গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১৫

আবু রাশেদ পলাশ

বিমোহিতের মায়াকান্না

আমাদের পরিবারে মানুষ আমরা দুজন । আমি আর আমার বউ । একটা মফস্বল শহরে ভাড়া বাসায় থাকি আমরা । মনোহরপুর বাজারের ঠিক পশ্চিমে । পুরনো কংক্রিটের তৈরি । দেওয়ালগুলো শেওলা ধরা, পিছনে জংলা আর প্রকাণ্ড বাঁশঝাড় । বড় ঘরের সামনে খানিকটা জায়গা নিয়ে উঠান । উঠোনে আমার বউয়ের নিত্য পদচারণা, ওর ফুলের বাগান । তাতে কত কত রক্তজবা ।
সম্প্রতি শহুরে একটা কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছি আমি । পড়াশোনার পাঠ চোকেনি এখনো । মফস্বলের ছেলে বলেই হয়তো বিয়েটা একটু আগে হয়েছে আমাদের । কলেজে একই নামে আরও সহপাঠী থাকায় বন্ধুদের কাছে বিয়াত্যে রফিক’- বলে পরিচিতি আমার । শব্দটা এখন বার্ধক্যে পৌঁছেছে  মনে হয়  ছাত্র জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে বন্ধুদের মুখে সম্বোধনের ভাষা পরিবর্তিত হচ্ছে দিনদিন । সভ্যপাড়ায় ভদ্রলোকেরা কেউ কেউ সাহেব বলে ডাকে এখন ।
আমার বউয়ের নাম মৃদুলা । আমি ওকে বর্ষা বলে ডাকি । আষাঢ়ে বাদল হয় এখানে । বর্ষা আমার শ্রাবণের বর্ষা নয়, শরতের জ্যোৎস্না । জানো, আমার ভেতরে একটা আকাশ আছে- এখানে চৈত্রে খরা হয় । ও তখন এক পশলা বৃষ্টির মত । বর্ষা আমার হঠাৎ পাওয়া কোন ঐশ্বর্য নয়, ও সাধনার ধন । ওকে নামতার মত মুখস্থ করা যায়না,অংকের মত বুঝতে হয় ।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে একটা স্কুলে পড়াই আমি । মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা এমনই, জন্মেই বিধাতা সংসারধর্ম পালনের শিক্ষা দিয়ে পাঠায় এদের । তারপর আমরা আজন্মকাল কলুর বলদ হয়ে অভাব পুরনের ব্যর্থ আস্ফালন করি আর অভাব বারংবার দিগ্বিজয়ী বীরের মত কর্তৃত্ব জাহির করে আমাদের উপর ।
বর্ষা- আমার ভরাপূর্ণিমায় চন্দ্রের মত। আমি হয়তো নিগুঢ় আমাবস্যা । তাই ওকে কোনদিন ঐশ্বর্যময়ী জোছনা দিতে পারিনি আমি । ওর চাহিদাগুলোও অপ্রতুল । পাছে আমার অসুবিধা হয়, এটা ভেবে এখন নিজের ইচ্ছা গুলোও প্রকাশ করতে ভুলে গেছে সে । একসময় বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজতে ভাল লাগতো, আমার ওতে অনীহা । এজন্য আজকাল বৃষ্টি হলে বায়না করেনা বর্ষা । জানালার ফাঁক দিয়ে নরম হাত দুটো বাড়িয়ে দিলে বৃষ্টির জল এসে জমা হয় সেখানে । আমার শীতের নরম রোদ ভাল লাগে । আর ভাল লাগে জ্যোৎস্নারাত । আশ্বিনে ভরা পূর্ণিমা হয় । বর্ষাকে নিয়ে তখন উঠোনে বসতি গড়ি আমি । আমি তখন অন্য মানুষ, মনে মনে বাদশাহী মনোভাব আমার । ভরাপূর্ণিমায় আমি জোছনা দেখি । বর্ষা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সহস্রকালের লুকানো ভালবাসা খোঁজে । মাঝে মাঝে বিরক্ত হই আমি, ওর দর্শনে ব্যাঘাত ঘটাই তখন ।
-কি দেখ অমন করে ?
সহসা জবাব দেয়না বর্ষা । হাতের একটা আঙুল মুখের সামনে ধরে থামার জন্য ইশারা করে সে । তারপর নাক বরাবর মুখটা এনে আলতো করে একটা চিহ্ন এঁকে দেয় চোখে  অতঃপর মিহি গলায় কণ্ঠসুধা বিতরণ করে আমার কাছে ।
-তোমার চোখে প্রজাপতির পাখনা মেলো, আর কিছু চাইনা আমি ।
আজ ভরাপূর্ণিমা । আমার দুজন জোছনা দেখছি । জোছনাজলে স্নাত হচ্ছি ক্ষণে ক্ষণে ।
-বর্ষা, সবুরের কথা মনে আছে তোমার ?
আমার প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত । জোছনা সৌন্দর্যে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য যথেষ্ট । মুহূর্তকাল স্তম্ভিত বর্ষা , তারপর তার সহজ স্বীকারোক্তি 
-না তো, কোন সবুর ?
মৃদুর কথায় সহসা মন খারাপ হয় আমার । সবুর । সবুরের কথা ভুলে গেল সে । এতো অকৃতজ্ঞ মানুষ হয় ? আমরা যে আজন্ম ঋণী ওর কাছে ।
আমাদের সবুর বড় হয়ে গেছে এখন । সেদিনের সেই রোগা হ্যাংলা ছেলেটার গায়ে চর্বি হয়েছে বেশ । একসময় উগান্ডার ছেলেদের মত মাথায় কুঁকড়ানো চুল ছিল ওর, এখন ওতে চুল নেই । সবসময় ন্যাড়া হয়ে থাকে সে । সবুরের সাথে আমি একই স্কুলে পড়েছি  এক কলেজেও পড়েছি কিছুদিন । কলেজের পড়াটা শেষ করেনি সে । একদিন হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল কোথাও । তারপর দীর্ঘদিন খোঁজেও সন্ধান পায়নি ওর ।
ঘরের টানে প্রতিদিন সন্ধায় বাড়ি ফিরি । মন ভাল থাকলে ফেরার পথে বর্ষার জন্য রজনীগন্ধা কিনে আনি । গতকাল ফুল কিনতে গিয়ে সবুরের সাথে দেখা হয়ে গেল হঠাৎ । আমাদের সবুর, আমার বন্ধু সে । আমাকে দেখেই ডেকে নিয়ে দোকানে বসালো ওর । চোখ দুটো মলিন হয়ে গেছে এখন, হাঁসিটাও কেমন দরিদ্র । বসিয়ে চা খাওয়াল । তারপর কত কথা হল আমাদের মধ্যে ।
-আমাদের ছেড়ে কই গেছিলি সবুর ?
-অইযে পড়া বাদ দিলাম, তারপর পলায় ঢাকা গেছিলাম আমি ।
-আসছিস কবে ?
-অনেকদিন । বাদ দেও, ভাবির কথা কও শুনি ।
-আছে ভালোই । আয় না, একদিন দেখে যা আমাদের সংসার ।
-হ, যামু , নিশ্চয় যামু ।
গতকাল থেকে বারংবার সবুরের কথা মনে হচ্ছে আমার । পুরনো দিনগুলো আবার নতুন করে যেন দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে  । একই স্কুলে আমরা দশ বছর সহপাঠী । পড়াশোনায় কত ভাল ছিল সবুর । একটু দুষ্টু ছিল, কিন্তু ওর মন ছিল কাদামাটির মত নরম । আচ্ছা, মতি স্যারের কথা মনে আছে ? সেই মতি স্যার, ছোট দাড়কিনা মাছের মত মানুষটা ? স্কুলে ইংরেজি পড়াত আমাদের । পড়া না পারলে কি মারটাই না দিত ! গেল বছর কলেরা হয়ে মারা গেছেন মতি স্যার । মরার আগে খুব কষ্ট করেছে মানুষটা । আমি জানাজায় গেছিলাম । সেখানে গিয়ে সবুরের কথা মনে হয়েছিল খুব । খুব ইচ্ছে ছিল স্যারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার । সুযোগ আর আসবেনা কোনদিন । চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময়ের ঘটনাটা এখনো মনে পড়ে আমার । ক্যাট- বানান না পারায় একদিন সবুরকে কি মারটাইনা মেরেছিলেন তিনি । সবুরের পিঠে অনেকদিন মারের দাগগুলো গুনা যেতো ।
সবুরকে যেদিন মারা হয়েছিল, সেদিন সন্ধ্যায় সবুরের সাথে দেখা করতে গেছিলাম আমি । ওর পিঠে মারের দাগগুলো দেখে গা শিউরে উঠেছিল আমার । সবুর ছিল নির্বিকার । পিঠের দাগগুলো ওকে যতনা কষ্ট দিয়েছিল, মনের আগুন পুড়িয়েছিল তার চেয়ে বেশি । আমাকে বলেছিল-
-দেখিস প্রতিশোধ নিমু  তারপর ঠিকই একদিন প্রতিশোধ নিয়েছিল সে ।
আমাদের ক্লাসে মতি স্যারের জন্য আলাদা চেয়ার বরাদ্দ থাকত সবসময় । একদিন সবুর তার চেয়ারটা বদল করে, একটা পা ভাঙা চেয়ার এনে রেখেছিল । আমরা বুঝিনি কেউ । তারপর পড়াতে এসে স্যার যেইনা চেয়ারে বসতে গেছে, অমনি চিৎপটাং হয়ে পড়ে গিয়েছিল মাটিতে । সেবার বেশ আঘাত পেয়েছিল মতি স্যার । তারপর অনেকদিন আর সবুরকে স্কুলে দেখিনি আমরা । অবশেষে একদিন ওর বাপ হারু নাপিত স্যারের হাত পা ধরে স্কুলে দিয়ে গিয়েছিল তাকে । সেদিন স্যার প্রহার করেনি সবুরকে । শুধু বলেছিল-
-স্যারের সাথে বেয়াদবি করলি সবুর ? তোর না আর পড়া হয় । সত্যি সবুরের পড়া হয়নি বেশি দূর । একদিন ঠিকই পড়াশোনায় ইস্তফা দিতে হয়েছিল তাকে ।
সবুরদের সংসারে অভাব ছিল খুব । ওরা অনেকগুলো ভাইবোন ছিল । ঠিক কতজন বলতে পারবনা । ওদের বাড়িতে গিয়ে কোনদিন সবুরের বাবাকে দেখিনি আমি । শুনতাম হারু নাপিত মোরগ ডাকা ভোরে বাড়ি ছাড়ে, বাড়ি ফিরে হাঁটুরে দলের শেষ মানুষটা হয়ে । বাজারে গেলে কোনদিন হারু নাপিতকে বসে থাকতেও দেখিনি আমি । বাজারের পথে আসার সময় তার ক্ষুর কাঁচির আওয়াজ শুনতাম রোজ ।
আমাদের সংসারেও সচ্ছলতা ছিলনা কখনও । বাবা ছিলনা আমার । সবুরদের বাড়িতে ভাল-মন্দ রান্না হলে আমাকে নিয়ে খাওয়াত সে । ওর মায়ের তেলে পিঠার স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে আমার । আহ! কি ভাল মানুষ ছিল সবুরের মা । আচ্ছা, তিনি কেমন আছেন এখন ?
স্কুলে সবুর আর আমার বন্ধুত্ব চোখে পড়ার মত ছিল । গাঁয়ের ছেলেরা ছড়া কাটত আমাদের নিয়ে । আমি সবুরের চোখে হিংসা দেখিনি কখনও । কিন্তু আমার মনে হিংসা ছিল খুব । অপ্রকাশিত সেটা- মনে মনে সবুরকে আমি হিংসা করতাম খুব । সবুর নাপিতের ছেলে হলে কি হবে,ওর মাথার গিলুতে সার ছিল খুব । কোন পড়া মুখে মুখে শুনেই মুখস্ত করতে পারত সে । পরীক্ষায় আমাদের দুজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো তখন । কোন পরীক্ষা খারাপ হলে মন খারাপ হতো আমার । বাইরে এসে কাঁদতাম আমি । সবুর কারণ জানতে চাইলে বলতাম-
-এইবার ফার্স্ট হমুনা আমি । সবুর আমাকে সান্ত্বনা দিত
-মিছা কথা দেখিস তুই ফার্স্ট হবি ।
তারপর হয়তো ইচ্ছা করেই একটা পরীক্ষা খারাপ দিত সবুর । আমি এটা বুঝতে পেরেছিলাম অনেক পরে । যেদিন ওকে নিয়ে মনের মধ্যে থাকা সন্দেহটুকুও অবশিষ্ট ছিলনা আর । আচ্ছা, নাপিতের ছেলে কি শিক্ষিত হয়না ? সবুর তাহলে পড়াশোনা করলনা কেন ? মতি স্যার অভিশাপ দিয়েছিল তাই ?
এস এস সি পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম আমি । সবুর দ্বিতীয় । আমাদের নিয়ে স্কুলের শিক্ষকরা অনেক স্বপ্ন দেখতেন । আমাদের সংসারে তখন নিদারুণ অভাব । পরীক্ষায় ফরম পূরণের টাকা ছিলনা আমার । দুর্বিষহ সময়গুলো সবুরের সাথে কাটাতাম । ভেবেছিলাম পরীক্ষা হয়তো দেওয়া হবেনা আর । শেষমেশ পরীক্ষা দিয়েছিলাম ঠিকই, তার জন্য জল ঘোলা করতে হয়েছিল খুব । ফরম পূরণের শেষদিন সবুরের সাথে কথা হয়েছিল আমার । ওর টাকা জোগাড় হয়েছিল । উচ্ছ্বসিত ছিল সে, আমার তখন শূন্য পকেট । সবুর বলেছিল-
-টাকা পাইছস ? ওর কথা শুনে কেঁদেছিলাম আমি । বলেছিলাম-
-পরীক্ষা দিবনা আর ।
সবুর সেদিন মনের কথা বুঝতে পেরেছিল আমার । সেদিনই দুপুরে আমার বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছিল সে । হাতে একটা বই ছিল তার , তাতে লুকানো কিছু টাকা  ঐ টাকা গুলো দিয়ে আমি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছিলাম সেবার । আমাকে টাকা দেওয়ার জন্য সেদিন হারু নাপিত কি মারটাই না মেরেছিল সবুরকে । বেজন্মার বাচ্চা বলে গালি দিয়েছিল তাকে । সবুরের পিঠে ওর বাবার মারের দাগগুলো এখনো আছে হয়তো ।
এস এস সি পাশ করে একই কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম আমি আর সবুর । তখন আমরা বিন্দাস । কি সুখময় দিন ছিল আমাদের । সবুর ছিল শূন্যে ভাসমান সবুজ টিয়া, আমি হয়তো মধুভরা রক্তজবা । একদিন এক রঙিন প্রজাপতি এসে বসতি গড়েছিল আমাতে । প্রজাপতির নাম ছিল মৃদুলা ।
মৃদুলার সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ খোলামেলা ছিল । সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারিনি আমরা । খুব তাড়াতাড়িই আমাদের কথা জেনে গিয়েছিল সবাই । আমার পরিবারে খুব বেশি সমস্যা হয়নি কখনো । সমস্যা হয়েছিলো প্রজাপতির । অন্যত্র বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার । সেই দিনগুলোতে বিধ্বস্ত ছিলাম আমরা । এখানেও আমাদের সেতু বন্ধন সবুর । তারপর গোপনে বিয়ে করেছিলাম আমরা । তখন আমাদের জন্য কি না করেছে । বর্ষার ভালবাসাপূর্ণ হৃদয় ছিল । আমার ছিল শূন্য পকেট আর সবুরের পূর্ণ হৃদয় । সবুরের টাকায় কেনা বেনারসিটা এখনো আছে বর্ষার কাছে । বিয়ের দিন বর্ষাকে উদ্দেশ্য করে সবুর একটি কথা বলেছিল-
-তুমি আমার ধর্মের বোন । আজ থেকে পাগলটার দায়িত্ব তোমার । দেখে রেখো, বড্ড অভিমান ওর ।
এরপর হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সে । তারপর কত খুঁজেছি, সন্ধান দিতে পারেনি কেউ । সেই সবুরকে বর্ষা ভুলে গেলো ! আচ্ছা আমিই কি মনে রেখেছি, কই অন্তরজ্বালাতো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি ? গতকাল সবুরের সাথে কথা বলে অনেককিছু জানতে পারলাম । বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাকে একটি কথা বলেছে সে
-ছোটভাই ভার্সিটি চান্স পাইছে দোয়া রাইখো ।
সবুরের বাপ হারু নাপিত এখন পরবাসী । সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিটি সে । বাবার পুরনো ব্যাবসাটার উত্তরসূরি হয়েছে সবুর । এখন বুঝতে পেরেছি-ঐদিন কেন গৃহত্যাগী হয়েছিলো সবুর । কেনইবা অসময়ে পড়াশোনায় ইস্তফা তার । একজন সবুর শিক্ষিত হলে হয়তো সবুর সদৃশ ছোট সবাই অশিক্ষিত হতো । আমাদের সবুর ঐশ্বর্যশালী, মনে ওর হিরামুক্তোর মোহর বাঁধানো ।
রাতটা এখন শেষ প্রায় । হয়তো আযান হবে একটু পর । চাঁদটাও বিদায়ের প্রহর গুনছে । সামনে আমার বি সি এস ভাইভা পরীক্ষা । আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে ঐশ্বর্যবান ব্যক্তিটি কে- আমি হয়তো নির্দ্বিধায় সবুরের নামটা বলে দেব ।          



