গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১৮

ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়

ফাঁদ

         ধূ ধূ মাঠ, কোথাও কোন জনমনুষ্য নাই। বহুদুরে দুই-একটি মাত্র মাটির ভাঙ্গা ঘর ছায়ার মত দেখা যাইতেছে। চতুর্দিকে ভগ্ন প্রস্তর  ছড়ানো, মাঠ ঘাট গুল্মলতায় পরিপূর্ণ। সেই জনহীন প্রান্তরের উপর দিয়া একখানি শীর্ণ পায়ে চলার পথ বহুদুর পর্য্যন্ত বিস্তৃত। সীতাপতি বধূর  হাত ধরিয়া সেই প্রান্তরে উপস্থিত হইল...এই পর্য্যন্ত পড়েই বিকাশ বইটির পাতায় একখানি পাখির পালক রেখে বইটি  মুড়ে বিছানার পাশে রাখল। জানলা দিয়ে তাকিয়ে ভাবল,বাস্তবিকই এই  জায়গাটিও যেন সেইরকমই।  ফাঁকা, কেউ কোথাও নেই, দূরে কিছু ভাঙ্গা, মাটির ক্ষয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি। প্রভাত কি সীতাপতি,যে বধূর হাত ধরে এই জনহীন প্রান্তরে এসে বসবাস করছে! বেশ একটু মজাই লাগল ভাবতে। তাহলে একদিন দেখতে হবে পায়ে চলার শীর্ণ পথটি কোথাও আছে কিনা, থাকলে সে কোথায় গিয়ে মিশেছে।


        মাত্র  কিছু লোকজন মিলে এখানকার  বসবাস।  নতুন রেললাইনের কাজ চলছে, সামনে একটি ইঁটভাঁটা আছে।  রেলের কর্মী আর ইঁটভাঁটার লোকজনেরাই এখানে থাকে। বেশির ভাগই শ্রমিক, দিনমজুরের দল। দু-চার জন বাবু আর একজন মাত্র অফিসার গোছের লোক। কে তাকে এখানে আসার কথা বলেছিল, এখন আর মনে নেই। কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকার পক্ষে এর চেয়ে নিরাপদ  জায়গা আর কিই বা হতে পারে! কিন্তু কতদিন অন্যের উপরে নিজের ভার চাপিয়ে এভাবে থাকা যায়, তার মত কলকাত্তাইয়া বাবু আর কতদিন এভাবে  থাকতে পারে!


       অনেকক্ষণ থেকেই মন চা চা করছিল, কিন্তু বন্ধুর স্ত্রীটিকে নিজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে বিব্রত করতে বিকাশের মন চাইছিল না। অন্যের ওপর জোর জুলুম করা সাজে না। এপাশ ওপাশ চাইতেই দেখে রুক্মিণী নিজেই দুকাপ চা হাতে নিয়ে এঘরে  আসছে। বারান্দা দিয়ে আসার সময় কার সঙ্গে যেন কথা বলল, তারপর ঘরে এসে জিজ্ঞেস করলচা হোবে?

