গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

সুবীর কুমার রায়

মহাদেব বাবুর মাহাত্ম্য

১৯৮০ সালের আগষ্ট মাসের একটা বিকেল, আমি আমার দুই বন্ধু, দিলীপ ও অমলের সাথে চাম্বা থেকে ভারমোর এসে পৌঁছলাম। উদ্দেশ্য ভারতীয় কৈলাস, মণিমহেশ দর্শন। শুনেছিলাম দেশ ভাগের আগে যাঁরা ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, চট্টোগ্রাম, ইত্যাদি জায়গায় বংশানুক্রমে বসবাস করতেন, দেশ ভাগের পর তাঁরা স্বভূমি ছেড়ে নিরাপদ ভারতবর্ষে এসে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন। মহাদেবের নিজস্ব বাসভুমি কৈলাস যখন চৈনিকরা অধিগ্রহণ করে, তখন আমাদের মহাদেববাবু তাঁর সৈনিক, নন্দি ও ভৃঙ্গিকে বগলদাবা করে কৈলাস থেকে পলায়ন করে মণিমহেশে ঘাঁটি গেঁড়ে বসেন। তাই মণিমহেশকে ভারতীয় কৈলাস বলা হয়। মহাদেবের মতো একজন শক্তিশালী দেবতা কেন চৈনিকদের কঠোর হাতে দমন না করে, স্বপরিবারে ভিটা ছেড়ে পলায়ন করলেন বলতে পারব না, তবে একবার সরজমিনে বাবার নতুন বাসস্থানটি দেখার, মনে বড় সাধ জাগলো।
যাবার আগে ভ্রমণ সংক্রান্ত বইতে মণিমহেশের মাহাত্ম্য, ও ভারমোরে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কর্মী, শান্তি রঞ্জন রায় সম্বন্ধে অনেক তথ্য, অনেক গল্প পড়ে যাবার সুযোগ হয়েছিল। জানা গেল শান্তিবাবু মণিমহেশ যাত্রীদের নানাভাবে সাহায্য করে থাকেন। যাবার পথে চাম্বাতেই কয়েকজন মণিমহেশ ফেরত অভিযাত্রীর কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মণিমহেশের পথে এই মুহুর্তে আর কোন যাত্রী নেই। শান্তিবাবুর ডেরার সন্ধানও পাওয়া গেল, তাঁকে ভারমোরের স্টুডিও কৈলাসে পাওয়া যাবে। সম্ভবত তিনি কাজের ফাঁকে স্টুডিওটিও চালান।
ছোট্ট জায়গা, বাস থেকে নেমে স্টুডিও কৈলাস খুঁজে নিতে অসুবিধা হবার কথা নয়। ডান হাতে ছোট্ট দোকান, কিন্তু দোকানের মালিক দোকানে নেই। বাম দিকে একটা ছোট মন্দির বা আশ্রম জাতীয় কিছু, সেখানে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ও বসে। তাদের একজনকে দেখে মনে হ’ল বাঙালী, কাজেই শান্তিবাবু হলেও হতে পারেন। তাঁদের দিকে হাত তুলে শান্তিদা বলে দু’বার চিৎকার করতেই একজন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, যদি এই ভদ্রলোক শান্তিদা হন, তাহলেতো মিটেই গেল, আর না হলে ওঁর কাছেই শান্তিদার খোঁজ নেওয়া যাবে। যদিও জানিনা শান্তিদা এরকম এক পান্ডব বর্জিত জায়গায় এখনও কর্মরত আছেন কী না।
ভদ্রলোক আমাদের কাছে এসে প্রথমেই বললেন— “আপনাদের তো ঠিক চিনলাম না”? অর্থাৎ ইনিই দি গ্রেট শান্তিদা। আমি একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে বললাম, আমরা গত বছরের আগের বছর এসেছিলাম, মনে নেই? উত্তরে তিনি শুধু  বললেন— প্রতি বছর এত লোকের সাথে আলাপ হয় যে, সবাইকে মনে রাখা যায় না। আমাদের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সুবাদেই বোধহয়, তিনি আমাদের তিনজনকে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। চা তৈরী করে খাওয়ালেন, নিজের জীবনের অনেক কথা বললেন। ছোটবেলায় তিনি তাঁর বাবার সাথে ঝগড়া করে, বাঁকুড়া না পুরুলিয়ার বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে উড়িষ্যার এক ভদ্রলোকের কৃপায় লেখাপড়া শিখে, বড় হয়ে চাকরি নিয়ে এখানে এসে হাজির হন। তাঁর  একটি ছোট্ট মেয়ে আছে, তার নাম তিনি সন্তোষি রেখেছেন, ইত্যাদি অনেক কথা। যাইহোক, তিনি রাতে থাকার হোটেল ও কৃষাণ নামে একটি ছেলেকে কুলি কাম গাইড হিসাবে ঠিক করে দিলেন। আমরা হোটেলে গিয়ে উঠলাম।
পরদিন সকালে আমরা ধানচৌর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে বিকালের দিকে ধানচৌ এসে পৌঁছলাম। রাতটা সেখানেই একটা তাঁবুতে কাটিয়ে পরদিন সকালে মণিমহেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। শুনলাম মণিমহেশের মুল মন্দিরটি ভারমোরে অবস্থিত। জন্মাষ্টমী থেকে রাধাষ্টমী পর্যন্ত সময়টাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। ভারমোর থেকে মণিমহেশে ছড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। এর সত্যাসত্য আমার জানা নেই, জানার আগ্রহও বিশেষ নেই।
একসময় নির্বিঘ্নে মণিমহেশ এসে পৌঁছলাম। জলাশয়ের পাশে পাথরের মাঝে ইতস্তত ত্রিশুল পোঁতা, সেখানেই কিছু কঞ্চি জাতীয় কাঠি ও ত্রিশুলের সাথে ঘন্টা বাঁধা জায়গায় দেবতার স্থান। সম্ভবত একজন পুরোহিতকে ঘিরে পাঁচ-সাতজন দেহাতি মানুষ বসে। পুরোহিত ভদ্রলোক তাদের মণিমহেশের মাহাত্ম্য ও গল্প শোনাচ্ছেন। আমি হিন্দী বড়ই কম বুঝি, তবু যেটুকু বোধগম্য হ’ল, মণিমহেশ সম্বন্ধে ভদ্রলোকের বক্তব্যের সাথে আমার পড়া গল্পের কোন মিল খুঁজে পেলাম না। শেষে আমি আমার বিশুদ্ধ হিন্দীতে বললাম, “ইয়ে বাত সাহি নেহি”। পুরোহিত ভদ্রলোক একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে চুপ করে গিয়ে, হয়তো একটু বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। বিশ্বস্ত অনুচরেরাও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। এবার আমার বিপদে পড়ার পালা। ভদ্রলোককে আমার বক্তব্য বুঝিয়ে বলতে গেলে দোভাষী লাগবে। তবু বাধ্য হয়ে আবার বলতেই হ’ল, “আপ যো কাহানী বাতাতে হ্যায় ও সাহি নেহি”।
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে গুম হয়ে থেকে বেশ অবজ্ঞার সাথেই জানতে চাইলেন আসল ঘটনা তাহলে কী। এবার আমার ঘামার পালা। গল্পটা বেশ বড়, শুধু বড়ই নয়, কাক, সাপ, ভেড়া, মেষপালক, ইত্যাদি অনেক চরিত্র আছে। কিন্ত ওখানে খাল কাটার সম্ভাবনা না থাকলেও, বিপদরূপী কুমির আমি নিজেই ডেকে এনেছি। কাজেই হিন্দীতে ঐ গল্প বলা আমার কম্ম না হলেও, পিছিয়ে আসারও আর কোন সুযোগ নেই।
অগত্যা আমার নিজস্ব হিন্দীতেই গল্পটা বলতে শুরু করলাম। আমার সবথেকে বড় অসুবিধা, আমি হিন্দীতে কোন বাক্যই শেষ করতে পারি না। প্রতিটা বাক্যই মাঝপথে এসে হোঁচট খেয়ে থেমে যায়, তখন আবার ফিন রামসে শুরু করতে হয়। যাইহোক, কৈলাস ছেড়ে মহাদেব একপ্রকার পালিয়ে এসে মণিমহেশে বসবাস শুরু করেন। এটা কেউ জানতেও পারে নি। একদিন এক মেষপালকের একটি মেষ হারিয়ে গেলে, হারানো মেষের সন্ধান করতে করতে সে মণিমহেশ গিয়ে হাজির হয় এবং মহাদেবের সাক্ষাৎ পায়। মণিমহেশে আসার কারণ শুনে মহাদেব তাকে বর দিয়ে বলেন যে, সে তার বাসস্থানে ফিরে গিয়ে যতগুলি মেষের কামনা করবে ততগুলি মেষ সে পাবে, তবে একটি শর্তে। মহাদেব যে মণিমহেশে আছেন, একথা সে কাউকে জানাতে পারবে না। মহাদেবের কথায় মেষপালক বাড়ি ফিরে এসে অনেক মেষ কামনা করে এবং মহাদেবের কথামতো পেয়েও যায়। রাতারাতি সে অনেক মেষের মালিক হয়ে যায়। কিন্তু সে মহাদেবের কথা রাখে নি। সে একটা সাপ, একটা কাককে নিয়ে আবার মণিমহেশে যায়। মহাদেব তাকে দেখে রুষ্ট হয়ে শাপ দেন। মহাদেবের অভিশাপে উপস্থিত সকলেই পাথর হয়ে যায়।
অনেক বছর আগের ঘটনা, মেষপালকের সাথে বোধহয় আরও কেউ ছিল, আমি ঠিক স্মরণ করতে পারছি না। তবে আমার সাথে ঐ ভদ্রলোকের গল্পের বিন্দুমাত্র মিল না থাকলেও, গল্পের চরিত্রগুলো, অর্থাৎ সাপ, কাক, ভেড়া ইত্যদি ও তাদের পরিণতি প্রায় একই ছিলো। তবে গল্প বলার গুণে না হিন্দী বলার গুণে বলতে পারব না, বাবারও যেমন বাবা থাকেন, আমাকেও বোধহয় সেরকম আধ্যাত্মিক জগতের একজন মহাপন্ডিত ভেবে, স্বয়ং মহাদেবের খাসতালুক থেকে আসছিও ভেবে থাকতে পারেন, আমাকে অতি বিনয়ের সাথে বললেন “আপ বৈঠিয়ে সাহাব”। অতএব বসতেই হল।
ভদ্রলোক আমাদের আম লজেন্স্ ও বরফ প্রসাদ দিলেন। এবার আঙ্গুল তুলে দুরের পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে আমাদের  সকলকে পাহাড়ের গায়ে কাক, সাপ ইত্যাদির পাথর হয়ে যাওয়া মুর্তি দেখাবার চেষ্টা করলেন। এতদুর থেকে জ্যান্ত সাপ বা কাক দেখাই অসম্ভব, তো দুরের পাহাড়ের গায়ে একই রঙের পাথরের সাপ বা কাক দেখা, তবু আমার মতো সম্মানীয় ও শিববিশারদ ব্যক্তিকে বাধ্য হয়েই আলাদা আলাদা ভাবে কাক, সাপ, ভেড়া, মেষপালক, প্রত্যেককে দেখতে  পেয়ে উল্লাসিত হতেই হ’ল। প্রত্যেক জায়গা থেকে কিছু না কিছু স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে নিয়ে আসার অভ্যাস, তাই ভদ্রলোককে খুব নরম গলায় বললাম, “ইয়ে যো ত্রিশুল হায় না, উসমে শিউজীকা স্পর্শ্ হ্যায়। মেরা পিতাজী মাতাজী ইধার আ নাহি পায়েগা। হাম এক ত্রিশুল লে যায়, তো উনলোগ ভী শিউজীকা স্পর্শ্ পায়গা। এক ত্রিশুল লে যাঁউ? শুনে ভদ্রলোক যেন একটু লজ্জাই পেলেন। তিনি খুব মিষ্টি সুরে বললেন—“লে যাইয়ে সাহাব”। আমি একটা বেশ শক্তসমর্থ ত্রিশুল তুলে নিয়ে গুছিয়ে বসলাম।