দেবাশিস কোনার

কেদার পাণ্ডে


অনেক ঘাটের জল খেয়ে তবে আজ কেদার পাণ্ডে প্রথিতযশা বডি মিস্ত্রি হয়েছে । সারাটা জীবন ভর কম কষ্ট তো করতে হয় নি । সে সব দিনের কথা ভাবলে আজও চোখ ফেটে জল আসে । কেদার আজ মদ খেলে খবর হয় । মেয়ে মানুষ নিয়ে ঘুরলে অনেকে ফিসফিস করে । গাড়ি চড়লে এমন ভাবে দ্যাখে যেন ভূত দেখছে । কেন রে ভাই , কেদার কি মদ খেতে পারে না ? সে প্রেম করলে কার কি ক্ষতি হবে ? এতো পরিশ্রম করে সে যদি একটা গাড়িই কিনল , তাতে তোদের এতো গায়ের জ্বালা কিসের ? কেদার আসলে উত্তর প্রদেশের লোক ।যখন বর্ধমানে এসেছিল তখন আক্ষরিক অর্থেই লোটাকম্বল ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে ছিল না । দেশোয়ালি এক চাচার আশ্রয়ে দীর্ঘদিন থাকার পর কেদার একটা কাজ নিয়েছিল গ্যারাজে । প্রতিদিন কাজও জুটত না । কাজ না থাকলে বেতন পেত না । প্রচুর পরিশ্রম করে গ্যারেজ মালিকের মন জুগিয়ে চলতে হত কেদারকে । দেশে হাজার হাজার বেকার । মালিকের যদি তাকে মনপসন্দ না হয় , তবে অন্য কাউকে কাজে নিয়ে নিতে পারে । এরকম এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল কেদার । এখন কেদার একটা গ্যারেজের মালিক । টাকার অভাব নেই । তার কাছে বহু ছেলে কাজ করে । দেশ থেকে বিয়ে করে এনেছে ফুলমতিয়াকে । সে আনপড় , গাওয়ার । এই দেশে কত ভাল ভাল মেয়ে থাকতে সে ব্যাটা কেন যে মরতে দেশে গিয়েছেল মেয়ে খুঁজতে , তা সে বুঝে উঠতে পারে না । ভুল হয়ে গেছে বিলকুল । যাক , ফুলমতিয়া যেমন ঘরে আছে থাক । ওকে কেদার ওর মতো থাকতে দেবে । কিন্তু সে , অন্য এ দেশের একটা মেয়েকে রেখে দেবে । বেশ কয়েকদিন ধরে কেদার একটা ঘর ভাড়া নিয়ে সোনিয়া বলে একটা মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছিল । কিন্তু ভীষণ ঝামেলা বাঁধাল মেয়েগুলো । সেই দলে ফুলমতিয়া যেমন ছিল , তেমন ছিল পাড়ার বউ ঝি রা । বাড়ি থেকে সোনিয়াকে বের করে দিল। তাকে বেধড়ক মারল। নিজের টাকায় আমোদ আহ্লাদ পর্যন্ত করা যাবে না ? কেদার বুঝেছে এই রাজ্যটা যত ভাল , তত খারাপ । এখানে তুমি রোজগার কর , বউ নিয়ে ঘর সংসার কর সকলে তোমাকে সাহায্য করবে । আর তুমি যদি অসামাজিক জীবন যাপন কর তাহলে কেউ তোমাকে ছাড়বে না ।কেদার এখন আর মদ-মেয়ের পাল্লায় পরে না । ঠকে শিখেছে সে ।

সৌরেন চট্টোপাধ্যায়

 বই নিয়ে বৈঠক
   
    ভোলানাথ সমাদ্দার, মানে আমাদের ভুলোদার বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঁচাত্তর যা খুশি হতে পারে। ভারি ফিটফাট শৌখিন মানুষ। উত্তর কোলকাতার বসত বাড়ির তিনতলায় একটা মস্ত হলঘরে তাঁর আস্তানা, নিচের দুটো তলা ভাড়া দেওয়া আছে। পাড়ার ছেলে-বুড়ো থেকে বাইরের পরিচিত চৌহদ্দিতে ভুলোদা বলেই সমাধিক প্রসিদ্ধ। একা মানুষ, পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির টাকা থেকে যা সুদ পান তাতে ভালো রকমই চলে যায়, তাই অর্থোপার্জনের জন্য না দৌড়ে জ্ঞানার্জনের নেশাতেই মজে আছেন। অসম্ভব স্মৃতিশক্তি ভুলোদার, এবার যা পড়েন বা দেখেন তা মগজের বিশেষ মাইক্রোচিপে সঙ্গে সঙ্গে অটোমেটিক সেভ হয়ে যায়। এত বিদ্যে কিন্তু জাহির নেই, বহু সাধ্য-সাধনা মানে সোজা কথায় তেল মেরে মুখ খোলাতে হয়। আমরাও ছাড়বার পাত্র নই! নিত্য নতুন ছক কষে ভুলোদাকে খুঁচিয়ে ওঁর মুখ খোলাতে কসুর করি না। তবে একবার মুখ খুললে আর দেখতে হয় না!   
   
