গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

মঙ্গলবার, ১২ জুন, ২০১২

দুটি গল্প - কাশীনাথ গুইন ও সীমা ব্যানার্জী রায় এবং একটি রম্য রচনা - রেজওয়ান তানিম


নবজীবন
কাশীনাথ গুইন
                                           (১)

সমুর জীবনে আচমকা ধ্বস - ভূমিকম্পের পর যেমন হয় আর কি । বাড়ীর উৎসাহে ছোটবেলার খেলার সাথী সুমি যেদিন ওর ঘরণী হয়ে গেল তার তিনদিন পরে ওর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হল। বারো ক্লাসের রেজাল্টের আগেই একটা চাকরী নিয়ে সমু শিল্পাঞ্চলের মেস বাড়ীতে উঠল। সারা সপ্তাহের ক্লান্তি ভুলে যেত সমু যখন শনিবারের রাতে সুমির মুখটা তার পাঁজর ভিজিয়ে দিত। মেসের ছাদে বসে  লুকিয়ে লেখা কথামালা সুমির হাতে গচ্ছিত রেখে নির্ঘুম ভোরে বেরিয়ে আবার কাজ আর মেস জীবন। আটবছুরী এই জীবনে সুমির চাপাকান্নায় বাধানো রোগটা তাকে পৌছে দিল শিল্পাঞ্চলের হাসপাতালে। রোগমুক্তির কটাদিনের স্বামীসঙ্গ স্মৃতি আঁচলে বেঁধে আবার আগের জীবনে । তিনবোনকে পাত্রস্থ করা,প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়িত্ব পালনের  শপথ পালন করতে সমুর-কেটে গেল আরও সতেরটা বসন্ত । বাবার মৃত্যুর পর মা আর ছোটভাইকে নিয়ে বাসা-ভাড়া করলো। দুবছর পর সুমিকে আর ছোট্টটাকে আনল স্কুলে ভর্তির জন্য। আর দুবছরের মাথায় আর একটা ছোটু এলো । জীবনের স্বাদ বদলে গেল যান্ত্রিক জৈবিকতায়। কর্তব্যের জালে আটকে ভালবাসার হাসফাঁসুনী শুনতেই ভুলেছে ওরা। দামোদরের অনেক জল লোণা সাগরে মিশলো। চুলের রূপোলী রেখা মন-দুটোকেও মরচেতে ঢাকলো। ত্রিশবছর পাশাপাশি লাশের মত দিনযাপনের গ্লানি ওদের অমোঘের পথেই টেনে নিয়ে যাচ্ছিল । আবার একটা ঝোড়ো হাওয়া- কালবোশেখীর রাতে সমু একটা আশ্রয়ের ঠাঁইয়ের নীচে। বাজ পড়লো কাছেই-হঠাৎ আলোর ঝলকে হাতবাড়ানো দূরে যাকে দেখে চমকে গেল সমু তাকে যেন খুব চেনা মনে হল। আলাপ করিয়ে দিল  ওই আঁধারী দুর্যোগ। তারপর প্রলাপ বাড়তে থাকলো স্বনিয়মে । সুমির অজান্তে সমুর বনলতা মনে হল তাকে। সুমির নিখাদ ভালবাসাকে কণামাত্র অসম্মান না করে সমু তার বনলতার পুজোয় মেতে নিজের কাছে নিজেকে সৎ রাখার চেষ্টা করেলও সময়ের হাতে মুক্তি মেলেনি তার। ছন্দপতনের ধাক্কা দুজনের মনের বরফ গলিয়ে অকাল বন্যায় নদীর কূল ভেঙ্গে,ভাসিয়ে দিল শরীরের মরচেও। ওরা ফিরলো তিন দশক আগের বাসরঘরে মনের দরজা ভেঙ্গে-যেখানে পরে থাকা মালার দড়িতে আবার টাটকা রজনীগণ্ধার নেশা ।
                                   (২)
তিন দশকের জমে থাকা অতৃপ্তি নিয়ে বাঁচার অবসানে জীবনটা বদলে গেল সুমি আর সমুর । প্রৌঢ়ত্বের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ওরা নতুন করে চেনা শুরু করলো একে অপরকে। নিজদের আবিষ্কারে নিজেরাই হতবাক ওরা। মনের জোয়ারে ভেসে যাওয়া দুটো প্রাণ নতুন করে আবার শরীরী আশ্লেষে টের পেলো অনেক না পড়া রচনা ওদের সামনে খোলা পড়ে আছে। রাতের ভেজা রজনীগন্ধায় প্রাণ পাওয়া দুটো মানুষ- মানুষী আজ যেন অন্য কেউ। মনের সাথে পাল্লা দিয়ে ওদের শরীর দুটোও কী বিভ্রমে যেন যতি মনতে চায় না আর - এতদিনের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিতে চাইছে। কোন শাসন-বারণ শুনতে চায়না লাশের বুকে ফোটা ফুলের নেশা। বেশ কটা দিনের এই নেশা ওরা আস্তে আস্তে কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে চেয়েও পারলো কই ! সমু চাইলো এই জিওনকাঠির উৎসের সন্ধান সুমিকেও দিতে । কমা সেমিকোলন সমেত তার বনলতার কাহিনী শোনাতে দ্বিধা আসেনি সমুর নিষ্কলুষ মনে। সুমিও চেনে তার জীবনসাথীর প্রতিটা চুল – ওর মনের কোণে কোন মেঘ না এসেও চোখে বাদল এসে গেল। সমুকে লোহার কাঠিণ্যে বেঁধেও ওর শান্তি মেলে কই । সমু সহপাঠীদের না বোঝা পাঠগুলো যে মুন্সীয়ানায় মগজে পাঠাত সেভাবেই সুমিকেও সেদিন বনলতার পাঠ বোঝাল আরও আত্মার গভীরতায়। এই মনের মানুষ খোঁজার কারিগরদের নানা গাথা গাইতে রাতের চোখেও ঘুম নেই। মেসের ছাদে লুকিয়ে লেখা প্রিয়া বিরহের কাব্যর পাশাপাশি আরও কিছু লিখতো সমু – বেতারের প্রাত্যহিকীতে সেরার শিরোপাও ওকে ধরা দিত। সেই চুকে যাওয়া নেশায় শান পড়তে শুরু হয়েছিল বনলতার পাঠশালায়। সুমির আব্দারে এবার পদ্য ছেড়ে কঠিন গদ্যে হাত দিতে হল সমুকে – লিখতে হবে পিছন পথের পাঁচালী। জানিনা সে নির্বাক চ্যাপলিনী ছায়াছবির দিশা কি হবে 


