এই সংখ্যায় ৪টি গল্প লিখেছেন মৌ দাশগুপ্তা , অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী, দেবাশীষ দে এবং ত্রিভুবন মুখার্জী
গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।
সোমবার, ৪ মার্চ, ২০১৩
৪৬তম সংখ্যা ৫ই মার্চ ২০১৩
এই সংখ্যায় ৪টি গল্প লিখেছেন মৌ দাশগুপ্তা , অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী, দেবাশীষ দে এবং ত্রিভুবন মুখার্জী
মৌ দা শ গু প্তা
আশিয়া
এক
আশিয়ার আজ আর কিছুতেই ঘুম আসছে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ- পাতাল
ভাবছে। দূরে কোথাও বিয়েবাড়ীর সানাই বাজছে, মাঝে মধ্যে অনতিদূরের পাকা
রাস্তা থেকে চলন্ত গাড়ীর আওয়াজ মুহর্তের জন্য রাতের নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে ফেলে
পরক্ষনেই ডুবে যাচ্ছে আদিম নিশার স্তব্ধ গভীরে। বিছানা থেকে উঠে মেয়েটা আলগোছে
জানালা খুলে দেয়। তার ভয় হয়;- হয়ত পাশে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত
মানুষটা জেগে যাবে। এটা কোন মাস; আজ কত তারিখ কিছুই-আশিয়া
মনে করতে পারেনা।হাসপাতালে কতগুলো দিন যে কাটিয়ে এল, তারপর আবার ক’দিনের জন্য মানসিক হাসপাতাল, সে স্মৃতি সত্যিই মনে পড়েনা
আর।ক’টা দিন,ক’টা মাস,বোধহয় বছরও তার এই বাইশ বছরের জীবন কাহিনীর পাতা থেকে
যেন বেমালুম উবে গেছে । দুত্তোরী! ভাদ্র- আশ্বিনে কী আসে যায়!
আশিয়ার অলস নিদ্রাহীন মনটা বিরক্তিতে ভরে ওঠে। কটা রাতচরা পাখী
নাকি বাদুড় বুঝি মাথার দিকের বন্ধ জানলটার গা ঘেঁষা কামরাঙ্গা গাছের এক ডাল থেকে
আরেক ডালে উড়াউড়ি করছে। কেমন অদ্ভুত জীবন ওদের! আশিয়া ভাবে- সে যদি মেয়েমানুষ না
হয়ে ওদের মত হতো।পেটটা মোচড় দিয়ে উঠে।একটা শক্ত কিছু পেটের ভেতর খোঁচা মেরে থেকে
থেকে ব্যাথা দিয়ে জানান দেয়।আশিয়া কষ্টে-সৃষ্টে জানালার সামনে বসে পড়ে। সে যদি
ওদের মত হতো- অন্ততপক্ষে এই কষ্ট ভোগ করতে হতো না। ওর মন খারাপ লাগে। গলা ছেড়ে
কাঁদতে ইচ্ছা করে;-
কিন্তু কান্না আসে না।
দুই
অগ্রহায়নে ধান ওঠার পর পরই বাবু মুদীর বড়মেয়েটার বিয়ে হওয়ার কথা।
অষ্টাদশী অনাঘ্রাতা মেয়েটি বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই গত কয়েকমাসে কত রকম স্বপ্নই না
দেখেছে। ঠিক করে রেখেছে,
জোছনা রাতে না দেখা তার বরটিকে
নিয়ে চুপিচুপি খোলামাঠে বসে সারারাত জোছনা দেখবে। কানেকানে গান শোনাবে, সূয্যি ওঠারও আগের নরম ভোরে শিশির ভেজা আলপথ বেয়ে হেঁটে যাবে হাতে
হাত রেখে, এমন কি একটা দুষ্টুমিষ্টি গালফোলা পুঁচকিরও স্বপ্ন
দেখেছে।অথচ বিয়ের পর থেকেই সব স্বপ্ন উধাও। একে তো পণ নিয়ে ঝামেলা, তার ওপর নতুন বৌ ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে ভাসুরের একমাত্র ছেলে মারা গেল
সাপের কামড়ে।দ্বিরাগমনে এসে সেই যে জামাই রেখে গেল আর ওবাড়ীর কেউ এমুখোও হয়না।
বলেই দিয়েছে বাকী পণের দাবি মিটালেও ও অপয়া বউ আর ঘরে নেবে না। স্বামী নিয়ে কোন
আফশোস নেই মেয়েটার।যদিও কানাঘুষোয় মেয়েমানুষজনিত অনেক নোংরা উল্টোপাল্টা গল্প কানে
এসেছে আশিয়ার, কিন্তু মানুষটাকে সামনে থেকে দেখে তা বিন্দুমাত্র বোঝা
যায়নি। বরঞ্চ সত্যি বলতে কি, মানুষটা ভালো ছিলো।দিনে
বাড়ীর বড়দের কথার ঝালে ধারেকাছে না থাকলেও রাতভর আদরের কমতি ছিল না। সে আদরে
ব্যাথার ভাগ বেশী হলেও সে ব্যাথাটাও বড় সুখের ছিলো।সে আদরের স্মৃতিটুকুই ছিল
আশিয়ার সম্বল।
তিন
সকালটা অনেকদিন পর আজ একটু অন্যভাবে শুরু হয়েছে মেয়েটার। এমন নয়
যে আজ কোন পালাপার্বন আছে কি উৎসবের দিন, ঘুম থেকে উঠে সে আগে
পাতকূয়োর জলে সাবান মেখে স্নান করেছে, নতুন শাড়িকাপড় পরেছে, আজ তার বর আসছে । নিন্দুকেরা বলছে ওদের এলকায় কোন মেয়েকে নিয়ে নাকি
স্ফূর্তি করতে গিয়ে ফেঁসে গেছে।মেয়ের বাপ দাদা এক রাজনৈতিক নেতার ধামাধরা পোষা
গুন্ডা। তাদের হাত থেকে বাঁচাতে প্রথমে ছেলের বিয়ে দিয়েছিল,তারপরে তালেগোলে হরিবোলে বউকে বাপের বাড়ী ছেড়ে আসায় ছেলে আরও
পুরানো কেচ্ছায় বেশী করে জড়িয়ে পড়ে।অবস্থা বেগতিক দেখে ছেলেকে অপাংক্তেয় সেই
শ্বশুরবাড়ীতেই লুকিয়ে রাখার ব্যাবস্থা হয়েছে। আনন্দে মাটিতে আর পা পড়েনা মেয়ের।
আবার সেই মানুষটা,সেই ব্যাথাভরা রাতের আদর,সেই সুখের অনুভূতি।
আসার পর থেকে কেমন যেন মনমরা হয়ে আছে মানুষটা। ঘর থেকে বেরোনো তো
দূর,রাতবিরেতে সামান্য আওয়াজে এমন চমকে উঠছে যে বলার নয়।
অনেক কষ্টে বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে নদীর ধারে চখাচখীর মেলায় যেতে রাজী করানো গেছে।
মেলা থেকে ফিরতে দেরী হয়নি। বরঞ্চ মানুষটার হড়বরিতে অন্যসবাই ফেরার আগেই মেলায় না
ঘুরে ফেরত আসছিলো দুজনে। আশিয়ার ডানহাতে কাঁচের রঙীন পাখী,পুতুল,
বামহাতে মেলায় কেনা জিলিপি গজা। জগুমিয়ার ধানক্ষেতের পাশে আসতে না আসতেই কে যেন পাশ থেকে অশ্রাব্য
গালি দিয়ে বললো,- ‘……. বেলেল্লাপনার সময় বৌয়ের
আঁচল মনে ছিলো না’ ------আশিয়া চমকে থেমে যায় । থেমে যায়, আসলে থেমে না গিয়ে উপায়ও থাকে না, একটা বাঁকের মুখে আচমকা
