গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়

সঙ্গী

শীতের সকালে একা একা মৃতা পঁচাত্তর বছর বয়সের  স্ত্রীর হাত ধরে বসে রইলেন সুমিতশেখর। সুহাসিনীর মৃত্যুকালে তাঁর চার ছেলেমেয়ের কেউই পাশে ছিল না। তখন শীতকাল। সুহাসিনী ঘরের বাইরে বাঁধানো চাতালে বেতের চেয়ারে বসে সকালের চা খাচ্ছিলেন। একদিকে সুমিতশেখর, তিনিও  বসে ছিলেন।  সুমিতশেখর তাঁর স্বামী, যথারীতি সকালের পূজা-পাঠ শেষে পায়ে মোটা মোজা, মাথায় টুপি,গায়ে  পাঞ্জাবীর উপরে একপ্রস্থ গরম জামাকাপড়, তাঁর উপরে শাল মুড়ি দিয়ে সুহাসিনীর পাশে বসে চা খেতে খেতে কথা বলছিলেন। বেশির ভাগ কথাবার্তাই সাংসারিক, মধ্যে ছেলেমেয়েদের কথাও হচ্ছিল। গত কয়েকদিন ধরেই সুহাসিনী কথায় কথায় ছেলেমেয়েদের কথা তুলছিলেনক্রমাগত একই কথা  বারবার বলায় বিদ্রুপের সুরে সুমিতশেখর বলে উঠলেনভারি তো ছেলেমেয়েদের কথা ভাব, কই, এতবার করে যে ওদের বললে এখানে আসার জন্য, একজনও এলো? তুমি শুধু ওদের নিয়ে চিন্তা কর, ওরা করে না, বুঝলে? 

সুহাসিনী এই কথায় দুঃখ পান। আজও পেলেন। ছেলেমেয়েরা থাকে কত দূরে। ঘর-সংসার, নিজেদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, স্বামীদের আপিস-কাছারি সব ফেলে মেয়েরাবৌমারা কি করে এতদুরে এসে বসে থাকবে? এত  দুরে আসতে গেলে তো আর এক/দুদিনে র জন্য আসা যাবে না, হাতে কয়েকদিনের সময় নিয়ে তবে আসা । তিনি নিজে কি তা জানেন না? তাহলে শুধু শুধু সুহাসিনীকে কষ্ট দেওয়া কেন!  বেশ তো ছিলেন ছেলেদের কাছে। বড় শহরে থাকা, খাওয়া, আরামের তো কোন অসুবিধে ছিল না! ছোট ছেলের কাছে যখন বিদেশে ছিলেন, ছেলে-বৌমা, নাতনি কত করে বলেছিল ওখানে থাকার জন্য। কিন্তু সুমিতশেখরের সেই এক কথা---বিদেশের মাটিতে মরব কি রে, আমার কি নিজের দেশ নেই ?যদি ওরা আরো বেশিদিনের জন্য আটকে রাখে, তাড়াতাড়ি তিনমাসের মাথায় চলে এলেন কলকাতায় বড় ছেলের বাড়িতে। তা সেখানেও তো দিব্যি ছিলেন! হেসে-খেলে, শরীর চর্চা করে, বাজারে ঘুরে ঘুরে মাছ, শাক-সব্‌জি কিনে, নাতির সঙ্গে পার্কে খেলা করে তাঁর তো দিন মন্দ কাটছিল না! কিন্তু কি যে হল,  আবার  পালিয়ে এলেন। মানুষটার বোধ হয় এক জায়গায় বেশিদিন মন টেঁকে না।  সব ছেড়ে ফিরে এলেন সেই বাপের ভিটেয়। ছেলেমেয়েরা তাঁদের চাকরি জীবন, সংসারজীবন ফেলে রেখে  এখানে এসে থাকতে পারে ? তাঁর নিজের চাকরি জীবনে তিনি এসে কদিন ছিলেন বাপ-মায়ের কাছে!
সুমিতশেখর এসব যে বোঝেন না তা নয়, তবু বলা চাই, আর এইজন্যই সুহাসিনী মনে মনে কষ্ট পান। সারা জীবন বড় বড় শহরে, ঠাটে-বাটে থাকার পর সুহাসিনীর কি কষ্ট হয়না, এই আধা শহরে এসে থাকতে? কি আছে এখানে, দুটো ভাল করে কথা বলার মত লোক পাওয়া যায় না! কিন্তু সুহাসিনী হলেন  সেই ধরণের স্ত্রী, যিনি স্বামীর কথায় কোনদিন অবাধ্য হবেন না, স্বামীর কথাই শেষ কথা, যত কষ্টই হোক  না কেন, মানিয়ে নেবেন। তবে আর শুধু ছেলেমেয়েদের কথা বারবার তুলে তাঁকে কষ্ট দেওয়া কেন?

সুহাস কি ছেলেমেয়েদের কথায়  তাঁর উপর রাগ করে চলে গেলেন! ছেলেমেয়েদের সম্বন্ধে বিরক্তি প্রকাশ কি তাঁকে খুব বেশী আঘাত দিল? সুহাসিনী চিরদিনই বড় বেশী সন্তানভক্ত। এমন মা বুঝি কোটিকে গুটিকও মেলেনা। সুমিতশেখরের ছেলেমেয়েদের নিয়ে অত আহ্লাদেপনা নেই। তাঁদের মানুষ করেছ, লেখাপড়া শিখিয়েছ,ব্যস! এবার ছেড়ে দাও। সুহাসিনীর মত কে মাছ ভালবাসে, কে ছোট মাছ খায় না, কার রসগোল্লা পছন্দ, কে কারিপাতা দেওয়া ডাল মুখে তোলে না,এসব মনে থাকে না,অত আদিখ্যেতা ভালও বাসেন না। তাই কি ছেলেমেয়েরা তাঁকে একটু এড়িয়ে চলে? নাতি-নাতনীরাও সুহাসের ভক্ত বেশী। তিনি নিজেই বা কি কম! সুহাসের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন সুমিতশেখর।  
  
