গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০১৫

উৎসব দত্ত


গর্বিত মা

অফিসের পার্টিতে নিমন্ত্রিত অভীক বোস স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন । আরও অনেক সহকর্মীর গিন্নিরাও এসেছেন। মিসেস মিত্রকে দেখে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন মিসেস বোস।
- আরে মিসেস মিত্র ক্যামন আছেন? এই জানেন তো আমার ছেলে টেক্সাস যাচ্ছে। ওদের অফিস থেকে পাঠাচ্ছে। ওর ইচ্ছে আছে ওখানেই পাকাপাকি ভাবে থেকে যাওয়া। আমার আর ওর বাবারও সেরকমই ইচ্ছে। বাবুকে তো আমি চিনি ওর ছোটবেলার স্বপ্ন আমেরিকা যাবে। ওখানেই থাকবে।
মিসেস বোস কে থামিয়ে মিস্টার বোস বলতে শুরু করলেন ছেলেকে আজ এই জায়গায় আনতে প্রচুর ইনভেস্ট করেছি। সব চেয়ে ভালো ইন্সটিটিঊশানে পড়িয়েছি । আরে বাবা  কার ছেলে দেখতে হবেতো !
মিস্টার বোসের কথা কেড়ে নিয়ে মিসেস বোস আবার বলতে শুরু করলেন -
-আমার বাবু পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ক্লাসে ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড কোনোদিন হয়নি। ওর বন্ধুরা তো ওকে নিয়ে পাগল। এই বিদেশ যাওয়ার খবরটা শুনে সবাই কি ভীষণ খুশি। কজন এই সুযোগ পায় বলুন তো ।

মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বোসের কথা গুলো চুপ করে মন দিয়ে শুনছিলেন মিস্টার অ্যান্ড মিসেস মিত্র। এতক্ষণ ধরে চুপ করে শোনার পর কোন প্রত্যুত্তর না পেয়ে মিসেস বোস কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে স্বগোতোক্তির স্বরে হাসব্যান্ডকে বললেন "অ্যায়ই এবার চলো। "
মিসেস বোস চলে যেতে মিস্টার মিত্র বিরক্ত হয়ে মিসেস মিত্রকে বললেন
-তুমি চুপ করে সব শুনলে একটা কথাও বললেনা। যে ছেলে জার্মানি যাওয়ার অফার ছেড়ে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারি করে তার মায়ের তো গর্ব হওয়া উচিত। তুমি কিছু বললেনা ক্যানো?
এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর মিসেস মিত্র হাসতে হাসতে বললেন
-বোবা কালার কোনো শত্রু নেই কেউ হিংসে করেনা । মাঝে মাঝে কালা কিম্বা বোবা হলে ক্ষতি কি ।

ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী


লং বেঞ্চ  


পার্কের এই কংক্রিটের লং বেঞ্চটা বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য উদ্দিষ্ট । একটু নিরিবিলি পরিবেশ । সামনেই ছোট্ট একটা ফুলের বাগান আছে তাতে নানান রঙের গোলাপ , রজনীগন্ধা ,ডালিয়া ,  জারবেরা ইত্যাদি  ফুলের শোভায় এক মনোরম পরিবেশ । বেঞ্চের ওপর ছায়ার জন্য বেশ পেছনে একটা কদম গাছ । বলে কদম গাছে নাকি কেষ্ট নাচে গোপীদের জন্য , তাই এই -  বরিষ্ঠ নাগরিকের বসার জায়গায় কদম গাছটাই বেশ বেমানান। এই অঞ্চলের কাউন্সিলার ঠিক যায়গাতেই বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য বসার যায়গাটা ঠিক করেছেন পার্কের মধ্যে । সামনেই মাঠের মধ্যে আরেকটা গোলাকার ঘর যার চালাটা এসবেস্টস এর তৈরি । চূড়াটা কোনিকাল আকৃতির এবং গোলাকার বেঞ্চ , বসার জন্য । মধ্যেখানে সুন্দর অর্কিড। পাসের দেওয়ালটা খোলা তাই আলো বাতাস আসার অসুবিধা নেই। মোটামুটি বলতে গেলে এরকম একটা পার্ক সাধারণত সল্ট লেকেই দেখতে পাওয়াযায় ।  

প্রসঙ্গে আসি । এই বেঞ্চটাতে আমরা ৫ জন অবসরপ্রাপ্ত বরিষ্ঠ নাগরিক এসে বিকেল বেলায় আড্ডা দি। আমরা বলতে ১. পঞ্চুদা , ২.  নিহারদা , ৩. রণজিৎ-দা , ৪. সমরেশ দা এবং আমি । এনাদের মধ্যে আমি সর্ব কনিষ্ঠ । পঞ্চুদা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ তাই সকলে ওনাকে সম্মান করেন।  আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গ সাম্প্রতিক রাজনীতি , খেলা , কিছু ধর্মালোচনা আবার তার মধ্যে কখন কার্ল মার্ক্স তো কখনো শ্যামা প্রসাদ মুখুজ্জে র আবির্ভাব হয়। নিহারদা এর আগে পার্টি করতেন । ৭১ এ জেলে ছিলেন শুনি। রণজিৎ দা একটু গেরুয়ার ভক্ত। পঞ্চুদা , আমাকে নিজের দলে টানেন । উনি কোন পার্টির আলোচনায় থাকেন না । আমার তাই ওনাকেই পছন্দ । সমরেশদা কে বোঝা মুশকিল । উনি সব শোনেন কোন মন্তব্য দেন না। বলতে-গেলে আমরা তিনজন রাজনীতির প্রসঙ্গে আসি না । নিহারদা আর রণজিৎ দার মধ্যে কথা কাটা কাটি হলে পঞ্চুদা সামাল দেন। আমি ওই সময় চট করে দুটো রাউন্ড মেরে আসি পার্কের চারিদিকে। আজকে পঞ্চুদা আসেন নি । নিহারদা খবর দিলেন উনি এপোলোতে আই.সি.ইউ.তে । কাল নাকি স্ট্রোক হয়েছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বড় দেখতে যাওয়ার সাধ হল । এইতো গতকাল বিকেলে  কি সুন্দর ছিলেন । রাতে কি এমন হল ?  সকলকে বললাম চলুন না দেখে আসি পঞ্চুদাকে 