অচেনা ক’জন মানুষ পথ আটকে ধরেছে তাদের । শরীরের একদম কাছে এসে
দাঁড়িয়েছে, লোকগুলোর গায়ে মদ সিগারেটের বিশ্রী গন্ধ টের পায়
আশিয়া । ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ওকে একা বিপদের মধ্যে ফেলে দুদ্দার করে হাটের আলো,লোকের ভীড়ের দিকে পালাচ্ছে ভীতু মানুষটা। পেছনে ক’জন তাড়া করে যাচ্ছে । বিপদ বুঝে আশিয়াও দৌড়ে পালাতে চায়, কিন্তু জোড়া পায়ে জোর পায় না। সব জোর যেন ঘাম হয়ে ঝরে পা বেয়ে
বেয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। চিৎকার করতে চায়, মাঝপুকুরে ডুবে যাওয়া
ক্ষীণ স্বরটুকু সে নিজেই শোনে। কেউ একজন মুহূর্তের মধ্যে পিছন থেকে মুখ চেপে ধরে, অন্য কেউ ওর বিবশ শরীরটা পাঁজাকোলা করে তুলে পাশেই জগুমিয়ার ক্ষেতে
ঢুকে পড়ে।
চার
মেয়েমানুষেরও বোধহয় বিড়ালের মত নয়টা প্রাণ থাকে । নয়তো
ঐ অতগুলো নরপশুর প্রতিশোধ নেবার বীভৎস মানসিকতার পাশবিক অত্যাচার সয়েও মানুষ যে বাঁচে তার প্রমাণ তো সে নিজে । তবে
মন্দের ভালো, তার মানুষটা কিন্তু তার সঙ্গ আর ছাড়ে নি। শুধু ওর মুখের
দিকে তাকিয়ে আশিয়া আত্মহত্যার কথা ভাবতে পারে নি। পেটের ভিতর আবার মোচড় দিয়ে উঠে।
শত্তুরটা যেন পেটের ভিতর লাথালাথি শুরু করছে- যেন এখনই পেট ফুঁড়ে বের হয়ে আসবে।
ব্যাথার একের পর এক তরঙ্গ যেন ঢেউ-এর দোলায় দোলাতে থাকে আশিয়ার সারা শরীর। একটু জল
খেলে হোতো। ঘুমন্ত মানুষটাকে না জাগিয়ে মেয়েটা প্রাণপনে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে
ব্যাথা চাপতে চাপতে মাটি থেকে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। আশিয়ার মনে হয়, ওর চোখ বারবার বন্ধ হতে চাচ্ছে কেন? ও বারবার চেষ্টা করেও চোখটা
খোলা রাখতে পারছে না। ও ভাবতে থকে, ও কি পারবে কালকের দিনটা
দেখতে? পেটের শত্তুরটার মুখ দেখতে? যেখানে ওর সব স্বপ্নগুলো ঘুমিয়ে আছে! ভাবতে গিয়ে নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে।
অ র্দ্ধে ন্দু শে খ র গো স্বা মী
মহাপ্রস্থান
বাবা অকালে চলে
গেলেন। আকস্মিক পথ-দুর্ঘটনায়। সে বছরই কলেজে পা রেখেছে হিমেশ। মাকে নিয়ে অগাধ জলে
পড়ল সে। কেউ সাঁতার জানে না। না মা, না সে। বাবার ছায়ায় নিশ্চিন্ত ডাঙ্গায় বাস
করতে এমনই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল তারা যে কখনও এই পরিস্থিতি হতে পারে এমনটা
কল্পনাতেও আসেনি। তার বাবা, পঁয়তাল্লিশ বছরের যুবক –
হ্যাঁ, বাবাকে যুবকই মনে হত তার। সটান চেহারা, সদাই ব্যস্ত, হো হো করে এমনই
উচ্চকিত হাসত যে বিষণ্ণতা তাদের বাড়ির ছায়া মাড়াতেই সাহস করত না। বাড়ি ফেরার ঠিক
ছিল না কোনও। সংবাদপত্রের চাকরি, খবরের খোঁজে শহর-গঞ্জ তোলপাড় করে বেড়াত। দু-চার
দিন পর ফিরত যখন বাড়িতে, পাড়া-পড়শিরা জেনে যেত যে সাংবাদিক প্রবর বাড়ি ফিরলেন। ঘরে ঢুকে দরজা
বন্ধ করতে না করতেই এক হাতে ছেলে আর এক হাতে বউকে নিয়ে প্রায় কাঁধে তুলে নেওয়ার
জোগাড়। মা যখন “ছাড়ো ছাড়ো” বলতে বলতে দুমদাম কিল
মারছে বাবার পিঠে, হিমেশ তখন হা হা করে বাবার হাসিতে হাসি মেলাচ্ছে। এরপরই বাবা
তার গালে গাল ঠেকিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে দেবে তাকে আর মাকে বুকের কাছে সরিয়ে এনে চকাস্
করে সশব্দে চুমো খাবে। ছাড়া পেয়ে লজ্জারুণ মা সটান রান্নাঘরে, --এত বড় ছেলের সামনে...... ইত্যাদি ইত্যাদি কী
সব বিড়বিড় করতে করতে।
ছবিটা হারিয়েই গেল
চিরতরে। বাবার অফিসের লোকেরা যখন বাবার দেহ নিয়ে এল বাড়িতে, মা অজ্ঞান আর সে
দুঃস্বপ্নের ঘোরে। ঘোরের মধ্যেই দাহকাজ হয়ে গেল। বাড়ি ফিরেও ঘোর কাটল না। বাবার
সহকর্মীরাই যা যা করতে হয় সব করলেন, যা যা বলতে হয় সব বললেন। কিছুই মাথায় ঢুকল না – না তার, না মায়ের। তিনদিনের মাথায় মায়ের ঘন ঘন অজ্ঞান হওয়াটা বন্ধ
হল বটে, কিন্তু তার মস্তিষ্কের ক্রিয়া চালু আছে বলে মনে হল না।
নিতান্তই অল্প বয়সে
তার কাগজের থেকে একটি অনাথ আশ্রমের উপর রিপোর্টিং করতে গিয়ে রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা
প্রমান করতে সঙ্গে একটি অনাথ কিশোরীও নিয়ে এসেছিল বাবা। সেই কিশোরীই হিমেশের মা।
আর বাবার ইতিহাস তার নিজেরও জানা ছিল কিনা
সন্দেহ। ফলে তাদের জ্ঞাতিগুষ্টির অ্যাকাউন্টে ঢ্যাঁড়া। বাবার অবশ্যি বন্ধুবান্ধব
কম ছিল না। তাঁরা সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী যেটুকু করার সেটুকুই করলেন। শ্রাদ্ধশান্তি
হয়ে গেলে নিয়ম অনুযায়ী বেপাত্তাও হয়ে গেলেন। তবে বাবার সহকর্মীরা তার পরিবারের
পাশে দাঁড়ালেন। বোঝা গেল, বাবাকে তারা ভালবাসতেন। খুবই নাকি জনপ্রিয় ছিল বাবা।
ভালো ভালো খবর করত। সে সব খবরের কদরও হত। কিছুদিন আগেই একটি বিভাগের সম্পাদক করা
হয়েছিল তাকে। চিফ এডিটর আশিস সান্যাল খুবই নাকি স্নেহ করতেন বাবাকে। বিশাল মেদবহুল
চেহারা তাঁর, বাতের ব্যথায় খুবই কষ্ট পান। কদাচিৎ তিনি অফিসের বাইরে যান। তিনিও
এসেছিলেন শ্রাদ্ধের দিন। হিমেশের কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, -- চিন্তা করো না,
গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট কর। তারপর কাগজের অফিসেই নিয়ে নেব তোমাকে। কাজকর্ম শিখিয়ে
নেব। তদ্দিন সংসার খরচের সংস্থান অফিসই করবে। তোমার মাকে এই ক’বছর মাসে পাঁচ হাজার করে পেনশন দেবে। তোমার বাবা বাড়ি করার সময়
অফিস থেকে যা লোন নিয়েছিল সেটা শোধ হতে এখনও যেটুকু বাকি আছে সেটা অফিস মকুব করে
দিচ্ছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটি বাবদ টাকাটা ভালো জায়গায় রাখার ব্যবস্থা
করে দিচ্ছি। তার সুদ আর পেনশনের টাকায় মনে হয় সংসারটা চালিয়ে নিতে পারবে তোমার মা।
সুরেশ তো কোনদিন ভবিষ্যতের কথা ভাবতো না! বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করেছিলেন
তিনি।
সেই প্রথম
সংসার-চালানো শব্দটা বোধের মধ্যে ঢুকেছিল হিমেশের। প্রতিদিনের খাওয়া-পরা, পড়াশোনা
চালানোর জন্যে টাকা আয় করতে হয়, বাবা বেঁচে থাকতে তার কথাবার্তায় সেটা টের পায়নি
কখনও। সমস্যাটির মুখোমুখি হতে না হতেই তার এমন চমকপ্রদ সমাধানে জীবনের দিকে মুখ
ফেরায় সে বাবার মৃত্যুর এগারো দিনের মাথায়। সবাই চলে গেলে বিছানায় বসে থাকা
বিষাদের প্রস্তরমূর্তি মাকে জড়িয়ে তার মাথার উপর নিজের গাল ঠেকায়। তখন তার বুকে
মাথা রেখে প্রবল অশ্রুস্রোতে জীবনের দিকে ফিরতে থাকে মা।
অনাথ আশ্রমের
পালিতা কন্যা, তার মা নিজের বর, ঘর এবং সন্তান পেয়ে এমনই পরিতৃপ্ত ছিল যে অন্য কোন
পার্থিব বস্তুতে তার না ছিল আকর্ষণ, না ছিল আকাঙ্খা। তার জীবনের দুটি মাত্র
আসক্তির পাত্রের মধ্যে সম্ভবত প্রবলতরটি এইভাবে অন্তর্হিত হওয়ায় নিরাসক্তির আবরণে
নিজেকে জড়িয়ে সন্তানের মুখ চেয়ে নিজেকে সাংসারিক কর্তব্যের দৈনন্দিনতায় আবদ্ধ করে ফেলল মা। ফলে, সংসারে
টাকাপয়সার অভাব টের পাওয়া না গেলেও তাদের ছোট্ট দু’কামরার বাড়িটিতে আনন্দের
যে সুবাতাস বইত, তা চিরতরেই বন্ধ হয়ে গেল।
এইভাবে কেটে গেল
তিনটে বছর। ইংরাজি সাহিত্যে সাম্মানিক সহ স্নাতক হল হিমেশ। আশিস সান্যাল
প্রতিশ্রুতিমতো তাকে তাদের রিপোর্টিং বিভাগে শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত করে নিলেন।
কাগজের কনিষ্ঠতম স্টাফ রিপোর্টারটি এক নতুন জগতে পদার্পণ করল। প্রথমে তাকে কপি
লিখতে শেখানো হল। আশিস সান্যাল তাঁর হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেও তার দিকে সতর্ক নজর
রাখলেন। দেখা গেল, হিমেশের ভাষা ঝরঝরে, মেদহীন। প্রকাশভঙ্গীও আকর্ষণীয় – যাকে বলে পারফেক্ট রিপোর্টিং ল্যাঙ্গুয়েজ। সে দ্রুত ভাবে বলে
লিখতেও পারে তাড়াতাড়ি। সান্যাল প্রীত হলেন। ছমাসের শিক্ষানবিশি পর্ব শেষ হতে একজন বরিষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে তাকে জুতে
দেওয়া হল রিপোর্টিং-এর কাজে। হিমেশ বুঝল, খবর লেখাটা যত সহজ, জোগাড় করাটা ততটাই
কঠিন। সিনিয়ারের কায়দা-কৌশলগুলি সে লক্ষ্য করত ঠিকই, কিন্তু সেগুলিতে রপ্ত হতে হলে
প্রথমত দরকার প্রচুর সোর্স; দ্বিতীয়ত দরকার, অল্প সময়ে মানুষের মন বুঝে তদনুযায়ী
নিজের কথাবার্তার ধরন পালটানো। হিমেশ লড়ে যেতে লাগল। আরও মাসতিনেক পরে তাকে
ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিপোর্টিং-এর দায়িত্ব দেওয়া হল। তার আগে সান্যাল একদিন তাকে নিজের
চেম্বারে ডেকে পাঠালেন। ততদিনে মানুষটিকে ভালো করে চিনে নিয়েছে হিমেশ। তাঁর
চেহারাটি বিশাল ও জড়দ্গব হলেও মস্তিষ্কটি প্রবল ক্ষুরধার। এবং তাঁর চোখের সংখ্যা
কম করেও এক ডজন। তবে কোন এক অজ্ঞাত কারণে হিমেশের প্রতি তাঁর অহেতুক পক্ষপাত। কারণটি
অনাবিষ্কৃত হলেও হিমেশ তার ষোল আনা সুযোগ নিতে পিছপা হয় না।
তাঁর চেম্বারে ঢুকতেই সান্যাল বললেন, --
বসো।
তারপর নিজের চেয়ার ঘুরিয়ে তার মুখোমুখি হলেন। চোখ থেকে চশমা খুলে
টেবিলে রাখলেন। তারপরে বললেন, -- এখন থেকে তুমি প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকের কর্মজীবনে
ঢুকতে চলেছ। চ্যালেঞ্জিং জব। ইন্টারেস্টিং বাট টাফ। সফল সাংবাদিক হতে গেলে কয়েকটা
ব্যাপারকে বেদ-বাইবেল মানতে হবে। সেগুলো বলি, মন দিয়ে শোন। এক, সাংবাদিকদের কোন
ডিউটি-আওয়ার্স নেই। যেখানেই থাকো বা যাই করো না কেন, সর্বত্র চোখ-কান খোলা রাখবে।
দুই, খবরের ঘ্রাণ আছে, সেই শক্তি অর্জন করতে হবে। তিন, রুটিন রিপোর্টের জন্য
সরকারি-বেসরকারি সমস্ত কেন্দ্রে আমাদের কাগজের সোর্স আছে। তার লিস্ট আমি তোমাকে
দিয়ে দেব। কিন্তু তার বাইরে সেন্সেশনাল খবরের জন্য তোমাকে নিজেকেই সোর্স জোগাড়
করে নিতে হবে। এর জন্যে কোন ধরা-বাঁধা সূত্র নেই, য়্যু হ্যাভ টু অ্যাডপ্ট ইন্ডেজেনাস
মেথড। চার, সোর্সের অনুমতি ব্যতিরেকে কোন কিছুর বিনিময়েই তার নাম প্রকাশ করবে না।
করলেই তোমার সাংবাদিক জীবন শেষ। পাঁচ, ভালো খবরের জন্য অনৈতিক, এমনকি বেআইনি
পদ্ধতি গ্রহন করাও মার্জনীয় অপরাধ। দায়িত্ব কাগজের। সোর্সকে ঘুষ দেওয়া আবশ্যিক
কর্ম। কাগজ সেই ব্যয় বহন করবে। ছয়, সাংবাদিকের সততা একটু ভিন্ন বস্তু। খবরের
স্বার্থে কপট বাক্য, কপট আচরণ সম্পূর্ণ নির্দোষ। খবর ধরে তা অতিরঞ্জিত করে