ভুলদার বিশাল হলঘরটার চারদিকের দেওয়ালজোড়া তাকে কয়েক হাজার বই ঠাসা, বেশিরভাগই পুরনো। এদিকে-ওদিকে ছড়ানো প্রাচীন চিনেমাটির ফুলদানি, পুতুল, মান্ধাতার আমলের ডজন দুই সচল-অচল ঘড়ি, ধাতু ও টেরাকোটার কিম্ভুত মূর্তি, রঙ্গচটা ছবি, বিটকেল সব মুখোশ ইত্যাদি সব মহামূল্যবান বস্তু;  ঘরের মধ্যিখানে  সাবেকি বিরাট পালঙ্কের ওপরেও বই আর পাণ্ডুলিপির তাড়া। দাবার ছককাটা মেঝেতে একটা প্রমান সাইজের লেখার ডেস্ক। এই সব নিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন তিনি।  
    কাঁধে একটা মস্ত ঝোলা নিয়ে আমি যখন পৌঁছলুম, ভুলোদা তখন অত্যন্ত মনোযোগে চিমটে দিয়ে একটা ঝুরঝুরে পাণ্ডুলিপির পাতা ওল্টাতে ব্যস্ত। রিমলেশ চশমার ফাঁক দিয়ে আমাকে একনজর দেখে হাসি মুখে বললেন, ব্যাপার কি হে চাটুজ্জে, বড্ড ধকল গেছে মনে হচ্ছে আজ!    
--- তা আর বলতে! পাখাটা একঘর বাড়িয়ে দিয়ে বসতে বসতে বললুম, তুমি তো আর বিয়ের যাঁতাকলে পড়ে এই সংসারের চক্রব্যুহে ঢুকলেই না, তাই জানতেও পারলে না এই মায়া-প্রপঞ্চময় সংসার সমরাঙ্গন যে কি ভীষণ ... ইয়ে... মানে ভয়ঙ্কর...।  
--- থাক থাক! আর বলতে হবে না, আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে দিলেন  ভুলোদা, যে রকম তপ্ত লাভার মত সাধুভাষা বেরুচ্ছে তাতে তুমি যে একটা আগ্নেয়গিরি হয়ে আছো তা বেশ টের পাচ্ছি। তা তোমার ও ঝোলায় কি আছে হে? বই বলে মনে হচ্ছে যেন!
-- তবে আর বলছি কি! ছেলে পাশ করেছে, নতুন বই-খাতা কিনতে হল। কি রকম ওজন দেখেছো! এ বই বইতে গেলে একজন ঝাঁকামুটে চাই। তার ওপর যা দাম!
--- অ! ও আর এমন কি! জ্ঞানলাভ করতে গেলে কি এই সামান্য ওজন আর দাম নিয়ে মাথা ঘামালে চলে! ভুলোদা পাত্তাই দিল না। 
-- বটে! ঝলা থেকে একখানা দশাসই বই বের করে দু-হাতে ধরে ভুলদার সামনে নাচিয়ে বললুম, ‘বুক’-টা দেখলেই ত বুক ধড়ফড় করে, ছেলে পড়বে কি১ বুকফোবিয়া হয়ে যাবে। আর দাম শুনলে তো...!
--- এটাও ত্যামন ধর্তব্যের নয়, নাকের ওপর থেকে মাছি তাড়াবার ভঙ্গীতে আমার উত্তেজনা নস্যাৎ করে দিয়ে বলল ভুলদা, বই সম্বন্ধে কটা তথ্য যদি তোমার জানা থাকত, তাহলে ছেলের ওই কটা পুঁচকে বই আর অত ভারী বলে মনে হত না, আর দাম নিয়েও অত উতলা হতে না।   
চশমার পিছনে চিকচিকে চোখ দেখে বুঝলুম, এ হল তুবড়ি জ্বলে ওঠার আগের অবস্থা, ফুলকি দেখা দিচ্ছে মনে হয়! এখন একটু উসকে দিলেই হবে। একটু বিরক্তি দেখিয়ে বললুম, সে তুমি যাই বল ভুলোদা, আমাদের সময়ে কিন্তু এমন পাহাড়প্রমাণ বইও ছিল না, আর বাপ-মাকেও বই কিনতে নাকের জলে চোখের জলে হতে হত না।   
 --- হুম! পাণ্ডুলিপির কাগজগুলো যত্ন করে গুছিয়ে রেখে, ধীরে সুস্থে রুপোর সিগারেট কেস থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে ভুলদা বলল, ‘কুধো দ্য’ বলে কোন বই-এর নাম শুনেছো?
আমি অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মত দুদিকে ঘাড় নেড়ে দিলুম।  
 --- বার্মা মুলুক, মানে এখনকার মায়ানমারে দক্ষিণ মান্দালয়ের প্যাগোডায় একটা সম্পূর্ণ বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ আছে যার ওজন হল আঠাশ টন। সাতশো ঊনত্রিশ পাতার সেই বইটার এক একটা পাতা পাঁচ ফুট লম্বা আর সাড়ে তিন ফুট চওড়া মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরী। এই গন্ধমাদন বইটা তৈরী হয়েছিল ১৮৬০ থেকে ১৮৬৮ সালের মধ্যে।
     --- বাপ রে! এর বেশি আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।  
--- ওজন তো হল, এবার বই-এর দাম নিয়ে বলছি শোন, মিটিমিটি হাসতে হাসতে ভুলোদা আবার শুরু করলেন, ১৯৮৩ সালের ৬ ডিসেম্বর লণ্ডনে সথবী কোম্পানির নীলামে দুশো ছাব্বিশ পৃষ্ঠার একটা হাতে লেখা বই বিক্রি হয়েছিল ৮৯ লক্ষ ৪০ হাজার টাকায়, আজকের হিসাবে তখনই দাম ছিল ষাট কোটি টাকারও বেশি, আর এখন তো ...! বইটার নাম ‘দ্য গসপেল অব হেনরী দ্য লায়ন’, হেরিম্যান নামে এক জার্মান সন্ন্যাসী ১১৭০ সালে লিখেছিলেন। শুধু তাই নয়, বইটার ৪১ টা পাতা জুড়ে অপূর্ব মিনিয়েচার ছবিও এঁকেছিলান। মহামূল্যবান এই বইটা লম্বায় সাড়ে তিন ইঞ্চি আর চওড়ায় ১০ ইঞ্চি।    
    ভুলোদার কথা শুনতে শুনতে  আমার মুখটা কখন যে হাঁ হয়ে গিয়েছে তা খেয়ালই নেই।
--- এতেই যে বাক্যি হরে গেল ভায়া! আর ছাপানো বই-এর দামের কথা যদি ধর, তাহলে ১৪৫৫ সালে জার্মানির মেইনজ শহরে ছাপাখানার আবিষ্কারক গুটেইনবার্গের প্রেসে ছাপা ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ এখনও সবার ওপরে। ১৯৮৭ সালে ২২ অক্টোবর নিউইয়র্কে ক্রিষ্টির নিলামে বইটা ৫৩ লক্ষ ৯০ হাজার পাউণ্ড, অর্থাৎ আজকের হিসাবে তখনই প্রায় ৪০ কোটি টাকার মত। কিনেছিল টোকিওর বই-এর ব্যবসায়ী মারুজেন কোম্পানি।  
ওরে বাবা! ভুলোদা এসব কি বলে যাচ্ছে! অথচ অবিশ্বাসও করতে পারি না। সঠিক প্রমাণ ছাড়া কোন কিছু বলার পাত্র তো ভুলোদা নয়!    
--- হ্যাঁ, তখন বই-এর সাইজ নিয়ে কি যেন বলছিলে? ভুলোদা এখন ফুল ফর্মে ক্রিস গেইলের ঢঙে চালাচ্ছে বোঝা গেল, দুটো খবর দিতে পারি, শুনলে তোমার মনটা হালকা হবে চাটুজ্জে। আইরিশ ইউনিভার্সিটি প্রেস ২৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত চার বছর ধরে ১১১২ খণ্ডে ‘ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পেপার’ নামে একটা তথ্যমূলক বই ছেপেছিল; ছাপতে খরচ হয়েছিল ৫০ হাজার পাউণ্ড। ১৯৮৭ সালে সেই বই-এর এক একটা খণ্ডের দাম ছিল ৪৯ হাজার পাউণ্ড করে। সব কটা খণ্ডের মোট ওজন ৩.৩ টন। হিসেব কষে দেখা গেছে সে সময় বইটা তৈরী করতে ৩৪ হাজার ভারতীয় ছাগল প্রাণ দিয়েছিল, আর ১৫০০ পাউণ্ড দামের সোনা লেগেছিল। ওই বইটা প্রতিদিন গড়ে দশ ঘন্টা করে পড়লে শেষ করতে ছ-বছর লেগে যাবে।
ভুলোদা আজ নির্মম, পরের ওভারের জন্য স্টান্স নিয়েছে। 
    আর একটা মস্ত বই হল ‘সুপার বুক’। এটা অবিশ্যি পড়ার বই নয়, দর্শকদের মন্তব্য লেখার বই। লম্বায় ১০ ফুট আর চওড়ায় ৯ ফুট। আমেরিকার কলরাডো শহরে ছাপা হয়েছিল এটা। ২৫২ কিলোগ্রাম ৬০০ গ্রাম ওজনের বইটাতে ৩০০ পৃষ্ঠা আছে।         
 --- আর পাণ্ডুলিপির কথা তো কিছু বললেনা! ভুলোদার দ্বিতীয় সিগারেট ধরানোর ফাঁকে একটু সামলে নিয়ে বললুম।
--- মোনালিসা ছবির অমর স্রষ্টা লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ছিলেন এক আশ্চর্য প্রতিভাবান মানুষ জানো তো! একাধারে শিল্পী, বিজ্ঞানী, কবি, দার্শনিক।  ১৫০৭সালে তাঁর হাতে লেখা মাত্র ৩৬ পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি ‘কোডেক্স লিসেস্টার’ ১৯৮০ সালে ক্রিষ্টির নিলামে ২২ লক্ষ পাউণ্ড মানে আজকের হিসেবে প্রায় ১৬ কোটি টাকায় কিনেছিলেন আরমান্দ হ্যামার নামে এক ধনকুবের সগ্রাহক। তাহলেই বোঝো!
    আমার বিপন্ন অবস্থা দেখে বোধ হয় মায়া হল ভুলোদার, বলল, একটা ছোট্ট বই-এর কথা বলে আজকের মত শেষ করছি; একদিনে এর বেশি বোধ হয় হজম করতে পারবে না তুমি! ১৯৮৫ সালে মার্চ মাসে গ্লেনিয়ার প্রেস থেকে ‘ওল্ড কিং কোল’ নামে বাচ্চাদের একটা বই মাত্র ৮৫ কপি প্রকাশিত হয়েছিল। বইটা লম্বায় চওড়ায় মাত্র এক মিলিমিটার করে। খুব সরু সূচ দিয়ে সাবধানে পাতা উল্টে আতশ কাঁচ দিয়ে পড়তে হয়। আজ অবধি পৃথিবীতে যত বই ছাপা হয়েছে তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে ছোট।  
    তিনতলার ঘরটা থেকে যখন নেমে এলুম তখনও আমার কান-মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। ভুলোদাকে ঘাটিয়ে লাভ হল না লোকসান হল জানি না, তবে টের পেলুম ছেলের বই ভর্তি ব্যাগটা এখন যেন বেশ হালকা লাগছে, আর বইগুলোর দামও এমন কিছু বেশী বলে মনে হচ্ছে না।   

[‘বই নিয়ে বৈঠক’ গল্পগুচ্ছতে সৌরেন চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম লেখা । লেখাটিতে বই বিষয়ক যে তথ্যগুলি আছে সেগুলো সবই ১০৯১এর গিনেস বুক অফ রেকর্ডস থেকে নেওয়া । এইরকম বিচিত্র তথ্য সম্বলিত একটি গ্রন্থ ‘জানা অজানা ১০০১’এর  লেখকও সৌরেন বাবু ।] 

বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৫

বর্ষ ৪ সংখ্যা ১০ ।। ১০ই এপ্রিল ২০১৫

এই সংখ্যায় ৮টি গল্প । লিখেছেন – ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, সুবীর কুমার রায় প্রদীপভুষণ রায়, স্বপন দেব, সাঈদা মিমি, ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী ও সকাল রায় । 
                   সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন

ঝর্না চট্টোপাধ্যায়

পর্ণমোচী


দোকানে কাউন্টারের উপরে নানান রঙের  উলের গোলা। তার উপরে ঝুঁকে পড়ে রঙ  বাছছিল তৃণা। হাতে বোনা সোয়েটার কেউ আর পরে না এখন। সে সব আগে পরত। শীত এলেই মা-কাকির দল উলের গোলা নিয়ে দুপুরে খাবার পরে রোদে বসে উল ছাড়ানো,  কিংবা সন্ধ্যেয় রেডিওতে খবর শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে সোফায় বসে উলবোনার একটা রেওয়াজই ছিল বলা যায়। আজকাল নানা ধরণের সোয়েটার, জ্যাকেট বেরিয়েছে । ছেলেমেয়েরা সেসবই পছন্দ করে। তৃণা পুরনো দিনের এতসব গল্প  জানে না, মায়ের কাছে শুনেছে । তবে এখন সত্যিই কার্ডিগান পরতে দেখে না খুব একটা। শুধু মাকে কোন শীতের জায়গায় বেড়াতে গেলে তৃনা দেখেছে, শাড়ির উপর কার্ডিগান পরে তার ওপরে শাল জড়িয়ে নিতে।   
কিন্তু স্কুলে সেলাই ক্লাসে এখনও শেখানো হয় কার্ডিগান  বোনা। স্কুলে একটা রঙেরই বোনার নির্দেশ থাকে, সেটা হল নেভি ব্লু, আর ওটাই এখানে তৃণাদের স্কুলের ইউনিফর্ম। কিন্তু বছরের পর বছর একই রং...কাঁহাতক আর ভালো লাগে! প্রিন্সিপ্যাল মিস্‌, সেলাই মিস্‌, স্কুলবোর্ড মেম্বারদের কাছে অনেক অনুরোধ-উপরোধের পর কয়েকবছর হল যে কোন রঙের কার্ডিগান বোনার অনুমতি মিলেছে। কিন্তু কড়া নির্দেশ, স্কুলে নেভি ব্লু ছাড়া অন্য কোন রঙ নয়। তা স্কুলের মেয়েরা সেটা মেনে নিয়েছে। স্কুলের ডিসিপ্লিন তারাও নষ্ট করতে চায় না। সে কারণেই আজ মায়ের সঙ্গে  মার্কেটে আসা, তৃনা নিজের হাতে উলের রঙ বেছে  নিতে  চায়।
মাও এসেছেন। এই ছোট্ট শহরে কতটুকুই বা মার্কেট। এক ছাতের তলায় খান পঁচিশেক ঘর নিয়ে মার্কেটপ্লেস। চারটে শাড়ির দোকান, দুটো বাসনের দোকান, গোটা পাঁচেক ওষুধের..এমনি সব। নিচের তলাটা মার্কেট। দোতলায় বড় বড় ফ্ল্যাট। একটা বেশ ভালো হোটেল আছে তিনতলায়। কোম্পানীর লোকজন সব আসেন, নানান মিটিং-এ, তাঁরা সব  থাকেন। কিছু  অফিসার এখানে ফ্ল্যাটভাড়া নিয়েও থাকেন। তৃণারা থাকে অফিসের কোয়ার্টারে।  কোম্পানীর অনেক কোয়ার্টার আছে, যার যেমন চাকরি, তার তেমন কোয়ার্টার। তৃণাদের কোয়ার্টার বেশ বড়, বাংলো টাইপের। তার বাবা এখানকার অফিসের দু-নং অফিসার। এক শর্মা আঙ্কল বাদ দিলে এখানকার বাকি সবাই বাবার অধস্তন কর্মচারী। শর্মা আঙ্কলরা থাকেন প্রথম বাংলোয়, পরেরটাই তৃনাদের।    
পর্ণা ওদিকে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল আরো কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে। পর্না, তৃণার দিদি, এখন কলেজে পড়ে। তৃণার এবার ক্লাস নাইন। মেয়েগুলোর সঙ্গে দুটো ছেলেও আছে, একটু  তফাতে দাঁড়িয়ে। দিদির ছেলে বন্ধুও আছে নাকি, কই বলেনি তো...অবাক হল তৃণা।  সেদিকে একবার তাকিয়ে উলের রঙ বাছায় মন দিল তৃণা। দোকানের দরজার বাইরে মা মানে  মিসেস বসু কথা  বলছেন শেলী আন্টির সঙ্গে। এখানে বাবার কর্মসূত্রে ওইভাবেই সবাইকে ডাকতে হয়। কেন, শেলী কাকিমা, পলাশ কাকা ...এমন করে বললে কি হয়! শেলী আন্টির ছেলেমেয়ে-- নিনি, তাপুরাও ওর মা-বাবাকে বলে বোস আঙ্কল, গীতু আন্টি। এখানে ওইরকমই। একবার শেলী আন্টির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি কমলা রঙের গোলাটা পছন্দ হল তার । কমলার উপরে একটা হালকা সবুজের আভা, যেন নতুন পাতার মতো কচি সোনালী রঙ। ভারী ভাল লাগল তৃণার। উলের গোলাটা হাতে তুলে ডাকল তৃণা---মা, এটা নিই?
গীতিকা, মানে মিসেস বসু  শেলী আন্টিকে কিছু একটা বলে দোকানের ভিতরে এলেন। বললেন---কটা লাগবে, মিস্‌ কি বলেছেন?
মাকে দেখছিল তৃনা। মুখটা  কেমন লাল হয়ে উঠেছে। দিদি কোথায় গেল! মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল তৃণা, ---মা জল খাবে?
গীতিকা মাথা নাড়লেন। ---কই হল তোর উল কেনা!  কখন বেরিয়েছি...তাড়াতাড়ি কর, বাবা এসে বসে থাকবেন অফিস থেকে...অনুযোগের স্বরে বললেন মা।--দিদি কোথায় গেল, ডাকো তাকে---আবার বললেন।
---দিদি, এই দিদি...পর্নার দিকে হাত নেড়ে ডাক দিল তৃনা।
বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে ধীর পায়ে দোকানে  হেঁটে এল পর্ণা। --কোনটা নিলি? চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল পর্ণা। হাতের উলটা তুলে দেখায় তৃণা।
--বাঃ, কি সুন্দর রংটা! মা, আমাকেও একটা এইরকম করে দেবে, এই রঙই কিন্তু...! মায়ের কাঁধের উপর মুখ রেখে আবদার করল পর্ণা, কিন্তু নিচু গলায়।
--নিজেই কোরো, স্কুলে তো তুমিও শিখেছ... বললেন গীতিকা।
--সে তো নেভি ব্লু,আমাদের তো অন্য রঙ ছিল না, দিও না মা...প্লিজ...  
--আচ্ছা আচ্ছা... সে দেখা যাবে, এখন চল তো, কখন বেরিয়েছি। বাবা এসে বসে থাকবেন...
তিনজনে কেনাকাটা সেরে দোকানের বাইরে পা রাখলো।

(২)
 হেঁটে হেঁটেই বাড়ি ফিরছিল ওরা তিনজনে। অল্প একটু পথ, বিকেলবেলায় বাজার থেকে ফিরতি পথে বেশির ভাগ সকলেই হেঁটে বাড়ি ফেরে,একটু বেড়ানোও হয়। বিশেষ কোথাও তো যাবার  জায়গা নেই! আসা-যাওয়ার পথে দু-চারজন লোকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কেউ কেউ মিসেস বসুকে দেখে মাথা নাড়ছেন, নোয়াচ্ছেন। মাও কাউকে দেখে অল্প একটু হাসি কিংবা মাথা নাড়াছেন। পিছনের সারির কোয়ার্টারে থাকেন কুমার আঙ্কল, তাঁর মাকে দেখে দু/একটা কথাও বললেন মা। দাদীজি পর্ণার পিঠে হাত দিয়ে কিছু বললেন, তৃণা দেখল, কিন্তু বুঝতে  পারল না। তৃনা কি একটা বলতে বলতে আসছিল। মা নিজের মনে হেঁটে যাচ্ছেন, পর্ণাও  চুপ। একবার নিচু গলায় মাকে বললে পর্ণা---বোনকে চুপ করতে বল না, মা...কি রকম   বকবক করে, দ্যাখো...। ছোট মেয়ের দিকে মুখ তুলে দেখলেন গীতিকা, মিসেস বসু, কিন্তু কিছু বললেন না। উলটে পর্ণাকেই বললেন,
---তুমিই বা এত চুপচাপ কেন? একটু বোনের সঙ্গেও তো কথা বলতে পারো, ও বাচ্চা মেয়ে, সব সময় চুপ করে থাকতে পারে...?’  
পর্না যেন জানত, মা ঠিক বোনের পক্ষ নেবেন। কিন্তু বড় বড় চোখে মায়ের দিকে তাকালেও মুখে কিছু বলল না। তিনজনে প্রায় বাড়ির গেটের কাছাকাছি এসে পড়েছেন, একটা স্কুটার এসে একেবারে আড়াআড়ি ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। এ কি অসভ্যতা! মিসেস বসু কিছু বলতে যাবেন, কিন্তু কিছু বলার আগেই একজন সুন্দর ভদ্র চেহারার প্রৌঢ মানুষ স্কুটার থেকে নেমে হাসি হাসি মুখে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
অবাক হয়ে চেয়ে রয়েছেন গীতিকা, চেনা লাগছে...কিন্তু, চিনতে পারছেন না, চিনতে চাইছেনও না, যেন মনে করতেও পারছেন না। ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন আরো একটু, তারপর গীতিকার দিকে তাকিয়ে বললেন--গীতু না? আমি অনিমেষ....গিরিডি, সেই যে...আমি সন্তু...
আর না বলা যায় না, একটু চোখ উজ্জ্বল করতেই হল গীতিকাকে। বাবা, চিনতেই পারা যাচ্ছে না ...এতদিন পর চেনা যায় নাকি সহজে! কিন্তু...এখানে কেন, এতদিন পর! একটু যেন অস্বস্তিতে গীতিকা, মিসেস বসু।
মেয়েদের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করলেন ভদ্রলোক--মেয়ে! 
মাথা নাড়লেন গীতিকা। তৃণা ছটপট করে উঠল। সে যেন জানে এর পরের ব্যাপার। ভদ্রলোক এরপর পর্নার দিকে তাকিয়ে বলে উঠবেন---ইশ, কি সুন্দর...একেবারে মায়ের মতো দেখতে হয়েছ!
বাস্তবিক, পর্না মায়ের মতই দেখতে। মায়ের মতো নরম, সুন্দর চেহারা, মায়ের মতো শান্ত, কম কথা বলে...কথা বলার সময় বড় বড় চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে...। তৃণা  একেবারে অন্যরকম। লম্বা, শ্যামলা, ছটপটে...সে বাবার মতন, পাপা কা লাডলি বিটিয়া...। যাঃ, বাবা  কি তার মত  দুষ্টু নাকি! তবে, বাবা যখন এক একদিন মায়ের সঙ্গে খুনসুটি করেন, তখন কিন্তু একটু দুষ্টুই  মনে হয়। হি হি...কদিন আগেই তো বাবা মায়ের  পিঠে ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। হি হি হি...মা কেমন বাচ্চাদের মতো লাফালাফি করছিলেন...ভাবতেই হাসি পেল তৃণার। মাকে তখন এত ভাল লাগছিল! কেন যে এত গম্ভীর হয়ে থাকেন মা!  তৃনা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
---মা, আমরা ভেতরে যাচ্ছি... বলেই ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে এগিয়ে যেতেই ভদ্রলোক বললেন, --কই, নাম বললে না তো!
ফস্‌ করে বলে উঠল তৃনা,---জিজ্ঞেস না করলে বলব কেন?
ওহ্‌, সরি! জিজ্ঞেস করিনি না? কি নাম, তোমার ...হেসে ফেলে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।
--তৃণা।
পর্নার দিকে তাকালেন। পর্ণা মায়ের ঠিক পিছনে মায়ের কাঁধের কাছে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেখান  থেকেই বড় বড় চোখ তুলে মৃদু স্বরে বললে--পর্ণা। তার ভাল লাগছিল না ভদ্রলোককে। কেন, সে জানে না...।

(৩)
আজ সকাল থেকেই বেশ একটা শীতের আমেজ। এদিকে শীতকালে একেবারে হু-হু ঠান্ডা। হাত-পা কনকনিয়ে যায়। ঘরে আগুন রেখে অনেকেই ঘর গরম করে রাখেন।  গরমকালটা আবার একেবারেই অন্যরকম। রোদের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক একেবারে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বেশি গরম পড়লে লু বইতে থাকে। বিকেলের পর থেকে একটু একটু করে আবার সব ঠান্ডা হয়, সন্ধ্যের পর থেকে পরদিন সকাল পর্য্যন্ত আরাম।
আজ ছুটির দিন, রবিবার। এখন বেলা প্রায় দশটা। শীত  পড়লে ছুটির দিনে খানিক বেলা হলেই ছেলেমেয়েরা সব বাড়ির বাইরে খেলার মাঠে বেরিয়ে পড়ে। এখানে দুটো ব্যাডমিন্টনের কোর্ট আছে, ক্রিকেট খেলার জায়গাও আছে। ফুটবল খেলার ঠিক মাঠ নেই, কিন্তু ছেলেরা সেটাও কোনরকমে করে নিয়েছে, সেখানেই বিকেলে, ছুটির দিনের সকাল-বিকেল ফুটবল খেলা চলে। এই তিন জায়গাতেই ভাগাভাগি করে কোয়ার্টারের ছেলেমেয়েরা খেলা করে। আজকেও নানা রঙের জামাকাপড়ে রঙ্গিন হয়ে ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলা করছিল।   
ব্যাডমিন্টনের কোর্টে তৃণা, শেলী আন্টির মেয়ে নিনি আর বি-কোয়ার্টারের কান্তা একসঙ্গে খেলা প্র্যাক্টিশ করছিল। ওদের সামনে দিয়ে বাইক চড়ে হাজির হল মন্নু, কুমার আঙ্কলের ছেলে। ভাল নাম মনোজ কুমার, বাড়িতে সকলে ডাকে মন্নু বলে। মন্নুও দিদি মানে পর্ণাদের কলেজেই পড়ে কিন্তু  উপরের ক্লাসে।  মন্নুর হাতে একটা বড় বল, সেটা দেখিয়ে সে  ডাক দিল তৃনাকে---আ...তৃণা...
মন্নুর সঙ্গে মাঝে মাঝে ফুটবল খেলে তৃনা। এখানে মেয়েরা ফুটবল কেউ খেলে না। কিন্তু তৃনার খুব ফুটবল খেলার ইচ্ছে। তাই মন্নু ভাইয়াকেই তার ইন্সট্রাকটর মেনে নিয়েছে। মাঝে  মাঝে মন্নুর সঙ্গে বল খেলার মাঠে পায়ে বল নিয়ে ছোঁড়া ছুঁড়ি করে তৃণা।
মাথা নেড়ে মুখ কাঁচুমাঁচু করে বলল তৃণা... আভি  নহী। মা এক্ষুণি ডাকবেন, বাড়িতে কে আসবেন, যেতে হবে।
মন্নু ভুরু কুঁচকে বলে উঠল---আরে, আভি তো খেল্‌...তব যা না...   
না, ওইরকম পায়ে বল নিয়ে লাগাতে না লাগাতেই চলে যেতে হবে, তৃণার একেবারেই  পছন্দ নয়। তার চেয়ে বিকেলে...ভেবে নিয়ে উত্তর দিল---ভাইয়া, সামকো...ঠিক হ্যায়?
মন্নু একেবারে ফুটবল কোচের মত মুখ গম্ভীর করে বলল---  তুঝসে নেহি হোগা...চল্‌ যা...বাইক ঘুরিয়ে নিল মন্নু।
ঠিক তখনই কোয়ার্টারের দিক থেকে আওয়াজ এল...তুনতুন......। বাবা ডাকছেন। বাবা এই নামেই আদর করে তৃনাকে ডাকেন। তৃনা মন্নুর দিকে হাতের বুড়ো আঙ্গুল তুলে বললে---সামকো, পক্কা...ভাইয়া!
বাড়ির দিকে দৌড় লাগাল তৃণা।  