পরের দিন সকালে সবাই এপোলোতে হাজির হলাম । ভিজিটিং আওয়ার শেষ হতে আরও বেশ কিছু সময় বাকি । পাস নিয়ে ওপরে গিয়ে দেখি আই.সি.ইউ. থেকে ডেড বডি বেরুচ্ছে । সামনেই পঞ্চুদার ছেলে মেয়ে ! সকলে হতভম্ব । কারুর মুখ থেকে কিচ্ছু কথা বেরুলো-না । মেয়েটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে । পঞ্চুদার ছেলে নিথর । রণজিৎ দা , নিহার দা , সমরেশ দা সকলেই চোখ পুঁছছে ।  আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো । নিজেকে সামলাতে পারলাম না । রণজিৎ দাকে জড়িয়ে বললাম একি হোল ? রণজিৎ দা শুধু মাথায় হাত রাখলেন। উনিও চোখ পুঁছছেন রুমাল দিয়ে । নিহারদা সমরেশ দা নিথর । সব শেষ ! এইতো মানুষের জীবন !! এই নিয়ে এতো গর্ব ।  


দী প ঙ্ক র বে রা


কথার চাতুরী


মিরন দেখা হলেই মনের যা কথা হুড় হুড় করে বলে দেয় । বাজারে বিভাসের সঙ্গে দেখা । কি বাজার হচ্ছে কথার সাথে সাথেই বিভাস বলল  কি আর বাজার করব ? যা দাম , আর পেরে উঠছি না । আপনার আর চিন্তা কি ? মাস গেলেই ।
মিরনও ছাড়বার পাত্র নয়
  কিন্তু এই মাসে শেষে একবারই আসে । আপনার যে সব সময় তার বেলায় ।
 কিন্তু সে তো বড়ই সামান্য । এ ভাবে ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ছি ।
 মাঝে মাঝে যখন খুব হয় তখন । তাছাড়া মাসের ব্যবস্থা করাটা এই যুগে খুব কম কৃতিত্বের নয় । তাতে কম কষ্ট হয়েছে ,
বিভাস মাথা নাড়ছে দেখে মিরন কাঁধে হাত দিয়ে বলল
 জিনিসপত্রের দাম কিভাবে বাড়ছে বলুন । কোন কিছুতেই সামাল দিতে পারছি না ।
বিভাস কথা বলার সুযোগে বলল
  আগের সরকারের বেলায় হয়তো কিছুটা ।
মিরন ফোঁড়ন কাটল
  দেশ দশ এগিয়ে যাচ্ছে । সরকার যা সব লুটেপুটে খাওয়ার তালে ।
ব্যাস বিভাস কি বুঝল কে জানে আরো কিছু বলার আগে কেটে পড়ল । আর মিরন যা বলল তার সারমর্মে বিভাস ঠিক বুঝে নিল এন্টি ।
মিরন বাড়ি ফিরে সে কথাই বলতে মা বাবা তেড়ে এল
  সমঝে কথা বলতে পার না তো কথা বলিস কেন ?
যা বাবা মিরন ভাবল বন্ধুর সাথে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারব না ।
দিনের মধ্যে মিরন বুঝল কথাটা কত সত্যি ।


দে বা শি স কো না র


বাঁকা চাঁদ


অপু এক সময় চাঁদ খুব ভালোবাসতো । এখন আর বাসে না । চাঁদ সম্পর্কে একটা বাজে ধারণা তৈরি হয়েছে তার । কিভাবে যে এমন ধারণা হল, সেটাই ভাবছে সে । প্রথম আঘাতটা আসে তার প্রথম প্রেয়সী রূপসার কাছ থেকে । যে সে আঘাত নয় , একেবারে জুতো ছুড়ে মার । রূপসার ডাক নাম চাঁদনী । আদর করে অনেকেই তাকে চাঁদ বলে ডাকে । ডাকতেই পারে । তা বলে সে চাঁদকে নিয়ে গান গাইতে পারবে না ? চাঁদের সমস্ত পেটেন্ট কি রূপসা একা নিয়ে রেখেছে ? কি বলবে সে ? যাক,যা অতীত তা কি আর কোনোদিন ফিরবে ? অতীত বড় ব্যাথা দেয়। আসলে হয়েছিল কি,অপু রাস্তা দিয়ে সে সময়ের একটা জনপ্রিয় গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিল । মান্না দের গান। আপাত নিরীহ সেই গান গাওয়ার জন্য যে এমন ঘটনা ঘটবে , তা কে জানবে ? জানলে অপু কি আর গাইত ? আর ঠিক ওই সময়েই রূপসা টিউশানি পড়ে বাড়ি ফিরছিল । 'চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি ' -এই গানের জন্য জুতোপেটা খাওয়া - ভাবা যায় ! অপুর প্রথম প্রেমের সলিল সমাধি ঘটেছিল এই চাঁদের জন্য । এর পরেও অপু চাঁদ সম্পর্কে খুব একটা খারাপ চিন্তা - ভাবনা করে নি । কিন্তু ক্লাশে বাংলা স্যার একদিন পড়া ধরেছিল।জানতে চেয়েছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটির ব্যাখ্যা । নিজের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে বলেছিল অপু । সে বলেছিল চাঁদ নাকি প্রেমের প্রতীক ।প্রেমে আঘাত পেলে যখন কষ্ট হয়,তখন আকাশের চাঁদকে মনে হয় ঝলসানো রুটি । আরও অনেক কথা বলবে বলে ভেবেছিল অপু । কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাংলা স্যার তাকে চুলের মুঠি ধরে মারতে শুরু করেন । অপুদের আমলে টিচাররা যা খুশি তাই করতেন । এখন হলে ওই বাংলা স্যারের বারোটা বেজে যেত । এরপর যা ঘটেছিল তা আরও মারাত্মক । 

