রমাকান্ত নামা--প্রপঞ্চ
কথা
সংসারে
থাকতে গেলে নাকি খিটিমিটি লেগেই থাকে। সংযুক্ত পরিবারে তো তা হতেই পারে–নানা মুনির নানা মত। যেখানে এতগুলি লোকের
বাস চলতে ফিরতে উঠতে বসতে ঠোকাঠুকি লাগা বিচিত্র কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, বুঝে শুনে চলতে হবে তা না হলে বাঁধন আলগা তো হবেই! ভেঙ্গে পড়বে যৌথ পরিবার, এমন কি কর্তা
গিন্নীর মধ্যেও বিচ্ছেদ ঘটে যেতে পারে। ওই একটা কথা বুঝেশুঝে চলা, বুঝেশুনে চলার একটা তারতম্য আছে। এই রমাকান্ত বাবু তা
হাড়ে হাড়ে টের পান।
যখন ভালো তখন ভালো, ও
গো, হ্যাঁ গো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে প্যান প্যানানির
অন্ত নেই।
এই
শৈলবালা রমাকান্তর স্ত্রী এসে বললেন, কি গো, আমায় একটা শাড়ি কিনে দেবে বলেছিলে ?
রমাকান্তর
মনে হল, আহা,শাড়ির
নামে বউ যেন আহ্লাদে আটখানা ! তিনি স্বাভাবিক ভাবে, নিজের অজান্তে নাকটা সামান্য কুঁচকে ছিল কিনা তিনি জানেন না, বললেন,
কোত্থেকে দেবো
? গত মাসে ছেলের বই পত্র ড্রেসে কত খরচ হয়ে গেছে তা জানো ?
--জানি, সব জানি--হিসাব পত্র তো সব আমার কাছে নেই--মাসের শুরুতে মাইনের টাকা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে তুমি তো খালাস। তারপর
কি উপরি পাও না পাও ও সব আমায় জানাও না—
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল, এবার রমাকান্ত কিছু বলতে গেলেই বাকবিতণ্ডা
শুরু হয়ে যাবে। কোন এক পক্ষ যদি না থামে তবে হয়ে যাবে খণ্ডিত মহাভারত।
--ঠিক আছে আগামী মাসে কিনে দেব--
--কত আগামী আসবে গো তোমার?মুখ ঝামটা দিয়ে নিজের কাজে বেরিয়ে গেলেন শৈলবালা। কথা ঠিক, দু মাস
ধরে আগামী মাসের কথা চলছিল বটে।
রমাকান্ত
জানেন আপাতত পর্দা পড়ল দৃশ্যের। এর পরের রেশ নিয়ে শুরু হবে আগামীর দৃশ্য। সেক্সপিয়ারের
সেই পুরনো কথাটা লোকে ছেনে ছেনে একেবারে ছানা বানিয়ে ছেড়েছে। সেই পুরানো কথা--পৃথিবী হল নাট্যমঞ্চ। এখানে পর্দা উঠছে
আর নামছে--যাকে
বলে নব নব দৃশ্যান্তর !
স্ত্রী
শৈলবালা রেগে আছেন,
শাড়ি বিনা মুখ তাঁর হাঁড়ি, না কথাটা মিলাবার জন্যে হয়ে গেল। রমাকান্ত দেখেছেন, স্ত্রী রেগে গেলে, বোধ হয় খানিক বেশী রেগে গেলে এমনটা হয়, রমাকান্তর পাশ দিয়ে যাবার সময় গায়ে গা
ছুঁয়ে না যায় স্ত্রী তখন এমনি সতর্কতায় চলাফেরা করেন। কেন রে বাবা গায়ে গা লেগে
গেলে কি ফোস্কা পড়বে ? নাকি শরীর প্রেমিকার মত ঝুনঝুনানি দিয়ে উঠবে ?—আহা, সেই নব প্রেম জীবনের শিহরণ যেমনটা
? কিন্তু এ বয়সে এসব আসে কি করে ? রমাকান্ত জানেন, এ বয়সেও এমনটা আসতে পারে। তাই তো স্বামীর প্রতি রাগ
বলে তাকে স্ত্রী ছোঁয়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত করার শাস্তি এটা। স্ত্রীদের ভাবনাগুলি অনেকটা
এমনি। স্বামীকে শাস্তি দেওয়া মানে তার থেকে দূরে দূরে থাক, তাকে ধরতে ছুঁতে দিও না--কুণ্ডলীস্থান স্পর্শ তো দূরের কথা। তা
হলেই যদি স্বামী বেটা শায়েস্তা হয়--এমনি একটা ভাব আর কি !