কতক্ষণ কেটে গেছে সুমিতশেখর নিজেও জানেন না। বড় ফটকটার গায়ে  কেউ যেন জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। শব্দ শুনে সম্বিৎ ফিরল সুমিতশেখরের,কিন্তু সুহাসকে ছেড়ে কি করে এখন উঠবেন বুঝতে  পারছিলেন না। শব্দটা কি অনেকক্ষন হচ্ছে! বাড়ির ফটকটা খানিক দূরে। বাঁধানো চাতাল পেরিয়ে কিছুটা ঘাসের লন মত আছে। সুহাসের আবদারেই এটা করতে হয়েছিল। গাঁ-গঞ্জে থাকি বলে কি গাছপালা, ঘরদোর সব অগোছালো করে রাখতে হবে নাকি! ঘরদোর সাজানোয় খুব শখ ছিল সুহাসের। খুব মামুলী জিনিস দিয়েও এত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখত, মন জুড়িয়ে যেত দেখলে। শব্দটা আরো জোর হচ্ছেকেউ কি ডাকছে? সুহাসের হাতটা আরো জোরে চেপে ধরলেন সুমিতশেখর।

(২)

ধপ করে একটা আওয়াজ আর বাড়িতে কাজ করে যে দেহাতী মেয়েটা, যুগিয়া, তার ছোট ছেলেটা লাফ দিয়ে পড়ল এপারে। সুমিতশেখর যেন কিছু দেখেও দেখলেন না। যুগিয়ার ছেলে, যার নাম কিনা টংলু, সেখান থেকেই হাঁক দিল----দাদা, হেই দাদা...হাঁকছি কখন থেক্যে, শুনতে নাই পাও? মা দাঁড়ায় আছে বাহারে..চাবি খুল...

সুমিতশেখরের দিকে ছুটে এল  টংলু। কি বুঝল কে জানে, একছুটে ঘরে ঢুকে একটা ছোট্ট বেতের ঝুড়ির ভিতর থেকে বাইরের ফটকের চাবি নিয়ে তালা খুলল। আর তারপরই শোনা গেল তার চীৎকার--- মা,আস্যো আস্যো...দিদির কি হইছে দ্যাখ, কে কুথাকে আছো গ,আস্যো আস্যো...ইদিকে আস্যো গ...
যুগিয়াই ছুটে এলো সকলের আগে। সকালের বাসী কাজ করার জন্যই সে এসেছে। এসে  দ্যাখে এই কান্ড! টংলুকে পাঠাল আশাপাশে বাড়িতে খবর দিতে।

তারপরের ঘটনা দ্রুত ঘটে যেতে লাগল। একেবারে যেন ঘড়ির কাঁটা ধরে। আশেপাশে বাড়ির লোকজনেরা  এলেন,সুহাসকে ঘরের ভিতর খাটে শোয়ানো হল। ছেলেমেয়েদের খবর দেওয়া হল। বিকেল নাগাদ বড় ছেলে, বৌমা, নাতি আর ছোট মেয়ের দলবল এসে হাজির হল। সুমিতশেখরের জন্য শোবার, বিশ্রাম করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু সুহাসের পাশে বসে একটি হাত ধরেই তিনি বসে রইলেন আগের মতই। সুমিতশেখর কি কিছু বুঝতে চাইছেন, কোন প্রশ্ন আছে তাঁর সুহাসের কাছে, নাকি তিনি ক্ষমাভিক্ষা করছেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে দুঃখ দিয়েছেন বলে, কটু কথা বলেছেন বলে? সুমিতশেখর যেন সেটাই জানতে চান।

সুহাসকে নিয়ে যাবার সময় মেয়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। একবার তাঁকে অন্য ঘরে নিয়ে যাবার চেষ্টা  করল। সুমিতশেখরের মুঠি আরো দৃঢ হল। যুগিয়া পায়ের কাছে কাঁদতে লাগল ---মা ঠাকরুণ  নাই বাবা, যাত্যে দাও উনাকে...
শেষে টংলু এসে হাত ধরল সুমিতশেখরের---দাদা, আমি যাব্যো, তুমি চল আমার সঙ্গে।সুমিতশেখর কিছু বুঝি বলতে চান। যুগিয়া বলে উঠল---চল বাবা, আমরা যাব্যো।
শববাহকদের সঙ্গে যেতে কষ্ট হবে ভেবে মেয়ে জামাই তাঁকে গাড়ীতে তুলে নিতে চাইলেন। সুমিতশেখর কোন কথা না বলে টংলুর একটা হাত ধরে উঠে দাঁড়ালেন।

পড়ন্ত বিকেলের আলোয় সুহাসের পাশে পাশে শ্মশানযাত্রীদের সঙ্গে হাঁটতে লাগলেন সুমিতশেখর। একহাতে ধরা রইল টংলু আর পিছনে তাঁকে সাবধানে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল যুগিয়া। শেষজীবনের সঙ্গী তো এরাই!

ঢালের কাছে এসে শক্ত করে টংলুর হাত ধরলেন সুমিতশেখর।




     