পরিবেশনযোগ্য করবে, এতো অতি মামুলি কথা; কিন্তু ভিত্তিহীন কল্পনা থেকে খবর নির্মাণ
আমাদের কোডে অমার্জনীয় অপরাধ। সর্বশেষ সূত্রটি বহুশ্রুত হলেও খবরের এর চেয়ে যথার্থ
সংজ্ঞা এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সেটি হল, কুকুর মানুষকে কামড়ালে –
হিমেশ আশিস সান্যালের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বাক্যটির পাদপূরণ করল।
তারপর বলল, -- বড্ড ক্লিশে হয়ে গেছে জেঠু।
সান্যাল
মৃদু হেসে বললেন, -- এটাকে ফেলে দেওয়ার আগে যথার্থতর কিছু তৈরি কর।
হিমেশ বলল, -- মানুষ মরলে সেটা খবর নয়, মরা মানুষ বেঁচে উঠলে সেটা
খবর।
সান্যাল বললেন, -- হল না। মানুষ কখনও হয়ত বা কুকুরকে কামড়াতেও
পারে, কিন্তু মরা মানুষ বাঁচে না কখনও।
দুই
বছর দেড়েক কেটে
গেছে। হিমেশ খারাপ করছে না। কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টি করবে এমন কিছু খবর এখন পর্যন্ত
করে উঠতে পারেনি। একটা তদন্তমূলক রিপোর্টিং- এর সুযোগ এসেছিল। সেটাও তার বুদ্ধির
দোষে ফসকে যায়। শিয়ালদার ফ্লাই-ওভারের নীচে বসা এক হকারের সঙ্গে ভাব জমিয়ে টুকটাক
খবর পেত। একদিন সে শিয়ালদার এক গোডাউনের কথা তাকে জানায়। সেখানে ব্যবহৃত ডিসপোজেব্ল
সিরিঞ্জ পরিষ্কার করে বিভিন্ন কোম্পানীর জাল লোগো লাগিয়ে প্যাকেটিং হয়। হিমেশকে
সঙ্গে নিয়ে সে একদিন আড়াল থেকে গোডাউনটা দেখিয়েও আনে। উৎসাহিত ও উত্তেজিত হিমেশ
তার সঙ্গী ফটোগ্রাফারকে নিয়ে প্রথমে আমহার্স্ট স্ট্রীট থানায় গিয়ে ওসিকে জানায়।
নিজেদের প্রেস কার্ড দেখিয়ে তাকে অনুরোধ করে তৎক্ষণাৎ গোডাউনটিকে তল্লাসি করতে। ওসি
একজন সাব-ইন্সপেক্টর ও দুজন কনস্টেবলকে তাদের সাথে পাঠান। কিন্তু সেখানে গিয়ে
আপত্তিকর কিছুই পাওয়া গেল না। পুলিশ তিনটির ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হজম করে ফিরে এল দুজন।
আশিস সান্যাল বললেন, -- এই বুদ্ধি নিয়ে ইনভেস্টিগেটিং রিপোর্টিং
করবে! থানায় গিয়েছিলে কী করতে?
হিমেশ বলল, -- হাতেনাতে ধরিয়ে দেব বলে। তাছাড়া আমাদের নিরাপত্তার
কথাও ভেবেছিলুম।
সান্যাল বললেন, -- এ ধরনের খবর যদি সত্যিই করতে চাও তাহলে ছদ্ম
পরিচয়ে গোপন ক্যামেরা নিয়ে যেতে হবে। থানাকে ঘুণাক্ষরে জানানো চলবে না। তুমি কি
ভাবো থানার অজ্ঞাতে এসব কাজকর্ম চলে? তোমরা থানায় ঢুকে মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে
মোবাইলে খবর চলে গেছে যথাস্থানে। আর এদের ব্যবস্থা এমনই যে আধঘন্টা সময় পেলেই সব
নিখুঁতভাবে সরিয়ে ফেলবে।
মাথা
নীচু করেছিল হিমেশ। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল স্বীকৃতি পাওয়ার মত কিছু একটা করে
দেখাতেই হবে তাকে।
গতকাল একটি ছেলের
সাথে আলাপ হল হিমেশের। অদ্রি বসু। একটি বহুজাতিক সংস্থায় নেটওয়ার্ক
অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। হিমেশের স্কুলের সহপাঠী গৌরব ওই সংস্থাতেই আছে। সফ্টওয়্যার
ইঞ্জিনিয়ার। সে কিছুদিন আগে অদ্রির কথা বলেছিল। অদ্রির বাবা
রাজ্য সরকারের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার। কয়েকমাসের মধ্যেই অবসর
নেবেন। তিনি নাকি এক অদ্ভুত মানুষ। অফিসে অফিসারের মতই থাকেন। কিন্তু বাড়িতে আর
পাঁচটা সংসারী মানুষের থেকে একেবারেই আলাদা। আজীবন নিরামিষভোজী মানুষটি ইদানীং
নাকি খাওয়াদাওয়া অত্যন্ত কমিয়ে দিয়েছেন। অফিসে আসার আগে দুটো রুটি, একটা কলা এবং
এক গ্লাস দুধ খান। অফিসে তাঁকে টিফিন করতে দেখা যায় না। বাড়ি ফিরে আড়াইশো গ্রাম
ছানা খান শুধু। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, বাড়িতে একটিমাত্র অন্তর্বাস পরে মেঝেতে আসন
পেতে তার উপর পদ্মাসনে বসে সারারাত কাটিয়ে দেন। সে সময় তাঁর চোখ থাকে নিমীলিত। ফলে
জেগে থাকেন নাকি ঘুমিয়ে পড়েন বোঝা যায় না। একদিন এক আশ্চর্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে
অদ্রি। তার মা স্বর্গতা, কাজেই বাবা একাই থাকেন তাঁর ঘরে। সেদিন মধ্যরাতের পরে
অদ্রির ঘুম ভেঙ্গে যায়। পেটের মধ্যে প্রবল অস্বস্তি। টয়লেটে যেতে হয় তাকে। ফিরে
এসে নিজের ঘরে ঢুকতে গিয়ে হঠাৎ-ই কৌতূহল
হয় তার। বাবা কি সত্যিই সারা রাত ওইভাবে থাকে? ভেজানো দরজা সামান্য ফাঁক করে উঁকি
দেয় সে। স্বল্পালোকিত ঘরে মেঝেতে পদ্মাসনে বসে ও কে? বাবা? চোখ সরু করে সে। হ্যাঁ,
বাবাই তো! কিন্তু এ কোন বাবা? এ তো তার সাত বছরের জন্মদিনে যে বাবার কোলে বসা তার
ছবি দেখেছে এ তো সেই বাবা! ঘন কালো চুল, টানটান শরীরের চামড়া – এ তো রীতিমতো যুবক! স্বপ্ন দেখছে ভেবে অদ্রি নিজের গালে চিমটি
কাটতে কাটতে রক্তাক্ত করে ফেলে, কিন্তু তার স্বপ্ন ভাঙ্গে না। অবশেষে ভৌতিক দৃশ্য
দেখছে ভেবে ভয় পেয়ে সে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গোঁজে।
[ পরের অংশ ... আগামী সংখ্যায় ]
দে বা শী ষ দে
তখনও প্রাণটা বের হয়নি। হাতটা একটু উঠিয়ে নিজের দিকে দেখিয়ে বৃদ্ধ
বললেন - আমাকে নিয়ে চলুন আপনারা,
যা শাস্তি দেবার দিন, কোনো খারাপ লাগবে না, এত চিন্তা করছেন কেন ?