                                   (৩) 
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় সুমির মনে পড়লো তাদের গ্রামের বাড়ির কথা। গোধূলীতে পাড়ার মেয়ে বউরা দল বেঁধে পুকুড় ঘাটে গিয়ে মনের কথা উজাড় করে গায়ে ঢলে পড়তো একে অপরের। তখন সপ্তহান্তে বাড়ী ফেরা সমুটা ওর অপেক্ষায় ছটফট করতো ঘরে। তারপর আঁধার নামা তক জল তোলপাড় করে দেহমন শীতলতায় ভরিয়ে ফিরে এসে রবিবারের সন্ধেগুলোর কথা আজও তার মনের মণিকোঠায় সযত্নে লুকোনো। ঘরে ঢুকতেই সমু ওকে বুকের আড়ালে লুকিয়ে ফেলতে চাইলে জালে পড়া মাছের মত ও ছটফট করেও নিজেকে ছাড়াতে পারতো কি। ওই সুখটুকু সম্বল করেই তো সপ্তহের বাকী দিনগুলো মনের অতলে শরীরের চাওয়াটাকেও বলি দিতে হত তাকে। এমনি করেই তার সতেরটা বসন্তের বলিদান আজ আর ও মনে রাখতে চায় না। কদিন আগে দুজনের দুজনকে আবিষ্কার ভুলিয়েছে মরা ইতিহাসের ক্লান্ত শোক। নতুন করে স্বামীর ভালবাসা জিতে সুমির আব্দার বেড়ে গেল অনেকটাই। সমুকে আরও নিবিড় করে পেতে চায় তার মন। বাঁধা গণ্ডীটা ছাড়িয়ে দূরে কোথাও ছুটে পালাতে চাইছে সে এখন। সেকথা বলার অপেক্ষায় সারাটা সপ্তাহ সেই পুরোনো অভ্যেসে পার করে রবিবারের বিকেলে তেমনি করে গা ধোওয়ার কথা মনে পড়লো সুমির। পুকুরঘাটের অভাবটা তাকে চানঘরেই মেটাতে হল। ফিরতেই সমুও হারয়ে ফেললো নিজেকে সেদিনের মতই। না, আজ আর সুমি জালে ধরা দিল না সেদিনের মত। সমুকে বলে উঠলো---আমার কিছু কথা আগে শোনো তুমি । বলনাগো যা বলার। ---কথা দাও রাখবে।
বলেই দেখোনা গো। না আগে কথা দাও।--বলনা সোনা। আমি আর পারছি না গো। কথা দিয়ে কবে রাখিনি বলো তো সোনা। জানি তো তুমি খুব মন কাড়তে ওস্তাদ। কথা না নিয়ে আর ছাড়বো না কখনও - মনে থাকে যেন। বেশ বাবা। এবারতো বল। আমাকে একটা জয়গায় নিয়ে যেতে হবে,যাবে তো। কোথায় যাবে বলই না।সে আমি কী জানি। তুমিই বলনা- শুধু তুমি আমি কটা দিন নিজেদের মাঝে লুকিয়ে থাকতে চাই। যাবে নিয়ে।নিশ্চয় নিয়ে যাবো। কবে যাবে কোথায় যাবে বলনা। না না,ওসব আমি জানিনা- তোমার দায়িত্ব সব,তুমিই করো। বেশ সোনা তাই হবে। এখন আমার পাওনাটা তো আগে মেটাও। পাওনা মেটাতে সমুর দুহাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে সুমি হারিয়ে ফেললো নিজেকে…হারিয়ে ফেললো না হারিয়ে গেল কে জানে…..
                                             (৪)

রবিবারের সকালটা সমুর বাজার-ঘাটে যথানিয়মেই কেটে গেল। জমিয়ে দুপুরের ভোজপর্বের পালাও চুকলো বেশ। বিকেলে সুমি চানঘরের পালা চুকিয়ে আয়নার সামনে সেই যে বসলো ওঠার আর নামটি নেই। অধৈর্য সমু অকারণ পায়চারীতে অনেকবার সামনাসামনি হয়েও সুমির মুখোমুখি হতে পারলো না। চুঁইয়ে –পড়া  বিকেলের রোদটাও ফ্ল্যাট বাড়ীটার ওপারে লুকিয়ে গেল তবুও সুমির মুখ আঁধারী আয়নার মুখোমুখি বসে –কোথায় হারালো সে! সমু এই প্রথম এমন দৃশ্যের মুখোমুখি। না ডেকে পারলো না আর…..এই – একটু চা খাওয়াবে। নিরত্তর সময়টা কালবোশেখীর পূর্বাভাসের মত মনে হলেও কারণটা সমুর বোধগম্য হল না। এই কদিনে ওদের সম্পর্কের জোয়ারে এমন অচেনা ভাঁটার মুখোমুখি হওয়াটা মনে কুডাক দিল সমুর। অন্য রবিবারে এই বিকেলী প্রসাধনে ও সুমিকে যে জ্বালাতনটা করতো সেটাই বা আজ গেল কোথায়! সুমির পিছনে দাঁড়িয়ে আলতো করে ওর কাঁধে হাত রাখল সমু ,বন্দী করতে দ্বিধা এল কেন সেটা ও নিজেও বুঝলো না। মুখের সামনে এসেও ঠোঁটের সমনে গিয়ে থামল কেন ! দুটো পাহাড়ী চোখে অকালবর্ষার প্লাবনে ঠোঁটের কূল যে ছাপিয়েছে তখন। কিন্তু কেন ? না,আর উত্তরের অপেক্ষা নয় – বুকের খাঁচায় বন্দী সুমি ফুঁপিয়ে চলে আর পাঞ্জাবীর পর্দা পেরিয়ে তা সমুর অন্তস্থলে আছড়ে পড়ে। কেমনে রোধ করবে এ জলধারা ভেবে না পেয়ে সমু ঠোঁটদুটোই সম্বল করল । অনেকটা সময় বাদে
সুমির ভেজা গলাটা ককিয়ে ওঠে….কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না বলো। -বলো-বলো । ….আবার ওর গলা ভিজে গেল। সমু কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। বিছানায় টেনে তুলল সুমিকে। আদরে সোহাগে শান্ত করে যা জানলো তাতে অবশ হয়ে পড়লো নিজেই। একটা চিঠি যা প্রাপকের কাছে না পাঠিয়েও রেখে দিয়েছিল সেটাই এই ছন্দপতন এনেছে। চিঠিটা এমন ঘটাবে এমনটা ভাবনি কখনও সমু। আজ রাতে জল অনেক গড়াবে ভেবেই সমু নিজেকে এখন একটু গোছাতে বসল একাকী আঁধারে ….
                                    (৫)  

