুন ফ্ল্যাট হচ্ছে সেখানে এক চেনা জানা প্রমোটারের কাছে ফ্ল্যাট বুক করছে । প্রমোটারই নাকি ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে দেবে । গড়িয়া এখন দারুন জায়গা । মেট্রো রেল চালু হয়ে গেছে । গড়িয়া রেল স্টেশনও খুব কাছে । এছাড়া স্কুল কলেজ হাসপাতাল নার্সিংহোম বাস টার্মিনাস বাজার দোকান সবই কাছাকাছি ফ্ল্যাটটার । টু বেডরুম থ্রি বেডরুম সবরকমই ফ্ল্যাট আছে । তনিমা একদিন দেখতে গিয়ে একটা ফ্ল্যাটও পছন্দ করে ফেলেছে । দারুন পজিশন । দামও একটু সস্তা । তনিমা তো উচ্ছসিত । বারবার বলছে ‘ জানো কি সবুজ চারিদিকে । চোখ জুড়িয়ে যায় ।’ যে ফ্ল্যাটটা পছন্দ করেছে সেটা পুরোপুরি দক্ষিণ খোলা । একটা ব্যালকনিও আছে । চেয়ার পেতে ওখানে বসলে মনটা নাকি একেবারে শান্ত হয়ে যাবে । সব টেনশন পালাবে । বুক ভরে নেওয়া পরিস্কার বাতাস শরীরটাকে চনমনে করে তুলবে । দেরি করলে ফ্ল্যাটটা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে । প্রমোটার বলেছে মাস ছয় সাতের মধ্যে পজেশন দিয়ে দেবে ।

তনিমা তখন বলেছিল ‘ তুমি ডাউন পেমেন্টটা করে দাও আমি ই এম আই গুলো দিয়ে দেব । তোমাকে এ ব্যাপারে কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না ।’ চিন্তা তো আসবেই । রথিন ভেবে পায় না কোথা থেকে কীভাবে সব ম্যানেজ করবে । এত খরচ , নুন আনতে পান্তা ফুরোয় । এখনই এতগুলো ই এম আই টানতে হচ্ছে । ওয়াশিং মেশিন , ফ্রিজ, কালার টিভি ,ল্যাপটপ সবই তো ইনস্টলমেন্টে কেনা । এর ওপর ইন্সিওরেন্স , মেডিক্লেম , দেশের বাড়িতে বাবার কাছে টাকা পাঠানো ,সুমনের স্কুলের    খরচ ,লতিকা মাসির মাইনে সব মিলে একেবারে নাজেহাল অবস্থা । নেহাত তনিমা চাকরি করে তাই দুজনে মিলে কোনরকমে সামাল দিতে পারছে । আর জমানো টাকা বলতে তো পোস্টঅফিস আর মিউচুয়াল ফান্ডে ট্যাক্স সেভিংসের জন্য করা কিছু ডিপোসিট । প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে বাবার বাইপাস সার্জারির জন্য নেওয়া লোন এখনও কাটছে ।
তনিমার মতো রথিনেরও যে এরকম ইচ্ছে করে না তা নয় তবে সাহস পায় না । স্বপ্নটা মনের মধ্যেই আটকে থাকে । নইলে ভাড়া বাড়িতে কারই বা থাকতে ইচ্ছে করে । হাজারো নিষেধাজ্ঞা , বাড়িওলার খচখচানি অথচ সাত তারিখ হতে না হতেই দরজায় ঠকঠকানি ভাড়ার তাগাদা । চারপাশ বদ্ধ ইঁট কাঠ পাথরের মধ্যে দম যেন আটকে আসে । অফিস থেকে ফেরা ক্লান্ত শরীরটাকে টানতে টানতে ঘরের মধ্যে নিয়ে আসার পর আরও দম বন্ধ হয়ে যায় । নোনাধরা দেওয়ালে সাতজন্মে রঙ হয় না । দেওয়ালে নতুন করে প্লাস্টার করে রঙ করার কথা বললে বাড়িওলা বলে ‘ ওসব করলে ভাড়া আরও বাড়াতে হবে ।’ এমনিতে ভাড়া তো কম নয় । দুটো ঘর বাথরুম রান্নাঘর মাসে সাড়ে পাঁচহাজার টাকা বেরিয়ে যায় । ঠিকমত জল নেই রোজই লাইন খারাপ । একটা ভারি আছে রোজ দুবেলা জল দিয়ে যায় তাকেও মাসে পাঁচশ টাকা দিতে হয় ।

সরু গলির মধ্যে পুরোনো এই বাড়িটা পেয়ে একসময় বর্তে গিয়েছিল রথিন । এখন আর ভালো লাগে না । একটু বৃষ্টি হলেই গলির মধ্যে একহাঁটু জল । কেউ দেখার নেই । এইসব থেকে মুক্তি পাবার স্বাদ পেতেই অনেক হিসেব নিকেশ করে কিছু ডিপোসিট ভাঙ্গিয়ে টাকাটা জোগাড় করে ফেলেছিল । ভেবেছিল প্রমোটারের কথামত ছ’মাস বাদেই তো পজেশন পেয়ে যাবে । তখন তো আর ভাবেনি এইরকম ঝামেলা আসতে পারে । লোকাল কাউন্সিলার প্রমোটারের পেছনে লেগেছে । এর সঙ্গে লোকাল পার্টি পাড়ার মাস্তান সকলেরই দিন কে দিন দাবির বহর বেড়েই চলেছে । আজ এই চাই কাল ওই চাই । ফ্ল্যাটের প্ল্যান এখনও স্যাংশন হয়নি নানান বাহানায় আটকে   রয়েছে । ফলে ব্যাংক  লোনও হয়নি । গোদের ওপর বিষফোড়ার মত জমিটার এক শরিক কোর্ট থেকে ইনজাংশন বার করে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে । তনিমার তো মাথায় হাত বারবার জিজ্ঞাসা করে ‘ কি হবে গো ?’ সুমন বাচ্ছা ছেলে তারও প্রশ্ন ‘ বাবা আমরা নতুন বাড়িতে কবে যাব ?’ রথিন কোনও উত্তরই খুঁজে পায় না । টাকাটা এই মুহুর্তে ফেরত পাবারও কোনও আশা নেই । প্রমোটার একরকম হাত তুলেই দিয়েছে । প্রমোটারকে দোষ দেওয়াও যায় না । লোকটাকে খারাপ বলেও মনে হয়নি । অত্যন্ত ভদ্র এই লাইনে একেবারে নতুন । তনিমার অফিস কলিগরা এরমধ্যে নিজেরা বসে ঠিক করেছে প্রমোটার আর কাউন্সিলারকে নিয়ে লোকাল পার্টি অফিসে একটা মিটিং করবে । মনে হচ্ছে এই সবকিছুর পেছনে ওখানকার এক বড় নেতা কলকাঠি নেড়েছেন । তার ক্ষমতা নাকি এখন এমন লোকাল পার্টিও তার কথায় চলে । সামনাসামনি লোকটা ভালোমানুষের মুখোশ পড়ে থাকে । আড়াল থেকে চাপ দিয়ে টাকা  আদায় করে যার একটা অংশ নিজের পকেটে ঢোকায় বাকিটা পার্টি ফান্ড আর অন্যান্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় । এইভাবেই নিজের একতলা বাড়িটাকে চারতলা করেছে । মনে হচ্ছে প্রমোটারকে ওদের সঙ্গে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে আসতেই হবে ।
- কী ভাবছো বলোতো ? তখন থেকে দেখছি চোখ বুঁজে চেয়ারে বসে রয়েছো । শরীর ঠিক আছে তো ? হাতের সিগারেট তো পুড়তে পুড়তে ফিল্টারের কাছে এসে পড়েছে । ছুটির দিন বাজার করতে হবে । সব্জিপাতি মাছ সব বাড়ন্ত । কাল থেকে তো আবার দৌড় ।
তনিমার কথায় রথিন চোখ খোলে । সত্যিই সিগারেটের ছাইটা লম্বা হয়ে রয়েছে । তাড়াতাড়ি এ্যাসট্রেতে সিগারেটটা গুঁজে দেয় রথিন ।