পুষদেরও
বলি হারি, দুটো দিন চুপ করে দাঁত কামড়ি দিয়ে পড়ে থাকতে পারিস না--কিন্তু তা হবার নয়--তাদের শারীরিক আবহাওয়াটাই
নাকি এমনটা--ঠাণ্ডা
গরম হতে সময় লাগে না ! এখানেও
তাই, শৈলবালা রেগে আছেন। আর ছেলে পাড়া-পড়শির সামনে তিনি অমায়িক বস্তুটির মত হয়ে থাকেন, মুখে হাসি ঝরিয়ে, মানে একেবারে স্বাভাবিক--এমনটা মনে হবে তাঁর সংসারে একটা চিড়িয়াও
যেন কিছু খুঁটে খেয়ে যায় নি! আর সেই শৈলবালা রমাকান্তর সামনে এলেই গম্ভীর, যেন এক চির শত্রু তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে।
কিছু প্রশ্ন করলে তার জবাব নেই, কিম্বা জবাব সারসংক্ষেপ--
রমাকান্ত
অফিস যাবার তাড়ায় সার্ট খুঁজে পাচ্ছিলেন না,
অগত্যা স্ত্রীকে বলতেই হল,
বুঝলে আমার শার্ট পাচ্ছি না--
--চোখ তো আছে, দেখে নিতে পার না ?
--অফিসের দেরী হচ্ছে যে, তাড়াতাড়ি একটু দেখে দাও না--
এবার
নিজে নিজে গজগজ করবে শৈলবালা, ঘরের ঝি পেয়েছে আমাকে --সব কাজ আমাকেই দেখতে হবে !
রমাকান্তর
রাগটা এখনও জমাট বাঁধে নি। তাই এক তরফা কোন্দল ততটা জোড়াল হয় নি ! আর তা ছাড়া অফিসে যাবার তাড়ায় তাঁর এ
সময় কিছু বলার অবকাশ নেই।
শৈলবালা
এসে খাটের ওপর শার্ট ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হন হন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওঁর রাগ একটু
বেশী। আর তা ছাড়া বয়স বাড়ছে, সংসারের খাটাখাটনিও তো কম নেই
! ঠিকা ঝি একটা আছে বটে--সে ঠিকার বাইরে যাবে কেন ?
অফিসেও
শালা, মাঝে মাঝে মন মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়। বসের অন্যায্য কথা কত আর শোনা যায়। দু-একটা
পাল্টা কথা বল তো ভার হয়ে যায় গোপলা ! অফিসটা যেন সরকার থেকে কিনে নিয়ে এসেছেন তিনি ! আসলে এমনটাই হয়, ঘরের পরিবেশ অফিসে ঢুকলে গেলে, ঘর খেঁচানো মন যাবে কোথায় ? অফিস থেকে ভার মুখ নিয়ে ঘরে ফিরলেন রমাকান্ত।
অভ্যাস
মত আরাম কেদারায় বসে ডাক ছাড়লেন, কৈ ? আমার
চা কৈ ? শৈলবালা
চায়ের কাপ-প্লেটে ঠনঠন শব্দ তুলে টেবিলে রাখলেন।
--কি ব্যাপার কাপ প্লেট ভাঙবে নাকি?
কথাহীন
শৈলবালা, যেমনি
প্রবেশ, তেমনি তাঁর প্রস্থান।
অসহ্য
হয়ে উঠছিলেন রমাকান্ত, ঘরে স্ত্রী, অফিসে বস। জালার আর শেষ নেই। তিনি বুঝতে পারলেন ঠোকাঠুকি আসন্ন। তিনি
হাঁক দিলেন, কৈ, চায়ের সঙ্গে বিস্কুট দেবে কে ?