রাত বাড়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে সমুর কপালের ভাঁজও। একটু পরেইতো কথামত সুমিকে ওই গোপন চিঠির ব্যাখ্যাটা শোনাতে হবে। কি বলবে এখনও তো কিছুই ভাবা হল না। অস্থির সমু ছটপট করতে করতে পাড়ার মোড়ের দোকানে গিয়ে বহুদিন পর একটা সিগারেট ধরিয়ে বসল কালভার্টের শানে। ভাবতে ভাবতে আঙ্গুলে ছাঁকা লাগতে হুঁশ ফিরল – সমাধান মিলল না। কি সাফাই দেবে সুমিকে ওই গোপন চিঠির। শুধু বনলতাকেই জানাবে ভেবে চিঠিটা লিখেও তা আর পাঠায় নি – কাউকে বিড়ম্বিত না করার জন্যই চেপে গিয়েছিল কিডনির অসুখটা। কিন্তু এখন কি করে ও।সুমি হেঁসেলের কাজ সেরে মুখে আঁচল ঘষতে ঘষতে ঘরে ঢুকে বরকে পাথরের মত বসে থাকতে দেখে একটু অবাক হল বৈকি !যে মানুষটা ওর কাজ শেষ হতে তর দেয় না সে যেন এতদিন ওকে দেখতেই পায়নি। হলটা কি !..কিগো কোথায় হারালে তুমি । ফাঁকি দেওয়ার মতলব করছো বুঝি – আমাকে ফাঁকি কোনদিন দিতে পেরেছো তুমি।
সেই আঠার বছরে বেঁধেছি তোমায় – আর আজ দেবে আমাকে ফাঁকি। ভাবলে কি করে।
নিরুত্তর সমু তাও। সুমি ছদ্ম রাগে সমুকে ধাক্কা দিতে গিয়ে নিজেই ধাক্কা খেল। সমুর দুচোখে বন্যা দেখে চমকে উঠল সে। কোন কথা না বলে একগোছা প্রেশক্রিপশান সুমির হাতে তুলে দিল। ভাল কোন কিডনি হাসপাতালে যওয়ার পরামর্শও সাথে। হতবাক সুমি সব বুঝে জড়িয়ে ধরলো সমুকে বুকের মাঝে –এতদিন যে নিজেই আশ্রয় খুঁজত কারও আড়ালে সেই হয়ে উঠল আশ্রয়ের আধার। মেয়েরা আর মায়েরাই বোধহয় পারে এমনটা।আরে ! বোকার মত করছটা কী, আমি আছিনা –কিচ্ছু হয়নি তোমার। কথা দিয়েছ না বেড়াতে নিয়ে যাবে,কালই টিকিট আনা চাই –ভেলোর যাব আমরা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা কর। বলেছি না আমরা কটাদিন একা কাটাব। যাও চোখ ধুয়ে এসে পুরুষমানুষ হওগো বীরপুরুষ। আমাকে আর রাগিয়ো না কিন্তু। রাত জাগতে পারবো না আর।অবাক সমু কলঘরে গিযে ভেবে পেল না একোন সুমিকে দেখল আজ। কত ভুল ভেবেছে ও। সুমির মধ্যে কত অভাবই না দেখেছে এতদিন। অতৃপ্তি নিয়ে খুঁজে বেরিয়েছে মনের মানুষ – বনলতাকে । মরূদ্যানের আশায় মরুভূমির তৃষ্ণায় কাঁটাগাছ চিবিয়ে দুই কষ বেয়ে ঝরা নিজের রক্তকে পান করে তৃষ্ণা মিটিয়েছে। কেমন সব ভোজবাজীর মত মনে হল ওর।

(৬) 
ভোজবাজিইতো! কোন যাদুতে সুমি এতখানি মনের জোর পেল তা ভাবার সুযোগও পেল না সমু। সুমি টানতে টানতে বরকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে রাতের রজনীগন্ধ্যা সেজে আবেশে ঘুমের দেশে পৌঁছে দিল। আর নিজেকে আটকাতে পারলো না সুমি। এতক্ষণে বুকের উপর চাপানো পাষাণটা নামানোর অবসর পেল যে – পাষাণের স্নেহধারা তুষারের বিন্দু হয়ে দুগাল বেয়ে যেন সিন্ধু হ’ল । গুরু গুরু গর্জন আটকানোর উপায় ওর ছিল না। ভগবানের কাছে দরবারে বসল সে। ফোঁপানো স্বরটা আস্তে আস্তে গর্ভিণী সাপিনীর মত তীব্র জিঘাংসায় জ্বলে উঠতে চাইল।..ওগো ভগবান, তুমি যে দয়াময় এই কি তার প্রমাণ দিলে। দায়িত্ব-কর্তব্যের এতগুলো বছরেও কি তোমার পরীক্ষা শেষ হল না। আজ যখন বুকের ধন ফিরে পেলাম তখন আবার খেলতে চাইলে আমার সাথে। আমিও দেখবো – আর সইবো না। ভেব না। চোখের জ্বলের পূজো আর তোমার জন্য নয়। এসো তুমি – আজকের আমি আর তোমাকে…শুধু তোমাকেই নয়, ভালবাসার কোন শত্রুকেই ভয় পায় না। এই লড়াইটা আমি একাই লড়বো দেখে নিও তুমি।
চোখের জল শুকিয়ে যেতে নিজেকে নিজেরই অচেনা মনে হলেও খুব সুখী আর সাহসী মনে হচ্ছে সুমির। এইলড়াইটা লড়তে নেমে আজ ওর নিজেকে একটা আস্ত নারী মনে হ’ল। ভাবতে অবাক লাগে ওর এতদিনের লজ্জাবতীর মত ভালমন্দ না বুঝেও চোখ বুজে ফেলার সেই মন্দ স্বভাবটা। তাই কী এতদিন ও সমুকে কাছে পেয়েও এতটা নিজের ক’রে পায় নি। নিজেই টের পেয়ে গেল সমু কেন মনে মনে রাতের আঁধারে তার মানসী, তার বনলতার খোঁজে পথ হাঁটতো দারুচিনি দ্বীপের ভিতর। ওর এই আত্মদর্শনে মনের মেঘ পালকের মত উড়ে যেতেই ঝলমলানো আলোয় নিজেকে গন্তব্যের পথে হাঁটতে দেখলো আজ।
সুমির কাছে এখন উত্তরটা চোখের সামনে। নারী-পুরুষের একে অপরকে বুঝতে ভুল হওয়ার কারণ বোধহয় এটাই – নিজের আসল চাওয়া পাওয়া সমেত আস্ত নিজেকে খুঁজে না পাওয়া আর তার জন্য যে ব’সে আছে তার ডালির ঢাকনাটা সরাতে না পারা। পর্দাটা সরেছে বলেই না আজ ও এত সাহসী। এতদিন বেকার কষ্ট পেয়েছে নিজর ভালবাসার মানুষটার কাছে নিজেকে অ-দামী দেখে। মনে হত ওকে তরল ভেবে এপাত্র্ ওপাত্রে ঢেলে পরখ করছে পুরুষটার কঠিন প্রাণ। আজ বুঝলো বেচারা ওর কঠিন খোলটা ভাঙ্গতে পারেনি বলেই দেওয়ালে মাথা ঠুকে নিজেকে রক্তাক্ত করে এই কঠিন রোগটা বাধিয়েছে। আজ তাই প্রায়শ্চিত্তের এ লড়াইয়ে উড়িয়ে দেবে সব ছাই – আনবেই মেঘের ফাঁকের রোশনাইটার ঘাড় ধরে।
                                               (৭) 