        রুক্মিণী উত্তর বিহারের মেয়ে, আরা না ছাপরা না সীতামারি কোন এক জেলার অজ এক গাঁয়ে  তার বাপের বাড়ি।  চেহারা  অনিন্দ্যসুন্দর  বললেও কম বলা হয়। বিকাশ  তার জীবনে এত সুন্দরী মেয়ে কখনো দেখেনি। রুক্মিনীর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে অসুবিধে বোধ করে, কেমন যেন অস্বস্তি করে। কিছু করারও নেই। প্রভাত সেই ভোরবেলা বেরিয়ে যায়, আসে প্রায় চারটে  নাগাদ। ততক্ষণ রুক্মিণীর সঙ্গেই কথাবার্তা চালাতে হয়, যা দরকার চাইতে হয়। প্রভাতের মত সাধারণ এক চাকুরিজীবির কি করে এত সুন্দরী একজনের সঙ্গে বিয়ে হল, বিকাশ  সেই কথাটাই শুধু ভাবে, যেন সাধারণ মানুষের   সুন্দরী কে বিয়ে করতে নেই। কিছু কিছু কথা জেনেছে  বিকাশ, প্রভাতই বলেছে তাকে। গরীব বাপের মেয়ে, টাকা-পয়সার জন্য বিয়ে আটকে যায়, প্রভাত তাকে উদ্ধার করেছে। এমন মেয়েরও বিয়ে আটকায়! অবাক হয়ে ভাবে সে। রুক্মিণী এসে বাধা দেয়। --কি ঘরে বসিয়ে আছেন ভাইয়া, বাহার যাও, দেখো চারোঁ  তরফ...বহোত কুছ হ্যায়...খালি ঘরে বসিয়ে থাকেন আপ জি!
--তুমি দেখেছ?
--সব না দেখলো...কুছু কুছু দেখেছি।বলেই মিষ্টি হাসি হেসে বলে আপ্‌সে জ্যাদা দেখ লিয়া...
কখন যাও, প্রভাত তো সারাদিন বাইরেই থাকে
--হম তো বাহার না রহে, ঘর মে থাকি।বাংলা বলার চেষ্টা করে রুক্মিণী। অর্থাৎ সে তো আর বাইরে বাইরে ঘোরে না প্রভাতের মত, সুতরাং তার এখানকার সবকিছু না দেখার কি আছে! প্রভাতের কাছ থেকে কিছু কিছু বাংলা শিখেছে সে। কি যেন একটা কথা  বলতে গিয়েও চুপ করল, বিকাশের দিকে একবার তাকিয়ে ঘরের  বারান্দায় এল রুক্মিণী। একটু পরেই আবার বিকাশের ঘরে এসে ওর খাটের কাছে মেঝেতে বসল। বিকাশ হাঁ-হাঁ করে উঠলআরে...আরে, এ কি! এখানে কেন?’ বলল, আবার খাটে তার সঙ্গে বসতে বলতেও পারছে না, কিসের এক অস্বস্তি ধরে  রেখেছে। অবাক হল রুক্মিণী।  --কিঁউ, আপনাকে বাড়িতে কেউ জমিন মে বসে না? আমরা বহুত গরীব ভাইয়া,হামাদের এত্ত বড়া ঘর নাহি  এক কামরা, উসিমে সব...খানা,  বৈঠনা, সো না...সব  কি কথার কি উত্তর! লজ্জ্বা পেল নিকাশ। কিন্তু মাটিতে রুক্মিণী বসে আছে বলে ওর নিজের খাটের ওপর বসে থাকতে খারাপ লাগছিল। খালি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে উঠে ভিতরের বারান্দায় যাবে, রুক্মিণী   তড়াক করে উঠে হাত থেকে চায়ের কাপ নিল---মুঝে দিজিয়ে ভাইয়া...ওহ্‌ গুসসা  করেঙ্গেভুরু কোঁচকালো বিকাশ--কেন, গুসসা করবে কেন? 
--আপ মেহমান যো হ্যায় থতমত খেল বিকাশ,রুক্মিণী কি মনে করিয়ে দিল!

        সত্যি,আর কতদিন এভাবে অতিথি হয়ে থাকা যায়! মুখে কিছু না বললেও অসুবিধে কি হয় না। একটা মেয়ে সারাক্ষণ একবাড়িতে অন্য একটা লোকের সামনে খাওয়া-বসা, গল্প করা, রান্না করা...এসব করতে পারে! একটা মাত্র কলঘর...তার নিজের দরকার থাকলেও বলতে পারে না। সে তো তার নিজের কেউ নয়, বরের বন্ধু, তবে! খারাপ লাগছিল বিকাশের। দু/একদিনের মধ্যেই চলে যাবে সে। অন্য কোথাও জায়গা খুঁজে নেবে। কিন্তু মুশকিল হল, যাবে কোথায়, তেমন নিরাপদ জায়গা আর আছে কি? কেউ না কেউ তাকে দেখে ফেলবেই। এ একেবারে পৃথিবীর একপ্রান্তে, কেউ বোধহয় জানেই না এই জায়গাটার কথা, তাই এমন সহজে থাকতে পারছে। তাছাড়া সে কেন এসেছে, কি কারণে এসেছে,এসব এখানে খুব সহজেই বুঝিয়ে বলা গেছে, প্রভাত কি তার বউ রুক্মিণী একটুও সন্দেহ করেনি। করলে বিকাশের পক্ষে মুশকিল হত। যাবে বললেই তো যাওয়া সহজ হবে না,দেখা যাক্‌।

(২)

