এই প্রবাস (৫ম ও শেষ পর্ব)
পুজোর তিনটে দিন যে কি ভাবে কেটে গেল কেউ জানতেও পারল না। গল্প,আড্ডা হৈচৈ আর পুজো দেখেই কাটিয়ে দিল সবাই। আজ বিজয়া দশমী। একদিকে চেয়ার পেতে চলছে জোর গল্পগুজব। আর একটু পরেই দশমীর অঞ্জলী আর তার পরেই মেয়েদের সিঁদুরখেলা। আসলে এই অনুষ্ঠানটি দেখার জন্যই জমায়েত হওয়া। ছোট-বড়, বয়স্ক, তরুণ সব পুরুষই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন এই অনুষ্ঠানের সময় মেয়েদের দিকে। কারো মুখে মৃদু হাসি, কেউ কেউ মজা পান, কেউ বা দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী বা ভালবাসার নারীটিকে সিঁদুরে রাঙ্গিয়ে যেতে দেখতে ভালবাসেন। দশমীর সকালে তাই মেয়ে-পুরুষের ভিড় লেগে থাকে পুজোমন্ডপের ভিতর। বয়স্কা মহিলারা অনেক সময় কাউকে বলেন—একটু তুলে ধরত মা, এ বছর তো ঠাকুরের কাছে সিঁদুর নিয়ে নিই, কি জানি, পরের বছর থাকব কিনা।‘
অল্পবয়সী
মেয়ে-বৌদের দিকে তাকিয়ে বলেন—দে ঢেলে দে,
যত পারিস, আজ কাউকে ছাড়বি না।‘ অল্পবয়সী
মেয়েগুলির উৎসাহ আরো বাড়ে। একেবারে কম বয়সী অবিবাহিতা মেয়েদের কপালে কেউ কেউ টিপ
পরিয়ে দিয়ে বলেন—এই,
পরের বছর তোর মাথায় যেন সিঁদুর দেখতে পাই।‘
মেয়েগুলি লজ্জ্বা পায়,একটু দূরে সরে যায় ঠিকই কিন্তু আবীর খেলার মত এ –ওর গালে সিঁদুর লাগায়। নতুন বিবাহিতা মেয়েদের দিকে সবার নজর,
ঢেলে সিঁদুর লাগানোর হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।
মোটের ওপর আজ মেয়েদের অবারিত আনন্দের দিন। সুসজ্জ্বিতা মেয়েদের আজকের দিনে দেখতেও
ভালো লাগে। কে বলবে,বাড়িতে
এরাই থাকেন আধময়লা শাড়ী আর হাতে হলুদের ছোপ নিয়ে!
পুজো
প্যান্ডেলে মেয়েদের
পাশাপাশি আজ বেশ
কয়েকটি পুরুষদেরও জটলা। কোথাও বয়স্ক পুরুষেরা, কোথাও অল্পবয়সী ছেলে-ছোকরারা, কোথাও আবার কমবয়সী ছেলে-মেয়েদের হাসাহাসি। সবার নজর কিন্তু আজ মেয়েদের দিকে। এমন
একটি অপরূপ উৎসব কেন পুরুষদের থাকে না?
তখনও পুজো
চলছে, আর একটু পরেই শুরু হবে অঞ্জলি।
হাতে পুজোর থালায়
সিঁদুর, আলতা, অপরাজিতার মালা,
কিছু ফুল-দুর্বা আর একটি ছোট্ট মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে মন্ডপে এলো মালিনী। পরনে লাল পাড়
গরদের শাড়ী। স্নান করে এসেছে,
অঞ্জলি দেবে বলে। শাড়ির আঁচল পিঠের ওপর দিয়ে গায়ে জড়ানো। আজ প্রায়
ছয়-সাত বছর ধরে রণেন, মালিনীর দাদা মারা যাবার পর থেকে
এই অনুষ্ঠানটিতে সে আসে,আসতে হয়। রণেন চলে
যাবার পর থেকে পারুল আর আসেন না প্রতিমার সামনে। গুণিনবাবু মারা যাবার পর থেকে তো বাইরে বেরোনই বন্ধ করে
দিয়েছেন। একরকম বিছানায় বন্দী বলা যেতে পারে তাঁকে। দশমীর সন্ধ্যাবেলা পাড়ার
ছেলেমেয়েরা প্রণাম করতে গেলে অল্পক্ষণ উঠে বসেন, দু-চারটি কথাবার্তা বলেন, ওইটুকুই। আর কোন কথা প্রায় সারা
বছর হয় না বললেই চলে। নিজেকে সকলের থেকে আড়াল করে নিয়েছেন। বাইরের কাজকর্ম,
উৎসব অনুষ্ঠানের ঝক্কি সব সামলাতে হয় মালিনীকেই।
মিলি মন্ডপে আসতেই শুভর মা,অণিমা কাকিমা জিজ্ঞেস করলেন মৃদু স্বরে,দিদিকে কার কাছে রেখে এলি?’
