গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

শুক্রবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৬

দেবরাজ দাশগুপ্ত

যাপিত জীবন

এক

কেমন কাটছে দিন?এই প্রশ্নটা যদি কেউ করতে চায় দীপকে,অনুরোধ করব একটু সময় নিয়ে করুন প্লিজ।
 হাইস্কুলের এক প্রাক্তন সহপাঠী  সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিগ্রী নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানীতে চাকরি করার গৌরব অর্জন করে বর্তমানে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া নিবাসী।ফেসবুকে তাকে খুজে পেয়ে ফ্রেন্ডশিপ রিকোয়েস্ট পাঠাতে দীপ কয়েক সেকেন্ডের বেশী দেরী না করলেও অপর প্রান্ত থেকে রিকোয়েস্টটি কনফার্ম হতে অনেক সময় লাগল।তারপর বন্ধুটি আবার চুপ,মেসেজেরও উত্তর আসে না।হয়ত তার সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করছে না সে, এই উত্তরটা মনে মনে তৈরী করলে,আরেকটি প্রশ্ন তৈরী হয়,একেই কি বলে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স?
তখনই ফোন আসে কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে।তবে বিদেশের নয়, এদেশেরই যে ছোট্ট একটা শহরে বড় হয়ে উঠা, সমস্যা ও দৈন্যতার মধ্যেও যেখানে ছিল দূর্গাপূজার আনন্দ, সেখান থেকে।কয়েক বৎসরের বড় তমোজিৎ পাল কোন সূত্রে দীপের ফোন নাম্বার পেয়ে গিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়াবাসীর সাথে তখন দীপের একটা প্রতিযোগীতা শুরু হয়।বলল,বর্তমানে পুনেতে আছি।কোরিয়ান ভাষায় ডিপ্লোমা নিয়ে একটা কোরিয়ান কোম্পানীতে কাজ করছি।বিদেশী কোম্পানীতে বেতন বরাবরই ভাল।কোম্পানীর দেওয়া ফ্ল্যাটে থাকি,ফুডিং এর এরেঞ্জমেন্টও কোম্পানীর।কোম্পানীর গাড়ী স্টাফদের ফ্ল্যাট থেকে অফিসে নিয়ে যায়।অতএব বেতন যা পাই,সামান্য পকেট খরচ বাদে প্রায় সবই জমে যায়।
তারপর অবধারিত প্রশ্ন মাসিক বেতনের পরিমান নিয়ে।এর উত্তর শুনে তমোজিত বলল,তাইলে তো তুমি রাজা।
নিজেকে গৌরবদান করতে দীপ আরও বলে,এই কোম্পানীতে প্রায় দুই বৎসর হয়ে গেছে।কিছুদিন পরই কোরিয়াতে চলে যাচ্ছি এক বৎসরের জন্য।তখন কোম্পানীর হেড অফিসে কাজ করার পাশাপাশি ভাষাটা ঝালিয়ে নিতে পারব।
 ফোন রেখে দিলে বুঝতে পারে,অনেক কথাই বলা হয়নি।কোম্পানী এদেশে ট্যুরিজম সেক্টরে আছে।আর এই বিজনেসে আপ ডাউন প্রচুর বলে চাকরিতে অনিশ্চয়তা অনেক।কোরিয়া যাওয়ার ব্যাপারটা শুধু একটি প্রতিশ্রুতি মাত্র ছিল। এখনো ফাইনাল হয়নি।আর এই চিন্তাটাই কুরে কুরে খায়। তবে যদি একবার যাওয়া যায় সেখানে ,কেল্লাফতে।
ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে সাড়ে পাচটায় ফ্লাইট ধরে পুনে থেকে ব্যাঙ্গালোর।সেখানে ফ্লাইট চেঞ্জ করে অন্য ফ্লাইট ধরে ত্রিভাঙ্কুর পৌছে যাওয়া গেল দুপুর বারোটার মধ্যেই। সেখানে মিটিং শেষে আবার একই পথে ফিরে বিছানায় যেতে রাত একটা।মোবাইলে বেতন ক্রেডিট হবার মেসেজ আসলে এসব ডিউটি গায়ে লাগে না।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সেসব কিছুই মনে থাকে না।বরং এই কথাটিই যেন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে দেয়ালগুলিতে,কোম্পানীতে চাকুরির তিন বৎসর পুর্ন হলে এক বৎসরের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে সিওলের হেড অফিসে। চাকরির পাশাপাশি কোরিয়ান ভাষাটা আরো ভাল করে শেখার জন্য একটা ইন্সট্যুটেও সে ভর্তি হতে পারবে কোম্পানীর খরচেই।একটা তাড়নায় সঠিক সময়েই হাজির হল ব্রেকফাস্ট টেবিলে।
 একজিকিউটিভ যত আগেই ঘর থেকে বেরোক,অফিসে গিয়ে দেখবে ম্যানেজার তার আগে পৌছে গেছে।
কোম্পানীর কান্ট্রি ম্যানেজার মানিকলালকে মাঝেমধ্যেই দিল্লী থেকে পুনের অফিসে এসে কাজ করতে হয়। ফলে এই সময়টা স্টাফদের মধ্যে একটা তোড়জোর ভাব থাকে।
গুড মর্নিং মিস্টার মানিক!পরিমিত হাসিতে বলল।
মর্নিং!মানিকলাল পুনে মিরর পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিল।বাট নো সিস্টার,নো ব্রাদার,অনলি মানিক।
আবার পরিমিত হাসির সাথে একটা সরল মুখ মেলে ধরতে হল বুদ্ধি করে।
স্যার,কোম্পানীতে কি শুরু হল,এই মাসে স্যালারী এল আটদিন পর।দীপ প্রসংগ পাল্টাতে চাইল।
কান্ট্রী ম্যানেজার মানিকলাল বললেন, তুমি জানো এমনও অনেক কোম্পানী আছে যেখানে স্যালারী হতে পনেরো বিশ দিনও লেগে যায়?
আবার এমনও অনেক কোম্পানী আছে যেখানে বেতন পেতে এক তারিখের বদলা দুই তারিখ হয় না। এই কথাগুলো মনে তৈরী হলেও দীপ বলল,স্যার, আমাদের গতি কি হবে? এরকম দিন পাস করা তো খুব অসুবিধা।এত অনিশ্চয়তা।হতাশা জর্জরিত কন্ঠে বলি।
মানিকলালের মুখটা একটু নিষ্প্রভ হল। এই চাকরি নিয়ে মাঝে মধ্যে আমিও দোটানায় পরে যাই। তুমি তো ব্যাচেলার। আমার তো বউ বাচ্চা ফ্যামিলি আছে।
 দীপ বলল, না স্যার, আমারও অনেক রেস্পন্সিবিলিটি আছে। জানেন তো বাড়ীতে টাকা পাঠাতে হয়।
সব টাকা পাঠিয়ে দাও?
হ্যাঁ।
 আরে, কিছু নিজের জন্যও রাখিও।দেখবে বিপদের সময় পয়সা কাজে আসে। কোন সম্পর্ক কাজে আসে না।
 দীপ এতদিনে বুঝে ফেলেছে এই কোম্পানীর ইন্ডিয়ান অফিসে চাকরি করতে হলে যার আশীর্বাদের হাত আমাদের উপর সবচে বেশী দরকার সে কান্ট্রি ম্যানেজার, চাকরির অভিজ্ঞতা প্রসুত এই জ্ঞান থেকে সংসার সম্পর্কিত তার উপদেশ নীরব শ্রোতা হয়ে যায়।
 ফ্ল্যাটের অপর বাসিন্দা পিটার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে এ যেন এক স্বাভাবিক ঘটনা এরকম ভাব দেখিয়ে দীপ ও মানিকলাল দুজনেই সতর্ক হয়। দীপকে দেখেও কালকের পুনে-ত্রিভাংকুর ট্রিপ সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল না।
কিচেনের দিকে পিটার ঢূ মারলে কুক আর আর তার এসিস্ট্যান্টের মধ্যে একটা ভয়কাতুরে ভাব আসে। পিটার আবার নিজের রুমে ঢুকে গেলে
হয়ত আর কথা বলার সুযোগ হবে না,তাই প্রশ্নটা করেই ফেলল।স্যার, আমার কোরিয়া যাওয়ার ব্যাপারটা কি হল?
 প্রশ্নটা শুনতে পেল কি না বুঝা গেল না,পিটারের দরজার দিকে ঈশারা করে মানিকলাল অনেকবার জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন আবার করে,কি রকম?
অন্যকে নিয়ে যতই জেলাসী থাক,টিমওয়ার্কই আসল।এসব ম্যানেজম্যান্টের ফান্ডা।বলি,চলতা হ্যায়।
মানিকলাল বলল,মেইক হিম ফ্রেন্ড।
এটা কি দীপের প্রশ্নের উত্তর ছিল?

