গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

রবিবার, ১৪ জুন, ২০১৫

মনোজিৎ কুমার দাস

কাগজের নৌকা 
                                                                                    

ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হানু গাঙটা বর্ষায় বেজায় খরস্রোতা হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের শুকনো নদীটা বর্ষায় এমন যৌবনবতী হয়ে উঠতে পারে তা বিশ্বাসই  করা যায় না। বর্ষাকালে সুমিতের মায়ের পুজোর বাসি ফুল ভাসতে ভাসতে টিউলিদের বাড়ির ঘাটে গিয়ে ঠেকে। টিউলি তাদের গাঙের ঘাটে বাসনকোসন ধুতে এলে ভেসে আসা ফুলগুলো দেখেই বুঝতে পারে ওগুলো সুমিতের মায়ের পুজোর বাসি ফুল। সুমিতরা এক ভাই এক বোন। রঞ্জনা সুমিতের বোন, সে সুমিতের ছোট, তাই সবাই ওদের মাকে রঞ্জনার মা না বলে সুমিতের মা বলেই থাকে।
টিউলি রঞ্জনার সঙ্গে  ক্লাস টেনে পড়ে।  স্কুল ফাইনাল দেবে ওরা দুজনে , অন্যদিকে সুমিত বিজ্ঞান নিয়ে টুয়েলভ ক্লাসে পড়ছে। রঞ্জনা আর টিউলি সুমিতের চেয়ে বছর তিনেকের ছোট।
আশ্বিনের মাঝামাঝি থেকে হানু গাঙের জল শুকাতে থাকে। কার্তিক শেষ হতে না হতেই হানু গাঙের জল হাঁটু সমানে গিয়ে ঠেকে। নৌকা চলাচল বন্ধ হলে পাড়ার ছেলেরা মরা হানু গাঙে যার যার পাড়ায় বাঁশের সাঁকো দেয়।  এপাড়ে ওপাড়ে যাতায়াতের জন্যে পাড়ার মাঝামাঝিতে সুমিতরা সাঁকো বানায়। তখন আর এ পাড় থেকে ওপাড়ে যেতে নৌকার দরকার পড়ে না।                                       
মা , বাবা আর ছোট একটা ভাইকে নিয়ে টিউলিদের একটা ছোট সংসার । ওর ভাই অরিন্দম সামনের বছরে ক্লাসে সিক্সে উঠবে। টিউলির বাবা ঢাকার একটা সদাগরী অফিসে কাজ করে। মাসে দুবারে বেশি তার পক্ষে বাড়ি আসা সম্ভব হয় না। বর্ষা এলে মাসে একবারও অনেকক্ষেত্রে তার পক্ষে বাড়ি আসার সম্ভব হয় না।  ওটাওটা কিনাকাটা করতে টিউলির মাকে অন্যেই উপর ভরসা করতে হয়। টিউলির মা ভাবে, অরিন্দম আর একটু বড় হলে তাকে আর অন্যের উপর ভরসা করে থাকতে হবে না।
বর্ষাকালেই টিউলিদের বেশই অসুবিধায় পড়তে হয়। তাদের পাড়ায় নৌকা আছে মাত্র দুজনের । টিউলি ভাবে, রঞ্জনাদের তালের ডোঙা না থেকে যদি একটা নৌকা থাকতো কী মজাই না হতো! তালের ডোঙা সবাই চালাতে পারে না, এমন কি সবাই ওতে বসে থাকতেও পারে না। রঞ্জনা কিন্তু ভালই তালের ডোঙা চালাতে পারে। টিউলি ওটা চালানো দূরের কথা বসে থাকতেও পারে না। তালের ডোঙায় চড়লে ওর নাকি মাথা ঘোরে।
ছুটির দিনে একদিন জোর করেই রঞ্জনা টিউলিকে তালের ডোঙায় চড়িয়ে বেতাল অবস্থায় পড়েছিল। টিউলি বারবার নড়াচড়া করায় ডোঙাটা উলটে যাওয়ায় তারা দুজনেই গাঙের জলে পড়ে যায়। রঞ্জনা সাঁতরে কূলে উঠে দেখে টিউলি জলে মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। টিউলিকে টেনে তোলার জন্যে জলে ঝাঁপ দেবার জন্যে মাজায় ওড়না জড়িয়ে নিয়ে প্রস্তুত হতে গিয়ে দেখে সুমিতদা ডুব সাঁতার দিয়ে টিউলিকে জাপটে ধরে উপরে তুলে আনছে। সে সময় সুমিতদা ঘাটে স্নান করতে নামছিল।সুমিত আর রঞ্জনা পিঠেপিঠে ভাইবোন, ওদের মধ্যে খুনসুঁটি লেগেই থাকে। সুমিত বোনকে ঠাট্ট করে বলে- রঞ্জনা, তুই এত বড় সাঁতারু আর তোর বন্ধুটি----                                                               
-আমার বন্ধুটি কী?                                                                                 
 -দুধ ভাতের সঙ্গে পিঁপড়ে খেলে সাঁতার শেখা যায়, টিউলি হয়তো তা জানে না। ওকে -----                                   
রঞ্জনার দাদার উপর রাগ দেখিয়ে বলে- তুই কেন আগ বাড়িয়ে ওকে জাপটে ধরে জল থেকে তুলতে গিয়ে্ছিলি, আমি কি তাকে টেনে তুলতে পারতাম না?                         
- তুই ওকে জল থেকে টেনে তুলতি! ওকে জল থেকে টেনে তোলা আমার ঘাট হয়েছেএখন  তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে।                                                     
- তুই কেন ওকে কেন জাপটে ধরে টেনে তুললি আমি জানি না!                                                     
   - জানিস বেশ ভাল।                                                                              
- টিউলি সাঁতার জানে কিনা তোকে আমি দেখাবো কিন্তু দুচারদিনের মধ্যে।                                   
রঞ্জনা কিন্তু জানে টিউলি ভাল সাঁতারাতে পারে না। সে মনে মনে ভাবে,  যে করেই হোক টিউলিকে সাঁতার শিখাতেই হবে।সে টিউলিকে বলে না তাকে নিয়ে সুমিতদার ঠাটা তামাশার কথা। সে তাকে বলে - টিউলি তুই একেবারেই সাঁতার জানিস না তা কিন্তু নয়, তবে সেদিন না সাঁতরিয়ে জলে হাবুডুবু খাচ্ছিলি কেন, হয়তো সুমিতদাকে দেখতে পেয়ে তুই ডুবে যাওয়ার ভান করেছিলি, তাই না? টিউলি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মিটমিট করে হাসতে থাকে।  
পরের সপ্তাহে ছুটির দিনে রঞ্জনা সাঁতার দিয়ে টিউলিদের ঘাটে এসে টিউলিকে ডাকতে থাকে। ডাক শুনে টিউলি ঘর থেকে বের হয়ে এলে রঞ্জনা বলে- টিউলি, আজ থেকে আমি তোকে সাঁতার শেখাবো, দেখি দাদা কীভাবে বলতে পারে তুই সাঁতার জানিস না। রঞ্জনার কথা শুনে টিউলি মুচকি হেসে বলেতোর দাদা বললেই হলো আমি সাঁতার জানি না।
- তুই যদি সাঁতারই জানবি তবে কেন তোকে দাদা জাপটে ধরে তোকে জল থেকে উপরে উঠালো। টিউলি তার বান্ধবীর কথার জবাব দেয় না।
টিউলিদের বাড়িতে সুমিতের অবাধ যাতায়াত ছোট্টবেলা থেকেই। টিউলির মা এটাওটা কিনবার জন্যে প্রায় প্রায়ই সুমিতকে খবর দেয়। শুকনো মৌসুমে সুমিতের সঙ্গে টিউলির মায়ের যোগাযোগ করতে অসুবিধা হয না। অরিন্দমের বাচ্চা বয়সে মা সুমিতকে খবর দিতে টিউলিকেই পাঠাতো। অরিন্দম একটু বড়সড় হয়ে একটু বুঝতে শিখলে টিউলিকে না পাঠিয়ে অরিন্দমকে পাঠাতো।  
টিউলিকে জল থেকে জাপটে ধরে টেনে তোলার পর সুমিতের মনে কেন যেন এক ধরনের শিহরণ বয়ে গিয়েছিল। পর মুহর্তেই সে শিহরণের কথা ভুলে যায়। রাতে বিছানায় যাওয়ার পর দুপুরের ঘটনাটা সুমিতের মনে কোণে ভেসে উঠে। তার নিজের ছোট বোন রঞ্জনা কেন বললো - তুই কেন ওকে কেন জাপটে ধরে টেনে তুলেছিলি আমি জানি না!
সুমিত বুঝতে পারে রঞ্জনা আর টিউলি আজ আর ছোট্টটি নেই। দুজনেই ক্লাস টেনে পড়ে , আজ আর ওদের ছোট্ট থাকবার কথা নয়। সে কিন্তু আজও রঞ্জনা ও টিউলিকে একই দৃষ্টিতে দেখে। নিজের বোন রঞ্জনা ও তার বান্ধবী টিউলি শরীর ও মনে বেড়ে উঠেছে তা তার  ছোট বোন রঞ্জনার কথায় উপলব্ধি করতে পারে। সুমিতের চোখের সামনে জলে ভেজা গায়ের সঙ্গে লেপটে থাকা জামার আড়ালের টিউলির শরীরটার ছবি ভেসে উঠে। জলে ডুবে যেতে থাকা টিউলিকে বাঁচানোর জন্যেই সে তাকে জল থেকে টেনে তুলেছিল, অন্য কোন চিন্তার তার মনে সে সময় জায়গা করে নেওয়ার কোন প্রশ্নই ছিল না। আজকের দুপুরের ঘটনা সুমিত মনে রাখতো না , যদি  তার নিজের ছোট বোন রঞ্জনা তাকে ওই ভাবে কথা না বলতো।                              

সুমিত ভাবে, টিউলিকে সে দেখে আসছে ছোটবেলা থেকে, রঞ্জনার সাথে ও পুতুল খেলতো ; রঞ্জনার সাথে সাথে টিউলিও তার কোলে চড়তো। তখন ওদের মুখে কেবল কথা ফুটছে, সরস্বতী পুজোয় হাতেখড়ি দেওয়ার পর সুমিত সবে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়েছে।
দিনের পর দিন গড়িয়ে যায়, টিউলি ও রঞ্জনা একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠে। এক সরস্বতী পুজোয় ওরাও হাতেখড়ি দিয়ে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়। টিউলি, রঞ্জনা সুমিতের সঙ্গে স্কুলে যায়। রঞ্জনা ও টিউলি ক্লাস থ্রিতে ওঠে, আর সুমিত ক্লাস ফাইভ পরীক্ষায় উর্ত্তী্ন হয়ে হাই স্কুলে ভর্তি হয়।
টিউলি ও রঞ্জনা থেকে যায় প্রাইমারী স্কুলে। গ্রীষ্ম গিয়ে বর্ষা আসে, হানু গাঙে গড়াই নদীর জল পড়ে, শ্রাবণ আসতে না আসতে হানু গাঙ জলে ফেঁপেফুলে ওঠে। ভাদ্র মাসের ভাদুরে ষষ্ঠীপুজোয় ব্রত পালন করে মায়েরা। পুজোর শেয়ে কলার গাছের খোলায় ঝিঙের চাকচাক করে কেটে তার উপর চালের পিঠুলিতে সিঁদুর মাখিয়ে পাড়ার ছেলেমেয়েরা কলার খোলা নৌকা গাঙের জলে ভাসিয়ে সুর করে সবাই একসুরে ছড়া কাটে -- নৌকা যায় ভেসে, মামা আসে হেসে।
রঞ্জনা আর টিউলি পাড়ায় তাদের বয়সী ছেলেমেয়েদের সাথে কলার খোলার নৌকা ভাসাতে মজা পায়। ছোট থাকতে সুমিতও রঞ্জনাদের সাথে কলার খোলার নৌকা ভাসাতো ভাদুরে ষষ্ঠীপুজোর দিনে। এখন আর সে রঞ্জনাদের কলার খোলার নৌকা ভাসাতে যায় না,কারণ তখন আর সে রঞ্জনাদের মতো ছোট্টটি নেই।