সকাল সকাল উঠেই সুমি আজ স্নান সেরে এলোচুলে পিঠে ভরিয়ে রান্নাবান্নায় বসেছে। এ কাজটা সেরে সমুর অফিসের খাবার রেডি করে আজ নিজেই রিজার্ভেশানের পাটটা চুকিয়ে আসতে চায়। আর কোন বোঝা চাপাতে চায় না সমুর কাঁধে। কাজ ভাগাভাগির এই দায়টা আরও আগে নিতে চাইলেও পারেনি নিজের উপর বিশ্বাসের অভাবে। আজ ওর সেই সাহসের অভাবটা ঘুচেছে। রান্নাবান্নার ঝক্কিটা সামলানো হল তাও উঠতে না দেখে সমুর ঘরে ঢুকে ওর কপালে হাত রাখতেই সুমি আটকে পড়ল
বরের খপ্পরে। .. জেগে জেগে আর কড়িকাঠ গুণতে হবে না – যাও মুখ ধুয়ে চা খেয়ে উদ্ধার কর। বাসিমুখের প্রেম আর ভাল লাগে না বাপু। আমার কাজ আছে মেলা।অগত্যা সমুকে উঠে বেরোতে হল। সুমি খাবারদাবার সাজিয়ে ঢাকা দিয়ে বেরোনোর সাজে। অফিসের প্রস্তুতি নিয়ে সমু খেতে বসে বউয়ের সাজ দেখে জিজ্ঞাসার চোখে তাকল। ..আমায় একটু বেরোতে হবে। একসাথেই যাই চল।
সমু আর প্রশ্নের অবকাশ পায়নি। বাসন গুছিয়ে রান্নাঘরে গেল সুমি তাড়াহুড়ো নিয়ে। সমুকেও বেরোনোর তাড়ায় চুপ করতে হল। দুজন একসাথে পথে হাঁটল নির্বাক ছায়াছবির চরিত্র হয়ে। বাস ধরে দুজনে দুরাস্তায়। রাতে খাওয়ার পর সুমির বেরোনোর কথাটা জানার চেষ্টা করার কথা ভেবেছিল সমু। হাত ধুয়ে আসতেই টেবিলের খামটা নজরে এল। খুলে দেখে দুজনের ভেলোর যাওয়ার টিকিট। অবাক হওয়ার তখনও কিছু বাকী – সুমির হাতের দিকে তাকয়ে। অদৃশ্য বালাজোড়ার ইতিহাস এতক্ষনে মাথায় এল সমুর। টাকার জন্য দেরীর ব্যাপারটা টের পেয়ে শখের গয়না এমেয়ে এমনকরে বিসর্জন দেবে সমু ভাবেনি।
মেয়েরা কখন কি ঘটাতে পারে তার আন্দাজ পাওয়া বুদ্ধিমান পুরুষেরও ধারনার অতীত – ভেবে নিজের অক্ষমতা – আর্থিক পরাধীনতার গ্লানিতে দগ্ধ হতে থাকল। অফিসে পি.এফ. অ্যাডভ্যন্সের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার কথাটা জানাতে ওর বেধেছিল। আন্দাজে কিছু বুঝেই সুমি কাণ্ডটা ঘটিয়ছে তা বুঝল। কতখানি মনের টান থাকলে মেয়েরা এমন করে তা আজ ওর বোধের দুয়ারে কড়া নাড়তেই মোচড় খেয়েও মনটা আনন্দ আর ভালবাসায় চোখ ভিজিয়ে দিল। রাতের রজনীগণ্ধ্যার ভিজে মিষ্টি গন্ধটার অপেক্ষায় সমু জানিনা আর কত রাত জেগে রইবে।
                               (৮)
ভোরে উঠেই আজ সমু কলকাতা বেরিয়ে গেল অফিসের কাজ আর টুকিটাকি কেনাকটার জন্যে-বাইরে বেরোনার তাগিদে। মনটা কিছুতেই সুমির গয়না বেচে বাইরে বেরোনোর খরচ জোগাড়ে সায় দিচ্ছে না । এখন আর ভেবে লাভও কিছু নেই – অগত্যা কর্ত্রীর ইচ্ছায় কর্ম ।সমু সব কিছু মিটিয়ে রাতে বাড়ী ফিরল ক্লান্ত হয়ে । সুমিও ওকে আজকের মত বিশ্রামের সুযোগ দিল । কাল সকালের জন্য মনটকে বেঁধে রাখল সে।সকালে সুমির জলখাবার তৈরীর পর সমুকে ডাকার কথা মনে পড়ল।সমু তখনও বিছানায় শুয়ে-গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠল সুমি।গা যে জ্বরে পুরে যাচ্ছে একেবারে,সাড়াও দিল না সে।
পাড়ার ডাক্তারকে খবর পাঠিয়ে মাথায় জলপটী দিতে শুরু করল সুমি। ডাক্তারবাবু এসে কিছু ওষুধ আর পরীক্ষার প্রেস্ক্রিপশান লিখে গেলেন। পরীক্ষাগুলো করিয়ে সন্ধেবেলা রিপোর্ট দেখাতে গেল সুমি। রিপোর্ট দেখে ভ্রু কুঁচকে ডাক্তারবাবু সমুকে কলকাতার ভাল কোন কিডনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন দ্রুত।
পাড়ার ছেলেদের সাহায্যে দক্ষিণ কলকাতার এক নামী প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করে জানতে পারল ডায়ালিসিস্ শুরু হবে তখনই,রোগীর অবস্থা যে সুবিধের নয় তাও জানিয়ে দিল তারা।
সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালে জানতে পারা গেল রোগীকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। সারাদিন পরিস্থিতি একই থাকল-করার মত বিশেষ কিছুই নাকি নেই। তবু আশার খুঁটি শক্ত করতে সুমি ছুটল কালিঘাটের মায়ের কাছে-তখনও ওর বুকভরা আশা, ওর ভালবাসা এমন করে শেষ হতে পারেনা।
কাল সন্ধে থেকে জল পর্যন্ত মুখে তোলেনি বেচারী।মায়ের প্রসাদ স্বামীর মুখে দেওয়ার পর তা মুখে দেবে ভেবেছিল কিন্তু পারমিশন মেলেনি। অনেক কষ্টে প্রসাদী ফুলটুকু মাথায় ছোঁওয়াতে পারল। একরাতেই সমুর মুখটা কেমন অচেনা মনে হল। তবে কি ওদের ভালবাসা ফিরে পাওয়ার এই পর্বটাই অভিশপ্ত!
পাড়ার ছেলেদের জেদাজেদিতে একটু জলমিষ্টি মুখে দিয়ে দিনটা কাটল সুমির। আর বেশী অপেক্ষা করায়নি সমু। সন্ধের শাঁখ এখানে শোনা গেল না। ডাক্তারের মুখের শেষ খবরটা শোনা গেল তখনই-রোগী আর বেঁচে নেই। অনেক দেরিতে না আনা হলে হয়তো বাঁচানো যেত। সুমি কি করে বোঝায় যে পাশে থেকেও সে বোঝেনি যে লোকটা এমন ভিতরে ভিতরে শেষ করে ফেলেছে নিজেকে। এমনি করে বিনা টিকিটেই সে কোন নতুন দেশে চলে যাবে একা তবু তার গয়নার বিনিময়ে তাকে সাথে নেবে না। এ
অভিমানের মানে খুঁজবে সে এখন বাকী জীবনটা ধরে।