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

না-রূপকথা

- ‘একটা গল্প বলনা পিপিয়া’
- গল্প? গল্প আমি একদম বলতে পারিনা, তুই দিদিয়াকে জিজ্ঞাসা করে দেখ।
- ‘কেন ঠাম্মা তো পারে। রাত্তিরে শুয়ে শুয়ে রোজ কত গল্প বলে আমায়। তুমি পার না কেন?’
- ওই তো, দিদিয়াকেও তো ওর দিদামা-ই গল্প শোনাত আর ইসেমশাই। আমি একদম গল্প বলতে পারিনা রে। ঠাম্মা তো সুন্দর লিখতে পারে, তাই সুন্দর গল্পও বলতে পারে।
- ‘তুমিও তো লেখ। তাহলে তুমি কী পার?’
- হুমমম...আমি তো সত্যি লিখি তাই সত্যি বলতে পারি।
- ‘গল্প কি মিথ্যে নাকি? সিন্ডারেলা, স্নো-হোয়াইট সব মিথ্যে?’
- গল্প? গল্প ঠিক সত্যিও না আবার মিথ্যেও না। ওটা সত্যি দিয়ে বানিয়ে তোলা মিথ্যে। মিথ্যের ভেতরও খুব ভালো করে খুঁজলে সত্যি পাওয়া যায়।
- ‘তাহলে আমাকে একটা সত্যি বল।’
- সত্যি? সত্যি ভারি কঠিন রে, ছোটদের শুনতে নেই। বড় হলে সবাই নিজে নিজেই জেনে যায়।
- ‘সত্যি কি ভূত যে ছোটদের শুনতে নেই? আমাদের স্কুলে খুব কঠিন অঙ্ক দেয়, আমি তো করি। ইঁ ইঁ ইঁ ইঁ...আমাকে সত্যি বল...’
- দাঁড়া, অমন বিচ্ছিরি করে চ্যাঁচাবি না, কানে লাগে। চুপ করে বোস। ধর একটা মেয়ে ছিল।
- ‘ধরব কেন? মেয়েটা কি সত্যি ছিল না? তাহলে সত্যি হল কি করে?’
- আচ্ছা, আচ্ছা, একটা মেয়ে ছিল।
- ‘কত বড় মেয়ে?’
- এই ধর কলেজে পড়ে।
- ‘আমি জানি কলেজ কী? স্কুলের পরে কলেজে পড়তে হয়। আবার ধরব কেন?’
- হুঁ, তুই তো সবই জানিস। আচ্ছা বেশ, ধরতে হবেনা, কলেজে পড়ে। তো সেই মেয়েটা ভারী গরীব ছিল।
- ‘সিন্ডারেলার মতো? ওর কি স্টেপ মাদার ছিল?’
- না রে, নিজের মা-ই। ও রোজ কলেজে পড়তে যেত, তারপর দুটো বাচ্চাকে পড়িয়ে অনেক রাত্তিরে বাড়ি ফিরত। কলেজ ছিল কলকাতায়, আর ওর বাড়ি ছিল গ্রামে। লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল। তোর মতো ফাঁকিবাজ নয়।
- ‘আমি সব হোমওয়ার্ক করে রাখি, মাকে জিজ্ঞাসা কোরো।’
- বেশ, গুড গার্ল। তো ওই মেয়েটাও সব হোমওয়ার্ক করে ভালো রেজাল্ট করে স্কুল পাস করে 
কলকাতার কলেজে ভর্তি হয়েছিল। সেখানেও ভালো রেজাল্ট করত। তো একদিন হয়েছে কি, ও স্টেশন থেকে নেমে যে রাস্তা দিয়ে ফিরত সেই জায়গাটা বেশ অন্ধকার অন্ধকার ছিল। গ্রামের লোকজন কতবার বিডিও-র কাছে গেছে, স্থানীয় নেতাদেরকে বলেছে যে ওখানে আলো লাগাতে। ওখানে বসে যেসব দুষ্টু লোকেরা মদ খায় তাদেরকে সরিয়ে দিতে, তো সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ বললেও, কেউ কথা রাখেনি।
- ‘নেতা কি, বিডিও কী - রাজা-মন্ত্রী? মদ কেমন খেতে? দুষ্টু লোকেরা মদ খায় কেন?’
- তা বলতে পারিস। এখন তো আর রাজা-মন্ত্রী নেই, আছে সরকার। ওরা সব সরকারের লোক। মদ হল একরকম লিকুইড, খায়। কোল্ড ড্রিঙ্কস নয়। বিচ্ছিরি খেতে। ওসব কেউ কেউ খায় যাদের ভালোলাগে। দুষ্টু লোকেরাও খায়। খেলে যা নয় তাই মনে হয়।
- ‘বললে কী করে? তুমি খেয়েছ? তুমি তো দুষ্টুমি কর না।’
- হ্যাঁ, টেস্ট করেছি, বললাম তো বিচ্ছিরি খেতে। তারপর একদিন হয়েছে কি, ওই অন্ধকার রাস্তা দিয়ে মেয়েটা আসছে আর দুষ্টু লোকেরা ওকে ধরে নিয়ে একেবারে আঁচড়ে, কামড়ে, সে এক বিভৎস অবস্থা।
- ‘ওরা কি মদ খেয়ে রাক্ষস হয়ে গিয়েছিল? তোমার সত্যি বিচ্ছিরি। ঠাম্মার গল্পই ভালো। সিন্ডারেলা, স্নো-হোয়াইটে বিচ্ছিরি একটা স্টেপ মাদার থাকে কিন্তু পরে ভালো একটা প্রিন্স চলে আসে। তোমার সত্যিতে প্রিন্স নেই?’
- না রে, সত্যিতে কোনও প্রিন্স থাকে না। আর যদি থাকেও তাহলে সত্যিকারের প্রিন্সদের গল্পের প্রিন্সদের মতো অত সাহস থাকে না। তুই ঠিক বলেছিস, ওরা তখন রাক্ষস হয়েই গিয়েছিল। তারপরে তো লোকজন চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে হৈ হৈ করে গিয়ে দেখে মেয়েটা মরে পড়ে আছে আর রাক্ষসগুলো সব পালিয়েছে। মেয়েটার বাবা তখন কাঁদতে কাঁদতে পুলিশে গিয়ে নালিশ করল।
- ‘তারপর পুলিশ এসে দুষ্টু লোকগুলোকগুলোকে মারল তো? আমি জানি পুলিশেরা দুষ্টু লোককে মারে। আমি যখন খেতে চাই না তখন ইনাই মাসি বলে, তুমি খাচ্ছ না তো, আমি মাকে বলে দেব। আরও দুষ্টুমি করলে বলে, পুলিশ এসে মারবে। আর তক্ষুনি আমি লক্ষ্মী হয়ে সব খেয়ে নিই।’
- নারে ওটাও গল্প। সত্যি সত্যি পুলিশের লোকেরা এসে মেয়েটাকে নিয়ে গেল। আর বাকি যারা দুষ্টুদের শাস্তি চাইছিল তাদের বকাবকি করে বলল, একদম গোল কোরো না, তাহলেই ধরে জেলে পুরে দেব। তারপর পরেরদিন সেই নেতা এলো। এবার আরও নরম করে মেয়েটার বাবার হাতে অনেক টাকা, হাজার হাজার টাকা দিয়ে বলল, যা হবার তো হয়েই গেছে, একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে ওরা। আমার খুব খারাপ লাগছে। আপনারা বরং ওকে এনে পুড়িয়ে ফেলুন, আমরাই সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, আপনার কোনও চিন্তা নেই। থানা-পুলিশ এসব করলে বুঝতেই পারছেন কখন কি হয়...। ওরা তো এলাকারই ছেলে। আমি দেখছি ওই রাস্তাটায় দু-চারদিনের মধ্যেই আলো লাগিয়ে দেব। আপনার একটা ছেলে আছে না বড়? ওকে আমার কাছে একটু পাঠিয়ে দেবেন, দেখছি সরকার থেকে একটা চাকরি যদি দিতে পারি...।
- ‘আর দুষ্টুদের শাস্তি দেবে বলল না? অ্যাঁ, অ্যাঁ, অ্যাঁ ঠাম্মার গল্পে তো দুষ্টুরা শাস্তি পায়। রাজা হলেও পায়। জানো না তুমি, কিচ্ছু জানো না। বিচ্ছিরি সত্যি। তোমার সত্যি আমি আর শুনব না।’
- হ্যাঁ রে, সত্যি বিচ্ছিরিই হয় তোকে তো আগেই বললাম। তাও দুষ্টুদের শাস্তির জন্য গ্রামের লোকজন লড়েছিল রে অনেক, কিন্তু কিচ্ছু হলনা। মেয়েটার বাবা-মা, দাদাই তো টাকাপয়সা নিয়ে, চাকরি নিয়ে সেই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল। ওদেরও দোষ ছিলনা। দুষ্টুগুলো আর সেই মন্ত্রী তো ওদের মেরে ফেলার ভয়ই দেখিয়েছিল। মরা মেয়ের জন্য মরার থেকে নিজেদের জন্যই বাঁচা ভালো মনে হয়েছিল ওদের।