দুই

ফলে সকালবেলা ব্রেকফাস্টের টেবিল কোন সুখদুখের আলোচনা বা পত্রিকায় আসা কোন নিউজের আলোচনা নয়,হয়ে যায় অফিসের মিটিং্যের টেবিল।
 ফ্ল্যটে অফিসের আলোচনা নয় নিয়মের প্রবক্তা পিটার প্রস্তাবনা পেশ করে। কোরিয়া থেকে আসা ক্লাস নাইনের একটি মেয়েকে পড়ানোর জন্য এমন একজন টীচার নিযুক্তি দেওয়া হয়েছিল যার যোগ্যতা এম বি এ।কাল সে ফোন করে জানিয়েছে আজকে সে পরাতে যেতে পারবে না।
 মেয়েটিকে রিক্র্যুট করেছিল দীপ।এই পৃথিবী কাজের কৃতিত্ব কেউ উল্লেখ না করলেও ব্যার্থতার দায় ঠিকই ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে।মানিকলালের উপস্থিতির কারনে কৈফিয়ত দেওয়াটা আরো প্রয়োজনীয় মনে হল।
 যারা টীচার পোস্টটার জন্য এপ্লাই করেছিল তাদের মধ্যে সেই মেয়েটিই ছিল হাইয়েস্ট কোয়ালীফাইড।বাকী সবাই গ্র্যাজুয়েট আর স্টুডেন্ট।দীপ বলল।কথাগুলোর মাধ্যম স্বাভাবিকভাবেই ইংরাজীতে।আচ্ছা,সে আসবে না কেন?
 প্রশ্নটার উত্তরে বিরক্তি নাকি সত্যি লুকিয়ে আছে বুঝা গেল না। ওর পিরিয়ড চলছে,তাই আসবে না!
দীপ মানিকের মুখের দিকে তাকালে পিটার বলল, আমার মনে হয়,ক্লেয়ারকে পড়ানোর জন্য তুমিই যেতে   পারো। তুমি তো আগে ছাত্র পড়িয়েছো।
 হ্যাঁ, কিন্তু সেগুলো ছিল সাইন্সের স্টুডেন্ট।দীপ জানাল।আর ভ্যাকেশনে আমাদের ফার্ম হাউসে থাকতে এসেছিল।
দীপ,দিস ইজ এ সিম্পল জব।পিটার বলল।
এতটুকু কথার পর এবং মানিক নীরবতার ধারাবাহিকতায় দীপ অনিচ্ছাতেই সম্মতি জানায়।মানিকলালকে বলেছিল,বাসায় টাকা পাঠাতে হয়।আসলে না পাঠালেও চলে।তবে টাকা পাঠানোর চেয়ে গুরুত্বপুর্ন অন্তত  ফোন করে খোজখবর নেওয়া।
 ফার্স্ট,ইউ রিপোর্ট ইন অফিস এন্ড ফ্রম দেয়ার ইউ কেন গো টু টিউশন। পিটার দুই আঙ্গুলে চপস্টীক নিয়ে নুডুলস তুলতে তুলতে বলে।
কিন্তু দীপ এখন ফোন করবে কিভাবে? ফ্ল্যাটের নীচে গাড়ী নিয়ে ড্রাইভার অপেক্ষা করছে।

তিন

ক্লেয়ারকে পড়াতে গিয়ে একটি নতুন অভিজ্ঞতা হবার পরিপ্রেক্ষিতে সেখান থেকে ফিরে দীপ সোজা পিটারের টেবিলেই গেল।একটা বাচ্চা মেয়ে,আমার কাছে জানতে চায় আমার বেতন কত? বলে, তোমার একদিনের বেতন কত?সেই টাকাটা পেয়ে যাবে,অতএব, বি কোয়াইট। পড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে লাভ নেই।
 হয়ত উত্তর দিতে সময় নিতে গিয়ে পিটার কম্প্যুটারে ব্যস্ততা অব্যাহত রাখলে দীপ নিজেই চিন্তায় পড়ে যায়।আজকের অভিজ্ঞতা কি ইউ ব্লাডী ইন্ডিয়ানএর চেয়ে খারাপ ?যদি না হয় তবে অভিযোগ কেন?
 একটু গুছিয়ে নিয়ে পিটার বলল,একটা আঠারো বৎসরের মেয়ে আপনাকে অপমান করে এত কথা শুনিয়ে দিল ,আর আপনি তাকে কিছুই বলতে পারলেন না?
আমার কি বলা উচিত ছিল?দীপ একটু সাহস করে বলে ফেলে।
আমি বলব কিভাবে?পিটার প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করে। আপনাকে যে পোস্টে কাজ করতে দেওয়া হয়েছে সে পোস্টে থেকে কি বলা উচিত সেটা আপনিওই তো ভালভাবে বুঝবেন।
আমরা যারা সহকর্মী, তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এই যে ,একজনের সমস্যায় আমরা অন্যরা নিরাপদ ভোগ করি।
 নিজের টেবিলে এসে দীপ কথাগুলো গুছাতে শুরু করে কিভাবে মানিকের কাছে পেশ করবে? একজন বসের কাজ কি ? ওর আন্ডারে যারা কাজ করে তাদের সমস্যার সমাধান করে দেওয়া।কিন্তু কোন সমস্যা নিয়ে গেলে পিটার মনে করে সে সমস্যার জন্য স্টাফই দায়ী।
 তবে কথাগুলো ঠিকমত গুছাতে পারে না।অনেক উদাহরন চলে এসে বক্তব্য অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়।অতীতে মানিকলাল এজাতীয় কথাগুলো শুনেছে,কিন্তু সমাধান দিতে পারেনি।
 অফিসে এরিকার উপস্থিতির কারনে দুঃখগুলো সহজেই বাষ্প হয়ে যায়। ফর্সা রঙ আর স্লিম চেহারার চেয়ে ওকে আরো বেশী কাবু করে ফেলে মেয়েটির সহজ চলাফেরা,নিজের কাজটা ভাল করে করার চেষ্টা। কি কারনে মেয়েটিকে নিয়ে দীপ ভাবতে থাকে আর কি যে ভাবে সে দীপ বুঝিয়ে বলতে পারবে না। ভিনদেশী ঐ মেয়েটার সাথে প্রেম করা সম্ভব নয় , ওর সাথে সংসার বাধা সম্ভব নয় , শুধু শারীরিক কারনে ওর সাথে যৌন সম্পর্ক সম্ভব নয়  তবু ওকে নিয়ে ভাবনার আকাশে উড়ে বেড়াতে দীপের ক্লান্তি নেই।তবে মন্দের ভাল এই যে পিটার ওর সাথে মাখামাখি করার চেষ্টা তো করে না মোটেই।
 মানিকলাল মুম্বাই এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবে বলে ব্রাঞ্চ মিটিং শুরু হল।মানিকের উপস্থিতি,পিটারের কাছে অনুগত স্টাফ হিসেবে প্রমানের প্রচেষ্টা,এরিকার উপস্থিতির কারনে দীপ তার পারফরম্যান্স নিয়ে সতর্ক হয়।আলোচনাগুলো অবশ্যই অফিশিয়াল ইংলিশে হচ্ছিল।
 মানিকলালকে একা পাওয়ার আশায় দীপ তাকে গাড়ীতে তুলে দিতে আসল।, স্যার,আমার কোরিয়া যাওয়ার ব্যাপারটা একটু দেখবেন?
মানিক লাল বলল,কালকে স্যান্ডুইচ মিটিংযে কথাটা তুলো
 স্যান্ডুইচ মিটিং অনেকটা সাপ্তাহিক মিটিং এর মত।প্রতিটি ব্রাঞ্চ কে তখন স্কাইপে কোরিয়ার হ্যাড অফিসের সাথে বসতে হয়।কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে মানিক তো থাকবেই। কিন্তু ইন্ডিয়ান অফিস থেকে একজন স্টাফ হ্যাড অফিসে নিয়ে যাওয়ার মত বিষয়ে পিটারের ভূমিকা কি হবে কনফিউজড হয়ে গেলে মানিকলালের উপদেশই মাথায় আসে।
 বিকালবেলা গ্রেস আর এরিকা একটু তাড়াতাড়িই অফিস থেকে বেরিয়ে গেলে পিটার দীপকে আর নীতীনকে ওর টেবিলে ডেকে অভিযোগটা পেশ করল।এই অফিসে বসে যদি কেউ অফিস আওয়ারে কম্প্যুটারে পর্নো সাইটে যায় তাহলে কি সেটা গ্রহনযোগ্য?
 পিটার সরাসরি বলল না,এই কাজটি কে করে?
আমি আমার কমন সেন্স থেকে একটা কথা বলছি।কয়েক সেকেন্ড পর দীপই নীরবতার কাঁচ ভাঙ্গার চেষ্টা করি যুক্তির হাতুড়ি দিয়ে।একজন পুরুষ মানুষ , ধরা যাক তার বয়স ৪৫ এর নীচে , তার কাছে কম্প্যুটার ও ইন্টারনেট কানেকশন আছে , কিন্তু সে একবারের জন্যো পর্নো সাইটে যাচ্ছে না সেটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য।
 নীতিন একটু নড়েচড়ে বসে আটকে রাখা শ্বাস ফেলে,পিটার মনোযোগী চোখ নিয়ে তাকায়।
দেখো এটা নয় যে অফিস আওয়ারে আমরা মেশিনের মত কাজ করি ।দীপ বলতে থাকে। অফিসের কাজ করতে করতে আমরা তো নিজেদের কাজেও ইন্টারনেট ব্যাবহার করি।ফেসবুক, নিজেদের পার্সোনাল ইমেইল, ইউটিঊব।এখন কারো যদি পর্নো সাইটে কোন কাজ থাকে কি আর করার।
 পিটার কথাগুলো বুঝতে পারল কি না বুঝা গেল না।বলল, দীপ,আমার মনে হয় ক্লেয়ারকে তুমি পড়াতে পারবে।কালকেও তুমিই চলে যেয়ো ওকে পড়ানোর জন্য।
 অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়ে নতুন শাস্তির আদেশ খুব একটা বিচলিত না করলেও অন্য একটা বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
 আর মানসী?আমাদের নিয়োগকৃত শিক্ষক?
 ওকে জাস্ট বলো, কয়েকটা দিন অপেক্ষা করার জন্য।পিটার কম্প্যুটারে চোখ রাখতে রাখতে বলল।
যদি কালকেও চুপ করে বসে থাকতে বলে?
চুপ করে বসে থাকবে।পিটার বলল।আদেশ,উপদেশ কিংবা মতামত,সেটাই শিরোধার্য করতে হবে দীপকে।