       বিকেলের আলো মরে আসছিল। জানলা দিয়ে দুরের ছোট ছোট গাছপালা, অনেক দুরের মাটির ভাঙ্গা ঘরগুলো কেমন যেন আবছা লাগছিল,ক্যালেন্ডারের ছবির মতন। ওখানে কি কোন মানুষজন থাকত একসময়,ওই ঘরগুলোয়?  জানতে ইচ্ছে করে, কারা তারা? চলে গেছে, নাকি মরে গেছে? একটা  গোটা গ্রাম এভাবে শেষ হয়ে যায়!  নাকি আরো গভীরে আছে অন্য কোন ঘটনা, কি সে?বাইরের দিকে চেয়ে চেয়ে এইসব চিন্তাই করছিল বিকাশ। অন্যদিন প্রভাত প্রায় এইসময়েই এসে পড়ে। আজ দেরি হচ্ছে কেন কে জানে!  সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বিকাশ বললতুমি ওখানে গেছ,ওই ভাঙ্গা মাটির ঘরগুলোর কাছে?’
--আমাদের বিহারে নিজের ঘরই ত ভাঙ্গা আছে,আবার দুস্‌রা কে ভাঙ্গা ঘর কেনোদেখব? সব তো একই আছে...ই জায়গা যেমন আছে,আমরাকে ঘর তো ওইসে হি ...তো কেনো যাব!যেন প্রশ্ন করে বিকাশকে।  
--সারা জিন্দগী ত এমনি ভাঙ্গা কাটল, তো নয়া কি আছে জি? আপনি দেখ কে আসুন, লেকিন আপনাদের কি সব বড়া বড়া লোক আছে,বহুত পয়সাওয়ালা? গরীব নাই কোই?  জিন্দগী ভি তো এমনি আছে ভাইয়া, কভি টুটা-ফুটা, তো কভি রওশন। ...দেখো, এখানে রেল লাইন আছে, বাজার আছে,  আদমী  লোগ আতে যাতে হ্যাঁয়, আবার কিসি জগহ দেখো একদম সুনা...একদম সুনা, সুখা পড়া হুয়া...ইয়ে সব দেখতে ভালো লাগে? আপনার মন মে ...দুখ নহি লগতা!...আপনি কি ইয়ে সব দেখনে কে লিয়ে আসেছেন...ক্যা ভাইয়া?
একনাগাড়ে অনেক কথা বলে চুপ করল রুক্মিণী। বিকাশ চুপ করে আছে, কোন কথা বলছে না দেখে আবার বলল সে---আমি জানে আপনি এখানে কেনোআসেছেন। আপনে কেনো এমন করলেন?  যো দুখী ভাইয়া, কেনো উকে ঔর দুখী বানাবে। কেনো মারলে উকে? সুখ কে লিয়ে বহোত কম চিজ লাগে,বহোত কম...ওটা  কেন নিয়ে লিবে? অগর নিবে তো পালাবে কেন?  আপনি জানে, কি উয়ারা আপনাকে ধরিয়ে দিবে...সেজন্যে আপনি পালাবে, তো লিয়া কিউঁ?  বুরা মত মানিয়ে ভাইয়া,যো লেতে হ্যায়, বহ তো দেতে নহি...তো লেনা ভি নহি চাহিয়ে।
আমি বহুত দেখেছি, আপসে ভি জ্যাদা...ইয়ে,আপনি ইখানে যো সুনা দেখছেন, আমার অন্দর উস্‌সে ভি সুনা, খালি পড়ে আছে। আপ মুঝে ক্যা দেখাবে,মত দিখাও মুঝে। আমি সব জানি, জগহ ভি জানি, সব আদমী কো ভি জানি।  আদমী বহোত শয়তান আছে!
--প্রভাত কি বলেছে তোমাকে,সব বলেছে?
-আমি জানতে পারি, হামি আদমী দেখলে বুঝতে পারি,আপনার মুখে দাগ আছে ...উ আমাকে বোলে নাই...আমি নিজে জানি।
-কি জান, তুমি?’ রুক্ষ হয়ে উঠল বিকাশের গলার স্বর।
--এহি,কি আপনার ডর লাগছে আমাকে...আপনি দোস্তকে বিস্‌ওয়াস করছেন না...কাল সুবহ আপনে চলিয়ে  যাবেন, নেহি তো...
-না হলে কি?
কঠিন চোখে তাকাল রুক্মিণী,নহি তো,আমি ধরিয়ে দিবো...
--কাকে চেন তুমি এখানে?কাকে বলবে আমার কথা? তুমি কতদিন এসেছ এখানে, কাউকে চেন, যে তুমি বলবে?’
ক্রুর হাসি হাসল রুক্মিণী,রেল কোম্পানী ঔর ইঁটভাঁটার কাম করে আদমী লোগ সব পাক্কা চোর  আছে। ওহি আদমী সব কে পকড়বার জন্য  লোক আছে সরকার সে, জাসুস জানে আপনি, জাসুস...ওহি কাম করে আমার আদমী,আপনে দোস্ত...ওহ  চোর, ডাকু, বদমাশ  পাকড়ায়...আপনার অগর বিশ্বাস না  হোচ্ছেতো পুছে নিবেন। আমার আদমী  সব চোর-বদমাশ আদমীকে ধরে লিয়ে ঐ দূর ভাঙ্গা ঘর মে ছোড়কে আতে হ্যাঁয়...একেলা...মরনে কে লিয়ে। সব মর যাতা...সব।  খানা নহি,আদমী নহি,পানি নেহি...কুছু না মিলে। বিসোয়াস না হোলে পুছে নিবেন...চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে যায় রুক্মিণী।   