(৪)
বাড়িতে বসার ঘরে পা দিয়েই দ্যাখে, সেদিনের সেই ভদ্রলোক অনিমেষ বাবু, বসে আছেন। দেখা হওয়ার পর থেকে কয়েকদিনই এবাড়িতে দেখেছে তাঁকে। কি ব্যাপার, তৃনা ঠিক বুঝতে পারে না। কিন্তু বাড়িতে যে কিছু একটা হয়েছে সেটা বুঝতে পারে। সবাই কেমন যেন চুপুচাপ। মা আরো গম্ভীর। দিদি এমনিতেই কথা কম বলে, এখন বলেই না। পর্ণা, যাকে বাবা আদর করে ডাকেন পর্ণমোচী বলে, বাবার খুব কাছে ঘেঁষে না। জরুরী যা কথাবার্তা সব মায়ের সঙ্গেই হয় পর্নার। তৃণার মত পর্ণার অত বাবার সঙ্গে ভাব নেই। খুব কাজের কথা, যা বাবা নাহলে চলবে না, সেইরকম কিছু হলেই সে বাবার কাছে যায়। বাবা দিদিকে পর্ণমোচী বলে ডাকেন কেন? একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিল তৃণা। মা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন---মানে আবার কি! তোকেও তো  তুনতুন বলেন, কিছু মানে ভেবে কি...!  
---ওই কথাটার মানে কি মা? কেমন শক্ত কথা...  
--মানে যে পাতারা ঝরে যায়।
ঝরে যাওয়া মানে কি, মরে যাওয়া! দিদিকে বাবা এমন নামে ডাকেন কেন?
মা দিদিকে এত ভালবাসেন
, এবং তৃনার ধারনা মা দিদিকে তার চেয়েও বেশি ভালবাসেন, সেই মা এমন একটা বিচ্ছিরি নাম মেনে নিলেন? বাবা তো দিদিকে পুনপুন নামেও ডাকতে
 পারতেন, তুনতুনের সঙ্গে মিলিয়ে!
--মা, তুমি দিদির নাম...শেষ করার আগেই বিরক্ত হলেন গীতিকা।
---মেয়েরা তো তাইই---  অন্য বাড়িতে যেতে হয় তো...তুমি এত কথা বল, এবার চুপ কর তো......কথাটা শেষ হয়নি সেদিন। আজকে ভদ্রলোককে বসে থাকতে দেখে কেন জানে না,  মনে হল মায়ের কথা। কেন এসেছেন, ইনি? দিদিকে অন্য বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য? নাকি অন্য কিছু? মা, বাবা এত চুপচাপ! তৃনা ঠিক বুঝতে পারে না। তাকে কেউ কিছু বলে না কেন? কি হয়েছে দিদির?    
ঘরে ঢুকতেই বাবা তৃনাকে জড়িয়ে ধরে বসালেন নিজের পাশে। তৃনা দেখল ভদ্রলোক বসে আছেন বড় সোফার এক ধারে। মা একটু পাশে একটা ছোট মোড়ায় বসে আছেন, হাতে সেই একই কমলা-সোনালী রঙের উল, দিদির জন্য সোয়েটারটা শুরু করেছেন মা। কদিন আগে নিজেই বাজার থেকে নিয়ে এসেছেন। তৃনারা তখন বাড়িতে ছিল না, স্কুলে-কলেজে গিয়েছিল। না, তৃনার জন্য তিনি করে দেবেন না, স্কুলের কাজ তৃনাকে নিজেই শিখতে হবে, করতে হবে। মা এইসব ব্যাপারে খুব কড়া। দিদির স্কুলের সেলাইও মা করে দেননি। এটা স্কুলের হলে মা করে দিতেন না।   
বাবা সকলকে অবাক করে ডাকলেন---পর্ণমোচী...  
আরো যেন কিছু অবাক হওয়ার মত ছিল। পর্না ছুটে এসে বাবার কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করল------আমায় কোথাও যেতে দিও না বাবা, আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারব  না বাবা...গেলে আমি মরে যাব, বাবা...আমি যাব না ওনার সঙ্গে...আমি কেন যাব, বাবা...আমি তো এখানেই থেকেছি বাবা...তুমি আমায় ছেড়ে দিও না ...আমি যাব না...বাবা.. আমি ওনাকে চিনি না, জানি না...কোনদিন দেখিনি...সেই লোক কি করে.........বাচ্চা মেয়ের মতো কাঁদতে লাগল পর্না। যে দিদির গলা কোনদিন শোনা যায় না, কান্নার সঙ্গে কত কি--ই যে বলে যেতে লাগল...!
তৃণা কিছুই বুঝল না, কিন্তু কি যেন একটা না-বলা কথা ঘুরপাক খেতে লাগল ঘরের মধ্যে।     
তৃনা একবার এর দিকে, একবার ওর দিকে তাকায়, মাথায় ঢোকে না। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল উলের গোলাটা মা শক্ত করে ধরে আছেন, তার উপরে টপটপ করে চোখের জল পড়ছে। কান্না পেয়ে গেল তৃণারও। বাবা জোর করে পর্ণাকে তুলে ধরে আর এক পাশে বসালেন। তারপর দুহাতে দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সেই ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন------অনিমেষ বাবু, আমি খুব সাধারণ মানুষ। আমার অনেক কিছুই খুব সাধারণ। আমি দুহাত দিয়েই সব কিছু সামলাতে  পারি, এতদিন ধরে তাইই সামলেছি। একহাতে সামলানোর মতো ক্ষমতা আমার নেই। এতদিন পর এখন  এসে একটা  হাত কেটে নিয়ে যেতে চাইলে কি করে  পারি বলুন? প্রথম থেকে সে অভ্যাস থাকলে অন্য কথা ছিল...অত কষ্ট করার ক্ষমতা আমার নেই। আপনি আমায় ক্ষমা করুন...।
তারপর দিদির দিকে তাকিয়ে বললেন---আমি ওর নাম রেখেছিলাম পর্ণমোচী। পাতা ঝরে গিয়ে আবার নতুন পাতা জন্ম নিল আজ। ওর নাম দিলাম...... বাবার কথা শেষ হবার আগেই তৃনা বলে উঠল, 
---বাবা, দিদির নাম পুনপুন, আমি তুনতুন।   
বাবা আবার অনিমেষের দিকে তাকিয়ে বললেন---দেখলেন তো, ওরা নিজেরাই ঠিক করে নিল, আমি-আপনি  আর কি করতে পারি, বলুন? আপনি গীতুর সঙ্গে কথা বলুন, আমরা বাইরে  যাই... দুদিকে দুই মেয়ের কাঁধে হাত দিয়ে উঠে পড়লেন বাবা। বাইরে বেরোবার আগে একবার মায়ের কাঁধে হাত রাখলেন তারপর মেয়েদের সঙ্গে বাইরে এলেন।   
কি যেন এক রহস্য! কে ইনি, দিদি জানে? দিদিকে একথা জিজ্ঞেস করতে হবে। বাবা যেন বুঝতে পেরে তুনতুনকে বললেন---তুমি এখনও ছোট মা, আরো একটু বড় হও। বলেই হেসে বললেন--ছোট না হলে যে ফুটবল খেলা শেখা যাবেনা লুকিয়ে লুকিয়ে... পুনপুন বড় হয়েছে বলে লুকিয়ে শেখে না...জিজ্ঞেস কর পুনপুনকে। বাবা দিদিকে সেই প্রথম পুনপুন বলে ডাকলেন। বাবাকে  জড়িয়ে ধরল দিদি।    
ভাল লাগছিল তৃণার। দিদি কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে...একেবারে নতুন, খুব ভাল লাগছিল তৃনার, না তুনতুনের...!   