- কত বাজলো বলোতো ? রথিন জিজ্ঞেস করে ।
- তোমার হাতেই তো ঘড়ি । ন’টা বাজে ।
- ওরে বাবা অনেক দেরি হয়ে গেছে । তাড়াতাড়ি ব্যাগগুলো গুছিয়ে দাও ।
- সব রেডি করাই আছে । তুমি কিন্তু বললে না কী ভাবছিলে ।
- ও কিছু না । রথিনের ছোট্ট জবাব ।
- আমি কিন্তু তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি কিছু একটা ভাবছ । ফ্ল্যাটের কথা ? দ্যাখো কিছু একটা হয়ে যাবে । আজকে তো রবিদাদের সঙ্গে ওদের বসার কথা ।
- দ্যাখো কি হয় । আমার তো মনে হচ্ছে অতগুলো টাকা জলে গেল ।
- না না , এখনই হতাশ হয়ো না । শুধুতো আমাদের একার নয় আমাদের অফিসের আরও দশজন এরসঙ্গে জড়িয়ে আছে । রবিদা ,শ্যামলদা, সুরজিতদা ওদেরও তো অনেক জানাশোনা পার্টির ওপর মহলে ,পুলিশে, প্রশাসনেও হাত আছে । মনে হয় না এত সহজে ওরা ছেড়ে দেবে ।
- সময়টা ভালো যাচ্ছে না তনিমা । এত খারাপ খারাপ খবর আসছে বুঝতে পারছি না কি হবে ।
- কেন আবার কী হল ?
- তোমায় বলেছিলাম না আমাদের অফিসে কানাঘুষো চলছে ভি আর এস আসতে পারে । এই সময় যদি চাকরি চলে যায় টাকা পয়সা যা পাবো সেগুলো ফিক্সড রাখলে ইন্টারেস্টের যা হাল হয়েছে সে তো কুলোবে না । সব চালাব কী করে । এই সময় তাই অতগুলো টাকা যদি জলে যায় কি করব ভেবে পাচ্ছি না ।
- দ্যাখো আমরাতো কোনওদিন কারও ক্ষতি করিনি । কারও ক্ষতি করার কথা চিন্তাও করি না । মানুষের ভালো-মন্দে জড়িয়ে থাকি । সকলের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলি । সামর্থ মত প্রয়োজনে সাহায্যও করে থাকি । নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য সাধ্যমত পালন করার চেষ্টা করি । ভগবান কি এতটা নির্দয় হবেন ? আমি বিশ্বাস করি না । বিপদে পড়লে তিনিই রক্ষা করবেন ।
- তোমার বিশ্বাসে তুমি শক্তি পাও । আমার বিশ্বাসের ভিতটা বড় দুর্বল । আমার চারপাশে শুধুই অন্ধকার । জানি না আলোর দিশা কোনদিকে পাব । আমার মনে হয় আমাদের মত মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখা বাতুলতা মাত্র । যাদের চাদর দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বেড়িয়ে যায় তাদের স্বপ্ন দেখাটা দূরাশা ছাড়া আর কিছু নয় ।
- তুমি এত হতাশ হয়ে পড়লে কি করে চলবে । নিজের শক্তির ওপর আস্থা তো তোমার বরাবরই
ছিল । হঠাৎ করে দুর্বল হয়ে গেলে কী করে ? এসব আগে থেকে ভেবে মন খারাপ করার কোনও যুক্তি নেই । আরে আমার তো চাকরিটা আছে যদি সেরকম কিছু হয়ও আমরা দুজনে ভেবে ঠিক রাস্তা বের করে ফেলব ।

রথিনের চোখে মুখে বিষন্নতার ছাপ । শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না । অফিসে অত্যধিক পরিশ্রম তারপর এইসব দুঃশ্চিন্তা । ভালো লাগছে না একদম ।
তনিমা বলে ওঠে ‘তাড়াতড়ি ফিরো । আজ আবার ডঃ মুখার্জীর সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে । আসার সময় অঞ্জলি মেডিক্যাল স্টোর্স থেকে তোমার স্টুল আর ব্লাড রিপোর্টটা এনো । ওরা তো আজকেই দেবে বলেছিল । ডাক্তারবাবুকে দেখাতে হবে ।’
রথিন বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে । রোদ্দুরটাও যা উঠেছে হাঁটতে একদম ইচ্ছে করছে না । একটা খালি রিক্সা আসছিল রথিন তাকে থামিয়ে রিক্সায় উঠে বসে ।


                                                  (দুই)

    দেখতে দেখতে আরও কয়েকটা মাস কেটে গেল । তনিমাদের ফ্ল্যাটের সমস্যা এখনও মেটেনি । নেতা ভদ্রলোকটি প্রমোটারের কাছ থেকে দশ লাখ টাকা চেয়েছেন । প্রমোটার এখনও রাজি হননি । প্রমোটার এবং তনিমার অফিস কলিগরা পার্টির আরও ওপর মহলে যোগাযোগ করেছেন যাতে নেতা ভদ্রলোকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় । এসব ছাড়াও তনিমা বড় চিন্তায় পড়ে গেছে রথিনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে । দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে রথিন । হিমোগ্লোবিন কমে যাচ্ছে , প্রায় সাতে নেমে   এসেছে । ডঃ মুখার্জী খুব একটা ভালো বুজছেন না । পেটের ব্যাথাটাও কমছে না । আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করেও যখন কিছু পাওয়া গেল না তখন এন্ডোস্কপি করে পাকস্থলির নিচে একটা ক্ষত পাওয়া গেল । ডাক্তারবাবু আবার ওখান থেকে স্যাম্পেল নিয়ে বায়োপ্সিতে পাঠিয়েছেন । আজকে রিপোর্টটা পাওয়া যেতে পারে । তনিমা ঠিক করে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে রিপোর্টটা নিয়ে আসবে । মনটা একদম ভালো নেই । রথিন আজকেও অফিস যায়নি । মাঝখানে জ্বর হয়েছিল । এত দুর্বল হয়ে পড়েছে দেখলেই বোঝা যায় । ছেলেটাকে নিয়েও চিন্তা ওরও জ্বর হয়েছিল । শুধু তনিমাই ঠিক আছে । বাড়ির এই অবস্থায় ক’দিন অফিস কামাই করতে হয়েছে । অফিসের কি অবস্থা কে জানে । অফিসে ঢুকতে ঢুকতে ঘড়িতে দেখে দশ মিনিট লেট । সবাই অবশ্য জানে ওর বাড়ির অবস্থার কথা । ওকে দেখে সবাই হই হই করে ওঠে । বড়বাবু থেকে সব কলিগরাই এগিয়ে এসে খবর নেয় । রনিতা এগিয়ে এসে বলে ‘ দারুন সুখবর আছে রে তনিমা ।’
- কি ব্যাপার রে ? তোর কোনও প্রমোশন হল নাকি ? তনিমা হেসে জিজ্ঞেস করে ।
- আরে না না । আমাদের সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে ।
তনিমা এবার বুঝতে পারে ওদের ফ্ল্যাটের সমস্যা মিটে গেছে । রনিতাও ওখানে ফ্ল্যাট নিয়েছে ।
- প্রমোটার কি টাকা দিতে রাজি হয়েছে ?
- না রে । ওপর মহলের চাপে ওখানকার নেতাটিকে পার্টি থেকে বহিস্কার করা হয়েছে । অনেকদিন ধরেই অনেক রিপোর্ট জমা পড়ছিল ওই নেতার নামে । পার্টির গোপন তদন্তে সবকিছুই ওই নেতার বিরুদ্ধে যায় । ওনার জন্য পার্টির খুব বদনাম হচ্ছিল । ওই এলাকা থেকে দ্রুত জনসমর্থন হারাচ্ছিল পার্টি । আর কাউন্সিলারকেও রেসিগনেশন দিতে বাধ্য করেছে ।
- কোর্টের ইনজাংশন ?
- সেটাও মিটে গেছে । পার্টির চাপে কেসটা উইথড্র করে নিয়েছে । তবে প্রমোটার তাকে কিছু টাকা দেবে বলেছে । আসলে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে বাপের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলেও মেয়ে তো । বাপের সম্পত্তিতে তারও অধিকার আছে ।