এবার দিলীপের জন্য একটা ম্যানেজ করতে হবে। একটু সময় নিয়ে দিলীপকে দেখিয়ে আবার শুরু করলাম, “ইয়ে যো হামারা বন্ধু হায় না, উনকো পিতামাতা হররোজ শিউজীকে লিয়ে জীবন উৎসর্গ্ কিয়া। উনকো পিতামাতাকে লিয়ে আউর এক ত্রিশুল লে যাঁউ”? আমার ঠাকুর দেবতায় বিন্দুমাত্র আস্থা না থাকলেও, দিলীপের বাড়ির লোকজনের ভগবানের ওপর ভীষণ আস্থা। তবে আমার ঐ বক্তব্যের যে প্রকৃত অর্থ কী দাঁড়িয়েছিল, আজও ভাবলে হাসি পায়। ভদ্রলোক এতটুকু সময় নষ্ট করে আমায় বিব্রত না করে বললেন, লে যাইয়ে জনাব। দিলীপকে একটা ত্রিশুল তুলে নিতে বললাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, এই ঘটনার বহু আগেই দিলীপের বাবা ইহলোকর মায়া ত্যাগ করে সম্ভবত শিবলোকেই চলে গেছিলেন। এবার আমার কদর বুঝে অমুমতির তোয়াক্কা না করে অমলকেও একটা ত্রিশুল আমিই তুলে নিতে বললাম। অমল ত্রিশুল নিয়ে কাকে খুঁচিয়ে মারবে জানিনা, তবে উৎসাহের আতিশয্যে একটা করে ত্রিশুল উপড়ে তুলছে, আর নাঃ এটা ভালো নয়, নাঃ এটা কিরকম বাঁকা মতো, ইত্যাদি বলে সেগুলোকে মাটিতে শুইয়ে রাখছে। শেষে পছন্দমতো একটা জুতসই ত্রিশুল তুলে নিয়ে এসে আমাদের পাশে বসে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটা পরখ করে দেখতে শুরু করলো। আমি তাকে আর নতুন করে ত্রিশুল উৎপাটন থেকে বিরত করে, একটু এদিক ওদিক ঘুরে, ধানচৌ ফিরে আসার জন্য তাদের কাছ থেকে বিদায় চাইলাম।
এবার আমাদের সাথে আর এক ভদ্রলোক সস্ত্রীক বেড়াতে এসেছেন। তাঁরা চাম্বায় আমাদের অপর সঙ্গীদের সাথে রয়েছেন। ফেরার পথে একটু নীচ থেকে তাঁর জন্যও একটা ত্রিশুল সংগ্রহ করা হ’ল। ত্রিশুল হাতে অনেক পথ পার হয়ে, ধানচৌ এর তাঁবু থেকে মালপত্র নিয়ে সেই পুরাতন পথ ধরে এঁকেবেঁকে একসময় ভারমোর এসে পৌঁছলাম। শান্তিদার সাথে দেখা হতেই তিনি আঁতকে উঠে বেশ বিরক্তের সঙ্গেই বললেন, “এটা আপনারা কী করেছেন? এখানকার লোকেরা তো আপনাদের পিটিয়ে মেরে ফেলবে”। এখানকার মতো নিরীহ সাদামাটা মানুষ যে পিটিয়ে মানুষ খুন করতেও পারে, জানা ছিল না। আমাদের অপরাধটা ঠিক কী তাও বুঝতে পারলাম না।  
ভদ্রলোক এবার বললেন সারা দেশ থেকে মানুষ এসে এখানে দেবস্থানে ত্রিশুল পুঁতে মনস্কামনা পুরণের জন্য মানত করে যায়। মনস্কামনা পুরণের আগেই ত্রিশুল তুলে নিলে, ইচ্ছা পুরণের কোন সম্ভাবনাই থাকে না। কোনটা কার ত্রিশুল বোঝার উপায় না থাকায়, কোন ত্রিশুলই তোলা বা নিয়ে যাওয়া উচিৎ নয়। যাইহোক তুলে যখন এনেইছেন, কেউ দেখে ফেলার আগে ওগুলোকে ফেলে দিন বা ব্যাগে পুরে নিন। এতকষ্টে বয়ে নিয়ে এসে ফেলে দিয়ে যেতে মন চাইলো না, তাই কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের শান্তিনিকেতনি ব্যাগে ওগুলো পুরে ফেলে, হোটেলে খেতে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে শান্তিদার সাথে পাশের আশ্রমে গেলাম, তাঁর সাথেই আশপাশটা বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে দেখলাম। ত্রিশুলগুলোর সামনে তিনটি ও পিছনে একটি ছুঁচালো অংশ ব্যাগ ফুঁড়ে, প্যান্ট্ ফুঁড়ে আমার ঊরু ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। তবু পিটুনি খেয়ে মরার চেয়ে ক্ষতবিক্ষত ঊরু নিয়ে আধমরা হয়ে থাকা, অনেক আরামপ্রদ ও নিশ্চিন্তের বলে মনে হ’ল।
ঠাকুর দেবতায় আমার কোনকালে বিশ্বাস বা আস্থা ছিল না, আজও নেই। শুনেছি মহাদেব ভদ্রলোক অতি অল্পেই তুষ্ট হ’ন। সামান্য ফুল বেলপাতা, তাও গোলাপ, চাঁপা বা জুঁই-রজনীগন্ধা নয়, আকন্দ, ভাট বা ধুতরোর মতো বুনো ফুলেই তিনি সন্তুষ্ট। কিন্তু আমার কাছ থেকে কোনদিন তাঁর সেটুকুও প্রাপ্তি না হলেও, তিনি আমাকে খুব পছন্দ করেন, বিপদে আপদে পরোক্ষভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, এটা আবার দেখলাম।
ফেরার পথে বাসে বসার জায়গা না পেয়ে বিড়ির ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হয়েও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসার সময়, মণিমহেশ নিয়ে ঠাট্টা তামাশা ও আলোচনা চলছে। আমাদের কথা বা ভাষা কারো বোঝার কথাও নয়। সম্ভবত স্থানীয় দরিদ্র একজন  মানুষ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় গিয়েছিলাম। তাকে ওয়েষ্ট বেঙ্গল বললে তিনি বুঝতে না পারায়, আবার বললাম বঙ্গাল সে। তিনি এবার জিজ্ঞাসা করলেন, বঙ্গাল হিন্দুস্থানের মধ্যে কী না। তাঁকে এবার ব্যাখ্যা করে বোঝালাম যে, কাশ্মীর যেমন একটা রাজ্য, হিমাচল প্রদেশ যেমন একটা রাজ্য, মাদ্রাজ বা গুজরাট যেমন একটা রাজ্য এবং হিন্দুস্থানের মধ্যে অবস্থিত, বঙ্গালও সেরকম হিন্দুস্থানেরই একটা রাজ্য। তিনি আমার কথা কতটা বুঝলেন জানি না, তবে আমরাও হিন্দুস্থানে বাস করি শুনে খুব খুশি হয়ে, এবং আমরা মণিমহেশ থেকে ফিরছি শুনে, নিজে উঠে দাঁড়িয়ে আমায় বসার জায়গা করে দিলেন। বাস কিছুটা যাবার পর কন্ডাক্টারের কাছ থেকে খবর পাওয়া গেল, যে সামনে কিছুটা দুরে একটা ছোট্ট ধ্বসের জন্য বাস আর যেতে পারছে না। তিন কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে চাম্বা যাবার বাস পাওয়া যাবে। চাম্বা থেকে ভারমোরগামী বাসগুলো আর এগলে বাস ঘোরানো যাবে না বলে, ওখান থেকেই বাসের মুখ ঘুরিয়ে চাম্বা ফিরে যাচ্ছে। তিন কিলোমিটার পথ হাঁটাটা আমাদের কাছে কোন সমস্যা নয়, কিন্তু সঙ্গের মালপত্র কাঁধে করে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যাওয়া নিয়ে আমরা একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তে ভদ্রলোক আমাদের ভয় পেতে নিষেধ করে জানালেন, আমরা শিউজীর জায়গা থেকে ঘুরে আসছি, কাজেই তিনি নিজে আমাদের মালপত্র বয়ে নিয়ে গিয়ে আমাদের ঐ তিন কিলোমিটার দুরের বাসে তুলে দেবেন। ধ্বসের জায়গায় এসে জানা গেল রাস্তা মেরামত হয়ে গেছে কাজেই আমরা নিশ্চিন্তে চাম্বা এসে পৌঁছলাম। ভদ্রলোক নিজে বাসের ছাদ থেকে আমাদের মালপত্র নীচে নামিয়ে এনে দিলেন। জানিনা ভদ্রলোকের এই অযাচিত সাহায্যের পিছনে মহাদেবের ইচ্ছা বা হাত ছিল কী না, তবে সম্ভবত এই মহাদেববাবুই, এর পরেও আমাকে একবার বিপদের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।  
বছর দুয়েক পরে কাশ্মীর-অমরনাথ ঘুরে বৈষ্ণুদেবী দেখে জম্মু স্টেশনে এসে ফেরার টিকিটের জন্য রেলের টিকিট কাউন্টারে অনেক লোকের পিছনে লাইন দিলাম। এখন অনলাইন কম্পিউটারের যুগ, কিন্তু সেদিন জম্মু স্টেশনে যতগুলো কাউন্টার ছিল, তার প্রায় সবকটাই মিলিটারিদের জন্য সংরক্ষিত, বাকি দু-একটিতেও মিলিটারিরা সাধারণ মানুষের সাথে লাইনে দাঁড়িয়েছে। আমি আমার সামনে লাইনে দাঁড়ানো ভদ্রলোকটির সাথে কথা প্রসঙ্গে সদ্য শুনে আসা অমরনাথের মাহাত্ম্য নিয়ে লেকচার দিচ্ছি। অনেকেই পিছন ফিরে আমার শ্রীমুখনিঃসৃত বাণী শুনছেন। হঠাৎ মনে হ’ল সামনের ভদ্রলোক হিন্দু না মুসলমান, জানা হয়ে ওঠেনি, তাই হজরতবালের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে শুনে আসা কিছু গল্পও বর্ণনা করলাম। লাইনের সামনের দিক থেকে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে, আপ ইধার আইয়ে জনাব, বলে আমায় লাইনের প্রায় একেবারে সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এতবড় লাইনের একজনও আপত্তি করলো না দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। দিলীপ আমায় জিজ্ঞাসা করলো, তুই এত শিব ভক্ত কবে থেকে হলি। আমি তাকে ইশারায় চুপ করে যেতে বললাম। মহাদেব না মহম্মদ, কার ইচ্ছায় জানি না, তবে খুব সহজেই সেবার ফেরার টিকিট হস্তগত হয়েছিল।