অপু তাই আর চাঁদকে পচ্ছন্দ করে না । জ্যোৎস্না সে সময়ে অপুর বান্ধবী । অপু একটা চাকরীও জুটিয়ে ফেলেছে। পার্কে এক রাতে সেই মান্না দের গান গাইছে অপু । পাশে জ্যোৎস্না । "ও চাঁদ সামলে রাখ জোছনাকে "। এই গান গাইবার পরদিন থেকে আর অপু তাকে কাছে পায় নি । লোক মুখে শুনেছিল ওর বাবার নাম নাকি চাঁদ ছিল । আর চাঁদের কন্যা জ্যোৎস্না । এরপর অপু আর কি করে চাঁদকে পচ্ছন্দ করবে

বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

বর্ষ ৪ সংখ্যা ৮।। ১২ইমার্চ ২০১৫


এই সংখ্যার লেখকসূচি - সুবীর কুমার রায়, শৌনক দত্ত, মুস্তাইন সুজাত, মুরাদুল ইসলাম, তাপসকিরণ রায়, কৃষ্ণা দাস, অপর্ণা গাঙ্গুলী ও দেবাশিস কোণার । 

                গল্পগুলি পড়ুন সূচিপত্রে ক্লিক করে

সুবীর কুমার রায়


অনিশ্চিত তিনটি রাত

(৩য় ও শেষ পর্ব)

সালটা ১৯৭৯, মাসটা আগষ্ট, আমি, দিলীপ আর মাধব হেমকুন্ড সাহেব, ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স, বদ্রীনারায়ণ, মানা গ্রাম, বসুধারা, ত্রিযুগীনারায়ণ, কেদারনাথ ঘুরে গঙ্গোত্রী যাওয়ার উদ্দেশ্যে উত্তরকাশী এসে পৌঁছলাম। মাধবের গায়ে বেশ জ্বর। তাকে ডাক্তার দেখিয়ে টুরিষ্ট লজে রেখে, বাসের টিকিট কাউন্টারে এসে জানা গেল যে গত বছর বণ্যার পর থেকে রাস্তায় ডিরেক্ট্ বাস বা স্থানীয় ভাষায়যাত্রাবাসবন্ধ হয়ে গেছে। ভুখি পর্যন্ত বাসে গিয়ে, তের কিলোমিটার হাঁটা পথ পার হয়ে ডাবরানী যেতে হবে। সেখান থেকে গঙ্গোত্রী যাওয়ার লঙ্কার বাস পাওয়া যাবে। কিন্তু সকালে ভুখি যাওয়ার বাসও না থাকায়, ভাটোয়ারী পর্যন্ত বাসে গিয়ে, ওখান থেকে ভুখি যেতে হবে।

উত্তরকাশীর টুরিষ্ট লজের ক্লোকরুমে তিনটে সুটকেস দুটো হোল্ড্-অল্ রেখে, তিনজনে তিনটে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ তিনটে ওয়াটার বটল্ নিয়ে, লাঠি হাতে রাস্তায় এলাম। যাব গঙ্গোত্রী। হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে, টিকিট কাউন্টারে গেলাম টিকিট কাটতে। ভাটোয়ারী পর্যন্ত তিনটে টিকিটের দাম নিল টাকা ত্রিশ পয়সা। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার মতো রাস্তা। একটু পরে বাস ছেড়ে দিল। আমাদের পাশে এক বাঙালী ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁর কাছে শুনলাম, একটু এগিয়ে এক বিরাট বাঁধের কাজ চলছে। গত বৎসর বাঁধের কাজ চলা কালীন বণ্যায় গঙ্গার জল ঢুকে, সমস্ত নষ্ট হয়ে যায়। তিনি ওখানে কনট্র্যাকটারী করেন। যাহোক্, একসময় বাস এসে ভাটোয়ারী পৌঁছলো। বাসের দুএকজন মাত্র যাত্রী ভুখি যেতে চায়। আমরা তিনজন নিজেদের গরজে বাস থেকে নেমে, বাসের অফিসে গিয়ে, ভুখি পর্যন্ত বাস নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করলাম। প্রথমে ওরা এই প্রস্তাবে কানই দিল না। পরে আরও কিছু প্যাসেঞ্জারের অনুরোধে, ওরা জানালো কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী হলে, বাস ভুখি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। ব্যাস, আর সময় নষ্ট না করে, লেগে পড়লাম প্যাসেঞ্জারের সন্ধানে। ভুখিগামী যে কোন লোককে দেখলেই আমরা তাকে ডেকে এনে, বাস এক্ষুণি ছাড়বে জানিয়ে বাসে বসতে বলছি। এইভাবে অনেক কষ্টে গোটা পনের লোক যোগাড় করা গেল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ভুখি যাবার জনা কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী যোগাড় ল। কিন্তু বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ কিন্তু দেখা গেল না। ফলে দুচারজন আগ্রহী যাত্রী আবার বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলো। যাহোক্, কর্তৃপক্ষের অশেষ কৃপা, শেষ পর্যন্ত এই রাস্তাটার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে এক টাকা করে ভাড়া নিয়ে, বাস ছাড়লো। অল্পই রাস্তা, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস এসে ভুখি পৌঁছলো।