তনিমা যেন হাওয়ায় ভাসতে থাকে । ঈশ্বর ওর পাশে আছেন । ছটফট করতে থাকে কখন বাড়ি ফিরে রথিনকে খবরটা জানাতে পারবে । একটা স্বপ্ন সফল হতে চলেছে । কয়েকবার রথিনের মোবাইল নাম্বারে ডায়াল করে । সুইচড অফ । কে জানে হয়তো ঘুমোচ্ছে । ল্যান্ড লাইনটাও ক’দিন ধরে খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে । সারানোর নাম নেই । কবে রিপোর্ট করা হয়ে গেছে । লতিকা মাসি আছে বলে ভরসা । বাড়িতে তবু একজন বয়স্ক কেউ আছে । রান্নাবান্না ,সুমনকে দেখাশোনা সবটাই নিজের মতো করেই করে । যেন সত্যিই ওদের অভিভাবক । অবশ্য তনিমা রথিন ওরাও সম্মান দেয় । মাস পাঁচ ছয় আগে রথিনই দেশ থেকে লতিকা মাসিকে নিয়ে আসে । মাসির এক মেয়ে ছিল বিয়ে হয়ে গেছে । মাসির বর মারা যেতেই মাসি একেবারে অসহায় হয়ে পড়ে । দেওররা কেউ দেখে না । বাপের বাড়ির  অবস্থাও তথৈবচ । দিদির দায়িত্ব নিতে হবে বলে ভাইরাও কেউ পা মাড়ায় না এদিকে । এসব দেখেই রথিন মাসির কাছে প্রস্তাবটা দেয় । অবশ্য ওদেরও এরকম একজনের দরকার ছিল । দুজনেই চাকরি করে সুমনকে নিয়েই সমস্যা । একটা ভালো লোকও পাওয়া যায় না । এর আগেরজন তো সুমনের গায়ে হাতও তুলতো । লতিকা মাসি তো সুমনকে পেয়ে আনন্দে তদগদ । নিজের নাতির মতই যত্ন করে । তনিমা দেখেছে সুমনও খুশি । মাসির কাছেই চান করা খাওয়া ঘুম সবকিছু । তনিমা তো সুমনকে খাওয়াতে নাজেহাল হয়ে যেত । সুমনও ছুটছে পেছন পেছন খাবারের থালা হাতে তনিমাও । এখন কেমন মাসির কাছে গল্প শুনতে শুনতে চুপচাপ খেয়ে নেয় । ভাবনায় ভাবনায় সময়টা কেটে যেতে থাকে । কাজে কিছুতেই মন লাগছে না । ভেতর ভেতর একটা অদ্ভুত ছটফটানি মনটাকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছে না । বারবার ঘড়ির দিকে চোখ চলে যাচ্ছে । বড়বাবুর নজরে পড়তেই মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করেন ‘ কি রে ছটফট করছিস কেন ? বাড়ি যাবার তাড়া আছে ?
- না না । লজ্জা পেয়ে যায় তনিমা ।
- যা যা সাড়ে চারটে তো বাজল । বাড়ি যেতেও তো দু’ঘণ্টা লাগবে । চলে যা আমি সামলে নেব ।
তনিমা যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেল । পেটের ভেতরটা ফুলে উঠছে । যতক্ষণ না রথিনকে সুখবরটা শোনাতে পারছে শান্তি নেই । উড়তে উড়তে বাড়ি ফেরে তনিমা । সন্ধের নরম কালো চাদরটা নেমে এসেছে প্রায় । লতিকা মাসি দরজা খুলে দেয় । সুমন লতিকা মাসির আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে । তনিমা ব্যাগ খুলে ক্যাডবেরিটা সুমনকে দিয়ে কপালে একটা চুমু খায় । জিজ্ঞেস করে ‘ লক্ষ্মী হয়ে ছিলে তো ?’ সুমন ঘাড় নাড়ে ।
- বাবা কোথায় ? কি করছে ?
- বাবা তো ঘরে শুয়ে আছে ।
তনিমা ঘরে ঢোকে । ঘর অন্ধকার দেখে বলে ওঠে ‘ কি গো লাইট জ্বালোনি কেন ? অন্ধকার করে শুয়ে আছো । শরীর খারাপ লাগছে ?’
তনিমা লাইটের সুইচটা অন করে । ঘরটা আলোয় ভরে যায় । রথিন কপালের ওপর হাতটা আড়াআড়ি রেখে শুয়েছিল । তনিমা রথিনের পাশে বসে কপাল থেকে হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে ‘ জানো দারুন সুখবর আছে । আমাদের স্বপ্নটা সফল হতে চলেছে । ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন । ফ্ল্যাটের সমস্যাটা মিটে গেছে । প্রমোটার বলেছে মাস ছয়েকের মধ্যে পজেশন দিতে পারবে । কি দারুন খবর না ?’
রথিনের বিষন্ন মুখ দেখে অবাক হয়ে যায় তনিমা । প্রশ্ন করে ‘ তুমি খুশি হলে না ?’
- আমার খুশি হওয়া না হওয়ায় এখন আর কিছুই এসে যায় না তনিমা । আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে । আমার চারপাশে এখন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই ।
- কি বলছ তুমি ! এরকম ভাবে ভাবছোই বা কেন ?

রথিন উত্তর দেয় না , হাত দিয়ে টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করে । তনিমা একটা খাম দেখতে পায় টেবিলের ওপর রয়েছে । তনিমা খামটা তুলে নেয় । যে রিপোর্টটা তনিমার আনার কথা সেটা রথিন আগেই এনে রেখে দিয়েছে । খামটা খুলে রিপোর্টটা বার করে । লেখাগুলো পড়তে একটুও অসুবিধা হয় না তনিমার । পরিস্কার ভাবে লেখা ‘এডিনোকারসিনোমা’ । ঘামতে থাকে তনিমা । ভীষণ গরম   লাগছে । সারা শরীরে কেমন এক অদ্ভুত অস্বস্তি । জানলাগুলো খোলা তো ! দম বন্ধ হয়ে আসছে   যেন । ধপ করে বসে পড়ে চেয়ারের ওপর । চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে ওঠে ‘ পাখাটা বাড়িয়ে দাও ।’
তনিমার বন্ধ চোখের সামনে তখন শুধু লাল হলুদ নীল সবুজ রঙগুলো ছুটে বেড়াচ্ছে ।

(এই লেখকের গল্প 'বদল' পড়ুন এই লিঙ্ক'এ http://galpogucchho.blogspot.in/2015/04/blog-post_96.html

                                            


             
     

             

মানসী চট্টোপাধ্যায়

প্রতিদান

সুমনবাবু আর তপতী সল্ট লেকে তাঁদের ছোট্ট সুন্দর বাড়িতে থাকেন, একমাত্র ছেলে অসীম কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এখন অস্ট্রেলিয়ায় ভাল চাকরী করছে। কখন ছেলে ফোন বা স্কাইপ-এতে কথা বলবে তার জন্য দুজনেই সারাটা দিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। ছেলের চাকরীর ক্ষেত্রে কোন সম্মান লাভ, একটু উন্নতি বা সে দেশের কত রকম চমকপ্রদ ঘটনা ও খবর শোনেন তাদের আদরের বাবাই-এর মুখে। তারপর সেই সব সংবাদ আরও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তাঁদের সোসাইটির চেনা-পরিচিত বন্ধু ও আত্মীয়দের কাছে বলে পরম তৃপ্তি পান। প্রতিদিন বিকালে সুমনবাবু আর তপতী বেড়াতে বেরোন, হাঁটতে হাঁটতে কত গল্প আর কত না ছোট ছোট স্বপ্নের জাল বোনেন দুজনে, বেশীর ভাগই বাবাই-কে নিয়ে। এই ভাবেই সুখের স্বপ্নে বিভোর হয়ে দিন কাটছিল তাঁদের। বছর ঘুরতেই অসীম দশ দিনের ছুটিতে বাড়ি এলো। কত রকম যে উপহার এনেছে! শুধু বাবা-মার জন্যই নয়, মামা, মাসী কাকা পিসি সবার জন্যই কিছু না কিছু, কারো কথাই সে ভোলেনি। তপতী আনন্দে ডগমগ হয়ে সবাইকে ডেকে ডেকে সেগুলো দিয়ে বললেন, –- দেখেছো আমার বাবাই বিদেশে এত বড় চাকরী করলেও তোমাদেরও কেমন মনে রেখেছে! ও আমার হীরের টুকরো ছেলে। তপতীর কথায় তাঁরাও একবাক্যে সায় দেয়, উপহার পেয়ে সকলেই খুব খুশী। --- কাদের ছেলে দেখতে হবে! দিদি, তোমাদের মতই মন পেয়েছে বাবাই, ছোট জা বলল। --- বৌদি, তুমি যেমন সবার প্রতি কর্তব্য করতে ভোল না, বাবাইও সেরকম হয়েছে, ননদ বলল, এবার ওর একটা বিয়ে দাও। --- আরে সে তো আমি আর ওর বাবা কবে থেকেই বলছি, তপতী ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলেন, তা সে শুনলে তো আমাদের কথা! বিয়ের কথা বললেই বলে, আগে তোমাদের সুখী করি, তারপর ওসব ভাবব। খাওয়া-দাওয়া, বেড়ানোর মধ্যে দিয়ে দশটা দিন কোথা দিয়ে কেটে গেল। অসীম ফিরে গেল তার কর্মক্ষেত্রে। আবার আগের মতই দিন কাটছে। বিকালে বেড়াতে বেরিয়ে ছেলের বিয়ে নিয়ে কথা হয় দুজনে। বিয়েতে কেমন জাঁকজমক হবে, কাকে কাকে নিমন্ত্রণ করা হবে, বিয়ের আগে বাড়িটা কি ভাবে সাজানো হবে এই সব কত পরিকল্পনা! এই নিয়ে দুজনে ঝগড়াও লেগে যায় বেশ। --- আমার ছেলে আমি যা বলব সেটাই হবে বুঝলে! সুমন বলেন। --- আরে রাখো তো! বাবাই আমি যা বলব সেটাই করবে, তপতী ঘাড় বেঁকিয়ে উত্তর দেন, ছেলেবেলা থেকেই ও আমার ন্যাওটা, তোমার কাছে তো ঘেঁষতোই না। মা ছাড়া সে কিছু জানেই না। --- আরে কার ছেলে সেটা ত দেখো! সুমনও ছাড়বার পাত্র নন। বাপ কা ব্যাটা ---বুঝলে!