তবে  সে সময় ভরা ভাদরের গাঙের জলে  ছুটির দিনে সুমিত তার বয়সী ছেলেদের সাথে গাঙের জলে সাঁতার কাটতো , খেপলা জাল ফেলে বন্ধুরা মিলে মাছ ধরতো।
রঞ্জনা টিউলিদের সঙ্গে কলার খোলার নৌকা ভাসাতে না পারলেও সুমিত কিন্তু তার বন্ধুদের সঙ্গে কাগজের নৌকা তাদের গাঙের ঘাটের জলে ভাসিয়ে মজা পেত। সুমিত তার বন্ধু শোভন , শিপন আর রাজনের সাথে কাগজের নৌকা বানানোর জন্যে কাগজ, রঙ পেন্সিল ,দেশলাইয়ের বাক্স, আটা, কঁচি আর পাঠকাঠি নিয়ে বসতো।
এ নিয়ে টিউলি সুমিতের বোন রঞ্জনাকে ঠাট্টা করে বলতো, “ তোর দাদা এখন আগের মতো আমাদের সঙ্গে কলার খোলার নৌকা ভাসাতে আসে না কেনরে , রঞ্জনা?”
তা আমি কী করে বলবো, তুই আগের চেয়ে বড় হয়ে গেছিস্ বলে হয়তো তোর সঙ্গে কলার খোলার নৌকা জলে ভাসাতে লজ্জা পায়, হয়তো।
হয়তো তাই!তবে তোর দাদা একদিন একজন বড় শিল্পী হবেরে, রঞ্জনা।রঞ্জনাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টিউলি আবার বলতে শুরু করে,“ তোর দাদা সুন্দর সুন্দর কাগজের নৌকা বানিয়ে জলে ভাসাচ্ছে দেখে মনে হচ্ছে তোর দাদা ভবিষ্যতে একজন বড় শিল্পী হবে। রঞ্জনা, তোর দাদা কিন্তু জানে না তার কাগজের নৌকাগুলো কোন ঘাটে ভেড়ে।
টিউলি, তুই আমার দাদাকে নিয়ে এত কিছু ভাবছিস্ দেখে আমার ভয় হচ্ছে তুই একদিন দাদার প্রেমে পড়ে না যাস্রঞ্জনা হেসে টিউলিকে বলে।

বর্ষা এলে টিউলিদের মা সংসারের টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে বেশ অসুবিধায় পড়ে। টিউলির বাবা বাড়ি থাকলে তো কথাই ছিল না। জল ভেঙে টিউলির পক্ষে বাজারঘাট করতে যাওয়া সম্ভব হয় না। অরিন্দম বেশিই ছোট, বারোয়ারি নৌকায় তাকে গাঙের ওপারে সওদা আনতে পাঠাতে টিউলির মা সাহস পায় না। তার একমাত্র ভরসা রঞ্জনার দাদা সুমিত। কলেজ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সুমিত টিউলিদের বাড়িতে আসে। টিউলির মাকে সে মাসিমা বলে ডাকে।প্রত্যেক ছুটির দিনেই সুমিত টিউলিদের বাড়িতে আসতে পারে না তাদের বাড়ির সাংসারিক কাজ কিংবা খেলাধুলোর জন্যে। স্কুলের ক্রিকেট টিমের সে একজন চৌকশ খেলোয়ার, আবহাওয়া ভাল থাকলে তাদের স্কুলের মাঠে ছুটির দিনে সুমিত ক্রিকেট খেলার প্রাকটিশে অংশ নেয়।  

ছুটির দিনে সুমিত তাদের বাড়িতে এলে টিউলির মনটা কেন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তার মন চায় রজ্ঞনাদের বাড়িতে ছুটে যেতে। টিউলির মায়ের অনুরোধে সেদিন ছুটির দিনে সুমিতের টিউলিদের বাড়িতে আসার কথা ছিল। কিন্তু কাজে আটকে গিয়ে সুমিত টিউলিদের বাড়িতে আসতে পারে না।
পরদিন স্কুলে যাবার জন্যে সকাল সকাল নিজ নিজ গাঙের ঘাটে স্নান করতে আসলে টিউলি চিৎকার করে বলে- রঞ্জনা, সাঁতরে আমাদের ঘাটে আয় তো দেখি।
টিউলির কথা শুনে রঞ্জনা  চেঁচিয়ে বলে ওঠে –  জল থেকে ওঠ, টিউলি, জলে কুমির এসেছে শুনিসনি, পা ধরে টেনে নিয়ে যাবে কিন্তু!
কুমিরের নাম শুনে টিউলির মনে একটু একটু ভয় হলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে চায় না। সে তাড়াতাড়ি জলে কয়েকটা ডুব দিয়ে মাথা তুলে রঞ্জনাদের গাঙের ঘাটের দিকে তাকিয়ে রঞ্জনাকে সেখানে দেখতে না পেয়ে অবাক হয়। টিউলি ভাবে, রঞ্জনা কি তাকে অবাক করার জন্যে জলে ডুব দিতে থাকাকালে সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছে। সুমিতদাকে বলে ওকে বকুনি খাওযাতে হবে মনে মনে বলে টিউলি আর দুটো ডুব দিয়ে উঠে পড়বে এমন সময় তার পা ধরে কিসে যেন টান মারে। পা ছাডিয়ে নিয়ে টিউলি পড়িমড়ি করে জল থেকে উঠতে গেলে রঞ্জনা জলের ভেতর থেকে ভুশ করে উঠে টিউলিকে জড়িয়ে ধরে বলে- কেমন ! ভয় পেয়ে গেছিস দেখছি। তোর ভয় কাটাতে হলে তোকে একটা সাঁতার দিতে হবে। চল
টিউলির মুখ থেকে কথা সরে না।  রঞ্জনা জানে টিউলি সাঁতার কাটতে চায় না , তার উপর ও আজ পরে আছে শাড়ি ব্লাউজ।
রঞ্জনা বলে- দাদা আজ ঘাটে থাকলে কী মজাই না হতো! দাদা ঠিকই বলে, আসলেই তুই একটা ভিতুর ডিম।
- তোর দাদা!তার কথা আর আমাকে বলিস না! কাল তো সরাদিন মা- সুমিত এখনো এলো না, এলো না , এলো না বলে মুখে ফেনা তুলে    
  ফেলে। তোর দাদা আসলেই একটা মিথু
 টিউলি শব্দটা শেষ করার আগেই  রঞ্জনা বলে উঠে- তোর মুখে দাদার নিন্দে !
- তোর দাদা তো সাধু পুরুষ, যেন ধোয়া তুলসি পাতা ! মেয়েদের দিকে চোখ তুল চাইতে জানে না, তাই তো?
তাই না তো কী! তোর মুখের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে কোন দিন দাদা ? তুই তো----  
- আমি তো কী
- কাল তোদের বাড়িতে যায়নি , তাই তো তুই তাকে মিথ্যুক বলছিস্ , তাই না?
রঞ্জনা, তুই কী সব আজেবাজে কথা বলছিস। টিউলি হেসে রঞ্জনাকে বলে।
- চল জল থেকে উঠি ,স্কুলের বেলা হয়ে যাচ্ছে । রঞ্জনাকে কথাটা বলে নিজেদের ঘাটে চলে আসবার জন্যে সাঁতার দিতে যাবার আগে টিউলি বলে  
  উঠে- রঞ্জনা তোকে সাবধান করে দিচ্ছি , আমার সম্বন্ধে কোন কথা তুই তোর দাদার কাছে বলবি না। আমার নামে ইনিয়ে বানিয়ে তুই তোর   
  দাদার কাছে লাগালে সে ভাববে ও আমাদের বাড়িতে না আসার জন্যে আমি তাকে দুষছি।
- এ সব কথা দাদাকে বলতে আমার বয়ে গেয়ে । কথা শেষ করে রঞ্জনা সাঁতার কেটে নিজেদের ঘাটে ফিরে আসে।

  গাঙের ঘাট থেকে দেরি করে ফিরে আসায় রঞ্জনার মা বলেস্নান করতে এত সময় লাগে ! তুই হয়তো এতক্ষণ টিউলির সঙ্গে জলে দাপাদাপি   
  করছিলি, তাই না?
কে তোমাকে বলেছে আমি টিউলির সঙ্গে জলে দাপাদাপি করছিলাম? দাদাই হয়তো তোমাকে আমাদের সম্পর্কে লাগিয়েছে।”‍
  “ তোর দাদা বলতে যাবে কেন?”
 রঞ্জনা আসলে জানে তার দাদা তাদের সস্বন্ধে কোন কিছু বলেনি। তার দাদা সুমিত কারো সম্বন্ধেই কোন প্রকার নিন্দাবান্দা করে না। রঞ্জনা
টিউলি সম্বন্ধে তার দাদার মনোভাব যাচাই করার জন্যে পরদিন রঞ্জনা দাদাকে বলে,“ দাদা, তুই টিউলিদের বাড়িতে কাল যাসনি বলে ও তোর উপর বড়ই খেপে আছে।
ও কেন খেপে আছে? আমি তো ওর কথায় ওদের বাড়িতে যাই না, যাই মাসিমার কথায়, আমি তো মাসিমাকে খবর দিয়েছিলাম অরিন্দমের কাছে যে আমি যেতে নাও পারি ক্রিকেটের প্রাকটিস হলে।সুমিত বুঝতে পারে না কেন টিউলি তাকে সহ্য করতে পারে না। সে ভাবে , আমি তো টিউলিদের অমঙ্গলের কথা ভাবি না, তবে কেন ও কথায় আমার সমন্ধে রঞ্জনার কাছে নানা কথা বলে।
সুমিত বর্তমানে তার নিজের বোন রঞ্জনার কথাবার্তার মধ্যেও যেন উল্টোপাল্টা ভাব লক্ষ্য করে।

সুমিতের একটাই লক্ষ্য যে তাকে বড় হতেই হবে। স্কুল ফাইনালে সে খুই ভাল রেজাল্ট করেছে। হায়ার সেকেন্ডারিতেও তাকে অবশ্য্ ভাল রেজাল্ট করতে হবে। তার ঠাকুরদার মৃত্যুকে আজো ভোলেনি, রমজান ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় তিনি মারা যান। সে সময় সুমিত খুবই ছোট, তবে ঠাকুরদার মৃত্যুর কথা তার ভাল করেই মনে আছে। সুমিত বড় হয়ে সংকল্প করে যে সে একজন ডাক্তার হবে। সুমিতের বাবা মাও চান তাদের একমাত্র ছেলে ডাক্তারী পড়ে গ্রামের মানুষের সেবা করুক।