ঘরের
বাইরে থেকে জবাব এলো, আজ বিস্কুট নেই--
টেম্পারেচার
বেড়ে যাচ্ছিল রমাকান্তর। বুঝতে পারছিলেন, ঠোকাঠুকির মধ্যে ঠোকা কাজ আগেই হয়ে আছে, এখন
ঠুকি লাগলেই হল। কিন্তু বুঝলেই সমস্যার শেষ হয় না--মনের মধ্যে থেকে কি বলে আত্মতুষ্টি চাগাড় দিয়ে উঠতে থাকে যে! তিনি বলে উঠলেন, তা হলে চা’টাও নিয়ে যাও--
পাশের
ঘরের থেকে জবাব এলো, কেন
একদিন বিস্কুট না হলে চা খাওয়া যায় না নাকি
?
--না,
যায় না, এ চা তুমি গেলো--এই গেলো, শব্দটা রমাকান্ত বলতে চান নি। তবু শালা, কিছু শব্দ আছে বাক্যের
মাঝে অবলীলাক্রমে ঢুকে যায়!
--কি বললে আমায়--গিলার কথা বললে?আমি তোমার সংসারে বসে গিলছি ?
রমাকান্তর
মুখের সামনে এখন জ্বলন্ত প্রশ্ন, তবু নিজেকে সামলে বললেন, আমি তা বলি নি--
--বললে তো তুমি, তুমি এখন আমায় খাবার খোটাও দিচ্ছ?
মেয়েছেলেরা
স্বভাবত ছিঁচকাঁদুনে হয়, একটুকিছুতেই তাদের কথা ভারী হয়ে যায় এবং তারপরেই কিছু ভাবাবেগ গলায়
দলা পাকিয়ে ওঠে, আর
শরীরের তরল পদার্থ
চোখে এসে জমা হয়।
বুঝে
গেছেন রমাকান্ত, এর
রেশ দু তিনদিন চলবে। গোমড়া মুখ নিয়ে ছটছট ধনুক ছিলার মত ছিটকাতে চাইবে। শৈলবালাকে এ
সময় সান্ত্বনা দিয়েও লাভ নেই। আর তা ছাড়া রমাকান্তরও এখন সে ধরণের মাথা কোথায়? তবু বললেন,
ঠিক আছে, শুধু চাই আমি খাচ্ছি। মাথা উঁচু করে দেখলেন তিনি, কোথায় শৈলবালা ! তিনি তো ঘর থেকে আগেই নিষ্ক্রান্ত হয়ে
গেছেন। মনে মনে গর্জে উঠলেন তিনি, যত সব !
রাত
এলো, মানসিক আবহাওয়ার কোন পরিবর্তন
নেই। রাত বাড়তে থাকলো আর রমাকান্তর মন ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকলো। বিছানা, বিশ্রাম এসব মানসিক ধারণাগুলি মন শান্ত
করায় কাজে আসে। তবে হ্যাঁ, আরও একটা মোক্ষম কারণ আছে,
দাম্পত্য জীবনের যাকে সুখাধার বলা যায়। সে আধার বিনা এ
সংসারধর্ম অচল। এ কথা মুখে আমরা বলতে না চাইলেও দেহে মনে ভালো ভাবেই ধরে থাকি। বিছানার
ধারে গিয়েই
রমাকান্তর মনটা চটে গেল। আজ বিছানার মাঝখানে ছেলেকে শুয়িয়ে বিমুখ শৈলবালা পশ্চাৎদর্শী
হয়ে শুয়ে আছেন। না ঘুমিয়েও ঘুমের ভান করছেন। মনে রাগ এলেও নিজেকে শান্ত করলেন তিনি। সব কিছু এই
মহিলার ফন্দিবাজি। ছেলেকে দিয়ে বিছানায় ঘের দিয়েছেন। যাতে রমাকান্ত তাঁকে ছুঁতে না
পারেন। এইটাই হবে শাস্তি। বাস্তবে পুরুষগুলির এ শাস্তিই সব চে বড় শাস্তি। সব স্ত্রীরাই
তা অবগত আছেন। তাই রাগের মাশুল স্ত্রীরা এমনি ভাবেই দিতে চেষ্টা করেন।
আর
দশটা পুরুষের মত রমাকান্তও বিছানায় বড় দুর্বল। কিছু সময় শুয়ে স্ত্রীর পাশে উঠে এসে
শান্ত গলায় তিনি ডাক পাড়লেন, এই, কি গো, শুনছো ?—ওগো, কি গো, ডাক এবার রমাকান্তর মুখে এসে গেছে। তিনি ধাক্কা দিলেন শৈলবালাকে।
না, নট নড়ন চড়ন। ওই যে কথায় আছে
না, জেগে থাকা মানুষকে জাগানো
যায় না। দু চার ধাক্কা খেয়ে তিড়িং করে উঠে বসেন শৈলবালা,
ঝাঁঝানো গলায় বলে ওঠেন,
কি, হচ্ছেটা কি ?