চার

আটতলা একটি ফ্ল্যাটবাড়িতে কোম্পানী দুটো ফ্ল্যাট নিয়েছে।পার্কিং স্পেস আর দেওয়াল ঘেষে কিছু গাছ থাকলেও পার্ক নেই। পাশের হাউজিং এ পার্ক আছে, সেখানে বার্থডে পার্টির আয়োজনও হয়।ক্লাউন এসে হাত মেলায় নিমন্ত্রিতদের সাথে। আর একটু দূরেই আছে ব্রম্মা সানসিটি , সেখানে সুইমিং পুল আর ক্লাব হাউসও আছে। এই তুলনামূলক আলোচনায় প্রমানিত হয় যা দীপরা গরীব এলাকায় বাস করে ।
 দুইটা ফ্ল্যাটের একটাতে মেল স্টাফ,অন্যটাতে ফিমেল। দুটোই তিন বেড রুমের,দুটোটেই একটা বেড্রুম খালি পড়ে থাকে , সেটা গেশটদের জন্য।খাওয়ার ব্যাবস্থা দীপদের ফ্ল্যাটেই,তাই মেয়েদের আসতেই হয় সেখানে।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটা হল ডিনারের টাইম।ডাইনিং টেবিলে পিটার বলল, আই ডোন্ট নো হোয়াই, আই ফাউন্ড কমন ইন্ডিয়ানস হ্যাভ এ টেন্ডেন্সী নট টু ওয়ার্ক।দে আর ভেরী আইডল।
 যথারীতি পিটার, এরিকা, গ্রেস আর দীপ- এই চারজন খাওয়ার টেবিলে। গ্রেস বয়সে সবচে সিনিয়ার আর মহিলা বলে ওর কোন বিষয় নিয়ে পিটার কথা বলবে না।তাহলে  কি দীপকেই অলস বলছে?
 যখনই আমি দুপুরবেলা এপার্ট্ম্যান্টে আসি , এসে দেখি মেইড টিভী দেখছে, কুক ঘুমাচ্ছে।পিটার তার মন্তব্যের কারন জানায়।
 আমিত নেপালী। মেইড আশা মারাঠী , কিন্তু খ্রিষ্টিয়ান। দীপ ওকে জিগ্যেস করেনি কখনো কিন্তু মনে হয় ওরা দলিত শ্রেনীর লোক ছিল।
 শালা! দুপুরবেলা কাজ শেষ হয়ে গেলেও কি তোর আন্ডারওয়ার শুকঁবে?রাগ চরচর করে চড়তে থাকে দীপের।অমিত সকলের লাঞ্চ স্কুটিতে করে অফিসে পৌছে দেয় ,তারপর তার কাজ অবশ্যই কম।
  এরিকা তেমন কথা বলছে না। যদিও গ্রেস মাঝে মধ্যে এটা ওটা  কথা বলছিল।
 পিটার বলল, দীপ , টেল মি ওয়ান থিং!তুমি কি খাওয়ার সময় তোমার হাত ধোও?
  একমাত্র দীপই হাত দিয়ে খাচ্ছিল,বাকী সবার হাতে চামচ।এরিকা আর পিটার তো কোরিয়ান খাবার খাচ্ছে ,তাদের চামচ দরকার।কিন্তু গ্রেস ইন্ডিয়ান খাবার খেলেও চামচ ব্যাবহার করছে।দীপ একা হয়ে গেল।
হ্যাঁ,অবশ্যই।
প্রত্যেকবার?
ইয়েস।
 ইউ নো গ্রেস। এরিকা মাথা নিচু করে খাচ্ছিল বলে পিটার একমাত্র তৃতীয় ব্যাক্তি গ্রেসের কাছেই পেশ করে কথাটা। যখনই আমি কাউকে দেখি হাত দিয়ে খাচ্ছে , আমার মনে হয় দে আর স্টার্ভিং এন্ড ডিরেক্টলি কেইম ফ্রম জাঙ্গল।
 দীপকে বাচাঁল গ্রেস। সে একটা গল্প বলল।একবার মিস্টার পার্ক,কোম্পানীর এম ডি, ইন্ডিয়াতে এলে একটা ইনভাইটেশন ছিল সাউথ ইন্ডিয়ান ফ্যামিলিতে। একটা স্কুলের ডিরেক্টরের বাড়ীতে।ওরা আয়োজন করে ছিল সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার।সেদিন ওরা খাবারের সাথে চামচ দেয়নি।স্কুল ডিরেক্টর বলল,হাত দিয়ে খেলে তবেই রিয়েল টেস্ট পাবেন।সেদিন মিস্টার পার্কও হাত দিয়ে খেয়েছিল।
 খাবার পর দীপ রুমে এসে আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়।শালা,তুমি কি আদমী হো,ইয়া পানি? কুত্তাকে যখন বেন্দা দিয়ে মারা উচিত ছিল তখন তুমি ওর মাথায় হাত বুলাচ্ছিলে?

(শেষাংশ পরের সংখ্যায় ...)