সুমিত এতটুকু বয়সে প্রত্যক্ষ করেছে কত মেধাবী ছেলেমেয়ের পড়াশোনর ইতি ঘটেছে নিজেদের খেয়ালিপনায় অথবা পরিবারের ইচ্ছাঅনিচ্ছার বলি হওয়ার কারণে।
সুমিতের সঙ্গে পড়তো মাধবী নামে একটা আদিবাসী মেয়ে, স্কুল ফাইনালে মেয়েটি তার চেয়েও ভাল রেজাল্ট করেছিল, কিন্তু তারপর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি তার বাবামা ও পরিবারের কারণে। আগে আদিবাসী ছেলেমেয়েদের মধ্যে পড়াশোন চল ছিল না বললেই চলে, আদিবাসীদের পাড়ার মাধবীদের পরিবার প্রথম পড়াশোনায় এগিয়ে আসে। মাধবীর দিদি সাধিকা স্কুল ফাইনাল পাশ করে পালিয়ে গিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের ছেলেকে বিয়ে করে, আর তাতে তাদের পরিবারের মানসম্মান ধুলায় লুন্ঠিত হয়।                                                               
মাধবীও সাধিকার মতো তার ভালবাসার ছেলেকে বিয়ে করে ফেলে এই আশংকায় ওর বাবা মা ওকে নিজের সম্প্রদায়ের অল্প লেখাপড়া করা এক দোকানদার ছেলের সাথে বিয়ে দেয়। মাধবীর পড়াশোনার ইতি ঘটে । সুমিত এ ঘটনায় খুবই ব্যথিত হয়। মাধবীর মতো অসাধারণ মেধাবী একটা মেয়ের জীবন নি:শ্বেষ হয়ে যাওয়ার সুমিত কোন দিন ভাবতেও পারেনি। সুমিত ভেবেছিল , লেথাপড়া শিখে অবশ্যই মাধবী প্রতিষ্ঠা পাবে। মাধবীকেই একমাত্র সুমিতের ভাল লাগতো্, সে ভাল লাগার মধ্যে কোন প্রকার স্বার্থের নাম গন্ধ ছিল না। সুমিত যে তার আদিবাসী সহপাঠিনীকে মনে প্রাণে ভালবাসতো তা রঞ্জনা ও টিউলি দুজনেই জানতো। সুমিতা ও মাধবী তাদের স্কুলের শেষ ক্লাসে পড়াকালে মাধবীর প্রতি সুমিতের দুর্বলতার কথা ঠারেঠোরে টিউলি প্রায় প্রায়ই রঞ্জনাকে বলতো।
- রঞ্জনা, তোর দাদাটা উল্টোপথে চলছে, তুই কি তা বুঝতে পারিস না। মাধবীদি তোর দাদার চেয়ে পড়াশোনায় ভাল তা আমি মানি, তাই বলে সে আমার চেয়ে কিন্তু সুন্দরী নয়, টিউলি রঞ্জনাকে বলে।
সত্যি কথা বলতে, টিউলি শরীর স্বাস্থ্য ও চেহারায় অপূর্ব্ ।

সুমিত বেশ কয়েকদিন টিউলিদের বাড়িতে না যাওয়ায় টিউলির মায়ের চেয়ে বেশি অসন্তুষ্ঠ হয় টিউলি নিজে। সে রঞ্জনাকে আকারে ইঙ্গিতে তাদের প্রতি সুমিতের এধরনের আচরণের জন্যে তার অস্বস্তির কথা ব্যক্ত করতে দ্বিধা করে না।
- তোর দাদাটার স্বভাবটাই যে কেমন, একটা আদিবাসী মেয়ে তোর দাদার মনে ---
টিউলির কথা শেষ করতে না দিয়ে রঞ্জনা বলে- দাদার নামে কী যা তা বলতে চাচ্ছিস্ , আমার চেয়ে তুই তো আমার দাদাকে বেশি চিনিস্ না। মাধবীর জন্যে দাদার মনে কোন দিনই কোন প্রকার দুর্বলতা ছিল না ।
- তবে তোর দাদার মনটা কার প্রতি --- 
রঞ্জনা এবারও টিউলিকে থামিয়ে দিয়ে বলেদাদার মনটা কার প্রতি দুর্বলতা তা আমি কী করে বলবো ! তবে এটা বলতে পারি, তোর প্রতি নয়।
তোর দাদা আমার প্রতি দুর্বলতা দেখালে আমি তা বরদাস্ত করবো , তুই ভাবতে পারলি কেমন করে !

রঞ্জনা ভেবে পায় না টিউলি কেন তার দাদাকে নিয়ে  প্রায় প্রায়ই এত কথার অবতা্রণা করে থাকে। টিউলির প্রতি দাদার কোন মাথা ব্যথা নেই। তারা আজ কেউই ছোটটি নেই। তাদের সবারই ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতা আছে। দাদা হায়ার সেকেন্ডারীতে ভাল রেজাল্ট করে কমপিটেটিভ পরীক্ষায় উর্ত্তীন হয়ে এম.বি.বি.এস এ ভর্তি হয়েছে। টিউলি ও রঞ্জনাও বিজ্ঞান নিয়ে হায়ার সেকেন্ডারীতে পড়ছে। তাদের দুজনেরও আশা ডাক্তার হওয়া।  

শারদীয়া দুর্গোৎসবের ছুটি চলছে। সবাই বাড়িতে, টিউলির বাবা, সুমিত, সুমিতের বন্ধুবান্ধবরা সহ আরো কতজন। বিজয়াদশমী পরদিন টিউলির ভাই অরিন্দমের জন্মদিন। টিউলির বাবা বাড়িতে না থাকার কারণে টিউলির মা  অরিন্দম ও টিউলির তার জন্মদিনে শুধুমাত্র পায়েস খাইয়েই ঘরোয়া ভাবেই পালন করে থাকেন । এবার টিউলির বাবা বাড়ি থাকায় অরিন্দমের বার্থ্ ডে একটু আনুষ্ঠানিক ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে টিউলিরা। বেশ কয়েকদিন টিউলি ও অরিন্দম ঘরদুয়োর সাজাতে ব্যস্ত । অরিন্দম ,টিউলির জন্যে আলাদা রিডিং রুম কাম বেডরুম, ড্রয়িংরম, ডাইনিংরুম নতুন করে সাজিয়েছে তারা বেশ কয়েকদিন ধরে ।

পাড়ার পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইচ্ছে থাকলেও সুমিত টিউলির মা বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারেনি। কলেজ ছুটি তারপর পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত থাকায় রঞ্জনার সঙ্গে টিউলির যোগাযোগ নেই। তবে গত পরশু গাঙের ঘাটে স্নান করতে গেলে ওপার থেকে রঞ্জনাকে দেখে টিউলি চেঁচিয়ি বলেছিলশুনলুম সুমিতদা বাড়িতে এসেছে, আমার সঙ্গে নয়, মায়ের সঙ্গে তো একবারের জন্যে দেখা করতে আসা উচিত ছিল না ওর!
টিউলি, দাদা বাড়ি এসেছে জেনে তোরও তো তার সঙ্গে দেখা করতে আসা কি উচিত ছিল না, আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার কথা বলেও তো তুই আসতে পার তি?
রঞ্জনার কথা শুনে টিউলি রেগে আগুন হয়ে বললো- তোর দাদা কি বাঘ না ভালুক ! তার কথা বলতে ভয় কিসের ,তোর দাদার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, একথা মাকে বলতে আমি কি ভয় পাই?
তুই দূর থেকে আমার সঙ্গে অযথা ঝগড়া করিস না। একটু ঠান্ডা হয়। তবে শোন, আজ বিকেলে দাদা তোদের বাড়িতে যাবে, তাই বলে ভাবিস্ না সে তোর সঙ্গে দেখা করতে যাবে, দেখা করতে যাবে মাসিমার সঙ্গে।
দাদার প্রসঙ্গ তুলে টিউলিকে রাগাতে রঞ্জনার মজা লাগে ভেবে সে তার কথা শেষ না করে আবার অন্য প্রসঙ্গে বলে- দাদার সঙ্গে আমিও তার সঙ্গে যাব, তুই কিন্তু বাড়ি থাকিস্।
- তোর দাদা যখন আমার সঙ্গে দেখা করবে না তখন আমার বাড়ি থাকা আর না থাকা একই কথা!                                      
টিউলি রঞ্জনার দিকে বেজার মুখে একবার তাকিয়ে গাঙের ঘাট থেকে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়।
সেদিন বিকেলে সুমিত তার বোন রঞ্জনার সঙ্গে টিউলিদের বাড়িতে যায়। বেশদিন পরে সুমিত টিউলিদের বাড়িতে এলো। সুমিত টিউলিদের বাড়িতে ঢুকবার পথের দুধারের ফুলবাগান আর উঠোন এবং ঝিমছাম ঘরগুলো দেখে বিস্মিত হয়। অন্যদিকে, রঞ্জনা বিস্মিত হয় টিউলিকে সেজেগুজে তাদেরকে দিকে এগিয়ে আসতে দেখে।
- কেমন আসিস্, টিউলি ? সুমিত টিউলিকে জিজ্ঞেস করে। প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা না করে সে টিউলিকে প্রশ্ন করলোমাসিমা কোথায়?  
সুমিতের গলা শুনে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলে সুমিত তাকে প্রণাম করে বললো- মাসিমা, কেমন আছেন?
ভাল আছি, বাবা । তুমি তো কয়েকদিন হলো বাড়ি এসেছো, কিন্তু ---
- বাড়ি এসে পুজোর কেনা কাটার জন্যে শহরে যাওয়ায় আসা হয়ে ওঠেনি। সুমিত মাসিমার কথার মাঝখানে বলে উঠলো। - তা মেসোমশাই আর অরিন্দমকে দেখছিনা ।
- তারা বাজারে গেছে টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে। - টিউলি মা, সুমিত ও রঞ্জনাকে তোর রিডিংরুমে বসিয়ে রান্নাঘরে একটু আয় তো । টিউলির মা বললেন।
ঘরগুলো মেরামত করার সময় রঞ্জনা কয়েকবার টিউলিদের বাড়িতে এসেছিল।  রঙ করে টিউলিদের জন্যে আলাদা বেড়রুম , রিডিংরুম ও ডাইনিং রুম সাজানোর পর রঞ্জনাও এ প্রথম টিউলিদের বাড়িতে আসা।  কিছুদিন মামাবাড়ি কুসুমপুরে থাকায় রঞ্জনা এর আগে টিউলিদের বাড়িতে আসেনি। সুমিত ও রঞ্জনাকে রিডিংরুমে বসিয়ে টিউলি রান্নাঘরে গেলে রঞ্জনাও তার পিছু পিছু রান্নাঘরে যায়।