       এ কোন ফাঁদে পা রাখল বিকাশ! দুরের ভাঙ্গা ঘরগুলো যেন  হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে। অন্ধকারের দিকে চেয়ে ঘরগুলোকে আরো দুরের মনে হয়। ধূ ধূ প্রান্তর যেন আরো শূন্য...জনহীন। আবছা অন্ধকারে দিকে চেয়ে নিঃসাড়ে বসে রইল বিকাশ...


অনিমেষ গুপ্ত

কবিতার হিম


      ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে কান্তি ছিল আমার সব চেয়ে কাছের, হয়ত ঘনিষ্ঠতম ।  কোলকাতা ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাক্টরির চাকরি করে কোনমতে বৃদ্ধ বাবা আর নিজের খরচ চালাত কান্তি কিন্তু এই নিতান্ত সাধারণ পরিচয়ের বাইরে কোথাও লুকিয়ে ছিল তার এক কবিতা-পাগল অস্তিত্ব ।  ট্রাম কোম্পানির কাজ আর দুজনের সামান্য রান্না, এছাড়া কান্তির সময় কাটত কবিতা লিখে আর বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় পাঠিয়ে। আমি ছিলাম তার কবিতার অনুরাগী এবং সমালোচক । দু একটা লেখা অনামা পত্র পত্রিকায় প্রকাশ পেলেও কান্তির বেশিরভাগ কবিতাই অমনোনীত থেকে যেত । তবুও তার অস্বীকৃতি আমার মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারেনি আদৌ । আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম তার কবিসত্ত্বার সম্বন্ধে । মনে হত নিশ্চিত একদিন কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কান্তি ।

        নানান উচ্চাশা থাকে মানুষের... অর্থ, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি, সুন্দরী বৌ । কান্তির কোন উচ্চাশা ছিলনা ।    পলেস্তারা খসা নোনাধরা পুরনো বাড়ী আর ট্রাম কোম্পানির চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল কান্তি । ঘনিষ্ঠদের মধ্যে কেবল আমিই জানতাম তার গোপন আশার কথা । নামহীন সামান্য জীবনের ব্যর্থতা কান্তি ঢাকতে চেয়েছিল তার কবিতা দিয়ে ।    
    
         ভবানীপুরে কান্তিদের বাড়ীতে গেলে দেখতাম অন্ধকারাচ্ছন্ন দেড়-তলার বারান্দার একচিলতে টিনে ঘেরা এলাকা । উত্তরদিকের সেই আশ্রয়টুকুতে কেবল দু ইঞ্চি রোদ্দুরের আশায় পুরো শীতটা হাপিত্যেশ করে  বসে থাকতেন কান্তির বাবা । খুব ফর্সা আর রোগা সত্তোরার্ধ এক বৃদ্ধ । কোলকাতার শীতের সঙ্গে এক ভারি অসম যুদ্ধে তাঁর হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে বেঁকে উঠত সময় সময় । আমায়  দেখতে পেলেও কোনদিন কুশল জিজ্ঞাসা করেননি । শুধু বিড়বিড় করে বলতেন, বড় ঠান্ডা, তাই না ! যতক্ষণ থাকতাম ততক্ষণই কান্তিদের আঁধারিয়া বাড়ী, নির্জন স্যাঁতসেঁতে বারান্দার এককোণে বসে থাকা ওর বাবার অসম্ভব শীত কাতরতা এবং কান্তির অস্বীকৃত কবিত্ব... সব মিলিয়ে একটা শিরশিরে ধারণার দিকে ঠেলে দিত আমাকে ।   