সত্যি, সত্যি সত্যিই খুব বিচ্ছিরি। যত বড় হবি দেখবি সত্যিগুলো চারদিক থেকে কেমন চেপে বসছে আর গল্পেরা আবছা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এসব সত্যি তো শুনতে হয় না রে। মেয়েরা আপনিই জেনে যায়, নিজে নিজেই। 

সনৎ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

টিনমামা

তারকনাথ চক্রবর্ত্তী - সংক্ষেপে টি এন চক্রবর্ত্তী। অফিসের সমবয়সী বন্ধুবান্ধবরা ডাকত টিনমামা বলে। আমিও তাঁকে টিনমামা বলতাম - প্রায় বছর দশেকের বড় আমার থেকে। ভালবাসতেন আমায়। বেঁটেখাটো ফরসা চেহারা - কপাল থেকে শুরু করে মাথায় টাক - এ কান থেকে ও কান পর্যন্ত পেছনে কাঁচাপাকা চুলের বেড়। চোখে মোটা কাল ফ্রেমের চশমা। সব সময়ে বেশ হাসিখুশি। অনেকটা আর কে লক্সমনের 'ইউ সেইড ইট'- কার্টুনের কমন ম্যানের মতন। ১৯৮৩ সালে ইন্ডিয়ান জুট ইন্ডাস্ট্রিস রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনে আমি যখন চাকরীতে ঢুকেছি তখন টিনমামার প্রায় কুড়ি বছর চাকরী হয়ে গেছে। আমাদের কাজটাই ছিল পাট সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করা। আর এই গবেষণা করার প্রসঙ্গে মামা একদিন তাঁর একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমায় বলেছিলেন।

মামার তখন তেইশ চব্বিশ বছর বয়স। বি এস সি পাশ করে সবে মাত্র চাকরীতে ঢুকেছেন। টেকনিক্যাল এসিস্ট্যান্ট। সিনিয়র গবেষকদের পরীক্ষামূলক কাজে টুকটাক সাহায্য করেন। হাতেকলমে কাজ শিখছেন। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। শীতকাল। কলকাতায় তখন সন্ধ্যের পর থেকে কার্ফু চলছে। তারাতলায় অফিস আর উত্তর কলকাতায় শ্রদ্ধানন্দ পার্কের কাছে বাড়ি। অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই সন্ধ্যে হয়ে যায়। ফিরে এসে করার কিছু থাকে না। কলকাতায় টিভি আসতে তখনও আরও দশ বছর। পাড়ার আড্ডা, তাস, ক্যারম সবই বন্ধ। মামা জানতে পারলেন সন্ধ্যের পরে রাস্তায় বেরোতে হলে থানা থেকে পাস নিতে হবে। কে কি করে, কার কাজের গুরুত্ব কতখানি এ সব বিবেচনা করে তবেই নাকি পাস দেওয়া হচ্ছে। পরিচিত দুএকজন পাস পেয়েও গেছে। টিনমামা গবেষণাগারে কাজ করেন তাও আবার ভারত সরকারের অধীনস্থ সংস্থায়। পাড়ায় সম্প্রতি মামার খাতিরও কিছুটা বেড়েছে। সুতরাং পাস পেতে তাঁর কোন অসুবিধা হবে না এ ব্যাপারে মামা নিশ্চিত। 
  
পরের দিন মামা অফিস কামাই করে মুচিপাড়া থানায় এলেন কার্ফু পাস নিতে। বেশ লম্বা লাইন পড়েছে। থানার সংশ্লিষ্ট অফিসার সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কাউকে পাস দিচ্ছে, কাউকে হাজার অনুরোধেও দিচ্ছে না, কাউকে আবার ধমক দিয়ে লাইন থেকে বের করে দিচ্ছে। মামা লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছেন। দেখতে দেখতে এবার মামার পালা। আগের তিনজন কে পাস দেওয়া হোল না। মামা তখন ছোটখাট ছোকরা ছেলে - মুখে চোখে একটু ফচকেমি ভাবও আছে। পুলিশ অফিসার মামার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে গম্ভীর ভাবে হাতে ধরা ব্যাটনটি উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল - "কি করা হয়?"
 