সুমিত টিউলির রিডিংরুমের চারদিকে তাকিয়ে তাজ্জব হয়ে যায়। পাশা্পাশি দুটো আলমারী, একটা বইতে ভর্তি , আর একটাতে নানা ধরনের পুতুল ও হাতের কাজ করা শিল্প সামগ্রী। সুমিত প্রথমে বইয়ের আলমারীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বাংলা সাহিত্যের নামকরা লেখকদের গল্প উপন্যাস, ইংরেজি  সাহিত্যের বেশ কয়েকটা বইও তার চোখে পড়ে।সয়েন্সের কয়েকটা বইও রয়েছে দেখে সুমিতের ভাল লাগে। সুমিত ভাবে,টিউলি তো আগের সেই টিউলি নেই, আলমারীর বইগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে সে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।রঞ্জনা তো এ কথাটা তাকে কখনোই বলেনি। রঞ্জনার কাছ থেকে জানতে হবে সে তার বান্ধবীর কাছ থেকে বইপত্র নিয়ে পড়া শোনা করে কিনা।  সুমিত পাশের আলমারীর দিকে চোখ রাখে। আলমারীর মাঝের তাকের উপরের কাঁচের পাল্লায় লেখামেলা থেকে কেনা। এবার সুমিতের চোখ পড়ে আলমারীর উপরের তাকে, কাঁচের উপরে লেখাআমার সংগ্রহ: হৃদয় মাঝে। সুমিত ভাবে, টিউলি হৃদয় মাঝে কী সংগ্রহ করে রেখেছে একটু দেখিই না! সারি সারি সাজানো কয়েকটা কাগজের নৌকা! এগুলো তো কয়েক বছর আগে জলে ভাসানো তারই সেইকাগজেরনৌকা’! তারই হাতের তৈরি কাগজের নৌকাগুলো জল থেতে তুলে আলমারীতে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে টিউলি , সুমিত সে কথা ভেবে অবাক হয়।

সুমিতের মনে হয়, তার থেকে আড়াই তিন বছরের ছোট টিউলিকে বোনের মতো ভালবাসা ছাড়া অন্যকিছু বলে ভাবতে পারেনি কোন দিনই ।আজ  কিন্তু টিউলির আলমারীতে কিশোর বয়সে গাঙের জলে ভাসানো কয়েকটা কাগজের নৌকা সুজ্জিত দেখতে পেয়ে সুমিতের মনটাতে খুশির আমেজ দেখা দেয়। সে ভাবেরঞ্জনার কাছে তার সম্বন্ধে টিউলির মন্তব্যগুলো আসলে সে মন থেকে করেনি।
সুমিত এখন ভাল ভাবেই বুঝতে পারছে টিউলি এতদিন তাকে এক তরফা ভাবে ভালবেসে এসেছে। সুমিত কখনোই টিউলিকে আমল দেয়নি। সুমিত টিউলির পড়ার টেবিলের পাশে রাখা রকিং চেয়ারটাতে এক সময় মনের অজান্তেই বসে পড়ে আলমারীতে রাখা কাগজের নৌকা গুলোর দিকে তাকিয়ে মনকে প্রশ্ন করে সে কি টিউলির মনে কাগজের নৌকার হয়েই বেঁচে থাকবে নাকি জীবন তরী হয়ে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।    

     



দেবাশিস লাহা

মা দিবস

আর কটা চাই তোর? ডজন খানেক তো তুলে ফেললি বাপান !
না, বাপি আর একটা! তুমি এপাশে এস ! হ্যাঁ এবার মিষ্টি করে জড়িয়ে ধর ঠাম্মাকে। মাম্মা তুমিও এসো ! তুমি কিন্তু বাঁ দিক থেকে জড়িয়ে ধরবে ! আর ঠাম্মা তুমি এই খানে বসো ! কি হল বাপি, এস না প্লিজ !” “আর ইউ ক্রেজি? মাথায় কি ভূত চেপেছে ! তোর মা-কে বল ! আমি পারব না !
আয় না খোকা ! বাপান এত করে বলছে ! একটি বার জড়িয়ে ধর না আমায় ! লজ্জা কিসের ? ছোট্ট বেলায় তো কোল থেকে নামিয়ে দিলেই কেমন ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠতিস ! তোর বাবা তো রেগেই যেত মাঝে মাঝে। বলত বেশি লাই দিও না ! কত মরা কান্না কাঁদতে পারে দেখি ! কে জানত এত আগেই চলে যাবে লোকটা ! এক মাঝ রাত্তিরে তোকে আমার কাঁধে চাপিয়ে ---এত কম বয়সে যে কারো এমন হার্ট ফেল করে আমি কি ছাই জানিতুম ! বাপানকে দেখলে কি যে খুশি হত ! পোড়া কপাল ! -----যাক গে সে সব কথা। আয় না বাবাআমাদের তো একটাই নাতি। তার একটা ছোট্ট আব্দার ! তোকে শুনতেই হবে বাবা ! কি হল বউ মা ! অমন করে দাঁড়িয়ে রইলে যে বড় ! এস মা ! এই দস্যি তোর ক্যামেরা ঠিক কর !
তুমি কিচ্ছু বোঝ না ঠাম্মা ! এটা ক্যামেরা নয় ! এটা আইফোন— !”
তাই নাকি ? দেখেছ দস্যিটা কত কিছু জানে ! আমি যে সেকেলে মানুষ বাবা ! এসব জানব কি করে ! সব কত বদলে গেছে এখন ! তোর দাদুকে নিয়ে কয়েকবার ছবি তুলেছিলাম বটে ! কিন্তু সে তো বাইরে গিয়ে। স্টুডিও না কি বলে ! কত কাণ্ড করে সে সব ছবি তুলতে হত ! কত্ত বড় সব ক্যামেরা ! অমনটি এখন আর দেখি না । কত সহজ হয়ে গেছে সব এখন। এই তো তোর বাবা আমায় জড়িয়ে ধরেছে ! এস বউমা তুমি আমার বাঁ দিকে এসো। আমি বরং তোমায় জড়িয়ে ধরি কেমন !
ওকে ঠাম্মা আমিও রেডি ! এবার যখন হাসতে বলব হাসবে ! একটু জুমটা ঠিক করে নিই ! মাদারস ডে পিক বলে কথা ! অসাম হওয়া চাই। না হলে আমার এফ বি ফ্রেন্ডস রা এমন চেটে দেবে ! ওকে নাউ ---স্মাইল প্লিজ ! কি হল ঠাম্মা ! হাসো ! ওয়াও গ্রেট ! ডান ঠাম্মা, ডান !” ********************************************** কা ! কা ! কা ! কা ! কা ! কা ! কা ! কা ! কা !
কি আপদ রে বাবা ! কা কা করে পাগল করে দিলে ! এই ভর সন্ধেবেলায় এটা আবার কোত্থেকে জুটল ! যা বলছি হতচ্ছাড়া ! হুস হুস ! আরে এই সরলা ! কাকটাকে তাড়িয়ে দে না সই ! শেষে কি এই অলুক্ষুনে ডাক শুনেই মরতে হবে গা ! বলি এই সরলা কোন চুলোয় গেলি তুই ?”
এই ত সই ! ঠাকুর ঘরে ছিলাম ! কি হল ! এমন চেল্লাচ্ছিস কেন ?”
কেন শুনতে পাচ্ছিস না ! কাকটা কেমন জ্বালাচ্ছে ! এত তাড়াচ্ছি, হতচ্ছাড়াটার নড়ার নাম নেই গা !” “ওহ এই কাণ্ড ! আমি ভাবলাম বুঝি চোর ডাকাত পড়েছে ! কাকের কি দোষ বল ! দেখ কোথাও কি মরে পড়ে আছে ! পচা গন্ধ টন্ধ পেয়েছে নিশ্চয় ! ওদের নাক কি আমাদের মত ! যাক, তোর তো আজ আনন্দের দিন রেতা নাতির এবার কোন ক্লাস হল ?”
একটু যেন চমকেই উঠল গৌরী ! জানা হল না তো ! কিন্তু কাকটা ওর দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে কেন ! বুকটা কেমন যেন ধুক পুক করে উঠল !কি মরেছে ওর ঘরে ? না, আজ সকালেই তো খুব ভাল করে ঘর-দোর মোছা হয়েছে। তবে কি কোথাও কোন ইঁদুর টিদুর মরল নাকি ? না তাই বা কি করে হয়!
তবু কিছু একটা মরেছে মনে হচ্ছে ! একটা অসহনীয় দুর্গন্ধে ভরে যাচ্ছে ঘরটা ! গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল ! এই মাত্র ধুনো দিয়ে গেল সরলা। কিন্তু সেই ধূপের গন্ধকে মুহূর্তেই ধরাশায়ী করে কি অবলীলায় ছড়িয়ে পড়ছে গন্ধটা ! কিন্তু কি মরল ? টেবিলের উপর ডাই করে রাখা মিষ্টি আর ফল অতিক্রম করে এবার নিজের দিকে তাকাল গৌরী। বুকের উপর মুখটা ঝুঁকে পড়তেই গা-টা কেমন গুলিয়ে উঠল ! ! হ্যাঁ ! ওর শরীর থেকেই আসছে গন্ধটা ! কিন্তু তা কি করে হয় ! একটু আগেই তো খোকা ওকে--------এতদিন পর-----
বৃদ্ধাশ্রমের জানালায় তখন একটু একটু করে রাত নেমে আসছে।


মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট 

"নমস্কার, মহিলাদের জন্য এই বিশেষ অনুষ্ঠান অদ্বিতীয়া'তে আপনাদের স্বাগত জানাই। আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত আছেন এমন কিছু নারী যাঁরা নিজ নিজ কর্ম্মক্ষেত্রে তো সফল বটেই, রোজকার জীবনে তাঁরা এমন কিছু নজীর রেখেছেন যা তাঁদেরকে মানুষ হিসাবে আরোও অনেকটা উচ্চস্তরে নিয়ে গেছে, তাঁরা সত্যিই অদ্বিতীয়া, আসুন দেখেনি তাঁরা কারা। আমার ডানদিকে রয়েছেন ডক্টর অনুরাধা যিনি শুধু মাত্র একজন ডাক্তার নন উনি একটি অনাথ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতি রবিবার মানে যে দিনটা ডাক্তার দেরও ছুটির দিন বলেই জানি আমরা সেই দিনেও উনি পেশেন্ট দেখেন। এভাবে বললে প্রায় কিছুই বলা হয়না। রবিবারদিন গুলোয় উনি সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় নিখরচায় চিকিৎসা করতে যান। গত পাঁচ বছর নিরলস ভাবে উনি এই কাজ করছেন। মানুষের সেবার জন্য উনি বিয়ে করেননি; বৃহত্তর সংসার কে পরিপূর্ন সময় দিয়ে চলেছেন। 
অনুরাধার পাশে আছেন চিত্রকর মেঘলা। মেঘলা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন দারিদ্রের সাথে লড়াই করে। এখন ফুটপাথবাসী শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর পাশাপাশি তাদের জন্য রোজ এক বেলার খাবারের বন্দোবস্ত ও করেন। এটা উনি করেন ওনার স্বচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েদের আঁকা শেখার যে স্কুল আছে তার থেকে উপার্জিত টাকা দিয়ে। মেঘলার ছবি দেশে বিদেশে বহু এগ্জিবিশনে আমাদের গর্ব বাড়িয়েছে। বিয়ে করার কথা এক্ষনি ভাবছেন না, আরোও কিছুদিন এই কাজ গুলোকে একটা অন্যমাত্রায় নিয়ে তবে নিজের জীবন সঙ্গী খুঁজবেন জানিয়েছেন। 
আমার বাঁ দিকে গায়িকা পামেলা। যমজ সন্তানের জননী পামেলা যখন তাঁর স্বামীকে হারান তখন তাঁর নিজের বয়স মাত্র সাতাশ আর সন্তানদের দুই। পামেলার মাথার ওপর ছাদ টুকু ছাড়া আর ছিলো তাঁর ভগবান প্রদত্ত গলা। একা হাতে সন্তানদের মানুষ করা, সাথে গানের টিউশনি; চূড়ান্ত ঝড় তুফানের মধে্য দিয়ে সব দিক সামলে আজ প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। উনি মানসিক ভারসাম্যহীন শিশুদের গান শেখান এবং সেই কাজেও অত্যন্ত সফল। 
সর্ব শেষ রয়েছেন বিউটি। পেশায় একজন শিক্ষিকা, কিন্তু ব্যাক্তিগত জীবনে উনি অসামান্যা। ওনার কথা দিয়েই শুরু করি আমাদের অনুষ্ঠান, পরে এক এক করে শুনছি বাকি দের কথাও। আসুন বিউটির কথা ওঁর মুখ থেকেই শুনি বরং। বিউটি আপনি বলুন যে আপনার ছোটোবেলা কেমন ছিলো, আর আপনার জীবনের মোড় ঘোরানো সেই ঘটনা।" 
"নমস্কার এলিনা, আজ আমাদের এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন জানানোর জন্য আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারেরই মেয়ে। ছোটোতে আমরা একটা জবরদখল কলোনি টাইপের বস্তি এলাকায় থাকতাম। আমার মা লোকের বাড়ী কাজ করতেন, ইন ফ্যাক্ট, আমি আর আমার দিদি, মায়ের শরীর খারাপ হলে আমরাও মায়ের কাজের বাড়ী কাজ করে দিয়ে এসেছি। সাথে নাক চোখ বুজে লেখাপড়া করতাম। ভদ্রস্থ ভাবে নিজের পায়ে যাতে দাঁড়াতে পারি। আমাদের এলাকায় খারাপ ছেলেপুলের ছড়াছড়ি ছিলো। সব সময় আমরা চেষ্টা করতাম যাতে বিকেলের পর আর না বেরোতে হয়। পড়তে যাবার সামর্থ্য ছিলোনা তবে কিছু মাস্টাররা ফ্রীতে পড়াতেন তাঁদের কাছে যাওয়াও সম্ভব হোতোনা শুধু সন্ধ্যের পর বলে। যাইহোক দুই বোনে আমরা অনেক খেটে কলেজ পৌঁছলাম। কলেজে পড়া কালীন দিদির খুব ভালো সম্মন্ধ আসায় ওর বিয়ে হয়ে গেলো। যদিও দিদির পড়াশোনা বন্ধ হয়নি; কিন্তু এই সময় থেকে সবখানে আমার একার যেতে আসতে হোতো। আমি যখন মাস্টার্সে চান্স পেলাম__" 
"একটু জিজ্ঞেস করি, কি সাবজেক্ট?" 
"অঙ্ক"
"আচ্ছা, হ্যাঁ তারপরে?"
"মাস্টার্স পড়ার সময়ে আমি প্রচুর টিউশানিও শুরু করি, কারন আমার গ্রাজুয়েশনের রেজাল্ট খুবই ভালো ছিলো। তো সেই সময়ে প্রায়শঃই সন্ধে্য হয়ে যেতো ঘরে ফিরতে, মা চেষ্টা করতেন বাসস্ট্যান্ডে থাকার। সেদিন মায়ের শরীর খারাপ থাকায় আমি একাই ফিরছিলাম। সুযোগ সন্ধানিরা ওঁত পেতেই থাকত, ওরা ঠিক এই দিনটার অপেক্ষাতেই ছিলো। বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাদের এলাকার মধে্য বেশ খানিকটা রাস্তা শুনশান থাকে। বাস থেকে নামার পর টের পেলাম বেশ পাঁচ ছয় জনের একটা গ্রুপ ঘিরে ধরল আমায় আর অশ্রাব্য সব কথা বার্তা। আমি যখন ভাবছি যে আজ আর বাঁচার উপায় নেই ঠিক সেই সময়ে একটা গাড়ী এসে দাঁড়ায় এবং তার থেকে একজন নেমে এই ছেলেগুলোর সাথে কথা বলতে শুরু করে। স্বাভাবিক ভাবেই শীকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে ওই বন্যপশুগুলো প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়ে ওই ভদ্রলোক কে নিয়ে পড়ল; আমি সেই সুযোগে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে দৌড়ে বাড়ী পৌঁছলাম। পৌঁছে মাকে সব কথা জানালাম এবং শুনলাম যে আমার জামাইবাবুর এক বন্ধু নাকি আমার খোঁজে আমাদের বাড়ী এসেছিলেন। এই ভদ্রলোক সম্পর্কে একটু বলি"
"হ্যাঁ বিউটিদি আপনার বাকি কথা শুনবো তার আগে ছোট্টো একটা বিরতি" 

"ফিরে এলাম বিরতির পর, বিউটিদির কাছ থেকে তাঁর কথা শুনছিলাম আমরা। বলুন বিউটিদি তারপর কি হোলো"
"আমার জামাইবাবু দারুন পড়াশোনা করা, এবং অত্যন্ত ভালো মানুষ। উনি আমার দিদির কলেজের পড়ান, সেই সুবাদেই বিয়ে হয়। ওঁর এক ছাত্র কাম বন্ধুর সাথে ওঁদের বাড়ীতেই পরিচয় হয়, আর আমার দিদি জানান যে দারুন সুপুরুষ এবং উচ্চ প্রতিষ্ঠিত সেই মানুষটি আমায় ভালোবেসে ফেলেছেন। ব্যাপারটাকে আমি আমল দেইনি কারন আমার তখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোটাই ধ্যান জ্ঞান। এইদিন উনিই আমাদের বাড়ী এসেছিলেন আর ঘটনাক্রমে আমায় বাঁচিয়েও দিলেন। এরপর ওই পাড়া থেকে বলতে গেলে, রাতারাতি আমি দিদির বাড়ী থাকার জন্য চলে গেলাম। নাহলে ওই ছেলেগুলো তো ছেড়ে দেবে না। তবে দিদির বাড়ী থাকতে শুরু করার পর জানতে পারলাম সেই রাতে ওই পশুগুলো আমায় না পেয়ে ওই মানুষটাকেই যথেচ্ছ পিটিয়ে তার পিঠের কোমোরের হাড় ভেঙ্গে দিয়েছে আর তাতেই ক্ষান্ত হয়নি ওনার মুখে অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছে। কথাটা শোনার পর থেকেই আমার অসম্ভব বিবেক দংশন শুরু হয়। আমি ভাবি যে ওই মানুষটাই আমায় ভালোবেসেছিলেন, আর সেদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে আমায় বাঁচালেন, ওঁর প্রতি আমারও তো কিছু করনীয় থাকে। চুপিচুপি একদিন গিয়ে উপস্থিত হলাম ওনার বাড়ী। সে বাড়ী তো নয় যেন হিন্দী সিরিয়ালের বাড়ী। কিন্তু অবাক কান্ড বাড়ীর মানুষ যে এতো পাষন্ড হতে পারে আমি না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। অশক্ত অসহায় মানুষটাকে বাড়ীর সব থেকে বাজে ঘরে আলোবাতাস ঢোকেনা এমন একটা ঘরে ফেলে রেখে দিয়েছে। ঠিক করে খেতেও দেয়না, একজন কাজের লোক সারাদিনে একবার তাকে পরিস্কার করে। যে মানুষের উঠে বাথরুম যাবার ও ক্ষমতা নেই তার কি হাল হতে পারে আশাকরি আন্দাজ করতে পারছেন। অমন রূপবান মানুষটা কে এমন বানিয়েছে ওই পশুগুলো যে দিনের আলোতে ও ওই মুখ দেখলে ভয় হবে। মানুষটার এই দশার জন্য আমি সম্পূর্ন দায় স্বীকার করলাম, নিজের কাছেই; যদিও হয়ত সত্যিই আমার কোনো হাত ছিলোনা ওঁর এই দুর্দশার পিছনে তবু কেমন জানি খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম আর ওনাকে ওই নরক থেকে উদ্ধার করবো ঠিক করলাম। 
বাড়ীর মানুষজন যেই টের পেলেন ওমনি আমার সাথেও অকথ্য দুর্ব্যবহার শুরু করলেন, এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন আমি যদি ওনাকে ওই বাড়ীর থেকে বের করে আনি তাহলে ওনারা ওনাদের ছেলেকে আর কোনোদিনও ঘরে ঢুকতে দেবেন না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে দিদির বাড়ী থাকতে পারবো, কিন্তু যখন দিদিদের জানাই ওনারা সাফ সাফ বলে দেন কোনো রকম বিতর্কিত বিষয়ে ওনারা নিজেদের জড়াতে চান না। অতএব আমার মায়ের কাছে ফিরে আসা ছাড়া আর গতি রইলো না। সেখানে তো পদে পদে বিপদ। তাও তখনকার মতো অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানীর সহযোগীতায় নিয়ে এলাম বস্তিতেই। কিন্তু সেখানে কিছু দিন মানে দিন পাঁচ সাত যেতে যেতেই আশপাশের লোকজন এসে বলল যে অবিবাহীত মেয়ে একজন অবিবাহীত পুরুষের সাথে থাকছে এই সব অনাচার এই এলাকায় থেকে করা যাবে না। বেশ ওই অবস্থাতেই ওঁর হাতে সিঁদুর পরে নিলাম। তাতেও হোলোনা বস্তির বাচ্চারা নাকি অসুস্থ হয়ে পড়ছে এই মানুষটা নিজে সুস্থ হবার জন্য তাদের ক্ষতি করছে। এমন উৎপাত শুরু হোলো, আমি পড়াশোনা করবো? নাকি এই মানুষটার দেখভাল করবো? না কি ওই মানুষ রূপী পশুদের ঠেকাবো? তবে এই কয়দিনেই আমার স্বামীর মুখের একটু একটু বুলি ফিরে এসেছে, ঠিক সময়ে ওষুধ পথ্য আর তার ভালোবাসার মানুষকে কাছে পেয়ে। উনি আর আমার মা পরামর্শ দেওয়ায় আমরা সম্পূর্ন অন্যখানে বাড়ী ভাড়া করে উঠে যাই। আমার স্বামীর ব্যাঙ্ক ব্যালান্সও খুব খারাপ ছিলোনা সাথে তখন আমার টিউশনি ও পরবর্তীতে সরকারী স্কুলে টিচারের চাকরি পাই, কাজেই ওনার চিকিৎসা করিয়েও মোটামুটি সুস্থ ভাবেই থাকতে শুরু করি। আর আজ আমার স্বামী অনেকটা সুস্থ, ওনাদের বাড়ীর ড্রাইভার কাকুও আমাদের খুঁজে পেয়ে আমার স্বামীর গাড়ীটা নিয়েই আমাদের কাছে চলে আসেন। আজও কিছু কিছু বিষয় নিয়ে কিছু মানুষের সাথে লড়াই অব্যাহত, আইনি ঘোরপ্যাঁচও কিছু চলছে, তবু বলবো আমরা ভীষন ভীষন হ্যাপি।" 
"তার মানে বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্টস্ বলা ভালো আপনার ঘটনা কে"
"একদম, আমার চারপাশে বীস্ট ভর্তি, আমার ঘরে সেই রাজপুত্র"
"আপনার মতো বিউটিদের উদ্দেশে্য যদি কিছু বলেন, কিছু পরামর্শ তাদের জন্য"
"সেই সব বিউটিদের কাছে আমার অনুরোধ তোমরা তোমাদের রাজপুত্রকে নিয়ে সুখী থাকো বাইরের বীস্টদের সাথে লড়াই করো, হার মেনো না। একটা মানুষের রূপই কিন্তু সব নয়, তার ভালোবাসা, মানবিকতা, এইগুলোই বোধহয় সব"
"অবশ্যই অসাধারন অভিজ্ঞতা, ধন্যবাদ বিউটি দিকে ওনার জীবনের এমন ঘটনা আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য। আমাদের আজকের মতো সময় শেষ বাকিদের কথা শুনবো পরের এপিসোডে। আমাদের সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ, নমস্কার"