এই ভাবে নানা সুখের স্বপ্ন দেখতে দেখতে এক সময় প্রৌঢ় দম্পতির ঝগড়ার সমাপ্তি ঘটে। আর একটা বছর ঘুরতে চলল। --- এবার বাবাই এলে ওর একেবারে বিয়ে দিয়ে পাঠাব, তপতী বলেন, একা একা থাকে, কি যে খায় কে জানে! --- আমিও ভাবছি ওকে জিজ্ঞেস করে এবার কাগজে পাত্রীর জন্যে বিজ্ঞাপন দেব। সুমনবাবু হেসে বললেন। --- সেই ভাল গো, আজ যখন রাত্রে ফোন করবে আমিই না হয় জিজ্ঞেস করে নেবো। তপতীর মুখে তৃপ্তির আলো খেলা করে, মেয়ে কিন্তু আমি পছন্দ করব, বাবাই আমার পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করবে দেখ।

কিন্তু সেদিন কোন ফোনই এলো না অসীমের। হয়তো কাজের চাপে বা ফোনের গণ্ডগোল হবে! পর পর সাত দিন কেটে গেল।, সুমনবাবু অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারলে না। উৎকণ্ঠায়, দুশ্চিন্তায় দুজনেই অস্থির, খাবার মুখে রোচে না, ঘুম নেই চোখে। হোয়াটসআপ-এ একটা মেসেজ এল শুধু – ‘ এবার আমি যেতে পারছি না। অফিসে কাজের খুব চাপ, এখন যেখানে আছি, সেখান থেকে ফোন করার অসুবিধা --- পরে জানাব সব।তপতী আর সুমনবাবুর খুব মন খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু কিছু তো করারও নেই! এখন বাবাই-এর উন্নতির সময়, আর কতই বা বয়স! বিয়ে না হয় কটা দিন পরেই হবে। --- এই সব ভেবে মনকে প্রবোধ দিলেন দুজনে।

সপ্তা খানেক পরে এক সকালে তপতী রান্না ঘরে ব্যস্ত, অসীমের ফোন এল। সুমন ধরলেন, অন্য দিকে ছেলের গলা। –-- বাবা, তোমাদের ইচ্ছা পূরণ করতে বিয়েটা করেই নিলাম, কি খুশি হয়েছো তো এবার! সুমন উত্তর দেবেন কি! শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা হিমজলের স্রোত নেমে গেল। অসীম আবার বলল, এখানকারই মেয়ে, আমার কোলীগ, বিদেশী হলেও খুব ভাল মেয়ে। দেশে ফিরে সব আত্মীয়-বন্ধুদের খুব বড় করে পার্টি দেব, মাকে বোল। তপতীকে কি করে বলবেন এটা সুমন! সে যে ভীষণ কষ্ট পাবে শুনলে! একটু ধাতস্থ হয়ে শুধু বললেন, -- ভাল করেছিস, সুখী হ তোরা।

ফোনটা কেটে গেল, সুমনবাবু চুপ করে বসে ভাবতে লাগলেন স্ত্রীর কথা, তার এত দিনের আশা, কল্পনার প্রাসাদটা যেন এক নিমেষে তাসের ঘরের মতই ভেঙে পড়ল! রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে তপতি স্বামীকে বিমর্ষ ভাবে বসে থাকতে দেখে চিন্তিত গলায় বলেন, এভাবে বসে আছো কেন গো? শরীর খারাপ লাগছে! ডাক্তার ডাকবো? বাবাইকে খবর দেব? --- না না, সে রকম কিছু নয়, সুমন বললেন, এই গরমে একটু --- ও কিছু না। স্ত্রীকে খবরটা দিয়ে আর কষ্ট দিতে চাইলেন না তিনি। অন্য দিনের মতই বিকালে স্বামী-স্ত্রী বেড়াতে বেরিয়েছেন, তপতী নিজের মনেই কত কথাই বলে চলেছেন, সবই তাঁর আদরের বাবাইকে নিয়ে। তাঁর কোন কথাই কিন্তু আজ সুমনবাবুর কানে যাচ্ছে না, চুপচাপ গম্ভীর মুখে পাশে পাশে হেঁটে চলেছেন। তিনি শুধু ভাবছেন, তপতী যে এত বড় মুখ করে সোসাইটি আর আত্মীয়স্বজনদের কাছে ছেলের কথা বলে গর্ব করে, এই ঘটনা জানাজানি হলে কি হবে! সুমনবাবুর সেই রাত্রেই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হল। প্রতিবেশীরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নামকরা নার্সিং হোমে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ডাক্তাররা সে রকম কোন আশার কথা শোনাতে পারলেন না, একটা দিক প্যারালাইজড হয়ে গেছে, কথাও বলতে পারছেন না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। অসীমকে সেই রাত্রেই জানানো হয়েছে, সেও তার পরের দিন ছুটে এল কলকাতায়। ছেলেকে দেখার পর দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল সুমনবাবুর চোখ থেকে, তারপরেই সব শেষ। তপতী এর মধ্যে ওর বিয়ের কথাটা তুললেন না দেখে অসীম বুঝে গেল, বাবা খবরটা মাকে দেননি, তার মনের চাপা অস্বস্তিটা কমে গেল, সেও আর কথাটা তুলল না। সুমনবাবুর পারলৌকিক কাজ শেষ হলে অসীম মাকে বলল, মা, আমি তো আর বেশিদিন কাজ ফেলে এখানে থাকতে পারবো না, সামনেই একটা বড় প্রমোশন হবে আমার, অনেক দায়িত্ব, এদিকে তোমাকেও এখানে একা ফেলে যেতে মন চাইছে না। --- আচ্ছা, তুই যা তাহলে, আমি একাই থাকতে পারবো, ভাবিস না। --- না মা, সে হয় না, অসীম জোর দিয়ে বলল, দরকার হলে আমি ওখানের চাকরি ছেড়ে দেব, কিন্তু তোমাকে একা রেখে কিছুতেই যেতে পারব না। --- দূর বোকা ছেলে! এমন সোনার চাকরী কেউ বুড়ি মায়ের জন্যে ছাড়ে! আমি আর কদিন! --- ও রকম বোল না তো মা! আচ্ছা মা, তুমি একা আর এখানে থেকে কি করবে? তার চেয়ে তুমিই চল না আমার সঙ্গে ওদেশে, এখানে আমাদের তো পিছুটানও তেমন কিছু নেই। কলকাতার এই বিশ্রী পরিবেশ, আর ওখানে যেমন সুন্দর জায়গা, তেমনি কত আনন্দ আর সুখ! --- না রে বাবাই, তোর বাবা আর আমি কত স্বপ্ন আর সাধ নিয়ে, কত প্ল্যান করে এই বাড়িটা করেছিলাম, আমি চলে গেলে কে এটা দেখবে বল? বেদখল হয়ে যাবে যে! --- সেটাই তো আর কষ্টের মা! বাবার স্মৃতি ধরে বসে থাকলে তুমি শুধু দুঃখই পাবে। মানুষটাই যখন চলে গেল, এই সম্পত্তি আঁকড়ে থেকে কি করবে বল! তার চেয়ে এসব বিক্রি করে এখানকার পার্ট চুকিয়ে চল --- যে কটা দিন বাঁচবে, একটু সুখে বাঁচবে, জীবন তো একটাই মা। আত্মীয়স্বজন যারা ছিল তারাও অসীমের কথায় সায় দিল। বলল, ও তো বেশ ভাল কথাই বলছে, ওর কথা ফেলো না তুমি। ঐ রকম সোনার টুকরো ছেলে তোমার, তোমাকে রাণী করে রাখবে ঠিক। তপতী শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। বাড়িটা বিক্রি করে, আর বাবার জমানো যা কিছু ছিল সব টাকা এক করে এক কোটির বেশী টাকা পাওয়া গেল। অসীম মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে সব টাকা বিদেশী ব্যাঙ্কে লেনদেনের সুবিধার জন্য নিজের একাউন্টে জমা করে ঝাড়া হাত পা হয়ে অস্ট্রেলিয়ার টিকিট কাটল। বেশি লটবহর না বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু জিনিস সঙ্গে নিয়ে এক ভোরে মা কে এ.সি ট্যাক্সি তে চড়িয়ে এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছাল। ফ্লাইটের অনেক দেরি আছে, মাকে এক জায়গায় বসিয়ে অসীম বলল, মা, এখানে বস তুমি, আমি টিকিটটা চেক করিয়ে আসি আর তোমার জন্য কিছু খাবার আর চা নিয়ে আসছি। দেখো, কোথাও আবার উঠে যেও না, জিনিসগুলো খেয়াল রেখো, যা চোর-বাটপার এখানে!