এয়ারপোর্ট
সীমা ব্যানার্জী রায়


           
‘এয়ারপোর্ট’ -এই কথাটার মধ্যে যেন একটা বিষাদ আর আনন্দ-এর ছোঁয়া লেগে থাকে। আজকাল আর লোপা দেবীর এই এয়ারপোর্ট নামের ওপরে একটা হতাশা এসে গেছে ।  নামটা শুনলেই একটা মাইল্ড স্ট্রোক-এর মতন হয় । অথচ আগে কি ভালই না লাগত । যখন প্রায়-ই এখানে ওখানে যেতে হত স্বামীর সাথে । ১৯ বছর বিদেশে কাটিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন । কোলকাতায় ম্যান্ডেভিলি গার্ডেন্সে একটা ২রুম ফ্ল্যাট কিনেছেন । বিদেশেই আছে দুই ছেলে আর ৩ মেয়ে। তারা পুরোপুরি সংসারী । ওখানে এত বেশী একাকীত্ব সহ্য  করতে না পেরে দেশে ফিরে এসেছেন । আজকাল এয়ারপোর্ট-এ যান প্রধানতঃ দুটি কারণে।  ছেলে মেয়েরা আসে। আবার তারা চলে যায় । যেদিন আসে সেদিন হার্টের কথা ভুলে যান। স্বামীর গায়েও যেন যৌবন ফিরে আসে।  কেউ দেখলে বলবে না  যে, আট বছর আগে তার শরীরের অর্ধেকটা ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। দুজনে মিলে এটা ওটা করেন। আর তিনি ছেলে মেয়েরা ছোটবেলায় কি কি পছন্দ করত তৈ্রী করতে শুরু করেন।  বড় ছেলে চুকচুকে ঘিয়ে ভাজা সুজির বরফি, ছোটছেলে মায়ের হাতের তৈ্রী সাদা চমচম ভীষণ প্রিয় ছিল। এই বয়সেই কলেস্ট্রলের ভয় ঢুকে গেছে তাই এই সব মিস্টি জাতীয় খাবার দাবারআভোয়েড করে। বৌমা নার্সিং-এ স্নাতোকোত্তর তাই চিনির উপর তার কড়া চোখ। মেয়েরাও আজকাল সব কিছুতেই ফ্যাট দেখে। তাও তো মায়ের মন...এ কদিন খেলে কিছু হবে না ভেবে সারাদিন রান্নাঘরে থাকেন।  হার্টের রোগীরা হয়ত বেশিক্ষণ আগুনের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না।  বাড়ির কাজের লোকগুলোকে দিয়ে করানোতে তিনি রাজী নন। ছোট মেয়ের প্রিয় জিনিস চিংড়ি ভর্তা। অনেক করে পেঁয়াজ লবণ ঝাল আর সর্ষের তেল মাখানো ভর্ত্তা । যত ঝাল ততই তার পছন্দ । ভাজা মরিচ আর তেল মেশানো ছোলার চটপটি আবার মেজ মেয়ের প্রিয় জিনিস । বড় মেয়ে আবার মায়ের হাতের এঁচোড়ের চপ খেতে খুব ভালবাসে । একটা হাত একটু অচল হয়ে পড়েছে তাতে কি ? সেই হাতেই তৈ্রী করছেন সব খাবার । চলে গেছেন নিজের  প্রয়াতা মায়ের কাছে । কষ্ট করে মা-ও তো এমনি করে সখের জিনিসগুলো বানিয়ে রাখতেন বিদেশে থাকা ছোটমেয়ের জন্য।

মায়েরা বেঁচে থাকতে তাঁদের কষ্টের কথা আমরা কেউ ভাবি না,মনে মনে বিড় বিড় করে বলে উঠলেন। ছেলে মেয়েরা ঘরে ঢুকতেই চলে আসে যাওয়ার দিনটা।  আসার দিনটা চোখের পলকে আসে না, শুধু যাবার দিনটাই আসে। ওরা বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে দুয়ারে প্রস্তত হয় বিদায় নেবার জন্য। এয়ারপোর্টের বারান্দায় গিয়ে বাক্সবোঝাই গাড়িটা খালি হয়ে যায়। গাড়ী হালকা হয় কিন্তু মনটা হালকা হয় না । মালপত্র চেক-ইন করার পর ওদের সঙ্গে ডিপোর্চার লাউঞ্জএ যান ।  দুবছর আর তিন বছরের দুই নাতি নাতনি সমস্ত লাউঞ্জ দাপিয়ে বেড়ায় । কারুর গায়ে ধাক্কা লাগতে পারে সেদিকে হুঁশ নেই।  মা বাবা পেছন পেছন ছোটে, ঠিক আমাদের মতন । এখন আমরা ছুটতে পারি না, শুধু এই মন, অন্ধ নির্বাক মন, কেবলি ছুটে বেড়ায়।

কিছুক্ষণ পর ওরা সিকিউরিটি চেকের দরজা পার হয়ে হাত নাড়তে নাড়তে ভেতরে
ঢুকে যায়। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন দুজনে, একটা ক্লান্তি আর শূন্যতা ঘিরে থাকে দেহে আর মনে।  জীবনের আরো একটা অধ্যায় যেন শেষ হয়ে যায়। এই শেষ আর কোনদিন পূর্ণ হবে না। এই শূণ্যই থেকে যাবে অনন্তকাল। খালি গাড়িতে দুজণ নির্বাক পুতুল বাড়ি ফিরে আসেন।  মনকে সান্তনা দেন...বিদেশে থাকতে ওরা আসত মাত্র দীর্ঘ উইকএন্ডে । থাকত দু দিন । তাও তো এখানে কিছুদিন থেকে গেল ; অথচ এই সেদিনও বাবা মাকে, শ্বশুর শাশুড়িকে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। যাবার সময় বুকে জড়িয়ে থাকতেন কিছু সময় আর ফেরার সময় মায়ের মুখে আঁচলের খুঁটি আর বাবাকে এড়িয়ে যাওয়া, নয়ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ।  তাদের ছেলে মেয়েরাও এখন ঠিক তেমনি এদিক ওদিক না তাকিয়ে ভেতরে ঢুকেযায় । বিদায়কে বড় ভয় পান আজকাল ।  এই বিদায়-ই সব মা বাবাদের নিয়তি ।  ওরা থাকার জন্য আসে না, ফিরে যাবার জন্য আসে । তারপর একদিন মা বাবা ছাড়াই বাড়ির লোকজনেরা আসেন এয়ারপোর্টে । একদিন আমরাও পারব না আমাদের  ছেলে মেয়েদের আনতে বা বিদায় জানাতে , অনেক আধুনিক হয়ে গেছে আজকের মানুষ ।   আধুনিক হয় না শুধু মায়েরা , বাবারা । তারা সেই একইভাবে এয়ারপোর্টে গিয়ে নিরিবিলি কোনায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন আজও, চোখের জল চোখেই শুকিয়ে যায় ।

রম্য রচনা

দিনান্তে
রেজওয়ান তানিম

ব র্ষা রো হ ণ

                        এখন আমার হাতে তেমন কোন কাজ নেই। বলা যায় একমুঠো নিশ্চিন্ত অবসর। এমন অখন্ড অবসর অমিত বাবুর জীবনে জুটেছিল কিনা নিশ্চিন্ত নই । তাহলে এত ব্যাকুল হয়ে তিনি হয়ত বলতেন না-

দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর !
ভালোবাসিবারে
দে অবসর ।
             এই মুহূর্তে আমার এমনতরো সময় সংকট নেই। আমার মনে নেই কোন অতৃপ্তির বেদনা, কর্মের ব্যস্ত ঘনঘটা। তাই আজ মন খুলে চিৎকার করে গাইতে ইচ্ছা করছে-

আজ বিরাম নেব সকল কিছুর পর
আজকে আমার চির অবসর!
করবো রচন-
করবো স্বপ্নে চয়ন-
ভালবাসার অনন্ত বাসর!