মামা (গম্ভীর ভাবে) - "আমি সরকারি চাকরী করি"।
অফিসার - "কোথায়?"  
মামা - "ইন্ডিয়ান জুট ইন্ডাস্ট্রিস রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনে।"
   
অফিসার - "সেটা কোথায়?"
  
মামা - "তারাতলায়।"
  
 অফিসার - "কাজটা কি?"  
মামা - "রিসার্চ করি।"
  
অফিসার - "কি ই ই ই ই?"
  
মামা (একটু জোড় গলায়) – "রিসার্চ করি। আমি সাইন্টিস্ট।"
অফিসার (একটু থমকে) - "সাইন্টিস্ট? রিসার্চ? তা রিসার্চতো দিনের বেলা - এর সাথে সন্ধ্যেয় বেরোনোর কি সম্পর্ক?"  
মামা - "রিসার্চের কাজ শেষ করতে করতেইতো সন্ধ্যে হয়ে যায়। বাড়ি ফিরতে রাত হয়। তাই... ।"
  
পুলিশ অফিসার খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে মামার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বাঘের মতন গর্জ্জন করে বলে উঠল -"সাতদিন রিসার্চ বন্ধ থাকলে দেশের কোনও ক্ষতি হয় না। বেরোও এখান থেকে।"

মামা কি রকম থতমত খেয়ে লাইন থেকে বেরিয়ে এলেন। মামার পরে যে লাইনে ছিল তাকে অফিসার জিজ্ঞাসা করল
"এ্যাই! কি করা হয়?" লোকটি বলল - "আজ্ঞে স্যার আমি গোয়ালা, বাড়ি বাড়ি দুধ দিই।"
পুলিশ অফিসার তার অধীনস্থ পুলিশ কর্মচারীকে বলল "একে একটা পাস ইস্যু করে দাওতো। নেক্সট।"


অসিত বরণ চট্টোপাধ্যায়

নগ্ননির্জন

ছলাৎ করে চাঁদের জোছনা উপচে পড়ল তিয়াসার শরীরে। মুহূর্তে চমকে উঠল তিয়াসা।
এতক্ষন মেঘের আড়াল থেকে পুর্ণেন্দু চুপিসারে দেখছিল রুপোলী তিয়াসার অভিসার। ও আজ বকুলফুলের মালা পরেছে গলায়। বাজুবন্ধে হাস্নুহানা। ককটেল করা গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল বনস্থলীর টিলা। এই গন্ধের সঙ্গে দারুণ সঙ্গত করছিল শালফুল।
মাতোয়ারা তিয়াসার সে সবে খুব একটা হুঁস ছিল না। ও আমাকে নিয়ে খেলতেই ব্যাস্ত। খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে বলল
-তুই খুব বোকা
আমি বললাম
-কেন কেন, তুই কি করে বুঝলি?
-তুই জোছনাকে সামাল দিতে পারলি কই। পুর্ণেন্দু আমাদের সব কিছু দেখে ফেলল।
-তাতে কি?
-মহূলের সঙ্গে সখ্যতা পাতিয়ে তোর সব বুদ্ধিলোপ পেয়েছে। সারা গায়ে লেপটে আছে সতীন মহূয়ার গন্ধ।
-তা কি করি বল! আদিম অন্ধকারে পথ হাতড়াতে মহূয়ার সঙ্গ বড্ড প্রয়োজন ছিল রে তিয়াসা। তুই তোর দুই সই বকুল আর হাস্নুহানা কে কেন নিয়ে এলি বল!
-ওরা না থাকলে এই প্রথম অভিসারের সাক্ষী হতো কে? তাই বলে তুই আমার সতীনকাঁটা কে সঙ্গে নিয়ে আনলি? এ তুই ঠিক করিস নি।
-নহবতখানায় সানাই বাজাবে কে,ও না থাকলে!

এ এক অদ্ভুত অভিসার। জুঁই মালতির ফিচলেমি। বীরহোড় ডেরায় মৌমাছির গুঞ্জন। বীরহোড়রা নাকি আজ মধু দিয়ে গুঁদলু লেটো খাবে। শ্রান্ত মৌমাছিরা নাকি বিষন্ন। আজ এই দুবচাটান পাহাড়ের টুড়গার পাথর চাটানে বসে সবাই ফিসফাস করছে। বাতাসে কুরচির বুকের আঁচল বারবার খসে পড়ছে ঠিক ঝর্ণার মত। রুপোলি পুর্ণেন্দু ফিকফিক করে হাসছে। লজ্জায় মুখ ঢাকে তিয়াসা। জোৎস্নায় চান করে বনস্থলী গর্ভবতী হয়। কুয়াসা মাখা কুরচিরা শাল পিয়ালের সঙ্গে মাখামাখি করে ঠিক তিয়াসার বালিকাবেলার মত। কিশোরী করঞ্জা বনতুলসীর কার্পেটে গা এলিয়ে গান ধরে
"আজি এই জোৎস্নারাতে
কে তুমি মধ্যরাতে
এসো আজ গল্প করি
চল আজ মিশে যাই জল প্রপাতে।
মহুয়ার নেশায় বিভোর হই আমি।বুকের আঁচল খুলে দেয় তিয়াসা। নগ্ন বনানী ক্ষত বিক্ষত হয় প্রেমের আঁচড়ে। ঐহিক শীৎকারের অনুরণন কানে আসে ফিরে ফিরে।