কত সময় কেটে গেল। তপতী বসে আছেন তো আছেন, অসীমের আসার নামই নেই, একটার পর একটা প্লেন উড়ে যাচ্ছে, খিদে-তেষ্টাও পেয়েছে খুব। সেই কাল রাত্রে একটু যা খেয়েছেন, এদিকে তাঁর কাছে তো কোন টাকা-পয়সাও নেই, সবই তো ছেলের কাছে! আর এখানে তো কাউকে চেনেনও না। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলেছে, এবার আর থাকতে না পেরে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকলেন তপতী। পাশে বসা সহযাত্রীরা অনেকক্ষণ থেকেই লক্ষ্য করেছেন, তাঁকে ওই ভাবে কাঁদতে দেখে এগিয়ে এলেন,এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি গার্ডরাও এসে কান্নার কারণ জানতে চাইলেন। তপতী হাতের টিকিটটা দেখিয়ে সব বললেন। বিমানবন্দরের কর্মচারীরা সেটা পরীক্ষা করে বললেন, এটা তো ভুয়ো টিকিট মাসীমা, আর অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইট তো সকালেই চলে গিয়েছে! স্বামীহীনা, নিঃসহায়, নিঃসম্বল তপতী কি করবেন এখন! কৃতি পুত্রের গর্ভধারিণী নারী আজ সর্বস্ব হারিয়ে অনুভব করলেন, আজ তিনি যদি সন্তানহীনা হতেন তাহলে এভাবে হয়তো সব দিক থেকে তাঁকে নিঃস্ব হতে হত না। তার যে কোথাও যাবার জায়গা নেই! বিমানবন্দরের কর্মচারীরা তপতীর অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কে সব জানিয়ে ফোন করলেন। তাঁরা এসে সব কিছু শুনে বললেন, যে ভাবেই হোক তাঁর দুর্বৃত্ত ছেলেকে খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবেনই। চলুন মাসীমা আমরা তো আছি! তাঁরা পরম যত্নে ও ভালোবাসায় জড়িয়ে তপতীকে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন।

রুখসানা কাজল

এক ফসলি নোনা জমি

রুমকিদের বাসাটা শহরের একেবারে মাঝখানে। আলো হাওয়া ঢুকতে পারে না তেমনভাবে। মাঝে মাঝে ভাঙ্গা টুকরো টুকরো আকাশ এ বাড়ি ও বাড়ির ফাঁক ফোঁকর দিয়ে দেখা যায়। আর আছে প্রচুর গাছ। ছায়াচ্ছন্ন ঘর বাড়ি উঠোন। গরম কালে  তাল পাখা ভিজিয়ে বাতাস খায় আর গজগজ করে রুমকির মা ধুচ্ছাই জ্যান্ত থাকতেই হাবিয়া দোজখের শাস্তি খাচ্ছি।
   
বহুদিনের  প্রাচীন বাড়ি। ছেড়ে যাওয়া যায় না । আবার একসাথে কেউ কিনে নিতেও চায় না। নগদ টাকা নেই যে  আলোহাওয়া খেলা করে এমন একটি বাড়ি বানাবে। কিন্তু এত যে গজগজানি মুখতোড় শাপ শাপান্তি সব থেমে যায়  যখনই  রুমকির বাপি বলে আচ্ছা চলো শহরতলির দিকে নতুন বসতি হচ্ছে।  নতুন নতুন ডিজাইনের বাড়ি ঘর বাগান। ছবির মত  লাগে দেখতে।  রুমকির মা তখন তানা নানা শুরু করে দেয়, নতুন বসতির নানান খুঁত বের করে।  জুতার বাক্সের মত বাড়ি। ওদের গাছ আছে বৃক্ষ নাই। পুকুর নেই যে ঘাটে বসব। আর এই বিশাল বাড়ি , চারপাশের চেনা জানা আপন লোক কি ওখানে পাওয়া যাবে!

হার মেনে তিনি  নেমে আসেন উঠোনে । সেখানে মিষ্টিবউ আম গাছের একটি আধপাকা পাতা শরীর মুচড়ে পড়ে আছে বাঁকানো চাঁদের মত। পাতাটি তুলে গন্ধ শোঁকেন । বেশ গন্ধ।  এই গাছটি তার বিয়ের পরে তার শ্বশুর লাগিয়েছিল। তাই নাম মিষ্টিবউ । আসলে তো ফজলি আমের গাছ। 
    
 রুমকির বাপি পাগল কিসিমের মানুষ । ওষুধের দোকান চালায় কর্মচারিরা। উনি দোকানে বসে কবিতা লেখেন। মাঝে মাঝেই তিনি জঙ্গল, নদী, ধান ক্ষেত, গাছগাছালি দেখাতে নিয়ে আসেন ওদের। খোলা হাওয়ায় সবুজের সাথে ওরা খুব আনন্দে মেতে ওঠে । আজ নীল দেখাতে নিয়ে যাবো নদীর পার। রেনুকে ডেকে বললে ওদের সাজিয়ে গুজিয়ে দে ত রেণু।
    