দেবাশিস কোনার

জবাই মস্তান

    
জবাই মস্তানের জীবন যে কি ভাবে গড়ে উঠল তা সাগর নিজেই জানে না ?এ এক ভবিতব্য ।পালা বদলের পালায় সে কেবল একজন অভিনেতা মাত্র । কিন্তু তার অভিনয় যে তাকে শেষ পর্যন্ত এমন এক গভীর খাদে নামিয়ে দেবে, তা সে নিজেই জানতো না । এখন সাগর মিডিয়ার কাছে জবাই মস্তান হিসাবেই পরিচিত । তার যে একটা পরিচয় আছে , সেও যে একজন মানুষ , তারও যে বাবা -মা – দাদা – ভাই – বোন প্রমুখ থাকতে পারে ; সে কথা যেন তারা বিশ্বাস করতেই চায় না।
সাগর ওরফে সাগরিদ হাসান বেশ কয়েকবার পুলিশের কাছে ধড়া পরেছে , জেলও খেটেছে । সরকারি কোন প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে দেয় নি সে তাদের জঙ্গল ঘেরা গ্রামে । সে আজ প্রায় আট বছর আগের কথা ।সরকারি কোনও আধিকারিক অথবা পুলিশ ঢুকতে ভয় পেত তাদের গ্রামে । সাগর সে সময় হিরো ।
     প্রতিদিন তাদের আন্দোলনকে সমর্থন করতে দলে দলে কলকাতা থেকে নেতা – আইনজ্ঞ – পণ্ডিত – গায়ক – নায়ক মানে সিনেমার হিরো থেকে নাটকের কুশীলব এমনকি উকিল – হাকিম – ডাক্তার – মোক্তার সকলেই আসতেন । এসে হাওয়া দিতেন । টাকা দিতেন । উৎসাহ দিতেন । পাশে চিরদিন থাকবার কথা বলতেন । বুক চিতিয়ে লড়বার কথা বলতেন । বলতেন মারকা বদলা মারের কথা ।
     সাগর ওনাদের ভোকাল টনিক খেয়ে অতি উৎসাহে নেমে পরত কাজে । আজ ওর ভালবাসার মানুষটাই ওকে ছেড়ে চলে গেছে ।যাবেই বা না কেন ? তখন তো সাগর বাতাসে উড়ছে । তার চারপাশে কত কত মানুষের ভিড় । সে নেতা । পরিবর্তনের আন্দোলনের এক অগ্রগামী সৈনিক । সে সময় রুপাই তার কাছে আসতে চাইলেও পাত্তা পেত না । দূর থেকে তাকে দেখত । অথচ এই রুপাইকে সে প্রানের থেকে বেশি ভালবাসত । আসলে সেই সময়টায় কি এক নেশা সাগরকে অন্য পথে চালিত করত । দু হাতে অর্থ । যখন খুশি নেশার জিনিস হাতের কাছে চলে আসত । খাওয়া – পরার অভাব ছিল না ।
     জঙ্গলের ভিতর পুলিশ এসে রেড করবে । এই খবর তাদের কাছে পৌঁছে যেতেই তারাও তৈরি হয়ে নেমে পরল অ্যাকশনে । বেচারা এস আই ! তাকে জবাই করে বস্তায় পুরে ফেলে দেওয়া হল নদীর জলে । আর তারপর থেকেই সাগরের নাম ফেটে গেল । সে হয়ে গেল জবাই মস্তান । আগে বোঝে নি সাগর । এখন বোঝে এই নামই তার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে । পরিবর্তন এনেছে তারা আর জেল খাটছে তারাই । যারা শুধু হাওয়া দিয়েছে তারা আজ মসনদে ।
     মাঝে মঝে ভাবে সাগর, সে একবার অন্তত যাবে কলকাতা । লুকিয়ে হলেও যাবে । গিয়ে জিজ্ঞেস করবে, ‘সে কেন মস্তান হল ? তাকে কারা মস্তান বানিয়েছে ? কেন তাকে পুলিশের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে হবে' ? সাগর জানে হাজার চেষ্টা করলেও সে আর তার আগের জীবনে ফিরতে পারবে না । সাগরিদ হাসান থেকে জবাই মস্তান হতে তার যতটুকু সময় লেগেছে সেখান থেকে ফিরে আসতে তার আরও অনেক সময় লাগবে ।সাগর ফিরে আসবেই ।

         

পলাশ কুমার পাল

বেইমান

ডুমুর গাছের পাতায় তৈরি আপন বাসায় টুনটুনি পাখির আসাযাওয়া দেখতে দেখতে ছোট্ট রিমির মন ভরে যাচ্ছিল। সেই ছোট্ট টুনটুনিটি যেন তার মায়ের মতো । মাঝে মাঝে কোথায় উড়ে যাচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পর মুখে করে খাবারএনে তার ছোট্ট বাচ্চা দুটিকে খাওয়াচ্ছে। তার মা যেমন সংসারের কাজে হারিয়ে গিয়েও হঠাত্ এসে তাকে খাওয়ায়।কখনো বা সেই পাখিরা খেলায় মত্ত। রিমিদের ভাড়া ঘরের বাইরে দেয়ালের পাশে ঝোপঝাড়টাই তাদের আনন্দের হাট।বিরাট শহরের ঘিঞ্জিতে এটাই যেন তাদের সবুজ পৃথিবী। রিমিও পড়া ভুলে সেই হাটে আনন্দ কুড়িয়ে নিচ্ছিল।

পড়তে বসতে রিমির ভালো লাগে না। এর জন্য মা-বাবা বকাঝকাও করে। শহরের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির পাঠ্যসূচীসাতবছরের রিমির মাথায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এই টুনটুনির সঙ্গে স্বচক্ষে ও মানসচক্ষে পরিচয়ের পর থেকে এখনসে বিছানায় বই নিয়ে বসতে আগ্রহী হয়। আসলে পড়ার নেপথ্যে জানালা দিয়ে পাখিগুলিকে দেখার কৌতুহল।

বইয়ের পাতা খুলে তখন সে বাইরে তাকিয়েছিল। টুনটুনি পাখিটিকে দেখে ঠাকুমার কাছে শোনা ছড়াটা মনে পড়ছিল'টুনটুনিতে টুনটুনাল...' । পাখিটার মতো সেও যদি ঐরকম একটি বাসা পেত, যদি সে উড়ে বেড়াতে পারত। তার তোডানা নেই, তবে? সে ছড়াটি শোনাতে চাইল সেই পাখিগুলিকে। কিন্তু মনে পড়ছে না সবটা। রিমি মনে মনে ভাবে ঠাকুমাযদি থাকত, তাহলে ধরিয়ে দিত। ঠাকুমাও তো সেই কবে আকাশে নক্ষত্র ধরে আনতে গেছে। এখনো ফেরেনি। ঠাকুমাটা বড্ড দুষ্টু। মিছে কথা বলে।

এতকিছু ভাবনার মাঝে বুকের মধ্যে একটা চাপা ভয়ও কাজ করছিল। গতকাল বাবার মুখে শুনেছিল বাড়ির পাশে এইঝোপঝাড়গুলিকে পরিষ্কার করার কথা। ওদের পাশের বাড়ির দীপককাকু কথাটি বলছিল। এই কথা শোনার পর থেকেরিমি কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। তার বাবা তাকে আশ্বস্ত করেছিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, 'বেশ কাটব না!'

বাবার কথায় আশ্বস্ত হলেও একটা ভয় চোরাপথে মনকে ভরিয়ে তুলছিল। দীপককাকু যদি কেটে ফেলে! তাহলে?পাখিগুলি যাবে কোথায়? বিদ্যালয়ে প্রতুল স্যারের কথাগুলি মনে পড়ছিল। পৃথিবীতে সকলের বাঁচবার সমান অধিকারআছে। বিশেষ করে গাছ-পালা, পশুপাখির। কারণ পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির ইতিহাসে এরাই আদি, তারপর মানুষ। অথচমানুষ নিজেদের মতো পৃথিবীকে সাজাচ্ছে। রিমির মনে হচ্ছিল মানুষগুলি বড্ড দুষ্টু! তার বাবাও। কেন ঐরকম ঝোপকাটার কথা বলেছিল!

দুপুরে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও রিমি টুনটুনিকে হাত নেড়ে শুয়েছিল। কথা দিয়েছিল বিকালে আবার তারা মিলিত হবে।বাবা জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে তাকে নিয়ে শুয়েছিল। রবিবার। বাবা ঘরে থাকলে রিমির এটাই খারাপ লাগে। ঘরেরজানালা খুলে ঘুমাতে পারে না, টুনটুনিদের দেখতে দেখতে ঘুমকে ছোঁয়া হয় না!

বিকালে ঘুম থেকে উঠে রিমি বাবাকে দেখতে পায় না। কোথায় গেল? মা তো শুয়ে আছে... বাবার প্রতি রাগ হলেওবাবাকে সে ভীষণ ভালোবাসে। তাই সে  'বাবা! বাবা!' বলে ডাকতে শুরু করে দিল। বাবা তাকে কত ভালোবাসে, যা চায়তাই এনে দেয় মা 'না' বললেও। বাবা ঘরে থাকলে বাবাকে ছাড়া একমূহূর্ত ভালো লাগে না তার।

বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে তার মনে পড়ে যায় টুনটুনির কথা। হাত বাড়িয়ে জানালার পাল্লাটা খোলে। জানালা বন্ধ থাকাঅন্ধকার ঘরে আলোর প্রবেশ চোখে সয় না। চোখ রগড়াতে রগড়াতে বাইরে তাকিয়ে দেখে সব ঝোপঝাড় কাটা হয়েগেছে। বাবা আর দীপককাকু সেই কাটা ঝোপঝাড়গুলি দূরে ফেলে দিয়ে আসছে। রিমি চিত্কার করে কেঁদে ওঠে, 'বাবা!বাবা! এ কী করলে? তুমি যে কথা দিয়েছিলে?'