আবু রাশেদ পলাশ

অস্ফুট আর্তি
                                                     
মিয়া বাড়ির মসজিদে ফজরের আযান ধ্বনিত হলে নিশিতে নিদ্রিত মানুষগুলোর নিদ্রা ভাঙে । রাতের গায়ে জোছনা শোভিত অন্ধকার তখন আরেকটি নতুন প্রভাতের ডাক শুনে দিনের আলোয় মুখ লোকায় । গেরস্ত বাড়ির মোরগটাও নিদ্রা ভাঙার গান জুড়ে এ সময় । শব্দ শুনে ঘুম কাতর শিশুগুলোকে মায়েরা ঠেলা দিয়ে তুলে দেয় । আধো ঘুমে ঢল ঢল শিশুগুলো বাইরে এসে ছাইয়ের গাঁদি থেকে পুড়া কাঠের কয়লা তুলে মাজন করতে করতে পুকুরের দিকে চলে যায় । একসময় প্রভাত কাকলীর মধ্যে আগমন ঘটে দিনের সূর্যটার ।
গ্রামের নাম চৌহালি  তার জন্মের ইতিহাস কালগর্ভে বিলীন । ওর বুক জুড়ে বহমান কালী নদীর স্রোত প্রবাহ এ গ্রামকে হিন্দু-মুসলমান পাড়ায় বিভাজিত করেছে । নদী নারী পুরুষের মিলনস্থল । স্থান,কাল নির্বিশেষে একই নদীর স্রোত জলে স্নান করে শুদ্ধ হয় সবাই ।এ গাঁয়ে মুসলমান পাড়ার উত্তরে মিয়াদের বাস । অপেক্ষাকৃত জনবহুল এ জায়গাটা গাঁয়ে টুগিপাড়া নামে পরিচিত । এখানে ভূমিহীন ঐ মানুষগুলো বসবাস করে নিম্নবিত্তের দৃষ্টিতেও যারা ছোটলোক । ছোটলোকদের থাকার জায়গাও সামান্য । ঘরগুলো একটার সাথে আরেকটা লাগানো ।
বুড়ো বাহারুদ্দিন মিয়াবাড়িতে বয়োজ্যেষ্ঠ  সংসারে স্ত্রী ছাড়াও একমাত্র মেয়ে আছে তার । নাম জরি । কয়েক বছর আগে উজানতলীর হাসেমের সাথে বিয়ে হয়েছিল ওর । সংসার টিকেনি সেখানে । স্বামী তালাক দিলে এখন বাপের বাড়ি এসে থাকে সে । বাহারুদ্দিনের ঘরের সাথে লাগানো ছোট ছাপরা ঘরগুলো আহালু,আরজ আর মধুর ।
চৈত্রের আকালে মধু ভাঙ্গুরা বাজারে বড়কর্তার আরতে কাজ করে । সাথে হিন্দু পাড়ার ভোদড়ও । কাজ শেষে একই পথে বাড়ি ফিরে ওরা । রাতে মধু যখন বাড়ি ফিরে মিয়া বাড়ির ঘরগুলোতে  পিদিমের শেষ আলোটা নিবুনিবু করে তখন। ভেতরে ডুকে ম্যাচের কাঠি জ্বালালে জরির রেখে যাওয়া কিছু একটা চোখে পড়ে তার । আনন্দে চোখগুলো জ্বলজ্বল করে তখন । খেতে বসলে জরির কণ্ঠ শুনা যায় ।
-মধু ভাই আইলা ?
-হ,ঘুমাস নাই অহনো ?
-চইত মাসের গরমে পুইড়ে মরি ।
-হাচানি ? গতরে সার পাইনে আইজ, জার করে কেবল 
-কি কও,জরনি আহে দেহি ?
তারপর মধুর কপালে হাত দিয়ে শিউরে উঠে জরি । কখন যেন জ্বর এসেছে ওর । পরক্ষনে রসুন সমেত তেল গরম করে এনে দেয় তাকে । রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবনায় পড়ে মধু । ভাবনার জগতে সমস্ত জায়গা জুড়ে বিচরণ করে জরি । শেষরাতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে ওর ।সকালে বাইরে এসে জরিকে খুঁজে সে । দেখা পায়না কোথাও । আহালুর মেয়ে বুচি জানায় ভোরে মামার বাড়ি গেছে সে, আসবে ভরসন্ধ্যায় ।
মুসলমানপাড়ার খড়িমণ্ডল সচ্ছল গেরস্ত । ঘরে জোড়া বউ তার, সন্তান নেই  এ পাড়ায় সালিশ করে বেড়ায় সে । বাহারি পণ্যের ব্যবসা আছে বাজারে । একই পাড়ার শুলাই মণ্ডলের খাস লোক  মণ্ডলের ব্যবসা দেখাশুনা করে সে । বিকেলে ভাঙ্গুরা বাজারে নিজের আরতে বসলে লাভের টাকাগুলো শুলাই তুলে দেয় তার হাতে । সন্ধ্যায় ফেরার আগে এক অচেনা রমণীকে দেখলে  খড়িমণ্ডলের চোখ আটকে থাকে সেদিকে । মাঝে মাঝে ডানে বামে তাকায় মেয়েটি । সন্ধানী চক্ষুযুগল পরিচিত কাউকে খুঁজে ফিরে হয়তো । ব্যর্থ হলে আবার স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে সে । ফেরার পথে খড়িমণ্ডল নিজের নৌকায় তুলে নেয় তাকে । মণ্ডল বলে,
-কাগো বাড়ির বেটিগো মাইয়া ?
-টুগি পাড়া মিয়া বাড়ি ।
-গেছিলা কই ?
-ধানশাইল মামুগো বাড়ি ।
-একলানি গেচিলা,মাইয়া লোকের ডর নাই ?
মণ্ডলের কথার জবাব দেয়না জরি । ও কথা না বললে মণ্ডলও চুপ হয়ে যায় একসময় । পরক্ষনে নৌকার পাটাতনের উপর একজোড়া সাদা পা দৃষ্টিগোচর হলে চক্ষু পড়ে থাকে সেদিকে । সে পা সহসা চোখের আড়াল হয়না,জরির প্রস্থানেও ।
কর্তার আরতে কাজ না থাকলে বাড়িতে অলস সময় কাটায় মধু । ও বাড়ি থাকলে ট্রাঙ্কে রাখা আসমানিরঙা শাড়িটা পড়ে জরি, মাথায় জবজবে তেল দেয় । তারপর ওর সামনে পায়চারী করে অনেকবার । মধু নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে হুঁকা টানে । মাঝেমাঝে আড়চোখে জরিকে দেখে সে । এরমধ্যে একদিন কালবৈশাখী ঝড় হয় গ্রামে । টুগি পাড়ায় আহালুর ঘর পড়ে যায় ঝড়ে । সে উছিলায় একদিন মিয়া বাড়িতে আগমন ঘটে খড়িমণ্ডলের । মণ্ডল এলে বাহারুদ্দিনের ঘরের দাওয়ায় বসতে দেওয়া হয় তাকে । মনে মনে জরিকে খুঁজে সে । দৃষ্টিগোচর হলে পুলকিত হয় মণ্ডল । যাওয়ার সময় বলে যায়-
-আহালু একবার আইয়ো আমার বাড়ি, কিছু টেহা দিমুনি । ঘরখান তুলো শিগগির ।      
রাতে বাড়ি ফিরে ভাবনায় পড়ে মণ্ডল । নৌকার পাটাতনে দেখা একজোড়া সাদা পা আর বাহারুদ্দিনের বাড়ির দহলিজে দেখা একটা মেয়ে মানুষের মুখশ্রী ভেতরে জ্বালা ধরায় তার  মনে মনে ঘরে তৃতীয় স্ত্রী আনার পাঁয়তারা করে সে । হ্যাঁ, আরেকটা নিকা করবে খড়িমণ্ডল । নিকা করবে নৌকার পাটাতনে দেখা সেই সাদা পায়ের রমনিকেই ।
এরপর মাঝেমাঝেই শুলাইকে মিয়া বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় । জরিকে খুঁজে সে । দৃষ্টিগোচর হলে খড়িমণ্ডলের দেওয়া জিনিসগুলো তুলে দেয় ওর হাতে । জরি নিতে না চাইলে শুলাই বলে-
-ডরাও ক্যান, আমিনা তোমার কাহা অই ?
বৈশাখ মাসের শেষের দিকে ব্যস্ততা বাড়ে ছেলেদের । ব্যস্ত হয় মেয়েরাও । সামনে আগত বর্ষাকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান পাড়ার ঘরে ঘরে জাল তৈরির সরঞ্জাম শোভা পায় । বড় ঘরের দাওয়ায় বসে দিনমান জাল বুননের কাজ করে সবাই । আরজের ছেলে হুলু বাজার থেকে সুতা আর বঁড়শি কিনে এনে মধুর জন্য অপেক্ষা করে  মধুর কাছে মাছ ধরার ছিপ বানিয়ে নিবে সে । কিন্তু সহসা সময় হয়না মধুর । ও এখন হিন্দু পাড়ায় নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত । ভোদড় কে সাথে নিয়ে আগামী বর্ষাটা বড়কর্তার নৌকায় কাটানোর ইচ্ছে তার ।এর মধ্যে একদিন  রাতে বাড়ি ফিরলে দেখা হয় জরির সাথে । জরি বলে-
-হারাদিন কই থাহ মধু ভাই, দেহিনা যে ?
-কর্তার নাওয়ে কাম নিছি,বানের মসুম নাওয়ে থাকুম ।
-হলু হুতা,বশি কিননে আনছে । হেরে বশি বানায় দিও একখান ।
আরজের বউ জুলেখা মারা গেছে একবছর হতে চলল  মরার সময় কলেরা হয়েছিল ওর  স্ত্রী শোকে এখনো বিয়ে করেনি আরজ । মা মরা হুলু সারাদিন পোষা কুকুরের ন্যায় এ বাড়ি ও বাড়ি আনাগোনা করে । ওর দিকে দৃষ্টি গেলে ভেতরটা হাহাকার করে আরজ আলীর । মেয়ে মানুষহীন সংসার হয়না । যে ব্যাঘ্র একবার মাংসের সন্ধান পায়, পরমুহূর্তে লোভ সংবরণ করতে পারেনা সে । আজকাল একাকি বিছানায় শুয়ে মেয়ে মানুষের অভাববোধ করে আরজ । নারী সত্ত্বার যে স্বাদ পেয়েছে সে, তার লোভ সামলানোর সাধ্য কই ? এখন ঘরে বউ দরকার ।
এরই মধ্যে হঠাৎ শুলাইয়ের সাথে কলহ হয় মধুর । একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে জরিকে হেসে কথা বলতে দেখে সে  শুধু কথা বললে হয়তো কলহ করতনা মধু । শুলাইয়ের দেওয়া জিনিসগুলো যখন জরি নিল তখনই রেগে গেল সে । পরক্ষনে শুলাইকে একটা ঘুষি মেরেছে মধু  তারপর চিৎকার করেছে ওর সাথে-
-হারামিরপুলা ইনু কি ?
-আমি আইছিনি, তোমার বইন আইতে কয়যে ?তারপর যাওয়ার সময় শাসিয়ে যায় শুলাই । ছাড়ুমনা,  মণ্ডলরে কয়ে শাস্তা করুম তরে
সেদিন জরির সাথে কথা বলেনা মধু । বড়ঘরের দাওয়ায় থ মেরে বসে থাকে অনেকক্ষণ । খড়িমণ্ডলের কথা মনে হলে অজানা আশংকা এসে ভিড় করে নিজের মধ্যে । মুসলমানপাড়ায় এ মানুষটাকে যমের মত ভয় পায় সবাই । শুলাইকে মারার খেসারত দিতে হবে নিশ্চয় । শুলাই কি আর যে সে মানুষ । স্বয়ং খড়িমণ্ডলের খাস লোক সে । এ পাড়ায় সবাই সমীহ করে তাকে ।পরদিন দাওয়ায় বসে থাকলে এগিয়ে আসে জরি, মধুর মান ভাঙানোর চেষ্টা করে সে।
-গোসসা অইছেনি মধু ভাই ? মধু সহসা জবাব না দিলে জরি আবার বলে-শুলাইরে হগল ফিরত দিমু, গোসসা ছাড়ান দেও অহন