সুশান্ত চক্রবর্তী

অনুসন্ধান অথবা হৃদয়নন্দন বনে

                             ()

এই পাহাড়ি জায়গায় দুদিন ধরে শুধু বিদ্যুতের ঝলক, বজ্রের গর্জন আর অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। ঘন্টা দুয়েক হলো প্রকৃতির আক্রোশ একটু কমের দিকে। চারটে বাজে। রাতে ঠিক চারঘন্টা ঘুমোন স্বামী অগ্নিকায়। সারা হৃষিকেশ অঝোর বৃষ্টির আদরে নিদ্রামগ্ন। কিন্তু গুরুর নির্দেশে ভোর সাড়ে চারটের মধ্যে প্রাথমিক ব্যায়াম করে, পূণ্যসলিলা গঙ্গাতে স্নান সেরে ধ্যানে বসেন স্বামী অগ্নিকায়। গত বিশ বছর ধরে তাই করে আসছেন। বিশ বছর। দেখতে দেখতে বিশ বছর কেটে গেলো? সন্ন্যাসীর পূর্বাশ্রমের স্মরণ নিষিদ্ধ, তবু কেন আজ হঠাৎ মনে ভেসে উঠলো মায়ের মায়া ভরা অপূর্ব সুন্দর সেই আয়ত চোখ দুটো। মানুষের আসল সৌন্দর্য তো তার চোখে। আর সেই হিসেবে দেখলে তাঁর  মা তো বিশ্বসুন্দরী। অমন চোখ জগতে কি আর কারো আছে? স্বামী অগ্নিকায়ের গৌর সুঠাম সুদীর্ঘ শরীর,  অপূর্ব মুখশ্রী, সুন্দর তীক্ষ্ম নাসা সব হার মেনে যায় তাঁর দুই চোখের কাছে। অবিকল তাঁর মায়ের প্রতিরূপ। মিশন থেকে স্ট্যান্ডকরা, দিল্লি আই আই টি-র সোনার পদক পাওয়া ছেলে কেন, কিসের খোঁজে পরিব্রাজক? ঠিক কুড়ি বছর আগে সেদিন কিন্তু হৃষিকেশের এই আশ্রমের মোহান্ত স্বামী অগ্নিশ্বর সেই প্রশ্ন করেননি, বরং প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। কিছু বলার আগেই বলেছিলেন - ‘বেটা, ম্যায় বচন দেতা হুঁ, যানে সে পহলে, তুঝে সব দে কর, মালিকসে মিলায়েঙ্গে জরুর। ইয়ে মেরা বচন। প্রাণ যায়ে পর বচন না যায়ে।

সেই থেকে গুরুর দেওয়া পরিচয়ে নতুন জন্ম স্বামী অগ্নিকায়ের। এক সাথে সাধনা আর আরাধনার শুরু। কারণ এই তপস্যা, এই শিক্ষা পুরোটাই গুরুমুখী, গুরুর দান। এখন তিনি অনেক ওপরের স্তরে। গুরুজি বলেন - ‘যিতনা উমিদ থা, তু উসসে জাদা হি নিকলা। লাগতা হ্যায় ওয়াক্ত আনেবালা হ্যায়। মালিক সে তেরা দর্শন জলদি হি হোগা।চুরাশি বছরের গুরুজি এখন একা পায়ে হেঁটে গেছেন অনেক ওপরে হিমালয়ের এক গোপন গুহায়, তপস্যায়। পরের বার তাঁর একমাত্র সঙ্গী হওয়ার অধিকার দিয়েছেন স্বামী অগ্নিকায়কে আর সর্বত্র, সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দেহ রাখার পর, বিশাল এই বেদান্ত মঠ, যোগাশ্রম সব দেখবেন পরম প্রিয় শিষ্য স্বামী অগ্নিকায়। যদিও এই নিয়ে মোটেই প্রীত নন আশ্রমের অলিখিত দ্বিতীয় প্রধান ষাটোত্তীর্ণ স্বামী অগ্নিতীর্থ, যিনি এই আশ্রম চালান, টাকাপয়সার হিসেব রাখেন। আশ্রমের খরচপত্র তাঁর হাতেই হয়। তাঁর ইচ্ছা আশ্রম শুধু সাধন স্থান নয়, এক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বড় হোক। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। টাকা পয়সা ক্ষমতায় সবচেয়ে উপরে থাকুক এই যোগাশ্রম। শুভ্র শ্মশ্রু-গুম্ফ-কেশ শোভিত গুরুজি স্বামী অগ্নিশ্বর এসবের কোনো খবর রাখেন না। তিনি মগ্ন বেদ, বেদান্ত, পূজাপাঠ আর শ্রীমদ্ভাগবত গীতার ভাষ্যে। বাকি সময় ধ্যান আর যোগাভ্যাসে। আশ্রমের নিয়ম অনুযায়ী, আশ্রম প্রধান হিসেবে শুধু গুরুজি-ই চুল দাড়ি গোঁফ রাখতে পারেন, বাকিরা মুন্ডিত মস্তক, শ্মশ্রু-গুম্ফহীন।

আজ যেন হঠাৎ বিজুরি ঝলকের মতো ঝলসে উঠলো খবর পেয়ে বিশ বছর আগে এই আশ্রমে ব্রহ্মচর্যরত পুত্রকে দেখতে মায়ের প্রথম ও শেষ আসার দিনটা আর শান্ত ধীর কন্ঠে মায়ের বলা কথাগুলো  - ‘বাবুসোনা, তোমার বাবা আমাকে গভীর ভাবে ভালোবাসতেন, তবুও আমাকে ছেড়ে গেছেন। নিয়তির দেওয়া সেই কঠিন শোক আমি তোমার মুখ চেয়ে মাথা পেতে সয়েছি। ধীরে ধীরে আমার আঘাত সহ্যের ক্ষমতা আরো বেড়েছে। ভেবোনা আমি তোমাকে ফেরাতে চাই বলে এসব বলছি। কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে আসিনি। তুমি সবসময়ে তোমার মনের নির্দেশে চলেছো। আমি আজ পর্যন্ত তোমার কোন ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করিনি। তোমার মন যা চায় তাই করো। আমি শুধু তোমাকে আশীর্বাদ জানাতে এসেছি। তোমার অনুভূতি জাগুক, উপলব্ধি আসুক।সেদিন মায়ের চরণ স্পর্শ করার সেই অনুভব আজ বিশ বছর বাদে যেন হঠাৎ ফিরে এলো।

সন্ন্যাস নেওয়ার পর বিশ বছর কেটে গেছে। মা আর আসেনি, কোন খবরও দেয়নি। সন্ন্যাসীর পূর্বাশ্রমের সংশ্রব বা সংবাদ রাখা নিষিদ্ধ, তাই স্বামী অগ্নিকায়ও কোনো খোঁজ রাখেননি। আর প্রয়োজনও নেই। কলকাতায় তাঁদের বনেদী বিশাল বসতবাটিকে লোকে রাজবাড়ি বলে জানে। আত্মীয়স্বজন প্রচুর। অভাব নয়, বরং ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য আর প্রাবল্যই ছোট থেকে দেখা। এখানকার অনাড়ম্বরতার সঙ্গে তার কোন তুলনা চলে না।

বৃষ্টিতে পথ সামান্য পিছল। খড়ম পরে যেতে কোন অসুবিধা নেই তাঁর। অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন খড়মেই স্বচ্ছন্দ। গঙ্গার তীরে এসে দেখলেন অনেক গুলো ধাপ ডুবে গেছে। জল বেড়েছে। হয়তো বন্যা হয়েছে। বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারি  যাই হোক না কেন স্বামী অগ্নিকায় গুরুজির নির্দেশ অমান্য করতে পারবেন না। পৃথিবী উল্টে গেলেও না। ঘাটের কাছে খড়ম রেখে আস্তে আস্তে জলে নামলেন। গলাজলে দাঁড়িয়ে চোখ বুজে মনে মনে শুরু করলেন গঙ্গা স্তব। এই গলাজলে দাঁড়িয়ে রোজ স্তব প্রার্থনা করেন, যতক্ষণ না ঊষার আলোয় প্রথম পাখিটি ডেকে ওঠে। তারপর গৈরিক বস্ত্র তীরে রেখে, কৌপীন পরে জলে ডুব দিয়ে একবার গঙ্গার এপার ওপার করে সিক্তবস্ত্রে আশ্রমে ফিরে যাওয়া। এই রুটিন রোজকার হলেও, আজ গঙ্গার রূপ ভয়ঙ্করী। কিছু কিছু মৃত গবাদি পশু জলে ভেসে যাচ্ছে। স্তব শেষ করে ডুব দিতে যাবেন, এমন সময় ঘাড়ের কাছে কি যেন একটা ঠেকলো। 
        
                                 ()

আশ্রমে হৈচৈ পড়ে গেছে। প্রচন্ড রেগে গেছেন স্বামী অগ্নিতীর্থ। গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে স্বামী অগ্নিকায় ফিরেছেন মাথায় একটা হাওয়ায় ফোলানো বাথটাব নিয়ে। তার মধ্যে বাচ্চার জামাকাপড় আর - আর একটি ছ সাত মাসের ফুটফুটে শিশুকন্যা। গোলাপি রং লাল হয়ে গেছে প্রচন্ড জ্বরে, নেতিয়ে অঘোর। বোঝা যাচ্ছে জল বাড়ছে দেখে শিশুটিকে মাথায় নিয়ে তার বাবা-মা হয়তো উঁচু জমির খোঁজে  বেরিয়ে পরেছিল, কিন্তু উন্মত্ত বন্যার জলে সলিল সমাধি হয়েছে তাঁদের আর ভেসে গেছে বাচ্চাটা। গুরুজির কাছ থেকে অনেক বন্য ওষধি ও তার প্রয়োগ অধিগত করেছেন অগ্নিকায়। কিছু ওষধি পাতা তুলে খলনুড়িতে বেটে লাগিয়ে দিলেন শিশুর কপালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তাপ নেমে আসবে। এবার একটু দুধের ব্যবস্থা করতে হবে। একটা ফিডিং বটলও চাই। একটা কাগজে কি কি চাই লিখে পাঠালেন স্বামী অগ্নিতীর্থর কাছে। কৌতূহলী হয়ে তিনি নিজে এসে হাজির ঘটনার বিশদ বিবরণ জানার জন্য। তার পরেই বিস্কোরণ। এই আশ্রমে কোনো মেয়ের স্থান নেই। এখনই বিসর্জন দিয়ে আসতে হবে এই আবর্জনা। শান্ত ভাবে সব শুনে অগ্নিকায় মৃদু হেসে জানালেন গুরুজির নির্দেশ ছাড়া তিনি কারো কথা শুনতে রাজি নন। আর দুধ ও অন্যান্য সরঞ্জাম তাঁর এখনই চাই।

জ্বর কমেছে। দুধ খেয়ে শিশু চোখ মেলে একদৃষ্টিতে অগ্নিকায়ের দিকে তাকিয়ে হাসছে। শিশুর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে তিনি বললেন  - ‘তোর নাম দিলাম দেবাদৃতা।উত্তরে দেবাদৃতা তাঁর আঙুল শক্ত করে ধরে হেসে উঠলো। আর এক বয়স্ক আশ্রমিক বাচ্চাটাকে দেখতে এসে নাম দিলেন সীতামা। অগ্নিকায় বললেন- ‘ঠিক আছে। আজ থেকে আপনারা ঐ নামেই ওকে ডাকবেন।