বাইরে বৃষ্টি ঝরছে। একটানা অবিশ্রান্ত বর্ষণ দৃষ্টি সীমায় আঘাত করছে । সবকিছূ হয়ে আসছে ঝাপসা। কিছুটা ক্লান্ত লাগছে, শুয়ে পড়লাম বিছানায়। একটু তন্দ্রামত আসল। আমি হারিয়ে গেলাম স্বপ্নে –ওই সময়ের কোন এক অজানা সাগরে। সে আমায় নিকট অতীতে নিয়ে গেল।
আমি আরো দূরে যেতে চাইছিলাম, কিন্ত সে সায় দিল না। কী আশ্চর্য- এখানেও বৃষ্টি ঝরছে। এখানে আমি - কারও একজনের আগমন অপেক্ষায় কাতর। কার আসবার কথা ? স্মৃতি মিলিয়ে দেখবার আগেই সে এসে গেল। সে আর কেউ নয়, আমার অতি পরিচিত এক সুহৃদ। তার নামটি না হয় অজানাই থাক।আমার সাথে সে গল্পে মত্ত হল। বিষয় অতি সাধারণ-বৃষ্টিতে ভিজবার গল্প। কিন্ত কী মুগ্ধ হয়ে সেদিন তা শুনেছিলাম-সে আজ বুঝতে পারছি।
             বৃষ্টির গল্প শেষ হলে পরে আরো দু ঘন্টা গল্প হল। দু একটা কাজের কথা হলেও বেশিরভাগই গুরুত্বহীন। তবু সে বাদল মুখরিত দিনের আড্ডা আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে রইল।
                                  
পূ র্বা গ ম ন

হঠাৎ করেই কী এক সপ্তসুর কানে মধুর বাঁশরী সুর ঢেলে দিল। ঘুমটা চলে গেল-কিন্তু রয়ে গেল তার মধুর আবেশ। হাতে দিনলিপিটা তুলে নিলাম।হায় ! নিয়তি আজ আমার সাথে এ কী খেলা খেলছে- বুঝতে পারছি না । কতগুলো পাতা নাড়াচাড়া করতেই বেরিয়ে এল সেদিনের অংশটুকু। দেখি তার পাতায় লেখা আছে আমার নিজস্ব কিছু গবেষণা-যাকে পূর্বানুমান বলা যায়-অথবা বলা যায়,মনোবিশ্লেষণ। পাত্র আর কেউ নয়- সেই বর্ষারোহিত ব্যক্তি। ডায়েরীর পাতায় লেখা আছে- ‘মানসিকতা ঝরঝরে বাহুল্যহীন। কথাবার্তা মাপা নয় তবে তাতে কৃত্রিমতার পরিমান খুব কম। চালচলন, ভাবভঙ্গি-আশাব্যাঞ্জক’ ।
             
ওর একটি অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে-হাসি। এটিই তার সবচেয়ে বড় গুন আবার সবচেয়ে বড় দোষ। হাসবার সময় মনে হয় সে জগতের সবচেয়ে সুখী। মাঝেমাঝে অবশ্য তা অনর্থক মনে হয়। তখন এ হাসি সন্দেহের উদ্রেক করে। হতে পারে-এ হাসি পরিবেশকে অতি লঘু করে ফেলে সবাইকে আপন করে নেবার জন্যে, অথবা সবার আপন হবার এ এক নিগূঢ় পন্থা। যাই হোক, আমার অবশ্য ভালোই লাগল ব্যপারটা। হোক না এ তার দোষ- অনর্থক হাসি। সেতো হাসি,কান্নাতো নয়। তাই সে শুদ্ধ। এমন দোষ থাকলেও ক্ষতি নেই।

আরেকটা কথাও মনে হচ্ছে । ঘুরিয়ে পেচিয়ে না বলে স্পস্ট করে সোজা বাংলায় বলি- যাকে বলে, জাতে মাতাল তালে ঠিক। অবশ্য তার একটা ব্যাপার আমার কাছে স্পস্ট নয়। সে হল তার প্রকৃতি। সেকি পর্বতের মত অটল,বজ্রের মত নিষ্ঠুর; না কী নদীর মত শান্ত,সাগরের মত বিশাল তার হৃদয়। এ বিষয়ে আমি দ্বিধান্বিত।”
               -মন্দ নয়। আমার মন হেসে উঠল কল্পনার সফলতার মধুর জয়গানে। নিজের সঙ্গে নিজেই রসিকতা করলাম- বোধহয় জ্যোতিষী নেমে পড়লেও খারাপ হয় না ।

চ রি ত্রা ব লী

            ডায়েরীর পাতা বন্ধ করলাম। আজকের বাদল দিনে একটা গান না হলেই নয় । স্টস্টিরিওতে ছেড়েদিলাম গান। বিশুদ্ধ বর্ষার গান-
                   
এই বাদলের দিনে
দাড়াও না হয় নিভৃত বাতায়নে;
খুঁজে পাবে আমারে,
ঝড়ো হাওয়ার স্পন্দনে, ঐ বাহুডোরে।
ছুয়ে যাব মনের মিনার
হব বাদল কিনার!
    
                
গানের সুরে আমি হারিয়ে গেলাম দূরে বহুদূরে। সেখানে কোন এক মেঘরাণী আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। সে আমার সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দেবার কথা বলছে। কিন্তু তার আগেই চলে এল তেজোদীপ্ত সূর্য। ভীষণ বেরসিক সে। অমিত তেজ তার । তবু বিন্দুমাত্র সময় অপরের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয়। আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল। ইত্যবসরে সে চলে এল।          
           
এসেই আমার হাতে একগোছা কদম ধরিয়ে দিয়ে বলল, শুধু কী জলে ভিজলেই হবে, বর্ষার প্রতীক এ কদম দানা লাগবে না ? আমি হেসে উঠতেই  সেও হেসে দিল। এরপর বদলে দিল গান –

তোমার দুয়ারে এসেছি প্রিয়তম,
হাতে ধরা সিঁদুর মম
রাঙাবে ঔ সিথির কেশরী ,
আমি বাজাব বর্ষার বাঁশরী।
তোমার হাতে নীপবিথীকার মালা  
দুলিতেছে আনমনে, ভুলিতেছে সুরবাণী।
           
আমি অবাক হয়ে গান শুনছিলাম। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অনুভব করলাম- কী ভীষণ মায়া তাতে! আমার ভাবনার জগতে তখন প্রচণ্ড তোলপাড়। সে কে ? কী বলতে চায় সে? কী তার মনের কথা। তার সব কথাই আমার জানা। তবু যেন সব নতুন নতুন মনে হয় ।

আমার মনের কথা বুঝতে পেরে হেসে বলল -আমি কে? তা জানা কী এতই সহজ! দেখ- আজতক আমি নিজেকে চিনিনি। আমি সহাস্যে বলে উঠলাম- কোন মানুষই মানুষকে চিনতে পারে। হয় তুমি আমাদের মানুষ বলে গণ্য করো না, না হয় তুমি মানবের উর্ধ্বে । সে সলাজ কণ্ঠে বলে উঠল – ‘না না, তা নয়। আমি অতি,অতি সাধারণ । তোমাদের তুলনায় আমার স্তর অনেক নীচু। আমায় মানবের উর্ধ্বে বলে অপরাধী কোর না’ । আমি ওর ইতস্তত ভাবটা দূর করবার জন্য বললাম-ওসব থাক। তার চেয়ে আমি তোমায় কেমন দেখেছি তাই বলি। সে হেসে বলে উঠল -বল দেখি। তোমার দেখায় আমি নিজেকে দেখি, তেমার চেনায় আজ নিজেকে আবার নতুন করে চিনি। আমি আবৃত্তি করতে লাগলাম-

অনেক ভাল তুমি,
সুরের মাঝে যেমন সুর সপ্তমী।
কিন্তু আবার কেমন খাপছাড়া-
মানতে চাওনা নিয়ম বাঁধাধরা।
উড়তে চাও নীলাকাশে-
দেখ যেই পাখি-উড়ে আর ভাসে।
কিন্তু ভুলে যাও হায়,
উড়ার ক্ষমতা দেয়া হয়নি তোমায়।
এ নয় দোষ তব-
মানুষ তুমি
কিছু আছে তোমার, কিছু সর্বগামী-
রেখেছে গোপন করে।
আজ তারে-
আনো বের করে।
অগমের পাড়ে-
যাবার মত শক্তি,সাহস-আ
ভালবাসা-ঐ বুকে বারবার
দোল খায়
বান ডেকে যায়-
অনিবার ।
তুমি বড় নিঠুর,
যেন মরু পথ বন্ধুর।
এ তোমার খেলা-
যত হয় বেলা, ভাসাও পাষাণ ভেলা।
তাতে কর যাত্রী-প্রিয় যত মানব তব!
ভাবনাই কোনদিন-
ধরণীর গহীন
ঐ ভবপাড়ে,
কি তোমায় ডাকতেছে হাক ছেড়ে!
আমি বলে যাই-
গেয়ে যাই
গলা ছেড়ে-
ভুলে যাও কল্পিত বেদনারে।
জীবনের স্বপ্ন সুখপাখিরে-
একদিন পাবেই খুঁজে।
তার গানে গানে
বাজবে আমার সুর

ক্ষ ণি ক বি দা য়


সে চলে গেল । যাবার আগে তাকে কিছুটা বিব্রত দেখালো। তার মনে জেগে উঠেছিল কোন এক অজানা বেদনা। সে আমার দিকে চেয়ে ম্লান হাসি দিয়ে বলল- আজ আসি! আমি বললাম,“আবার কবে দেখা হবে?” সে বলল-কি জানি, হয়ত কাল,হয়ত এক হপ্তা বা এক মাস পর।
             
সে আমাকে একা রেখে বিদায় নিল। দীর্ঘ পনেরটি দিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি । রাতে ফোনে কথা হয়নি । এদিকে আমার মন ততদিনে বুঝতে পারল সেই ‘সে’ আমার অস্তিত্বের সাথে কেমন করে যেন জড়িয়ে যাচ্ছে। আমি আর নিজেকে আলাদা করে ভাবতে পারছি না। আমার পৃথিবীতে কিসের যেন একটা ঝড় আসছে। সে ঝড় আমায় উড়িয়ে নিতে যেতে চাইলো। প্রথমে আমি বিক্ষিপ্ত ভাবে বাধা দিলেও পরে আর কোন বাধা দিলেম না। কারণ সে ঝড়ের তোড়ে উড়ে যেতে মন একান্তই চাইছিল । যে ঝড়ে সে দিন উড়ে গিয়েছিলাম- তার নাম ভালবাসার ঝড়। জানি কেউ কেউ একে বাড়াবাড়ি, পাগলামি, খেয়ালি মনের খেলা বলে আঘাত করতে চাইবে। তাতে লেপে দিতে চাইবে অনন্ত রাত্রির কালি। কিন্তু আমি জানি এ ভালবাসা পবিত্র। এর নেই কোন কামনার উন্মাদনা, বাসনার সুরাপাত্র। ‘সে’ আমার অন্তরের প্রবেশ করেছে বিশুদ্ধ ভালবাসা নিয়ে-যাতে মোহ ছিল না। তাই সে ঝড়ে ডুবে গিয়ে কাদঁলাম, আর গাইলাম

কাঁদালে তুমি মোরে-
ভালবাসারই ঘায়ে
নিবিড় বেদনাতে;
পুলক লাগে গায়ে।

প্র ত্যা ব র্ত ন

              আমার বিবেচনা বোধ যত শক্ত ভিতের উপরে দাড়িয়ে থাক না কেন, সেই বর্ষারোহিত ব্যক্তি -আমার ভালবাসার নিষ্ঠুরতার সম্বন্ধে আমি সজাগ ছিলাম না। আর তাই সে সুযোগ পেয়ে গেল। আমায় আঘাত করল। ভালবাসার আঘাত । আশ্চর্য এই- সে আঘাতে আমি কোন বেদনা অনুভব করিনি । কারণ আমি জানি,ভালবাসা বেদনারই আরেক রূপ। যাকে ভালবাসব-তার প্রতি সদা উদ্বিগ্ন থাকাই ভালবাসা। যুগে যুগে পৃথিবীতে যত অমর প্রেমগাঁথা রচিত হয়েছে-সবই সীমাহীন বেদনার ইতিকথা। তাই আমার এই নিগূঢ় প্রেম- সেও নিবিড় বেদনাময় । তাকে এই বেদনার নীলে অবগাহন করিয়ে আমি বেদনাকে কাছে টেনে নিলাম, তার সুখগুলো অনুভব করলাম ।


সে এবার বুঝতে পারল বেদনার ভাষা। আমায় আলিঙ্গণে নিয়ে বলল- আমার ভুলগুলো তুমি ক্ষমা কর । আর কখনো তোমায় ছেড়ে কোথাও যাব না। তোমায় না দেখে থাকা - এ আমার হবে না। কথা দিলাম, আর কোন দিন হারিয়ে যাব না। তোমার পাশে থাকব শেষদিন পর্যন্ত। মৃত্যুর দিনেও আমি তোমার পাশে থাকব- ছায়া হয়ে, পাতা ঝরা বয়েসী কোন অচিন বৃক্ষ হয়ে, গান ভুলে যাওয়া ক্লান্ত কোকিল হয়ে, দলে যাওয়া দূর্বাদল হয়ে, মাড়িয়ে যাওয়া সজনে ডাটা হয়ে, তৃষ্ণার্ত চাতক হয়ে, তোমার এ বেদনার স্বপ্ন গুলো হয়ে।


আমি তখন কিছুকাল আগেই জীবনে আসা সমস্ত বেদনাকে ভুলে গেলাম । আমার কন্ঠ আবার সুর ফিরে পেল। প্রকৃতি যেন আমায় জাগিয়ে তুলবার জন্য তার বৃষ্টিতে রিমঝিম ছন্দের নাচন তুলল। আমি গাইতে শুরু করলাম। সেও আমার সাথে গলা মিলিয়ে গাইল-
আমারে তুমি অশেষ করেছ-
এমনি লীলা তব ।
                                         


বুধবার, ৬ জুন, ২০১২

তিনটি গল্প - আনোয়ার হোসেন /'অটোবায়োগ্রাফি', পারোমিতা চট্টোপাধ্যায় / 'অনামিকা' ) দেবাশিষ দে /'পত্রমিতালি