রমাকান্ত
নেতিয়ে বলে উঠলেন, তোমার
পাশে একটু শুবো গো ?
--না--কক্ষনো
না--
--কেন গো ?
--জানো না তুমি?--আমায় খাওয়ার খোঁটা দাও--
--ওটা তো কথার কথা--
--না--আমায়
বিরক্ত করবে না বলে দিচ্ছি--যাও, যাও
নিজের জাগায়--অনেকটা
আদেশের সুর শৈলবালার মুখে।
রমাকান্তর
রাগ আবার চড়ে যাচ্ছিল। চুপচাপ
নিজের জাগায় এসে বসলেন। শরীর তাঁর চড়া হয়ে গেছে। এখন ঘুম আসবে না জানেন তিনি। এ সময়
রাজ্যের চিন্তা এসে মাথায় জড়ো হয়। সে সঙ্গে এক ধরণের বিরহ ভাবনা মাথায় এসে কিলবিল করতে
থাকে। এমনি সময় ক্ষয়িত ভাবনাগুলি জুড়ে শূন্য কালের কবিতার ভাব মনে এসে যায়। এক সময়
রমাকান্ত লিখতেন, আধুনিক কবিতা। ছন্নছাড়া উচ্ছন্নের কবিতা, বিরহ ভাবনার উচাটন উচ্চারণের
কবিতা—আবার
এমনটাও তিনি দেখেছেন, বিরহে
মন খুলে যায়, নতুন
ভাব মনে জন্ম নেয়, বাঁধ
ভাঙা ভাব এসে মনে ধাক্কা মারে। সুখ দুঃখের প্রেম বিরহের গাজন গান মনে এসে যায়। দুখের মাঝে বিশ্রামের
কবিতার সুর শুনতে পান তিনি।
বস্তুত
সুখ দুঃখ, প্রেম
বিরহ সব কিছু জীবনের পরিবর্তিত সংজ্ঞা। এগুলি ক্ষণস্থায়ী। এখন তুমি ভালো, পরক্ষণেই দুঃখ ভারাক্রান্ত। স্ত্রী প্রেমিকার
হাতের স্পর্শের সুখে এখন তুমি আপ্লুত, আবার খানিক পরেই মন-মলিনতা তোমাদের বিরহ এনে দিতে পারে। স্ত্রী যখন
তোমাকে ছুঁতে দেবে না, একই
ঘরের মাঝে চির বন্ধনের মাঝে তুমি বিরহের সুর সুনতে পাবে ঠিক তেমনি ভাবে যেমনটা নব প্রেমিক
প্রেমিকারা শুনতে পায়।
কখন
যেন রমাকান্ত ঘুমিয়ে পড়েছেন। ঘুমের মাঝে, স্বপ্নের মাঝেও বাস্তবের বিচরণ চলতে থাকে।
এখানেও সেই সুখ দুঃখের প্রপঞ্চ কথা!