আকাশটা আজ আবার বেশ মেঘে ঢেকে আছে, তবে এক্ষুণি বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এক যুবক আমাদের সাথে এই বাসেই এসেছে। সে নিজেই আমাদের সাথে আলাপ করলো। লক্ষ্ণৌতে বাড়ি, যাবে গরমকুন্ডে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম গরমকুন্ডটা কোথায়? সে জানালো, “গাংগানীনামক জায়গাটার গঙ্গার অপর পারটার নাম গরমকুন্ড। যুবকটি খুব সুন্দর কথাবার্তা বলে, দেখতেও বেশ সুন্দর। হাতে একটা ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে, আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে, একসাথে হেঁটে চলেছে। আমরা কিছু কলা আপেল নিয়ে এসেছিলাম রাস্তায় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে। খিদেও বেশ ভালই পেয়েছে। ভাবলাম কোথাও বসে সেগুলো খাওয়া যাবে। যুবকটি জানালো, সে গরমকুন্ডে ওয়্যারলেসে কাজ করে। হাওড়া শিবপুরে রেমিংটন ব্যান্ডে, তার বাবা কাজ করতো। ফলে সে নিজেও হাওড়া কলকাতা ঘুরে এসেছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, সে মিলিটারিতে কাজ করে কী না। সে জানালো, যে ওটা মিলিটারির আন্ডারে পড়ে না। ওদের কাজ গঙ্গার জল হ্রাসবৃদ্ধির খবর, ওয়্যারলেসে উত্তরকাশীকে জানানো, এলাকার ওপর লক্ষ্য রাখা। তাছাড়া রাস্তা মেরামতীর জন্য পাহাড় ব্লাষ্টিং করলেও উত্তরকাশীকে খবর পাঠানো, যাতে সময়ে কোন যাত্রীকে আসতে দেওয়া না হয়। আরও হয়তো কিছু কাজকর্ম আছে, বিশদভাবে জানতে চাইলাম না। যুবকটি সামনে একটা দোকানে আমাদের নিয়ে চা খেতে ঢুকলো। খুব হাল্কা এক পশলা বৃষ্টি শুরু , সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া। চা খাওয়া হলে দাম দিতে গেলে, যুবকটি বাধা দিয়ে বললোতাই কখনও হয়? আমাদের জায়গায় এসে আপনারা দাম দেবেন কী? আপনাদের ওখানে গেলে, তখন আপনারা দাম দেবেন বললাম, এটাও তো আপনার এলাকা নয়, লক্ষ্ণৌ গেলে আপনি দাম দেবেন। যুবকটি বললো, “ওখানে গেলে আমার খরচায় সমস্ত লক্ষ্ণৌ শহর ঘুরে দেখাবো বললাম, “আপনাদের লক্ষ্ণৌ শহর আমার দেখা, খুব ভাল জায়গা বৃষ্টি আর পড়ছে না, আমরা উঠে পড়ে দোকান থেকে রাস্তায় নামলাম।
বাস থেকে নেমে যুবকটির সঙ্গে এতক্ষণ আমরা কিন্তু বাস রাস্তা ধরেই হেঁটে আসছি। এদিকে বাস কেন যে আসেনা, বুঝলাম না। আরও কিছুটা পথ হাঁটার পর কারণটা বোঝা গেল। শুধু বোঝা গেল তাই নয়, সঙ্গে গঙ্গোত্রী যাত্রার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের মনে সংশয় দেখা দিল। রাস্তা একেবারেই নেই। কোন কালে ছিল বলেও বোঝার উপায় নেই। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরীর কাজ চলছে। বড় বড় শাবলের মতো লোহার রড দিয়ে ড্রিল করে পাহাড়ের গায়ে গর্ত করা হচ্ছে। পরে ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ভেঙ্গে, রাস্তা তৈরী হবে। তখন লোক চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবড়ো-খেবড়ো ভাঙ্গা পাথরের ওপর দিয়ে অনেকটা পথ পার হয়ে যেতে ল। পাশেই গভীর খাদ। অনেক নীচ দিয়ে গঙ্গা আপন মনে বয়ে চলেছ। সেই গঙ্গা, যার উৎস দেখতেই আমাদের এত কষ্ট করে যাওয়া। খুব সাবধানে এই পথটুকু পার হয়ে এলাম। একটু পা হড়কালেই গঙ্গা মাইকী জয় হয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। জায়গাটায় রাস্তা বলে কিছু নেই। কখনও নীচুতে নেমে, কখনও বা বড় পাথর টপকে একটু ওপরে উঠে, এগিয়ে যেতে হয়।

বেশ কিছুটা পথ এইভাবে পার হয়ে, আবার বাস রাস্তায় পড়লাম। গল্প করতে করতে জোর কদমে এগিয়ে চলেছি। বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হল। সঙ্গে ওয়াটার প্রুফ আছে বটে, কিন্তু যুবকটি ভিজে ভিজে আমাদের সাথে যাবে, আর আমরা বর্ষাতি গায়ে দিয়ে তার সাথে যাব? তাই আমরাও ভিজে ভিজেই তার সাথে পথ চলছি। কোথাও যে একটু দাঁড়াবো, তারও উপায় নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজার থেকে, ভিজে ভিজে হাঁটাই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের জন্য যতটা না চিন্তা, তার থেকে অনেক বেশী চিন্তা মাধবকে নিয়ে। যুবকটি জানালো, আমরা প্রায় গাংগানী এসে গেছি, আর সামান্যই পথ। একটু এগিয়েই একটা ঝোলা পোর্টেবল্ ব্রীজ পার হয়ে, গঙ্গার অপর পারে এলাম। পরপর দুটো চায়ের দোকানের একটার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যুবকটি আমাদের একটা পাকা বড় ঘরে ছেড়ে দিয়ে বললো, “এখানে রাতটা কাটাতে পারেন। আজ আর এগবেন না, কারণ এখান থেকে আগেকার পাকা বাস রাস্তা আর নেই। বাস রাস্তা ছিল গঙ্গার অপর পার দিয়ে, যেদিক দিয়ে আমরা এতক্ষণ হেঁটে আসলাম। এই ব্রীজের ঠিক পরেই আগেকার বাস রাস্তাটা গঙ্গার সাথে মিশে গেছে যুবকটি জানালো, গত বছর বণ্যার পর পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে, এই ব্রীজটা তৈরী করা হয়েছে। গঙ্গার এপার থেকে ডাবরানী পর্যন্ত নতুন পায়ে হাঁটার পথ তৈরী করা হয়েছে। এটা একবারেই স্থানীয় লোকেদের প্রয়োজন মেটাতে, তাদের উপযুক্ত হাঁটাপথ তৈরী করা হয়েছে। এখন গঙ্গোত্রী যাবার যাত্রী নেই। তাছাড়া রাতে রাস্তায় ভাল্লুকের উৎপাত আছে। কাজেই আমাদের আজ আর এগিয়ে না গিয়ে, এখানে থেকে যাওয়াই ঠিক হবে। সামনেই একটা পাকা বাড়ি দেখিয়ে যুবকটি জানালো যে, ওটাই তাদের অফিস, এবং ওখানেই মেস্ করে তারা কয়েকজন থাকে। যুবকটি তার নিজের আস্তানায় এগিয়ে গেল।