ক্রমশঃ আমার বাড়তে থাকা ব্যস্ততায় কান্তির সঙ্গে দেখা করার সময় কমে যাচ্ছিল । বুঝতে পারতাম ভেতরে ভেতরে একা হয়ে যাচ্ছে কান্তি ।  আমি ছাড়া আর কারো কাছেই সে মেলে ধরতে পারেনা নিজেকে। এরই মধ্যে বিমর্ষ কান্তি এক আচ্ছন্ন শীতের দরজায় কড়া নেড়ে ডেকে তুলল আমায় । ভোরের কুয়াশার হিম ঢুকে কান্তির গভীর চোখ দুটোকে অস্বচ্ছ করে রেখেছিল । তার গলার স্বর কেমন যেন আকুল । এক ধরণের আত্মধিক্কার, আক্ষেপ আর বিলাপ মেশান ছিল তার কথায়...   
     
         অনি রে, বড় অন্যায় হয়ে গেল । কী ঝোঁকে যে কাল বলে ফেললাম... বাবা, সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে ওই রোদটুকু আঁকড়ে আছেন, এবার একটু আমার কথা ভাবুন । আমারই বা কি আছে ! ট্রাম কোম্পানির চাকরি, বৌ-ছেলেপুলে নেই । ঝুঁকে পড়ে মাথা রাখার মতো কোন কাঁধই নেই । নিজের বলতে দিনে দিনে অন্ধকার হয়ে আসা এই প্রায় ধ্বসে-পড়া বাড়ী ।  প্রতিদিন রাতের বেলা কিংবা মিইয়ে আসা ছুটির দুপুরগুলোয়  অদৃশ্য ঠাকুর্দা, বড়দাদা এবং আরো অনেকের ফ্যাসফেসে গলার আওয়াজ শুনতে পাই ।  তাঁরা  রোজ বলেন... তোর বাবার কাছ থেকে চেয়ে নে ওই জায়গাটুকু । রোদ্দুর তো তোরও প্রয়োজন ! রোজ রোজ ট্রামের ঘন্টির দড়ি টেনে ক্ষয়ে যাচ্ছিস । এই বাড়ীর ঠান্ডা আর সব প্রকাশ না পাওয়া কবিতার হিম তোর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে একটু একটু করে ।

        বিশ্বাস কর অনি, আঘাত করতে চাইনি শুধু আমার যন্ত্রণাগুলো শেয়ার করতে চাইছিলাম কিন্তু বাবার মুখটা হঠাৎ কেমন কাতর আর ফ্যাকাসে হয়ে গেল । বললেন... আমার বাপ-ঠাকুর্দার কন্ঠ শুনেছো । হয়ত ঠিকই শুনেছো ।  সমাজের না পাওয়ার দলে পড়ি আমরা,  বংশ পরম্পরায় এই রোদ্দুরটুকুই যা হস্তান্তর হয়ে এসেছে এতদিন ।   হয়ত ঠিকই বলেছেন ওঁরা । কথা বলতে বলতে আমার হাত চেপে ধরল কান্তি... অনি, যেতে পারবি আমার সঙ্গে? আজ শেষ রাতে দেখলাম বিছানায় বাবা... একদম  ঠান্ডা।

        কান্তির বাবা মারা গেলেন আর তারপর থেকে কান্তিকে দেখেছি স্বেচ্ছায় ওদের বাড়ীর সেই একচিলতে বারান্দা আঁকড়ে পড়ে থাকতে । আমার জ্যোতিষ্ক চমকাচ্ছিল । পদোন্নতি, বাড়ী গাড়ী, টাকা পয়সা সবই বাড়ছিল সংখ্যায় এবং আয়তনে । কান্তির বসবাস ছিল তার নিজের জগতে । সময় আর ব্যস্ততার চাপে দেখা হতনা তেমন তবে আমি গেলেই চঞ্চল হয়ে পড়ত কান্তি, বলত... আগে বুঝতাম না কিন্তু এখন টের পাই জানিস, এই বাড়ী আর আমার অসফল কবিতাগুলো কি ভীষণ ঠান্ডা ।    