এরপর ভাঙ্গুরা বাজারে গেলে ভয়ে ভয়ে থাকে মধু । সহসা খড়িমণ্ডলের সামনে পড়ার সাহস করেনা সে ।তবুও হঠাৎ একদিন আচমকা ডাক পড়ে ওর  পরক্ষনে খড়িমণ্ডলের আরতে গিয়ে বসতে হয় তাকে । মণ্ডল বলে-
-মধু মিয়া যে, ভালা আছ মুনে কয় ?
-হ, ভালাই । জলদি কয়ে ছাড়ান দেন কাম আছে মেলা ।
-বহ মিয়া তাড়া কিয়ের ? মনা একখান বিড়ি দে মধুরে । শুলাইরে মারছ হুনলাম,বিবাদ ছাড়ান দেও  হেতো তোমার কাহা অয় ।
-কাহানি ? আরেকদিন আইলে ঠ্যাংখান ভাঙে দিমু ।
তারপর আর কথা বাড়ায়না মধু । সোজা গাঁয়ের পথ ধরে সে । আরতে বসে রাগে ফোঁপায় শুলাই । খড়ি মণ্ডল ধমক দেয়-
-চেতস ক্যান হারামিরপুলা, গোসসানি তর একলা অয় । ছাড়ুমনা নিজ্জস 
বর্ষা মওসুমে হিন্দু-মুসলমান পাড়ার ছেলেরা কাজে ব্যস্ত হয় । কালিনদীর উত্তাল ঢেউয়ের সাথে তখন সম্পর্ক গড়ে ওরা । মধুকে মালবোঝাই নৌকা নিয়ে যেতে হয় ইছামতী । বর্ডারে পণ্য চোরাচালানের ব্যবসা করে বড়কর্তা । এদিকে চৌহালি কাজ না পেলে বিপাকে পড়ে আরজ  নৌকা,জাল কোনকিছুই নেই তার । হিন্দু পাড়ার যোগেশ ওর নৌকায় কাজ দিতে চেয়েছিল তাকে, গতকাল এসে না করে গেছে সে । অবশেষে উপায় না দেখে গণেশের নৌকায় দিনমজুরির কাজ নেয় আরজ আলী  একদিন সন্ধ্যায় সওদা করে ফেরার পথে খড়িমণ্ডলের সাথে দেখা হয় তার ।মণ্ডল বলে-
-কার নাওয়ে কাম নিছ আরজ, ভালানি ?
-হিন্দু পাড়ার গনশা । দিনমজুরি জুত নাইগো ।
-তাইলে আমার নায়ে আহ মিয়া, ভালা মজুরি দিমু নিজ্জস ।
হিন্দু-মুসলমান পাড়ার দরিদ্র জেলে সম্প্রদায় বর্ষার এ সময়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন দেখে । চৈত্র মাসের ধরুন অভাবে জমানো অর্থ খরচ করতে হয় তাদের  আজকের এই দুঃসময়ে খড়িমণ্ডলের প্রস্তাবটা মনে মনে পুলকিত করে আরজকে । অবশেষে মণ্ডলের নৌকায় কাজ নেয় সে । বর্ষার মওসম শেষ হলে অলস সময় কাটাতে হয়  সবাইকে  আশ্বিন মাসে কর্তার আরতে কাজ পাবে মধু  কালিনদীর পশ্চিমে দ্বীপসদৃশ খানিকটা জায়গা । বহুকাল ধরে চর জাগার পাঁয়তারা চলে সেখানে । নদিতে যখন থৈ থৈ পানি তখনো ওটা সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকে স্বস্থানে । লোকে বলে ভাসান চর । অবসরে মধু জরিকে নিয়ে ভাসান চরে সময় কাটায় । অস্ফুট আর্তিগুলো দিনমান প্রকাশ করেনা কেউ,মনে মনে নিজেদের সহচর ভাবে ওরা । এক এক করে দিন যায় । না বলা পিছুটান গভীর থেকে গভীরতর হয় ।
টুগি পাড়ার আরজ আলী বর্ষা মওসুমে বড়কর্তার নৌকায় কাজ করে মোটা টাকার মালিক হয় । বাড়িতে টিনের দুচালা ঘর উঠে তার । এ পাড়ার সবাই এখন সমীহ করে তাকে । পলিসটার কাপড়ের একটা শার্ট আর সাদা লুঙ্গিটা পড়ে বাইরে বেড় হলে সালাম দেয় কেউ কেউ  এগুলো ভাল লাগে আরজের । পাড়ায় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ভাবে সে  ভাববেইতো খড়িমণ্ডলের খাস লোক যে  এ সম্মান টুগি পাড়ায় একমাত্র তারই । বর্ষা মওসুম শেষ হলে খড়িমণ্ডলের আরতে আবার কাজ পায় আরজ । বিকেলে মণ্ডল এলে খোশ গল্প করে দুজন । মণ্ডল বলে-
-এবার একখান নিকা কর আরজ,একলানি থাহুন যায় ?
খড়িমণ্ডলের কথা শুনে লজ্জা পায় আরজ আলী  কথার জবাব দেয়না সহসা ।পরক্ষনে বলে-
-নিকানি ? মাইয়া দেহেন তাইলে মিয়া ভাই ।
-মাইয়া একখান দেহা আছে, মত দেও মিয়া ।
-কেডা, খুললে কন হুনি ?
-বাহারুদ্দিনের বেটি জরি । সুরতখান দলা দেহি ?
-হাচা । তই কাহা মত দিবনি ?
- নিজ্জস মালুম অয়  চাইলে কতা কই ।
খড়িমণ্ডলের কথায় মত দেয় আরজ । জরি মেয়ে ভাল,দেখতেও বেশ । মেয়ে মানুষহীন সংসারে আরজের স্ত্রীর পাশাপাশি হুলুর জন্য একজন মা দরকার । অপরিচিত মেয়ে মানুষের মা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ? জরি থাকলে সে সন্দেহ নেই । এরপর হঠাৎ নিজের মধ্যে কামনা তৈরি হয় আরজের  বাড়ি ফিরে জরিকে নিয়ে ভাবে  সে   অথচ জরির প্রতি এ ভাললাগা কয়েকদিন আগেও ছিলনা তার । খড়িমণ্ডলের বলা আচমকা কথাটা যেন প্রেমিক বানিয়ে দেয় তাকে । চোখের সামনে আনাগোনা করলে আড়চোখে জরিকে দেখে সে । বাড়ন্ত শরীরের প্রতিটি ভাজেভাজে উত্তাল যৌবন খেলা করে ওর । দেখলে জ্বালা করে চোখে ।
অবশেষে একদিন খড়িমণ্ডল স্বয়ং নিকার প্রস্তাব নিয়ে যায় বাহারুদ্দিনের কাছে । বাহারুদ্দিন আপত্তি করেনা তাতে । অভাবের সংসারে যেখানে দুমুঠো ভাত জোগার করার সামর্থ্য নেই তার , সেখানে আরজ সচ্ছল গেরস্ত । প্রস্তাব মন্দ নয় । সুখী হবে জরি ।বিয়ে আগামী মাঘ মাসে হোক তাহলে  সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে বুচির মুখে সব শুনে মধু । জরিকে দেখা যায়না কোথাও । পরদিন ধলপ্রহরে আচমকা মধুর ঘরে এসে হাজির হয় সে । জরি বলে-
-হুনছনি হগল ?তাৎক্ষণিক জবাব দেয়না মধু । ও জবাব না দিলে রেগে যায় জরি । তারপর আবার বলে-চুপ মাইরে আছ যে, বোবা অইছ মুনে কয়
মধুর মধ্যে অস্ফুট আর্তনাদ তৈরি হয় তখন । মনে মনে জরির জন্য ভালবাসা উথলে উঠে তার কিন্তু সত্যি বলার সাহস পায়না সে । সত্যি বলে লাভ কি, যন্ত্রণা ছাড়া ? মধু খুব ভাল করে জানে যেখানে খড়িমণ্ডল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, সেখানে ওর কথা শুনবেনা বাহারুদ্দিন । বিয়ে জরির ঠিকই হবে । বিয়ে হবে আরজের সাথেই । পরক্ষনে মধু বলে দেয়-
-আমার কিছু কওনের নাই, হুলুর মা অ তুই ।
মধুর কথা মনে ধরেনা জরির । কাল চোখে দুঃখের ফোয়ারা বয় তার  সেও বলে দেয় 
-দিলে ঘা দিলা মধু ভাই । ভুলুমনা তোমারে নিজ্জস 
অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কালিনদীর পানি শুকায় । স্রোতস্বিনী নদী তখন কৃপণ হয় । ঢেউ থাকেনা কোথাও,দু একটা মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকা চোখে পড়ে শুধু । সওদাগরের নাও ভাসেনা আর । নদীর উপর জেগে থাকা ভাসানচর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় দিনে দিনে । চর দখলকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষ বিভক্ত হয় । লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করে বড়কর্তা আর খড়িমণ্ডল দুজনই । লাঠি চালনায় বিশেষ দক্ষতা থাকায় হিন্দু পাড়ার দায়িত্ব নিতে হয় মধুকে । এ নিয়ে একদিন আরজের সাথে বেশ কলহ হয় তার । আরজ বলে-
-লাঠি চালন ছাড়ান দে মধু । চরের দহল মণ্ডলরে দিমু । আরজের কথায় রাজি হয়না মধু  সেও বলে দেয়-
-জান দিমু, চর দিমুনা মণ্ডলরে 
এরপর একদিন টুগি পাড়ায় শোকের মাতম উঠে ঘরে ঘরে । মাতম উঠে মিয়া বাড়িতেও । বুড়ি হবিরন বিবি অভিসম্পাত করে মধুকে দিলে সবুর নাই হারামির, ভাইডারেই খাইল আইজ ।
চরদখলকে কেন্দ্র করে কর্তাবাহিনী আর মণ্ডলবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয় চৌহালিতে  ক্ষুদ্র ভাসানচর রঞ্জিত হয় মানুষের রক্তে  আরজ আলী চর দখলে বাঁধা দিলে মধুর সাথে কলহ হয় তার । ক্ষুব্ধ মধু নিজের কাছে থাকা ধারাল কোঁচটা ছুড়ে দিলে ওটা গিয়ে পীঠে বিঁধে ওর । পরক্ষনে খুন খুন রব উঠে উপস্থিত সবার মুখে মুখে । মধু মিয়া খুন করেছে ওর ভাইকে । তারপর জেলে পড়ার ভয়ে গ্রামটা পুরুষশূন্য হয়ে যায় চোখের পলকে । হিন্দু পাড়ার ভোদড় পালানোর সময় মধুকে সাথে নিতে চাই তার । সে বলে-
-মধু বইনের বাড়ি পলামু, ল যাই 
অকস্মাৎ কথা বলেনা মধু । স্বস্থানে থ মেরে বসে থাকে সে । তারপর বলে দেয়-
-যামুনা, ছাড়ান দে আইজ ।
ভাসানচর সংঘর্ষ মামলায় জেল হয় মধুর । খড়িমণ্ডল ভূমি অফিসের লোকদের হাত করে চরের অধিকার নেয় । পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার সবাই ফিরে আসে চৌহালি । ভাসানচরে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস শুনা যায় । ওরা মধুর কথা জানেনা । মধু এ পাড়ায় অতীত এখন  গ্রামে ফিরে ভোদড় দু একবার মধুর খোঁজ নিয়েছিল  তারপর আর খোঁজরাখা হয়নি ওর 
এরপর হঠাৎ একদিন খড়িমণ্ডলের ঘরে নবজাতকের ক্রন্দন শুনা যায় । খুশিতে জোড়া বলদ জবাই  করে চৌহালি ভোগ দেয় সে । টুগি পাড়ার মেয়েরা বলাবলি করে-
-হুনছনি, মণ্ডলের ঘরে পুলা আইছে । পুলার দেহি চাঁদরূপ ।
-কার কুলে অইলোগো বুচির মা ?
-আমাগো জরির ।
জরি এখন সংসার করছে খড়িমণ্ডলের ঘরে । মধুর খোঁজ আর সবার মত তারও অজানা     