আমাদের সর্বাঙ্গ বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। যুবকটির দেখানো বড় ঘরটায় রাত্রিবাস করার সিদ্ধান্ত পাকা করে, ঘরে ঢুকে নিজেদের সব জামাপ্যান্ট খুলে, দরজা, জানালা মাটিতে মেলে শুকতে দিয়ে, জাঙ্গিয়া পরে বসে রইলাম। যদিও বুঝতে পারছি শুকনো হবার কোন সম্ভাবনাই নেই, তবু যদি কিছুটা শুকনো হয় এই আশায়, ওগুলো মেলে দিলাম। এতক্ষণে কলা, আপেলগুলো যথাস্থানে স্থান পেল। খিদেটা অনেকটাই কমে গেল। ঘরটার সামনেই একটা বড় চৌবাচ্চা মতো। তার জল কিন্তু গরম। চারপাশ দিয়ে অল্প অল্প ধোঁয়াও উঠছে। ডানপাশে, উপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে একটা ঝরণার ধারা নেমে এসেছে। পরে শুনলাম ঝরণার জল গরম, এবং জলই অঞ্চলে সর্বত্র ব্যবহার করা হয়। আমাদের ঘরটার ভিতরে একপাশে মুখোমুখি দুটো করে, মোট চারটে বাথরুম বা পায়খানা, কিছু একটা হবে। চারটের দরজাই তালা দেওয়া। কার কাছে চাবি থাকে জানিনা, তবে ওগুলোর দেওয়াল ছাদ থেকে বেশ খানিকটা নীচে শেষ হয়েছে। বন্ধুদের বললাম, প্রয়োজনে দেওয়াল টপকে ভিতরে নেমে ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু সবার আগে রাতের খাবারের একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মাধবকে বসিয়ে রেখে, জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় গায়ে ওয়াটার প্রুফ চাপিয়ে দোকান দুটোর কাছে গেলাম। নীচের দোকানটা জানালো, চা ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। ওপরের দোকানটায় দেখলাম কয়েকজন বসে চা খাচ্ছে। একপাশে পাঁচটা খাটিয়া পাতা। কিছু পাওয়া যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, দোকানদার জানালেন চা পাওয়া যাবে। এই দোকানের একমাত্র খাদ্যবস্তু চা আর বিড়ি। দেশলাই পর্যন্ত নেই। আমরা জানালাম, রাতে আমরা এখানে থাকবো, আমাদের খাবার কিছু ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বৃদ্ধ দোকানদারকে লালাজী বলে সম্বোধন করায়, তিনি খুব খুশী হলেন। দোকানের বাইরে ডানপাশে, একটা নল থেকে ঝরণার গরম জল একভাবে পড়ে যাচ্ছে। তার পাশে কিছু ছোট ছোট শুকনো আলু পড়ে আছে, হয়তো বা রাখা হয়েছে। দেখে মনে পচে গেছে, তাই দোকানের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেল প্রত্যেকটা আলুর গা থেকে শিকড়ের মতো কল্ বার হয়েছে। এতক্ষণে লালাজী জানালেন যে, আমরা যেখানে উঠেছি, সেটা আসলে মহিলাদের গরমকুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়ার জায়গা। ওখানে রাত্রে থাকতে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে পুরুষদের তো নয়ই। দিলীপ আর আমি পাশাপাশি বসে। হাতে এই দোকনের একমাত্র খাদ্য, চায়ের কাপ। শোচনীয় অবস্থা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বৃষ্টি পড়ছে, দারূণ শীত, চারপাশে কালো হিমালয় ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না, অনেক নীচু থেকে গঙ্গার বীভৎস আওয়াজ এক নাগাড়ে কানে বাজছে, এই অবস্থায় এখনও আমরা জানি না, রাত্রে কোথায় থাকবো, কী খাবো। এখানে কাছেপিঠে কোন মানুষ বাস করেনা, থাকা বা খাওয়ার কোন ব্যবস্থাও নেই, এখানে কোন্ মহিলা পাহাড় ভেঙ্গে রাতে কুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়তে আসবে ভগবান জানেন। অপরদিকে একটা খাটিয়ায়, একজন পায়জামা সার্ট পরা লোক বসে আছেন। তাঁর দৃষ্টিটা কিরকম যেন সন্দেহজনক। দিলীপকে সাবধান করে দেবার জন্য বললাম, লোকটার চাউনি মোটেই সুবিধার নয়, রাতে সতর্ক থাকতে হবে। দিলীপও আমার কথায় সায় দিল। সঙ্গে এত টাকা, মাধবের আমার মানি ব্যাগে বেশ কিছু টাকা আছে। আর বেশীরভাগ টাকাই অবশ্য রাখা আছে খালি একটা বিস্কুটের প্যাকেটে। এমন জায়গায় এসে হাজির হয়েছি যে, চিৎকার করে আমাদের সতর্ক করে, ঢাক ঢোল পিটিয়ে আমাদের খুন করে ফেললেও, কারো জানার উপায় নেই। মাঝেমাঝে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি লোকটা একভাবে আমাদের লক্ষ্য করছেন। আমরা যে ফাঁদে পড়েছি, তিনি বুঝে গেছেন। লালাজী বললেন, ভাত, ডাল সবজী পাওয়া যাবে। আমরা বললাম, ভাত না করে চাপাটি বানানো যায় না? লালাজী বললেন, বাঙালী আদমি রুটি খাবে? আমরা জানালাম যে রুটিই আমরা ভালবাসি। তিনি জানালেন যে তিনি রুটি তৈরী করে দেবেন। একটা সমস্যা মিটলো, অন্তত খালিপেটে লোকটার হাতে মরতে হবে না। আমরা বললাম রাতে তিনটে খাটিয়া চাই, সঙ্গে লেপ্ কম্বল। সামনের ঘরে আমাদের এক বন্ধু আছে, সে অসুস্থ। খাটিয়া লেপ ঘরে নিয়ে যাব। লালাজী জানালেন, সব কিছুই মিলবে, তবে ওখানে রাতে থাকতে দেওয়া হয় না, কাজেই দোকানেই থাকতে হবে। আসলে ঘরটায় থাকতে চাওয়ার একটাই উদ্দেশ্য, ঘরটায় দরজা আছে, এবং সেটা ভিতর থেকে বন্ধ করা যায়। আর এই দোকানটা একটা অতি সাধারণ চায়ের দোকান। সামনে তিনটে বাঁশের খুঁটি। সামনে ডানপাশটা পুরো খোলা। পিছন বাঁপাশটা খড়ের মাটির দেওয়াল মতো। খড়ের চাল। সঙ্গে এত টাকা পয়সা নিয়ে এখানে থাকা বেশ বিপজ্জনক বলেই মনে হয়। দিলীপ বললো মাধবের সাথে পরামর্শ করে, পরে এখানে আসা যাবে। আমি কিন্তু তাতে রাজী হলাম না। পাঁচটাই মাত্র খাটিয়া আছে। তার মধ্যে একটা নিশ্চই লালাজীর। বাকী রইলো চারটে। আমরা তিনজন আছি। এরমধ্যে কেউ এসে হাজির লে, জায়গা পাওয়া যাবে না। তখন সারারাত বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে রাস্তায় বসে কাটাতে হবে।

