গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০১৫

আবু রাশেদ পলাশ

মাকড়সা
                 
অন্তু এখন যেখানে থাকে সেটি পুরনো কংক্রিটের তৈরি একতলা ঘর । পরিত্যক্ত,অপরিচ্ছন্ন আর আপাদমস্তক শেওলা ধরা  চারপাশে শাল-কড়ইয়ের সুবিস্তৃত অরণ্য ।আশেপাশে জনবসতির চিহ্ন দেখা অমাবস্যায় চাঁদ দেখার মত দুরূহ এখানে । একাকি জীবনে এখানে মাঝেমাঝেই কিছু অপরিচিত মুখশ্রী  চোখে ভাসে ওর  কে জানে কত বছর আগে এখানে কারো পদচিহ্ন পড়েছিল । অথবা কোন রমণী তার ভেতরে লালিত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে গেছে এখানে । এখন কোথায় সে ? ভাবনাগুলো মস্তিষ্কে  কেমন জটলা পাকায় আজকাল । এ জায়গাটা আগে চেনা ছিলনা অন্তুর ।সহকর্মী সুমন সম্প্রতি এর সন্ধান দিয়েছে তাকে । তারপর এখানে এসে বসতি গড়েছে সে । ভেতরে জংলা কেটে পরিষ্কার করেছে  স্যাঁতস্যাঁতে মেজেতে একটা চৌকি পেতে নিয়েছে ইতোমধ্যেই । চৌকির ব্যবস্থা করেছে সুমন, সাথে কয়েক বোতল কার্বলিক এসিড । সাপের ভয় আছে জঙ্গলে । তার চেয়েও ভয়ংকর বুনো শেয়াল । রাতে এখানে শেয়াল ডাকে । গভীর রাতে দরজার পাশে শেয়ালের কণ্ঠ শুনলে  পিলে চমকে উঠে অন্তুর  তবুও জায়গাটা নিরাপদ ওর জন্য কারণ জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে সে । বিশাল জনসমুদ্রে অস্তিত্বহীন ঠেকলে মানুষ ফেরারি হয় । নিজ সত্ত্বাকেও বিশ্বাস করতে পারেনা তারা । অন্তুর অবস্থাও এখন তদ্রূপ । আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে সত্ত্বা চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় তার থেকেও পালিয়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে ওর ।       

আজকাল রাতে ঘুম হয়না অন্তুর । চোখগুলো কেমন জ্বালা করে যেন  বিছানায় শুয়ে থাকলে পীঠে ব্যাথা অনুভব করে সে ।  পরক্ষনে অন্ধকারেই দেয়ালে হেলান দিয়ে বিড়িতে আগুন ধরায় নেশাচরী  ভেতরে ভ্যাঁপসা গন্ধ নাকে লাগেনা ওর  অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে  পিদিমে আগুন দিলে ঘরের ভেতরটা চোখে পড়ে সহসায় । দেয়ালে মাকড়সা বাসা করেছে, জাল বুনেছে কোনায় কোনায় 
সুমনের সাথে অন্তুর পরিচয় কাকাতালিয়ভাবে   গ্রামের কলেজে এইচ এস সি দিয়ে শহরে এসেছিল সে । প্রথমদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়ে কতগুলো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে । সাথে মার্কসীট না আনায় ভর্তি হতে পাচ্ছিলনা অন্তু  বিশ্ববিদ্যালয় ট্রান্সপোর্টের সামনে এসে দেখে শিক্ষার্থীদের  বিশাল জটলা । লম্বা,কাল আর দানব সদৃশ একজন বক্তৃতা দিচ্ছে । ছাত্র-ছাত্রীদের কি সব অধিকার আদায়ের কথা বলে সে । এখান থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়না সেগুলো । পাশে বসে সুমন আড্ডা দেয় বন্ধুদের সাথে। ওর সাথে সহসা কথা বলার সাহস পায়না অন্তু । দৃষ্টিগোচর হলে সুমনই এসে পরিচিত হয় ওর সাথে ।
-কি ভাই,নতুন মনে হচ্ছে সমস্যা কোন ?
-হুম,মার্কসীট আনিনি ভর্তি নিচ্ছেনা তাই ।
-ও আচ্ছা, আস আমার সাথে ।

সেদিন সুমনের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় অন্তু । সুমন ছাত্র রাজনীতি করে । লম্বা দানব সদৃশ যে মানুষটা অবিশ্রাম বক্তৃতা দেয়, ওর নাম রনি । বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সব থেকে পরিচিত মুখ । সুমন ওরই অনুসারী ।অতপর সুমনের মাধ্যমেই রনির সাথে পরিচিত হয় অন্তু । পরিচয় পর্ব শেষ হলে অন্তুকে নিয়ে মঞ্চে উঠে রনি তারপর আবার মুখে কথার তুবড়ি ছুটে ওর-
-বন্ধুরা এর নাম অন্তু । ভর্তি হতে এসে হয়রানির শিকার । আজ থেকে অন্তুও আমাদের সহকর্মী  পরক্ষনে শ্লোগান দেয় সবাই- ভর্তি নিয়ে বাণিজ্য, মানিনা মানবনা । প্রশাসনের কাল হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও  

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সবসময় সুমনের সহযোগিতা পেয়েছে অন্তু । সুমনের মাধ্যমেই ছাত্র রাজনীতিতে আগমন ওর । তারপর সহকর্মী হয়ে উঠা  এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেও পরিচিত মুখ । অবনীর কথা মনে আছে ? অর্থনীতি বিভাগের অবনী-দোহারা গড়নের সুশ্রী মেয়েটা । বন্ধুরা টুনি বলে ডাকে ওকে । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কালচারাল প্রোগ্রামে ওর সরব উপস্থিতি চোখে পড়ার মত । এক অনুষ্ঠানে অন্তুর সাথে পরিচয় হয় ওর । সেদিন শাড়ি পড়েছিল সে ।হাতে কাচের চুড়ি আর মাথায় বেলি ফুলের ঝুঁটি । মঞ্চে উঠার আগে অন্তুকে দেখে বলেছিল-
-দেখতো আমার সাজটা ঠিক আছে কি ?
-হুম । সেদিন আর কথা হয়নি ওদের । তারপর একদিন ডিপার্টমেন্ট থেকে ফেরার পথে পেছনে একটা মেয়ে মানুষের কণ্ঠ শুনে অন্তু । তাকিয়ে দেখে অবনী । অবনী বলে-
-তোমাকে বলছি । কি নাম যেন তোমার,সিনিয়র ?
-হুম, অন্তু ।
-আপনি বলতে পারবনা, ওটা আমার হয়না । আমি অবনী । চল বসি এখানে ।

এরপর মাঝেমাঝেই অবনী আর অন্তুর দেখা হয় ক্যাম্পাসে । দেখা হলে বসে আড্ডা দেয় ওরা । কোনদিন সন্ধ্যার শেষ অবধি । নারী দেহে সম্মোহনী ক্ষমতা থাকে ।ওটা বিধাতা প্রদত্ত ।  রাতে বিছানায় শুয়ে ওগুছালো ভাবনায় পড়ে অন্তু । তারপর ভেতরে ভেতরে শিহরণ হয় ওর ।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিরোধী পক্ষের মধ্যে জহিরের দাপট তুঙ্গে । ওকে কে না চেনে ? বিকেলে দলের ছেলেদের নিয়ে ক্যাম্পাস পদক্ষিন করে সে । ট্রান্সপোর্টে গেলে টঙের মামারা ঘন লিকারে চা করে খাওয়ায় ।এরই মধ্যে একদিন ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রনির সাথে বিরোধ হয় ওর । ব্যাপারটা হয়তো এখানেই শেষ হতে পারত কিন্তু হয়নি । এটা নিয়ে বেশ বড় কলহ হয় পরে  প্রথমে হাতাহাতি তারপর রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে ক্যাম্পাসে  সেদিন অন্তুর হাতে রিভলবার আসে সুমনের মাধ্যমে । অন্তু বলে-
-রিভলবার চালাতে পারিনাতো সুমন ভাই ?
-সাথে রাখ,শিখিয়ে দেব ।
প্রথমদিন রিভলবার হাতে নিলে কেমন অস্বস্তি হয় অন্তুর । পরক্ষনে বলে
-এটা বরং তোমার কাছেই রাখ ভাই,আমার কেমন অস্বস্তি হয় ।
কথা শুনে ধমক দেয় সুমন-অবুঝের মত কথা বলিসনা অন্তু । তোর সেফটি তোকেই দিতে হবে ।

এ ঘটনার পর কিছুদিন পালিয়ে থাকতে হয় সবাইকে । লুকিয়ে গ্রামে চলে যায় অন্তু । সেখানে ওর মা থাকে, বাবা পরবাসী  ছেলে বাড়ি ফিরলে আহ্লাদিত হয় হাসিনা বানু । রাতে সুখ-দুঃখের গল্প করে দুজন । হাসিনা বানু বলে-এবার পলিটিক্স ছেড়ে দে অন্তু, ওসব করে কি হবে বলতো ?  
সহসা হাসিনা বানুর কথার জবাব দেয়না অন্তু । পীড়াপীড়ি করলে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দেয় সে । এদিকে কদিন ধরে মনে মনে অন্তুকে খুঁজে অবনী । ক্যাম্পাসে কোথাও দেখা পাওয়া যায়না ওর । সুমনের সাথে দেখা হলে ওর বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারটা অবগত হয় সে । এরপর ক্যাম্পাসে ফিরে আবার ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হয় অন্তু । অবনীর সাথে দেখা হলে মান-অভিমানের একপালা গান হয় দুজনের মধ্যে ।   

অবনীর সাথে অন্তুর প্রেমময় সম্পর্ক হঠাৎ করেই ।  এইতো গেল ফাল্গুনে মনের আদান-প্রদান করল দুজন । এখন ওরা আত্মার আত্মীয় । আজকাল অবনীর ছোট ছোট ছেলেমানুষি গুলোও সয়ে গেছে অন্তুর  অবনীর সারাদিন চকলেট চিবানোর অভ্যাস । একটাকা ধরের সস্তা চকলেট । ও চকলেট চিবালে বিরক্ত হয় অন্তু । তারপর বলে-
-কি খাও ওসব, ছেড়ে দাওনা ?
-ভালতো, তুমিও একটা নাও ।
পরক্ষনে অভিমান করে থাকতে পারেনা অন্তু । সেও একটা চকলেট মুখে নিয়ে চিবাতে থাকে । আহ! কি সুখময় সম্পর্ক ওদের । একেকজন যেন মধুভরা রক্তজবা । এ ক্যাম্পাসের কে না ওদের চেনে ? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দূর্বাঘাসও ওদের প্রেমের সাক্ষী । সেখানে অবনীর কোমল পায়ের স্পর্শ আছে যে । কলাভবনের দক্ষিণে শিমুলতলা, সেখানে ছোট একটা বাঁশের টং । অবনীর পছন্দের জায়গা এটা । কত বিকেল দুজনে এখানে কাটিয়েছে ! কত সুখময় মুহূর্তের সাক্ষী এ টং !  পশ্চিম আকাশে রক্তাভ সূর্যটা লাল হয়ে একসময় মিলিয়ে যায়,ধরণীর বুকে অন্ধকার নামে তখন । শিমুলতলায় ঝিঝি পোকার আনাগোনা বাড়ে ক্রমশ । কিন্তু প্রজাপতি সদৃশ মানুষদুটোর কথা ফুরায়না সহসা । অন্তু বলে-
-রাতযে অনেক হল অবু চল উঠি । অবনী বলে-  
-যদি না যায় আজ, আমার সাথে থাকবা এখানে ?
অবনীর কথা শুনে হাসে অন্তু । তারপর দীর্ঘক্ষণ কোন অজানা মোহের মধ্যে পড়ে থাকে দুজন  এ মোহের ঘোর কাটেনা সহসা । অন্যদিকে অবনীর সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে সংগঠনের কাজে মন নেই অন্তুর  ব্যাপারটা বিচলিত করে রনিকে । একদিন রাতে এ নিয়ে কথা হয় দুজনের মধ্যে । রনি বলে-
-সারাদিন কই থাকিস বলতো, দেখিনা যে ?
অবনীর ব্যাপারটা পাশ কাটানোর চেষ্টা করে অন্তু । ও বলে-আছি ভাই আপনাদের সাথেই 
-মেয়ে মানুষের পাল্লায় পড়ছিস শুনলাম । কেন এসব ফালতু ব্যাপারে জরাস ? কাজে মন দে
-ঠিক আছে ।
অন্তুর কথায় খুশি হতে পারেনা রনি । ওর সংক্ষিপ্ত করে বলা ঠিক আছে কথাটা যে আদৌ ঠিক নেই এটা রনির চেয়ে ভাল কে জানে । সংগঠনে বেশ চৌকশ সে, নিজের অবস্থান বিসর্জন দিতে অকৃপণ । সেদিন সুমনের সাথেও কথা হয় ওর । রনি বলে-
-অন্তুকে আমার চাই,অবনী কে- খোঁজ নে ?  
এরপর হঠাৎ একদিন অবনীর সাথে সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয় অন্তুর । দীর্ঘদিন কথা হয়না ওদের মধ্যে । ঐ দিন গুলোতে বিধ্বস্ত থাকে দুজনই  অবশেষে একদিন সুমনের মাধ্যমেই নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয় ওদের । সুমন বলে-
-ছেলেমানুষি ছাড় দুজনই, একটু স্থিত হও সম্পর্কে ।

তারপর আবার প্রজাপতির আনাগোনা বাড়ে ক্যাম্পাসের সর্বত্র । শিমুলতলার টং প্রাণ পায় আবার । এখানে বসে আগামীদিনের স্বপ্ন বুনে দুজন । অবনী আর অন্তুর সম্পর্কটা হয়তো এমনই হতে পারতো সবসময় । কিন্তু হয়নি। হঠাৎ একদিন অস্ত্রসমেত পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় অন্তু । পত্রিকায় নাম আসে ওর । ক্যাম্পাসে কানাঘুষা করে সবাই । এক এক করে দিন যায়, সহসা ছাড়া পায়না সে । তারপর রনির সহায়তায় যেদিন বেড়িয়ে আসে অন্তু, ততদিনে অবনী বদলে গেছে বেশ । অন্তু এলে সহসা ভরসা করতে পারেনা অবনী । ছাত্র রাজনীতির নামে অন্তু যা করে বেড়ায় স্থানীয়দের ভাষায় সেটা ক্যাডার রাজনীতি । এর ভবিষ্যৎ কি ? একাকি বিছানায় শুয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয় চপলমতি মেয়েটা  কিন্তু সম্পর্কের টানাপড়েন গুছাতে পারেনা সহসা  
একদিন শিমুলতলায় জোড়াশালিকের পদচারনা দেখা যায় হঠাৎ  শালিকের কূজন শুনা যায়না সহসা  বিকেলের শেষ সময়টা টঙে বসে থাকে অন্তু-অবনী,কথা বলেনা কেউ ।অকস্মাৎ অন্তু বলে-
-চকলেট খাবা অবু, একটা দেই ?
-না, একটা অনুরোধ করব রাখবা ?
-হুম,বল ।
-পলিটিক্স ছেড়ে দাও তুমি । এ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কি, ভেবেছ কখনো ?
-পলিটিক্স ছাড়লে টিকতে পারবনা যে ?
-বেশতো, আমাকেই ছেড়ে দাও তাহলে ।

তারপর আর কথা বাড়ায়না অবনী । নিজ গন্তব্য লক্ষ করে জোড়া পায়ের চিহ্ন আঁকে মাটিতে । অবনী চলে গেলে অনেকগুলো ভাবনা এসে দোল খায় অন্তুর মধ্যে । এক অর্থে অবনীই ঠিক । ও যে ভালবাসার কাঙাল । ক্যাডার রাজনীতি করে অবনীদের মনে জায়গা পাওয়া যায়না । আশা করাও অন্যায় । কিন্তু অবনীবিহীন অন্তু-যখন উন্মাতাল গ্রীষ্মে একপশলা বৃষ্টির প্রতীক্ষা সেখানে মায়াময়ী হাতের স্পর্শ দিবে কে ? পরক্ষনে রনিকে একটা কথা জানিয়ে দেয় অন্তু-
-আমি আর পলিটিক্স করবোনা ভাই ।

অন্তুর কথায় বিচলিত হয়না রনি । মুখশ্রী দেখে মনে হয় এমন কথা শুনার জন্য প্রস্তুত ছিল সে । তারপর সেও বলে দেয়-বেশতো, ভাল না লাগলে ছেড়ে দে পলিটিক্স ।
রাতে রনির কাছে সব শুনে ভাবনায় পড়ে সুমন । রাজনীতির যে বাঁকে আবদ্ধ অন্তু, সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা যে অতটাও সহজ নয়-এ সত্যিটা বুঝাতে চেষ্টা করে সে । সুমন বলে-
-পাগলামী করিসনা অন্তু । সংগঠন ছেড়ে দিলে জহির বাঁচতে দিবেনা তোকে ।

বিরোধী পক্ষের মেহেদী অবনীদের ডিপার্টমেন্টে পড়ে । অবনীর দুবছর সিনিয়র সে । ডিপার্টমেন্টে ওকে দেখলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে ছেলেটা । অন্তুর সাথে সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হলে অবনীকে কুপ্রস্তাব দেয় সে । এ নিয়ে একদিন অন্তুর সাথে বেশ কলহ হয় তার । এরপর অন্তু ধরে মারে ওকে । মেহেদীও শাসায়-
-ছাড়বনা কাউকে, প্রতিশোধ নিব দেখিস । এরপর ব্যাপারটা জহির পর্যন্ত গড়ায় ।
একদিন সন্ধ্যায় ফেরার পথে অবনীর সাথে দেখা হয় সুমনের । তারপর বসে গল্প করে ওরা । অবনী বলে-অন্তুকে এবার ছেড়ে দেন সুমন ভাই । পড়াশোনা করুক ।
-তুমিও পাগল হইছ অবনী । সংগঠন ছাড়লে টিকতে পারবেনা ও ।
-তবুও চেষ্টা করতে দেন একবার ।

কথা বাড়ায়না সুমন । তারপর সত্যি একদিন সংগঠন ছেড়ে দেয় অন্তু । ও সংগঠন ছেড়ে দিলে সম্পর্কে আবার স্বস্তি আসে ওদের । এরপর আবার শিমুলতলায় পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায় দুজনকে । আশপাশের দূর্বাঘাসে পদচিহ্ন পড়ে ওদের ।

এরপরের ঘটনা মর্মান্তিক । একদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি কথা শুনা যায় মুখে মুখে । অর্থনীতি বিভাগের অবনী মারা গেছে । গতরাতে কে বা কারা শ্বাসরোধে হত্যা করেছে তাকে । সকালে কেউ একজন ডিপার্টমেন্টের পেছনে ওর লাশ দেখে প্রশাসনে খবর দেয় । ঐদিনই অবনী হত্যা মামলা হয় থানায় ।ফেঁসে যায় অন্তু,জহির,মেহেদী সহ অনেকেই । অবনী হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাভাবিক শ্রী হারায় । শিক্ষার্থীদের জটলা চোখে পড়েনা সহসা । সন্ধ্যার পর নীরবতা নামে সর্বত্র ।

অবনীর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এসেছে । আচ্ছা লাশকাটা ঘরে মৃত মানুষের কান্না শুনেছ কেউ অথবা কোন মেয়েলি কণ্ঠের আর্তনাদ ? যে দেহে ভালবাসা পরিপুষ্ট হয় তার ব্যাবচ্ছেদে অন্তরাত্মার আস্ফলন কেমন হয় ? অন্তুর খুব জানতে ইচ্ছে করে ভালবাসাপূর্ণ ঐ দেহগুলো বোবাকান্না করে কি ? হাতের বিড়িটা শেষ হয়ে এলে দেয়ালে চেপে ধরে আগুন নেভায় সে  মাকড়সার দিকে দৃষ্টি গেলে চোখ আটকে থাকে সেখানে । নিরীহ মশাসদৃশ পতঙ্গগুলো ওর জালে আটকা পড়লে ভোগ্যপণ্য হয় ।
কদিন থেকে ব্যস্ত রনি, সাথে সুমনও । বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটি দেওয়া হবে ছাত্র রাজনীতিতে । প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জহির । মনে মনে ওকে সরিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করে রনি গ্রুপের নেতারা  ক্যাম্পাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আগমন ঘটে অন্তুর । ও এলে খুশি হয় রনি । রনি বলে
-অশ্রুকে আগুনে পরিনত কর অন্তু, অবনী হত্যার প্রতিশোধ নেব আমরা ।

ফেরত দেওয়া রিভলবারটা হাতে তুলে দিলে টগবগে দেহে খুন চাপে অন্তুর । জহিরকে ছাড়বেনা সে । বেড়িয়ে আসার সময় রনির ঘরে কানাঘুষা শুনা যায় । সুমন আর রনি কথা বলছে কোন ব্যাপারে । রনি বলে-
-অবনী শেষ, এবার জহিরকে সরিয়ে দে সুমন 

পরক্ষনে সত্যিটা বুঝতে পারে অন্তু । অবনী হত্যার পরিকল্পনাকারী আসলে সুমন আর রনিই । অস্ত্রসমেত একদিন পুলিশের হাতে রনিই ধরিয়ে দিয়েছিল তাকে । মুহূর্তে যাতনা তৈরি হয় নিজের মধ্যে  হাতের রিভলবারটা কার্তুজে পূর্ণ,ওটা তাক করতে ইচ্ছে করে সুমনদের দিকে । হাতে শক্তি পায়না সে । আয়নায় নিজ মুখশ্রী দৃষ্টিগোচর হলে নিজেকে একটা মশাসদৃশ পতঙ্গ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না তার । বুঝতে পারে মাকড়সার জালে আটকে গেছে সে । পরক্ষনে সুমন তাড়া দিলে সামনের দিকে পা বাড়ায় অন্তু-ফেরারি জীবনে আবার ফেরারি হওয়ার জন্য ।     
     


মিশকাত উজ্জ্বল

মূল্যবোধ


কাঁটাবনের রাস্তা ধরে রিকশায় চড়ে যাচ্ছে শাওন ও আনিস। উফ্‌, কী বিশাল যানজট রে বাবা! একজন আরেকজনের দিকে বিরক্তির চোখে তাকাল, আরেকবার রাস্তার দিকে। যে জ্যাম, বসে থাকলে একঘণ্টায়ও যাওয়া যাবে কি না সন্দেহ! এই মামা,আমাদেরকে সাইড করে নামিয়ে দাও তো!

রিকশা ছেড়ে হনহন করে হাঁটতে লাগল। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘড়ির কাঁটা তখন রাত সাড়ে আটটা অতিক্রম করেছে। দোকান বন্ধ হয়ে গেলে সব পণ্ড। আগামী পরশু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে প্রোগ্রাম। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিকে আমন্ত্রণ, হলরুম ভাড়া সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। এখন শুধু ব্যানার আর ক্রেস্ট বানানো বাকি। মাঝে মাত্র একদিন সময়। ঝড়ের বেগে ছুটছে যেন দুজন। হঠাৎ পাশের দোকানে বিদেশী কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ শুনে থমকে দাঁড়াল। উৎসুক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল শাওন... এক ভদ্রলোক সপরিবারে গিয়েছেন কুকুর কিনতে। সস্ত্রীক ভদ্রলোকের হাতে একটি সাদা কুকুরের বাচ্চা। আর তাদের নিজেদের আট-দশ বছরের ছেলেটি দোকানের বাইরে রাস্তায় প্রাইভেটকারের সামনে দড়িবাঁধা বেঢপ সাইজের একটি মস্ত বড় কুকুরের সাথে খেলছে। সম্ভবত এটি তাদের বাড়িতে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় পালিত অতি কদরের বিদেশী মেহমান। স্ত্রী-রত্নটি ভদ্রলোকের পাশেই সুন্দর, ফুটফুটে শিশু মেয়েটিকে ট্রলিতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিদেশী ট্যুরিস্টের ভঙ্গিমায়।

ভদ্রলোক কুকুরের বাচ্চাটিকে সযত্নে নেড়েচেড়ে দেখছেন, হাঁটাচ্ছেন, কোলে তুলে নিচ্ছেন। এরই মধ্যে স্ত্রীটি সপ্রতিভ হয়ে এগিয়ে যেয়ে কুকুরটিকে ইঙ্গিত করে স্বামীর উদ্দেশ্যে বলল, "ও মা... কী কিউট! উম্‌... ম্মাহ" করে কুকুরের বাচ্চাটির মুখে সস্নেহ চুমু বসিয়ে দিল। স্ত্রীর আচরণে লোকটি যেন দ্বিগুণ উৎসাহিত বোধ করল! স্বামী-স্ত্রী কুকুরের বাচ্চাটিকে নিয়ে আহ্লাদে গদ্‌গদ। এদিকে তাদের শিশু মেয়েটি মাকে না দেখে কান্না শুরু করলে ভদ্রলোকটি বিরক্তির স্বরে গাড়ির ড্রাইভারকে ডেকে বললেন, “ড্রাইভার... অর্পিতাকে একটু ঘুরিয়ে আনো তো

আনিস ততক্ষণে অনেকদূর এগিয়ে চলে গেছে। পেছনে ফিরে এসে, -আরে শাওন ভাই, আপনে এখানে দাঁড়ায়া আছেন ক্যান? ক্রেস্ট বানাইতে আইছেন, না কুত্তা কিনতে! -না ভাই, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এলাহী কাণ্ড দেখছি, আনিস ভাই। -আরে আপনে পাগল নাকি মিয়া? -এমন বিলাতী কুত্তা আমগ মহল্লায় দুই-চাইর ডজন আছে। চইল্লেন একদিন, নিয়া দেহামু নে। -আরে ভাই, কুকুর তো আমাদের এলাকায়ও আছে। -তাইলে? -ভাবছি, কত কোটি টাকার মালিক হলে মানুষ পশুস্বভাবের হয়ে যায়? ঐ ভদ্র লোককে আমাদের কি বলে ডাকা উচিৎ_ বড়লোক, কোটিপতি নাকি কুকুরপতি?

ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী

যখন হাত বাড়ালেই আকাশ


দেশলাইয়ের বাক্সটায় বিড়ি ঠুকতে ঠুকতে করিম চাচা বলে , ভাড়া বিশ টাকা লিবো যাইতে হইলে চল না হলে অন্য কারে ডাক ।
... সে কি ! তোমারে না কাল থেকে বলেছি আমার ইন্টারভ্যু আছে দশটায় । এখান থেকে ষ্টেশন পৌঁছতে কুড়ি মিনিট লাগবে । অত টাকা কেন চাও । গ্রামের ভ্যান রিক্সা , গ্রামের ছেলেদের কাজে আসবে না ত কাদের কাজে আসবে ?
...তা আমি কি করবো ! আমার ও ত প্যাটটারে খিধা লাগে না কি , তার ওপর ছাওলদের প্যাটের খিধা , বিবির আজ এটা কাল ওটা । আমার কি ভালো লাগে তদের লইগ্যা চাইতে ?
...উপায় না দেখে অর্ণব উঠে পড়ে । বসেই বলে তাড়া তাড়ি চল লোকালের টাইম হয়ে
গিয়েছে । 
...তর অত তাড়া কিসের ? আমি তরে ঠিক সময় ইষ্টিসনে পৌঁছে দিমু। চাকরি পেলে খাওয়াইবি  ত না কি চাচারে ভুইলা যাবি । দম বিরিয়ানি খামু  বলে খক খক করে কাশে ।  
দুর্গা দুর্গা বলে সারা রাস্তা অর্ণব ওই খেঁকুড়ে বুড়ো করিম চাচা নামক  বুড়োটাকে বরদাস্ত করে । স্টেশন পৌঁছতেই অর্ণবের ধড়ে প্রাণ এলো । ভাড়া মিটিয়ে নেমে পোঁ পা ছোটে ষ্টেশনে । গাড়ি ইন করতে সময় আরও বাকি । টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে অপেক্ষা করে প্ল্যাট ফর্মের ধারে । আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়া কাগজটা কিনে চোখ বুলিয়ে নেয় । আজকাল সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষায় viva তে কি প্রশ্ন সব হতে পারে তা কেউ বলতে পারেনা । স্রেফ ভাগ্যের ওপর নির্ভর আর ঠাকুরের আশীর্বাদ না থাকলে ...... 
ট্রেন এসেগেল । বাঁচা গেল । একটা বসার যায়গা পেয়ে-গেল অর্ণব। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করে চলে । বিগ ব্যাং থেকে ন্যানো টেকনোলজি .. গ্লোবাল ওয়ার্মিং  আরো কত সব কি । অর্ণব ফিজিক্স নিয়ে এম.এস.সির পর এম.ফিল করে । পি.এচ.ডি র জন্য চেষ্টা করছে । কোন ভালো প্রতিষ্ঠানে ও রিসার্চ করতে চায়। সিভিল সার্ভিস না পেলে রিসার্চ করবে। বাইরে কোথাও চলে যাবে । যেখানে অধ্যাপকের সম্মান আছে সেই ইউনিভার্সিটি ওর পছন্দের তালিকায় । বাবা মার অমত থাকলেও নিজের ক্যারিয়ার এর জন্য বাইরে যেতেই হবে । 

সিভিল সার্ভিস মেন ক্লিয়ার করে ভাইভা দিতে গেলে অনেক বিষয়ে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন । কি প্রশ্ন আসবে কেউ জানেনা । ওদের অঞ্চল-থেকে ওই বোধহয় এক মাত্র ক্যান্ডিডেট । ও ইন্টিমেসন  লেটার পেয়ে খুশি ছিল । বাবা মা এই বিষয়ে অতটা বোঝেন না । ছাত্র ছাত্রীরা এই সম্বাদ পেয়ে সকলে তাদের স্যারকে অভিনন্দন জানায় ।  ওর মা খুব ই সাদা মাটা মানুষ।   বাবা প্রাইভেট ফার্মের চাকরি। সর্বদাই টেনশনে থাকেন। ওনাদের প্রতিক্রিয়া সেরকম ছিলনা । তবুও মা বলেন ,  হ্যাঁরে তুই কি বাইরে চলে যাবি আমাদের ছেড়ে ?”
অর্ণবের প্রতিক্রিয়া কিছুই ছিলোনা । শুধু বলে এখন কিছুই বলতে পারবোনা । তবে যেখানে যাব তোমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব ।

অর্ণব ভালো ছেলে । টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাত । আজকাল ফিজিক্সের টিচারের অনেক দর । উচ্চ মাধ্যমিকের ছেলে মেয়েদের অঙ্ক ফিজিক্স দুটোই পড়াত । তা ছাড়া আই আই টি এবং জয়েন্ট এন্ট্রান্সের জন্য খুব ভালো কোচিং দিত। ওর নাম আছে সেই বিষয় । নিজের কোচিং ক্লাস করলে বেশ দু পয়সা রোজগার হত কিন্তু ওর ইচ্ছা ছিল আই.এ.এস অফিসার হওয়ার । তাই ও সব সময় ছাত্রদের বলত ঃ   অল্পে সন্তুষ্ট হলে তোমার লক্ষ্য পূরণ হবেনা । অধ্যবসায় , মেধা , ব্যক্তি চরিত্র  দুটোরই প্রয়োজন । শুধু ভালো ছাত্র হলে চলবেনা । ভালো মানুষ হতে হবে। মা বাবাকে কখন অবজ্ঞা করবেনা । তাঁদের আশীর্বাদ ছাড়া সাফল্য অসম্ভব। এ যুগে সব অধঃপতনের মূল কু শিক্ষা কু সঙ্গ । আমি তোমাদের স্বামী বিবেকানন্দ হতে বলছিনা কিন্তু তাঁর আদর্শকে অনুসরণ কর । মহিলাদের সম্মান দাও তারা তোমাদের মা , বোন , মাসি , পিসী , মামি ......... । এ যুগে এটার ই বড্ড অভাব। আমি যদি ভগবানের আশীর্বাদে আই.এ.এস অফিসার হতে পারি আমার প্রথম কর্তব্য যে কথাগুলো তোমাদের বললাম সেগুল কর্ম ক্ষেত্রে করে দেখান ।

ওর ছাত্র ছাত্রীরা এই জন্য ওদের স্যারকে শ্রদ্ধা করতো , সম্মান করত । আজকাল এরকম শিক্ষক পাওয়া বিরল।  অর্ণব আরো বলত অর্থ উপার্জনের জন্য অর্থের পশ্চাৎ ধাবন বাঞ্ছনীয় নয়।   নিজের মনকে আয়ত্তে রাখলে তবেই সফলতার শিখরে পৌঁছন যায়।
এসব ভাবার সময় এটা নয় । প্রসংগ পাল্টালো ......... 


 দ্বিতীয় পর্ব

অর্ণব ১০ টার আগে পৌঁছে যায় নির্ধারিত স্থানে । প্রায় ১০০ জনের ওপর ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছেন বিভিন্ন জায়গা থেকে । একে একে প্রায় ১০জনের পর ওর নাম ঘোষণা হল। প্রথম সিভিল সার্ভিসের জন্য ইন্টার্ভিউ একটু নার্ভাস তো লাগবেই ।
অর্ণব ভালো করে যানে ইন্টার-ভিউয়াররা ;  ম্যানারিসম , স্মার্টনেস , টু দি পয়েন্ট উত্তর সিভিল সার্ভিসের ভাইভাতে অনেক প্রাধান্য দেন । সিভিল সার্ভিসের প্রিলিমিনারি , ফাইনাল ,ভাইভা সব গুলো ইম্পরট্যান্ট । এখন ওর ফাইনালে কত মার্ক আছে সেটা নির্ভর করছে সিলেকশনের ওপর কারন দুটো মিলে র‍্যাঙ্ক ঘোষণা হবে । ভগবানের আশীর্বাদে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছে তবে স্মার্ট সিটিতে আরও কিছু বলার ছিল কিন্তু চেয়ারম্যান থামিয়ে দেন। তবুও যা বলেছে মনেহয় যথেষ্ট । 
ইন্টার্ভিউয়ের পর বাড়ি ফেরার পালা ।

একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা শিয়ালদাহ ষ্টেশন চলে যায় । ওখানেই সামনের হোটেলে লাঞ্চটা সেরে ফেলে । খুব খিদে পেয়েছিল তাই হোটেলেই লাঞ্চ সারে । ষ্টেশনে পৌঁছে টিকিট কাউন্টার-থেকে  টিকিট কেটে সোজা কৃষ্ণনগর লোকাল ট্রেনে উঠে পড়ে । সারা দিন খুব পরিশ্রম গিয়েছে এখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন । ট্রেনের কামরায় উঠে জানলার ধারে একটা বসার যায়গা পেয়ে যায়। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানেনা । হটাত মোবাইলটা বেজে ওঠে। বিরক্তির সহকারে কল রিসিভ করে। ওদিকে চেনা গলার স্বর ।
কিরে কেমন ইন্টার্ভিউ দিলি ? আমি কে বলতো ?
ও মাসি ! হটাত অনেক দিন পর ... তোমরা কেমন আছো ? হ্যাঁ ইন্টার্ভিউ ভালোই দিলাম । তবে কিছুই বলা যায়না । সব ভগবানের কৃপা । ট্রেনের মধ্যে কি ভালো শোনা যায়। আমি বাড়ি পৌঁছে তোমায় কল করবো ।
চিন্তা করিস না তুই ঠিক পেয়ে-যাবি । আজ পর্যন্ত তুই সবে ......... পরেরটা কিছু শোনা গেলনা...।

মোবাইল পকেটে রেখে একটু চোখ বুজেছে কি ... লেবু লজেন্স ... হজমি... ধুপ-কাঠি সব একসঙ্গে হকারদের চিৎকার । ওদের ই বা দোষ কি এই ভারতে বিশেষ করে আমাদের পশ্চিম বঙ্গে নিম্ন মধ্যবিত্ত আয় বর্গের ছেলে মেয়েরা পড়াশুনো করে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে নিজেদের অন্ন   সংস্থানের  জন্য । সকলে ত মেধাবী ছাত্র ছাত্রী নয় । তাদের শিক্ষার পর সামান্য চাকরি পাওয়া খুব ই  মুস্কিল । তাই যে যেমন পথেই হোক নিজের পেটটা চালানোর জন্য নানান রুজি রোজগারের পথ বেছে নিচ্ছে ।
এর মধ্যে ওর ষ্টেশন এসে-গেল । প্ল্যাটফর্মে নেবেই হাঁটা দিল ওভার ব্রিজের দিকে। সন্ধ্যে প্রায়  হয়ে এলো । ষ্টেশন থেকে বাড়ি বেশ পথ । সকালে করিম চাচা ছিল এখন তার টিকি নেই । চাচার এখন শুঁড়ি খানায় যাওয়ার সময় ।  এখন ভ্যান রিক্সা বলতে একটা দুটো আছে । অর্ণব হেঁটেই যাবে স্থির করলো । হাঁটা পথ ঘণ্টা খানেক নেবে । নিজের মনে গুন গুন করতে করতে এই গানটা ধরল ...
আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি 
সন্ধ্যা বেলার চামেলীগো,সকাল বেলার মল্লিকা
আমায় চেন কি?” ...
অর্ণব ওর বয়েস  আন্দাজে রুচি সম্পূর্ণ এবং ওর গানের সিলেকশন ও অন্য রকমের । নানা চিন্তা এবং তর্ক বিতর্ক মনে এলো ...। এইতো সেদিন অর্ণবের এক বন্ধু বলছিল , “আমরা বুঝিনা কোয়াণ্টম থিওরি ; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ  বুঝতেন ?” 
আমি  শুধু হেসে মাথা নেড়েছিলাম। ভাবছি এই পরিসরে তার সংক্ষিপ্ত একটা আলোচনা সেরে নি  ,পরে না হয়   অন্য কোন আলোচনায় আসবো ... বন্ধুটি বলতে লাগলো...

পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র না হয়ে , ইন্টারনেট আর দুএকটি বই পড়ে আমরা যেটুকু বুঝেছি , রবীন্দ্রনাথের মত একজন বিশ্বকবি ,স্বয়ং আইনস্টাইনের সাথে আলাপ ক'রে ,এতটুকু ও কম  বোঝেননি। উনি এতটাই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন যে নিজের মতামতে অটুট থেকে আইনস্টাইনের সাথে বিতর্কে গিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালের ১৪ই জুলাই তারিখে কবি ও বিজ্ঞানীর এ কথাবার্তা রিলিজিয়ন অব ম্যান বইটিতে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৩০সালের ১০ই আগস্ট, 'নিউইয়র্ক টাইমস' এ প্রকাশিত হয়। 
আমি বলি , “জানতাম না যাক ভালোই হল তুই বললি আমার ইন্টার্ভিউ তে কাজে লাগবে   
বাড়ি এসে-গেল ।

মা সন্ধ্যা দিচ্ছিলেন । আমাকে দেখে ইশারায় ঘরে যেতে বলেন ।
হাত পা ধুয়ে গামছায় মুছে ঘরে গিয়ে দেখি বাবার সঙ্গে এক ভদ্রলোক কথা বলছেন।
আমি নিজের ঘরে যাচ্ছিলাম হটাত বাবার ডাকে পেছন ফিরি ।
বাবা পরিচয় করিয়ে দেন ইনি আমাদের মিলের মালিকের ছেলে
হ্যালো আমি সিদ্ধার্থ জৈন ।  
অর্ণব ব্যানার্জী ।  
সিদ্ধার্থ - হ্যাঁ শুনেছি আপনার নাম । আপনার স্টুডেন্টরা ভালো র‍্যাঙ্ক রাখে জয়েন্ট এনট্রান্সে ।
অর্ণব - ও তাই ।
সিদ্ধার্থ - আমার মেয়ে এবারে বারো ক্লাস সাইন্স নিয়ে পাস করলো । আইআইটি এনট্রানসে বসার ইচ্ছা। আপনি একটু গাইড করলে অনেক উপকার হত ।
অর্ণব  আমি খুব ই ব্যাস্ত । হয়তো আমাকে দিল্লী যেতে হবে । কথা দিতে পাচ্ছিনা । আপনি বাবার সঙ্গে যোগা যোগ রাখবেন সম্ভব হলে নিশ্চই কিছু উপায় হয়ে যাবে । এই বলে বিদায় নেয় ।
ঘরে গিয়ে প্রথমেই মাসীকে কল করে ।
ওপার থেকে মাসী  ... হ্যাঁরে এতক্ষনে পৌঁছলি ।  
আর বোলনা ট্রেনে যা ভীড় । ভারতের জন গণনা লোকাল ট্রেনে হলে ঠিক হিসেব বেরুত । পা রাখার ঠাইঁ নেই।
তা যা বলেছিস । তুই দিল্লী কবে আসবি ? মেসো ত তোর আসার অপেক্ষায় দিন গুনছেন ।
কি যে বল মাসী , গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল । আগে দেখ কি হয়...
ও ঠিক হয়ে যাবে । আমি মানত করেছি  বৈষ্ণ দেবীর কাছে । হলে তোকে মায়ের মন্দির দর্শন করিয়ে পুজো দিয়ে আসবো । তোর মা কোথায় ?
পুজো করছে ।
ও তবে পরে কথা হবেখন । আহা সারা জীবন দুঃখে কাটলো এবার ভগবান সুদিন দেবেন বোধ হয় । তোর মাকে বলিস আমি ফোন করেছিলাম বলে।  
বলেদেব । ফোনটা রেখে ঠাকুর ঘরে যায় সন্ধ্যারতি করতে । ব্রাহ্মনের ছেলে সকাল সন্ধ্যা গায়ত্রী জপ অতি অবশ্যই করা উচিৎ ।

রাতে আরেকটা ফোন এলো অন্বেষার কাছ থেকে । অন্বেষা অর্ণবের কলেজের বন্ধু । ও দিল্লীথেকে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়েছে । ওখানেই কোচিং নিয়েছে । বাবার টাকা আছে তাই ওর চিন্তা কি ?
হ্যাঁরে কেমন ইন্টার্ভিউ দিলি ?
সো সো । তুই ?
বাজে বকিসনা । আমি জানি তুই খুব ভালো প্রিপারেসন করেছিলি । আমি ওই একরকম । সব ই আন প্রেডিক্টেব্ল , বল !
হ্যাঁ । তা ঠিক ।
এবারে পনেরো দিনের মধ্যে রেসাল্ট বেরুবে । মানে ধর পরের মাসের ১৫ তারিখ নাগাদ তুই ইন্টার নেটে পেয়েযাবি তোর অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক ।
তুইত আছিস ... আমায় জানিয়ে দিবি কি বল ?
হেঁয়ালি করিসনা । তোর কি প্ল্যান বল ?
আমার আবার কি ? আমি টিউশনি করে চলি ......
ঠিক আছে রাখছি । বাই ......
বাই ।

অর্ণবের সিভিল সার্ভিসের ফল জেনে বিভিন্ন খবরের কাগজ এর প্রতিনিধিরা ওর ইন্টার্ভিউ র  ভিডিও রেকর্ডিং করে নিয়ে যান। কাল দিল্লী-থেকে ফোন এসেছিল ইউ পি এস সি র অফিস থেকে । অভিনন্দন  জানিয়ে ইউ পি এস সি বলে অর্ণবের অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক ১০৮ । ওয়েব সাইট থেকে ডিটেলস ডাউন লোড করে নির্দেশ অনুযায়ী সব কাজ করতে। 
অন্বেষার ১০০২  ওর কাছ থেকেই জানে । ওকেও অর্ণব অভিনন্দন জানায় ।
অর্ণবের এত দিনের সাধনা সফল হল । ওর মনে হয়েছিল ও সিভিল সার্ভিস এবারে হয়তো  পেতে-পারে কারন প্রিলিমিনারি , ফাইনাল ও ভাইভা সব ভালো হয়েছিল। তবুও আশঙ্কা ছিল বলা ত যায়না ।
মা বাবার খুশীর ফোয়ারা ছোটে । গ্রামের সব গুনি মানুষ আসেন ওকে শুভেচ্ছা জানাতে । ওর স্কুলের মাষ্টার মশাই ছুটে আসেন ওর ঘরে । ওকে জড়িয়ে ধরে বলেন আমার জীবিত অবস্থায় এই সুখবর আমাকে আমার মাষ্টারের জীবনের সার্থকতা এনে দিল । আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি তোর আরও উন্নতির জন্য । আজ আমি সব চেয়ে খুশি   

অর্ণব মাষ্টার মশাই এর পায়ের ধুলো নিয়ে ওনার আশীর্বাদ নেয় । বাবা মা এবং সকল গুরু জনদের প্রণাম সেরে দক্ষিণেশ্বরে মায়ের দর্শনে বেরিয়ে পড়ে ।
মায়ের দর্শন সেরে ফিরে আসে । দিল্লী যাওয়ার আয়োজন করে । তৎকালে  টিকিট রিসার্ভে-সন করে নেয় রাজধানীর । শিয়ালদহ রাজধানী এক্সপ্রেস হওয়াতে ওদের অনেক সুবিধে হয়েছে ।
মাসীকে বলাতে মাসী খুশীতে আত্মহারা । মেসো অভিনন্দন তথা শুভেচ্ছা জানান ।
আজ সকলের আশীর্বাদ না থাকলে কিছুতেই এই সাফল্য হত না। তাই অর্ণব ঈশ্বর বিশ্বাসী ।
সমুদায় ৯ লক্ষ ৪০ হাজার পরীক্ষার্থী র মধ্যে ১৭০০০ লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্য হয় ৩৩০০ জনকে ইন্টার্ভিউর জন্য ডাকা হয় এবং ১২৩৬ জনকে নিয়োগ পত্র পাঠান হয় । ১২৩৬ জনের মধ্যে ১০৮ অসাধারণ সাফল্য এটা এক বাক্যে সকলে স্বীকার করবেন। 
অর্ণব দিল্লী গিয়ে মাসীর বাড়িতে ওঠে । ওখানে অন্বেষার সঙ্গে দেখা হয় । দুজনে সমস্ত প্ল্যানিং করে মুসুরি যাত্রার। 

তারপর দিল্লী থেকে মুসুরি যাত্রা করে । ওখানে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ন্যাশনাল একাডেমী অফ    এডমিনিস্ট্রেশন , মুসুরি তে এক বছরের ট্রেনিং । কর্মশালা বিল্ডিং এ  সারা ভারতবর্ষের  আই।এ।এস অফিসার গন একত্রীত হন তালিমের জন্য । এই সময় ওনাদের সমস্ত বিষয় পুঙ্খানু পুঙ্খ ভাবে তালিম দেওয়া হয় যেমন আইন শৃঙ্খলা , রাজস্ব , অর্থনীতি ইত্যাদি তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় । 
প্রায় এক বছরের ট্রেনিং এর পর দুজনে ফেরেন স্বদেশে । এর মধ্যে ওদের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় প্রায় অজান্তেই । এটাই প্রায় ঘটে ওই ট্রেনিং এর সময়। যে যার পার্টনার নির্বাচন করে ।
ওদের দুজনের বিয়ে হয়ে যায় । অর্ণব এবং অন্বেষা এখন স্বামী  স্ত্রী । খুব ধুম ধাম না হলেও ভালো ভাবেই বিয়ে হয় দিল্লীতে । 

অর্ণব সামান্য ঘরের ছেলে হয়েও নিজের মেধা এবং অধ্যবসায়ের বলে ভারত বর্ষের সম্মান জনক পরীক্ষা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সম্মানের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয় । তাই যখন হাত বাড়ালেই আকাশ আর পা বাড়ালেই রাস্তা তখন ভুল রাস্তায় না গিয়ে ঠিক রাস্তায় যুব সমাজ গেলে নিশ্চয় তার লক্ষ্য স্থলে পৌঁছবে অর্থাৎ আকাশ ছুঁতে সক্ষম হবে এতে সন্দেহ নেই।  


মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০১৫

৪র্থ বর্ষ ১৫তম সংখ্যা ।। ১ জুলাই ২০১৫

এই সংখ্যার লেখকসূচি – বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপভূষন রায়, রুখশানা কাজল, মানসী চট্টোপাধ্যায়, সুধাংশু চক্রবর্তী, ব্রতী মুখোপাধ্যায়, দেবাশিস কোণার, জয়া চৌধুরী ।