রুখসানা কাজল

    জীবনফ্রেম

    ঝনঝন করে ইঁদারায় বালতি নামার শব্দ হয়। তার সাথে রিনরিনে একটি ধমকের সুর , মম মম এই মম কি করছিস ওখানে ? কার  সাথে কথা বলছিস ? কে এই কে রে ওখানে? মম নামের সুন্দরীটি  কথা না বলে গপাগপ আচার গিলতে থাকে । অন্যদিকে হাস্নুহেনা, গন্ধরাজ, স্থলপদ্মের আড়াল দিয়ে আশোক গাছে ঠোক্কর খেয়ে কে যেন ছুটে পালিয়ে  যায় দ্রুত পায়ে।
   
        ঝন্নাত করে কপিকলের শিকল ছাড়ার শব্দ হয়। আর তখনই সুরেলা গলার অসম্ভব তেজি মহিলাটি মমর সামনে আবির্ভূত হয়ে বাগানে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মমর আধখাওয়া  আচার। “রাক্ষুসি মেয়ে সারাদিন এত যে খাস তোর ক্ষুধা মেটে  না ?” মমতা একপাশের ড্রাকুলা দাঁত বের করে বেহায়ার মত হাসে। শঙ্খের  মত সাদা সুন্দর  মমর  হাত ধরে টেনে আনতে আনতে তেজিনি হিসহিস করে, লজ্জা না থাকলে একটু শিখে নিতে হয় মমতা। তুই কি বুঝিস না খায়ের কেন লুকিয়ে এই সব হাবিজাবি তোকে খেতে দেয় ? বড় হয়েছিস পুরুষদের কি চিনতে পারিস না!  এরকম করলে কিন্তু আমি তোকে রাখতে পারবনা। আজকেই তোর বড়দাদুকে বলে বাচ্চুর বাসায় পাঠিয়ে দেব।”

         মমতাজের মুখ থেকে সাথে সাথে রক্ত উড়ে যায়। সে বাড়িতে থাকতে হলে এত কাজ করতে হয় যে নিজেকে কাজের বুয়ার মত লাগে। খেতে হয় সবার শেষে। ভাঙ্গা মাছের টুকরো, ডালের তলানি, বড় স্টিলের বাটিতে  ছড়ানো ছেটানো কিছু সব্জি পড়ে থাকে টেবিলে। আচারের বয়ামে হাত দেওয়া বারণ। চুরি না করলে দুধ খেতেই পায় না। সে যে অবহেলার একজন বাড়তি ফালতু তা ভাল করে বুঝিয়ে দেয় ছোটভাবি। ছুটির দিনগুলোতে অবশ্য মমকে  সাথে নিয়েই খেতে বসে বাচ্চু। তখন ভাল মাছ বা একটু বেশি মাংস তুলে দেয় ছোট বোনের পাতে। তাই দেখে ছোটভাবি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আর পরের দিন ভাগ্যে জোটে এক তরকারি ভাত। 

                             অন্যদিনগুলোতে মমতা ক্ষুধায় আমড়াপাতাও নুন দিয়ে চিবিয়ে খায়। এতিম বলে দু একজন প্রতিবেশি এটা সেটা খেতে দেয় । তারা বুদ্ধি দেয়, বড়দাদুর বাসায় চলে যা মমতা। এখানে  থাকলে না খেয়ে মরে যাবি যে। মমতার মন কাঁদে বাচ্চুর জন্যে। অফিস শেষে বাসার গেট খুলে বাদাম, বুট  কোন কোনদিন বুধুয়ার আচার, চানাচুর ফুলগাছের আড়ালে লুকিয়ে ছোড়দা ইশারা করে। মমতা জামার আড়ালে তাই নিয়ে সাঁ করে পালিয়ে যায় পুকুর ধারে।  গোগ্রাসে গিলে  হাজারবার খালি ঠোঙ্গার গন্ধ শোঁকে আর জিভ দিয়ে নুন ঝাল  চেটে চেটে খেয়ে গান গায়, জলের ছায়া জলের ছায়া রে আমায় ডাকিস না--- 
   
          তেজিনির হাঁটু ছুঁয়ে মমতা সাথে সাথে প্রতিজ্ঞা করে, এই আপনার পা ছুঁলাম বড়ভাবি আর কোনদিন খায়ের কিছু দিলে নেব না। আল্লার কিরে, বড় মসজিদের কিরে, সাহাপাড়ার মা কালির কিরে আমার মরা বাবা মার কবরের কিরে --বড়ভাবি হেসে ফেলে, এতকিছুর কিরে দিতে হবে না মমতা।  তুমি তোমার বড়দাদুর কথা মনে রাখলেই আমি খুশী হব। আর এসব কিরে টিরে কি ? এসব বলবে না কখনো। হাহাহ ফন্দি সাকসেস। ছোটভাবি হলে এত সহজে গলত না। ঘাম বেরিয়ে জিভ ঝুলে যেত। বড়ভাবি আসলেও বোকা। অনেক ভাল। মায়ায় ভরা মন। মমতা খুশিতে বাগচি অপেরার সুধা নর্তকির মত “কাঞ্ছা রে কাঞ্ছা রে--” গেয়ে পাকা উঠোনে কয়েকবার ঘুরপাক খায়। 
      
         একটু আগে ইঁদারার চাতালে ফেলে ধোলাই করা রুমকিকে বিকেলের জামা জুতা পরাচ্ছিল রেণুদি, মম  তার মাথায় সাবধানে গাট্টা মারে, তুই লাগিয়েছিস তাই না? ইস রে পুরো আচারটা খেতে পারলাম না  শুধু তোর জন্যে শয়তানি।” রেণুদি এক মণ কাজল হাতের আঙ্গুলে মেখে রুমকির দুই চোখ নৌকা করে দিয়েছে। এবার “কাজলি মাঈ কি জয়” বলে রুমকিকে মধুমতিতে ছেড়ে দিলেই হল। ভেসে একেবারে  কালীগঙ্গা পেরিয়ে বঙ্গোপসাগর! সে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখে দিদিদের দেওয়া পুরাণো জামা গায়ে পরির মত লাগছে মমতাকে। টকাস টকাস শব্দে   চেটে চেটে ভিজে রস রস করে বুধুয়ার দোকানের আচার মাখানো আঙ্গুলগুলো খাচ্ছে আর বেহায়ার মত দুলছে। সৎ ভাইয়ের বউদের তাড়া খাওয়া বাবা মা মরা এতিম  মমতা ভাল করেই জানে কোথাও তার স্থায়ী ঠাঁই নাই।  
            
         এ বাড়িতে এত আদর বড়দাদু আর বড় ভাবির জন্যে। একটিই অসুবিধা বড্ড নিয়ম কানুন। বড়ভাবি গাদা গাদা বই পত্রিকা পড়ে আর মেয়েদের গল্পপত্রিকার নায়িকাদের মত গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। মেয়েরা গান গায়, আবৃত্তি করে, আধুনিক  ডিজাইনের সুন্দর সুন্দর জামাজুতো পরে, শুদ্ধভাষায় মেপেজুকে কথা বলে। মম বড়ভাবির মেয়েদের চাইতে অনেক সুন্দরি । বড়ভাবি অন্যরকম আদর করে মমকে। মায়াও করে খুব। সৎ শাশুড়ি আঁতুড়ে মারা গেলে মমকে তিনিই কোলে তুলে নিয়েছিলেন। মম তার মেয়েদের সাথেই বেড়ে উঠছিল। কিন্তু বাচ্চু ছোঁ মেরে নিয়ে  গেল। মমও ছোটভাইয়ের গলা জড়িয়ে চলে গেলে তিনি অভিমানে পাথর করে নিয়েছিলেন নিজেকে। তার স্বামি আলাভোলা সাধক মানুষ। প্যাচ বোঝে না। মমর ভাগের জমির দায়িত্ব বাচ্চুকে দিয়ে বলেছিল, ছোট বোনটাকে কখনো ঠকাস নে যেন।  বড় দুঃখী কপাল নিয়ে জন্মেছে রে ।”

         বড়ভাবির দৃঢ় বিশ্বাস জমিজমা ভোগের জন্যেই বাচ্চুর এই আদেখলেপনা আদর। বাচ্চুর বউটাও হাড় হাভাতে ।হাতের পাশ দিয়ে একটি বাড়তি কণাও গড়াতে পারে না। কৃপন স্বভাবের জন্যে ছেলেমেয়েরাও ছোঁচা হয়েছে। এ বাড়িতে এলে পেটপুরে ভাত খায় আর বড়চাচিকে জড়িয়ে ধরে মায়ের কিপ্টেমির  গল্প করে। বড়ভাবির বুক তখন টনটন করে উঠে মমর জন্যে। পেটের সন্তানদের যে মা মেপে ভাত দেয় সে কি মমর মত সম্বৎসরের ক্ষুধার্ত হাভাতে এতিম লোভি কম বুদ্ধির মেয়েকে পেট ভরে খেতে দেবে ? 
       
         মাঝে মাঝে তাই বড়ভাবী মমতাকে নিয়ে আসে এ বাড়িতে । মমতা  পড়াশুনা করতে চায় না । বরং ভাইয়ের মেয়েদের দেওয়া সুন্দর সুন্দর  জামা পরে ছেলেবুড়োদের মাথা ঘুরিয়ে দিতে তার খুব ভাল লাগে। পাড়ার ছেলেরা তাকে একটু ইয়ে টিয়ে করবে এত  খুব স্বাভাবিক। একটু হাত ধরতে দেয়। কখনো লম্বা সুন্দর আঙ্গুলে সামান্য ছোঁয়ার আলতো চুমু। ফ্লাইং কিস তো ভাতমাছ। তার চোখের এক ইশারায় খায়ের তপন বাসু খসরুরা কদবেল, আমড়া, তেঁতুল থেকে সন্দেশ, প্যাড়া   ঘুগনি , চানাচুর, চপ, কাটলেট মূহূর্তে হাজির করে দেয়। পাড়ার বুড়ো চাচা মামা ভাইয়ারাও মাঝে মাঝে আদরের ছলে কোলে বসায়। টাকা গুঁজে দেয় হাতের মুঠোয়।  আর পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ডাঙ্গর হয়ে যাচ্ছিস তো মা! এবার তো তোর বিয়ে দিতে হয়। বিয়ের পর কি করতে হয় জানিস তো ? লোল রাক্ষসের মত বুড়োদের মুখ মমের কান ছুঁতেই এক মোচড়ে উঠে আসে মম। নইলে স্যাৎ করে  বুড়োর বাচ্চারা বুক টিপে দিয়ে খচ্চরের মত হাসে। অথবা মমর হাত টেনে নিয়ে দুপায়ের ফাঁকে কাঠের মত শক্ত গরম  লিঙ্গে চেপে ধরে।  
          ঘরের খাবারের চাইতে বাজারি খাবারের মজাই আলাদা। মম তাই বুড়ো হাবড়া জোয়ানদের খেলিয়ে খেলিয়ে নানা খাবার আদায় করে নেয়। কিন্তু এই বাসায় বড়ভাবির  জন্যে শান্তিমত কিছু করতে পারে না । রাগের মাথায় আজকের আচারের প্যাকেট কোথায় যে ছুঁড়ে ফেলল বড়ভাবি! যাক পরে খুঁজে খেয়ে নেবে।  দাঁত দিয়ে টাকরায় আওয়াজ করে দুলতে দুলতে শয়তানি বুদ্ধি ভাঁজে মম। খায়েরকে বলবে আবার এনে দিতে। না হয় এবার পুরো এক মিনিটের জন্যে হাত ধরতে দেবে খায়েরকে। চাইলে বুক। খুব করে যদি চায় চুমুও খেতে দেবে দু একবার।
       
          রুমকি তার ফ্রেমে ঝুলিয়ে দেয় মমফুপিকে। মমতাজ বিশ্বাস। তিন ভাইয়ের এক সৎ  বোন। ভাইদের ছেলেমেয়েদেরও অনেক ছোট। হ্যাটা খেয়ে একবার এই ভাই ওই ভাইয়ের বাড়ি ঘুরে ঘুরে কখন যেন পরি হয়ে গেছে। অনাদরের পরি। মমফুপির  নামের পাশে কালীমন্দিরের পুকুরে ফেলে দেওয়া পুরানো বাসি একটি কল্কে ফুল গুঁজে দেয় রুমকি। ফুপি তো এরকমই ছিল। কেবলই পুরানো বাসি বাতিল ঝালাই সারাই ছেঁড়া ফাটা আধখাওয়া জীবন নিয়ে এসেছিল এই পৃথিবীতে। আস্তাকুঁড়ের আধকপালি পরিরাণী।