আগে এসে  খাটিয়া  দখল  করে, পরে  অন্য চিন্তা  করা যাবে। ঘরে ফিরে এসে দলা করে সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে, দোকানে ফিরে চললাম। মাধবকে সন্দেহজনক লোকটার সম্বন্ধে সংক্ষেপে সব বললাম। দোকানে এসে তিনজনে তিনটে খাটিয়ায় সরাসরি উঠে বসে, লেপ-তোষক দিতে বললাম। পরপর তিনটে খাটিয়ায় আমরা তিনজন। আমার আর দিলীপের খাটিয়া দুটোর মাথার দিকে, আর দুটো খাটিয়া। স্থানাভাবে সবগুলো খাটিয়াই প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো। লালাজী জানালেন, একটু পরেই লেপ তোষক বার করে দেবেন। বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে। আমরা যে যার খাটিয়ায় চুপ করে বসে আছি। সন্দেহজনক লোকটা কিন্তু এখনও বসে আছেন, আর মাঝেমাঝেই আমাদের লক্ষ্য করছেন। ভুখি থেকে একসাথে যে যুবকটির সঙ্গে এতটা পথ হেঁটে আসলাম, তার থাকার ঘরটা যদিও এক মিনিটের পথ, তবু সে আর একবারও দেখা করতে এল না। ভেবে খুব আশ্চর্য লাগলো যে, যে লোকটা এতটা পথ একসঙ্গে এল, চায়ের দাম পর্যন্ত দিতে দিল না, সে আমাদের এই বিপদের সময়, একবারও দেখা করতেও এল না?
এতক্ষণে সন্দেহজনক লোকটা উঠে চলে গেলেন। আমরাও নিশ্চিন্ত হয়ে যে যার খাটিয়ায় শুয়ে, গল্পগুজব করতে লাগলাম। লালাজী জানালেন, খাটিয়া আর লেপ তোষকের ভাড়া, মাথাপিছু চার টাকা পঞ্চাশ পয়সা করে দিতে হবে। আজ রাতে আমরা যে জায়গায়, যে অবস্থায় এসে হাজির হয়েছি, তাতে চল্লিশ টাকা বললেও দিতে হবে। আকাশ একবারে পরিস্কার হয়ে, অসংখ্য তারা ফুটে গেছে। ঘরের খড়ের ছাদ দিয়েই নানা জায়গায় আকাশ দেখা যাচ্ছে। ভাল করে খুঁজলে হয়তো কালপুরুষ, সপ্তর্ষি মন্ডল- দেখা যেতে পারে। ভয় , রাতে জোরে বৃষ্টি আসলে আমাদের কী অবস্থা হবে ভেবে। হাতে কোন কাজ নেই, সময় আর কাটে না। এক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে, তিনজনে শেষ করতে বসলাম। কী করবো, কিছু একটা তো করা চাই। লালাজী একটা থালায়, লাল, সবুজ, হলদে, কালো, নানা রঙের মেশানো ডাল নিয়ে একবার করে ফুঁ দিচ্ছেন, আর দোকান ঘরে একরাশ ধুলো উড়ে যাচ্ছে। এর থেকেও অনেক খারাপ খাবার খাওয়ার অভ্যাস আমাদের হয়ে গেছে। তাছাড়া খিদেও পেয়েছে যথেষ্ট। তাই খাবার তৈরীর আশায় বসে রইলাম। সব শান্তির অবসান ঘটিয়ে, সেই সন্দেহজনক মক্কেল, আবার এসে হাজির হলেন। দিলীপ বললো ওর সাথে কথা বলে দেখলে হয়। আমরা বললাম, যেচে ওর সাথে আলাপ করার দরকার নেই। কিন্তু লোকটাকে দেখে মনে , সে আমাদের সাথে কথা বলতেই চায়। তাই আমরাই প্রথম জিজ্ঞাসা করলামতিনি কোথায় থাকেন, কী করেন ইত্যাদি। লোকটা এবার এগিয়ে এসে আমাদের সামনে একটা খাটিয়ায় বসলেন। তাঁর কাছে জানতে পারলাম যে, তিনি এখানে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। বাড়ি মিরাটে। বছরে দুএকবার এর বেশী বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না। এখানে ওয়্যারলেস কর্মীদের সাথে একই মেসে থাকেন। শীতকালে এখানকার অনেকেই বাড়ি চলে যায়। তখন এখানে তিনি প্রায় একাই থাকেন। একা একা তাঁর একদম ভাল লাগে না। কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, লোকটি ভাল। একা একা থেকে, কথা বলার অভ্যাস কমে গেছে, সুযোগও নেই। আমাদের সাথে তিনি কথা বলতেই চাইছিলেন, তবে নিজে থেকে আগে কথা বলা ঠিক হবে কী না ভেবে, এতক্ষণ কোন কথা বলেন নি। ওঁর কাছ থেকে গত বছরের বণ্যার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম।