ঘাসের উপর শুয়ে মাথার নীচে দু হাত রেখে পা নাচাতে নাচাতে আকাশ দেখার মজাই আলাদা। মেঘ ভেসে যায় কত ভঙ্গে। মোতির মার ছেঁড়া কাঁথার মত। আবার কখনো  এক চাকা ভাঙ্গা রিকশার মত, ঠুক ঠুক চালাচ্ছে সেলিম মিয়া। রুমকি আর ওর  ভাইয়া মেঘের মন্ড দিয়ে নিজেদের মত করে একেকটা ছবি বানিয়ে নিচ্ছে । ওদের  হাসির শব্দে উড়ে যাচ্ছে গাঙ শালিকের দল। নদীর ওপারে নীলের সাথে  নীল জমে পাহাড় হচ্ছে। নীল ডেকে নিচ্ছে নীলকে। ভাইইয়ার চোখে তখন রংধনু ঢেউ খেলছে । রুমকি  ছুটে যায় দূরের সবুজ ঢিপির দিকে। ওর শরীরে তখন তীব্র নাচন, শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা – এক দুই তিন , এক---   
তিরিশ মিনিটের ধ্যানে বসেছে ওদের বাপি।  দৌড়ে গিয়ে গিয়ে ঘাসের  উপর রাখা হয়েছে তিন কাঁটার ঘড়িটা  ঘড়ি দেখছে ওরা।  এই কদিনে চিনে গেছে ঘণ্টা, মিনিট  আর সেকেন্ডের কাঁটা। এমন সময়ে মিনতি কাকিমা এলো। হৈ হৈ করে উঠে,  কি এনেছ কাকিমা দাও দাও। ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে নাড়ু বের করে কাকিমা। রুমকি হাসে। কিচ্ছু জানে না কাকিমা। বাপি বলেছে তোমরা তোমাদের মত থাকবে। আমরা আমাদের মত। কেউ ধ্যান করবে, কেউ নাচবে, কেউ গাইবে এই সবাইকে নিয়েই আমাদের এই পৃথিবী। কাকিমা ঘাসের উপর বসে থাকে। দু গালে নাড়ু পুরে ব্যাক  সিনে নলখাগড়ার বনকে রেখে রুমকি নেচে উঠে , এক দুই তিন এক – মম চিত্তে নিতি নৃত্যে --   
- কি রে তুই? ধ্যান ভেঙ্গেছে বাপির।
- একটা বুদ্ধি দাও ঠাকুর।”
-- আহ আবার ঠাকুর— চাপা ধমকে উঠে রুমকির বাপি।    
--ঠাকুর ছিলে তাই ঠাকুর বলছি। তুমি কি চাও তোমাকে হুজুর বলি? পালটা ঝামটে ওঠে কাকিমা।  তারপর গলা নামিয়ে বলে, তুমি নিতাই সাহাকে একটি কথা  বলবে?”  
- কি কথা, আরও টাকা চাস?”
-না , শোভার সিঁথিতে যেন সিঁদুর দিতে দেয়। সেই তো নিয়েছে শোভাকে” বাপির চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত করে বলে কাকিমা। কিন্তু কাকিমার চোখে জল। তাতে অসংখ্য অসহায় ঢেউ । বাপি চোখ নামিয়ে বলে,    
-তুই পারিসও শান্তির বউ। মেয়ে দিয়েছিস ভোগে। তাকে কেউ সিঁদুর দেয়।’
-তুমি বললে মানতে পারে।
- তোর  সিঁদুরের কথা মনে হল যে ?
-নিতাই সাহার ঘরে যে জোয়ান ছেলে। সেও যে শোভাকে ঠুকরায়’  আঁচলে চোখ  ঢেকে ফেলে কাকিমা।  
 -- নিজেদের পেটে ভাত দেব বলে মেয়ে দিলাম, গলা দিয়ে যে ভাত নামে না ঠাকুর!     
রুমকির বাপি হাসে। রঙ ধোয়া ফ্যাঁকাসে নিরানন্দ হাসি।
--“শান্তির বউ,  প্রাণী সে পশু বা মানুষ , সবাই দলবল নিয়ে খেতে খেলতে  ভালবাসে । কাঁচা মাংস হলে ত কথাই নেই। আচ্ছা তুই বললি,  আমি বলব  নিতাইকে । কিন্তু তুই তো ভালোই জানিস সিঁদুরের কতখানি জোর। যা,ওদের বাড়ি নিয়ে যা।’  
 রুমকিদের বাড়িতে মাসে দুবার মাংস হয়। রেনুদি একাই কেটে, ধুয়ে, রান্না করে। রুমকির মা দূরে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দেয়। তার মধ্যে হাজারবার একই কথা বলে চলে, কি গন্ধ রে  বাবা! ও রেণু একটু ভাল করে ধুয়ে নিস মা। রেণুদি মাংস ধোয় আর খুশী খুশী গলায় বলে,  
--বড় কাকিমা আমি কিন্তু এবার আগেই এক বাটি সরায়ে রাখবানি। তোমার ডাক্তারকে বিশ্বাস নাই। কতজনরে যে খাতি ডাকবেনে তার কি ঠিক আছে। শেষে আমাগের জন্যি ভাঙ্গাচুরা আলুর ঝোল ছাড়া কিছুই থাকবেনা। মনে নাই সেবার ------  রুমকির মা আর রেণুদি হাসে আর কেটে ধুয়ে রান্না করে। কই আর কেউ ত হেল্প করে না! কিন্তু খেতে বসলেই সুপার ম্যাজিক। কত যে লোক হয়! ছ্যা, কাঁচা মাংস কেউ খায়! রুমকির মা  ঠিক ই বলে, আমাদের ডাক্তার সাহেবের ঘটে  এক ফোঁটা বুদ্ধি নাই।   
অপরাজেয় বাংলাদেশের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বিশাল ভার্সিটি দেখছে রুমকি। একটু আগেই ভর্তি পরিক্ষা দিয়ে এসেছে। পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল পাঁচতলায়। বড় ভাইয়ারা  সিট  খুঁজে দেওয়া থেকে জল খাওয়া পর্যন্ত অনেক হেল্প  করেছে। কিন্তু এরই এক ফাঁকে কেউ  একজন ঠিকই বুকে হাত দিয়ে নিয়েছে। অনেকেরই এক অবস্থা। এরকম হয় আগেই জানত ওরা। অর্থনীতির  স্যার চমৎকার  বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বর্তমান বাজার  ব্যবস্থার উর্ধ্বগতির  প্রেক্ষিতে কেবল মেয়েরা নয় ছেলেরাও ব্যবসার খাতওয়ারী পণ্য মাত্র। সারা পৃথিবীতে পুরুষ বেশ্যার সংখ্যাও অসংখ্য। সেই থেকে টুকটাক এমন গায়ে, বুকে হাত পড়লে রাগ হয় কিন্তু মাথা গরম করে না রুমকিরা। কোন স্ট্র্যাটেজিতে এদের সাথে থাকবে তাই নিয়ে বরং হাসাহাসি করে।  

কয়েকদিন ধরেই মিছিল মিছিলে ছেয়ে আছে ভার্সিটি।  স্যাররা বলে দিলেন এভাবেই ক্লাশ করতে হবে এখানে। এটা মানুষ গড়ার কারখানা নয়। রাজনীতির আখড়া। ওরা ভার্সিটির অলিগলি চষে অভিজ্ঞতা নিতে থাকে। ভাইয়া এখন মিছিলের অবিচ্ছেদ্য  মুখ। ঝোলা কাঁধে উলুঝুলু দাঁড়ি গোঁফে চেনাই যায় না ওকে । অথচ আগে কি ছিল। ঠোঁটের নীচে চিবুকের পরে টুকরো দাঁড়িতে ওয়াও। রাজনীতি করবে বলে হোস্টেলে চলে এসেহে। রুমকিকে বলে দিয়েছে তুই তোর মত আমি আমার মত। চারুকলার  ওদিকে আজ প্রচন্ড গন্ডগোল  হয়েছে। জল কামান ,  টিয়ার শেল, লাঠি চার্জ করেছে পুলিশ। কেউ কেউ বলছে  কয়েক রাউন্ড গুলিও নাকি করেছে । রঙ ছবির নরম মনের ছাত্ররা হাতুড়ি, ছেনি, বাঁশ , কাঠ,পাথরের  দুঃসহ প্রতিরোধ গড়ে  তুলেছিল। কিন্তু কিছু পরেই ভেঙ্গে পড়ে প্রতিরোধ। নিহত  হয়েছে দুজন ছাত্র , আহত অনেকে ই। গ্রেফতার করেছে আরো  বেশি। নিহতরা  স্কাল্পচার বিভাগের দুই সিনিয়র ভাই। ওরা কখনো কোন রাজনীতির সাথে ছিল না। কেবল সমভাবাপন্ন হয়ে বন্ধুদের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় ধনী গরিবের সমান সুযোগের দাবীতে।    
 অনেক রাতে চারুকলার রাজু, কাওসারি, ইমন বাসায় এসে জানায় ভাইয়া হলে  নেই। বাসায় ত আসে নি! মা বাপির বুক  থেকে স্বস্তির পাখিরা উড়ে গেল। হাসপাতাল,  ক্লিনিক, থানা কোথাও নেই। কেবল আরও কিছু  দুঃখী মা বাবার  সাথে দেখা হয়ে গেল। এর মধ্যে খবর হল বাতাসে। মিছিলে আহত কাউকে কাউকে আর্মি  টেনে হিঁচড়ে ভ্যানে তুলে নিয়েছিল। কেউ বলে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে  নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে তাদের। সমর্থিত খবর। রুমকিকে ডেকে নেয় ভাইয়ার বন্ধুরা। ওর মাথা দুলে ওঠে। এতগুলো বছর প্রেম করেও রুমকি জানত না ওর প্রেমিক পুলিশের ইনফর্মার।
    
ভাইয়া এখন ছবি।  দেশে  গণতন্ত্র এসেছে বিপুল কলরবে। পুঁজিবাদ দ্রুত চেহারা পালটে জনমানুষের কাছে পৌঁছেছে ।  টিকে থাকার স্বার্থে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থার সাথে খেলতে খেলতেই পুঁজিবাদ  নিজেকে বদলে নিচ্ছে হরেক রঙের  চাহিদায় । আর বাম রাজনীতি রঙ হারিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে । ক্রমশঃ  হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী ছেড়ে ।  পৌরাণিক কপিকলের গাঁটে গাঁটে আটকে গেছে কমিউনিজম। ভাইয়ার ঝোলাটি নিয়ে গেছে ইমনদি। কানাডার কোন অন্টারিও শহরের বাড়ির সামনে জমে থাকা বরফ সরাতে সরাতে দুহাতে বেলচা ধরে উবু হয়ে এখনো কাঁদে ইমন। 
  
মিনতি কাকিমা মারা গেছে। মরে যাওয়ার সময়ে সর্ষে বাঁটা আর বথুয়া শাক ছিল সাদা ভাতের পাশে। থালার পাশেই ঢলে পড়েছিল। রুমকির মাকে বলত, ও ঠাইরেন ওষুধ দেও দিনি। আমার যে ভাতের অসুখ আর সারে না। ছেলে হারিয়ে  কষ্ট বুকে ধুঁকে যাচ্ছিল রুমকির মা বাপি। আরো কষ্ট দিয়ে রুমকি জানিয়ে দিয়েছিল,  বিয়ে করব না। একা থাকব। দুঃখ ছাড়া ওদেরও কোন অসুখ ছিল না। দুঃখের ত্যানা পেচাতে  পেচাতে ওরাও মরে গেল । ততদিনে রুমকির শরীরের মাংস পাকা হয়ে উঠেছে । একটি হেরে  যাওয়া বাম হৃদয় নিয়ে মুক্ত বাজারের উন্মুক্ত ভালবাসায়  সততা নয়, ভোগের ভদকা হয়ে ও  শিখে নিয়েছে শরীরী খেলা । 
   
