হৃদয়বল্লভপুরের যাত্রী
সৌম্য অফিসে ব্যস্ত অফিসের কাজে । বাড়িতে ব্যাস্ত লেখালেখিতে
। ওর বৌ অনন্যা অফিসের ব্যস্ততা তেমন বোঝে না । সে নিয়ে ওর মনে কোন প্রশ্নও নেই ।
কিন্তু দিনের পর দিন বাড়িতে সৌম্যর লেখায় ব্যস্ততা দেখে
তিতিবিরক্ত হয়ে একদিন অনন্যা ওকে চড়া মেজাজে বলে উঠলো,’এই ব্যস্ততার কোন মানেই হয় না
। ফালতু ।‘
সৌম্য তখন মাথা নিচু করে কি এক লিখছিল ।অনন্যার কথায় চমকে
উঠে মুখ তুলল ও ।
কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রুক্ষ-মেজাজে
বলল ওকে,’এসব ফালতু মানে ? এ যে আমার মৌলিক সৃষ্টি । পরপর প্রকাশ পাবে নানা পত্রিকায়
। বাজে কথা বল কেন ?’
সৌম্যর কথা শুনে অনন্যা বেশ জোরে হেসে উঠে উত্তর দিলো,’তা
আমার কাছে কী প্রকাশ পাচ্ছে তোমার ? পরেই বা কী পাবে,শুনি ? এসব এবার বাদ দাও । সংসারে
অঢেল সময় দিয়ে সুযোগ পেলে লিখবে । হুম ।‘
কথা শেষ করে গটগট করে নিজের মেজাজে অনন্যা নিজের কাজে চলে
গেলো ।
সেই ভ্যাবাচ্যাকা মুখে সৌম্য আর না লিখে চুপচাপ বসে থাকলো
।
সহসা পাশের ঘর থেকে অনন্যা চেঁচিয়ে ওর উদ্দেশ্যে বলল,’এও
এক পরকীয়া । তবে লেখার সাথে । আমি কিন্তু আর সইবো না । ব্যবস্থা নিলে বুঝবে ।‘
শুনে প্রায় মাথা শুরে গেলো সৌম্যর । দু’হাত দিয়ে মাথা ধরে
কোনোরকমে বসে থাকলো । ‘পরকীয়া’ কথাটা ওর খুব বুকে বেজেছে । লেখার পথ ধরে সত্যটা একদিন
প্রকাশ পেয়ে যাবে ভেবে ও ব্যাকুল হয়ে উঠলো ।
ওর মনে হল অনন্যাকে গিয়ে বলে,’তুমি পরকীয়া বলতে কী বোঝাতে
চাও ? আমি কিন্তু অমন নই ।‘
কিন্তু ঠাকুরঘরে কলা খাওয়ার গল্পটা মনে হতেই ও সে বাসনা
থেকে দূরে সরে এলো ।
তারপরেই ভালোমানুষি মুখে গেলো অনন্যার কাছে । অনন্যা তখন
রুটি বেলছে ওর টিফিনের জন্য । দেখেও ওর সঙ্গে একটি কথাও বলতে চাইলো না । সৌম্যরও সাহস
হল না ওর সঙ্গে কথা বলার ।
তবে শেষে আমতা-আমতা করে বলল,’কিছু কাজ আছে কি ? আমি করে
দিই ।‘
অনন্যা এবার কাজ থামিয়ে একচোট হেসে বলে বসলো,’এবার কিন্তু
খাওয়াটাও জুটবে না । অভিনয় করতে এসেছ আমার সঙ্গে ? নিজের জায়গায় গিয়ে বস । তবে আবার
লিখছ দেখলে ব্যবস্থা কালই হবে ।‘
প্রায় কাঁপতে-কাঁপতে সৌম্য আবার ফিরে এলো নিজের লেখার ঘরে
।
বাইরে তখন প্রবল বেগে ঝড় শুরু হয়ে গেছে ।
খোলা জানলা বাতাসের দমকা এসে ওর লেখার কাগজ এদিকে-ওদিকে
ছিটিয়ে দিয়েছে । কিন্তু ওর কুড়োবার ইচ্ছাই হল না । জানলাও বন্ধ করলো না ও । বরং খোলা
জানলার সামনে এসে গায়ের গেঞ্জিটা খুলে দাঁড়ালো । ঝড় আর সদ্য শুরু বৃষ্টির ছাটে তখন
প্রায় দিশাহারা ।
প্রায় মিনিট কুড়ি পরে অনন্যা একটা প্লেটে খাবার নিয়ে ঘরে
ঢুকল । জানলার ধারে ওকে দেখে মুচকি-হেসে ফেললো ।
তারপর কাছে গিয়ে ওকে বলল,’এভাবে নিজেকে ফেরানো যায় না ।
বিবেকটা জাগাও আগে । তোমার লেখা প্রকাশ আমার এতদিনে কোন কাজেই লাগেনি । এবার প্রকাশিত
হও আমার মধ্যে আপাদমস্তক একটা মানুষ হয়ে । লেখক কি মানুষ বৃত্তের বাইরে কেউ ?’