গত বছর পাঁচই আগষ্ট রাত্রিবেলা, এই গাংগানীর কিছুটা আগে ডাবরানীর দিকে পাহাড়ের একটা চুড়া গঙ্গার ওপর ভেঙ্গে পড়ে। ওখানকার গঙ্গা খুব সরু, ফলে গঙ্গার জল চলাচল একবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে ওরা দেখে গাংগানীতে গঙ্গা একবারে শুকিয়ে গেছে। দুএকটা ঝরণার জল, গঙ্গার যেটুকু জল লিক্ করে আসতে পারে, সেই জলই সামান্য ধারায় বয়ে যাচ্ছে। দিন, অর্থাৎ ছয় তারিখে প্রায় বিকেল নাগাদ, গঙ্গার জমে থাকা বিপুল জলের চাপে, ভেঙ্গে পড়া পাথরের একটা অংশ ঠেলে ভেঙ্গে ফেলে, প্রবল বেগে জল নীচের দিকে, অর্থাৎ গাংগানী, ভুখি, বা উত্তরকাশীর দিকে ধেয়ে আসে। বর্ষাকালের প্রায় বার-চোদ্দ ঘন্টার জমে থাকা জলের স্রোত, হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভীষণ আকার ধারণ করে সমস্ত শহর ভেঙ্গে, গুঁড়িয়ে দিয়ে বয়ে চলে যায়। এই গাংগানীতে, যেখানে আমরা এখন বসে আছি, তার অপর পারে দুটো গেষ্ট হাউস, একটা আয়ুর্বেদিক কলেজ, একটা ইন্টার হাইস্কুল, কালীকম্বলীর ধর্মশালা বেশ কয়েকটা হোটেল ছিল। এক কথায় ওটা একটা বেশ বড় পাহাড়ী শহর ছিল। এখন এই মুহুর্তে আমরা যে জায়গাটায় আছি, তার নাম গরমকুন্ড। গঙ্গার অপর পারটার নাম গাংগানী। দিকটায় খাড়া পাহাড়, অপর দিকে প্রায় গঙ্গার লেভেলেই ছিল গাংগানী শহর, বাস রাস্তা। ফলে গঙ্গার জল বিশাল পাথর ঠেলে যেতে না পেরে, ডানদিকে বেঁকে গাংগানীর ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে, সমস্ত শহরটাকে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। আসবার সময় এত ঘটনা আমরা জানতাম না। তবে আমাদের বাড়ির কাছে এক ভদ্রলোক গঙ্গোত্রী যেতে না পেরে ফিরে এসেছিলেন, তাঁর কাছে এর অনেকটাই শুনে, আমরা ইউ. পি. টুরিজম্ অফিসে জিজ্ঞাসা করে হাসির খোরাক হয়েছিলাম। দোষটা তাদের নয়, তারা খবর জানতো না বা জানবার চেষ্টাও করে নি। আসবার সময় দেখেছিলাম, একটা ছোট মন্দির একটা ভাঙ্গা বাড়ির দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই ওদিকে নেই। ভদ্রলোক জানালেন, পাঁচজন টুরিষ্ট মারা যায়, তারা সবাই বাঙালী। স্থানীয় লোকেরা বিপদের আশঙ্কা করে আগেই বাড়িঘর, জিনিসপত্র ফেলে, ওপর দিকে পালিয়ে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে রক্ষা পায়। যাহোক্, ভদ্রলোক এবার মেসে ফেরার জন্য উঠলেন। আমরা ডাবরানী আর কতটা রাস্তা, রাস্তায় দোকান পাব কী না, ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করায়, ভদ্রলোক জানালেন ভুখি থেকে এই গাংগানী পাঁচ কিলোমিটার পথ। আবার এখান থেকে ডাবরানী আট কিলোমিটার পথ। পথে কোন দোকান পাওয়া যাবে না। রাস্তাও খুবই কষ্টকর। এবার ভদ্রলোক বাসায় ফিরে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, কোন ভয় নেই। আপনারা ঠিক ভালভাবে পৌঁছে যাবেন, আমার শুভেচ্ছা রইলো। ফিরবার পথে অবশ্যই দেখা হবে।