সুবীর কুমার রায়

সিনেমা দেখার হ্যাপা

অনেকদিন পরে সেদিন সিনেমা হলে একটা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। কলকাতার একটা  নামীদামী বাতানুকুল সিনেমা হলের নরম তুলতুলে চেয়ারে বসে সিনেমা দেখতে দেখতে কোন সুদুর অতীতে হারিয়ে গেলাম। আজ সিনেমাহল প্রায় অবলুপ্তির পথে। দু’চারটে হল আজও কোনমতে অস্তিত্ব রক্ষার্থে বেঁচে থাকলেও, আসন্ন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। মনে হ’ল অনেক টাকার টিকিট কেটে বিলাসবহুল এই হলে বসে অনেক আরাম, অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে সিনেমা দেখা গেলেও, সিনেমা হলের প্রতি আগের সেই টান এখানে নেই। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে ভাঙ্গাচোরা নড়বড়ে হলগুলোর সাথে স্কুল বা কলেজ জীবনে যেরকম একটা আত্মার টান অনুভব করতাম, সেই টান এখানে কোথায়? এখানে আরাম আছে, বিলাসিতা আছে, স্বাচ্ছন্দ্য আছে সত্য, কিন্তু সেই মানসিক সুখ কই? এ যেন মাটির পৈত্রিক ভিটে ছেড়ে, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বাড়িতে গিয়ে বাস করা।
স্কুল জীবনে দুপুরে স্কুল পালিয়ে, সন্ধ্যায় টিউশন পড়তে যাবার নাম করে, প্রাণের বন্ধু সন্তু আর আমি কত সিনেমা দেখতাম। পয়সার বড় অভাব ছিল। যাও বা কিছু পয়সা জোগাড় হ’ত, সিনেমা দেখে খরচ হয়ে যেত। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা মতো, ওতে আমাতে একটা ব্যাঙ্ক তৈরী করলাম। নিজেরা আলাপ আলোচনা করে, সুবিধা অসুবিধা বিবেচনা করে, নিয়ম কানুন তৈরী করা হ’ল। ঠিক হ’ল জমানো টাকা পয়সা তুলতে হলে, সাত দিন আগে জানাতে হবে। এই সাত দিনের নোটিশের পিছনে অবশ্য একটা কারণ ছিল। আমাদের উভয়ের বাড়ির কাছেই “শ্যামলী” সিনেমা হল ও আশেপাশের সমস্ত সিনেমা হলে, প্রতি শুক্রবার ছবি বদল হ’ত। আশপাশের কোন সিনেমা হলে ভাল কোন ছবি আসলে যাতে সিনেমা দেখে পয়সার অপব্যবহার করা না যায়, তাই এই এক সপ্তাহের নোটিশ। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা পয়সা তোলার সুযোগ আসার আগেই, সিনেমা হলের ছবি বদল হয়ে যাবে। সিনেমা দেখতে অবশ্য ঊনিশ পয়সা, আর একটু ভাল সিটে বসলে, বোধহয় চল্লিশ পয়সা হলেই চলতো। কিন্তু এটাই আমাদের পক্ষে জোগাড় করা দুষ্কর ছিল। একমাত্র আমরা দু’জনেই ব্যাঙ্কের কাষ্টোমার কাম চেয়ারম্যান কাম জেনারেল ম্যানেজার হলেও, এবং ব্যাঙ্কের সঞ্চিত টাকা পয়সা আমাদের নিজেদের কাছে থাকলেও, ব্যাঙ্কের সংবিধানের প্রতি আস্থা ও সম্মান রক্ষার্থে, যত ভাল সিনেমাই আসুক বা যত লোভনীয় প্রয়োজনই হোক, সাত দিনের আগে এক পয়সাও তোলা হ’ত না।
ব্যাঙ্কে টাকা পয়সা জমা দেবার জন্য হাতে লেখা পেয়িং স্লীপ তৈরী হ’ল। স্লিপের মাঝখান দিয়ে সুচ দিয়ে ফুটো ফুটো করে, দু’টো ভাগ করা হ’ল। একটা নিজের, অপরটা ব্য্যঙ্কের। তখন টাকা তো দুরের কথা, পয়সাও হাতে পাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। ঠিক হ’ল নানা ভাবে, নানা কায়দায়, নানা অছিলা অজুহাতে, যা জোগাড় হবে, তাই জমানো হবে। সন্তু কিছু পয়সা জমাও রাখলো। ব্যবস্থায় কোন খামতি ছিল না, খামতি ছিল মনোবলের। সপ্তাহ কয়েক মাত্র ব্যাঙ্কের আয়ু ছিল। তারপর নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে, ব্যাঙ্কের পবিত্র সংবিধানকে অসম্মান করে, সব পয়সা সিনেমা দেখে বাজে খরচ হয়ে গেল। যুক্তি ছিল একটাই— আমাদের দু’জনেরই তো টাকা, আমরা যদি দু’জনেই ঠিক করি টাকা তুলে নেব, তাহলে অন্যায় বা অসুবিধা কোথায়? 
এই পয়সা খরচ করার ব্যাপারে অসংযম ও লুকিয়ে সিনেমা দেখার হ্যাপা নিয়ে কয়েকটা ঘটনা বেশ মনে পড়ে। সাম্ রেস্, অর্থাৎ দৌড়ের মাঝে একটা অঙ্ক কষে, কে আগে দৌড়ে নিশানায় পৌঁছতে পারে, প্রতিযোগিতায় আমি বেশ কয়েক বার সফল হয়েছিলাম। একবার আদর্শ সঙ্ঘ নামে একটা বড় ক্লাবের স্পোর্টস্-এ আমি সাম্ রেসে দ্বিতীয় হয়ে, একটা বেশ ভাল কিট্-ব্যাগ পেয়েছিলাম। মৌমাছি যেমন তিল তিল করে মধু সংগ্রহ করে সঞ্চয় করে, আমিও সেইভাবে পয়সা ম্যানেজ করে করে, দশ টাকা জমিয়েছিলাম। একদিন, এক প্রবল বর্ষণ মুখর সন্ধ্যায়, খুব ইচ্ছে হ’ল “করকাফে” নামে বাড়ির কাছেই এক রেস্তরাঁ থেকে কিছু চপ, কাটলেট কিনে খাই। কিন্তু বার বার মন বাধা দিল—“পয়সাগুলো নষ্ট কোরনা”। একবার খেতে যাব, একবার যাবনা, এই ভাবে ঘন্টাখানেক যুদ্ধ করে, খরচা করার প্রবণতাকে আরও প্রশমিত করতে, খুচরো পয়সাগুলো কিট্-ব্যাগ থেকে নিয়ে বাইরে গিয়ে, একটা চকচকে দশ টাকার নোট বদল করে নিয়ে এলাম। নোটটা হাতে নিয়ে নিজেকে বেশ বড়লোক বড়লোক মনে হ’ল। টাকাটা খরচ করার ইচ্ছাও যেন বেশ কমে গেল। নোটটা কিট্-ব্যাগে তুলে রেখে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। আরও প্রায় ঘন্টাখানেক পরে সব বাধা উপেক্ষা করে, ব্যাগ থেকে চকচকে নোটটা নিয়ে, ছাতা হাতে এক হাঁটু জল ভেঙ্গে করকাফেতে গিয়ে, মন ভরে, পেট পুরে, টাকার সদ্ব্যবহার করে, মনোকষ্টে বাড়ি ফিরলাম। আবার আমি আমির থেকে ফকির বনে গেলাম।  
একদিন সন্ধ্যার সময় টিউশন পড়তে যাবার নাম করে বাড়ির কাছের “শ্যামলী” সিনেমা হলে “রাম ধাক্কা” নামে একটা হাল্কা হাসির সিনেমা দেখতে গেলাম। একাই গেছি। সেই বয়সে ছবিটা খারাপও লাগছিল না। মনের আনন্দে আধো অন্ধকারে ছবি দেখছি, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, আমার ঠিক বাঁ পাশের চেয়ারটায় সাধনদা বসে সিনেমা দেখছে। সাধনদা আমাদের বাড়ির দোতলারই মুখমুখি বাঁপাশের ফ্ল্যাটটায় থাকে। ঐ ফ্ল্যাটের নিতাইদা, সেজদা, মেজদার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঠিক আত্মীয়র মতোই। সাধনদা এই মেজদার শালা, মেজদার কারখানায় কাজ করার সুত্রে, তখন মেজদার কাছেই থাকতো। সাধনদা আমার থেকে বয়সেও অনেক বড়।
যাহোক্ আধো-অন্ধকারে সাধনদাকে এতক্ষণে দেখে যখন পরিস্কার চিনতে পারছি, তখন এটা নিশ্চিত যে, সেও তার ডানপাশে বসা আমাকে এতক্ষণে দেখে ও চিনে ফেলেছে। অর্থাৎ রাম ধাক্কা দেখে বাড়ি ফিরে, ঘাড় ধাক্কার ব্যবস্থা পাকা। ইন্টারভ্যালের ঠিক আগে একটা বেল বাজতো। বেল বাজতেই আমি অন্ধকারে হলের বাইরে চলে এলাম। কিছুক্ষণ পরে হল আবার অন্ধকার হ’ল। শুরু হ’ল নানারকম বিজ্ঞাপন দেখানো। আমি হলের বাইরে, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দুরু দুরু বক্ষে, অপেক্ষা করছি। ছবি আরম্ভ হলে অন্ধকার হলের ভিতরে ঢুকে, হাতড়ে হাতড়ে নিজের সিটে এসে বসলাম। এই রো এর একবারে ডানদিকে, ধারের সিটটা আমার। যতটা পারি ডানদিকে ফিরে বসে, ঘাড়টাকে বাঁপাশে করে, চোখ বেঁকিয়ে, কোন মতে ছবি দেখতে শুরু করলাম। ছবি দেখবো কী, মনের ভিতর তোলপাড় হচ্ছে—বাড়ি ফিরে কী হবে। হঠাৎ সাধনদা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস্ করে বললো, “এই সোজা হয়ে বসে ভাল করে দেখ্, কাউকে বলবো না”। সাধনদা তার কথা রেখেছিল।  
সেদিন স্কুল পালিয়ে “নবরূপম” নামে একটা হলে “নায়িকা সংবাদ” নামে একটা সিনেমা দেখতে গেছি। নতুন মুক্তি পাওয়া ছবি, ফলে অসম্ভব ভিড়। লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবছি টিকিট পেলে হয়। কী কারণে এতদিন পরে মনে নেই, তবে সেদিনও আমি একাই সিনেমা দেখতে গেছি। অনেকক্ষণ পর যখন টিকিট কাউন্টারের প্রায় কাছে এসে পৌঁছেছি, আমার সামনে আর মাত্র তিন-চারজন লাইনে আছে, পিছনে বিরাট লাইন, হঠাৎ নজরে পড়লো, লাইনের একবারে প্রথমে যিনি টিকিট কাটছেন, টিকিট কেটে ঘুরলেই যাঁর নজর সোজা আমার ওপর পড়বে, তিনি আর কেউ নন, স্কুলের শিব বাবু। তিনি স্কুল ছুটি নিয়ে সিনেমা দেখতে এসেছেন, না আমার মতোই স্কুল যাবার নাম করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে, সিনেমা দেখতে এসেছেন জানিনা, তবে এটা জানি যে,  এইসময় বই খাতা হাতে আমাকে সিনেমা হলে দেখলে, কপালে অনেক দুঃখ আছে। তাই এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে লাইন ছেড়ে বেড়িয়ে এসে, বাঘ জল খেতে এলে হরিণ যেমন আত্মগোপন করে থাকে, সেইভাবে দুরে, আড়ালে দাঁড়িয়ে নজর রাখলাম। তিনি ওখান থেকে চলে গেলে, টিকিট কাটার জন্য আবার বিরাট লাইনের পিছনে দাঁড়ালাম। শিব স্যার নিশ্চই দামী টিকিট কাটবেন, তাই কোন ঝুঁকি না নিয়ে, সব থেকে কম দামী টিকিট কেটে, হল অন্ধকার হলে, গুটি গুটি পায়ে ভিতরে ঢুকে ছবি দেখলাম। 
লুকিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে কেউ দেখে ফেলবে, শুধু কী এই একটাই বিপদ? কেউ যাতে দেখতে না পায় সেই ব্যাপারে সাবধানতা নিতে গিয়েও যে কত রকম বিপদ আসে, তা আর আমার থেকে ভাল কে জানে? “যোগমায়া” সিনেমা হলে কী একটা সিনেমা দেখতে গেছি। হল অন্ধকার না হলে ভিতরে ঢোকায় যথেষ্ট ঝুঁকি আছে, তাই বাইরে একপাশে দাঁড়িয়ে, চারিদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে অপেক্ষা করছি। সবাই যখন হলের ভিতর, তখন আমি নগদ পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে, চোরের মতো হলের বাইরে দন্ডায়মান। বই আরম্ভ হবার ঠিক আগে, একটা বেল বাজতো। এসব সিগনাল আমার নখদর্পণে, অভিজ্ঞতার ফসল। বেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে টিউবওয়েল থেকে জল খেয়ে, হলের ভিতরে যাব। একছুটে টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে দেখি, একজন লোক একহাতে কলের মুখ চেপে ধরে, অপর হাতে পাম্প্ করে যাচ্ছে। একা একা জল খেতে হলে, এটাই করতে হয়। এভাবে আমরাও খেতাম, সম্ভবত এ দেশের সবাই এই ভাবেই খায়। কিছুক্ষণ পাম্প্ করার পর, কলের মুখের হাতটা সামান্য ফাঁক করে, কলে মুখ ঠেকিয়ে জল খেতে হয়। লোকটা পাম্প্ করা শেষ করে কলের মুখে সবে মুখ ঠেকাতে যাচ্ছে, এমন সময় আমি দৌড়ে কলের সিমেন্ট বাঁধানো জায়গায় এসে, শেওলায় পা পিছলে পড়ার উপক্রম। নিজেকে বাঁচাতে একহাতে টিউবওয়েলটা ধরতে গেলাম। কিন্তু বেসামাল অবস্থার জন্য, হাতটা গিয়ে সজোরে লোকটার মাথায় লাগলো। কলের সাথে সজোরে মাথা ঠুকে, “ওরে বাবারে” বলে লোকটা কল থেকে হাত সরিয়ে, মাথায় হাত দিয়ে বাঁধানো জায়গায় বসে পড়ে যন্ত্রনায় কাতরাতে লাগলো। এদিকে আবার কল থেকে সজোরে জল পড়তে শুরু করায়, লোকটা পুরো ভিজে গেল। আমি সরি বলে বোকার মতো লোকটার সুস্থ হবার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, আর মনে মনে রামকৃষ্ণপুর না শিবপুর, কোন শ্মশানঘাটে আমায় নিয়ে যাওয়া হবে ভাবছি। লোকটা নিশ্চই সুস্থ হয়ে আমায় এক হাত নেবে। ছুটে যে পালাবো, তারও তো উপায় নেই। পকেটে বহু কষ্টে জোগাড় করা পয়সায় কাটা সিনেমার টিকিট। কিন্তু লোকটা ভীমের মতো চেহারা হলেও, যুধিষ্ঠিরের মতো ভদ্র, তাই সে যাত্রা কোন মতে বেঁচে গিয়ে, মাঝখান থেকে সিনেমাটা দেখলাম।
আজ পরিতক্ত ভুতুড়ে হলগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বুকের ভিতরটায় কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। এই হলগুলো একদিন সামান্য পয়সার বিনিময়ে কত ঘন্টা আনন্দ দিয়েছিল। আজ ইতিহাস হয়ে গিয়ে রাতে রিক্সা রাখার জায়গা হয়ে গেছে। খুব ইচ্ছা করে একবার হলের ভিতরে যেতে, পুরানো সিটগুলো আছে কী না জানিনা, থাকলে কিছুক্ষণ বসে স্মৃতি রোমন্থন করতে। কিন্তু কাকে বলবো?