রিমির মন খারাপ হয় যায়, অভিমানে চোখে জল আসে। তার বাবা তার কথা শুনল না। কাল কেন তবে বলেছিল? তারবাবাই তো পাখি পুষতে ভালোবাসত। অথচ... তবে কি বাবা খাঁচায় পাখিদের বন্দী করতেই ভালোবাসে? পাখিদেরউড়তে দিতে নয়? এই খাঁচাই কি পাখিদের প্রতি ভালোবাসার উপহার? টুনটুনিদের সুখকে নষ্ট করার জন্য বাবার প্রতিতার গভীর ভালোবাসা ফিকে হয়ে গেল। বাবাও আর সব দুষ্টু মানুষের মতো। বেইমান! পৃথিবীকে, উদ্ভিদকে,পাখিদেরকে নিজেদের মতো স্বাধীন থাকতে দেয় না। অভিমানে সশব্দে জানালা বন্ধ করে সে বালিশে মুখ গুঁজে দেয়।


অলভ্য ঘোষ

স্বপ্নের-ফেরিওলা
                                                                                    
একটা কাঠঠোকরা পাখি সাত রঙ্গের ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল সায়ক গাছটার কাছে যেতেই ; তার ডানা থেকে একটা পালক খসে পড়ে তখনো হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে  সায়কের মুখের সামনে থেকে পড়লো মাটিতে । সায়ক সেটা হাতে তুলে চোখ বন্ধকরে গালে বুলল । চোখ বন্ধ অবস্থায় সায়কের মনে হল আকাশে রামধনু আকাশ ছেড়ে তার পায়ের কাছে যেন এক মহাসমুদ্র নির্মাণ করেছে । তার পর সেই রং ধার করে বৃহৎ-সুন্দরী গাছটার আশেপাশের চাতাল জুড়ে অপরিচিত সব অপূর্ব ফুলের বাগিচায় ঢেকে গেল মুহূর্তে । হরেক রংয়ের প্রজাপতিদের ঢল নামলো নিমিষে । বৃষ্টির মতো তারা ফুলের ওপর ঝরে পড়লো । কয়েকটা সায়কের মাথায় বুকে উড়ে এসে বসতে ভুল করলো না । সায়কের একবার হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি বসা প্রজাপতিটাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করার ইচ্ছে হল ; পরক্ষনেই মনে হল যে তার মনের এত কাছাকাছি এসে ধরা দিয়েছে হাত দিয়ে ধরতে গিয়ে যদি সে উড়ে যায় । ওরা জানে মানুষ ফুলছেরে গাছ কাটে , পশুদের কাছে এমন ভয় নেই । লোভ সংবরণ করে প্রাপ্তি টুকুতেই যখন আনন্দ পাচ্ছিল সায়ক ; হটাৎ একটা ঠাণ্ডা নরম স্পর্শ সে তার পায়ের ওপর অনুভব করে । সাপের গা ঠাণ্ডা হয় ; আর  বাগানে সেটি থাকা কিছু অসম্ভব নয় । সাপ অনুমানেই সায়ক চোখ খুলে দেখল ওটা একটা গিরগিটি । করাতের খাঁজ কাটা পিট , ডায়নোসার মতো দেখতে বড় গিরগিটিটা শুকনো পাতার ওপর থেকে করমর শব্দ তুলে ঘার ঘুরিয়ে সায়কের দিকে দেখতে দেখতে গাছটার আড়ালে পালায় । সায়ক চোখ খুলে কিছুটা হতাশ হয়ে ছিল ফুলের বাগিচার বদলে শুকনো পাতার আবর্জনায় প্রজাপতিদের সমারোহের বদলে এই গিরগিটিটাকে আবিষ্কার করে । তবে সে রুক্ষতা কাটিয়ে পরিবেশের সাথে রং মিলিয়ে মিলিয়ে সায়ক আর প্রকৃতির সাথে লুকোচুরি খেলা বহুরূপী গিরগিটি টাকে সায়কের এবার বেশ ভাল লাগে । গিরগিটি টাকে যখন আর গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়ায় দেখা যাচ্ছিলো না তখন সায়ক সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতেগেলে একটা কাঠবেরালি তার সামনে দিয়ে ছুটে পালায় ।
সে যেন বলে ;
- বাঁচতে চাও তো পালাও এখান দিয়ে ।
সায়কের মনে হল এ তার শোনার ভুল । সে জানে ডারউইনের তথ্য ; বাঁচতে হলে এ পৃথিবীতে পালানো চলেনা লড়তে হয় । যে লড়ে সেই বাঁচে । যে লড়তে জানে না সে বাঁচতেও জানেনা । মৃত্যু এখানে ছায়ার মতো মানুষের পিছু ধাওয়া করে আর মানুষ সম্মুখ সমরে তাকে বারবার পরাস্ত করে জীবনকে রাজ মুকুট পড়ায় । পিছু পালালেও যখন মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই নেই ; বুদ্ধিমানের কাজ মৃত্যুকে বরন করে তার মোকাবিলা করা । মাথায় চড়িয়ে তাকে শাসন করতে না দিয়ে পোষা কুকুরের মতো বস করা । গাছের পেছনে গিয়ে সে দেখল গাছের গায়ে একটা বিশাল গর্ত আর সেই গর্তের গা বেয়ে সাড়ি সাড়ি লাল কাঠ পিঁপড়ে মুখে করে ডিম নিয়ে উদ্বাস্তুদের মতো দেশান্তরিত হচ্ছে ।
সায়ক মনে মনে যেন তাদের জিজ্ঞেস করলো ;
- কোথায় চললে তোমরা ?
তারা যেন চি চি করে বলল ;
- এক স্বপ্ন-পুরিতে । ভারি সুন্দর স্বপ্নের মত সে জায়গা ।
সায়ক বলল ;
- সেখানে কী কী রং আছে ?
তারা বলল ;
- হরেক । শুধু দেখার মতো চোখ চাই ।
সায়কের মনে হল পিঁপড়ের সাথে কথোপকথন শোনার কান ও অনেকের থাকে না । তার চেনা বন্ধুদের অনেকের মুখ তার মনে পড়লো ; বধির আড়ষ্ট সেই পাথরের মতো মুখ গুলোর ওপর সায়ক দেখল ঝলসে চলেছে নানা ভি ডি ও গেমের আলো আঁধারি । যখন মেশিন গানের আওয়াজ ; বাইকের রেস ; থ্রিলার মিউজিকের ককটেল সায়কের শিরা উপশিরা বেয়ে চৈতন্যকে তার বন্ধুদের মতো বসকরে নিচ্ছিল ;সায়ক কানে হাত চাপাদিয়ে চোখ বন্ধ করেনিল । সমস্ত আওয়াজ ঢাকা পড়ে গিয়ে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো সমস্ত চরাচরে । ধীর স্থির ধ্যান ভাঙ্গা ঋষির মতো সায়ক চোখ খুলে তাকাল বুড় গাছটার প্রকাণ্ড কাণ্ডের গায়ে ক্ষোদিত বিশাল আকার গর্তটার দিকে । সে দেখল পিঁপড়েদের মিছিল শেষ হয়ে গিয়েছে । হরেক রং - হরেক সাদ সায়কও পেতে চায় স্পর্শ ,গন্ধ , অনুভবে হৃদয়ের চোখ দিয়ে  ; মস্তিষ্কের বুদ্ধি-দিয়ে ; এই মহাবিশ্বের তিলবৎ সৌন্দর্য ও যেন তার দৃষ্টির অগোচরে গিয়ে চেতনাকে অভিষিক্ত করতে ভুলে না যায় । তাই সায়ক স্বপ্ন-পুরি এক স্বপ্নের রাজত্বে যাবার উদ্দেশ্যে বড় গর্তটার কাছে এগিয়ে গেল  ।