এদিকে লালাজীর রান্নাও শেষ। পাশের কাপড় ছাড়ার ঘরটা থেকে, চেঁচামিচির আওয়াজ আসছে। শুনলাম একদল পুরুষ মহিলা ওখানে এসে উঠেছে। আগেভাগে এখানে এসে জায়গা নিয়েছি বলে, নিজেদেরকে এখন ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। আমরা খাবার খেতে উঠতেই, লালাজী বললেন, ওখানে বসেই প্রেমসে খানা খাও। ডাল, ছোট ছোট আলুর তরকারী, যার অধিকাংশ আলুই শক্ত এবং পচা, আর একপিঠ পোড়া অপর পিঠ কাঁচা এক উপাদেয় রুটি। আলুর তরকারীতে একটু করে মাখন দিয়ে নিয়ে, মৌজ করে খাওয়া শুরু করলাম। এরকম একটা জায়গায় এই পরিবেশে বিনা পরিশ্রমে খাটিয়ায় বসে এই খাবার পেয়ে, লালাজীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আর সত্যি কথা বলতে, কী ভালই যে লাগলো, মনে অমৃত খাচ্ছি। জানিনা একেইখিদে পেলে বাঘে ধান খায়বলে কী না। অসুস্থ মাধব তিনটে রুটি মেরে দিল। এখানকার মতো বড় বড় রুটি না হলেও, আমি বোধহয় খান ছয়-সাত উদরস্থ করে ফেললাম। আমরা দোকানের বাইরে একটু দাঁড়িয়ে, আকাশে অসংখ্য তারার মেলা নীচে গঙ্গার গর্জন, উপভোগ করে, খাটিয়ায় ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম। এর কাছে দিল্লীর লালকেল্লারলাইট অ্যান্ড্ সাউন্ড্তুচ্ছ মনে ল। আকাশে একসাথে এত তারা আগে কখনও কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না। চারপাশে যে কী অন্ধকার বলে বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছে দরজা জানালা হীন একটা ঘরে, অমাবস্যার রাতে, আলো না জ্বেলে, আমরা শুয়ে আছি। মাধবের মানিব্যাগ, আমার মানিব্যাগ বিস্কুটের প্যাকেটটা আমার পিঠের তলায়, তোষকের ওপর রেখে, লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। উচু হয়ে থাকায় শুতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। লেপ-তোষকের সাদা রঙ বোধহয় বাইরের অন্ধকারের কালো রঙকেও হার মানাবে। তেমনি তার সুগন্ধ। ঘুম আসছে না। একটু পরেই নতুন বিপদ এসে হাজির ল। অসংখ্য ছাড়পোকার মতো এক রকম পোকা, সর্বাঙ্গ জ্বালিয়ে দিল। লালাজী আশ্বাস দিয়ে জানালেন, কিছু না, পিসু আছে। তাঁর বলার ধরণ দেখে মনে বাস্তু সাপের মতো, এগুলো বাস্তু পিসু। এগুলোকে একপ্রকার রক্তচোষা উকুন বলা যায়। হাওড়া-কলকাতায় জাতীয় এক প্রকার ছোট্ট, অতি পাতলা পোকাকে, চামউকুন বলতে শুনেছি। এরা লোমকূপে আটকে থেকে রক্ত চুষে খায়। নখ দিয়ে খুঁটেও এদের লোমকূপ থেকে তুলে ফেলা যায় না। লালাজীর মুখে পিসুর কথা শুনে মনে হচ্ছে পাহাড়ী চামউকুনের খপ্পরে পড়েছি। রাতদুপুরে খাটিয়ায় উঠে বসে খস্ খস্ করে সারা শরীর চুলকাতে শুরু করলাম। এর আবার আর একটা অন্য যন্ত্রনাও আছে। গলা, কান, মুখ বা দেহের অন্য কোন অংশের চামড়ার ওপর দিয়ে এরা হেঁটে যাবার সময় একটা অস্বস্তি হয়। হাতের তেলো দিয়ে ঘষে ফেলে দেবার চেষ্টা করলে, এরা হাঁটা বন্ধ করে দেয়। মনে হবে শরীর থেকে পড়ে গেছে বা মরে গেছে। কিন্তু একটু পরেই আবার সেই পুরানো জায়গা থেকেই শরীর ভ্রমন শুরু করে। আমরা যেমন মাংস কেনার সময়, নিজের নিজের পছন্দ মতো খাসীর শরীরের অংশ দিতে বলি, মনে হয় এরাও বোধহয় নিজেদের পছন্দের লোমকূপ খুঁজতে মানুষের শরীরে হেঁটে বেড়ায়। মাধব দিলীপ ঘুমিয়ে পড়েছে। হতভাগ্য আমি একা জেগে বসে গা, হাত, পা চুলকে যাচ্ছি। বন্ধুদের দেখে মনে হচ্ছে, ওরা মহানন্দে ঘুমচ্ছে। মনে হয় পিসুদের আমায় বেশী পছন্দ হয়েছে। এইভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, হঠাৎ মনে আমার মাথাটা কে যেন কিছু দিয়ে খুব জোরে ঘষে দিল। ধরমর্ করে উঠে বসে দেখি, আমার মাথার কাছের খাটিয়াটায় কখন একজন এসে রাতের আশ্রয় নিয়েছে। তার মাথাটা আমার মাথার সাথে ঘুমের ঘোরে ভাবে ঘষে গেছে। ঘুম মাথায় উঠলো। নতুন করে আবার গা চুলকাবার পালা শুরু ল। লোকটাকে মনে মনে অভিশাপ দিয়ে ঘুমবার চেষ্টা করলাম। ঘরের ছাদের ফাঁক দিয়ে একটা জ্বলজ্বলে তারাকে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি। ওটা শুকতারা না মঙ্গল গ্রহ ভাবতে বসলাম। মাধব দিলীপ নোংরা লেপই মাথা পর্যন্ত ঢাকা দিয়ে দিব্যি ঘুমচ্ছে। আমার পেটটা আবার কেমন ব্যথা ব্যথা করতে শুরু করলো। একবার বাইরে যেতে পারলে ত। আসবার সময় জায়গাটা ভালভাবে দেখবার সুযোগ হয় নি। টর্চ সঙ্গে থাকলেও, অন্ধকারে একা একা কোথায় যাব ভেবে পেলাম না। একবার ভাবলাম মাধবকে ডাকি, তারপর ওকে আর বিরক্ত না করে চুপচাপ শুয়ে থাকলাম।

ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, এক কাপ চা পর্যন্ত না খেয়ে, লালাজীকে থাকা খাওয়া বাবদ তেইশ টাকা পঞ্চান্ন পয়সা মিটিয়ে দিয়ে, ব্যাগ নিয়ে তৈরী হয়ে, গঙ্গোত্রীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।

জীবনে বহু ক্ষেত্রে পদে পদে প্রথম দর্শনে বহু মানুষকে দেখে সন্দেহ করে, ভয় পেয়ে, সাবধানতা অবলম্বন করে, বার বার ঠোক্কর খেয়ে, বিবেক দংশনে জর্জরিত হয়ে, এটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি যে, পহেলি দর্শনধারি পিছে গুণবিচারি শুধুই কথার কথা। এর থেকে সেই ছেলেবেলায় পড়া–- “দেখিতে আপেল আর খাইতে মাকাল, সে ফল পাড়িতে যাওয়া শুধুই নাকালবোধহয় অনেক বড় সত্য। অসুন্দর হলেও, এইসব মানুষেরা এখনও আছেন বলেই বোধহয়, মাকালে ছেয়ে যাওয়া সমাজে আমরা এখনও টিকে আছি, ভালো আছি, নিরাপদে আছি।