স্বপন দেব

 হোমওয়ার্ক 

ইউ এস এ থেকে মহুল আর অরিত্র যখন দেশে ফিরলো, অরিভের বয়েস তখন মাত্র ছয়। অ্যামেরিকায় জন্মেছে বলে জন্মসূত্রে অরিভ   ইউ এস এ এর নাগরিক। তবে আঠারো বছর বয়েস হলে অরিভ ই ঠিক করবে ও কোন দেশের নাগরিকত্ব নেবে। তবে মহুল আর অরিত্র দুজনের ই ইচ্ছে অরিভ ইউ এস এ তেই সেটল করুক। আর সেইজন্যেই ওকে ছোটো থেকেই তৈরি করছে মহুল আর অরিত্র। অরিভের বয়েস এখন এগারো। মহুল পেশায় সফটওয়্যার  ইঞ্জিনীয়ার আর অরিত্র ম্যানেজমেন্টে আছে। দেশে ফিরে কোলকাতায় ওদের চাকরি মেলেনি। জুটেছে গুজরাটের গান্ধীনগরে।  আপাতত দুজনেই আছে অরিভ কে নিয়ে। অরিভ কে গান্ধীনগরের  একটা ইন্ট্যারন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে। অরিভের গরমের ছুটি শেষ হতে আর মাত্র তেরোদিন বাকি। সারা ছুটিটা গুজরাটে    কাটিয়েকাল ওরা যাবে কোলকাতায়। মহুলের মা আর অরিত্রের মাও থাকে কোলকাতায়। সেখানে দিন চারেক থেকে ওরা যাবে লেহ। ফিরবে ফ্লাইটে। গত তিন মাসে কাজের চাপে মহুল একটা দিনও ছুটি নিতে পারেনি। অরিভ গরমের ছুটিটা বন্ধুদের সাথেই খেলে কাটিয়েছে। বেড়াতে যাবার অন্যতম আকর্ষণ প্যাকিং। মহুল খুব উৎসাহ ভরে তিনজনের জামা কাপড়, ব্যাগে ভরল। নানারকম ড্রাই ফুডস এর প্যাকেট ভরা হলযার অনেকগুলোই ও জানে পরে  গুজরাটে ফিরে এসে খোলা হবে বা ফেলে দেওয়া হবে। তবু সঙ্গে  খাবার-দাবার না নিলে ইন্সিকিউর লাগে। কাজু, চিপ্স, টুনা সব  ঢুকলো। ব্যাস এবার বাকি রইল শুধু পেপারগুলো। এই  সাইডপকেটেই ঢুকে যাবে।” “পেপার!” - শুনেই অরিভ আঁতকে    উঠেছে। তোমরা ওখানে গিয়ে অফিসের কাজ করবে !  আমি যাব না  তাহলে  মহুল  ওকে আশ্বস্ত করল -  আমাদের পেপার না - তোমার সামার হলিডেজ এর এ্যাসাইনমেণ্ট শীটগুলো। হোমওয়ার্ক  শেষ করতে হবে না!” “সে তো এসেও করা যায়” – অরিভ  প্রতিবাদ করল। মহুল বলল – “যায় কিন্তু এসে অত সময় পাওয়া  যাবে না।  প্রোজেক্টটাও তো করতে হবে।শীটগুলো বার করো।  কোলকাতাতে বাবা যখন কাজে যাবে তখন আমরা দুজন মিলে  করে ফেলব। বেশীরভাগই তো ক্রসওয়ার্ড, ছবি আঁকা এইসব দেখ  মজা হবে।
অরিভ ব্যাজার মুখ করে এ্যাসাইনমেণ্ট শীট বার করতে গেল।কিন্তু   অনেক খুঁজেও কিছুতেই এই বছরের এ্যাসাইনমেণ্ট শীটগুলো পাওয়া গেল না। গত বছরের সমস্ত শীট, অরিত্রর যাবতীয় পুরোনো  অফিসের  পেপারস, মহুলের অফিসের মীটিংএর মিনিটস সব  পাওয়া গেল শুধু দরকারি শীটদের দেখা নেই। টেন্স হয়ে গেলেই  মহুল চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। আমি তো এইখানেই রেখেছিলাম  এই ড্রয়ারে কোথায় গেল!” – দাঁত কিড়মিড় করতে করতে মহুল ড্রয়ারের ভেতর থেকে, পড়ার টেবিল থেকে,  বুককেসের ভেতর থেকে দিস্তা দিস্তা আবর্জনা বার করে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে ঘরের চারদিকে।  অরিভ ক্যাচ প্র্যাক্টিস করতে করতে বলল   – “তুমি রাখার পর ম্যাম আবার দেখতে চেয়েছিল। আমি তাই স্কুলে  নিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনই আবার কুট্টি মাসী এসেছিল দেখতে চাইল আমি দিলাম তারপর থেকেই আর পাচ্ছি না।” “মানে!  তুমি জানতে যে ওটা হারিয়ে গেছে? তাহলে আগে বলনি কেন?” “আমি ভাবলাম কুট্টি মাসী বোধহয় তোমাকে দিয়েছে। ট্যাক্টফুলি  বলটা মহুলের কোর্টে চালিয়ে দিল অরিভ।  কুট্টিমাসী অর্থাৎ মহুলের অফিসের বান্ধবী।  অরিভ  চাইছে ফোকাসটা ওর ওপর থেকে মাসীর ওপর শিফট করতে। অরিত্র পুরো ব্যাপারটায় ইনভল্ভড হতে   চাইছে না। ও মহুলের ছুঁড়ে ফেলা কাগজের গাদা থেকে কিছু নোটস  বেছে বেছে রাখছে। গত মাসেই একটা কাজের জন্য এই  নোটগুলো  খুঁজেছিল ও পায়নি বলে আবার বানাতে হল।এখন দেখছে  বানিয়ে ভালোই করেছে এগুলো একটু ব্যাক-ডেটেড হয়ে যেত।  ওর আবছা মনে পড়ছে কোথায় যেন দেখেছে এ্যাসাইনমেণ্ট শীটগুলো কিন্তু মনে করতে পারছে না। এরকমuseless  ইনফরমেশন দিলে মহুল আরো খেপে যাবে এখন।
মহুল গজগজ করছে – “প্রত্যেক বছর একই জিনিষ। কেন আগে  থেকে শেষ কর না তুমি হোমওয়ার্ক?” জবাব অরিভের তৈরীই ছিল  – “তোমাদেরই তো সময় ছিল না মা ! শীটের একদম ওপরেই  লেখা ছিল যে কাজগুলো করতে হবে With active involvement of parents – ভুলে গেছ?” মহুলকে চুপ করতে বাধ্য করে অরিভ।  প্রায় একঘণ্টা বৃথা খোঁজাখুঁজির পর ওরা ঠিক করে যে কোন বন্ধুকে ফোন করে তার থেকে শীট এনে জেরক্স করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই এখন। মহুল তখন রোহনের মাকে ফোন করে বলে যে  ও অরিভ কে নিয়ে আসছে শীটগুলো নিয়ে জেরক্স করে তখনই ফেরত দিয়ে আসবে।
শীট তো জোগার হলো। কিন্তু দেখা গেল যে রোহন তার মধ্যে  অনেকটাই লিখে ফেলেছে।  অরিত্র বুদ্ধি দেয় – “চল আমরা দুজনে  মিলে পুরোটা টাইপ করে ফেলি। মহুল আঁতকে ওঠে – “ক্রসওয়ার্ড  টাইপ করা চাট্টিখানি কথা নাকি! তার চেয়ে আমি হ্বোয়াইটনার মেরে আবার জেরক্স করে আনি।
কোলকাতা যাত্রার প্রাককালে শীট তৈরী হল মহুল মনে মনে  প্রতিজ্ঞা করল এর পরের বছর থেকে শীটগুলো পেয়েই ও লকারে রেখে দেবে 
মহুলের মায়ের ঘরে বসে বসে শীট উদ্ধার করল মহুল আর অরিভ।
দুদিন ধরে অরিভকে অনেক ভুজুং ভাজুং দিয়ে মহুল কাজ প্রায় শেষ  করে এনেছে।  কাল ওরা অরিত্রের মায়ের বাড়ি যাবে। মেণ্টালি প্রিপেয়ারড থাকার জন্য প্রোজেক্ট গুলোতে একঝলক চোখ বুলিয়ে নিল অরিত্র আর মহুল। একটা ম্যাগাজিন বানাতে হবে।মহুল বলল  ওটার দায়িত্ব ও নেবে। ইঞ্জিনীয়ার হলেও সাহিত্য ওর প্রিয়  বিষয়।   অরিত্র দায়িত্ব নিল কেমিষ্ট্রি প্রোজেক্টের। বাড়ীতে ইণ্ডিকেটর বানাতে   হবে রেড ক্যাবেজ দিয়ে।  ওয়াটার হারভেষ্টমেণ্টের ওপর একটা রাইট-আপ বানাতে হবে। কথা হল ওটা অরিভ নিজেই ওয়েব সার্চ   করে বানিয়ে ফেলবে। মহুল আরেকবার খেপে গেল – “তা এতদিন  বানাওনি কেন?ম্যাগাজিনের জন্যই বা কখন লিখবে, রাইট আপই বা কখন করবে!অরিত্র তাড়াতাড়ি মধ্যস্থতা করল – “থাক না হয়ে  যাবে। অত টেন্স হবার কিছু নেই। সব প্রোজেক্ট সাবমিট করতে হবে   এরকম কোন মানে নেই!” “মানে?” অরিত্র আর মানেটা সবিস্তারে বলল না ! এর পর ওরা গেল লেহ তে।
লেহতে ওরা ছিল পাঁচদিন। সিন্ধু নদীর জলে সূর্যাস্তের স্বর্ণালী রং  রোজ বিকেলে আগুন ধরায়। বিশ্বের উচ্চতম সড়ক ধরে, খার দুংলা  ক্রস করে ওরা গেল ডেসকিটের কোল্ড ডেজার্টে। দেখে এল বরফের পাহাড়ের কোলে কোলে ভারত থেকে তিব্বত চলে গেছে অপরূপ সবুজ-নীল লেক প্যানগং - পলিটিকাল সীমার ধার ধারে না সে। এছাড়াও অজস্র গুম্ফা, ফ্রেসকো, মিউজিয়ম পাঁচটা দিন হুশ করে কেটে গেল।
ফেরার পথে ফ্লাইটে অরিত্র অরিভকে বলল – “লিখে ফেল লেহর  ওপর ট্রাভেলগ লিখে ফেল।  কালার ছবি দিয়ে তোর ম্যাগাজিনটা দেখবি না কি দারুণ বানিয়ে দেব!অরিভ গাঁইগুঁই করে  ম্যাগাজিনটা ওর দায়িত্বে ছিল না।  অরিত্র বলে লেখা তো সবাইকে   লিখতে হবে।  ও ম্যাগাজিনের এডিটর কাম প্রিণ্টার!   
অতঃপর গুজরাট।  হাতে রয়েছে দুটো দিন। প্রথম দিন সকালে   অরিভ চেষ্টা-চরিত্তির করে একটা ভ্রমণকাহিনী লিখে ফেলল  আধপাতার মধ্যে। একলাইনে রইল কি কি দেখা হয়েছে। দু লাইন  লাঞ্চ আর ডিনারের মেনু। তারপর রয়েছে বরফে কাবু হবার কথা।   বাকিটা ওর জীবনের ট্র্যাজেডির ওপর যে বেড়াতে গিয়েও ওকে হোমওয়ার্ক করতে হয়েছে !  তার পরেই ওর মনে হল যে শুধু  ভ্রমণকাহিনীতে ম্যাগাজিনটা ঠিক জমবে না।তাই অরিভ একটা  ডিটেকটিভ গল্প লেখার দিকে মন দেয়।আধপাতার মধ্যে গল্প শেষ  করে ও মহুলকে ফোন করে দিল যে মা যেন অন্তত একটা কবিতা  লিখে ফেলে তাহলে ব্যাপারটা বেশ সর্বাঙ্গ-সম্পূর্ণ হবে। ছেলের ফোন পেয়েই সফ্টওয়্যার কন্সালট্যান্ট মহুলের মাথায় ছড়া গুনগুন  করতে শুরু করল।অচিরেই একটা ছড়া দাঁড়িয়েও গেল। নিজের  সৃষ্টি ব্যাগে বন্ধ করে বেশীক্ষণ বসে থাকা যায় না।  তাই বিকেল সাড়ে-চারটেতেই মহুল অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। ফেরার পথে   ডিপার্টমেণ্টাল স্টোর থেকে রেড ক্যাবেজও নিয়ে নিল। ইণ্ডিকেটর  বানাতে হবে।অরিভ ইতিমধ্যে ওয়াটার হার্ভেষ্টমেণ্ট নিয়ে বসে।   ইণ্টারনেট থেকে কয়েক প্যারাগ্রাফ, ছবি ইত্যাদি একটা ফাইলে কাট-পেষ্ট করে অরিত্রকে মেইল করে বলে দিল ফরম্যাট করে যেন  প্রিণ্ট-আউট নিয়ে নেয়। ওর কাজ শেষ করে অরিভ খেলতে চলে গেল।