সায়ক দেখতে পেল বড় গর্তটার গা বেয়ে বৃহৎ গাছটার কাণ্ডের  ভেতর একটা সিঁড়ি পথ অন্ধকার গুহার প্রবেশ দারের মতো এগিয়ে চলেছে ভূপৃষ্ঠের কেন্দ্রের দিকে । মশালের মতো জোনাকির আলো তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল । পথে সায়ক দেখতে পেল সিঁড়ির অনেকটা দূরে সেই গিরগিটি টাকে । তার কিছু পেছনে পিঁপড়ের মিছিল টা এগিয়ে চলেছে । সায়ক বুঝল সকলেই চলেছে  ওই স্বপ্নের রাজ্যের দিকে । হটাৎ অন্ধকারে ওৎপেতে বসে থাকা একটা পেঁচা উড়ে এসে গিরগিটি টায় ছোঁ মারে ; ধরে নিয়ে চলে যায় । কয়েক টা বাদুর ফরফর করে উড়ে চলে যায় সায়কের মাথার ওপর দিয়ে বিকট আওয়াজ করে । পিঁপড়ে গুলো মিছিল ভেঙ্গে ছোটা ছুটি করে । সায়ক প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও নিজেকে সংযত করে। সে জানে ভয়কে প্রশ্রয় না দিয়ে জয় করতে হয়  । না হলে ভয়ের আসংখ্যায় জীবের অনেক মূল্যবান কার্য অধরা থেকে যায় । দূরে সিঁড়ির শেষে সায়ক দেখতে পেল আলোক সাগরের ঢেউ । অসম্ভব রোমাঞ্চ নিয়ে যখন সায়ক সিঁড়ির কিনারায় গিয়ে পৌঁছল সিঁড়ির ওপর বসে আকাশ থেকে পৃথিবী দেখার মতো দেখল একটা নতুন দেশকে মাকড়সার জালে বেষ্টিত সিঁড়ির শেষ প্রান্তের গহ্বর মুখ থেকে। এখানে নাগরিক সভ্যতার ধূয়া -গ্যাস ,গাড়ি- ঘোড়া , বড় বড় বিল্ডিং , লাইট পোস্ট ,ফ্লাইওভার, কারখানার চিমনি কিংবা ওয়ারলেস - টি.ভি অথবা টেলিফোনের টাওয়ার নিদেন পক্ষে খাবার জলের উঁচু ট্যাঙ্ক কিছুই দেখা গেল না । দেখা গেল শুধু একটা সমুদ্র আর রাশি রাশি ফুল আর ফলের বাগান সমুদ্র তটে । সে সব বাগানে কাজকরা মানুষ গুলোকে ওপর থেকে পিঁপড়ের মতো দেখাল সায়কের চোখে । এদিকে সেই মিছিলের লাল কাট পিঁপড়ে গুলো সিঁড়ির শেষের এই মাকড়সার জালে আটকে ছটপট করছিল । বেশির ভাগের মুখ থেকে ডিম গুলোখসে পড়েছিল সমুদ্রের জলে । এটুকু ভেবে পিঁপড়েরা আস্বস্হ ছিল তারা সে সুন্দর দেশে পৌঁছাতে না পাড়লেও তার ছানারা পাবে এক সুন্দর পৃথিবীর সাদ ।
সায়ক ভাবে যে জাল থেকে একটা পিঁপড়েও গলতে পারেনা সেই মিহি জাল টপকে সেও বা সে দেশে যাবে কিকরে । মাকড়সার জালের ফাঁক থেকে সে আবার দেশটাকে দেখে ; সমুদ্রের বুকে বড় বড় জাহাজ ভাসছে না । ছোট একটা ডিঙ্গির ও দেখা মেলা ভার । শুধু রূপোর মতো চিকচিক করা কূল কিনারা হীন জলরাশি যেন জ্ঞান গর্ভ গভীরতা বুকে ধরে অপেক্ষা করছে কোন এক দেব দূতের যে এসে ডুব সাতরে  তার গভীরতায় পৌঁছে সঞ্চয় করবে জ্ঞানের মণিমাণিক্য ।

কিন্তু সে দেবদূত কোথায় ?
অনেক টা ঝুঁকে অনেক ওপর থেকে সায়ক সেই দেব দূতের সন্ধান করতে করতে হটাৎ হরকে পড়লো মাকড়সার জালে ।
বোধয় সায়ক কে দেখেই মাকড়সা টা কোথাও কাছাকাছি লুকিয়ে পরেছিল । সে জালে জড়িয়ে পড়তেই লোমশ বড় বড় ঠ্যাং গুলো নিয়ে সে জাল বেয়ে সায়কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো । মুখ দিয়ে জাল বুনে সায়কের হাত পা বেঁধে ফেলার চেষ্টা করলো সায়ক যখন হাতপা ছুড়ে তাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিল সহায় হল সরবো হারা পিঁপড়ে গুলো । তারা মরণকামড় দিয়ে বসলো মাকড়সার সারা দেহে ।
সায়ক সুযোগ বুঝে হাতদিয়ে মাকড়সার জাল ছিঁড়তে লাগলো সে জাল এতো মজবুত আর মায়াবী কষ্ট করে ছিঁড়লেও সাথে সাথে জোড়া লেগে যায় । অনেক কষ্টে জালে একটা বড় ছিদ্র বানিয়ে সেখান থেকে সায়ক মহাকাশচারীর পৃথিবীতে ফিরে আসার মতো টুপ করে ঝরে পরে সমুদ্রের জলে ।