তেমনই নিচু গলায় উত্তর দিল মিলি—আলোদি আছে,কাকিমা।‘ গুপ্তকাকিমা হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিলেন মিলিকে। অনিমার সঙ্গে কথা বলার সময় কেমন যেন চাঞ্চল্য অনুভব করল মিলি। কেন জানে না, কিন্তু কি একটা মনে হতেই একটু দূরে ডানদিকে যেখানে ঠিক বয়স্ক নয় আবার একেবারে ছেলেছোকরাদের জটলাও নয়, সেদিকে তাকাতেই শুভর চোখে চোখ পড়ে গেল। একবার তাকিয়েই আবার চোখ তুলে দেখে নিয়ে চোখ নামিয়ে নিল মিলি। দেখল শুভও তাকিয়ে রয়েছে এদিকেই। মুখ লালহয়ে উঠল। আর কোনদিকে না তাকিয়ে প্রতিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। কিন্তু মনের ভিতর তখন আলোড়ন। কই, শুভ আসবে, একথা তো সে জানে না! শুভ তো দুর্গা পুজোতে আসে না, দেওয়ালিতে বোনের কাছে ভাইফোঁটা নিতে যায় বলে আর বাড়তি ছুটি পায়না। সেই কারণেই মহালয়ার সময় দু-একদিন বাড়তি কাটিয়ে যায়। এবারেও তো মহালয়াতে এসেছিল। তবে কি শুভ এবার পাটনা যাবে না! ভাবতে গিয়ে আবার শুভর চোখে চোখ পড়তে একেবারে অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে নিল মালিনী। আর মুখ ঘোরাতেই দেখল কণা বৌদি আর বাণী, ওপাড়ার রুদ্রদার বৌ ওরই দিকে তাকিয়ে। লজ্জ্বায় মুখ নিচু করে ফেলল মিলি।
দশমীর
শেষে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল প্রণাম করার। একদিকে প্রণাম, অন্যদিকে মেয়েদের সিঁদুর খেলার রেশ তখনও চলছে। হীরালালের নতুন বৌ কুসুমকে
মেয়েরা সিঁদুরে একেবারে ঢেকে দিয়েছে, তাই নিয়ে এখনও অল্পবয়সী বৌ-মেয়েদের মধ্যে হই-চই লেগে রয়েছে। কুসুমও এদের সঙ্গে বেশ মেতে উঠেছে দেখে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে
হাসছিলেন নয়না দেবী, হীরালালের মা। হীরালালরা অনেকটা দূরে থাকে, তাই সব সময় সকলের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করা হয়ে ওঠে না। এবার পুজোতে তাই হীরালালের মা পুত্রবধূকে সকলের সঙ্গে
পরিচয় করানোর জন্য মন্ডপে নিয়ে এসেছেন, প্রবাসের দিনগুলি আনন্দমুখর হয়ে
উঠুক সকলের। এই দুরদেশে তো এদের সঙ্গেই ওঠা বসা। তাই পরিচয়ও প্রয়োজন। কখন কার কাকে
দরকার, কেউ কি বলতে পারে! তাছাড়া হীরালাল এই বাঙ্গালীপাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই একসাথে বেড়ে উঠেছে।
পড়াশোনা, খেলাধূলা সবেতেই সে আছে, পুজোর মিটিং এও তার ভূমিকা আছে, তবে তাঁদেরই বা পুজোতে সকলের সঙ্গে একত্র হওয়া বাদ যাবে কেন?
