গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭

রুখসানা কাজল

ছাতিম পলাশ মহুয়াবন

বৃষ্টি হয়ে বেশ ভালই হয়েছে। অন্তত দুদিনের রেহাই ধূলো থেকে। উত্তর ধানমন্ডি গেল পরশু ছিল ধূলোমোড়া। গাছের পাতা, ছেঁড়াফাড়া কাগজ, চিপস এর নানারঙ্গা প্যাকেট আর পলি ব্যাগ ছোট ছোট বাতাসে এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। শাড়ির আঁচলে নাক মুখ ঢাকলেও কিছু ধূলো রুমকির কালো মুখকে ধূসর করে ঢুকে পড়েছিল বুকের ভেতর। বুকের বামদিকে হৃদয় । এক্স রে প্লেটে ফর্সা আঙ্গুল রেখে ভাইয়া গম্ভির হয়ে বলেছিল, বাঁচতে গেলে এটাকে সবল রাখতে হবে। তোকে ইয়োগা ক্লাশে ভর্তি করে দিই চল। দিব্যি বেঁচে আছে রুমকি। বরং ভাইয়াটাই মরে গেলো। মরে যাওয়ার কিছুদিন আগে নিজের রুমের ঠিক মধ্যিখানে সুন্দর করে আলপনা এঁকেছিল। লাল হলুদ ফুলের পাশে যখন কিছু স্বউদ্ভাবিত জ্যামিতিক লতা আঁকছিল রুমকি প্রবল তাচ্ছ্যিলে আপত্তি তুলেছিল, এম্মা ভাল লাগছে না। এটা কি লতার পাতা শুনি! ভাইয়া শুনলে ত! এঁকেই যাচ্ছিল। রুমকিও ঘ্যানপেনে কম নয়, ভ্যা গেল আল্পনাটা । কি পচা লাগছে। মুছে দে না! সবুজ রঙ্গে তুলি চুবিয়ে এবার ভাইয়া বলেছিল, বুঝলি না ভেবলি, এই লতা ছিল আদম হাওয়ার স্বর্গের বাসার পেছন বাগানে। এতে তেলাকুচার মত দুধসাদা ফুল ফুটত। ফল হত শশার মত সবুজ আর পাকলে লাল টুকটুক। কচকচ করে খেয়ে নিত আদম হাওয়া। ঠোঁট বেঁকিয়ে চরম অবিশ্বাসে রুমকি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে টুক করে তুলি ছুঁইয়ে রঙ মেখে দিয়ে বলত, যা তো একটু আদা চা করে আন। অনেক ক্ষণ ঝুঁকে আছি বলে বুকে কেমন চাপ চাপ লাগছে। কেমন পোড়া পোড়া হয়ে গেছিল ভাইয়া। রুমকির হাতের পাশে হাত রেখে বলত এই দ্যাখ, আমি এখন তোর রঙ নিয়ে নিয়েছি। ভাল হয়ে উঠলেই তোর পকাতা এঁকে দেবো। ভাইয়ার ঘনকালো চোখের পাপড়িতে নির্ভুল মৃত্যু। ইয়োগা ক্লাশে যে মেয়েটি ইন্স্রাকটর তার হ্যান্ড মাইকটা সবুজ। মাইকটা দোলে , উঠে, নামে, স্থির হয়, কখনো টেবিলে মাথা কাত করে শুয়ে থাকে। প্রথম প্রথম মনে হত মৃত্যু খেলছে, নড়ছে , চলছে, কথা বলছে তাকিয়ে আছে। শিরশির করে উঠত বুক। 

অনেক অনেক বছর ভাইয়ার মৃত্যু নিয়ে রুমকি কখনো কারো সাথে কথা বলেনি। এমনকি ভাইয়ার বন্ধুদের কারো কাছে কখনো বলেনি, আমি অমুকের বোন। যারা জানে তাদের এড়িয়ে গেছে। বিয়ে করেছে, চুটিয়ে সংসার করতে করতে দেখে রুমকির ছেলের মুখে ভাইয়ার ছায়া। ছেলের আঙ্গুলগুলো ভাইয়ার মতই ছবি আঁকে । ইয়োগা ইন্সট্রাকটর মেয়েটা শক্ত মুখে বলে, পুল ইয়োর লেগস ম্যাম, জাস্ট এভাবে—রুমকি কচ্ছপ আসনে বসে কেঁদে ফেলে। ভাইয়া ছুটে আসে। আস্তে খুব নরমভাবে পা ছাড়িয়ে দিয়ে রুমকিকে নিয়ে চলে আসে। বাচ্চুকাকু ভয়ংকর রেগে যায়। ভাইয়া রাগে না। ফর্সা মুখে গোলাপি হাসি দিয়ে সালাম দিয়ে বলেছিল, কাকু ওর হার্ট উইক। মনের উপর চাপ পড়লে অসুস্থ হয়ে যাবে যে। মন কি হৃদপিণ্ডের পাশে থাকে রে ভাইয়া? এক্স রে প্লেট এনে খুলে ধরে, কই মন কই ? চিনিয়ে দে তো ! ক্লাশ শেষে ইন্সট্রাকটর মেয়েটা হাসে। ম্যাম আজ আপনি পারফেক্ট পারফ্যমেন্স করেছেন। অন্যদিনের মত দুষ্টুমি করেন নি। মেয়েটাকে একটা কফি চকোলেট দিয়ে রুমকি হাসে, মন খারাপ ছিল যে তাই! উত্তর ধানমন্ডির এই বাসায় ঢুকতে পাকা উঠোনে একটি শেফালি গাছ পেরুতে হয়। কিছু ফুল থেঁতলে থাকে। কিছু ফুল আশ্চর্য সতেজতায় অক্ষত থেকে চেয়ে থাকে। রুমকি হাঁটু গেঁড়ে তুলে নেয়। কাগজে মুড়ে যত্ন করে রেখে দেয় ব্যাগে। ড্রাইভাররা সহাস্যে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কোন কোন বাড়ির বাসিন্দারা থমকে দেখে চলে যায়। আজকাল অন্য ভাবিরাও ফুল কুড়ায়। সাদা পিরিচে ফুলগুলো পু্রো একবেলা আনন্দ দিয়ে ঘুমিয়ে যায়। ছেলে দেখে খুশি, অহো মাম্‌ ইটস রিয়েলি হেভেনাবল! রুমকি গল্প বানায়, জানো আদম ঈভের হেভেনের বাসায় শিউলিফুলের গাছ ছিল। ছেলে যখন ছোট ছিল ভাবত আমার মা সব জানে। আর তাই জানতে চাইত, তুমি দেখেছ ? রুমকিও মনের সুখে বানিয়ে বানিয়ে গল্প শোনাত যে গল্পের কোন শেষ নেই। আজকাল ছেলে হাসে। কখনো কেয়াফুলের ঝাড় কিনে লুকিয়ে রেখে বলে, মাম্ তুমি কি জানো ঈভের প্রিয় ফুল কি ছিল? সমস্ত ফ্ল্যাটের নিঃশ্বাসে ভাসে কেয়ার সুঘ্রাণ। রুমকি লাফিয়ে উঠে, কই দেখি তো – ওমা তাই তো ...।



নীহার চক্রবর্তী

যুগান্তরবাবু

 অপুর ব্যাপারটা মিটে গেছে একবছর আগেই । পরে আর কেউ সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারে অভিযোগ করেনি অপুর বিরুদ্ধে । তাই অপুর মার মনে শান্তি বিরাজ করছে । ওর বাবার মাথায় কিছুই নেই আর । সে জানতেও চায় না । কিন্তু আর একটা সমস্যা এসে উপস্থিত হল । কি যে সমস্যা । এও বুঝি হয় ? ভাবতে ভাবতে অপুর মা চুল ছিঁড়তে থাকলো মনে মনে ।