অনেক ওপর থেকে পড়ায় সমুদ্রের অনেকটা গভীরে চলে যায় সায়ক । সমুদ্রের তলায় কোরালের নগরের ওপরে মাছদের ঝাঁক যুদ্ধের এরোপ্লেনের মতো পাক খাচ্ছিল । সায়ককে দেখে একটা অক্টোপাস সড়ে গেলে কোরালের ওপর রাখা তার পেটের তলায় একটা নীল জ্ঞান নীলায়  সূর্যের আলো পরে নীল শিখায় জলের ওপর প্রতিফলিত হয়ে পড়ে । ডুবুরির মতো ডুবসাঁতারে সেটার কাছে গিয়ে  সায়ক সেটা সংগ্রহ করে । নীলা টা হাতে তুলে নেবার সময় জেলির মতো একটা চটচটে পদার্থ কোরালের গা থেকে তার হাতে সে অনুভব করে ।
তার তালু বদ্ধ নীলা টা সায়কের যেন মনে হল কথা বলছে ।
- আমায় সঞ্চয় করে তোমার কী লাভ ?
সায়ক বলে ;
- বা জ্ঞান অর্জন করতে কে না চায় ।
নীলা বলে ;
- সে তুমি করেছো । অনুসন্ধান করতে করতে তুমি আমার এতো কাছে পৌঁছে আমার সম্পর্কে সমস্ত কিছু জেনে নিয়েছ । আমার  বাহ্যিক নীল শরীর টা সঞ্চয় না করলেই নয় । জ্ঞান তো মগজে সঞ্চিত; সম্পদ সঞ্চয় করে কী লাভ । আমার জন্য ; চোরে সিঁদ কাটবে , ডাকাতে তোমায় লুট করবে,লোভী প্রতিবেশী বা নিকট আত্মীয় তোমাকে ঠকাবে , প্রিয় বন্ধু বিশ্বাস ঘাতকতা করবে । এই সবকিছুই যখন একটা পাথরের টুকরোর জন্য তা হলে সেটা বর্জন করনা কেন বাপু । যে সম্পদ মানুষে মানুষে সম্পর্ক নষ্ট করে ; জানি না তোমরা মানুষ সে সম্পদ অধিকারে কী লাভ পাও । তোমার অন্তরে সিঁদকাটার কিংবা মস্তিষ্কে ডাকাতি করার সাধ্যি কার নেই । চুরি ডাকাতি দুরের কথা তোমার মনের মনি মাণিক্য যদি বিশ্বাস ঘাতকতা করেও কেউ নিতে চায় ধরা পরে যাবে ।
সায়কের মনে হল সে নতুন কত কিছু শিখল । যা তার পড়ার বইয়ের কোথাও লেখানেই । নীলাকে ধন্যবাদ জানাবে বলে সে যেই না হাতের মুঠো খুলল দেখল শুধু তার হাতের মধ্যে একরাশ বুজ-বুজ সমুদ্রের ফেনার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে । সায়ক হতাশ হল না বুঝল কোনকিছুর প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির চেয়ে বড় ভেবে দেখা সেটা আদপে কতটা  জীবনের প্রয়োজনীয় ।
সে ডুবুরির মতো যখন ওপরে ভেসে উটতে লাগলো দীর্ঘায়ু একটা কচ্ছপ তার পাশ থেকে ভেসে গেল । খরগোসের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় কচ্ছপের জেতার গল্প সকলে জানে কচ্ছপের মন্থরতা সম্পর্কে অভিযোগ সর্বজন অবিদিত । তবে এই উভয় চর টি এখন তার সম্পর্কিত সমস্ত অভিযোগ খণ্ডন করে সাঁ সাঁ করে সায়কের সামনে থেকে ডাঙ্গার দিকে ভেসে চলল ।
যাবার সময় সে যেন সায়কের কানে কানে বলে গেল ;
-সময়ের সাথে তাল-মিলিয়ে গতিশীল হয়েছি আমরা । বলতে পারো এটা আমাদের অভিযোজন ।
সায়ক বলে ;
-ধীরে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে সে চলে । লম্বা দৌড় জিততে হলে দম সঞ্চয় করা খুব জরুরি ।
সায়ক যে অভ্রান্ত প্রমাণিত হল মাঝপথে কচ্ছপকে হাঁপিয়ে হাবুডুবু খেতে দেখে । লুকিয়ে পড়া লাল ক্যাঁকরা দের গর্তের পাশে সায়ক যখন পারে উঠে বালুকা তটে এক বুক নিঃশ্বাস নিয়ে বেশ কিছুটা সতেজ হয়ে উঠে সে দেশ দেখতে যাবার উপক্রম করছিল । কচ্ছপ টা পারে পৌঁছায় ।
সায়ক বলে ;
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই কিন্তু জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার; তোমার আয়ু তিনশো বছরের কতকিছু শিখবে বলো দেখি ।
এমুহূর্তে সেই কচ্ছপ যে কি শিক্ষা পেল হাঁপিয়ে উঠে সে কিছুই বলতে পারলো না ; হা করে শুধু সমুদ্র পারের বাতাস নিতে থাকলো ।
 তখনি একটা অতভূত বাঁশির সুর দূরে কোথায় বেজে উঠলো । সেই বাঁশির সুরের মূর্ছনায় মোহিত হয়ে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে সায়ক এগিয়ে চলল নতুন দেশের সুর সাগরের দিকে । সাগর য়ই বটে ; সমুদ্রের চড়ার বড়  বাঁকটা পেরতেই বাঁশির সুরটা অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের কনসাটে রূপান্তরিত হয়ে উঠেছিল । যা সে আগে কোন দিন শোনেনি । সায়ক যখন বিচিত্র সুরের বাদ্য যন্ত্রের উৎস স্থলে গিয়ে পৌঁছল দেখল সে এক মহা মিলন সমারোহ । আমাদের দোতারা, বীণা, সন্তুর তো আছেই; সাথে আছে প্যরাগুয়ান বীণা, জাপানি কোটোত্রিনিদাদের ইস্পাত চাটুচীনা ইয়ানজিকিন , অস্ট্রেলিয়ান ডিডজেরিডোও আর কতকি ।বিভিন্ন বর্ণের ; বিভিন্ন পোশাকের ; নানা রকম বাদ্যযন্ত্র ধারী একদল লোক ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে এই মিলন মেলায় তাদের ভাবের আদান প্রদান করছে সুরের মাধ্যমে । আনন্দের সুরে প্রত্যেকে নাচছে ; আবার করুন সুরে সকলে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে উঠছে । বিষণ্ণতা হতাশার সুর কার কাছে আশার হতে পারে না। সায়ক এই প্রথম বুঝল একমাত্র সুরের  একটা সার্বজনীন ভাষা আছে । যেমন চিত্র দেখে চিত্রকারের মনের ভাব বুঝি আমাদের সাথে চিত্রকারের মনের সংযোগ ও জারণে সংমিশ্রণ হয় । সঙ্গীতেও এ শক্তি বিদ্যমান । সঙ্গীতে যদি বিদেশী ভাষার ব্যাবহার থাকে আর আমরা যদি সে ভাষা নাও জানি এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না সেটা আমার কোন ভাবকে জাগিয়ে তুলছে ভালবাসার না ঘৃণার । আসলে মানুষের কয়েক টি মৌলিক বৈশিষ্ট্য জাতি -ধর্ম-বর্ণ ; দেশ -কাল-পাত্র নির্বিশেষে এক । যেমন জাতীয়তা বোধ বা দেশপ্রেম । আর সেই বৈশিষ্ট্য গুলোই মনে অধিক আলোড়ন ঘটালে সুরের মূর্ছনায় তার বহি প্রকাশ ঘটে । সঙ্গীত হয়ে ওঠে সকলের । অতি বড় নিষ্ঠুর ব্যক্তিও গান শুনে কানে হাত চাপা দেয়না ।

সায়ক যখন সুরের মূর্ছনায় আপ্লুত হয়ে উঠেছিল সুযোগ পেয়ে বাঁশিওলা আবার বাজাতে শুরু করলে সমারোহের মাঝখানে সায়ক তাকে আবিষ্কার করে । কাঁধে তার ঝোলা ব্যাগ আর ব্যাগ ভর্তি বাঁশি । সায়কের মনে হল অমন বাঁশি তার যদি থাকতো হৃদয় মিলিয়ে পৃথিবীর সবার সাথে ইংরাজি , ফার্সি, আরবি না শিখেও ভাবের আদান প্রদান করতে পারতো অনায়াসে ।
নানা বর্ণের মানুষের ভিড় ঠেলে সায়ক যখন বাঁশি আলার দিকে এগিয়ে চলল সে তখন অন্য কোন সমারোহে প্রদীপ প্রজ্বলনের উদ্দেশ্যে চলল । সায়ক কে সে লক্ষও করল না ; ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল ।

ভিড় পেছনে ফেলে ছুটে সমুদ্র তটের আর কিছুটা এগিয়ে গেলে সায়ক আবার শুনতে পায় সেই বাঁশিওলার সুর । সায়ক ছুটে চলল দুই একবার সমুদ্র পাড়ের বালির ওপর পড়ে গেলেও সে থামল না । সমুদ্রের পাড়ের নতুন বাঁকটায় এসে দিগন্ত বিস্তৃত পটে আর কাউকে দেখতে পেল না সে । সা সা করে বয়ে আসা দমকা হাওয়ায় সমুদ্রের গর্জনের সাথে একখণ্ড বাঁশির সুর তখনো লেগে । সুরটা যেন সায়ক কে কানে কানে অনন্তের পথের মোরে বাঁশিওলার ঠিকানা দেয় । সায়ক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে ।
আর একটা বাঁকের পর সে দূরে বাঁশিওলা কে দেখতে পায় । অনন্তের পথে আপনমনে বাঁশি বাজিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে সে ; কোন অচেনা রঙ্গের সন্ধানে অপর কোন অচেনা স্বপ্নরাজ্যে । সায়ক ছুটেগিয়ে যখন তার ঝোলা টেনে ধরল একটা বিভেদ , বৈষম্য, বিচ্ছিন্নতা হীন ব্যাপ্ত সুরের বাঁশির জন্য । সায়কের  কক্ষচ্যুতি ঘটলো ।

মা রান্না ঘর থেকে এসে পটাস করে আটা মাখা হাতেই স্কেলের বাড়ি বসাল সায়কের পিঠে । ডেক্সের ওপর থেকে চোখ মুছতে মুছতে মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল চক্ষু তার রক্ত বর্ণ ।
- হোম-ওয়ার্ক করতে বসলেই ঘুমপায় না । তারা তারি কমপ্লিট কর আমি রান্না সেড়ে এসে দেখবো । বিকালে আবার আঁকা স্কুলে যেতে হবে । কাল পাড়ায় আঁকা প্রতিযোগিতা আছে । গত বার যা এঁকেছিলি আমি কার কাছে মুখ দেখাতে পারি নি ।

পরের দিন যেমন খুশি আঁক প্রতিযোগিতায় সায়ক মনে করেকরে তার স্বপ্নের ফেরি-ওলার ছবি আঁকতে আঁকতে সময় পেরিয়ে গেল । ছবি টি আর সম্পূর্ণ হল না ।
গত বছরের মতো এবার টুবলু প্রথম হওয়ায় তার মা বেস ভিজিয়ে ভিজিয়ে ছেলের গুণকীর্তন করলো । সায়কের মা মনমরা হয়ে বাড়ি ফিরে সায়ক কে আবার ঠেঙ্গাল ।
- গাধা টা তোর দারা কিছুই হবে না ।
সায়ক কাঁদতে কাঁদতে বললো ;
- হবে কী করে স্বপ্ন টা পুরপুরি দেখতে দিলে ।
আবার স্বপ্নের কথা শুনে সায়কের মা আর চোটে গেল । কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল বেডরুমে ;
- রাত দিন সুযোগ পেলেই শুধু ঘুম আর হাবি যাবি স্বপ্ন ।
সায়ক যন্ত্রনায় কাতরে উঠে বললো
- কান ছাড়ো লাগছে ; আজ পর্যন্ত আমার কোন স্বপ্নই তুমি পুর পুরি দেখতে দাওনি ।
সায়কের মা আর চেঁচিয়ে ওঠে ;
- তুই ক্লাসে ফাস্ট হবি; আঁকায় ডিওটিংশন পাবি ; কম্পিউটারে তোর দখল থাকবে সকলের থেকে ভাল ; তোর সাথে জেনারেল নলেজে কেউ পারবে না । এ গুলো আমার স্বপ্ন । আমার কোন স্বপ্ন টা তুই পুড়ন করছিস বল দেখি ?
সায়ক বিরক্ত হয়ে বলে ;
- তোমার স্বপ্ন তুমি দেখ; আমার স্বপ্ন আমাকে দেখতে দাও ।
এবার সায়কের মা আরো রেগে গিয়ে তার পিটে কিল মারতে মারতে তাকে বেডরুমে আটকে দরজা বন্ধ করে দেয় ।
- আজ থেকে তোর খাওয়া দাওয়া সবকিছু বন্ধ ।