সকাল রয়

কেউ কেউ হারিয়ে যায় নাগরিক কোলাহলে

সে রাতে পূর্নিমা ছিল না, বাতাসের গান ছিল না। শুধু নিরবতা রাতকে নিয়ে ডুবে ছিল কল্পনার অদৃশ্য সমুদ্রে। সেই অদৃশ্য সমুদ্রের সমস্ত দুঃখ গায়ে মেখে ছাদ থেকে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়বার আগ পর্যন্ত রুপু ভাবছিলো, ‘মরে গেলে মানুষের সাথে সম্পর্ক থাকেনা তবুও মৃত সম্পর্কের ইতিহাস কেউ চাইলেও সহজে মুছে ফেলতে পারেনা। যে ভালোবাসার মায়াজাল থেকে নিজেকে ফেরানো সম্ভব নয় সে ভালোবাসার মানুষ যখন আর কারও হয়ে যায় তখন কারো কারো কাছে মহাপ্রয়াণ হয় সমাধান। ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলে অনেক সম্ভব কিছু অসম্ভব হয়ে উঠে আর তখন কেউ কেউ ইচ্ছে করে নিজের মুখোশ খুলে দেখিয়ে দেয় তার আসল রুপ।
অভিরূপের সাথে রুপুর প্রেমের সম্পর্ক তিন বছরে পরলো। চাকুরীতে পদার্পন করার শুরুতেই প্রেমটা জমে উঠেছিল জল নূপুরের মতো। তারপর আর দশটা প্রেমের মতো পার্ক, গঙ্গা, রেস্তোরাঁ সব পেরিয়ে শুভ পরিণয়ের দিকে যখন ধাবমান ঠিক তখনি অনাকাঙ্খিত একটা ঘটনায় দুজনার দুমুখী আস্ফালনের সূচনা। ওদের দুজনের মাঝে সম্পর্ক নিয়ে কখনো কথা উঠেনি। অভিরুপ প্রেমের চুড়ান্ত রুপ দেবার ব্যাপারে সিরিয়াস না হলেও রুপু বিশ্বাসের জলটা এতবেশি খেয়ে নিয়েছিল যে সেটার ঘোর কেটে বেরিয়ে আসা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
পরিচিতদের মাঝেও বিয়েতে পাত্রীকে দেখার একটা আনুষ্ঠানিকতা থাকে। রুপু সেভাবেই সেদিন সেজেছিল। অভিরুপের মা-বাবা সহ বেশ কজন আত্বীয় স্বজন আসবে। ওদের বসার ঘরেই সবাই বসেছিল। অভিরূপের মা অবশ্য এ বিয়েতে রাজী নয় কিন্তু এতদিন ধরে ছেলের সম্পর্কের কথা সব আত্মীয়-স্বজন বলাবলি করে আসছে এখন কোন কারণ ছাড়া ভন্ডুল করে দিলে লোকের কথা বলবার একটা ইস্যু হবে। পরিচয় পর্বের পর হাতে আংটি নেবার জন্য রুপু হাত পেতে ছিল।। রুপুদের হয়ে যারা আয়োজন করেছে তাদের অপেক্ষা ক্রমশই ঘর ভর্তি হয়ে যাচ্ছিল। অভিরুপের বাবা রুপুর হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন! হাতের মধ্যমায় একটা রুবীর আংটি দেখতে পেয়ে ভ্রু-কুচকে তাকিয়ে রইলেন।
রুপু ভাবছিল ওর হাতটা ধরে নিয়ে অভিরূপের বাবা কিসের কোন দ্বিধা ধন্দে পড়ে গেলেন? ‘ঘটনার সূত্রপাত সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল। রুবী পাথর খচিত আংটিখানা অনেকক্ষণ ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে দেখে বললেন, -এই আংটি কোথায় পেলে? রুপু কিছু বলবার আগেই ওর মা বললেন, রুপুর বাবা অনেক আগে এনে দিয়েছিল। ঘরের সবার দৃষ্টি তখন আংটিকে ঘিরে। হঠাৎ যেন পিন-পতন নিরবতা ভর করলো ঘরময়। রুবী পাথরের এই আংটি বেশ কবছর আগে, যখন রুপুর বাবা বেঁচে ছিলেন তখন এনে রেখেছিলেন ওদের পুরোনো আলমিরার একটা বাক্সে। এতদিন সেখানেই ছিল আজ পুরোনো কাপড় সরাতে গিয়ে দেখা মিলল তার। রুপুর মা ভাবলেন, পড়ে থাকা আংটি রুপুর হাতে থাকলে ক্ষতি কি। রুপুও খুশি হয়েছিল আংটি হাতে পেয়ে তবে ওরা কিন্তু আচ করতে পারেনি উজ্জল পাথরের এই আংটিটা আসলে রুবীর আংটি।
সে বিকালে বিয়ের আংটি আর পড়ানো হলোনা। অভিরুপের বাবা বললেন রুবী পাথরের আংটি তাদের অফিসের ড্রয়ার থেকে বেশ কবছর আগে চুরি গেছিল। রুপুর বাবা ছিল তখন ওই অফিসের ম্যানেজার। খোয়া যাওয়া আংটির কথা ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি। আজ স্বচক্ষে দেখে পুরোনো ব্যাথাটা জেগে উঠেছে। আর যাই হোক চোরের মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে হতে পারেনা
পরদিন এক দুপুর কেঁদেও অভিরূপকে বোঝাতে ব্যার্থ হলো রুপু। তার বাবা চোর যে হতে পারে নাএটা অবিশ্বাস্য। তাছাড়া ওই আংটি চুরির কথা এতকাল তো কেউ জানতো না। এতদিন পর কেন প্রসঙ্গ আসলো?
অভিরুপ শুধু বলেছিল ওই আংটির পেছনে পিঠে একটা চিহ্ন রয়েছে, যা ওর বাবা জানতো। রুপুর বাবা বেচেঁ থাকলে হয়তো সত্যিটা জানা যেত। কিন্তু এখন তো সেটা সম্ভব নয়। উপায়হীন হয়ে গেলো রুপু আর ওর মা। অভিরূপের এ বিয়ে না হলে হয়তো কিছু হবেনা। কিন্তু রুপু? সে-যে প্রেমের পাগল পাড়ায় সব কিছু খুইয়েছে। তার কি হবে?
এতদিনকার ভালবাসা সামান্য আংটিকে কেন্দ্র করে শেষ হয়ে যাবে। সত্যিই কি রুপুকে ভালোবাসতে অভিরুপ? নাকি ফুলের গায়ে প্রজাপ্রতি হয়ে পরশ বুলিয়ে একদিন ফুলটাকেই দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে যাবার আশায় ছিল। জীবন থেমে থাকেনা তবে রুপু এতটাই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, সকাল-দুপুর-সন্ধ্যের সব রঙ কেই অসহ্য লাগতে শুরু করলো।
আত্মার মরন হয়না, দেহ পাল্টে হয়তো হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় কিন্তু প্রত্যেকটা ব্যাক্তি প্রেমের মরন হয়। প্রেম একবারই হয় দ্বিতীয় বার হলে সেটা হয় অভিনয়। অভিরুপকে ছাড়া রুপুর জীবন পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। দিন যাচ্ছিল এভাবেই একসময় অভিরূপ তার মুখোশ খুলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নির্দ্বিধায় বলে যায় কোন চোরের মেয়েকে ঘরে তোলা সম্ভব নয়। ব্যাপার সামান্য হলেও সুযোগটা মস্ত বড়ই মনে হয় অভিরুপের কাছে। সে যা চেয়েছিল তা পেয়ে গেছে অনেক আগেই। অভিরুপের মা সেদিন-ই এই বিষয়টা নিয়ে দারুণ রকমের বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন। মনে মনে শঙ্কিত হলেও মুখে প্রকাশ করেন নি।তিনিও আত্মীয়-স্বজনদের বলে বেড়ালেন আর যাই হোক চোরের মেয়েকে আমরা নিশ্চয়ই ঘরের বউ করতে পারিনা
রুপুর মৃতদেহ নিয়ে যখন আনটোল্ড স্টোরি বে্রিয়েছে পত্রিকায়। চারপাশে যখন গুঞ্জন আহা! মেয়েটা খুব ভালো ছিল। তখনো চাপা পড়ে আছে সেই আংটির সত্যি খবরটা। জীবনের পথে অনেক কিছুই অপ্রকাশিত থেকে যায়। সামান্য কিছুর জন্যই হয়তো কেউ কেউ নিজেকে নিয়ে ঝাঁপ দেয় অন্তিম অদৃশ্য সমুদ্রের মাঝে। সপ্তা পেরুতেই থেমে যায় সব। মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। মুল কাহিনী চাপা পড়ে যায় নগর যাত্রার জাঁতাকলে এবং কেউ জানতে পারেনা অভিরূপের মা কোন একদিন ওই আংটি লুকিয়ে রুপুর বাবাকে উপহার দিয়েছিল ভালোবেসে।



বুধবার, ২৭ মে, ২০১৫

বর্ষ ৪ সংখ্যা ১৩।। ২৮শে মে ২০১৫

এই সংখ্যায় ১০টি গল্প । লিখেছেন – সুবীর সরকার, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, সুবীর কুমার রায়, আবু রাশেদ পলাশ, শ্রাবণী বসু, দেবাশিস কোণার,  ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী, সীমা ব্যানার্জী রায়, ও শাঁওলি দে ।
            
          পড়ুন সূচিপত্রে ক্লিক করে