প্রচন্ড ব্যস্ততায় প্রায় বছরখানেক দেখা হয়নি কান্তির সঙ্গে । কান্তি একলাই হোয়াটস আপ করত মাঝে মাঝে ।  এক সকালে কান্তির মেসেজ পেলাম । গোষ্ঠগোপাল দাসের বিখ্যাত গানের এক কলি... বন্ধু, তুমি আসিও খবর পাইয়া । মন আকুলি বিকুলি করে উঠল । পরের রবিবারেই গেলাম । একবছরে কিছুই বদলায়নি । বাড়ীটা সেই একই রকম নোনাধরা, স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা । পড়ন্ত বেলার একতিল রোদ্দুরের জন্য চেয়ার টেনে লড়াই করছিল কান্তি আর ভারি অদ্ভুৎ, অপ্রাকৃত ভাবে কান্তিকে দেখাচ্ছিল ঠিক তার বাবার মতো । চোখের নীচে পুঁটুলির মতো ফোলা আর দুটো ভেতরে ঢোকা, চিপসানো গাল । হাতে হাত ঘষছিল কান্তি আর আঙুলগুলো বেঁকে উঠছিল অবিকল তার বাবার মতো ।  বুঝলাম কান্তি খুবই অসুস্থ । আমাকে দেখে তার মুখে সেই পুরনো অমলিন হাসি । বলল... মেসেজ পেয়ে এলি ? কাল অবধি চালিয়ে নিচ্ছিলাম সব, আজ ভোরে মনে হল বোধহয় সময় হয়ে গ্যাছে ।

       প্রিয়সঙ্গীকে হারানোর সম্ভাব্য বেদনা আমার চোখের জল ঠেলে তুলছিল ওপরে । ফিসফিসে গলায় কান্তি বলল, আমার একটা কাজ করে দিবি অনি ? কান্তি হাফাচ্ছিল, তার চোখদুটো আগের থেকে তীক্ষ্ণ অনেক । একই রকম স্বরে সে বলল, এখন আর কবিতা লিখিনা ।  এখন চোখের সামনে রোজ নিজের নিয়তিকে দেখি । শেষদিন অবধি আমাকে এই বাড়ী আর বারান্দার সঙ্গে লড়াই করতে হবে ইঞ্চি ইঞ্চি রোদ্দুরের জন্য আর আমার কবিতাগুলো ঠান্ডা হয়ে যাবে আরো ।

কান্তির চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি । বলল, সব জেনেও কবিতাগুলোকে প্রাণে ধরে নষ্ট করতে পারিনি । ওগুলো তুই রেখে দিবি তোর কাছে ?  যেকটা দিন আছি ওগুলো থাক তোর কাছে, তারপরে ফেলতে হলে ফেলবি, রাখতে হলে রেখে দিবি এক সামান্য বন্ধুর উপহার হিসেবে । কান্তির কথাগুলো কখনো  প্রলাপ, কখনো রহস্যময় বলে মনে হচ্ছিল আমার । সারাজীবন ধরে কবিতা লিখে স্বীকৃতি না পাওয়া, সামান্য আয়ে মনুষ্যেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হওয়া, অপারগতা আর এক পুরনো বাড়ীর নোনাধরা দেওয়াল, বারান্দার অন্ধকার কোণে জমে থাকা বহুযুগের হিম কি তার মাথার সুক্ষ শিরা, তন্তুর মধ্যে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত করেছে কোনভাবে ! 


এর দুদিন পরে মারা গেল কান্তি । শেষকৃত্য সেরে বাড়ী ফিরতে কান্তির কবিতাগুলোর কথা মনে হল, যেগুলো তার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলাম সেদিন । স্নান সেরে, এককাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসে খুললাম সেই কবিতার তোড়া । 
        বসন্তের হাওয়ায় ছোঁয়াচলাগা উষ্ণতা । কান্তির চলে যাওয়া যেন ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে আমায় । কবিতাগুলো পড়তে পড়তে অনেকদিনের জানা, পুরনো হয়ে যাওয়া একটা সাধারণ প্রশ্ন ধাক্কা দিচ্ছিল  আমার মনে... কবিতা কি বরাবরই মানুষকে এমন পাগল, অহেতুক করে দেয়! ছাড়াও যায়না আবার ধরে থাকাও যায়না !   

       চা শেষ । ব্যালকনির থেকে বয়ে আসা হাওয়া যেন শোক ভোলানোর প্রলেপ দিচ্ছিল আমার শরীরে, হঠাৎই মনে হল এক অচেনা হিম স্রোত যেন কবিতার পান্ডুলিপি থেকে বেরিয়ে আমার হাত বেয়ে কাঁধ, কাঁধ বেয়ে গলা আর বুকে ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ ।