গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

বুধবার, ৬ জুন, ২০১৮

দীপলেখা মুখার্জ্জী


প্রজাপতি

সারাদিনের কাজকম্মো সেরে লক্ষী যখন বিছানায়  শুলো তখন রাত ১১টা। মনটা কদিন ধরেই খারাপ, শাশুড়ির মুখঝামটা, স্বামীর মারধোর সেতো সেই বছর সাতেক ধরেই চলছে।মারকে 
আর ভয় পায়না, ছোটবেলা থেকেই, মা বাবা দাদা দিদি সবাই ওকে ছোটবড় ভুল করলেই মারধোর করে এসেছে। ইদানীং সকলে 'পাগলি' 'পাগলি' বলে খেপায়, এটায় ওর বড় কষ্ট! লক্ষী জানে, ওর মধুসূদন দাদা ওকেই শুধু দেখা দেয়।

বিছানায় শুয়েই জানালার দিকে চোখ গেল! এতো বড় একটা চাঁদ উঠেছে, বড় একটা যেন রূপোর থালা।  চাঁদটা যেন ওকে দেখে হাসছে, না না  পাগলি বলে মজা করছে। 'আমি পাগলি না' বলতেই তারের ওপর বসা রাতপাখি গুলো হেসে উঠল, সাথে তালগাছ গুলোও, ঠকঠক করে পাতার হাততালি দিয়ে হেসে উঠল। কেঁদে ফেলল লক্ষী। দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি শুধু বাঁশিই বাজাও মধুসুদন দাদা, আর তো কষ্ট সহ্য হয় না। একটা সন্তানও দিলে না, তবু তো সে আমার কষ্ট বুঝতো! " লক্ষী স্পষ্ট দেখল, মধুসূদন দাদা, বাঁশি থামিয়ে তাকে ইশারায়   দরজা দেখালো। লক্ষী এক গাল হেসে, উঠে বসে লাল ওড়নাটা গায়ের উপর ফেলে বাইরে এসে দাঁড়াল।চরাচর ভেসে যাচ্ছে জোৎস্নায়। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ।  

পাশের ঘরে বিছানায় ওর স্বামী ঘুমচ্ছে আফিং খেয়ে, এই নেশার কারনেই আজ পর্যন্ত মা হতে পারল না লক্ষী। মদ,গাঁজা, আফিং সব খায়। পাড়ার লোক, আত্মীয়স্বজন সবাই দোষ দেয় লক্ষীকে। কোন শুভকাজে 'বাঁজা' বলে ডাকে না। 

মধুসুদনদাদার ডাকে সাড়া দিয়ে এই রাত দুপুরে লক্ষী চলতে লাগল,আলপথ ধরে। এসে দাঁড়ালো একটা লাইটপোষ্টের সামনে, সকালে এখানে তারের কাজ হচ্ছিল, এখনো লম্বা মইটা রাখা আছে, তরতর করে উঠে পড়ল মইয়ে করে লাইটপোষ্টের মাথায়।তাদের গ্রামের পুরোটা দেখা যাচ্ছে, এত ওপর থেকে। চোখ জুড়িয়ে গেল, তার আনন্দে হাওয়া, পাখি, তালগাছ, ধানক্ষেত  সবাই হাসতে লাগল মনে হল যেন উৎসব।  এমন সময় মধুসূদন দাদা ওর কানে কানে বলল, দুটো তার ধরে ঝুলে পর, সব কষ্টের শেষ হয়ে যাবে। তোর জন্য কেউ কাঁদবে না। কেউ না। চোখবন্ধ করে মনে করল, বাবা, দাদা,দিদি,স্বামী না! কেউ না,কেউ তাকে কোনোদিন ভালবেসেছে,তার মনেই পরল না। শুধুমনে পড়ল রহিমের কথা। সেই তাদের পাড়ায় আসা কাবুলিওয়ালা, যে তাকে একদিন আদর করেছিল লুকিয়ে, বলেছিল, "লখস্মী, তোকে আমি খুব ভালবাসি " আর বলেছিল "টাকা জমিয়ে বাড়ির সামনে ফুলের বাগান করবে, তাদের শুখা ধরতিতে চাষ করতে অনেক টাকা চাই।"--মনে পরতেই চোখে জল এল লক্ষীর, চোখ খুলে বলল, মধুসূদন দাদা আমার একটা শেষ ইচ্ছে রাখবে গো? পরের জন্মে আমি যেন একটা প্রজাপতি হয়ে জন্মাই। শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি থামিয়ে হেসে ঘাড় নাড়ল। শেষবারে মতো লক্ষী চঁাদ দেখল, গ্রামটা দেখল, মধুসূদন দাদার দিকে তাকিয়ে হাসল, খপ করে ধরে ফেলল তার দুটো। প্রচন্ড জোরে একটা শব্দ হল, বিদ্যুৎ চমকানোর মতো আলো ঝলকে উঠল। পাখি গুলো ভয়ে চিৎকার করে উঠল।সকলের জন্য ফেলনা,  লক্ষী আলো ছড়িয়ে মিলিয়ে গেল, পৃথিবী থেকে। ব্যাস আর কিচ্ছু না। কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হল না কিছুর।পৃথিবী চলতে লাগল তার আর্হ্নিক গতি, বার্ষিক গতির ছন্দে। 

বহু দূরে আফগানিস্তানের একটি  বাগানে একটা মস্তবড় লাল ডানাওয়ালা প্রজাপতি দেখে, রহিমের বিবি রুকসনা, রহিমের কাছে বায়েনা করল ওটা ধরে দিতে। রহিম প্রজাপতি ধরার জাল আনতে গেল।


নীহার চক্রবর্তী


অনুপম-বেলা

দরজা ভেজানো ছিল । 
শমি দরজা খুলে একটু ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দেখল খাটের ওপর ওর মা-বাবার অন্তরঙ্গ দৃশ্য  । দেখেই ও ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এলো ।
সেইথেকে শমি খুব সঙ্কুচিত । 
দ্বিধায়-দ্বিধায় জর্জরিত একেবারে । পরে মার মুখোমুখি হলেও মুখ তুলে কথা বলতে পারলো না তার সাথে । মা বেশ অবাক ।
জিজ্ঞেস করলো শমিকে,''কী হল তোর ? অমন করে আছিস কেন ?''
কিন্তু শমি পরিষ্কার কিছু বলতে পারলো না তাকে । 
শুধু আমতা আমতা করে বলল তাকে,''কিছু না গো । কিছু না ।''
মার বিস্ময় আরও বেড়ে গেলো তাতে ।
শমির বাবা কম কথা বলার মানুষ । 
খুব ব্যস্ত সে নানা কাজে । তাই তাকে নিয়ে শমির সমস্যা কম । সারাদিনে খুব কম দেখা হয় তার সাথে । কিন্তু মা ছাড়া শমির গতি নেই । মা খুব খোলা-মেলা মনের মানুষ । শমির ঘরে-বাইরের সব কথা তারই সাথে । কিন্তু এখন কী উপায় ? খুব ভাবতে থাকলো শমি । না বলে শান্তি নেই ওরকিন্তু সে বুঝি বলা যায় ।
মার বিস্ময়ের মাত্রা ক্রমশ চড়তে থাকলো ।
শমি আর কোন কথা না বলায় সেও কথা বন্ধ করে দিলো ওর সাথে । কিন্তু সে ত সয় না শমির । তাই সকালের সব কথা বলে দিলো তাকে ।
মা শুনে স্মিত হাসল ।
সে বলল শমিকে,''আমাদের ভুল তো বটেই । দরজায় খিল দেওয়া উচিৎ ছিল । তবে আর একদিক থেকেও ভাবা যায় ।''
খুব আগ্রহের সঙ্গে শমি তাকে বলল,''আর কোন দিক,মা ?''
মা ভাবতে শুরু করলো তারপর । 
ভাবতে ভাবতে শেষে সে অনাবিল-হেসে বলল,''আমরাই তো তোর ইহলোকের দেব-দেবী । তাই না ? মনে কর দেখে ফেলেছিস দেব-দেবীর এক অনুপম প্রেমের দৃশ্য । খারাপ কিছু বললাম ?''
মার কথা শুনে শমি উল্লাসে ফেটে পড়লো । ও মাকে সবেগে আর আবেগে বুকে চেপে ধরল । মা তখনর সারা মুখে তখন যে কত আকাশ ছবি ।
কিন্তু সব শেষে শমির মা বেশ আনমনা হয়ে বলল শমিকে,''তবে অত সস্তা না । এ একবারই দেখা ভালো । তারপর এর আর মূল্য বলে কিছু থাকবে না । লজ্জায় বলছি না । দম্ভে বলছি । বুঝে নিস পরে । আসি এখন ।''
মা চলে গেলে শমি অপার-বিস্ময় নিয়ে মার কথাগুলো ভেবে গেলো । ভেবেই গেলো । সে অনেকক্ষণ । অনেকক্ষণ সে ।


পার্থ রায়


গোধূলির রঙ
-  হ্যালো! সুইট প্রিন্সেস!!

একটা পরিচিত বয়স্ক কণ্ঠস্বর শুনে, চমকে পেছন ফিরে তাকাল তিতলি। আরে এতো সেই রাজধানী এক্সপ্রেসের বুড়ো লোকটা। তখন কিন্তু বুড়োটা বলেছিল, “আবার দেখা হয়েও যেতে পারেখুসট বুড়োটা পিছু নিয়েছে না কি? বিশ্বাস নেই, বুড়ো হলে ভীমরতি হয়। তায় আবার তিতলি চোখে পড়ার মতো সুন্দরী।   
ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির অন্যতম ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লী ইউনিভার্সিটিতে প্রেজেনট গ্লোবাল সিনেরিও অব ইকনমির উপরে একটা সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে এসেছে তিতলি। বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরা লেকচার দেবেন।এমএসসির ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্টদের কাছে এই সেমিনার একটা মহার্ঘ বস্তু। স্টুডেন্ট হিসেবে তিতলি বরাবরই ব্রিলিয়ান্ট।
ট্রেনে ভদ্রলোক একই কামরায় ছিলেন। প্রথমদিকে তিতলির একটু গায়ে পড়া মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে, বেশ জমে গিয়েছিল। নরম সিল্কের মত চুলগুলোতে একটাও কালো চুল নেই। মাথার চুলের মতোই ধবধবে সাদা ধুতি পাঞ্জাবী। অনেকটা পশ্চিমবাংলার প্রাক্তন এক মুখ্যমন্ত্রীর মতো। না, না সৌমিত্র চ্যাটার্জীর মতো। তবে, রিমলেস চশমা ভেদ করে দুটো বুদ্ধিদীপ্ত চোখের সব সময় হাসি-এটা এই বুড়োটার স্পেস্যালিটি। তিতলি মনে মনে বলল, “ বুড্ঢা, দিনেকালে তুমি অনেক সুন্দরী মেয়েদের মাথা খারাপ করেছ, কিন্তু আমার সাথে পাঙ্গা নিতে এসো না তাই বলেএমন মজার মজার কথা বলছিলেন, তিতলির বেশ ভাল লেগে গিয়েছিল। তিতলির কাছে মনোযোগী ছাত্রের মতো হোয়াট্স অ্যাপ, মেসেঞ্জার করা শিখলেন, তিতলি উনার ফোনে ওইগুলো ডাউনলোড করে দিল। আবার হেড ফোন শেয়ার করে একসাথে গানও শুনেছেন। হ্যা, তিতলি আর সাথের গোমড়ামুখো অর্ণবকে দারুন বিদেশী চকোলেট গিফট দিয়েছেন। পরে মনে হয়েছে, ভাগ্যিস বুড়োটা ছিল, অর্ণবটা তো একটা বোর। যদিও তিতলির অনেক কথা উনি জেনে নিয়েছিলেন, নিজের পরিচয় সে রকম কিছু দেন নি। ফোন নাম্বার ইন্টার চেঞ্জ করার সময়  কি নামে সেভ করব জিজ্ঞাসা করাতে হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “মাই ওল্ড ম্যান
-   কি ভাবছ? দেখলে তো দেখা হয়ে গেলো আবার।
-   হ্যা, তাই তো দেখছি। তুমি এখানে?? এই ইউনিভার্সিটিতে কেউ আছে বুঝি? ( তিতলি মুখ স্লিপ করে তুমি বলেছিল। উনি বলেছিলেন, “ইট উইল ডু, সুইট প্রিন্সেস। রাদার ইটস মাই প্লেজার টু উ উ উ    
-   কেন সুইট হার্ট? তোমার সাথে দেখা করতে আসতে পারি না?
তিতলির মতো আধুনিকার মুখেও লালাভ। কিছু বলার আগেই, পাশে দাঁড়ানো সদ্য আলাপ হওয়া জে এন ইউ-র সিমরন কানের কাছে বিস্ফারিত চোখে ফিসফিস করে বলল, “হেই, ডোন্ট ইউ নো হিম? তুমি কোলকাতার মেয়ে হয়ে উনাকে চেন না, উনি ওয়ার্লড ফেমাস ইকোনমিস্ট ডাঃ অশোক সান্যাল। হি ইজ দ্য সেন্টার অব অ্যাট্রাকশন অব দিস সেমিনার
তিতলির মুখ তিমি মাছের মতো হা হয়ে গেল। উনার বই পড়ছে ও গ্র্যাজুএশন লেভেল থেকে। ইতিমধ্যে, ভাইস চ্যান্সেলর নিজে অন্য প্রফেসরদের নিয়ে উনাকে রিসিভ করতে ছুটে এসেছেন।
 চলে যাবার আগে রাজেশ খান্নার মতো দুটো আঙ্গুল তুলে, সেই হৃদয় ভেদ করা চোখের হাসি উপহার দিয়ে গেলেন।
আরও লাল হয়ে যেতে যেতে তিতলির ভেতর থেকে আর একটা তিতলি বলল, “ইউপ, মাই ওল্ড ম্যান! পরের জন্মে আমার প্রথম আর শেষ প্রেমিক তুমি। তোমার অর্থনীতির সাথে আমার প্রেমনীতির কমবোটা খুব একটা খারাপ হবে না
সূর্যটা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসটা ছেড়ে চলে যাবার আগে গোধূলির সব রঙ তিতলির মুখে মাখিয়ে দিয়ে গেল।  


আফরোজা অদিতি


করিমন বিবি


    সকাল থেকে দেখা নাই করিমনের। শুক্রবার হলেই কামাই। আগে এমনটি ছিল না। এখন মাসে সাত-আটদিন তো আছেই। জিজ্ঞেস করলে, কী; না মাথা ঘুরে, লো প্রেসার, ডাক্তারের ধারে গেছিলাম; স্যালাইন নিতে কইছে; নিতে গেছিলাম। এরকমের হাজার রকম বায়নাক্কা চলছে।

    এখন ফেসবুকের যুগ; ফেসবুকেই কথা চালাচালির যুগ! করিমনের ফেসবুক নেই, তাই সে আপডেট দিতে পারে না। মোবাইল আছে আজ মোবাইল করেনি। এদের সিণ্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন মিসেস মিমি। কাজে না আসলে অন্য লোককে দিয়ে কাজ করাবে তাও পারেন না তিনি।  নিজেদেরই কষ্ট করতে হয়। ধমকি-ধামকি দিয়েও দেখেছেন কোন কাজ হয় না। বেতন কাটার ভয় দেখিয়েছেন তাতেও ভয় পায় না।

    পরদিন করিমন এলে কেন আসেনি জিজ্ঞেস করলে কোন কথা বলে না করিমন। প্রশ্নের জবাব  না দিলে মেজাজ বিগড়ে যায় মিসেস মিমির। রাগ করলেন; শেষে শুনতে পেলেন তার যে স্বামী চলে গিয়েছিল; দশটা বছর খোঁজ নেয়নি, সেই স্বামীর অসুখ। তাকে নিয়েই শতেক ঝামেলা- ডাক্তার, কবিরাজ, হাসপাতাল করতে করতে কাজের বাড়ি কামাই। করিমন কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘খালাগো, একখান গরু ছিল তাও হেই ব্যাডার জন্যি বেচি দিলো আমার শাউড়ি মাগি।

মিসেস মিমি আর কিছু বললেন না। একটু পরে পানি খাওয়ার জন্য ডাইনিঙে গিয়ে শুনতে পেলেন, করিমন কাঁদছে ইনিয়েবিনিয়ে আর বলছে সুয়ো মাগের ষোল আনা, দুয়োর নামে ছাই / এক চোখা ভাতারের মুখে বাসি আখার ছাই।মিসেস মিমি লক্ষ্য করেন ওর কণ্ঠস্বরের বিদ্বেষ-বিতৃষ্ণা-বিক্ষিপ্ততার ধকধকে আগুন। ওদের এই আগুন কোন কিছু ভস্ম করতে পারে না, শুধু দগ্ধ হয় নিজেই!

ষাটে পা দিলো যেই
আফরোজা অদিতি

    মানুষটির  ষাটে পা। সেই পঁচিশ থেকে এ-বাড়িটির সঙ্গে সম্পর্ক। নতুন বউ নিয়ে উঠেছিল নতুন এই বাড়িতে! বাবা করেছিল এই বাড়িটি। এখানে আসার পর থেকে ওঠা-বসা-কাঁদা-হাসা সব তার এ বাড়িটিতেই। এখানে ভালো-মন্দে মিশিয়ে একমুখী ট্রেনের সদস্যদের সঙ্গে ছিল ওঠা-বসা-কাঁদা-হাসা। ওরা  ভালোই ছিল। ষাটে পা দিলো যেই, আঁধার নামলো সেই। মানুষটির আশপাশটা বদলে গেল চোখের পলকে।  

    একদিন সকালে বাইরে গিয়ে আর ফিরতে পারলো না মানুষটি। ভুলে গেছে বাড়ি যাওয়ার পথ, ভুলে গেছে ঠিকানা। এক-ওকে-তাকে জিজ্ঞেস করেও হদিস পেল না বাড়িটির। হদিস পাবে কী করে ? মনের ভেতরে বাড়ির জলছাপটাই যে হাতড়ে পাচ্ছে না। বাড়িটি যেন ভ্যানিস হয়ে গেছে মন থেকে।

    ওদিকে তার একমুখী ট্রেনের সঙ্গীরা বড্ড চিন্তিত। গেল কোথায় মানুষটা! থানায় ডায়েরী, কাগজে- টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন। নাহ্‌! কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থায় দাঁড়িয়েছে তারা। হঠাৎ একদিন চেনা-জানা একজন প্রায় ধরেবেঁধে নিয়ে এলো তাকে। ট্রেন-সঙ্গীদের একজন তার প্রিয় জলচৌকিটা দিলো পেতে। কিন' সেই মানুষটি দোটানায়- বসবে ? কী বসবে না! চোখ দুটোতে শুধুই ঘুরপাক খাচ্ছে বিস্ময়! চোখের ভেতর তার সাদা বলাকার সারি। বলাকারা উড়ছে, ক্রমশ নীল ঢেকে যাচ্ছে তাদের ডানায়! একসময় স-ব অন্ধকার। বলাকারা উড়ছে না তার চোখে। বিষণ্ণ নিষ্প্রাণ চোখদুটোয়  শুধুই অন্ধকার!



দেবাশিস কোনার


নকল বাদশা

আমি আমার যত গৌরব ,সম্মান সব তোমাকে দিলাম দিদা , তুমি বেঁচে ওঠো , ভালো হও !
কিন্তু আমার দিদা সেই যে শয্যা নিলেন সেখান থেকে আর মুখ তুললেন না।তাঁর নাকি মন ভেঙে গেছে।এতো বড় অসম্মানের পর তিনি আবার লোকের কাছে মুখ দেখবেন ,এমনটা হয় না। তিনি নাকি চিরকাল দাপটের সাথে বেঁচেছেন ,জমিদারি চালিয়েছেন,সকলের সাথে সম্পর্ক রেখেছেন আর আজ কে এক সাধারণ খড় ব্যবসাদার এসে তাকে যা নয় তাই বলে যাবে ?
 আমি মনে যাকে দিদা ডাকেন বাদশা বলে ।আমার নাম অমল।বাদশা দিদার দেওয়া ভালোবাসার নাম।আমি পড়েছি মহা মুশকিলে।
আমি কোনো দোষের দোষী নই, অথচ বাড়ির সকলেই,মায় পাড়া প্রতিবেশীরা পর্যন্ত দিদার এই হালের জন্য আমাকে দায়ী করছেন।
 আমি এখন কি করব ভাবছি । ভেবে কোনও কুল কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না।
আমার দিদা অর্থাৎ গঙ্গাবালাদাসী প্রচন্ড দাপুটে মহিলা।তিনি ছিলেন মা বাবার একমাত্র সন্তান ।দিদার মা ,যাকে আমরা বড় মা বলতাম,তিনি খুব অল্পবয়সে বিধবা হন।সে সময় কালে বিধবাদের সম্পত্তির ভাগ নেবার অধিকার ছিল না।কিন্তু তিনি নিজ গুনে সব কিছু আদায় করেছিলেন।একমাত্র কন্যার জন্য যা যা করণীয় সব কিছুই করেছিলেন।
সে সময় শিক্ষার এতো ছিল ছিল না।তবু গৃহ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কর্মনিপুন করে গড়ে তুলেছিলেন মেয়েকে।
সেই দিদা এখন শয্যাশায়ী । তার অসুস্থতার কারণ আমি অমল ।আমি যন্ত্রনায় ছটফট করছি।ভাবছি এখন কি করব ? শহর থেকে বড় ডাক্তারকে ধরে আনলাম ।
ডাক্তারবাবু এসে নারি দেখে বললেন,সব ঠিক আছে।কোন রোগ নেই ।মনের রোগ।
কিছুটা হলেও আমার দিকে আঙ্গুল তোলাটা বন্ধ হল।আমি একটানা দিন পাঁচেক দিদাকে নিয়ে এতো চিন্তিত ছিলাম যে এ ক'দিন পাপড়ির কথা মনেই পড়েনি ।
এই পাপড়িকে নিয়েই তো যত কান্ড ।এখন সন্ধ্যে সাতটা ।সবে সূর্য্য দেব ডুব দিয়েছেন।অমল দেখল আকাশে পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘের ভেলা যেন ভেসে চলছে।আর তাতে ডুবন্ত সূর্যের লাল আভা।ঠিক এই সময়ে পাপড়ির মুখে আলো পড়লে কি দারুন যে লাগে ,কি বলবো ! বলে বোঝানো যাবে না।
এই মেয়ের বাবা নিতাই দত্ত ।খড়ের ব্যবসাদার।আগে ওনার পিতৃদেব নাকি দিদার মায়ের কাছে কর্য করে দিনাতিপাত করতেন।দিদার বাড়িতে আসতে হলে গলায় গামছা দিয়ে হাত জোড় করে আসতে হত।সে কিনা দিদাকে যা নয় তাই বলেছেন।এতো বড় সাহস ! এ যে ঘোর কলি।
নিতাই দত্তের বাবা কেষ্ট দত্ত ভাদ্র মাসের দিনে ধান বারি না করলে খেতে পেত না।সেই তার ছেলের ,সাহস কত ? বলে কিনা আমার মেয়ে ফেলনা নয়। আর আজকের দিনে পণ প্রথা নেই।উঠে গেছে ।ও সব পণ টন হবে না।মানে দেব না।আমার মেয়ে যে ছেলে পণ নেবে,তাকে বে করবে না।
 দিদা আগেকার দিনের মানুষ।অনেক বদলেছেন,তবু মেয়ের বাপের এতো বড় ঔদ্ধত্য তিনি মেনে নিতে পারলেন না। আমি হলাম গিয়ে তাঁর ছোট মেয়ের চতুর্থ সন্তান।ছাগলের চতুর্থ সন্তানের মতো অবস্থা আর কি।মা বাপের অনেকগুলি সন্তান হওয়ায় আমাকে মাতুলালয়ে দিদার কাছে  রেখে দেওয়া হয়।আমিও দিদার কাছে পরম আদরে প্রতিপালিত হই।
নাতি ও দিদার সম্পর্ক সংসারে সবথেকে মধুর। আমি মানে দিদার বাদশা ওরফে অমল, এই কথাটা জীবন থেকে উপলব্ধি করেছি।আমাদের মধ্যে সব কথা হত। দেখতে দেখতে বড় হলাম।একটা চাকরিও পেলাম।আমার সাথে দিদার সম্পর্কটা কখনো হয়ে যেত মা ও ছেলের মতো।কখনো বন্ধুর মতো।
আমি যখন পাপড়ির প্রেমে পড়লাম দিদাকে সব খুলে বললাম।দিদা আমাকে উৎসাহ জোগাতো ।
এগুলো ঠিকঠাকই চলছিল।কিন্তু বাদ সাধল ,দিদার সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব।
আমার জীবনে দিদা যেমন প্রথম প্রেম তেমনি পাপড়ি যেন অন্য এক আলোড়িত অধ্যায়।আমার বড় হয়ে ওঠা , শিক্ষা লাভ ,কর্মসংস্থান এসবের ভিতর আছে দিদার অনন্ত নজরদারি।আবার সেই দেখভালের সাথে সাথে আমার নিজের মধ্যের চাওয়া পাওয়া তৈরি হওয়া এবং তাকে ফুলে ফলে বিকশিত করবার মধ্যে আমার নিজস্বতা যে আছে তাকে তো আমি অস্বীকার করতে পারি না।
দিদা সে সব বুঝবেন না।তিনি উদার হলেও সেকালের মানুষ।তার মনের ভিতরে সংস্কারগুলো কি এতো সহজে যায় ? আমি যে তার সাধের বাদশা। আমাকে ঘিরে তার মনের মধ্যে গজিয়ে ওঠা আস্ফালনের বহিপ্রকাশ ঘটবে না,তা কি হয় ?
আমার তিন মামা।আমি মাতুলালয়ে ঠাঁই নেওয়াতে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছিল বোধহয়।তাছাড়া তিন মামিমা ও তাদের পুত্র কন্যাগন কেউই আমার উপস্থিতি খুব সহজে মেনে নিতে চায় নি।দিদার প্রবল জেদ আর হার না মানা মনোভাবের জন্য আমি মাতুলালয়ে এতদিন কাটাতে পেরেছি।আমার আর আপন ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে না।মনে হয় এই মাতুলালয় টিই আমার আপন গৃহ।দিদাই যেন আমার মা ,আমার বাবা ,আমার সব কিছু।এই গ্রাম আমার জন্মভূমি।আক্ষরিক অর্থে তাই।শুনেছি আমার জন্ম এখানেই হয়েছিল।তখনকার দিনে মেয়েদের সন্তান হবার সময় পিতৃগৃহে পাঠান হত।আমার মামাদের বর্ধিষ্ণু অবস্থা।আর দিদা তার কনিষ্ঠা কন্যটির অভাব অনটনের কথা জানতেন।তাই তার সমস্ত সন্তানকেই তিনি নিজ গৃহে এনে প্রাথমিক লালন প্যানেল করেছিলেন।
    তো আমি অমল ,দিদার বাদশা খুব একটা যে সহজ সরল পথে এতদূর আসতে পেরেছি,তা কিন্তু নয়।আমার জীবনের পরতে পরতে কাঁটা বিছানো ছিল।সেই সব বাঁধাকে জয় করেই আমাকে টিকে থাকতে হয়েছে।
এখন আমার তিন মাতুল পৃথকভাবে বসবাস করেন।আমি আর দিদা একসাথে থাকি।মামারা চাষের আয় থেকে দিদাকে কিছু ভাগ দেয়।বাকিটা আমার চাকরির মাইনে থেকে হয়ে যায়।কিন্তু জানেন,আমি কখনো দিদার থেকে আমাকে পৃথক করে ভাবতে পারি না।সেই জন্মের সময় থেকে একসাথে আছি তো ।
আমি জানি না পাপড়ির বাবা নিতাই মামার সাথে দিদার কেন মনোমালিন্য হল ? দিদা তো আমার ভাল চায়,মঙ্গল চায়। আমি ভীষণ সমস্যায় পড়লাম।মান রাখি না কুল রাখি ? আমার জীবনে যতখানি স্থান দিদার , পাপড়ির স্থান এখন তার থেকে কম কিছু না।পাপড়িও আমাকে সুখে দুঃখে জড়িয়ে থেকেছে।আমার ভালো মন্দে আমাকে অভয় দিয়েছে।আমাকে দিকনির্দেশ করেছে।বাস্তবে ওর নির্দেশেই আমি এখন যে চাকরিটা পেয়েছি,তার ফর্ম পড়েছিলাম।ওকে আমার জীবনে ভীষন প্রয়োজন।দিদা সবই জানেন।আমিই বলেছি।আর সে সব জেনেও দিদা কেন যে পাপড়ির বাবাকে ওসব বলতে গেলেন , তা জানি না !

আমি ঠিক এই মুহূর্তে অথৈ সাগরে ভাসমান।বসেছিলাম বাড়ির বাইরে মামাদের গোয়াল ঘরের দাওয়ায়।একমনে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনছিলাম।ভাবছিলাম ওই আকাশের কত ঔদার্য ! কত দুঃখ , কত লাঞ্ছনা,গ্লানি সহ্য করে ও আজও অম্লান।আমিও আকাশ হব।মানুষের অহং, লোভ,লালসা,ক্রোধ, হিংসা,বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে ভেসে থাকব একা।তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই । ওহ, মুক্তি ! মুক্তির অপার আনন্দে আমি ভেসে যাব।
এমন সময় কাজের মাসি এসে আমাকে ডাকল,বাদশা ভাগ্নে ,মা তোমাকে ডাকছেন।
আমি দেরি না করে হন্তদন্ত করে ছুটে গেলাম দিদার কাছে।
দিদা বলল, তুই আমার নকল বাদশা।মন খারাপ করিস নে ভাই । বে তোর ওই কন্যের সত্যেই হবে।বাজনা না বাজুক,ঘোড়া না আসুক।তবু তোর বে আটকাবে না।
আমি আমতা আমতা করে বললাম, তোমাকে যারা অপমান করে , তাদের সঙ্গে আমি সম্পর্ক রাখব না দিদা ।
তুই তাকে ছেড়ে যে থাকতে পারবি নে ভাই।আমি কি সেটা জানি নে ।
আমি বললাম , না দিদা , আমি পারবো, তুমি আর আমি ।
আমার দিন যে ফুরিয়ে এলো ভাই,আমি আর ক'দিন।তোকে যে সারা জীবন কাটাতে হবে রে হান্দারাম ! আমার জন্যে তুই কেন তাকে ত্যাগ করবি ? তার কি দোষ ?
সত্যি আমি অবাক না হয়ে পারলাম না।দিদা আমাকে এতটাই ভালোবাসেন।আমার জন্য তিনি মান সম্মান সব কিছুকেই বলিদান দিতে চান ।টাকার চেয়ে যে সুদ মিষ্টি।আমি যে তার নাতি।নিজের সন্তানের থেকেও প্রিয় ! এ সম্পর্ক নিখাদ।কোনও স্বার্থের দর কষাকষি নেই।এখানে আছে শুধু গভীর ভালোবাসা।মায়া এবং এক অমোঘ বন্ধন।