পাঁচ বছরের পুরানো প্রেমে হেরে গেছে জেনে বন্ধু তমাল ছুটে এসেছিল। তমালের  হিপ পকেটের তলানিতে মাস গেলে কিছু খুচরো পয়সা থাকে। তবুও সাহস করে বলেছিল, চল বিয়ে করবি আমাকে?  চিলিস চাইনিজের ব্যক্তিগত কেবিনে আধখানা শারীরিক উষ্ণতা ছড়াতে ছড়াতে রুমকি বলেছিল বিয়ে? মোটেই না। সম্পর্কে কোন   বন্ধনী রাখব না। চলবে? তমালের মধ্যবিত্ত  মন হা হয়ে গেলেও মেনে নেয় । বাম ভাইয়াদের অনেকেই তখন প্রবল বিক্রমে ব্যবসা করছে। ছায়াচ্ছন্ন বাড়িটা বিক্রি করে কিছু পুঁজি দেয় তমালকে। তমালরা লাভের পর লাভ দিয়ে এক রক্তপিপাসু ভুত বানায়।  পুঁজিবাদের ভুত। কমিউনিস্টরা এক এক করে পুঁজিপতি হচ্ছে এই ভুতের মন্ত্রণায়। লৌকিক দৃশ্যকল্পের ভৌতিক চালচিত্র দেখে এক সময়ের  বাম সমর্থকেরা বোঝে বিপ্লব দীর্ঘজীবী স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। সফল ব্যবসায়ী তমাল  আবার  বিয়ের প্রস্তাব দেয় । ফিরিয়ে দেয় রুমকি। বার বার ফিরিয়ে দেওয়ায় বেহেড মাতাল তমাল সাত তলা ফ্ল্যাটের ছাদ কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠে, আবে শালী। টাকা দিয়ে আমি হাজার রকম মেয়ে মানুষ কিনতে পারি। তুই তো ছ্যা । তোর ভাই বেঁচে থাকলেও কম্যুনিজমে লাত্থি মারত। পণ্য ছাড়া তুই কি রে হারামজাদী !

হজ্জ্বে লোক পাঠানোর এজেন্সি খুলে দেশের ধনীদের একজন এখন তমাল। বিয়ে  করেছে পীর বাড়ির মেয়ে। তার হাতে  মোজা পায়ে মোজা। চোখ ছাড়া আপদমস্তক চলন্ত কাপড়ের পুটুলি। ছেলে অস্ট্রেলিয়া থেকে এম বিএ করে ফিরছে এক হাত দাঁড়ি নিয়ে। বাবার  সুটকেসে সযত্নে রাখা মার্ক্স এঙ্গেলসের ইস্তেহার খুঁজে পেয়ে পুড়িয়ে ফ্ল্যাশ করে দিয়েছে কমোডে। দুঃসহ বেদনায় আঙ্গুল তোলে তমাল, তোর  জন্য, তুই ফেরালি বলে। আমার উত্তরাধিকার কি এরকম হওয়ার কথা ছিল? ডাইনি তুই!
 ছেলে হয়েছিল শোভাদির । সে কার সন্তান জানত না শোভাদি। সেই ছেলে কেঁদে  উঠতেই মুখে নুন গুঁজে দিয়েছিল কনক ধাত্রী । আঁতুড় ঘরের খোলা দরোজা  দিয়ে দেখেছিল কনক ধাত্রীর হাতে টাকা গুঁজে দিচ্ছে নিতাই সাহা। পেছনে নিতাই সাহার ছেলে তাড়া দিচ্ছে মৃত শিশুটিকে জংগলে পুঁতে দেওয়ার জন্য। শোভাদি কাঁদেনি। দুধের ভারে ফুলে উঠা দুটি অমৃত ভাণ্ডার থেকে ঝরে পড়া দুধ  গা ভিজিয়ে নেমে যায় আঁতুড় ঘরের কালো মাটিতে। ক্ষুধার্ত ঠোঁটে খেয়ে নেয় মাটি। শোভাদি বোঝে তাকে মরতে হবে। বেঁচে থাকার মত মৃত্যুও বড় কঠিন।  শোভাদি মরেনি। অই শহর ছেড়ে রুমকির কাছে পালিয়ে এসেছে । 

মাঝে মাঝে সুর তুলে কাঁদে শোভাদি। মায়া মমতার কত যে ঝোঁপঝাড় শোভাদির  শরীর আর মনে। ছেলে বেঁচে থাকলে খুশী হতে শোভাদি? রুমকির কথায় আতংকে কেঁপে উঠে বলে, নারে না। ছেলেও যে ঠুকরে খেতে শিখে যেত। পশুর মত কামড়ে খুবলে খেয়ে নিত মেয়েমানুষ। শোভাদির ভয় দেখে হাসে রুমকি। ওর পাশে এক খন্ড নোনা জমির মত খর চোখে পৃথিবীকে দেখে ভাবে উৎপাদনের উপকরণ হয়ে আর কতদিন !   
-
  


সুধাংশু চক্রবর্ত্তী



ভিন্নতর হাতছানি

গঙ্গার বুকে হেঁইয়ো হেঁইয়ো বলে নৌকার বৈঠা টানছে দুই মাঝি । ওদিকে মাঝগঙ্গা আকুলভাবে ডেকে চলেছে আমায় । গঙ্গার গভীর শীতল জলে ঝাঁপ দেবো কি দেবো না সেই দোটানায় রয়েছি । একটা শুশুক চমকে দিলো ভুস করে জল থেকে উঠে পরমুহূর্তে জলের গভীরে তলিয়ে গিয়ে । নৌকা কি থামলো তাতে ? নাকি থামলো আমার মন ? বরং নবোদ্যমে মেতে উঠলো শুশুক হতে চেয়ে ।

অন্য সময় হলে ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম । আজ আর ভয় পাচ্ছি না । অহেতুক মৃত্যুভয় আর কেন পুষে রাখি এই বুকে ? এমনিতে তো মরেই আছি । তুমিও জানো, মা গঙ্গাও জানেন । দেখছি তো, তোমরা দুজনেই হাত নাড়ছো আমাকে লক্ষ্য করে । অথচ সেই হাতের ভাষা একেবারে ভিন্নতর । তুমি বিদায় জানিয়ে হাত নাড়ছো । হয়তো নিজেই শান্তনা দিচ্ছো নিজেকে । হয়তো এখনো ভেবে আকুল হচ্ছো ঠিক করছো ? নাকি ভুল করলে কিছু ! ওদিকে মা গঙ্গা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে আমাকে ডাকছেন তাঁর শীতল বুকে স্থান করে দেবেন বলে । হয়তো আমাকে পিতামহ ভীষ্ম ভেবেছেন । অথচ আমি যে তা নই । হতেও চাই না চিরকুমার । আমি সংসারী যে হতে চাই মনেপ্রাণে ।


এই মুহূর্তে কিছু খুচরো বাতাস হুল্লোর বাঁধিয়েছে গঙ্গার বুকে । ওরাই এসে কানে কানে বলে গেল, মনস্থির করে নে ঠিক কি চাস তুই ? কাকে চাস ? মা গঙ্গা ? নাকি অনিশ্চিত ভবিষ্যত ? তবে যেটাই চাস না কেন দেখবি সুখের মাঝে সেই দুঃখই কিন্তু গুঁজে রয়েছে । আরও একবার ভালো করে ভেবে দ্যাখ তেমন কিছু সিদ্ধান্ত নেবার আগে । এখনো সময় আছে হাতে । এখনো বৈঠা টেনে চলেছে দুই মাঝি । এখনো মাঝগঙ্গায় এসে পৌঁছোয়নি তোর নৌকা । ঐ দ্যাখ, এখনো প্রিয়ার হাতদুটি বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে । হয়তো তোকে ফিরে পেতে চাইছে । হয়তো না ।

ব্রতী মুখোপাধ্যায়



রেশমিকাহিনি

শ্যামাপদ কদিন ধরে বাড়িবন্দি। কথাও বলছে কম। যে মানুষটার দুতিনটে মোবাইল একসঙ্গে বেজে উঠত তার কাছে প্রায় কোনো কলই আসছে না। বড়সড় ঝাড়, রেশমি আন্দাজ করে। 

সারাজীবন জ্বালিয়েছে। পাকা দেখার পরে বিয়ের দিন স্থির হয়েছে। নেমন্তন্নের চিঠিপত্র বিলি হচ্ছে। হঠাৎ  সে কোনো অজুহাতও না দেখিয়েই বিয়ে করবে না জানিয়ে দিল। রেশমির দুই দাদার সে কি হয়রানি! বাচ্চা পেটে এল। বলে কিনা তার বাচ্চা নয়। রেশমি তখন আত্মহত্যার কথাও একবার ভেবেছিল। সে বাচ্চা বাঁচে নি। বাচ্চা  আর আসেও নি। রেশমি আবদার করেছিল, মাদার তেরেসার থান থেকে একটা অনাথ বাচ্চা এনে মানুষ করবে। শ্যামাপদ রাজি হয় নি।