অপুর দিদি অর্পিতা । ও কলেজে পড়ে । অপুর থেকে বছর চারেকের বড় হবে । ওকে নিয়েই নতুন সমস্যা এসে উপস্থিত ।
সেদিন অর্পিতার কলেজ ছিল না । ও ছুটির দিন তেমন বাইরেও বেরোয় না । সারাদিন কানে হেড-ফোন গুঁজে গান শোনে । টিভির কাছে যায় খুবই কম । কারো সাথে ওর কথা বলতে ভালো লাগে না । মানে নিজের মতো নিজে দিনযাপন করে ।

ভ্য্যাজানো দরজা খুলতেই অর্পিতার মা অবাক । সে যেন তখন আকাশ থেকে মাটিতে পড়লো । অর্পিতা মনের সুখে সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে । ধোঁয়া বেরোচ্ছে বেশ । ওর মা তখন ভাবল,কিছু বলবো না এখন । পরে দেখা যাবে । কিন্তু একথা ভেবেও সে ঘরে ঢুকে পড়লো । মার দিকে চোখ পড়তেই অর্পিতা সিগারেটটা পিছনের দিকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করলো । ফেলে দেওয়ার উপায় নেই তখন ।

‘’ব্যাপারটা কী ? এ আবার কেমন কথা ? তুই মেয়ে না ? কি সব্বনাশ !’’
অর্পিতার মুখের কাছে এসে ওর মা চোখ গোল্লা করে বলে উঠলো । পিছনে তখন ধোঁয়া বেরোচ্ছে বেশ ।
মার কথা শুনে অর্পিতা স্মিত হাসল ।
হেসে ওর মাকে বলল,’’তুমি শুরুতেই ভুল । মেয়ে বলে সিগারেট খাওয়া যাবে না এমন কিন্তু নয় । আমাদের কলেজের অনেক মেয়েই খায় । শুধু ওদেরই বা বলি কেন ? অনেক গুণী মেয়েরাও মনঃসংযোগের জন্য সিগারেট টানে । সব বুঝি ছেলেদের জন্য ? কি যে বল না তুমি ।‘’
কথাগুলো শেষ করে অর্পিতা মুচকি হেসে প্রায় শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা খোলা জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলো ।
অর্পিতার কথা শুনে ওর মা বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলে উঠলো,’’বাজে কথা বলিস না । কে কোথায় খায় তাতে তোর কী ? তোকে খেতে হবে কেন,শুনি ? আর এ শরীরের পক্ষেও ভালো না । বাজে নেশা থেকে দূরে থাকো,মা ।‘’
তারপর আর কোন কথা না বলে অর্পিতার মা হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো । মার যাওয়া দেখে অর্পিতা মনে মনে হাসতে থাকলো । তারপর উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আবার একটা সিগারেট ধরাল । এবার ও বেশ নিরুপদ্রব ।

অর্পিতার বাবা অফিস থেকে ফিরল সন্ধের দিকে । সে কিছুসময় বিশ্রাম নেওয়ার পর অর্পিতার মা তাকে দোতলার ঘরে নিয়ে গিয়ে মেয়ের ব্যাপারে সব তাকে বলল । অর্পিতা তখন নিজের ঘরে বসে গান শুনছে আপন মনে ।
সব শুনে অর্পিতার বাবা হেসে উঠলো ।
সে বলল,’’তাই বুঝি ? এমন উন্নতি আমার মেয়ের ? তবে এ উন্নতি অনিবার্য । আজকের সময়ের সাথে আমি বা তুমি তাল মিলাতে পারবো না । জেট গতিতে এগিয়ে চলেছে সব । তুমি ওকে বলতে বলছ আমাকে । সে আমি বুঝেছি । বাট আমি অপারগ । আমি নিজেই লজ্জায় মরে যাবো । ওর ভালোমন্দ ওকে বুঝতে দাও । আর কোথায় লেখা আছে মেয়েরা সিগারেট বা মদ খেতে পারবে না ? থেমে যাও,ডার্লিং । নতুন প্রজন্মকে অবাধে এগোতে দাও ।‘’
অর্পিতার বাবার কথা শুনে ওর মা বেশ বিরক্ত তখন ।
সে রাগত-স্বরে তাকে বলল,’’অপুর ব্যাপারেও তুমি এমন করেছিলে । আজো করলে । আমি একা কী করি ?’’
এবার হাসতে থাকলো অর্পিতার বাবা ।
সে একমুখ হাসি নিয়ে বলল,’’অপুর ব্যাপারে আমি সফল । বুঝতে পারো না কিছু ? কিন্তু অর্পিতার ব্যাপারে আমি শুধু তোমাকেই স্পিচ দিলাম । ওকে আমি মরে গেলেও কিছু বলতে পারবো না । কাল আমাকে নারী-স্বাধীনতা নিয়ে একটা ভাষণ দিতে হবে । তাই তার আগে ছন্দ কাটতে রাজী নই । বাদ দাও বাজে ব্যাপার ।‘’

রাতের দিকে অর্পিতা এলো বাবার কাছে সাহিত্যের কি ব্যাপারে আলোচনা করতে । সে তখন সুখটান দিচ্ছিল বেশ । বাবাকে দেখে অর্পিতা স্মিত হাসল ।
পরে জিজ্ঞেস করলো,’’মেয়েদের বুঝি সিগারেট খাওয়া বারণ ? কোথাও এমন কথা লেখা আছে ? তুমি জানো কিছু এ ব্যাপারে ?’’
সঙ্গে-সঙ্গে বাবা একগাল হেসে ওর হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলতে থাকলো,’’লজ্জা দিস না আমাকে । এ কোত্থাও লেখা নেই । আর থাকবেই বা কেন ? বিচার-বিবেচনা নিজের ওপর । এ নিয়ে আবার ফতোয়া কীসের ? মেয়েদের সিগারেট খাওয়া চলতেই পারে । আমাদের অফিসের দুজন মহিলা দিব্যি টানে আমাদের সামনেই । তাতে কী ? তবে একটা কথা বলি তোকে ।‘’
কথাগুলো শেষ করে অর্পিতার বাবা এক চিলতে হাসল । বাবার দিকে বেশ অবাক-দৃষ্টিতে তখন অর্পিতা চেয়ে থাকলো ।

‘’তোমার কথাটা কী,বাবা ?’’
সাগ্রহে অর্পিতা জিজ্ঞেস করলো ।
ওর বাবা তখন বেশ বিজ্ঞের সুরে বলতে থাকলো,’’কাউকে দেখে কিছু করবি না । এতে নিজের জাত-মান আর থাকে না । বান্ধবীরা খেলে খেতে হবে,তা কেন ? তোর মন কি চায় খেতে ? তাহলে খাস । আর মনঃসংযোগের ব্যাপারটা ধাপ্পা । ও প্রচলিত কথা । হৃদয় সবথেকে মনঃসংযোগকারী । হৃদয় যা চাইবে করবি । আসলে সত্যিকারের হৃদয় থাকলে কোনোকিছুতেই সমস্যা হয় না ।‘’
তারপর অর্পিতার বাবার আর সময় ছিল না । সে সারা মুখে হাসি নিয়ে বাজারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো । অর্পিতা চুপ করে বসে থাকলো কিছুক্ষণ ।