বৃষ্টি থেমেছে। নেমেছে বন্যার জলও। এই কদিনে সীতামা অগ্নিকায়কে খুব চিনেছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকে, তিনি ফিরলেই খিলখিলিয়ে হেসে হাত পা ছুঁড়তে থাকে। তিনি আঙুল বাড়ালেই চট করে ধরে নেয় আর ছাড়তে চায় না। তিনি দুধের বোতল বাড়িয়ে দিলে দুহাতে ধরে চুকচুক করে খেয়ে নেয়। তিনি ঘুম পাড়াতে বুকে তুললে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। তিনি দেবাদৃতা বলে ডাকলে তাকিয়ে হাসে। তিনি সীতামা বললে হাত পা ছুঁড়ে হেসে ওঠে। তিনি কাছে আসলে পাশ ফিরে তাঁর কাছে আসতে চায়। তিনি পাশে শুয়ে থাকলেআআ উবুবুআওয়াজ করে তাঁকে জাগিয়ে রাখে।

                               ()

সাতদিন পর গুরুজি আজ ভোরে আশ্রমে ফিরেছেন। সবাই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছে, তবে দূর থেকে। গুরুজি কে এখন স্পর্শ করা যাবে না। কথাও না। এ সময়ে তিনি মৌণব্রত পালন করেন। তিনি দূর থেকে সবাইকে আশীর্বাদ করে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের পর আবার স্বাভাবিক হবেন। গুরুজির আহার বলতে সারাদিনে যে কোন একটি ফল। রাতে কিছু না।

অগ্নিকায়ও পরিমিত আহার করেন। দিনে ফলমূল, রাতে একটি রুটি ও ডাল। সারা বছরে কোন পরিবর্তন নেই। রাতের খাওয়া তাড়াতাড়িই সারা হয়ে যায়। তারপর মন দেন বেদপাঠে। আজ অবশ্য সীতামার চোখে ঘুম নেই। খালি হাত পা নাড়ছে আর আপন মনে হেসে যাচ্ছে। রাত দশটা নাগাদ মুখেচোখে চাপা উল্লাস নিয়ে স্বামী অগ্নিতীর্থ নিজে এসে জানালেন গুরুজি ঠিক বারোটায় দেখা করতে বলেছেন। বোঝাই যাচ্ছে সীতামার কথা স্বামী অগ্নিতীর্থ নিজের মত করে গুরুজিকে বুঝিয়েছেন। হয়তো বিতাড়নের ব্যবস্থাও পাকা হয়ে গেছে।

ঠিক বারোটায় অগ্নিকায় গুরুজির ঘরে প্রবেশ করলেন। ব্যাঘ্রচর্মাসনে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে আছেন গুরুজি।
 - ‘আকেলা কিঁউ? বেটি কো লে আ।

প্ল্যাস্টিকের হাওয়া ফোলানো বাথটাবে সব জামাকাপড় সহ দেবাদৃতাকে মাথায় করে নিয়ে গুরুজির পায়ের সামনে নামিয়ে রাখলেন অগ্নিকায়। ঘুমের মধ্যেও হাসি অম্লান। গুরুজি তার কপালে আঙুল স্পর্শ করে অগ্নিকায়কে বললেন - ‘ইয়ে কিসকো লায়া হ্যায় তু? সাকসাত মায়া। তু ইতনা নজদিক আ গ্যয়া। বেটা ইসে ত্যাগ দেনা পড়েগা। আকেলা তু ইধার রহ্ সকতা। নেহি তো তুম দোনোকো আশ্রম ছোড়না পড়েগা।

- ‘ইসে ক্যা করু, গুরুজি?’ সপ্রশ্ন চোখে তাকালেন গুরুজির চোখে।

- ‘ঠিক জ্যাইসে আই থি, অ্যাইসা হি যানে দে।তারপর ঠোঁটের কোনে এক রহস্যময় মৃদু হাসি হেসে বললেন - ‘নেহি তো তুম দোনোকো যানা পড়েগা ইধারসে।

- যো আজ্ঞা গুরুজিবলে সীতামাকে তুলতে যাবেন, গুরুজি স্মিত হাসি হেসে বললেন - ‘আ মেরা পাশ। বৈঠ ইধার। ওয়াদা কিয়া থা জানে সে পহলে, তুঝে উনসে মিলায়ুঙ্গা। আগর ও না হো পায়ে তো মেরেকো জিতনা মিলা উতনা তো দে সকুঁ। কেয়া জানে কব মালিক বুলায়ে।

সীতামাকে পাশে সরিয়ে গুরুজির চরণে প্রনত হলেন অগ্নিকায়।

একটি পাখি ডেকে উঠলো। আরো একটি। আরো, আরো। পাতা ঝরার মর্মর ধ্বনি নিয়ে স্তব্ধ রাত্রি ভিজে যাচ্ছে পাখির কলকাকলিতে। তমসাভেদী অরুণাভা ছড়িয়ে ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছেন আলোর দেবতা।ঔঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং.অগ্নিকায় ধীরে ধীরে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিলেন প্ল্যাস্টিকের হাওয়া ফোলানো বাথটাব। সঙ্গের গৈরিক ঝোলায় রয়েছে একটি গীতা, আশ্রম থেকে পাওয়া বেবি ফুডের কৌটো আর ফিডিং বটল, বাচ্চার সাথে ভেসে আসা জামাকাপড়, কৌপীন ইত্যাদি। পরিধানের দ্বিতীয় বস্ত্রখন্ডে ঘুমন্ত দেবাদৃতাকে শুইয়ে পিঠে বেঁধে নিলেন সন্ন্যাসী। ঘুমের মধ্যেও সীতামা তাঁর গলা জড়িয়ে ধরলো। ঝোলাটা কাঁধে ঝুলিয়ে, পথ চলার সঙ্গী তাঁর পুরনো পরিব্রাজক লাঠি হাতে নিয়ে, কপর্দকশূন্য সন্ন্যাসী মনে মনে গুরুজিকে প্রণাম করে, অলব্ধ ঈশ্বর উপলব্ধির থেকে মুখ ফিরিয়ে এগিয়ে চললেন সূর্যাভিমুখে, তাঁর পূর্বাশ্রমের দিকে। ঈশ্বরের আবিষ্কারে।