বাড়ী ফিরে অরিভের সাহিত্যকর্ম দেখে মহুল  আর অরিত্রের মাথায় হাত। তিন পাতার ম্যাগাজিন বার করতে অস্বীকার করল এডিটর অরিত্র ! পেরেণ্টস ইনভল্ভমেণ্ট বলে দেবার ফলে এটা একটা প্রেষ্টিজের ব্যাপার হয়ে গেছে ওদের। তাই তিনজনে মিলে এবার  লেগে গেল ম্যাটার তৈরী করাতে। অরিভকে বলা হল ওর প্রিয় বিষয় ক্রিকেট আর ক্রিকেটার নিয়ে লিখতে। এবার আর অরিভের কোন  আপত্তি রইল না। এক সন্ধ্যেতেই গোটা চারেক পাতা ক্রিকেটার,   তাদের টিম, রেটিং, রেজাল্ট, ছবি - সব নিয়ে ভালোই দাঁড় করাল। অরিত্র পড়ল ডিটেক্টিভ গল্পটা নিয়ে। অরিভের গল্পে চোর, তার চুরি,  কবে, কখন এবং কারা চোর ধরেছিল সবই ছিল কিন্তু সারমর্মের মতো। তাকেই টেনে হিঁচড়ে লম্বা করে দুপাতা করল অরিত্র। আগাথা ক্রিষ্টি, এনিড ব্লাইটনের জব্বর পাঞ্চ। অরিভ একটু   ক্ষুব্ধ ওর গল্পটা নাকি শার্লক হোমসের স্টাইলে ছিল আরেকটু ইণ্টেলেকচুয়াল। তবে অরিত্রের দাবড়ানিতে অরিভ খুব একটা সুবিধে   করতে পারল না।  লেহ ভ্রমণকাহিনী মহুলের হাতে পড়ে রঙ্গীন ছবি   সহ খুবই মনোগ্রাহী হয়ে উঠল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে।
এরই মধ্যে ম্যাগাজিনের দপ্তর ছেড়ে মহুল আর অরিভ পৌঁছে গেছে রান্নাঘরে ইণ্ডিকেটর বানাতে। আধখানা রেড ক্যাবেজ সিদ্ধ করতে   বসানো হল। বাকি অর্ধেকটা ফ্রিজে ঢোকাল। আপাতত থাক -  শুকিয়ে গেলে ফেলে দেবে! মূ্হূর্তের মধ্যেই বাটির জল ঘোর তুঁতে বর্ণ লাভ করল।  বেশ রোমাঞ্চকর! সেই জল ঠাণ্ডা করে তাতে ড্রয়িং পেপারের স্ট্রিপ কেটে কেটে ডোবানো হল।কাগজের টুকরোগুলো  দিব্যি সবুজ হল। এবার এসিড টেস্ট।রান্নাঘরে গিয়ে সেগুলোর   ওপর ভিনিগার প্রয়োগ করা মাত্র কাগজগুলো গোলাপী হযে উঠল।  বাঃ ! এবার ক্ষার খোঁজার পালা। বাড়ীতে এ্যাসিড যত সহজে পাওয়া   গেছিল দেখা গেল ক্ষার অত সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাবান জল,  বেকিং সোডা,অ্যাণ্টাসিড সব রকম দ্রব্য নিয়ে চেষ্টা করা হল। কিন্তু বিশেষ সুবিধে হল না। সবুজ থেকে নীলের দিকে সামান্য রং  বদল দেখা যাচ্ছে কিন্তু তা চোখের ভুল না কাগজটা ভেজার ফলে সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। যাই হোক - সমস্ত কাগজের টুকরো  হাওয়ায় শুকোতে দিয়ে সেই রাত্রের মতো শুতে গেল তিনজন।
পরের দিন চোখ খুলেই মহুল ছুটেছে কাগজের রং দেখতে। দেখে তো ওর মাথায় হাত ! প্রায় সব কাগজই সাদা খুব সামান্য সবুজ  অথবা গোলাপী আভা আছে তবে তা বোধহয় নেহাত ও জানতো বলেই। অরিভের ওপর নির্দেশ হলো কেমিষ্ট্রি নোটবুকে প্রোসিডিউর   আর অবজার্ভেশন লিখে ফেলার এভিডেন্স দেওয়া যায় না সব কিছুর। গজগজ করতে করতে অরিভ রাজি হল। কিন্তু ওর ইচ্ছে ব্যক্ত করল যে মা যেন দ্বিতীয় প্রোজেক্টটাও একটু দেখে। সেটাতে  ছিল যে ফিটকিরির স্যাচুরেটেড সলিউশান বানিয়ে তাকে কৃস্টালাইজ করতে হবে। মহুল বলল – “ঠিক হ্যায় ওটাও হয়ে যাবে। 
সেদিন বিকেলে মহুল আবার অফিস ফেরত বাজারে গেল ফিটকিরি  কিনতে। দেখা গেল ব্যাপারটা ঠিক যত সহজ ভেবেছিল তা নয়। গান্ধীনগরের সুপারমার্কেটে ফিটকিরি কিনতে পাওয়া যায় না।তাই  দোকানদারদের নাক সিঁটকানোকে অগ্রাহ্য করে ও কাতর ভাবে  জানতে চাইল কোথায় পাওয়া যেতে পারে। দোকানদার বলল  রাস্তার পাশে যে নাপিতরা দাড়ি কাটে তাদের কাছে থাকতে পারে!” “তারা কোথায় থাকতে পারে?” – সেটা সঠিক কেউই বলতে পারল না। প্রায় দু ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পর ফিটকিরি যোগার করে বাড়ী  ফিরেই সোজা রান্নাঘরে। ফিটকিরির কৃষ্টাল ব্যাপারটা ভাগ্যক্রমে বেশ   সহজেই তৈরী হয়ে গেল। কৃষ্টালদের প্যাকেটস্থ করে মহুলের ছুটি!  অরিত্র ব্যস্ত ম্যাগাজিনের প্রিণ্ট-আউট নিয়ে। কাউকে ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না।
মহুল অরিভকে বলল অন্যান্য সব জিনিস ব্যাগে ভরে ফেলতে। চেকলিষ্ট দেখে মেলাতে গিয়ে আবার মাথায় হাত। ম্যাথসের আসাইনমেণ্টটা কারুরই চোখে পড়েনি। একটু অদ্ভূত ধরনের  কাজটা। একটা কার্ডবোর্ডে হিসেবমতো নির্দিষ্ট দূরত্বে ফুটো করে সুতো দিয়ে সেলাই করে একটা প্যারাবোলা তৈরী করতে হবে।দায়িত্বটা খুব স্বাভাবিকভাবেই মহুলের।  হারিয়ে যাওয়া সেলাইয়ের ব্যাগ খুঁজে কমলা রঙের উল বার করে ওটাও তৈরী হল। রাত সাড়ে  এগারোটায় অরিত্র ওর ম্যাগাজিন পেশ করল। দুর্দান্ত কভার    অসাধারণ সব ছবি - প্রায় প্রোফেশনাল কোয়ালিটির ম্যাগাজিন দেখে অরিভ খুব খুশি। বিধ্বস্ত হয়ে তিনজন শুতে গেল যখন তখন রাত  প্রায় বারোটা।
পরের দিন সকালে অরিত্র অরিভকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এল গাড়ী  করে। বলল দুপুরে নাকি গিয়ে নিয়েও আসবে। আসলে দুজনেই  বেশ উত্তেজিত সামার হলিডেজ এর হোমওয়ার্কে তো যা দেখা যাচ্ছে বাবা-মায়েরই মূল্যায়ন হবে ! ছেলে যদি এসে ওদের বকাবকি  করে! প্রেস্টিজ একেবারে গ্যামাক্সিন হয়ে যাবে!
স্কুল থেকে রিপোর্ট এল পরের দিন। অরিভ দারুণ উত্তেজিত।প্যারাবোলা পেয়েছে। তবে আসল খবর হলো ওর ম্যাগাজিনটা  দারুণ প্রশংসিত হয়েছে। ম্যাম বলেছে ওর ম্যাগাজিনটা ক্লাসের  ডিসপ্লে বোর্ডে লাগানো হবে সামনের মাসে।টেনশনে মহুল আজ হাফ-ডে ছুটি নিয়ে চলে এসেছে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল এতক্ষণে। অরিত্র আলতো করে মনে করিয়ে দিল যে কৃতিত্বটা আসলে ওর। অরিভ ওর গলা জড়িয়ে ধরে আদর করে দিল। সাথে রাত্রে সেলিব্রেশন ডিনারেরও প্ল্যান হয়ে গেল।
খেতে খেতে অরিভ ওর প্রস্তাবটা সর্বসমক্ষে রাখল। বাবা তুমি কি ম্যাগাজিনটার আর কটা প্রিণ্ট-আউট দিতে পার?” “কেন স্কুলে চেয়েছে?” “না মানে বন্ধুরা পড়তে চেয়েছে। তাই ভাবছিলাম যদি  কয়েকটা কপি করে দিতে পার তাহলে ক্লাসে বিক্রী করতে পারি আমি। কত করে রাখা যায় বলতো?” “কি!গলায় ভাত আটকে  যায় মহুলের।  অরিত্র মহুলের পিঠে চাপড় মারতে মারতে খুব ঠাণ্ডা  গলায় বলল এক এক পাতা কালার প্রিণ্ট-আউটের কত খরচা জানিস? পনেরো টাকা! তাহলে হিসেব কর তোর পনেরো পাতার ম্যাগাজিনের দাম কত হবে?” “দ্যাটস টু এক্সপেনসিভ! কেউ কিনবে না” – অরিভ মুষড়ে পড়ে। আচ্ছা জেরক্স করে বিক্রী করা  যায়?” মহুল ভয়ে আর ভাত মুখে দেয় না। অরিত্র প্রবল আপত্তি  করে – “পাগল! কালার ছাড়া ওই লেহর ছবিগুলো খুলবে?” অরিভও  মাথা নাড়ে – “নাঃ জমবে না। মন খারাপ করে কোনমতে একটু  খেয়েই অরিভ উঠে পড়ে।পরক্ষণেই হাত ধুতে ধুতে হঠাৎ অরিভের  প্রবল চিৎকারে মহুলের হাত থেকে মাছের ঝোলের বাটি সোজা  ছিটকে অরিত্রের কোলে।মা একটা আইডিয়া! আমি তো  ম্যাগাজিনটা লেণ্ড করতে পারি বল বন্ধুদের! পার ডে দশ টাকা! লাইব্রেরির মতো। মহুল অরিত্রকে জিজ্ঞেস করে – “আচ্ছা ডারউইনের থিওরি কি ভুল ছিল? পড়েছিলাম এ্যাকোয়ারড ক্যারেক্টারিস্টিকস আর নট ইনহেরিটেড শুধু গুজরাটের হাওয়াতেই  এরকম পাকা ব্যবসাবুদ্ধি ও কি করে পেল?” মহুলের এই মধ্যবিত্ত মানসিকতায় অরিত্র হাঁসে। ও খুব খুশি - ছেলে এণ্টারপ্রিনিউর হবার  পথে পদক্ষেপ নিচ্ছে। অন্তত ওদের মত বাবা-মায়ের কথা শুনে বাধ্য  হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিঙ বা ম্যানেজমেন্ট  পড়বে না!