এরপর অর্পিতা নিজের ঘরে গেলো । প্যাকেটে তখন চারটে সিগারেট ছিল । অনেকক্ষণ ভাবতে ভাবতে ও সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলো । তারপর চুপিচুপি বাড়ির ছাদে গিয়ে প্যাকেটের মধ্যে দুটো কাঁচের গুলি দিয়ে প্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো বাড়ির পাশের জঙ্গলে ।
নীচে নেমে এসে ও মাকে তৃপ্তির হাসি হেসে সে কথা জানালো । জেনে ওর মা তো আনন্দে আত্মহারা ।
ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে স্বস্তির হাসি হাসতে হাসতে বলল,’’অমন সব্বনেশে কাজ আর করিস না । তুই ভালো মেয়ে না ?’’
নিজে ভালো না মন্দ,তা নিয়ে বিচার করার সময় তখন ছিল না অর্পিতার । তাই এক ফালি হেসে আবার নিজের ঘরে চলে এলো ।

কিন্তু বাবা বাজার থেকে ফিরতে অর্পিতা ওর বাবাকে বলতেই সে বলে উঠলো একটু আনমনে,’’কি যে করিস ছাই । এভাবে নেশা ঘোচে ? চলতে চলতে একটু একটু করে থেমে যায় । তুইও দেখছি অপুর মতোই । ধুস... আর ফেলবি কেন তুই ? আমার পয়সায় কেনা না ? আমাকে দিতে পারতিস ।‘’
বাবার কথা শুনে বেশ লজ্জা পেলো অর্পিতা । বাবার শেষ কথায় বেশ মনমরা হল ও । ওর মাও ছিল কাছে ।
সে বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে বসলো অর্পিতার বাবাকে,’’কি যে বলি তোমাকে । মেয়েটা আনন্দ করে বলতে এলো । আর তুমি কিনা... তুমি যে কি আজো বুঝলাম না ।‘’
অর্পিতা মার কথার মাঝে নিজের ঘরের দিকে মাথা নিচু করে হাঁটা দিয়েছে  । ওর যাওয়া দেখে ওর বাবা এক চিলতে হাসে ।
আর অর্পিতার মার কথায় উত্তর দেত সে,’’এ যুগে অভিভাবক হওয়া খুব কঠিন গো । অনেক প্যাঁচ আছে তাতে । তুমি খুলতে জানো না । চুপ করে থাকো । মেয়েকে আরও ভাবতে দাও । আমার আর ভাবার কিছু নেই । একটু কফি কর । জমিয়ে পান করা যাক ।‘’



চন্দনকৃষ্ণ পাল

ঘরে একটা জানালা চাই

(১)

চা বাগান ছাড়িয়ে জঙ্গল এলাকায় ঢোকার মুখে জরিন বাগানের নিজস্ব রাস্তা। দীর্ঘ একটা হর্ণ দিয়ে বাসটা থামে। দুতিন জন নামে। কেউ ওঠে না। হেলপার বাসের  জোরে দুটো থাপ্পর লাগায়। বাস চলতে শুরু করে। দুপাশে পাহাড়। সবুজ গাছ-গাছালী অন্ধকারে ঢেকে আছে। ঝিঁ ঝিঁর মিলিত কলতান। পিচ ঢাকা কালো পথে ছুটে চলেছে বাস। চমৎকার লাগছে তপুর কাছে। দীর্ঘদিন পর শমসেরনগর যাচ্ছে। অথচ এক সময় প্রায় সপ্তাহেই একবার যেতো। গৌরাদা, সাধনদা, সায়েক, দীপংকরদের সাথে আড্ডা হতো শমশেরনগর বাগান মাঠের সুবজ ঘাসে। কিংবা কালীবাড়ীর দেয়াল ঘেরা চত্তরে। আজ সব স্মৃতি হয়ে আছে। যে রাস্তা দিয়ে এই মুহূর্তে সাই সাই করে বাস ছুটছে এই রাস্তা বছর দুয়েক আগেও ছিলো কাঁচা। কিছু জীপ, মাইক্রোবাস চলতো ধুকে ধুকে। যখন তখন আটকে  যেতে কাদায়। কতো বদলে গেছে। এক সময়ের গভীর ভানুগাছ পাহাড় এখন হালকা হয়ে গেছে। অবৈধ গাছ কাটার ফলে ফরেষ্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেট ভরেছে কিন্তু মূর্খগুলো জানে না এই দেশের পরিবেশের কত বড় ক্ষতি করছে তারা দিনের পর দিন।
শ্যামলী রেস্ট হাউজের পাশে এসে বাস থামে। বড় সাইজের বোঝা নিয়ে হাচড়ে পাচড়ে ওঠে এক লোক। বাস আবার চলতে শুরু করে। ভানুগাছ চৌমুহনীতে আসতেই বাস প্রায় খালি হয়ে যায়। শামসের নগরের যাত্রী তপু সহ গোটা কয়েক। দুচারজন ওঠে। বাস আবার চলতে শুরু করে। শংকরদার কথা খুব মনে পড়ে তপুর। কমলগঞ্জের সাংস্কৃতিক অংগনের চেনামুখ। অনেকগুলো সংকলনের সম্পাদক, বাংলার বানীর কমলগঞ্জ প্রতিনিধি। নিজের কাজের প্রতি নিবেদিত প্রায়। কাউকে বুঝি এদেশ থাকতে দেবে না। শংকরদা আর্থিক কারণে দেশ ছাড়া। মেধাবী ছাত্র প্রিয় বন্ধু মোহন এখন কেমন আছে কে জানে। কলেজ জীবনের সোনালী দিনগুলোতে তপু মোহন এতো কাছাকাছি ছিলো যে তখন কেউ কল্পনাও করেনি কত বড় বিচ্ছেদ অপেক্ষা করছে ওদের জন্য। প্রথম দিকে পত্র যোগাযোগ ছিলো। একসময় ক্ষীণ হতে হতে এখন আর পত্র লিখা হয় না দুজনের কারোরই। তপু শুনেছে বাবার লাইব্রেরী দেখা শুনা করেই সময় কেটে যায় মোহনের। ধলাই ব্রীজ পার হয়ে শমসেরনগরের দিকে ছুটতে থাকে বাস। কামুদপুর এসে মাত্র তিনজন ছাড়া সবাই নেমে যায়। বাস চলতে শুরু করে আবার। একটু পরেই শমসেরনগর কালী বাড়ীর পাশে এসে থামে বাস। রাত নটা তিন। তপু বাস থেকে নেমে শীলুদের দরোজায় কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে ছিটকিনি খুলে দরজার একটা পাল্লা ফাক করে মুখ বের করে কেউ। তপু তাকায়। শীলু।
ঃ দাদা মনি।
ঃ হ্যা।
ঃ ভিতরে এসো।
তপু ভিতরে পা রাখে।

(২)