রাতে কাজ থেকে ফিরে বাবা সে ঘরের শিকল খুলে ঘরে ঢুকে দেখল সায়ক অঘোরে ঘুমিয়ে কি যেন বির বির করে । সায়কের আর কাছে গেলে সে পরিষ্কার শুনতে পেল সায়ক বলছে ;
- ফেরি-ওলা তুমি তোমার বাঁশি বন্ধকরো এখান থেকে যাও । আমার মা তোমার সাথে আমায় দেখলে কষ্ট-পাবে । আমি মা কে কষ্ট দিতে চাইনা ।
সায়কের মা রাতের রান্না সেড়ে হন্তদন্ত হয়ে এসে বলে;
- ওকে ডেকে দাও । না খেয়ে শুলে আবার শরীর খারাপ করবে ।
সায়কের বাবা বলেন :
- আস্তে কথা বলো; এক দিন না খেয়ে শুলে কিছুই হবে না ।
সায়কের বাবার কাছে সায়কের ঘুমন্ত প্রলাপ শুনে মার চক্ষু ভিজে যায় ।
রাতে বিছানায় শুয়ে সায়কের বাব যখন তার মায়ের কাছ থেকে সংসারের খুঁটি নাটি খবর নিচ্ছিল সে শোনে সায়কের আঁকা সেই ফেরি ওলার কথা । গ্রামের বাড়ির রথের মেলায় এমনি একটা ফেরি-ওলার কাছথেকে সায়কের বাবা একটা আড় বাঁশি কিনেছিল শখকরে । বাঁশি বাজানোর তার ছিল খুব ইচ্ছে ; কিন্তু তার বাবা সায়কের ঠাকুর দা রাগ করতেন ; বলতেন  '' শেষ মেষ যাত্রা দলে গিয়ে ভিড়বে । " তার আর বাঁশি বাজানো হয়নি । সে এখন সরকারি দপ্তরের ক্লার্ক । অথচ তার বাড়িতে এক সময় রবীন্দ্র
নজরুলের ছড়াছড়ি ছিল । বাবা মহা মনবের উদাহরণ দিলে এদের কেই সামনে দাঁড় করাতেন । অথচ কোন দিনও বলেননি ; দুক্ষু-মিয়া যদি যাত্রাদলে বাঁশি বাজিয়ে কাজি নজরুল হতে পারে '' আমাগো পোলা বাজাইলে জাত জাইবো কেন ? ''
অনেক রাত অব্ধি সায়কের বাবার আর ঘুম এলো না । বাল্য স্মৃতি সংরক্ষিত একটা টিনের বাক্সর মধ্যের লাট্টু,লেত্তি,লাটাই,গুলি কতকিছু সে উলটে পালটে দেখে শেষমেশ তার সেই মেলায় কেনা আড় বাঁশিটা হাতে তুলে নিল ।


পরের দিন সকালে সায়কের বালিশের তলায় সায়ক আবিষ্কার করলো তার স্বপ্নের ফেরি-ওলার সেই বাঁশি। সেটা স্বপ্ন না সত্যি; বোঝার জন্য সায়ক নিজেকে চিমটি-কাটে ।

বৃহস্পতিবার, ২৪ মার্চ, ২০১৬

৫ম বর্ষ ১০ম সংখ্যা।। ২৫ মার্চ ২০১৬

এই সংখ্যার লেখকসূচি - দময়ন্তী দাশগুপ্ত  তাপসকিরণ রায়, পার্থ রায়, রুখসানা কাজল, নীহার চক্রবর্তী, সুবীর কুমার রায়, সংযুক্তা মজুমদার ।

                      সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা

পথেঘাটে মাঝে মধ্যেই ঈশ্বরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়ে থাকে। এই সেদিনও হয়েছিল - কলকাতা শহরে যে বেশে তাকে পাওয়া সবচেয়ে দূর্লভ,অর্থাৎ কিনা ট্যাক্সিচালক। অশোক সেন-এর স্মরণসভা থেকে ফিরে দশদ্রোণে মা-কে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফিরছিলাম। রাত দশটা বেজে গেছে। ওই রাস্তায় অত রাতে বাস বন্ধ হয়ে যায়। অন্য কেউ হলে থেকেই যেত হয়ত। কিন্তু যতক্ষণ আমার পদযূগল আছে ততক্ষণ আমি ও নিয়ে বিশেষ চিন্তা করি না। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে অটো বা রিক্সা কিচ্ছু না পেয়ে হাঁটা দিলাম। একটা স্টপেজ মতো হেঁটেও ফেললাম। এর আগে আমাকে স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক স্কুটারচালক হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এসে বলেছিলেন,‘এখন তো বাস পাবেন না’। মনে হল, ভদ্রলোকের হয়তো মনে হয়েছিল আমাকে কিছুটা এগিয়ে দেওয়ার কথা,কিন্তু মুখ ফুটে ঠিক বলতে পারলেন না। যাইহোক,হঠাৎ একটা হলুদ ট্যাক্সি থামল ঘ্যাঁচ করে – ‘যাবেন নাকি?’ দেড়শো টাকা চাইল। আমার মনঃপুত হল না। আরে বাবা,ভি আই পি কী নিদেন পক্ষে চিনার পার্ক পৌঁছাতে পারলেও কিছু না কিছু পেয়েই যাব। বলি,নাহ্‌,যাব না। আবার হাঁটা দিই। এবারে একটা সাদা গাড়ি এসে দাঁড়াল,সেটা ট্যাক্সি বা এমনি গাড়ি ঠিক বলতে পারব না। একশো টাকা চাইতে উঠে বসলাম। জয়া সিনেমার-র কাছে নামিয়ে দিয়ে গেল। বাড়ি ফিরে বললাম, দেখলে তো কেমন চলে এলাম,মিছিমিছিই চিন্তা করছিলে। মনে মনে ভাবি,রাখে কেষ্ট, হাঁটে কে?
অনেকদিন আগে,কালান্তরে চাকরি করার সময় একদিন পার্কসার্কাস থেকে এক ভদ্রলোক আমাকে অমনিই পৌঁছে দিয়েছিলেন। আমি অন্যান্য রানিং গাড়ি যেগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়,তেমন ভেবে হাত দেখিয়েছিলাম। সেই ভদ্রলোকও গাড়ি থামিয়ে কেবলমাত্র আমাকে তুলে নিয়েই আবার রওনা দিলেন। অর্ধেক রাস্তা উনি গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইলে কথা বলে গেলেন আর আমি পিছনে বসে আক্রমণ করলে জলের বোতল না ছাতা কোনটা আত্মরক্ষার জন্য বেটার হবে ভেবে গেলাম। আর বাকি অর্ধেক রাস্তা আমার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন দূরবস্থা নিয়ে গম্ভীর আলোচনা করে গেলেন। ভদ্রলোক প্রবাসী বাঙালি,কয়েকদিনের জন্য এসেছেন। নামার সময় ভাড়া দিতে গেলে বললেন,কী মুশকিল,আমি তো এপথেই যাচ্ছিলাম,আপনার জন্য আমার তো বাড়তি কোনো তেল পোড়েনি। অকাট্য যুক্তি। আমিও আর কথা বাড়াই নি।
কিছু কিছু অভিজ্ঞতা,কিছু কিছু মানুষের কথা ফিরে ফিরে আসে মনে। ঈশ্বরের দেখা পাওয়া, তাও গাড়ি সমেত,কলকাতা শহরে,সে কি সোজা কথা?

‘তাই হেরি তায় যেথায় সেথায় তাকাই আমি...’।