আপনাদের ডিউটি তো আপনাদের করতেই হবে, তাই না ? তাহলে
দেরি কেন ? কাঁপা কাঁপা
গলায় বাহাত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধের কথায় ডিউটি
অফিসার ও তার তিন জন সহকারি পুলিস অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে,
ভেবে পায় না কী করবে।
স্পন্দন
গোস্বামী আর অরুণিমা গোস্বামীর বহূ বছর আগে আলাপ, আলাপ থেকে
ভালোলাগা, আর
ভালোলাগা ত্থেকে ভালোবাসা, ভালোবাসার পরিণতি গড়ায়
বিবাহে। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে
ইলেক্টিকাল ইঞ্জিয়ার স্পন্দন গোস্বামীর সাথে অঙ্কন শিল্পী অরুণিমার খুব ঘটা করে
বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকে তারা কেউ
কাউকে এক রাত্রি ছেড়ে থাকেনি। অসম্ভব ভালোবাসা দুজনের মধ্যে। প্রায় দুবছর পর তাদের
একটি কন্যা সন্তান হয় । নাম রাখে লালিমা।
লালিমাকে নিয়ে স্পন্দন আর অরুণিমার সুখের সংসার । ক্রমে লালিমা বড় হতে থাকে। প্রতি
ক্লাশে প্রথম হওয়া লালিমা এক সময় ভর্তি হয় বেঙ্গল ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে। পাশ করার পর
ভালো চাকরিও পেয়ে য়ায় লালিমা। দিন যায়। লালিমা বিয়েতে মত দেয় না। বাবা মা’কে নিয়েই
চিরকাল থাকতে চায় সে। সময় এগিয়ে চলে।
স্পন্দন গোস্বামী চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করে। মাঝে মাঝে অরুণিমার অঙ্কন প্রদর্শনী হয়,
ওরা তিন জনে দেখতে যায়। লালিমা অফিস থেকে ফিরলে রোজই ওদের আড্ডা চলে প্রায় দুই
থেকে তিন ঘন্টা। আসে বিভিন্ন প্রসঙ্গ,
ঘটে যাওয়া ঘটনার অণুরণন।
ভালোই কাটতে থাকে ওদের তিন জনের জীবন।
হঠাৎ
একদিন সুখের সংসারে চুপিসারে ঢুকে পড়ে কালো মেঘ। অফিস যাওয়ার পথে এক বাস
দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় লালিমার । স্পন্দন আর
অরুণিমা একা হয়ে যায়। দুজন দুজনকে সান্তনা দেয় । আগের সেই সাজানো সংসার কেমন প্রাণহীন
হয়ে পড়ে।
খুঁড়িয়ে
খুঁড়িয়ে চলতে থাকে গোস্বামী পরিবার। বার্ধক্যও ঠিক ততটাই তাড়াতাড়ি গ্রাস করতে থাকে
ওদের। নতুন সঙ্গী হিসাবে ‘অসুখ’ আসে ওদের দুজনের কাছে। লেগেই
থাকে কিছু না কিছু। একজনের কিছু হলে অন্য জন সেবা করে। আস্তে আস্তে দুজনেই প্রায়
বিছানা নেয়। অদ্ভুত এক ভীতি ওদের গ্রাস করে । ওরা দুজনেই ভাবতে থাকে একজন চলে গেলে
অন্য জন থাকবে কি করে, কি
নিয়ে বাঁচবে অপর জন। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে চায়
না। স্পন্দন গোস্বামী মনে মনে ভাবে যদি সে আগে মারা যায় তবে অরুণিমার কি হবে, কে তাকে দেখবে, একই চিন্তা
সারাদিন তার মাথায় ঘুরতে থাকে।
একদিন
সকালে , চিন্তার ভারে ক্রমশ কুঁকড়ে যাওয়া স্পন্দন গোস্বামীর চোখ
মুখ চিক চিক করে ওঠে। বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা নিজেদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষন কথা বলে নেয়। এর
পর বৃদ্ধ স্পন্দন গোস্বামী রান্নাঘর থেকে দু-গ্লাস
সরবৎ নিয়ে আসে। এক গ্লাস তুলে দেয় অরুণিমার
হাতে। কেঁদে ফেলে বাহাত্তরের বৃদ্ধ।
অরুণিমার নিস্প্রান দেহটা বিছানায় এলিয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় বৃদ্ধ । নাড়ী
দেখে স্ত্রী’র।
মুখে চোখে শান্তির ছাপ ফুটে ওঠে তাঁর ।
পড়েথাকা
আরএকটা গ্লাস তুলে নেয় নিজের জন্য ।
অর্ধেকের বেশি ঢেলে ফেলে মুখে। বাড়ির কাজের লোক দরজা ধাক্কাতে থাকে। সাড়া না পেয়ে
পাশের ফ্লাটের লোকদের ডাকে সে। পুলিশ আসে.........