তপুর মামাতো বোন কাঞ্চন। কাঞ্চনটা অন্য দশটা মেয়ে থেকে আলাদা। আর এ জন্যই তপুর কাছে খুব প্রশ্রয় পায় কাঞ্চন। সেবার ফুলদার বিয়েতে অসুস্থ শরীর নিয়েই তপুকে যেতে হলো। না হলে কাঞ্চন বিয়েতে নেই। অবশ্য অসুস্থতা সত্ত্বেও কোন সমস্যা হলো না তপুর। কাঞ্চন ব্যস্ত থাকলেও ওর প্রিয় বান্ধবী শীলু সঙ্গ দিলো ওকে। কাঞ্চনের দাদামনি শেষে শীলুরও দাদামনিতে পরিণত হলো। বিয়ের অনুষ্ঠানাদির ফাকে তপু জানলো শীলুর বাবা মা ভাইবোন সম্পর্কে। বিয়ের পর একদিন কাঞ্চন বেড়াতে নিয়ে গেলো শীলুদের বাসায়। সেই থেকে কাঞ্চনদের ওখানে যতোবার গিয়েছে তপু শীলুদের বাসায় একবার ঢু মারতে হয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিচয় গভীর ঘনিষ্টতায় পরিনত হয়েছে। তপু শীলুদের পরিবারের একজনের মতই হয়ে গেছে। সময় গড়িয়ে গেছে অনেক। শীলুর বাবা মারা গেলেন। তিন বোনের বড়জনের বিয়ে হয়ে গেলো। শীলু আর ওর বড় বোন লীলা গ্রাজুয়েশন করে স্থানীয় গালর্স স্কুলে চাকরি নিলো। এক ভাই, মা আর দু বোনের সংসার ভালোই চলছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটলো দুর্ঘটনা। শীলুদের একমাত্র  ছোট ভাই রতন জন্ডিসে আক্রান্ত হলো। নানান চিকিৎসার পরও কিছু হলো না। লিভার সিরোসিসে মারা গেলো রতন। খরব পেয়ে তপু গেলো। মাসীমা পাথর হয়ে আছেন। লীলা শীলা শুকিয়ে অর্ধেক। কেউ ভাবেনি এরকম হঠাৎ করে চলে যাবে রতন। বুঝালো তপু। কিন্তু কিছুটা শান্ত হলে কর্মস্থলে ফিরলো তপু। নিয়মিত খোজ খবর রাখতো। শীলু ও চিঠি লিখতো। মাস খানেক আগে একটা চিঠি পায় তপু। চিঠি পড়ে চমকায়। একটা সমস্যা ঘনিয়ে ওঠেছে শীলুদের সম্পত্তি নিয়ে। শীলুর বাবা মৃত্যুর পূর্বে রতনের নামে সব স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি লিখে দিয়ে যান। শর্ত থাকে যতোদিন শীলু লীলার বিয়ে হচ্ছে না ততোদিন এই সম্পত্তি রতন হস্তান্তর কিংবা বিক্রী করতে পারবে না। মাসীমার মৃত্যু পর্যন্ত সমস্ত সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশের মালিক মাসীমা। মামীমার মৃত্যুর পর লীলা শীলার বিয়ের পর সম্পূর্ণ সম্পত্তির মালিক হবে রতন। কিন্তু রতন মারা যাবার পর শীলুদের সৎ ভাইরা গ্যাঞ্জাম পাকাচ্ছে (শীলুর বাবা দুটো সংসার করেছিলেন প্রথম পক্ষে দুই ছেলে, শীলুরা ২য় পক্ষের সন্তান)। ওরা শীলুদের সম্পত্তি দাবী করছে। জোট বাধছে শহরের বখাটে আর টাউটদের নিয়ে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার শহরের গন্যমান্য ব্যক্তিরা অসহায় মেয়ে দুটোর পক্ষ ছেড়ে ঐ পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বড় অসহায় অবস্থায় পড়েছে শীলুরা। তপু চিঠি পেয়ে ভাবে যেমনি হোক তাদের এই দুঃসময়ে পাশে গিয়ে দাড়াবে। কিন্তু তপুর চাকরি তাকে সময় দেয় না। তপু চিঠি লিখে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সে আসবে। ওরা যেন ভেঙ্গে না পড়ে।স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিতেও বলে তপু। ইতিমধ্যে একমাস চলে গেছে। তপু আর কিছুই জানে না। ওর বিশ্বাস ঈশ্বর অসহায়দের সাহায্য করেন। লীলা শীলুরা এ বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারবে। গতকাল বাড়ী ফিরেই সিদ্ধান্ত নেয় তপু প্রথম কাজ শীলুদের সাথে দেখা করা। আজ তাই শীলুদের বাসায় চলে এসেছে তপু।

(৩)

ঃ কেমন আলো দাদামনি।
ঃ ভালোই। তোরা কেমন?
ঃ আছি। অনেক দূর থেকে যেন উত্তর দেয় শীলু।
ঃ মাসীমা আর লীলা কোথায়।
ঃ ওপরে।
ঃ তোদের কি খবর বলতো। আমিতো সাথে সাথে আসতে পারিনি। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।
ঃ এসেছো যখন সব শুনবে। বসো। আমি মা আর মেঝদি কে বলে আসি।
শীলু সিঁড়ির দিকে চলে যায়। তপু রুমের দেয়ালে চোখ রাখে। মেসো ছিলেন শ্রমিক নেতা। সারাটা জীবন কাটিয়েছেন চা শ্রমিকদের মাঝে। শ্রমিকদের দুঃখে কষ্টে এই মানুষটাই সবার আগে ছুটে গেছেন। কিন্তু এদেশ এ মহান মানুষটির মুল্যায়ন করেনি। দেয়ালে মেসোর কটি ছবি। এর মধ্যে কবি দিলওয়ার এর একটি কবিতা যা মেসোকে উৎসর্গ করেছেন কবি।
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা যায়। লীলা নেমে আসে। শুকিয়ে গেছে অনেক। তবুও মুখে হাসি লেগে আছে। এই মেয়েটিকে দেখে অবাক হয় তপু। ঝড় ঝঞ্ঝা সব কিছুতেই স্থির অবিচল এই মেয়ে। যেন সংগ্রাম করতেই জন্ম ওর। বি.এ কমপ্লিট করছে। প্রস্তুতি নিচ্ছিল এম.এ এর কিন্তু এর মধ্যেই এই দুর্ঘটনা।
ঃ কেমন আছে তপুদা? একটু বিষন্নতা খেলা করে লীলার কণ্ঠে।
ঃ ভালো। তোমাদের খবরাখবর বলো।
ঃ চলছে। হাসে লীলা।
ঃ তুমি বদলালে না।
ঃ লাভ নেই। যাক এসেছেন যখন সব বলবো। শীলু চা আনছে। চা খান। তারপর কথা বলি।
শীলু দু কাপ চা রাখে ছোট টেবিলটাতে দুজন দু কাপ চা তুলে নেয়। একটা হালকা চুমুক দিয়ে লীলা শুরু করে।
রতন মারা যাবার পর ওর মৃত্যু পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতায় দাদারা যোগ দেয়। অনুষ্ঠানাদির পর একদিন বড়দা জানায় বাবার দলিলের শর্তের কথা ওরা জানে। রতন না থাকায় এখন ওরা এ সম্পত্তির মালিক। মূল বিল্ডিং এর সামনের দোকানগুলো এই মুহূর্তে দাবী করে তারা। লীলা শীলা স্থম্ভিত হয়ে যায়। যুগপৎ ক্ষোভ এবং দুঃখ জমে দাদাদের লোভ দেখে। লীলা তারপরও বাঝায় যে ওরা চিরদিন থাকবে না এ সংসারে। বিয়ের পর দাদারাই হবে এর মালিক। মা কে দাদারাই দেখা শুনা করবে। সম্পত্তিও ওরাই ভোগ করবে। এই মুহূর্তে লীলা শীলু অসহায়। দোকান গুলোর সামান্য আর আর স্কুলের বেতনে চলতে হচ্ছে। কিন্তু দাদারা ওসবে পাত্তা দেয় না। সোজাসুজি না হলে বাকা পথ ধরবে জানালে লীলার  রোখ চাপে। লীলা জানায় তাদের যা ইচ্ছে তা তারা করতে পারে। এরপর থেকে পিছু লেগেছে দাদারা। নানা ধরনের কথাবার্তা রটাচ্ছে বাজারে। দল গড়ছে। রাতে দরজায় কারা জানি ধাক্কা দেয় ঢিল ছুড়ে। স্থানীয় থানায় নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছে লীলারা। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার যারা সার্বক্ষণিক ওদের সহায়তা করতো। সুখে দুখে এগিয়ে আসতো আজ তারা ঐ পক্ষে। বাসায় তো কেউ আসেই না। রাস্তায় ওদের দেখলে অন্যদিকে তাকায়। তাদের এই অসহায় অবস্থায় লীলার স্কুলের হেড মাস্টার সহায়তা করছেন। কিন্তু লীলা জানে হেডমাস্টার স্বার্থ ছাড়া কিছুই করেন না। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সহায়তা নিতে হচ্ছে। মাঝখানে দুপক্ষে দুটো মামলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনে এবং সহকারী জেলা প্রশাসক ও জড়িয়েছেন। লীলা জানে না কবে তারা মুক্তি পাবে এই ঝামেলা থেকে।
লীলা থামে। ওকে ক্লান্ত বিমর্ষ মনে হয়। প্রচুর দৌড়তে হচ্ছে ওকে। একে ওকে ধরতে হচ্ছে। মামলা চালাতে হচ্ছে। অথচ এমন একজন পুরুষ মানুষ নেই। যে সার্বক্ষণিক সহায়তা করবে।
তপুর নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। মনে হয় এদের কাছে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ওর চাকরি আছে। আছে ওদের নিজেদের নানান সমস্যা। বুকের ভেতর একটা কষ্ট চেপে বসে তপুর।