          এরকমটি হওয়ার কথা ছিল না। মমতার বাবা মা ছাড়া সব ছিল মমর। ছোটভাই বাচ্চু খুব আহলাদ করে বোনের দায়িত্ব নিয়েছিল। বাচ্চু নিজে ঘোর  কালো । ফুটফুটে বোনটিকে সাজিয়ে গুজিয়ে পাড়ায় ঘুরতে খুব ভালবাসত । ভাইরা কেউ কখনো মমকে বুঝতেই দেয়নি না খেয়ে না পরে থাকার কষ্ট কেমন। বাচ্চু  বিয়ে করে ঘরে বউ আনার পরেই সংসারে মমর দাম কমতে থাকে। বাচ্চুর সংসারে এটা সেটা করতে করতে বাচ্চাদের আয়া হয়ে যায় । ইশকুল পড়াশুনা কোন কালেই ভাল লাগত না মমর। কাজের অজুহাতে প্রথমে ইশকুল কামাই শুরু হয়। পরে ছোটভাবি নিজেই বন্ধ করে দেয়। আগের মত আদর যত্ন না পেয়ে বেপরোয়া বেহায়া হয়ে উঠে মম। দুধের সর চুরি করে খেয়ে আবার সর ফেলতে চুলায় দুধের পাতিল  রেখে দেয়,  মূহূর্তমাত্র ফ্রিজ খুলে মিষ্টি খেয়ে ফেলে গপাগপ করে, এঁটো হাতে মাছ মাংস তুলে নেয় গরম কড়াই থেকে, বাচ্চুর দেওয়া টাকায় এটা সেটা কিনে খায়। পাড়াপড়শি আর ছেলেছোকরা বুড়ো হাবড়ারা তো আছেই। মমতার তবু পেট ভরে  না। ক্ষুধা লেগেই থাকে। বড়ভাবি যখন আদর করে পিঠে হাত রেখে বলে, আর একটু ভাত তরকারি দিই মমতা? মমতার চোখ জলে ভরে উঠে। সব ক্ষুধা পালিয়ে যায়। কিন্তু বড়ভাবির কাছে ওকে ত থাকতেই দেয়না ছোটভাবি!  
     
        ছোটভাবি নালিশ করেছিল বড়ভাবির কাছে। বড়ভাবি কিছু না বলে  মমকে নিয়ে চলে এসেছিল। দুদিন না যেতেই ছোটবউ মমকে নিতে আসে। মমকে দেখে তো তার চক্ষু চড়কগাছ। সদ্য বেরুনো কচি বাঁশপাতার মত সবুজ সুন্দরী মমকে দেখিয়ে বড়ভাবি বলেছিল, মেয়েটা এতিম। রাখলে এভাবেই রেখো। নইলে এখানেই থাকুক।”  কথা শুনে শরীর জ্বলে যায় ছোটবউয়ের। কিন্তু তখন মমকে খুব দরকার। একা এত কাজ সামলাতে পারছে না। বাচ্চাদের  রাখাও বিরাট ঝক্কি। তায় আবার পর পর দু দুজোড়া যমজ। মাথা নীচু করে মমতাকে নিয়ে এসে নীরবে নিষ্ঠুর খেলা শুরু করেছিল। প্রথম প্রথম মজা পেলেও বুঝে সরে যেতে চেয়েও আটকে যায় মমতা।
  
         ছোটভাবির অনেকগুলো ভাই। তারা এতদিন মমকে ছিঁড়তে সাহস করেনি। ছোটভাবি সর্বদা পাহারা দিয়ে রেখেছিল। এবার পাহারা তুলে নেয়। এটা সেটা বাজারী খাওয়ার লোভে মমর ভাব জমে উঠে বুলু, ঝালু, সাজুর সাথে। মমর এখন মজাই মজা। ছোটভাবির গলায় মধু। দু চোখে ঘন পর্দা। কোনদিন বুলু এসে  সারা বিকেল গল্প করে। মমতার  চোখমুখ দিয়ে যেন আগুন ছোটে তখন। সিংগাড়া কচুরী খেতে খেতে মমর ওড়না সরে যায়। বুলু ফাঁক বুঝে এক মাই টিপে দেয়। আবার অন্যটি। মমতা সন্ন্যাস সন্ন্যাস মুখ করে খায় আর টিভি দেখে। খাওয়া শেষ হতেই ছুটে উঠোনে বেরিয়ে আসে। বুলু তপ্ত শরীরে অতৃপ্ত ফিরে যায়। ঝালু ঢাকা থেকে এলেই প্রতিদিন মমর সাথে দেখা করে। সিনেমার গল্প, টুকটাক উপহার দিয়ে মাঝে মধ্যে দু একটি চুমু খেয়ে নেয়। মমতা স্বেচ্ছায় ঝালুকে বুকেও হাত দিতে দেয়। ঝালু ঘোর কালো । বাচ্চুর শ্বশুর একবার বলেছিল, মমতাকে বউ করলে কেমন হয় ? অন্তত বাচ্চাকাচ্চাগুলো কালো নাও হতে পারে। মম জানেনা এই প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছে তার ভাইয়েরা। সে মনে মনে ধরেই নেয় ঝালুর সাথে তার বিয়ে হচ্ছে যখন তখন না হয় একটু বেশিই ঝালু তার শরীর চেটে নিলো। ঝালুর সাহস বেড়ে যায়। মমর জামা উলটে হাত দিতে থেকে শরীরের এখানে সেখানে। এরকম এক বিকেলে সাজু দেখে ফেলে। সাজুর চীৎকার চেঁচামেচিতে বুলু ঝালুর এ বাসায় আসা বন্ধ হয়ে যায়। বাচ্চু প্রচন্ড ক্ষেপে বউকে বলে, তোমার তিন ভাইয়ের আধখানাকেও যদি এবাড়িতে দেখি তো গুলি করে মেরে ফেলব। 
  
        ঝালুর তখন মমতাকে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা। বন্ধু মুকুটকে পাঠায়। পুকুর  ঘাটে আধোয়া কাপড় বোঝাই বালতি রেখে ঠা ঠা দুপুরে রওনা হয় মম। ঝালু অপেক্ষা করছে বিরিয়ানীর প্যাকেট নিয়ে। পথে লাল শার্টপরা মুকুটের খুব ভাল লেগে যায় মমকে। মোরাম বিছানো লাল ইটের রাস্তায় তিন তালির ঝুলঝুলা স্যান্ডেলের সাথে পুরানো ইউরোপিয়ান ফ্রকে সিন্ডারেলার মত লাগছে মেয়েটাকে। মুকুটের বুকে নিরালা বিলের একলা কোন ঘুঘু ডেকে উঠে। নিজেকে শিকারি বলে মনে হয়। ঝালু তো সুরক্ষা কনডম দেখিয়ে ফ্যা ফ্যা করে হেসেছে, আমার পরে তুইও— । মুকুট  জানতে চায়, ঝালু কি তোমাকে বিয়ে করবে মমতা ?

        সেই মূহূর্তে হঠাত দাঁড়িয়ে পড়ে মমতা । মুকুটের ছায়ার সাথে মিশে গেছে  মমতার ছায়া। তাই তো ঝালু তো কখনো বলে নি একথা। বিয়ে করতে চাইলে ছোড়দা কেন ঝালুকে বাসায় আসতে নিষেধ করবে? আলমারি খুলে বন্দুকটা ঝুলিয়ে রেখেছে দেওয়ালে। ছোটভাবিও মমতাকে ঠারে ঠুরে জানিয়ে দিয়েছে ঝালুর বিয়ে হবে  ঢাকার কোন মেয়ের  সাথে। মেয়ের বাবা অফিসার। বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী। সে মেয়ের দুই পায়ে চারটে আঙ্গুল। তাতে কি ঘুঁটেকুড়ানি মেয়ে তো আর নয়। 
   
        কি ভেবে মম পেছন ফিরেই ছুটতে থাকে। তার ত সর্বনাশ হয়ে যেত । মুকুট দ্রুত ধরে ফেলে । নিজেকে ছাড়াতে চায় মম। মমর দু হাত শক্ত করে ধরে গভীর ভালবাসা মাখা গলায় মুকুট বলে, আমাকে বিয়ে করবে মমতা?

                                

অসিতবরণ চট্টোপাধ্যায়

আশামুকুল

"এই যে দাদারা দিদিরা বোনেরা গরমাগরম  ঘুগনী খান। বিষ্ণুপুরী ঘুগনী। ফ্রেশ এন্ড হাইজিনিক ঘুগনী।  খেয়ে তৃপ্তি পাবেন।  মাত্র পাঁচটাকা। খেয়ে দেখুন দাদারা, তারপর বলবেন। খারাপ হলে পয়সা ফেরৎ।"
বিভিন্ন আওয়াজের মাঝে এই বাক্যগুলো বেশ স্পষ্ট শোনাত। ও উঠলেই যাত্রীরা হামলে পড়ত ঘুগনির জন্য।
ধোপদুরস্ত চেহারা। পরিস্কার করে মুখ সেভ করা। হকার বলে মনেই হত না। আর পাঁচটা হকারের মত না। বাঁ হাতে টিনের চাদরায় লুকোনো উনুনের উপর ঘুগনির হাঁড়ি। গলায় ঝোলানো ছোট্ট ঝুড়ি,তাতে সাজানো থাকতো নারকেল কুচি, পেঁয়াজকুচি ধনেপাতা,গোলমরিচগুড়ো,বাহারী লবনের কৌটো আর প্লাস্টিকের চামচ।
আমি তখন গোয়ালতোড় সেচ দপ্তরের কংসাবতী  সেকশান অফিসে  কর্মরত। প্রায় প্রতি সপ্তাহের উইক এন্ডে বাড়ি যাতায়াতের সুবাদে পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ট্রেনে ওকে দেখতাম। প্রথমদিকে ঘুগনী খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করিনি। তারপর একদিন হঠাৎই পাতার বাটিতে নিয়ে ফেললাম ঘুগনী। ঘুগনীর স্বাদগন্ধ আমাকে আকৃষ্ট করল। একটা নুতনত্বের স্বাদ পেলাম। এরপর যেদিনই যাতায়াত করতাম সেদিনই  অন্যকিছু খাই বা না খাই ঘুঘনী মাষ্ট।
লক্ষ্য করতাম ও বিষ্ণুপুরে ঘুগনী নিয়ে উঠত,যেত খড়গপুর পর্যন্ত। আবার খড়গপুর থেকে দুপুরে টুনটুনি প্যাসেঞ্জার ট্রেনে বিষ্ণুপুর।
আমি একদিন সন্ধ্যেবেলায় কিছু কাজ সেরে কোয়াটারে ফেরার জন্য মেদিনীপুর ষ্টেশন থেকে ট্রেনে উঠলাম। দেখলাম ঘুঘনীওলা ব্যাজারমুখে বসে আছে জানালাধারে। হাঁড়ি বা ঝুড়ি কিছুই নেই ওর সঙ্গে। আর পাঁচটা দিনের মত ওর গলায় আওয়াজ নেই। আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম। ট্রেনে খুব একটা ভীড় নেই। বললাম,
---- কি ব্যাপার? এত চুপচাপ কেন?
ও বলল,
---- ভীষণ মনকষ্টে আছি স্যার।
---- কেন?
---- আজ দুপুরবেলা আমার স্ত্রী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে।
----- এতো ভাল খবর। তা তোমাকে এত উদ্বিগ্ন লাগছে কেন?
---- সে তো ঠিক বলছেন স্যার। কিন্তু আমার স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ বি নেগেটিভ। আর যে ছেলে জন্মেছে তার রক্ত এ পজিটিভ। কয়েকঘন্টার মধ্যে রিগাল ইঞ্জেকশেন দিতে না পারলে ছেলেটা বাঁচবে না স্যার।
-----বাঁচবে না কেন? ভগবান আছেন, কিচ্ছু হবে না। তা ওরা আছে কোথায়?
----- গোয়ালতোড় প্রাথমিক হাসপাতালে।
চমকে উঠলাম আমি। বললাম,
---- আমি তো ওখানেই থাকি। তোমার শ্বশুরবাড়ী কোথায়? এখন যাবেই বা কোথায়?
---- আমার শ্বশুরবাড়ী ওখানেই স্যার, ঘোষ পাড়ার দত্ত বাড়ীতে। আমি এখন ওখানেই যাবো।
---- ঠিক আছে চলো। আমিও রোড চন্দ্রকোনা ষ্টেশনে নেমে গোয়ালতোড় যাবো। ষ্টেশনে জীপ আসবে আমায় নিতে,তুমি আমার সঙ্গে যেতে পারো।
---- তাহলে তো খুব ভাল হয় স্যার। ইঞ্জেকশেনটা ওখানে পাওয়া যায়নি বলে খড়গপুর গিয়েছিলাম। তার আগে মেদিনিপুরে খুঁজে কোথাও পাইনি। খড়গপুরে পেয়েছি। বরফে মুড়ে তাই নিয়ে যাচ্ছি। জানিনা ছেলেটা কেমন আছে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা রোড চন্দ্রকোনা ষ্টেশনে নেমে গেলাম। ষ্টেশনে গাড়ী অপেক্ষা করছিল। গাড়ীতে চড়ে ড্রাইভার সন্ম্যাসীকে বললাম ---- জলদি চালাও।
মিনিট পনেরোর মধ্যে নয়াবসত কিয়ামাচা পেরিয়ে কাদড়া জঙ্গল লাগোয়া মেন রাস্তার উপরেই গোয়ালতোড় প্রাথমিক স্বাস্থকেন্দ্রে পৌঁছালাম। দুজনে নেমেই সোজা চলে গেলাম মেটারনীটি ওয়ার্ডে। কর্তব্যরত নার্স ইঞ্জেকশেন নিয়ে ডাক্তারবাবুকে কল দিলেন।
ডাক্তারবাবু এসেই বললেন
 
----দুজনের অবস্থাই খারাপ। আন্ডারওয়েট বেবী। তায় রিগ্যাল এবং প্রিম্যাচিয়োর। মা অপুষ্টির শিকার। ইতিমধ্যে বেবীর ঘাড় ষ্টিফ হয়ে গেছে। দেখা যাক কি করতে পারি।
এ কথা বলে ডাক্তার বাবু যা যা করনীয় করলেন। বেডের কাছে গিয়ে দেখলাম বেবী রিকেট গ্রস্ত। খুব ছোট বেবী। বুকের দুধও টানতে পারছে না। মায়ের অবস্থা তথৈবচ। কঙ্কালসার চেহারা। ড্যাবড্যাব করা দুই চোখই সার।
বেরিয়ে এলাম দুজনেই। বললাম 
----চল তোমার শ্বশুরবাড়ি পৌছে দি। কিছু পেটে দিয়ে রাতটা একটু বিশ্রাম নাও। তখন কাল সকালে আসবে।
----না স্যার, খেয়ে দেয়ে এখানেই ফিরে এসে বাইরে শুয়ে থাকবো, যদি কোন প্রয়োজন হয়।
বললাম, 'ঠিক আছে তাই করো। তা তোমার নামটা এখনো আমার জানা
  হয়নি।
---- নির্মল, নির্মল সেন।
বালিবাঁধের ঠিক পরেই ডানদিকে ব্লক অফিস, বাঁদিকে কংসাবতী ইরিগেশান অফিস। আমি নেমে গিয়ে সন্ম্যাসীকে বললাম,
----ওনাকে ঘোষপাড়ায় পৌঁছে দিয়ে
  এসো।
পরদিন সকাল থেকেই মনটা খচখচ করছিল। একবার দেখে এলে কেমন হয় এই ভেবে। নিজেই ভেবে দেখলাম ও তো আমার কেউ নয়। দেখতে যাওয়াটা একটু বেশিই আদিখ্যেতা হয়ে যাবে। ও তো ঘুঘনীওলা বইতো কিছু নয়। ওর বৌ এর বাচ্ছা হয়েছে তো আমার কি?
এইসব সাত পাঁচ ভাবছি। হঠাৎ দেখি নির্মল এসে হাজির। বললাম,
---- সব খবর ভাল আছে তো?
---- হ্যাঁ স্যার, দুজনেই মোটামুটি ভাল আছে। তবে ডাক্তারবাবু
  বলেছেন বিপদ এখনও কাটেনি।
---- সব ঠিক হয়ে যাবে। ওপরওলা আছেন।
---- না স্যার আর যেই থাকুক ওপরওলা নেই। থাকলে তিনি পুরোপুরি
  অন্ধ।
----তা কেন? ভগবানের উপর বিশ্বাস হারাণো পাপ।
----বিশ্বাস রেখে কি হবে স্যার? কিসের পাপ বলতে পারেন? জানেন এই বত্রিশ বছরে একটাই সত্য উপলব্ধি
  করেছি তা হলো গরীব হয়ে জন্মানোটাই পাপ। আর ভগবান? ও তো পাথর। ও খায় না দায়, শুনতে পায়, না দেখতে পায়? আমি বিশ্বাস করি না স্যার।
আমার রাঁধুনি অমল ঘোষ ততক্ষনে চা বিস্কুট নিয়ে এলো। নির্মলকে বললাম চা খেতে। দু তিনদিনের অযত্নলালিত দাড়ি,উস্কোখুস্কো বাবরী চুল দেখে বোঝাই যাচ্ছিল না এ সেই ঘুঘনীওলা নির্মল। বললাম,
---- ভগবানে বিশ্বাস রাখতে হয়। ভগবান যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন।
এ কথা বলতেই তপ্তকড়াই এ হঠাৎ জল পড়ার মত ঝাঁঝিয়ে উঠল নির্মল।
---- ভুল বলছেন স্যার। ভগবান আপনাদের জন্য,ভগবান বড়লোকদের জন্য,ভগবান রাজনীতিবিদদের জন্য।
---- এসব কথা হঠাৎ বলছ কেন?
----তবে শুনবেন স্যার আমার কথা? বিচার করবেন তো ভগবান কত মঙ্গলময়?
এমন সময় অমল রুমে ঢুকেই প্রশ্ন করল,
---- বাবু বাজার করতে যাচ্ছি। কি বাজার করব?
বললাম,---- এই ভদ্রলোক আজ এখানেই খাবেন। কাঁচা আনাজ ছাড়াও একটু মাছ নিয়ে আসিস।
নির্মল হাঁইহাঁই করে উঠলো, বলল,
---- না না স্যার। আমাকে আবার হাসপাতাল যেতে হবে।
---- তাতে কি,খেয়েদেয়ে যাবে। অনেক করে বোঝানোর পর সে রাজী হলো। তারপরেই বললাম,
---- হ্যাঁ যা বলছিলে বলো। আমি শুনবো।
নির্মল বলতে শুরু করলো,
---- স্যার আমার বাড়ী বিষ্ণুপুরের কাদাপাড়ায়। বাবা ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এখন অবসরপ্রাপ্ত, এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বিছানায় শুয়ে থাকেন আর ফ্যাকাসে চোখে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দুরসম্পর্কিত এক পিসিমা
  আমাদের বাড়ীতে থাকেন। তাঁর একমাত্র পুত্র বৃহস্পতি তাঁকে ঘরছাড়া করেছে। তাই দুমুঠো অন্নের তাগিদে থেকে গেছেন আমাদের বাড়ীতে। বাবার দেখাশুনা পিসিমাই করেন। বাবাকে বাথরুম করানো, তেল মালিশ করা, খাওয়ানো সবকিছুই উনি করেন।
আমরা এক ভাই,এক বোন। আমি ইংলিশ এ মাস্টার ডিগ্রী করেছি বিদ্যাসাগর ইউনিভারসিটি থেকে। পাশ করেছি এগারো বছর আগে।
বোন গ্র‍্যাজুয়েশান করেছে বছরসাত আগে। বোনের জন্মের দুবছরের মধ্যেই মা ক্যান্সারে মারা যান। বিষন্ন হয়ে পড়েন বাবা। তাঁর ঐ মানসিক অবস্থা নিয়ে আমাদের পড়িয়ে মানুষের মত মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন। আমরা দুজনেই বড় হতে লাগলাম। বাবা কোনদিন মায়ের বা সংসারের অভাব বুঝতে দেননি।
বোন বড় হওয়ার আগে পর্যন্ত বাবা ই রান্নাবান্না কাপড়কাচা,বাসনমাজা প্রায় সব কাজই করতেন। তিনি এক স্বপ্নের মধ্যে বাঁচতে চেয়েছিলেন। আমরা বড় হব, চাকরী করব, নিজের পায়ে দাঁড়াবো,বাড়ীতে স্বচ্ছলতা আসবে। আরও কত কি।
আমি মাস্টারস করে ইন্টারভিউ এর পর ইন্টারভিউ  দিতে লাগলাম। লিখিত পরীক্ষায় খুব ভালভাবে পাশ করি তো মৌখিকে ডাঁহা ফেল। আমার মামা কাকা নেই আমার কোন আত্মীয় এম এল এ, এম পি, বা মিনিষ্টার নেই। লিখিত পরীক্ষায় সত্তরের মধ্যে আটষট্টি পেয়ে প্রথম স্থান পাই কিন্তু পাঁচজন মৌখিক পরীক্ষকের কাছ থেকে মাত্র দুই। অথচ যে কিনা লিখিত পরীক্ষায় পঁঞ্চান্ন সে মৌখিকে আঠাশ পেয়ে দিব্য চাকরী হাতিয়ে নেয়। একবার তো একজন বলেই ফেললেন পাঁচলাখ দিতে পারলেই চাকরী। বাবা ওই পরিমান টাকা স্বপ্নেও দেখেননি।  আমার চাকরী  হলোনা, কেননা ভগবান মঙ্গলময়।
ভেবেছিলাম বোনটার একটা কিছু হবে। বোনটা ছিল অসম্ভব বুদ্ধিমতী। অঙ্কে ইউনিভারসিটির টপার ছিল। সেও চেষ্টা করছিল একটা চাকরীর। কিন্তু বয়সের উন্মাদনায় প্রেমে পড়ল এক ছেলের। ছেলেটা দেখতে খারাপ ছিল না। কিন্তু মুখোশের আড়ালে ছিল এক বীভৎস মুখ। চাকরীর প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায় এক নকল অফিসে। বোন বুঝতে পারেনি। ছেলেটা বলেছিল ওটা তার বসের কোম্পানি।  দুমাস সেখানে চাকরী করল আটহাজার টাকা মাস মাইনায়। বাড়ীতে  তখন আমাদের খুশির বন্যা। দুবেলা দুমুঠো অন্নের যোগানেই আমরা খুশি ছিলাম। বাবার ঔষধের খরচা, জামাকাপড় সবেরই জোগান দিত বোন। আমরা জানতাম না ওই টাকার বিনিময়ে বোন তার দেহটাকে বাজী রেখেছে।
হঠাৎ দুমাস পর ও বলল তাকে দিল্লীর গাজিয়াবাদের অফিসে বদলী করেছে। শুনে বাবা ভাবলেন নিশ্চয়ই পদোন্নতি হয়েছে। তিনিও বলেছিলেন ভগবান মঙ্গলময়, যা করেন মঙ্গলই করেন। আপনি কি বলেন স্যার?
মঙ্গলময়ের ইচ্ছায় বোন চলে গেল গাজিয়াবাদ। এখানে ছিল দুজন ক্লায়েন্ট আর ওই অফিসে অগুনতি  নিত্যনতুন ক্লায়েন্ট। টাকার পাহাড়।
চারমাস পরে বোন এল বাড়ীতে। বাড়ীর চৌকাঠের ওপার থেকেই বাবাকে প্রণাম করে বলল,
 
---- বাবা পবিত্র চৌকাঠ পেরিয়ে আজ আর তোমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করার মত পবিত্রতা আমার অবশিষ্ট নেই তাই দুর থেকেই প্রণাম করছি। সেই সঙ্গে রেখে গেলাম এই দু লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা। আমি নেক্সট ফ্লাইটেই দিল্লী চলে যাচ্ছি।
বাবা নির্বাক হয়ে রইলেন কিছুক্ষন। সম্বিত ফিরে পেলেন যখন দেখলেন সামনে তাঁর আদরের মেয়ে নেই,গাড়ী চড়ে ফিরে যাচ্ছে নিজের ঠিকানায়। সামনে পড়ে আছে দু লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকার তিনটে বান্ডিল।
বাবা হতভম্ব হয়ে পড়ে গেলেন মাটিতে। আমি বাড়িতে ছিলাম না। বাবা কতক্ষন মাটিতে পড়েছিলেন জানিনা। আমি বাড়ীতে ঢুকে দেখি, বাবা মেঝেতে পড়ে আছেন, মুখটা বেঁকে গেছে, শরীরের বামদিক অবশ হয়ে গেছে। একটা গোঁঙানির শব্দ পেলাম। চৌকাঠের পাশে পড়ে আছে তিনটে টাকার বান্ডিল। যে পরিমান টাকা একসঙ্গে আমরা চোখে দেখিনি।
ভগবান মঙ্গলময়,কি বলেন স্যার?
মনে হচ্ছিল ওর চোখে আগুনের গোলা। মুখে একরাশ তাচ্ছিল্যের অভিব্যক্তি।
 
একটু দম নিয়ে আবারও বলতে শুরু করল নির্মল।
বুঝলাম বাবা কিছু কথা বলতে চাইছেন। পারছেন না। জড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর কথা। কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। আমি ঘাবড়ে গেলাম। কোত্থেকে এত টাকা এল, কেনই বা এল কিছুই বোঝা গেল না।
বাবাকে ধরাধরি করে বিছানায় শোয়ালাম। টাকার বান্ডিলগুলো বাবার ঈশারা মত একটা টিনের বাক্সতে রেখে দিয়ে কোবরেজ বাড়ী গেলাম দৌড়ে। ওনি এসে দেখলেন, কিছু ভেষজ বড়ি আর মালিশ তেল দিয়ে চলে গেলেন। যা আজও চলছে নিয়মিত।
আমার রান্নার হাতেখড়ি বোধহয়  সেদিনই হল। ফেনভাত আর আলুভাতে। নিজের রান্না করা খাবার আর কাউকে খাওয়ানো যে কত আনন্দের হতে পারে সেদিনই বুঝলাম। 
হাত পুড়িয়ে রান্না বেশীদিন করতে হয়নি। মাসখানেকের মধ্যেই ছাতনার পিসিমা এলেন বাড়ীতে। বললেন,
---বাছা তোর ভাই বেস্পতি আমাকে বাড়ীছাড়া করেছে তাই তোদের শরণাপন্ন হলুম বাবা। আমার কিচ্ছু দরকার নেই বাবা, দুগ্রাস ভাত আর একটু মাথা গোঁজার আশ্রয় চাই বাবা। আমি সব কিছু করে দেব।এমনকি দাদার সেবাটাও করে দেব।
বেস্পতি ওরফে বৃ্হস্পতি মল্লিকের কান্ডকারখানা শুনে তাজ্জব বনে গেলাম। যেখানে আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় সেখানে একজনের চাপ নেওয়া কি কঠিন সেটা পেনশানভোগী সংসারীরা খুব ভালই উপলব্ধি করতে পারবেন। তাছাড়াও টিভি সিরিয়ালের বিধবা পিসিমাদের কান্ডকারখানা দেখেছি বলে দোনামনা করছিলাম, কিন্তু বাবার মাথা নাড়া দেখে সম্মতি দিলাম।
পিসিমা সংসারের হাল ধরলেন। আমি হকারী ধরলাম। সহজ কাজ ঘুগনী বেচা, তাছাড়া এই লাইনে তখনো কোন হকার ঘুঘনী নিয়ে ব্যবসায় নামেনি। অতএব ছাতনার পিসিমার তৈরী ঘুঘনী  হকারী করে প্রথমদিনেই বাজীমাত করলাম।
কিছুটা বাবা সুস্থ হতেই টাকার ব্যাপারটা জানতে চাইলাম। বাবা শুনতে পেতেন, বুঝতেও পারতেন কিন্তু কথা বলতে পারতেন না। তাই স্লেটে লিখে দিলেন " ওই টাকা তোমার বোন তৃপ্তির পাপের টাকা, ওই টাকার একপয়সাও ছোঁবে না। ওই টাকা বিষ্ণুপুরের কোন অনাথআশ্রমে দিয়ে দিও। তোমার পিসি থাকুক। ওর অমর্যাদা করো না। তুমি যেমন হকারী করছ করো। কোন কাজই ছোট না। আরেকটা কথা বলে রাখি বছরখানেক বাদে গোয়ালতোড়ের ঘোষপাড়ার নবীন দত্তের মেয়ে সুধাকে বিয়ে কোর। ওরা খুব গরীব, কোন পণটন নিও না। ওরা গরীব হলেও সত্যিকারের মানুষ। অনাড়ম্বর বিয়ে করবে।
একবছর পেরোনোর পর স্যার বাবার কথামত  আমি দত্তবাড়ির সুধাকেই বিয়ে করলাম। বিয়ের পর বেশ ভালই চলছিল। সুধা বাড়ীতে সংসারের প্রায় সব চাপই হাসিমুখে কাঁধে নিয়ে নিলো। এমনকি পিসিমার ভারাভারও নিল। ওর রান্নার হাতটাও ভাল। জানেন সুধার তৈরী ঘুঘনী  দুতিনটে ষ্টেশানের মধ্যেই এক হাঁড়ি শেষ হয়ে যেত। দেড় বছর ভালই ছিলাম স্যার। চাকরী না পাওয়ার ব্যাথা প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। কিন্তু_____
একদিন সুধা বললো সে নাকি কনসিভ করেছে। পিসিমার সে কি আনন্দ। কালী দুর্গার ফটোতে মাথা ঠুকে বললেন 
----ভগবান মঙ্গলময়। এবার মা দুর্গা
  মুখ তুলে চেয়েছেন।
খুশির ঝরণাধারায় ভরে গেলো ঘর। যেহেতু সুধা একা হাতে বাড়ীটা সামলাতো তাই খাটাখাটনিও বেশী হওয়ার কথা চিন্তা করে আমরা সকলে মিলে সাব্যস্ত করলাম, সন্তান জন্মানো অবধি সুধা বাপের বাড়ীতেই থাকুক।
সেইমত সে বাপের বাড়িতেই থাকতো, তখন বুঝিনি বাপের বাড়ীর নিদারুণ দারিদ্রতার কারণে সে অপুষ্টিতে ভুগবে। নবাগত আসছে জেনে আমিও বেশী পয়সা রোজগারের ধান্দায় থেকে খুব বেশি সময় দিতে পারিনি ওকে। ওর প্রতিবেশীরা বলত সুধার ছেলেই হবে। ছেলে হলে নাকি মেয়েরা একটু শুকায়, হাড়গিলে হয়। এত সব শুনেও আপনি কি বলবেন স্যার, ভগাবান মঙ্গলময়,ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।
আমি কি বলবো বা আমার কি বলা উচিৎ  ভেবে পেলাম না। শুধু বললাম
---- আপনি স্নান করবেন? আলাদা গামছা আছে। কুয়োপাড়ে স্নান করে নিতে পারেন।
----না স্যার। স্নান করার দরকার নেই। আজ তিনদিন বিক্রিবাটা করিনি। ভাবছি কি করবো। কি করে সব সামাল দেব। তাছাড়া খেয়েদেয়ে এখুনি হাসপাতাল পৌঁছাতে হবে।
আমি আর জেদাজিদি করিনি। 
আমি স্নান সেরেই অমলকে হাঁক পাড়লাম খাবার দেওয়ার জন্য। নির্মল তৃপ্তি করে খেলো। হাতমুখ
  ধুয়েই হাসপাতাল যাওয়ার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়ল।
আমি ওকে পাঁচশ টাকা দেব ভেবে ওকে বললাম,
---- নির্মল তুমি এই পাঁচশ টাকা হাতের কাছে রাখো। দরকারে কাজে লাগবে।
---- না স্যার টাকা নিতে পারবো না।
করুণা নয় স্যার, আপনি ব্রাহ্মন সন্তান, আমায় আশীর্বাদ করুণ যেন এই পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারি। ভগবান যদি মঙ্গলময় হয়ে থাকেন তাহলে টাকার দরকার হবে না।
বলেই হনহন করে হাঁটতে শুরু করলো। ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
পরদিন ওর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। তার পরদিন আমার মনটা আনচান করছিল ওর সঙ্গে দেখা করার জন্য। শেষমেশ সন্ধ্যের গোড়ায় গোড়ায় মোটরবাইক করে হাসপাতালে পৌঁছালাম। অনুমতিক্রমে ওয়ার্ডে ঢুকে নির্দিষ্ট বেডের কাছে গিয়ে দেখি তৃপ্তি নেই। গা টা ছমছম করে উঠল। একজন কর্তব্যরতা নার্সকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,
---- সিস্টার ১৪ নং বেডের তৃপ্তি সেন কোথায়?
---- আপনি ওর কে হন?
 
---- ওর স্বামীর বন্ধু।
---- আপনি কিছু জানেন না?
----না।
----গতকাল রাত দুটোয় তৃপ্তি সেন মারা গেছেন। বেবী এখনো বেঁচে আছে। ওর মামাবাড়ীর লোকেরা নিয়ে গেছে। ডেডবডি বিষ্ণুপুর নিয়ে গেছেন নির্মলবাবু।
চমকে উঠলাম আমি। বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। রাত্রে কোনমতেই ঘুম এলো না। বারবার কেন জানিনা নির্মলের বৌ তৃপ্তির ফ্যাকাসে মুখটা আর ড্যাবড্যাব করা চোখ দুটো মনে পড়ছিল। সেই সঙ্গে চিঁ চিঁ করা শীর্ণকায় শিশুটাকে। কি হচ্ছে ওর? কে জানে।
একটা ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কখন সকাল হল জানিনা। স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে অফিসের কাজে মন দিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই ভুলে গেলাম সবকিছু। 
এক দেড়মাস পেরিয়ে গেল। চার পাঁঁচ বার বাড়ি যাতায়াত করলাম। ঘুঘনীওলা নির্মলকে আর দেখতে পাইনি। শুনতে পাইনি সেই কন্ঠস্বর। "এই যে দাদারা,দিদিরা বোনেরা, গরমা গরম বিষ্ণুপুরী ঘুঘনী আছে, দেবো নাকি?"
ও কোথায় জানার কৌতুহল অদম্য কিন্তু জানার উপায় নেই। একদিন গোয়ালতোড়ের সারেঙ্গা মোড়ে অনিলের চায়ের দোকানে বসে আছি বিকেলবেলা। হঠাৎ চোখে পড়ল গ্লাস কাপ ধোয়া ছেলেটার দিকে। কোথায় যেন দেখেছি। মনে পড়ল এ সেই ছেলে, যে তৃপ্তির জন্য হাসপাতালে খাবার নিয়ে যেত আর হাসপাতাল বারান্দায় পড়ে থাকতো। তৃপ্তির ভাই অর্থাৎ নির্মলের শ্যালক। ওকে ডেকে বললাম,
---- এই তুই নির্মলের শালা না?
---- হ্যাঁ বাবু।
---- তোর জামাইবাবু
  কোথায় রে?
----জানিনা বাবু। দিদির দেহ যেদিন নিয়ে গেল সেদিনই দিদির মরদেহ দেখে পক্ষাঘাতগ্রস্ত তাউই মশায় হার্টফেল করে মারা গেলেন। একই দিনে দুজনের শ্রাদ্ধকার্য হলো, তারপরদিন থেকেই আর জামাইবাবুর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভগবানের ইচ্ছায় ভাগ্নে আমাদের বাড়ীতে ভালই আছে। দুলেপাড়ার এক দুলেবৌ ওকে প্রতিদিন দুধ খাওয়ায়,পরিচর্যা করে বিনিপয়সায়।
আমি মনে মনে বললাম,'আবার ভগবানের ইচ্ছায় _
পাঠকদের উদ্দ্যেশে বলি, যদি কোনদিন কেউ সুঠাম সপ্রতিভ বাবরী চুল, টিকোলো নাক, কপালের বাঁদিকে কাটাদাগ যুক্ত ঘুগনীওলাকে কোন ট্রেনে বা বাসে হকারী করতে বা বিড়বিড় করতে দেখেন তাহলে প্লিজ তাকে বলে দেবেন " তার ছেলে 'আশামুকুল' বেঁচে আছে,সুস্থ আছে।"


মুস্তাইন সুজাত

বোধোদয়

মুহূর্তে পরিবেশটা মোচর খেয়ে গেলো খরস্রোতা নদীর কুড়ে ঘোলাটে জলের পাকের মতন । শেষটায় পরিস্থিতি এমন হল যে কিনা, পাহাড় গাত্র থেকে কেন্দ্রীভূত জলধারা পতনের মতকরে কস্মাত একটা ঘটনার জন্ম নিল ।
কলেজের মেরুনরঙা দেয়াল চোখের সামনে ভাসতে লাগলো যেন উদোম আকাশ হয়েঠেশ দিয়া দাঁড়ানোমেয়েটা এবং ছেলেদুটোর কিংকর্তব্যবিমূ ফ্যাকাশে মুখ আর ঘোলাটে চোখগুলারঅনড় পাতা জেগে থাকল সামনের জটলার দিকে; চোখেএই মাত্র ঘটে যাওয়া ভয়ার্ত ঘটনার পর সমাচার দেখার যেন এক মৌন অপেক্ষা !

এই নির্জন জায়গাটা প্রতিদিনের মত নয় আজ । ঝিঁঝিঁ পোকাদের ক্রমাগত চিৎকারে প্রকৃতির বেহাল দশাকলেজ ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে ভেসে আসা কনসার্টের শব্দের উৎপাত আর হাজারো শিক্ষার্থীর আনন্দ উল্লাস ধ্বনি মিলেমিশে অনেকটা শোরগোলের মত শোনাচ্ছে কানে । প্রতি বছর ঠিক এই সময়টায়, হালকা শীত শীত আমেজ যখন আসছে আসছে করে, হাইওয়ের পাশের খালপাড়ে যখন কাশফুল পাখনা মেলে, তখন কলেজের এনুয়েল প্রোগ্রাম শুরু হয়গত তিনদিন ধরেচলছে অনুষ্ঠান ।সামনে চলবে আরো চারদিনসাত দিনের প্যাকেজপ্রোগ্রাম এবার । বিশাল মাঠের মধ্যিখান জুড়ে চারকোনা ছাতার মত প্যান্ডেলের নিচে দর্শককুল উন্মত্ত; নেচে গেয়েখুশি ভাগাভাগি করে নিচ্ছে । আর দর্শককুল বলতে এই কলেজেরই শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং কলেজের সাথে সংশ্লিষ্টতা আছে যাদের তারা সব এবং তাদের সাথে যাদের নিবিষ্টতা আছে তাদের কেউ কেউ যেমন, ভাই-বোন, বাবা-মা কিংবা নিকটাত্মীয়-বন্ধুবান্ধবরিক্সাভ্যানগুলার উপর দাঁড়ায়ে পরিপাটি করে সাজানোএই মফস্বল শহরেরকিছু মানুষ কনসার্ট উপভোগের পতিত নির্যাস শুষে নেয়ার চেষ্টায় রততারা কলেজ বাউণ্ডারির বাইরে মিশমিশেকালো পিচ ঢালা রাস্তার উপর । হয়তো আরো অনেকেদূরে কোন বাসার বারান্দায় কিংবা নিভৃত ঘরের আবছা আলোময় আবহে মাতোয়ারা হয়ে সুরে-গানে তন্ময় ।
মেয়েটি দাঁড়ানো একদম নাঙা পায়ে । পা-হাত কাঁপছে । গোটা শরীরেও কাঁপন তার, মৃগী রোগীর মতনতার খসে পড়া উর্ণার অবশিষ্ট ভাগ সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা একহাতে, অন্যহাতে দেয়ালের কাছ ঘেঁষে অযথা বেড়ে ওঠা ডুমুর গাছের কাণ্ড ধরা মুঠোকরে । স্ট্রট লাইটের সাদা-ফ্যাকাশে আলো এদিকের গলিমুখ ছাড়ায়ে ভেতরে পৌঁছেনাকারন হিসেবে অধিককাল পুরানা বাল্ব এবং সেই সাথে গলিমুখ দাঁড়ানো শিরি গাছের পাতার ফাঁকে ল্যাম্পপোস্টটার অসহায়ত্বকে সহজেই দায়ী করা যায় । পেছনে কলেজ বিল্ডিং আর সম্মুখে রাস্তার ঐপাড়ে কারখানার উঁচু দেয়াল । দুই দিকের বন্ধকতা ছাপায়ে কারখানা আর কলেজ বিল্ডিঙের গায়ে সাঁটানোই লেকট্রিকবাতিগুলো থেকে ছড়ানো হলুদাভ আলোরেখা মেয়েটার মুখে আর শরীরে যেন হাতড়ায় নির্লজ্জভাবে এমনই বেগতিক অবস্থা ।

ছেলে দুইটার দুই গালেই মারের নিশানা স্পষ্ট । ফর্সা গালে পাঁচ আঙ্গুলে সপাটে চড় বেশ কখানা পড়েছে, যে আঙ্গুলের দাগ জেব্রা লাইন হয়ে ভাসছে । একজনের নাকের ডগায় ফোঁটা কয়েক রক্তের জমাট । চশমাওয়ালা ছেলেটা একটুবেশিই চোট পেয়েছেকার হাতের পাঞ্চে যেন চশমার কাচ ভাঙা খালি ফ্রেমটা উড়ে গিয়া আকন্দ পাতার ফাঁক গলে ঝুপের ভেতর লুকিয়েছে নিঃশব্দেচোখে তেমন কিছু ক্ষতি হয় নি বলে রক্ষা । কেবল নাকের উপরের বাঁ পাশটা ছিলে গিয়ে হালকা রক্তের ধারা ফুলে যাওয়া ঠোঁট ডিঙায়ে থুতনাতে আটকে আছেনিচে পড়ার আগেই নাই হয়ে যাচ্ছে । শার্টের বাম হাতায় মুছে ফেলা রক্তদাগ স্পষ্ট । ছেলেটার এক হাত ডুমুর গাছে মেয়েটার হাত চেপে বসা যেন এ যাত্রায় কাণ্ডারি সেজে মেয়েটাকে রক্ষার পুরু ভার ন্যস্ত তার উপর । অন্য ছেলেটাকে আরেক হাতে কাঁধ জড়ায়ে ধরে আছে । তিনজন দাঁড়ানো এক কাতারে

মেয়েটা স্পষ্ট কথা বলতে পারছে না, শব্দগুলো জড়ায়ে জড়ায়ে যাচ্ছেমুখের ভেতর । মুখ থেকে হালকা মদের গন্ধ আসছে আর উড়ে আসা গন্ধ ভেসে ভেসে যেন খোঁচাচ্ছে নেশাখোর আগন্তুক ছেলেদলের প্রত্যেককে । আর সেই সাথে চাগায়ে দিচ্ছেতাদের সুপ্ত নেশাবাসনাঅথচ মেয়েটার পাশে দাঁড়ানো ছেলে দুইটা বেশ শক্তগোছেরপাথরের মত নিশ্চল মনের দিক থেকেটনটনে কথাবার্তা,কেবল মুখনিঃশ্বাসে বের হওয়াহুইস্কির একটা জট পাকানো মাতাল মাতাল গন্ধ ছাড়া
গলিতে ঢুকার কোন কথাই ছিল না আগন্তুক দলটার । তিনটা বাইকে ওরা মোট আট জন । গত বছর কলেজের পাঠ চুকিয়ে মানে গ্রাজুয়েট শেষ করা মুকিত হালদার আজকের দলনেতা । ছাত্রত্বের আঁশটে গন্ধ যায় নি এখনো, আজ সকালে এসেছে রাতের কনসার্টে থাকবে বলেগত চার বছরে কম করে হলেও ষোলবার প্রেম নিবেদনে ব্যর্থ প্রেমিক মুকিতের স্বপ্নরানী আজ নাচবে, গাইবে প্রোগ্রামেএও শুনেছে বেশ কিছুদিন হল অন্য কার সঙ্গিনী সে, মানে বয়ফ্রেন্ড জুটায়েছে জয়িতা করপ্রতিশোধ আর ভালবাসার ঝুলানো মাচায় দুলছে মুকিতসেই থেকেএকটা কিছু করা চাই এবং চাই-ই,এমনই যখন মোক্ষম স্পিহা তার মগজে ঠোকরাচ্ছে বেশ কয়দিন ধরে, জুনিয়র সাত জন নিয়া জয়িতার হোস্টেলের উদ্দেশ্যে আজকের যাত্রা

জয়িতা কর হোস্টেল ছেড়েছে অনেক দিন, সেও মুকিতের অজানাজানা হয় জয়িতার এক পুরানা হোস্টেলমেটের সাথে কথা বলে আজ । সে এখন ভাড়া করা বাসায় থাকছেতার তিন বান্ধবীর সাথে আর বয়ফ্রেন্ডের আদরে সোহাগে নাকি পৌষের শীতেও একশত তিন ডিগ্রী সেলসিয়াসে গরম ঝরে কথায় চলনে-বলনে, তেমন অনুযোগে নাক সিটকায় সংবাদদাতাঠিকানা বিত্তান্ত নিয়ে যখন মুকিতরা পৌঁছায় সম্ভাব্য বাসার গেটে, সন্ধ্যা তখন উতরে যাচ্ছে রাতের দিকে । প্রকৃতিতে আঁধারের মরণকামড় । এদিকে অনাদরে পরে থাকা রাস্তার মৃতপ্রায় সোডিয়াম লাইটগুলা থেকে কেরোসিনের সলতের মত আগুন আলো ঠিকরে বের হচ্ছে । আর তাতেই ঘাসপোকা দল উড়ছে পাখনা ছড়িয়ে ।