বৃদ্ধ স্পন্দন গোস্বামীকে অ ম্বুলেন্সে
তোলে হসপিটালের উদ্দেশ্যে। কিন্তু
মাঝ পথেই স্পন্দন গোস্বামীর প্রাণ
নিস্তেজ হয়ে যায়। পৌঁছে যায় অরুণিমার
কাছে।
ত্রি ভু ব ন মু খা র্জী
তির্যক
আমার
গল্পের নায়িকা উচ্চ মধ্যবিত্ত ঘরের এক মহিলা। তিনি সর্ব গুণসম্পন্না এক ভারতীয়
নারী। শিক্ষিতা, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত
ও ওডিষি নৃত্যেও পারদর্শী । বলতে গেলে প্রতিভাসম্পন্না নারী । তা সেই মেয়েটিকে
নিয়ে আমার গল্প লেখা কেন ? তার মনে , আচরণে প্রেম-প্রীতির যে ছবি আমি দেখেছিলাম
সেটাই আমার গল্প লেখার কারণ । মেয়েটির নাম পায়েল ।
ঘটনাটা এইরকম ..। পায়েল তখন ইংলিশ অনার্স নিয়ে স্কটিশে পড়ছে । এমনিতে
পায়েল ভাল ছাত্রী ছিল তাই ওর অনার্স পেতে অসুবিধে হলনা। একজন স্কচ্ লেডী হেড অফ
দি ডিপার্টমেন্ট ছিলেন । ম্যাডাম এডিনা সেদিন উইলিয়াম্ সেক্সপিয়ারের ‘ওথেলোর‘ ক্লাস্
নিচ্ছিলেন সুস্পষ্ট উচ্চারণ ।
সকলে মন্ত্রমুগ্ধর মতন শুনছিল । পায়েল , ম্যাডাম এর ট্যুটোরিয়াল ক্লাসে কিছু প্রশ্ন করে , কবে এবং কোথায় প্রথম ওথেলো ষ্টেজে দেখান হয় ইত্যাদি । কলেজের ঘণ্টা বাজে । ছেলে মেয়েরা ক্লাস থেকে বেরোয় । পায়েল তখন ঘোরে রয়েছে , শুধু দডেসডেমনার কথা ভাবছে । এই সময় ওর প্রতীকের সঙ্গে দেখা হয় ।
সকলে মন্ত্রমুগ্ধর মতন শুনছিল । পায়েল , ম্যাডাম এর ট্যুটোরিয়াল ক্লাসে কিছু প্রশ্ন করে , কবে এবং কোথায় প্রথম ওথেলো ষ্টেজে দেখান হয় ইত্যাদি । কলেজের ঘণ্টা বাজে । ছেলে মেয়েরা ক্লাস থেকে বেরোয় । পায়েল তখন ঘোরে রয়েছে , শুধু দডেসডেমনার কথা ভাবছে । এই সময় ওর প্রতীকের সঙ্গে দেখা হয় ।
প্রতীক খুব সাধারণ ছেলে । কিছুটা ভাবুক ভাবুক কবি কবি ভাব । তবে পরনে
পায়জামা পাঞ্জাবী কাঁধে ব্যাগ । প্রতীক এপ্লায়েড ইকনমিক্স নিয়ে ইউনিভার্সিটীতে
এম.এ. ফাইনাল ইয়ারে । নিজের পডার খরচ টিউশনি করে মেটায় । বাবা একটা প্রাইভাট
ফার্মে কাজ করেন । যৎ সামান্য রোজগারে সংসার কষ্টেই চলে । এসব ছেলেদের জীবনে অনেক
সংগ্রাম করে বড হতে হয় । এরা খুব একটা মেয়েদের সঙ্গে মেলা মেশা করে না।
- আজ কোথায় যাবে ? পায়েলের প্রশ্ন তে প্রতীক বিব্রত হয়ে পডে !
- ও ! হ্যাঁ তুমি ? না কোথাও নয় । সন্ধ্যে বেলায় টিউশন আছে । লোকালে যেতে
২৫ থেকে ৩০ মিনিট্ । কথাগুলো অন্যমনস্ক ভাবে প্রতীক বলে ।
- আজ ভিক্টোরিয়া যাবে ?
- না । আমার অন্য কাজ আছে । কলেজ
ষ্ট্রীটে কিছু পুরান বই কিনতে যাব।
- চল না আমিও যাই সঙ্গে, আমার তো ওই দিকেই
বাডী ।
প্রতীক পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখল কিছু খুচরো
টাকা আছে । একটা সিগারেট্ - খেলে বাকি থাকছে ৫৫ টাকার মতন। ...। বইটার দাম টা৫০কা
তো হবেই ...!
- কি ভাবছো অত । চল তো । বাস এসে গেল।
- ওটাতো কলেজ স্ট্রীট্ যাবে ।
- হ্যাঁ আমিও ওই দিকেই যাব । নাও উঠে পড় ।
মন্ত্র মুগ্ধের মতন উঠে পড়লো প্রতীক । বাস
ভাডাটা প্রতীক দিতে যাচ্ছিল কন্ডাক্টার পেছনে ঈশারা করে কিছু বোঝাতে চেষ্টা করল। বাস
ভাডাটা কেন ও দিল ? আত্মসন্মানে
বাধে । খুব বাজে লাগলো । কলেজ স্ট্রীট বাটার কাছে নেমে দুজনে হাঁটা দিল ।
- তুমি কিন্তু এটা ভারি অন্যায় করলে !
প্রতীক খুব অপ্রস্তুতে পডার মতন বলল
- ছাড তো । ও আমাকে পরে পুষিয়ে দেবেখন ,
তুমি কি যেন বই এর কথা বলছিলে না ?
- প্রডাকশন ইকনমিক্সের বই ।
- আজকাল ইন্টারনেট থেকে অনেকে বই ডাউনলোড
করে পডে ।
- হ্যাঁ তা করে তবে আমার কিছু অন্য
প্রয়োজন আছে ।
- কাউকে কি গিফট্ দেবে ?
- হ্যাঁ !
- কাকে ?
- আমার এক ছাত্রী কে । মুখটা লাল হয়ে গেল
পায়েলের । খুব অপমান বোধ হল। আসলে প্রায় মেয়েরাই ওই এক ই রোগে ভোগে । মোটেই
অন্য মেয়ের সংস্পর্শে তার প্রিয়তম কে আসতে দেয় না । সে
ছাত্রী ই হোক কিম্বা অন্য কেউ হো্ক । নিছক
সন্দেহ বাতিক থেকেই যায় । মনে জাগে অনেক প্রশ্ন ।
ঘটনা চক্রে বলে বসে প্রতীক , ‘ও কিন্তু আমার মামাতো বোন । ওর বইটা দরকার । আমাকে আসার সময় বলেছিল আনতে । ও আমার জন্যই ইকনমিক্স অনার্স নিয়েছে’। এবার পায়েলের গালে যেন কেউ ঠাস্ করে একটা চড মারল বলে মনে হল। প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য বললো, ‘না না আমি এমনি জিঙ্গাসা করছিলাম’। ব্যাপারটা ঠাওরাতে প্রতীকের খুব একটা অসুবিধে হল না !
ও আসলে জানতো এই কথায় পায়েল একটু রাগ অভিমান করবে আর মিথ্যে সন্দেহ করবে যেটার মজা ও নেবে।
ঘটনা চক্রে বলে বসে প্রতীক , ‘ও কিন্তু আমার মামাতো বোন । ওর বইটা দরকার । আমাকে আসার সময় বলেছিল আনতে । ও আমার জন্যই ইকনমিক্স অনার্স নিয়েছে’। এবার পায়েলের গালে যেন কেউ ঠাস্ করে একটা চড মারল বলে মনে হল। প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য বললো, ‘না না আমি এমনি জিঙ্গাসা করছিলাম’। ব্যাপারটা ঠাওরাতে প্রতীকের খুব একটা অসুবিধে হল না !
ও আসলে জানতো এই কথায় পায়েল একটু রাগ অভিমান করবে আর মিথ্যে সন্দেহ করবে যেটার মজা ও নেবে।
- তোমার কিন্তু এটা ভারি অন্যায় । আমাকে
বলবে ত !
- কি বলব ? ...ও ওহ্... !! হেঁসে ফেলে প্রতীক ।
- খুঊব না ! চোখে জল আসে পায়েলের। ‘আমাকে
রাগাতে আর অপমান করতে তোমার এতটুকু খারাপ লাগে না’ ?
- এতে অপমানের কি হল ? পিয়ালি আমার ছোট বোন ।
- কই আমাকে তো কোনদিন বলনি ওর কথা ।
- কি মুস্কিল । সব কথা কি বলা যায় ! না প্রয়োজন আছে বলার!
মিথ্যে অভিমানে পায়েল আলতো করে চাঁটি মারে প্রতীকের বাঁ হাতে । দুজনের কথপোকথনে
পথচারির দৃষ্টি আকর্ষণ করে । প্রতীক অপ্রস্তুত হয়ে বলে , ‘এখন থেকেই শাসন করবে তুমি । হ্যাঁ কারণ তুমি শুধু আমার
.. আর কারুর নয় ..’
- ওকে
বস্। ..... আমার বাস এসে গেছে বাই । এরকম অপ্রস্তুত মুহুর্তে পায়েল পডবে ভাবতে
পারেনি।
কয়েকদিন
পরে ...
কফি হাউসে কফির পেয়ালায় মুখ দিয়ে বসে আছে প্রতীক সঙ্গে বন্ধু রনবীর আরো
দুজন। পার্টি আর খেলার কথাই বেশি হয় এখানে । হঠাৎ পায়েলের নাম্বার থেকে কল এলো
প্রতীকের মোবাইলে ।
-কোথায় আছো ? কেন?
- এখুনি এস আউটরাম ঘাটে । খুব দরকার ।
- আমার হাতে সময় নেই একদম। প্রতীক কিছু
জিঙ্গাসা করার আগেই ফোন কেটে গেল। বাসে যেতে হলে এক ঘণ্টা লেগে যাবে, তাও বেরিয়ে
পড়ল । কি হতে পারে ভেবে কূলকিনারা পেল
না। মধ্যেখানে আবার ফোন ।
- কি তুমি বেরিয়েছ ?
- হ্যাঁ রে বাবা । কি হয়েছে বলবেতো !
- এলেই জানবে ।
আউটরাম ঘাট্ আস্তেই বাস থেকে নেমে পূর্ব
পরিচিত স্থানে পৌঁছে দেখে পায়েল একটা বেঞ্চে বসে গঙ্গা দেখছে । জোড়ায় জোড়ায় কপোত
কপোতীর ভীড় । সকলে মসগুল নিজের প্রেমিক/প্রেমিকার
সাথে গল্প করতে । প্রতীক কে দেখে হাতে স্বর্গ পাওয়ার মত লাগলো পায়েলর । দৌড়ে
এসে প্রতীক কে জডিয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল ।
- একি ছেলেমানুষি ! ছাড় । কি
হয়েছে বল ? একটু
অপ্রস্তুত বোধ করে ।
- কি না হয়েছে বল ! বাপী আমার বিয়ের ঠিক
করেছেন এক সফট্ ওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে ।
- কংগ্রাচুলেসন।
- তোমার বলতে লজ্জা করেনা ? শালা বাঁদর আমাকে নিয়ে ছেলে খেলা ! মহিলার মুখে ‘শালা’ শব্দ টা
শুনে চমকে গেলেও আশ্চর্য হলনা কারণ এর আগেও একবার শুনেছে । কথাটার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বলল,ন
- রিল্যাক্স্ বেবি রিল্যাক্স্ !
- চল আমরা বিয়ে সেরে ফেলি কোথাও । আমরা
দুজনেই এডাল্ট্ । আইনের দিক থেকে কোন অসুবিধে নেই।
- খেপেছ ! প্রতীক আমি একটা বেকার ছেলে তার
ওপর আমার মা বাবা আমাকে তেজ্য পুত্র করে দেবেন । তাছাড়া আমার নিচে বোন আছে তাদের
ভবিষ্যৎ ? মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে হবে ।
তোমাকে জীবন সঙ্গিনী করার কোন বাধা নেই । কিন্তু পালিয়ে বিয়ে করা কে আমি কাপুরুষতার
পর্য্যায়ে ফেলি । ওটা ভীরুতার লক্ষণ । খুব বাজে ব্যাপার । আমি তোমার বাবার সঙ্গে
কথা বলতে চাই।
- ওরে আমার বীরপুরুষ রে ! হুঁ ! আমার
বাপীকে ত চেনোনা ! উনি বাপীর সঙ্গে দেখা করবেন তার আগে বাপী তোমাকে লক আপে ভরে দিন
আর আমি ওই ভোঁদাইয়ের সঙ্গে ... । ফটো টা দেখেছি । কি বিচ্ছিরি ম্যাগো । আমি
পারবোনা ওই ভোঁদাইয়ের সঙ্গে থাকতে । তুমি এক্ষুনি কিছু কর । তুমি না পুরুষ মানুষ ? এই ! এটাই মহিলাদের প্রধান অস্ত্র ! প্রতীক জানে মহিলারা পুরুষদের পৌরুষত্বে আঘাৎ
দিয়ে কথা বলে , যখন কিনা , তারা কোন কাজ সহজে তাদের দিয়ে হাসিল করতে চায় । কিংবা
যখন বিপাকে পড়ে । এখন ও কোন কথা শোনার মুডে নেই ।কারন
ওকে ডক্টরেট করতেগেলে এসব ছেঁদ কথায় মন
দিলে ওর লক্ষ্য পুরন হবে না ।
কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা সাদা রঙের স্করপিও এসে থামল । পায়েল গাড়ীটা
দেখেই আঁতকে ওঠে । ও সঙ্গে সঙ্গে প্রতীকের হাথ ধরে এক
হ্যাঁচকা টান দেয় । প্রতীক কিছু বোঝার আগেই এক বলিষ্ঠ ব্যাক্তিত্বের সুটেড বুটেড
মাঝ বয়েসি ভদ্রলোক এসে ওকে বলে , ‘আপনি কি
প্রতীক চৌধুরী’ ?
- আজ্ঞে হ্যাঁ । কিছু প্রয়োজন আছে ?
- প্রয়োজন না থাকলে কি এখানে আপনার কাছে
আসি ।
আপনি কি করেন ?
- আমি ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটীর ছাত্র ; এই
বছর এপ্পলায়েড ইকনমিক্সে মাস্টার ডিগ্রীর ফাইনাল দেব । - ও বেকার ! ইন্টেরেস্টিং
। বাবা কি করেন?
- আপনার পরিচয় ? আপনি আমাকে এত সব প্রশ্ন করছেন কেন?
- আমি ! আমি পিয়ালীর বাবা , নৃসিংহ চক্রবর্তী , আই.পি.এস্ । তুমি আমার নাম শোননি ? আমি কমিশনার, ইন্টেলিজেন্স্ , কোলকাতা
পুলিস্ । শোন নি আমার নাম ? স্ট্রেঞ্জ্
। একটা বিদ্রূপের হাঁসি মুখে নিয়ে ভদ্রলোক বললেন । তোমার জানা উচিৎ ছিল ।
- আমি অর্থনীতির ছাত্র পুলিসের খবর রেখে কি
হবে আমার ? আপনি আমাকে বেকার কেন বলছেন ? আমার তো পডা শেষ হয়নি এখনও । পড়া শেষ করে
ডক্টরেট্ করবো । আমি ইউনিভারসিটিতে ফার্স্ট হয়ে ছিলাম অনার্সে । আপনি আমার বাবাকে টানছেন কেন এর মধ্যে ! নিজের
পায়ে না দাঁড়ানো অবধি আমি আমার কোন ব্যাপারে সিধান্ত নব না ।
- ইয়ং ম্যান প্রেম করার আগে আপনার যাচাই করা উচিৎ ছিল
আপনার আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে কিনা ! আমার মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারেন , কিন্তু বিয়ে ? ইম্পসিবল্ । আপনি ত অর্থনীতির ছাত্র এটুকু
আপনার কাছ থেকে আশা করেছিলাম। ওয়েল্ মাই বয় মাইন্ড ইওর স্টাডিস্ । ফার্স্ট
এস্টাব্লিস্ ইয়োরসেলফ্ ইন দি সোসাইটি দেন থিংক অফ্ ম্যারেজ্। ওকে । ফরগেট্ হার সি
ইস এ বেবি । স্টিল এ বেবি মাই বয় । গুড লাক্ । পিয়ালী থর থর করে কাঁপছিল ওর বাবা
ওকে কাছে ডেকে বললেন , আয় মা
আমার কাছে আয়। শুনলিতো সব ।
পিয়ালীর মুখ দিয়ে একটা কথাই বেরুল প্রতীকের
উদেশ্যে .... কাওয়ার্ড.... কাপুরুষ । আমার সঙ্গে প্রতারণা । কান্নায় ভেঙ্গে পডে
পিয়ালী । বাবার সঙ্গে গাডিতে গিয়ে ওঠে । প্রতীক একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে
উদাস মনে আকাশের দিকে তাকায় আর এক রাশ ধোঁয়া মুখে নিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয় ।
নিজেকে সামলে নেয় । তার পর প্রতীকের সঙ্গে
আর পিয়ালীর দেখা হয় নি ।
পনের বছর
পর ......
এরপর
প্রায় ১৫ বছর কেটে গেছে । প্রতীক এখন ইউনিভারসিটির এপ্লায়েড ইকনমিক্সের প্রফেসার । ডক্টর
প্রতীক চৌধুরী । ওর ছাত্র ছাত্রীরা ওকে সম্মান করে । ওর কিন্তু ওই এক সাদা মাটা
মাষ্টারী পোশাক , পায়জামা
পাঞ্জাবী,ফ্রেঞ্চ
কাট দাডী , ঠোঁটে
সিগারেট্ আর ভাবুক ভাবুক চেহারা । ওর বিয়ে হয় ওরই এক ছাত্রীর সঙ্গে নাম মধুমিতা সান্যাল ।
পায়েল জীবনে সুখি কিনা জানিনা । ওর বিয়ে হয়ে
যায় সেই সফট্ওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে ,ওর অমতে । পিয়ালির কথায় সেই ভোঁদাইয়ের
সঙ্গে । একদমই পছন্দ করে না ওকে স্বামী হিসেবে । রাত দিন খটা খটি লেগেই থাকে । এর
মধ্যে ওর মা মারা যান । বাবার রিটায়ারমেন্টের পর দুটো স্ট্রোক্
হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন । পিয়ালী দেখা শোনা করে । বাবা বুঝতে পারেন
মেয়ের মনের ব্যাথা । দু চোখ বেয়ে জল গডায় । পুরান দিনের স্মৃতি রোমন্থনে আর কোন
লাভ নেই । একমাত্র মেয়ে, এতো টাকা পয়সা থেকেও শান্তিতে নেই তার কারণ তার মনের
মতন বর পায়নি । যাকে পেল সে গ্রহণ যোগ্য নয় পাঁড় মাতাল এক
উচ্ছৃঙ্খল যুবক তার আরেকটি মেয়ের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক যেনে স্বামীকে ঘৃণা করে পিয়ালী। কিছু
উপায় নেই। নিয়তির নিয়ম। মেনে নেয় সব কিছু । আজ ও
প্রতীকের কথা মনে পডে । সেই রোগা লম্বা চেহারার ভাবুক ভাবুক লোকটি কাঁধে ব্যাগ আর
ঠোঁটে সিগারেট্ । সব সময় অন্যমনস্ক কি জেন ভাবে ? এখন প্রতীক কি করছে ? ও কেমন আছে
জানতে ইচ্ছে হয় । ওকে কি মনে রেখেছে ? মনটা ডুকরে কেঁদে ওঠে । কি হবে ওর কথা ভেবে
?
কলেজ স্ট্রীটে বইয়ের দোকানে নতুন মারুতি ডিজায়ার গাডী থেকে নেমে হঠাৎ এক পায়জামা পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোক কে দেখে চিনে ফেলে পিয়ালী ।বেশ কদিন আমেরিকার ডালাসে ছিল ওর স্বামীর সঙ্গে । অনেক দিন কলেজ স্ট্রীটে আসা হয় নি । কিন্তু ফ্রেঞ্চ কাট দাডী , চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর মন দিয়ে দেখছে কিছু পুরন বই যে ভদ্রলোক ; সে যে প্রতীক তা ঠাওরাতে অসুবিধে হলনা । কাছে যাওয়ার সাহস হলনা । আবার মনে মনে লোকটার প্রতি আবেগ এলেও সেটা চেপে রাখল । মনের ভেতরটা ডুকরে উঠলো । মনে হল ঠাস্ করে গিয়ে গালে একটা চাঁটি মারি । অপদার্থ কাপুরুষ !! আবার নিজেকে সামলে নিল এ কি ভাবছে সে ? এঁর জন্যেইতো বসে আছে পথ চেয়ে কবে হবে তার সঙ্গে দেখা? ইনি তো তার মনের মানুষ !! আজ সেই ভ্যালেন্টাইন ডে । কিন্তু প্রতীক ওই সব একদম পছন্দ করতনা !
সে কি যাবে ওর কাছে ? ও কি চিনবে? যদি না চেনে ? চিনেও না
চেনার ভান করে তাহলে লজ্জা ঘেন্নায় নিজেকে ছোট করবে ওর কাছে ? ওর প্রেম প্রীতি ভালবাসা তার কি কোন দাম নেই? রাবণের হাথে নিজেকে সঁপে দিয়েছে পিয়ালী । সে যখন পশুর
মতন তার শরীরটাকে ছিঁড়ে খায় মনে হয় যেন ড্রাকুলা তার ধারল দাঁত দিয়ে ছিন্ন
ভিন্ন করছে তার শরীরটাকে । কি নিয়ে দাঁড়াবে প্রতীকের কাছে ? বলবে প্রতীক আমি তোমাকে এখনো ভালবাসি । বলে কি লাভ
? ওকি মূল্য দেবে সেই ভালবাসার । ওকি জানে
নারীর মনে যে প্রথম পুরুষ আসে সেই তার মনে আঁচড় দিয়ে যায় , যার ক্ষত ; ক্ষত বিক্ষত করলেও সে সেটাকেই আঁকডে ধরে । স্মৃতি টুকু তার মনে সান্ত্বনা দেয় । তাই
সেই স্মৃতি নিয়ে ফিরে এল নিজের ঘরে ।
ভারতীয়
রমণীর এটাই বৈচিত্র সে বহ্নি শিখায় জ্বলে পুডে মরে কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়না তার
মনের ব্যাথা । মনের ব্যাথা মনেই থাক নাইবা তুমি জানলে ......। ভগবান তির্যক দৃষ্টিতে দেখেও দেখেন না । ওরা
মেনে নেয় অদৃষ্ট বলে । আমরা পুরুষরা ওদের পুডতে দেখেও না দেখার ভান করি ।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)