(৪)

রাত প্রায় সাড়ে দশটায় ওঠে দাড়ায় তপু। কাঞ্চনদের ওখানে যেতে হবে। কাল সকালে আবার আসবে জানিয়ে শীলু লীলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় নামে তপু। নিরব হয়ে এসেছে বাজার। প্রায় সবগুলো দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। স্টেশন পেরিয়ে নামা বাজারে পৌছে তপু। মাথার ভেতর লীলার কথাগুলো ঘুরছে। ঘরের ভেতর যে ব্যাপারটা শেষ হতে পারতো আজ তা জেলা প্রশাসন পর্যন্ত গড়িয়েছে। আর এর পেছনে কাজ করছে ক্ষোভ, জেদ, আবেগ। নানা লোক নানা ধরণের ফায়দা লুটছে এ থেকে। সর্বোপরি ক্ষতি হচ্ছে অবিবাহিতা মেয়ে দুটোর। নানা রটনা ওদের ভাবিষ্যতকে কন্টক পূর্ণ করছে। 
তবুও তপু ভাবে লীলার সাহস আছে। লীলা ছাড়া অন্য কেউ এই সমস্যায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারতোনা। তপু লীলাকে কাল বুঝাবে পুরো ব্যাপারটা। একটা সমোঝোতায় আসা যায় নাকি চেষ্ট করতে বলবো। না হয় তপু নিজে দাদাদের সাথে আলাপ করবে। ওদের মতামত গতিবিধিও জানা দরকার। একটা সমাধান খুব তাড়াতাড়ি প্রয়োজন। না হলে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে লীলারা। না এটা হতে দেয়া যায় না।
হাইস্কুল পার হয়ে মাটির রাস্তায় নামে তপু। সামনেই বিশাল গোরস্থান। ছোট ছোট ঝোপঝাড়ে পূর্ণ। লালমাটির ছোট ছোট টিলার ওপর বাড়ী ঘর। রাস্তার বাঁক পেরোতেই খোলা মাঠ। এক পাশে গম্বুজওলা মসজিদ। আকাশে টুকরো টুকরো সাদা মেঘ ত্রয়োদশীর বেশ বড় সড় চাঁদের সাথে লুকোচুরি খেলছে । তপু পশ্চিম দিকে হাঁটছে। কাঞ্চনের বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় দুবছর। গৌরাদা প্রায় পাচ ছয় বছর ধরে দেশের বাইরে। মামার বাড়ীটা খালি। মামা মামি ফুলদা আর ফুল বউ। অন্য দুটো ভাই একজন সিঙ্গাপুরে। অন্য জন সিলেটে থেকে পড়াশুনা করছে। অথচ এক সময় কি জমজমাট ছিলো এ বাড়ী। ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে। ডাক্তারবাড়ী পার হয় তপু। টুকলুদির কথা মনে পড়ে। অসাধারণ সুন্দরী ছিলো টুকলুদি। বিয়ের পর চলে  গেছে কলকাতা। টুকলুদির স্বামী কোলকাতায় বড় চাকরী করে। টুকলুদি কি আদর যে করতো তপুকে। তপুর চিবুক ছুয়ে বলতো মনে রাখিস তপু তোকে অনেক বড় হতে হবে। কতটুকু বড় হতে পারলো তপু?
হাতের ডান পাশে খুকুদের বাড়ী। সেই ছোট খুকু এখন ক্লাশ টেনে পড়ে। খুব সুন্দর হয়েছে খুকু। এক সময় খুকুকে দেখলেই নীরেন চক্রবর্তীর একটা কবিতা আওতাড়াতো তপু। কবিতাটা আসলেও সুন্দর-
খুকু ঘরে একটা জানলা চাই
বাইরে একটা মাঠ
ওঠোনে একটি মাত্র কাঠ
 গোলাপের চারা
আস্তে সুস্থে বড় হোক
কিছু নেই তাড়া
একদিন সকালে নিশ্চয়ই দেখবো
 যে তার ডালে ফুল ধরেছে।
খুকু
আর কিছু  তো চাইনি আমি
 চেয়েছি এই টুকু.....
কবিতা শুনে খিলখিল করে হাসতো খুকু। কাল খুকুকে একবার দেখে যেতে হবে। বড়পুল পেরিয়ে বটতলার পাশ কাটায় তপু। পুকুর পাড়ে বিশাল মন্দির অশত্থ গায়ে জড়িয়ে নির্বাক দাড়িয়ে আছে। পাকা ঘাটলার পাশের বড়ই গাছটার নীচু ডালটা সেই দশ বছর আগের মতোই পানি ছুয়ে আছে। শ্রীবাস, গৌরাদা আর তপু কতো লাফিয়েছে এই ডালে চড়ে। কতো দিন যে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার কি ইয়ত্তা আছে। ঘাটলা পেরিয়ে সুপারি গাছের সারির ভেতর দিকে বাড়ীর দিকে হাঁটে তপু। হিমুদার বাড়ীতে বোধ হয় নারায়ন সেবা। কীর্তন হচ্ছে।
তপু ফুলদার রুমের দরোজায় দাড়িয়ে হাঁক ছাড়ে।
ঃ ফুল বৌদি, ও ফুল বৌদি।
ঃ কোন গুন্ডারে এই রাত দুপুরে ষাড়ের মতো চেচাচ্ছে।
ঃ আরে দরোজা খুলেই দেখো না তোমার প্রিয় বর দরোজায়।
দরোজা খুলে দেয় ফুল বউ। চাঁদের আলোতে ফুল বউ এর হাসি মাখা মিষ্টি মুখটা চমৎকার লাগে তপুর কাছে। ফুল বউ হাসে। ,
ঃ আয় ভিতরে আয়। 
ও ঘর থেকে মাসীমা সাড়া দেন।
ঃ কে রে তপু নাকি।
ঃ হ্যা মাসীমা। ফুল বৌর হাত ধরে মামাীমার রুমের দিকে হাঁটে তপু।
কাঞ্চন, গৌরাদার শূন্যতার মধ্যেও একটা বিষন্ন ভালোলাগায় ভরে যায় তপুর মনোজগত।


আফরোজা অদিতি

চিঠি


  পিয়ন এসে একটি চিঠি দিয়ে গেল। রেজিস্ট্রি চিঠি। আবদুর রহিমের পক্ষ থেকে পাঠিয়েছে কোন এক উকিল সুবোধ বাবু । উকিলের চিঠি। সেটি হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে খোলার কথা মনেই পড়লো না। আবদুর রহিম আমার স্বামী। দুই বছরের সংসারের স্বামী।

   নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে আমার; গালি দিতে ইচ্ছা করছে নিজেকে। পাঁচ পাঁচটি বছর ছেড়ে এসেছি স্বামীর বাড়ি আমার পরিবার, ঘরবসত। এই পাঁচটি বছর খোঁজ নেয়নি, নেওয়ার বোধকরি সময় হয়ে ওঠেনি তার! ভাত-কাপড় দেওয়ার ইচ্ছা বা তাগিদ অনুভব করেনি সে, দেখা করার ইচ্ছাও হয়নি তার। এতদিন পরে উকিলের মাধ্যমে চিঠি দেওয়ার সুযোগ এবং ইচ্ছা হয়েছে তার! এই চিঠির ভাষা কী হতে পারে তা যে কেউ আন্দাজ করতে পারে বা পারবে, আমিও পারছি।

   স্বামীর বাড়িতে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি সকলে মিলে প্রতিদিন অপমান করেছে, শারীরিক মানসিক অত্যাচার নিপীড়ন করেছে, সেসব কথা ভুলে গিয়েছিলাম। এতদিন পর নতুন করে সেই অপমান-অসম্মানের কথা মনে পড়তে লাগল। পুরানো অপমান অসম্মানের সঙ্গে আবার নতুন করে অপমান-অসম্মান! কিন্তু কেন এই অসম্মান, এই অপমান, নিপীড়ন; নতুন নতুন পদ্ধতিতে কেন হেনস্থা করা বারবার! আমি নারী তাই? লেখাপড়া শিখিনি তাই? দেখতে ভালো নই, কুৎসিত সেই কারণে! কেন ? কেন? এই অত্যাচার! আমার কেনর উত্তর দেওয়ার মতো আশেপাশে কেউ নেই। শুধু একটি বিড়াল মিঁয়ো মিঁয়ো শব্দে তার অবস্থান জানান দিয়ে জানালা দিয়ে লাফিয়ে বাইরে চলে গেল।

   এই বাংলার শত শত নারীর মতো একদিন জন্ম হয়েছিল আমারও। জন্মলগ্নে কোন ন্‌ক্ষত্রের আলোর কণা খুলে পড়েছিল কিনা জানি না; কোন রাহুগ্রাস ছিল কিনা জানা নেই আমার। শুধু জানি আমার সুখ নেই; রাহু গ্রাস করেছে আমার সুখ, আমার আনন্দ, আমার জীবন।আমি বিংশ শতাব্দির নারী। কুসংস্কারে বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না। ভাগ্য স্বীকার করি না। তবুও মাঝে মাঝে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয় এই মন; ভাগ্যকে না মানলেও ভাগ্যের খেলাকে স্বীকার করতে বাধ্য হই! ভাগ্যকে জয় করার জন্যই মুখ বুঁজে এতটা পথ চললাম, একলা একা পথ চললাম পাঁচটি বছর; সহ্য করলাম এতকিছু কিন' কিছুই তো আমার পক্ষে গেল না! ভাগ্যে না থাকলে এই রকম চিঠি আসার কথা নয়, আসতে পারে না! আজও ভাগ্যকে স্বীকার করলাম, মানলাম। বাবার অবস্থা ভালো নয়। বিয়ের সময় মোটর সাইকেল নয় একটা সাইকেল আর একটা রেডিও দেবার কথা ছিল; দিতে পারেনি। বাবা রিটায়ার্ড করেছিল, ছোটখাট একটি চাকরি করতো; আমরা ভাইয়ের সংসারে থাকতাম। ভাই দিতে পারলেও দেয়নি; সেই অজুহাতে প্রতিদিন টুকরাটাকরা কথা কাটাকাটি চড় থাপ্পড় চলতোই। কথায় কথায় বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইতো শাশুড়ি। স্বামী তাল মেলাতো ওদের কথায়, মারতো আর বলতো ‘হারামজাদী চলে যা। দূর হয়ে যা।’ একদিন মার সহ্য করতে না পেরে স্বামীর চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘চলেই যাবো।’ আমার মাথা তুলে দাঁড়ানো সহ্য করলো না স্বামী। বলল, ‘যা না যা, কোন চুলায় যাবি যা। দেখি তোর কোন ভাতারে তোরে খাওয়ায়। কোন বাপে কোলে তুলে রাখে।’ ধাক্কা দিয়ে বাড়ির বাইরে বের করে দিলো।

    এখন যাবো কোথায়? বাবার অবস্থা ভালো নয়! আর ভালো হলেই বা কী! কে কার? আমি তো অষ্টম শ্রেণি। তবুও সেদিন আর ঐ বাড়িতে ফিরে যাইনি। আত্মহত্যা করার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠেছিল। আত্মহত্যা মহাপাপ; আত্মহত্যা করলে অপরিতৃপ্ত আত্মা মানুষের চারপাশে ঘুরঘুর করে ঘুরে বেড়াবে এই পৃথিবীতে; আত্মার কষ্ট হবে। ইহলোকে তো শান্তি পেলোই না পরকালও নষ্ট হবে। নষ্ট হলে হবে, হোক। অনেক ভাবনা-চিন্তা করে ঠিক করলাম এই জীবন আর রাখবো না। ঘুমের ওষুধ, পোকা মারার ওষুধ, ইঁদুর মারা বিষ কোনটাই পছন্দ হলো না।  ঠিক দুপুর বেলা খোলা চুলে দাঁড়ালাম; দাঁড়ালাম বুড়িগঙ্গার ব্রীজে।শুনেছি দাদি নানিদের মুখে ‘ঠিক দুক্কুর বেলা ভূতে মারে ঠেলা’ এই তো সময়, শুনশান নিরব!  নিচে খরস্রোতা নদী। খোলা চুল উড়ছে বাতাসে। নিচে তাকিয়ে ডাকলাম ঈশ্বরকে! ক্ষমা করো ঈশ্বর, ক্ষমা করো আমাকে! মাফ করো আমায়, অধম বান্দা আমি তোমার! এই জীবন থেকে পালানো আমাকে ক্ষমা করো, আমার অক্ষমতা ক্ষমা করো! দুই চোখ উপচে পড়লো জলের ধারা। কিছুক্ষণ কেঁদে চোখ মুছে তৈরি হই নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য। ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্তে মনে হলো দুটো শক্ত হাতের বেষ্টনিতে বন্দী হয়েছি আমি! এখানে তো কেউ ছিল না, জনমানবহীন, তবে কে?
   ‘এই মেয়ে  কী করো?’ কণ্ঠে নরম ধমকের সুর।
   ‘ দেখছেন না, কী?’ উষ্মা প্রকাশ করি।
   ‘আত্মহত্যা করা পাপ জানো না! আত্মহত্যা কেন করবে? এই জীবন কতো সুন্দর তুমি জান না!’
   ‘সুন্দর আপনার কাছে! আমার কাছে না।’ কণ্ঠের রাগ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। মানুষটি একটুও রাগ না করে বলে, ‘সুন্দর জীবন নিজে নিজে গড়ে নিতে হয়, কেউ হাতে ধরে দিয়ে যায় না!’
    ‘আপনার লেকচার থামান তো, ভালো লাগছে না আমার।’ কাঁদতে থাকি। আমার কান্না দেখে মানুষটি নরম সুরে বলে, ‘মরতে এসেছ কেন? একটা জীবন কী তুমি দিতে পারো যে জীবন নিতে এসেছ।’
‘আমি না মরলেও ওরা তো মেরেই ফেলবে আমাকে। আমাকে ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন আমাকে।’ ওর হাতের ভেতর ধরা হাতখানি ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করি। জোরাজুরিতে একসময় ছাড়া পেয়ে দৌড়াতে থাকি। সেও দৌড়াতে থাকে। ওর সঙ্গে দৌড়ে পারি না। চেঁচিয়ে বলি, ‘পিছু নিয়েছেন কেন? পুলিশ ডাকবো, বলবো আপনি ডিস্টার্ব করছেন! এরপরেও বিরক্ত করলে খামচি দিবো।’ আমার কথায় মানুষটি হাসে। দিক ভুলানো হাসি।  আমি আরও রেগে যাই। বলি, ‘হাসছেন কেন?’
কথার উত্তরে মানুষটি বলে,‘হাসছি না, তোমার তেজ দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। এমন তেজ আর তা কাজে না লাগিয়ে এসেছ মরতে! যা এটা কোন কাজের কাজ হলো! এই পৃথিবীতে মরা ছাড়াও অনেক অনেক কাজ আছে; মৃত্যুর চেয়ে জীবন কতো মধুময় তা জানো না বলেই মরতে এসেছ।' মাথা নিচু করে থাকি। একটু অপেক্ষা করে বলে, ‘কোথাও বসি, কিছু কথা বলি তোমার সঙ্গে।’
‘এখানে বসবো কোথায়? বড্ড রোদ্দুর।’
‘রোদ্দুর তো কী হয়েছে? ছায়ার কী প্রয়োজন আছে?’
ওর কথায় লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলি। খুব আস্তে বলি, ‘তাইতো যে মানুষ মরবে বলে এসেছে তার রোদ বা ছায়ায় কী আসে যায়!’ আমার কথা শুনে হাত ধরে; এই ধরার মধ্যে কোন দ্বিধা নেই, নেই কোন সংকোচ। আমরা ব্রীজ থেকে নেমে নদীর ঢালুতে গিয়ে বসি। ওর পরিচয় দেয়; ও সাব্বির। এম.এ করেছে। বেকার কোন চাকরি জোটাতে পারেনি এখনও। টো-টো কোম্পানির ম্যানেজার; বাবার হোটেলে চলছে খাওয়া দাওয়া! নিজের পরিচয় দিয়ে আমার নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করে। নাম বলি; ভেবেছিলাম নাম পাল্টে দিবো কিন' বলতে পারিনি। মিথ্যে কথা গুছিয়ে বলতে পারি না। নাম বলে সব কিছু অকপটে খুলে বললাম।

   আমার সব কথা শুনে নদীর স্রোতে চোখ রেখে বলল, ‘যদি কিছু মনে না করো, আমার ফোন নম্বর রাখো, বাড়ি ফিরে যাও। প্রয়োজনে ফোন করো।’ পরক্ষণে কী একটা ভেবে বলল, ‘ঠিক আছে চলো পৌঁছে দেই তোমার বাড়ি।’ আমার বাড়ি মানে বাবার বাড়ি। এখনও বাবার বাড়িতেই থাকি। ভাই একটা ঘর দিয়েছে সেখানেই থাকি। খাবার ব্যবস্থা নিজেই করি। ওদের ঘাড়ে বোঝা হতে ইচ্ছা করেনি। ওই ঘটনার মাসখানেক পরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে একটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেয় সাব্বির, ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থাও সেই করে। মুরগি খামারের মালিক এখন আমি; ঋণ শোধ করেছি। দিন চলে যাচ্ছিল ভালোই। এতো বছর পর গোল বাধালো এই চিঠি। চিঠিটি হাতে নিয়ে বসে আছি; খুলিনি। পড়িনি। চিঠিতে কী লেখা আছে জানতে হবে, সেই মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। সাব্বিরকে পুরো বিষয় জানাতে হবে। কিন্তু ওকে জানাতে মন চাইছে না।

   আজ রবিবার। আসবে সাব্বির। সাব্বির ওকে চায়, ওরও ভালো লাগে। কিন' ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়’ আমার সেই অবস্থা! অন্য জীবনে জড়াতে ভয়; মনের কথা জানাইনি সাব্বিরকে; জানায়নি সাব্বিরও। হয়তো অপেক্ষা করছে ওর কথা শোনার। আমি পড়াশোনা করছি। সামনে এসএসসি। লোন শোধ করে খামারটি একটু দাঁড়িয়ে গেলে বইপত্তর এনে দিয়েছে সাব্বির। বলেছে,‘লেখাপড়া মানুষকে শক্ত হতে সাহায্য করে। জ্ঞান কখনও চুরি হয় না, জ্ঞান চুরি করা যায় না। জ্ঞান বৃথা যায় না, বরঞ্চ ভাবনা-চিন্তাতে সাহায্য করে।’ সাব্বিরকে কথা দিয়েছি লেখাপড়া করবো। এস.এস.সি দিবো। ভালোভাবে পাশ করতে পারলে আরও পড়বো।

   কিন' এই চিঠি? চিঠিটি খুললে যদি আবার মরতে ইচ্ছা করে। খুব আবেগপ্রবণ আমি। চিঠির মধ্যে যদি অসুন্দর লুকিয়ে থাকে; অসুন্দরে খুব ভয়; অসুন্দর সহ্য করতে পারি না। চিঠিটি কি সাব্বিরকে দিবো; চিন্তা করি। চিঠি খোলার জন্য অপেক্ষা করবো সাব্বিরের; তা কি ঠিক হবে? কিছু কিছু কাজ, কিছু কিছু বিষয় থাকে যা একান্ত নিজস্ব; নিজেকেই করতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজেকেই।

   চিঠি খুললাম। মেলে ধরলাম চোখের সম্মুখে; ডিভোর্স নোটিশ। স্বামী ডিভোর্স দিবে তারই প্রথম নোটিশ। কারণ দর্শানোর নোটিশ। চোখ জ্বালা করছে। বাঙালি নারী ডিভোর্সের কথা শুনলেই চোখ ভরে ওঠে জলে; সেপারেশনে থাকা যায় কিন্তু ডিভোর্স! ডিভোর্স মেনে নিতে কষ্ট হয়! চিঠি মেলে ধরা সম্মুখে; চোখ ভরা জল। অন্যমনস্ক আমার কাঁধে হাতের স্পর্শে চমকে উঠি। সাব্বিরের আসা টের পাইনি। সাব্বির হাত থেকে চিঠি নিয়ে রেখে দিলো টেবিলে। দাঁড়ালো সামনে; বলল, ‘চল খামারে যাই। এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নয়। যা নিজের নয় তা নিয়ে কখনও ভাবতে নেই।’ ওর এই একটি কথাতেই জোর পেলাম মনে; বুঝতে পেরেছি আমার গন্তব্য। ওর বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে উঠে দাঁড়ালাম। 

   