দুই তলা বাসার উপরের ফ্ল্যাট পুরা অন্ধকার নিচ তলার বাসিন্দাদের বারান্দায় আটক বিলাতি কুকুরের লকলকে জিহ্বায় তখন অনর্গল লালা ঝরার দৃশ্যবারান্দার হালকা আলোয় দেখা সেই লালা,ঘন, জলিভাতের ঘন মাড়ের মত নিচে পড়ে পড়ে প্রায় অবস্থা । বাইকগুলির ইঞ্জিনের শব্দে বিলাতির গোটা কয়েক জাঁদরেলি হুঙ্কারে বুঝা হয়ে গেছে, নাগালে পেলে ঘাড়ে ঝুলবে নিশ্চিত ।
অন্ধকার দোতলার বাসাটায় নাকি থাকে জয়িতা কর । জয়িতার বয়ফ্রেন্ড অনুপ,এবাসায় আসে প্রায়ই জয়িতার রুমবন্ধ থাকাটা অনুপের নিঃশব্দ অনুপ্রবেশের সিম্বলবাকিদের কাছেআর অন্য সব সময় রুমের দরোজা হ্যাঁ’খোলা ।গেট দিয়া ভেতরে ঢুকতে থাকা একজন মধ্যপ্রৌঢ়কে জিজ্ঞাস করে নিশ্চিত হয় যে, জয়িতা নামের মেয়েটা এখানেই থাকে এবং আজ সকালেই বেরিয়ে গেছে একটা ছেলের বাইকের পেছনেবসে চালকের গলা জড়ায়ে চকিতে ম্লান হওয়ামুকিতের মুখটায় নিমিশে কেমন বিষাদ ছড়ায়আর সবাই ঠাহর করে তার ভেতরে বহমান কষ্টের বন্যা । সেই কষ্ট ঝরে আর ঝরে, যেন ধুপাঘাটে সদ্য ধৌত করা কাপড় থেকে মোচড়ায়ে জল ফেলার মত করে । কেউ কেউ বুঝে যায় কারন,উপস্থিত কারো কারো জীবনও যে এরকম ঘটনার জন্ম দিয়েছে অতীতদেরী নয় আর, গলি থেকে বের হয়ে সোজা কলেজের পথ ধরে দলটামুকিতের বাইক সবার সামনে, এর পিছু পিছু অন্য দুইটা । মাঝ রাস্তায় হঠাৎ মুকিত বাঁ দিকে মোড় নেওয়া মাত্রই পেছন থেকে সবাই হায় হায় করে উঠে । ভাবনায় চকিতে দোল দেয়, এই বুঝি গেল বিরহে !

পেছনের বাইক দুইটা তাকে দ্রুত অনুসরণ করে গলিতে ঢুকেআঁকাবাঁকা পথ মাড়ায়ে মনা’দার চায়ের দোকানে বিরতি সবার । এখান থেকে কনসার্টের আবহ টের পাওয়া যাচ্ছে, তবে কিছুটা অস্পষ্ট । ড্রাম আর গীটারের শব্দে গায়ক কণ্ঠ যেন সাময়িক চাপা পড়ে যায়মনা’দার দোকানটা কলেজ থেকে প্রায় দেড় কিলো দূরত্বে, মেইন রোডের দিকে মুখ করা । দোকানের দুই পাশে দুইটাকাঠের বেঞ্চিদোকানের কোনায়বড় হওয়া বহুকাল পুরানা ছাতিম গাছের ছায়াটা যেন আগলে রাখছে এদিকের অনেকটাপ্রতিসকালে কাঁচা বাজার আর মাছ-মাংসের পসরা বসে পেছনে সারি করেআর সারাদিন উদম পড়ে থাকে টিন শেডের উঁচু ভিটাগুলকিন্তু মনাদার চায়ের ব্যবসা থেমে থাকে না । চলে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ।বাইক দলের সদস্যদের দৈনন্দিন রুটিন মাফিক রাতের আড্ডা বসে এই চায়ের দোকান ঘিরে

হাতে ধুঁয়াতুলা চায়ের কাপ, যেন হালকা শীতের আমেজটা বাড়িয়ে দিচ্ছে শতগুণ । দীর্ঘ ঘোরাঘুরিতে সবাই ক্লান্ত । আবার ওইদিকে কনসার্টে যাবার তাড়া । তাই উঠতেই হয় শেষেমেশ
মুকিতের বাইক তখন শিরিষ গাছটার ঠিক নিচে, যেখানটায় এসে কলেজ ক্যাম্পাসের উত্তর সীমানার উঁচু পাঁচিলটা ঠেকেছে আর ‘দ’ এর মত বাঁয়ে ঢুকে গেছে সরু গলিটার দক্ষি পাশ ঘেঁষে সোজা পশ্চিমে, আর এতে তৈরি হওয়া গলিটাঠিক মাঝামাঝিতে আধো আলো-আঁধারে দুইটা ছেলে একটা মেয়েকে টেনে টেনে নিয়ে আসছে মেইন রোডের দিকে, এই দৃশ্যটা মুকিতের দৃষ্টি এড়ালেও পেছনে বসা ছোকরাটার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না । মুকিতকে বলতেই বাইকটা ডান দিকে ঘুরে গিয়া গলির ভেতর ঢুকে পড়ে । বাকি দুইটাও পিছু নেয় । পরপর তিনটা বাইক একসাথে আসতে দেখে ওরা সরে গিয়ে দেয়াল সেঁটে দাঁড়ায় । একটু সামনে আগিয়ে চকিতে বাইকটা ঘুরিয়ে নেয় মুকিতআর তখনই হেড লাইটের আলোর মুখে তিনজনকে কুঁকড়ে যেতে দেখা যায় শক্ত ব্রেক কষে বাইকের
এই কলেজের ?
হ্যাঁ ।
কোন ইয়ার ।
ফার্স্ট ইয়ার ।
এখানে অন্ধকারে কি করছিস ?
না মানে... কিছু না... মানে, এখানে একটু...
আবে শালা, মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তি করা হচ্ছে ?
মাস্তি করা হচ্ছে ? ছুটাচ্ছি দাঁড়া ।
ততক্ষণে ছেলে দুটোর শার্টের কলার ধরে কিলঘুষি শুরু হয়ে গেছে । মেয়েটা মাতালের মত বকছেআর কি যেন খুঁজছে রাস্তার ঘাসে অস্পষ্ট সে ভাষা, জড়ানো জিহ্বায় শুধু এটুকু বলতে শোনা যায়, লিভ মি এলোন, প্লিজ ।

বুঝা যাচ্ছে নেশা বেশ চড়েছে । বাইক দলের অনেকেই মেয়েটার দিকে আগিয়ে যায়ুযোগে হাত চালায়ে দেয় বুকে-পেটে-নিতম্বেমেয়েটা জোরাজুরি করেনিজেকে রক্ষার চেষ্টায় সামান্য মরিয়া । মুকিত মেয়েটাকে বাঁচায় একপাশে দাঁড় করিয়ে নিজে পাহারা দেয় । কাউকে ঘেঁষতে দেয়না । দুই জন এগিয়ে গিয়ে ছেলে দুটোকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেওরা দাঁড়ায় পাশাপাশি মেয়েটা মিনমিনকরে একই কথা বলে যাচ্ছে, প্লিজ লিভ মি এলোনপ্লিজ লিভ মি এলোন । মুকিতে কড়া ধমক শেষে বেচারা একদম চুপ হয়ে যায়

আর তখনই আকস্মাত ঘটে অনাহুত এক ঘটনাবাইক দলের সবচেয়ে নিরীহ ছেলেটা ঘটিয়ে ফেলে এক অদ্ভুত কাণ্ড । বর্ণনায় ছেলেটা মাঝারি গড়নের । হালকা পাতলা শরীর, আন্ডার ওয়েট যাকে বলে ঠিক তাইএমনিতেই খুব ভাল স্বভাবের । কিন্তু হঠাৎ কি যেন কি হয়, সবার মাঝ থেকে এক দৌড়ে মেয়েটার কাছে চলে যায়দুই হাতে মেয়েটার মাথা ধরে নিজের ঠোঁট মেয়েটার ঠোঁটে ঠেকিয়ে এমন ভাবে স্মোচ করা শুরু করে, সবাই হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ । এবার মেয়েটাকে সটান কাঁধে ওঠিয়ে হাঁটা দেয় মেইন রাস্তা বরাবরএক বন্ধুর নাম ধরে চেঁচিয়ে বলে, আবে শালা, মেসের চাবিটা দে !
মুকিত দৌড়ে গিয়া এমন একটা চড় কসায়, মেয়েটাকে আছড়ে ফেলে গালে হাত দিতে ছেলেটা বসে পড়ে রাস্তার উপরআর দেখা যায় তার লাল টকটকে চোখ, চোখের মণি দুটো জ্বলজ্বল করতে; কামহিংস্রতায় ভরপুর সে চোখ

এরপর থেকে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েও মেয়েটা কেঁপে কেঁপে উঠছে ভয় তার চোখজোড়ায় আর বিবি করে বলেই যাচ্ছে, প্লিজ লিভ মি এলোন ।
এই ফাঁকে ছেলে দুটোর কাছ থেকে আসল ঘটনা উদ্ধার হয়ে গেছে । কলেজের প্রথম বর্ষের প্রথম কনসার্ট উদযাপন তাদেরভেবেছে একটু অন্যরকম ভাবে পালন করবে ওরা তিন বন্ধু । ক্যাম্পাসের বাইরে কলেজ চত্বরের পেছনে খালি বিশাল মাঠদুব্বা ঘাসে বসেছিল বিয়ার আর হুইস্কির বোতপ্ল নিয়েকথা ছিল, মেয়েটা শুধু বিয়ার খাবে । কোন ফাঁকে যে হুইস্কির দুই পেগ মেরে দেয় খেয়াল করে নি অন্যরা । বেচারা মাতলামোর চরমে পৌঁছে কেবলই ছুটে যেতে চাইছে মাঠের দিকে । দুই হাত শুন্যে ভাসিয়ে খোলা বাতাসে দম নিতে নিতে কেবলই যেন উড়তে চায় । আর অসহায় ছেলে দুটো তাকে একরকম টেনে হিঁচড়ে ক্যাম্পাসে আনতে চায় । এই দৃশ্যটাই চোখে ধরে মুকিতের বাইকের পেছনে বসা ছেলেটার । ব্যস, এরপর ঘটনার পর ঘটনা
কলেজের সিকিউরিটি গার্ড ততক্ষণে চলে আসেপ্রিন্সিপাল স্যারকে খবর দেয়া হয়তিনি এসে ওদের তিনজনকে নিয়ে যান তার অফিসে । আর ঘটনার সময় আশপাশ থেকে জড়ো হওয়া, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জটলার কেউ কেউ ক্ষুধার্ত শকুনের মত তাকিয়ে দেখতে থাকে উদ্ভ্রান্ত মেয়েটার নিতম্ব দোলিয়ে চলে যাওয়ার দিকে
মুকিত হালদার তার দল নিয়ে কনসার্টে মিশে যেত যেতে শুনতে পাওয়া প্রিন্সিপাল স্যারের কথাটার রেশে মাথা দোলায়, এক অন্যআবেশে
“আপাদত তিন মাসের জন্য কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হল তোমাদের তিনজনকে । ভাগ্যিস মুকিতরা ছিল, নইলে কি যে কেলেঙ্কারি হত, ওফ !”
মাঠের এক কোনায় জয়িতা কর নাচছে কোমর দুলায়ে আর বয়ফ্রেন্ডের ঘাড়ে দুই হাত জড়ায়েপাশ থেকে কে যেন বলে উঠে,
মুকিতদাঅ মুকিতদা, ঐ তো !
কি ?
যাকে খুঁজছো পুরুটা বিকেল
ছাড় না, খুঁজে কি হবে আর !
কি বলছো মুকিতদা? তোমার না আজকে একটা কিছু করার কথা ছিলো ?
কথাটা যেন মুকিতের কানের কাছে পৌছায় নামুকিত শুনতে পায় চারপাশের জনসমুদ্রে যেন ফেনার মত ছড়ায়ে পড়েপ্রিন্সিপাল স্যারের কথাটা প্রতিধ্বনিত হয়ে,
“ভাগ্যিস মুকিতরা ছিল, নইলে কি যে কেলেঙ্কারি হত, ওফ !”

একটা স্নিগ্ধ হাসি ঢেউ খেলে যায় মুকিতের সারা মুখে ।