ততদিনে শ্যামাপদ দলের ভেতরে প্রভাবশালী নেতা। রেশমিকে পেছনের দরজা দিয়ে কলেজে ঢুকিয়ে নিজে কলেজ ছেড়ে দিয়েছে। হোলটাইমার।

রেশমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকদিন নিজের মুখ, মাথার চুল, শরীর, সমস্তই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। বুঝতে চেয়েছে সত্যিই সে বিকর্ষণীয়  কিনা।  নাহলে সে জানে, শ্যামাপদর আসঙ্গলিপ্সা প্রচণ্ডই, কিন্তু নিজের বউকে সে নিয়মিত অবহেলা করেছে। রেশমি আদর চাইত, ভিকিরির মতো। শ্যামাপদ যন্ত্র। নিজের বীর্য বের করে ফেলাই তার কাজ। তারপরই সে নাশেষ হওয়া হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়েছে, সিগারেট ধরিয়েছে।

মাঝে একসময় সুলেখা আর জুলেখাদের ফোন আসত। রেশমির কাছেও আসত। তারা হয়ত দলের কেউ কিংবা সমাজের প্রতিপত্তিশালীদের কেউ। এমন ভাবে কথা বলত যেন রেশমি কাজের মেয়ে। রেশমি পরে জেনেছে, জুলেখা কনসিভ করেছে আর দল শ্যামাপদকে সেই কারণে দায়ী করেছে। তবে আজকের সঙ্কট সেই কারণে নয়, বড় কিছুর জন্যে দল শ্যামাপদকে শাস্তি দিতে চাইছে।

দলের ছেলেরা ধর্ষণ করছে খুন করছে, রেশমি খবর পেত। তোলাবাজি, প্রোমোটারি, জমিছিনতাই, এসব খবরও পেত। শ্যামাপদকে কখনো কখনো প্রশ্ন করত। সে সঙ্গেসঙ্গেই উড়িয়ে দিত দলের সামনের সারির নেতারা যেমন সাংবাদিকদের এসব প্রশ্ন মাছিতাড়ানোর মতো উড়িয়ে দেয়। 

আজ আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল শ্যামাপদ। একটা কিছু হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে, এইরকমই বিড়বিড় করে বলতে বলতে বেরিয়েছিল। সন্ধের আগে ফিরে এসেছে। বিধ্বস্ত।

রেশমি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। ভাবল, সবগুলোই এক পদ যেখানে, কে কার হেস্তনেস্ত করবে ?

শ্যামাপদ অস্বাভাবিক তাড়াতাড়ি আলো নিবিয়ে দিল। এক চুমুকে গ্লাস খালি করে পুরনো মেজাজেই ডাক দিল, রেশমি!

এই ডাকের মানে রেশমির জানা।  পরের দিন ক্লাস ছিল তার। সে পল সায়েন্স পড়ায়। বিরক্তিকর। বরাবরই মনে হয়েছে, পলিটিক্যাল প্রোবাবিলিটি। সম্পত্তির উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে একটা বই সে তখন পড়ছিল। শ্যামাপদ আবার ডাকল, রেশমি!
রেশমি বলল, না।


ফুল ফুটল না

যত ভিতরে পা ফেলি অন্ধকার বড়ো বেশি সরল। সেই গহন অন্ধকারে আলো বলতে মাথার ওপর অগণ্য নক্ষত্র  আর দামুচাচার উঠানে বাঁশেঝোলানো দুটি হেরিকেন।   

শুরুতেই গান। মুক্ত হবে প্রিয় মাতৃভূমি, সেদিন সুদূর নয় আর। তারপরই নাটক। শহরের পথনাটকে যে কজন ঘিরে দাঁড়ায় তার চেয়ে ভিড় একটু বেশি। দেবাঞ্জনদা বলল ---  দেখেছ কমরেড, গ্রামের মানুষ জেগে উঠেছে।

সত্তরের দশক সেদিন মুক্তির দশক। সবুর সইছে না। বিপ্লবীরা গ্রামে চলে গেছে। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার কর্মসূচি পার্টির। আমরা বিপ্লবী নই। শহরের দেয়ালে মাওসেতুঙের মুখ আঁকছি। আমরা সহায়ক। গান গেয়ে নাটক করে শহরগ্রামের মানুষদের চেতনা আনাই আমাদের কাজ। 

নাটক আরম্ভ হতেই সামনেবসা বাচ্চারা গোলমাল বন্ধ করে দিল। তাদের জড়িয়ে বসেছিল নানাবয়েসের মেয়ে। বয়স্ক ছেলেরা সব দাঁড়িয়েই ছিল, পেছনে। ছোট নাটক। ফুলকাকা জোতদারের রোলটা চুটিয়ে করে। বিশেষত একটা দৃশ্যে --- যেখানে দেনাশোধ করতে পারে নি চাষি আর জোতদার তার জমি হড়প করবে, জোর করে বুড়ো আঙুলের ছাপ নেবে শাদা কাগজে, কালি শেষ, চাষির বুড়ো আঙুলে সে ছুরি চালিয়ে দিল আর সেই আঙুলের রক্ত দিয়েই ... 
আমরা রোমাঞ্চিত হতাম। দর্শকরাও হত।      

আমাদের অভিনয় এখানেই শেষ --- বলার আগেই তুমুল হাততালি।
দেবাঞ্জনদা আবার বলল --- দেখেছ কমরেড, জনগণ তৈরি।

রাতে খাওয়ার আয়োজন ছিল। তখন দামুচাচা, হাতে একটা বিড়ি, আমাদের সামনে।
দেবাঞ্জনদা জিগগেস করল --- কেমন লাগল, দামুচাচা ?
--- দেখেছ ফুল কেমন ফুটে ? 
--- সে কি কেউ দেখতে পায় ?
--- ধীরে ধীরে ফুটে। ভিতরে ঝড়, ভাঙচুর। রক্তঝরন। চারপাশ অতি সুন্দর ছিঁড়ে সে। তারপর পাপড়ি মেলে, সাজায়, একটু একটু করে। 
--- তো ?
--- নাটকখান ভালো। জোতদার নাকাল। ভালো। কিন্তু কোথায় যেন তোমাদের তাড়াহুড়ো। ফুল ফুটাতে চাইলে,  দুম করে। ফুল ফুটল না। 



জয়া চৌধুরী

আদরখেলা

কাল তুমি চলে গেলে যে বড় ... কি হলো উত্তর দেবে না? আমার বর এসে গিয়েছিল ঘরে তো কি হলো? সে তো জানতেই পারে না তুমি আমার কাছে থাকো আমি তো জানি সে কথা জানলেই বা... আমি তো তোমাকে কত আদর করি সোনা কি ভাবে? এই যে ...তোমার ঠোটে আঙুল রাখি স্তনে জিভ ঠেকাই দাঁতে... আমার বর আমাকে জড়িয়ে রাখে ঘাড়ে হাতে পিঠে... আমার তোমার কি? আচ্ছা... কী পারা যায়? আমার শরীর তখন ছুঁচ্ছে ঠিক তখনই তুমিও... কেন যায় না দিলজান? আমার দিল কী পেয়ারি... একসঙ্গে দুভাবেই শরীর দেব? শব্দে দেব মাংসে দেব... তো খেলা আমাদের যৌথ ... তুমি রাজী হও নি আগে? আমি তো মন চেয়েছি তুমি শরীরে এলে কেন? সব ন্যাকামি শরীর ছাড়া মন হয় না কি? ভুল শুধু ভুল করেছি আমি কীসের ভুল ? শরীর তোমার এত ভিক্টোরিয়ান সতী জানা ছিল না তো? তোমার দাঁত বেরিয়ে পড়ছে কবি... আমি দেখতে পাচ্ছি তোমার নীল ফণাটাও...শোনো... বলো এতই যদি ভালবাসো আমাকে নিয়ে যাও এঘর থেকে মানে? অর্থ বোঝো নি? কবিতা লেখো তুমি? তুমি পাগল হলে না কি? ওঃ... অন্যের বউ হয়ে তোমার সঙ্গে শরীর খেললে আমি সুস্থ প্রমাণ হব তাই না? তো সবাই করে হা হা হা... এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা... আসল কবিতা দিলজান হাসছো কেব ওভাবে? চোখের জল তো হাসলেও পড়ে কবি... আমার ভয় ভয় লাগছে পেয়ারি সব কবিতাই তবে শরীর খোঁজার চার তোমার? ইয়ে তা কেন? তা নয়... তবে... এই তবের কারণ তোমার নতুন শিকারকে শুনিও ... ডাকছে আমায়... চলি