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

শোক

“এই মাত্র পাওয়া খবরে জানা গেছে, বিশিষ্ট অভিনেতা তথা নাট্য নির্দেশক রমেন বাগচীর জীবনাবসান হয়েছে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শিল্পী মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর প্রতি সম্মান দেখাতে আজ নির্ধারিত সমস্ত শুটিং বাতিল করা হয়েছে। শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপণের উদ্দেশ্যে তাঁর মরদেহ আজ সারাদিন রবীন্দ্র ভবন চত্তরে রাখা থাকবে” 
“হইলো, এবাবা, তাহলে ওই সিরিয়ালটার কি হবে? রমেন যে চরিত্রটা করত কী দারুণ করত গো। ও বৌমা, শুধু চা দিলে? তোমায় যে বলেছিলাম অনুপকে স্পেশ্যাল চানাচুরটা দিতে। একটা কথাও যদি মনে রাখ। ওবাবা, এইটুকু কথাতেই তোমার চোখে জল নাকি? আর পারিনে বাপু” 
“ছাড়ুন না মা, ভুলে গিয়েছে হয়ত। বাচ্চা মেয়ে” 
“এই তোমরা ‘বাচ্চা মেয়ে বাচ্চা মেয়ে’ বলে বলে আরোও ওর বারোটা বাজাচ্ছ। যে বয়সে ইনি বিয়ে করলেন, সেই বয়সে আমার খুকু, টুলু দু’জনেই হয়ে গেছে। খোকা তখন হবে” 
“না না, তাছাড়া বুঝতেই তো পারছেন মা, এই রকম একটা খবর আচমকা...” 
“হ্যাঁ, তুমি আর তাল দিও না বাবা। তোমার বউ শুনলে আরোও সব্বনাশ। মানুষ তো মরবেই, তা’বলে কী আত্মীয়কুটুম্ব আসবে না? অতিথি আপ্যায়নে ভুল হবে? তুমি তো এবাড়ির বড় জামাই নাকি? তোমার দিদির মেয়ের বিয়ের সুখবর দিতে এসেছ, সেখানে যত্ন আত্তি করবে না? শিখতেও তো হবে। আমি চোখ বুজলে খুকু, টুলু তাদের বাড়ির লোক নিয়ে আসবে না এ বাড়িতে? যত্তো সব। আর তাও যদি সিরিয়ালে অভিনয় করত বৌমা। তাতেও পড়শিদের কাছে মুখ উজ্জ্বল হতো। উনি তো করতেন থিয়েটার, সেই দেখতে গিয়েই তো খোকার মাথা ঘুরে গেল, মনে নেই?” 
রান্না ঘর থেকে সবই শুনতে পায় টুপুর। লুকিয়ে চোখের জল মোছে। হাহাকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে যেখানে, সেখানে টুঁ শব্দটিও করতে পারছে না। ফোনটা বেজে ওঠে, গলাটা যতোটা সম্ভব স্বাভাবিক করে ফোন তোলে,
 “হ্যালো, বল”
“বল মানে? তুই খবরটা পাসনি?” 
“পেয়েছি। টিভি তো ছাড়াই রয়েছে” 
“তাহলে?” 
“কী তাহলে?”
“যাবি না?” 
“কী করে যাব বলত? অঞ্জনের দিদি জামাইবাবু এসছেন, জামাইবাবুর দিদির মেয়ের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে। মাংস বানালাম, এখন লুচি ভাজছি” 
“হোয়াট? তুই, তুই রমেনদা’র শেষ যাত্রায় না গিয়ে.... তুই কী ভুলে গেলি সব?” 
“কী করে ভুলি বলত? নাঃ, রাখিরে। এখনই খেতে দিতে হবে” 
“তোর বন্ধু কিন্তু ঠিকই বলেছে” 
“বড়দি??!!”  রান্না ঘরে কখন যে খুকু মানে টুপুরের বড় ননদ এসে দাঁড়িয়েছে, টেরই পায়নি টুপুর। 
“শোন, তোর জামাইবাবুকে দেবার পরিমাণ লুচি ভাজা হয়ে গেছে না? ব্যস্ আমি দিয়ে দিচ্ছি। তুই চ’ আমার সঙ্গে” 
“কোথায়?” 
“রমেন বাবুর শেষ যাত্রায়” 
“বড়দি। কিন্তু মামনি...”
“মা কে আমি সামলে নেব। তুই চট করে রেডি হয়ে চলে চল” 
“জানো, বড়দি, আমার কিন্তু রমেনদা’র মৃত্যু সংবাদে যতো না শোক হচ্ছে, তারচেয়ে বেশী হচ্ছিল এই আধুনিক যুগেও এতো অমানবিক আচরণ দেখে। আবার দেখো, তোমার মতো মানুষও তো আছে” 
“এখন আর কথা বাড়াস না, তুইও শিখে রাখ, নিজের সবটা উজাড় করে দিয়েও নিজের টুকু আদায় করে নিতে হয়, সংসারে। সব সময় কী আর কেউ এসে সাহায্য করবে রে?” 
*****
“তুই নিয়ে এলি যে? সে কী এটুকুও শিখে আসেনি বাপের ঘর থেকে, যে, কেউ বেড়াতে এলে তাকে দিয়ে কাজ করাতে হয় না”
“মা। প্রথমতঃ তুমিই না বল, ‘বিয়ে হয়ে গেছে তাতে কী? এটা এখনও তোদের বাড়ি?’ তাহলে, নিজের বাড়িতে কাজ করতে অসুবিধে কোথায়? দ্বিতীয়তঃ, তোমরা সবাই জানো, রমেন বাগচী নামটা টুপুরের কাছে ভগবানের নামের তুল্য। টুপুরকে উনি হাতে ধরে স্টেজে নিয়ে গেছেন, যা কিনা যথেষ্ট বিরল সৌভাগ্য। টুপুরের প্রতিভাকে উনিই বের করে এনেছেন, এবং তাকে যোগ্য সম্মান দিয়েছেন।টুপুর কিন্তু অমন নামজাদা মানুষের নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছে, চূড়ান্ত আনকোরা হয়েও। সে সুযোগও তো ওই মানুষটার সৌজন্যেই।  টুপুর তোমার ছেলের বউ, এর বাইরেও তার একটা পরিচয় আছে, সেটা তো ভুললে চলবে না। আজকের দিনটা অন্ততঃ মানবিক হবে আশা করেছিলাম। কারণ, সে তো তোমাদের কাজের লোক নয়, সে এবাড়ির বউ। এই পরিবারে, আমাদের সবার যতোটা অধিকার, টুপুরের এক বিন্দু কম নয়।
“আমি, টুপুরকে নিয়ে যাচ্ছি; রমেন বাবুর শেষ যাত্রায়। তোমাদের যা যা ইচ্ছে ছিল, সব তো করে দিয়েছে মেয়েটা। এবার তোমরা শাশুড়ি জামাই বসে টিভি দেখো আর খাওয়া দাওয়া করো”
“দেখলে তো বাবা অনুপ? আমি, ঠিক এই আশঙ্কাই করছিলাম। বাইরের লোক লাগে না গো, ঘরের মধ্যেই আমার শত্রু” 
“হ্যাঁ। আজকের যুগে দাঁড়িয়েও যদি একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের কষ্ট বুঝতে পারাটা যদি কারো শত্রুতা মনেহয় তবে তাই হোক। অন্যের কষ্টে তার পাশে না দাঁড়াতে পারলে, তাহলে আমার শিক্ষা বৃথা। তোমার তো গর্ব হওয়া উচিত মা,তোমার মেয়েকে তুমি কতো ভালো শিক্ষা দিতে পেরেছ, ভেবে” 
“মামনি, আমি বড়দি’র সাথে যাচ্ছি....” 
“হ্যাঁ। যাবে তো বটেই। তবে, দেখো, তুমি তাঁর নায়িকা ছিলে বলে কথা, টিভি অলাদের ধরে একটু মুখটা দেখিও কোনো চ্যানেলে। তাহলে তাও সোসাইটিতে বেশ মুখউজ্জ্বল হয়। আমার ছেলের বউ, কি না রমেন বাগচীর নায়িকা। হলোই বা থিয়েটারে” 
“তোমার বলা শেষ? এবার তাহলে আমরা আসি মা? আর হ্যাঁ শোনো, আমাদের জন্য অপেক্ষা কোরো না, কতো রাতে ফিরতে পারব জানি না। তোমার জামাইকে তাঁর খাওয়া হলে, বাড়ি চলে যেতে বোলো। আমরা সেখানে তো শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যাচ্ছি, কাজেই টিভি তে মুখ দেখতে পাবে আশা কোরো না, কেমন?” 
...