হঠাত বেশ জোরে দুলুর গলা শোনা গেল। কয়েকজন এই হাঁক শুনে তাকাল দুলুর দিকে। দুলু একহাতে টুটুলকে ধরে টেনে নিয়ে মন্ডপের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে, টুটুল হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। টুটুল মানে ইব্রাহিম, যে কিনা বাইরে বসেছিল কিছু ছেলে ছোকরার সঙ্গে , সেখান থেকে দুলু তাকে জোর করে প্যান্ডেলের ভিতর নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। টুটুল পুজোর সময়টাতে বাইরে বসে গাল-গল্প করে, ভিতরে আসে না, প্রবাসে হয়ত দেশের মত অত নিয়ম,শুচি-অশুচি বাতিক নেই, টুটুলকে এই নিয়ে কেউ কোনদিন কোন কথাও বলেন না, বলেন নি। কিন্তু সে নিজের থেকেই ভিতরে আসে না। তার জন্যও তাকে কেউ জোর করেন না। কি জানি, ভিতরে পুজোর সময় আসাতে তার নিজেরও কোন বাধা থাকতে পারে! এই নিয়ে কেউ যেমন কিছু বলে না, আবার পুজোর মিটিং এর সময় কাজের দায়িত্ব দিতেও কেউ অস্বীকার করে না। প্রবাস বলেই হয়ত ভালবাসাবাসিটা এখনও পর্য্যন্ত বজায় আছে। একটু আগেই ঘট বিসর্জন হয়েছে, তার মানে প্রথামত পুজো শেষ। তবে এখন আর মন্ডপের ভিতরে আসায় দোষ কিসের? দুলু তাই টুটুলকে ভিতরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। যে ছেলেটি পুজোর অনেক কাজে অংশগ্রহণ করেছে,করে, সে পুজোর শেষ আনন্দটুকুও ভাগ করে নিক সকলের সঙ্গে। হাসতে হাসতে টুটুল দুলুর হাত ধরে মন্ডপের ভিতরে ঢুকল।
পুরোহিত
মশায়ের তখন শান্তির জল দেওয়াও প্রায় শেষ। টুটুলকে ঢুকতে দেখে আম্রপল্লবটি একবার
ঘটের জলে ডুবিয়ে নিয়ে ‘ওঁ শান্তি”
বলে টুটুলের মাথায় ছিটিয়ে দিলেন। বাটু,
দুলু, বাদলের দল হই হই করে উঠল—কাকু, আমাদের কম দিলেন,
ওকে বেশী দিলেন। আরো একবার আমাদের দিতে হবে।‘
-যা ভাগ, তোদের
সবাইকে দিয়েছি, আর না,
পরের বছর দেব’ বলে শুধু আম্রপল্লবটি আবার সকলের মাথার উপর ছিটিয়ে দিলেন। মেয়েরা তখনও টুকরো
টুকরো দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্প করছেন। বয়স্করা একে অপরের খোঁজ নিচ্ছেন,
আবার কবে দেখা হবে একে অপরের সাথে। বউগুলি কিছুক্ষণের জন্য
ছাড়া পেয়ে গল্প করছেন নিজেদের মত। আবার পথ চেয়ে থাকা,আগামী বছরের জন্য। মেয়েদের কেউ বিবাহিতা, কেউ বাপের বাড়ি এসেছেন, কেউ হয়ত
এখানেই আছেন, যাওয়া
হয়নি পিত্রালয়ে, কিন্তু
আনন্দে মুখরিত সকলেই। বছরকার দিনে মলিন মুখ কেউ রাখতে চায় না। সেদিকে তাকিয়ে হাত জোড়
করে মা দুর্গার কাছে আরো একবার প্রার্থনা জানালেন পুরোহিত মশাই—সকলের ভালো কর মা, আনন্দে
রাখো, সুস্থ রাখো,
মা গো দয়াময়ী, মা গো দুর্গতিনাশিনী, আজকের
দিনে কাউকে নিরানন্দ কোর না মা!’