কথাগুলো মন দিয়ে শুনে সৌম্য অনন্যার দিকে ছলছল চোখে তাকাল
।
বেশ কাচুমাচু মুখে ওকে বলল,’খানিক বুঝেছি আমি । বাকিটা
তুমি বুঝিয়ে দিও আমাকে । সত্যিই তো…’
ওর কথা শেষ না হতেই ঘরের আলো নিভে গেলো ।
সেই বালকবেলার মতো ভয় পেয়ে সৌম্য অনন্যার বুকে নিজেকে সেঁধিয়ে
দিয়ে প্রহর গুণতে থাকলো অনন্যার পরের কথার জন্য ।
অনন্যা আকস্মিক ঘটনায় বেশ অবাক । ও সৌম্যর মাথায় হাত রাখল
।
আকাশকুসুম ভেবে ও মুখ খুলল অন্ধকারে অনিন্দ্য-হেসে,’সেই
ছোটবেলার কথা এবার ভাবো । মানুষ করেছে একদিন তোমার মা । সেদিন গেছে । এখন আমি এসেছি
। সেই মানুষ করার ভাষা বদলে গেছে । আমি ভালোবাসা দিয়ে তোমাকে আবার গড়ে তুলতে চাই ।‘
অনন্যার বুকে মুখ ঘষতে-ঘষতে কাঁদো-কাঁদো গলায় সৌম্য বলল,’তবে
কি আমি আর লিখবো না ?’
ঘরে সহসা আলো চলে এলো ।
সেই আলোর সঙ্গে নিজের খিলখিল হাসি যোগ করে অনন্যা জবাব
দিলো,’তোমাকে না লিখতে কে বারণ করেছে ? আমি কি তা বলেছি ? শুধু আমার মধ্যেও নিজের প্রকাশ
রেখো । তাহলেই ব্যস…’
অনন্যার কথায় আপ্লুত সৌম্য বুক থেকে মুখ তুলে চোখেমুখে
খুশির ঝিলিক তুলে বলল,’বেশ তাই হবে । তুমি প্রকাশের সব পথ আমাকে দেখিয়ে দিও । আমি আছি
। বাকি সময় তোমার পথেই থেকে যাবো ।‘
অনন্যা কোন উত্তর দিতে চাইলো না । অনিমেষে ওর দিকে এক অদ্ভুত
দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ ।
পরে বলল,’সে ঠিক আছে । পরে দেখা যাবে সেসব । এখন খেয়ে আমাকে
উদ্ধার কর তো ।‘
খাবার লেখার টেবিলে অনন্যা কিছু আগেই রেখেছিলো । সেদিকে
আঙুল দেখিয়ে সারা মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো ।
এরপরেই সৌম্য সব আড়ষ্টতা কাটিয়ে টেবিলে বসে খেতে বসলো ।
এমন হাপুস-হুপুস করে ও খাচ্ছিল দেখে বোঝার উপায় নেই তখন,কে দিয়ে গেলো খাবারটা ? সেই
মমতাময়ী মা,না কখনো ফাগুনবেলার,কখনো বা শ্রাবণবেলার আকাশে প্রতিভাত প্রিয়তমা ?