মা-মাসি-বউদের একটি বড় দঙ্গল বেরিয়ে এলো মন্ডপের ভিতর থেকে। এবার
বাড়ি ফেরার পালা। পুরুষেরা গুলতানি মারুন আর যাই করুন, মেয়েদের এবার ফিরতেই হবে। বছরকার দিনে যত চাপই পড়ুক না কেন,
সকলেই চায় ঘরের মানুষগুলিকে একটু ভালো-মন্দ খাওয়াতে, যত্ন করতে। এ কদিন মন্ডপেই খাওয়া-দাওয়ার পালা ছিল, কিন্তু আজ আর নয়। আজ তাই তাড়াতাড়ি ফিরতেই হবে ঘরে। আশা কাকিমা,
চিনিপিসি, অণিমা কাকিমা আর লতুমাসি সামনের সারিতে, মাঝখানে প্রভাদি,সুলেখা
মাসি আর অপু পিসি, যিনি আবার
পুরোহিত মশায়ের বড় দিদি আর একেবারে পিছনে আছে অল্পবয়সী বৌ-মেয়েরা। তাদের মধ্যে আছে সীতেশের বৌ কণা বৌদি,
ঋষির বৌ বাণী বৌদি আর ওপাড়ার রুদ্রদার বৌ এবং আরো একজন যাকে
মিলি ঠিক ভালো ভাবে চেনে না। বেশ কয়েকটি অল্প বয়সী মেয়ে হই হই করে মন্ডপ থেকে
বেরিয়ে এদের সঙ্গে যাবে বলেও আবার ফিরে গেল মন্ডপে,হয়ত পরে আসবে। একেবারে পিছনের সারিতে কণা দের ঠিক সঙ্গে নয় আবার আগের সারিতেও
নয়, মালিনী কিছুটা একা একাই হাঁটছে।
প্রভাদি, যিনি মালিনীর স্কুলের হেড
দিদিমনি, পিছনে মুখ ঘুরিয়ে বললেন,
বাড়িতে যাস মিলি, আমি পা চালাই ’।
-যাব বড়দি’-উত্তর দিল মিলি। পিছনে শাড়ির আঁচল টেনে ধরল কণা—এই বেশী বড়দি বড়দি করবি নাতো, এটা তোর স্কুল নয়। তুই আমাদের সঙ্গে থাকবি।‘ কণা মিলিকে টেনে নিজেদের কাছে নিয়ে
এল। মিলি ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল বাণী ঋষিকে চোখের ইশারায় ডেকে নিল। মন্ডপের বাইরে গোল
হয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল ঋষি, তনু,শুভর দল। ঋষিকে ইশারায় ডাকতেই ঋষি বলে উঠল-দাঁড়া, কেন ডাকছে দেখে আসি। আচ্ছা, চল না, এতগুলো
মেয়ে যাচ্ছে...গায়ে সব
গয়নাগাঁটি আছে, একটু এগিয়ে দিই ওদের!’ ঋষি, শুভ,
তনুরা এগিয়ে এসে কণা, বাণীদের কাছে চলে এল।
ইচ্ছে
করেই আস্তে হাঁটছিল কণা। হঠাৎ ব্যস্ততা দেখিয়ে বলে উঠল—চলি রে, আমাকে ভাই
আগে যেতে হবে,মা’কে রেখে এসেছি,
জানই তো! আমাকে একটু পৌঁছে দাও তো ভাই, তনু। দেরী হলে মা আবার চিন্তা
করবেন। ’ সীতেশের মা বিধবা,
তাই সিঁদুর খেলার সময় কণাকেই আসতে হয়। রুদ্রদার বৌ তাড়াতড়ি
বলে উঠল, এই,
আমিও যাব তোমার সঙ্গে, আমাকেও একটু এগিয়ে দিও ভাই, তনু।‘ মুচকি হেকে বাণী বৌদি বলল- এসো,
আবার দেখা হবে’।
সামনের সারির ওরা তখন বেশ কিছুটা এগিয়ে। মাঝের সারির প্রভাদিরাও তাড়াতড়ি এগিয়ে গেছেন অনেকটাই। বাড়ি ফেরার তাড়া যেন সকলেরই। বাণী আর ঋষি একটু এগিয়ে গিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। মুখ তুলে মালিনী দেখল, শুভ কখন যেন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কোথাও যেন একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পেল মালিনী। প্রথমটা হকচকিয়ে গেল। তারপর বুঝতে পেরে অনেকদিন পর শুভর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল । পুজোয় বাড়ি আসা সার্থক হল শুভর।
আকাশে তখন
শুধুই পুজোর গন্ধ।