অটোবায়োগ্রাফি

আ নো য়া র হো সে ন

নীলিমার নীল আর বন-বাদারে ফুটে থাকা অযুত ফুলের পাঁপড়ির রঙে একদিন যাকে সাজিয়েছিলাম – বালিয়াড়ির মরীচিকায় তাকে হারিয়েছি আজ থেকে দু’-দুটি বছর আগে । কিছুদিন আগেও হৃদয়াকাশে ঘন মেঘ ছিলো,গুমোট আবহাওয়া ছিলো, বিষন্ন ম্লান প্রকৃতির মাঝে রিক্ততার দাপাদাপি ছিলো । হঠাৎ কোথা থেকে এক পশলা শীতল বাতাস বিষাদের ঘন মেঘ উড়িয়ে নিয়ে গেলো । গাছ-পালায় ঘন সবুজ ফিরে এলো । দূরে কোথাও শীস দিয়ে গেল বউ কথা কও । এইতো , এইমাত্র আমার ভালোলাগার শুরু হলো । স্মৃতির পাতায় ময়লা জমলেও তার কিছু কিছু অক্ষর নাকি একেবারে অস্পষ্ট হয়ে যায় না । কোনো কোনো ঘটনা স্মৃতিবাহী জীর্র্ন পাতাগুলোর মলিনতা অগ্রাহ্য করে রক্তাক্ত অক্ষরে ফুটে থাকে । সেই শৈশব আর কৈশোরের অবুজ সবুজের অর্ন্তদ্বন্দ্বময় সময়ের হাতছানি দিয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি কিছু বিস্মৃতি আজও আমাকে একাকি কাঁদায়।–আমার ভালোলাগার পাঁপড়িগুলো তখনও বাস্তবের শানানো কষাঘাতে বিদীর্ণ হয়ে যায়নি । কৈশোরের সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাত্রায় হঠাৎ কখন যেন আমার ভালোলাগার সমস্ত আবেশ সদাস চঞ্চলা , হরিনী চোখের একটি মেয়েতে জড়িয়ে গেলো। বয়স আর বুদ্ধির ক্রমবহমানতা আমাদের পৌঁছে দিলো একে অন্যের হৃদয় কন্দরে । কৈশোরের হিরন্ময় সময় চিরাচরিত নিয়মে হাঁটি হাঁটি পা-পা করে আমাদের নিয়ে যেতে লাগলো যৌবনের অজানা বন্দরে। পাশাপাশি উড়ে চলা দুটি পাখি একটি একান্ত ছোট্ট বাসা বাধার বাসনা নিয়ে পেড়িয়ে যেতে লাগলো বিস্তীর্ণ আকাশ । একান্ত চাওয়া –পাওয়া গুলো মিলিত হতে চললো একটি পুস্পিত বিন্দুতে । একান্ত সুখময় অনুভূতি গুলো ছুঁয়ে যেতে লাগলো দু’জনার ছন্দময় জীবনে ।


এমনি করে তীঁর বেগে ছুঁটে চলা দুটি জীবনে হঠাৎ করে রেখাপাত করলো অন্ধকার কালো মেঘ । দৃষ্টি লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে লাগলো । মুহুর্তেই নেমে এলো দূরন্ত বৈশাখি ঝড় । ডানাভাঙা দুটি পাখি পথ হারালো দু’টি অজানা মেরুতে ।হৃদয়ের সমস্ত ভালো লাগার সিক্ত অনুভূতিগুলো যৌবনের তপ্ত মরুর খর-রোদ্দুরে পুড়িয়ে একাকি হাঁটছিলাম । লক্ষ্যহীন,গন্তব্যহীন একটি জীবন এগিয়ে যেতে লাগলো হতাশার মরুপথ ধরে। গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যেতে লাগলো এক কালের সম্বাবনাময় একটি কিশোরের ফেরারি যৌবন। তখন বয়স আর কত হবে এগার কি বারো ! ক্লাশ সেভেনে পড়ি। পাড়া-গাঁয়ের স্কুল হলেও আমার স্কুলটির একটি আলাদা প্রসিদ্ধি ছিলো। প্রতি বছরই এস,এস,সি পরীক্ষায় কেউ না কেউ স্ট্যান্ড করতো । আর আমি সেই ঐতিহ্যবহী স্কুলটির ক্লাশ সেভেনের দুই নম্বর রোলধারী স্টুডেন্ট ছিলাম ।স্কুলটিতে তখন সহশিক্ষা প্রচলিত ছিলো। এখনও আছে।ছোটকাল থেকেই চঞ্চল প্রকৃতির আর বন্ধু বৎসল হওয়ায় প্রায় সকলেই আমাকে চিনতো। আমাদের ক্লাশে ত্রিশ জন ছাত্রী আর পঞ্চাশজন ছাত্র ছিলো। বিরাট ক্লাশরুমে আমাদের ক্লাশ হতো্ । ক্লাশ ওয়ান থেকে এক সাথে পড়ে আসায় ক্লাশের সবার সাথেই আন্তরিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। তখনও কৈশোরের লজ্জারাঙা আভা আদল থেকে একেবারে মুছেঁ যায়নি।


একদিন ক্লাশে একটা ঘটনা ঘটলো। আমি অবশ্য পরে জানতে পেরেছি । ক্লাশের পাঁচ নম্বর রোলধারী মেয়েটির নাম ছিলো উর্মিলা চক্রবর্তী ।তখন বিজ্ঞানের ক্লাশ চলছিলো । আমি মনোযোগ দিয়ে স্যারের লেকচার শুনছি। ক্লাশ শেষে এক বন্ধু আমাকে জানালো উর্মিলা নাকি ক্লাশ চলাকালীন সময়ে আমার দিকে মোট একচল্লিশ বার তাকিয়েছে। বোকা ছেরে বলে ওকে আমি দু’চারটা কানমলা দিয়ে ক্ষান্ত হলাম। কিছুদিন পরে এক বান্ধবী জানালো “ তন্ময় উর্মিলা তোর খুব প্রশংসা করে।” ওর কথা তেমন গায়ে লাগালাম না । মনে মনে কিছুটা লজ্জিত হলাম।বান্ধবীটির নাম মৌটুসি। উর্মিলার ঘনিষ্ট বান্ধবী, দু’জনার বাড়িও খুবই কাছাকাছি । ওর কথায় তেমন পাত্তা দিচ্ছিনা দেখে ও আমার পিঠে খোঁচা মেরে বললো, “জানিস , সেদিন আমি আর উর্মিলা স্কুল শেষে একসাথে বাড়ি ফিরছিলাম।পথে উর্মিলা আমাকে বললো “তন্ময় যখন বাড়ি থেকে মাইল খানেক হেঁটে এসে ক্লাশরুমে ঢোকে, তখন ওর কালো চেহারায় বিন্দু বিন্দু ঘামের ঝিকিমিকি দেখতে খুব ভালোলাগে । ”আমি লজ্জারাঙা হয়ে মৌটুসিকে বললাম “যা ছেমরি !”

সেদিন ছিলো বিষ্যুদবার । স্কুল একটু আগেভাগেই শেষ হলো । বইখাতা বগলবন্দী করে বাড়ি ফিরবো । এমন সময় উর্মিলা হাতের ইশারায় আমাকে কাছে ডাকলো। ততক্ষনে ক্লাশের অন্য সবাই ক্লাশরুম ছেড়ে বাড়ির পানে বেড়িয়ে পড়েছে। ও আমাকে বললো, “ তোর বাংলা বইটা আমাকে একটু দে এক্ষুনি ফেরৎ দিচ্ছি।” আামি বিনা বাক্য ব্যয়ে বইটি কে দিলাম। ও বেইটিকে আড়াল করে তার মধ্যে কী যেনো গুঁজে দিয়ে বইটি বন্ধ করে আমাকে ফিরিয়ে দিলো।বইটিকে আমার হাতে দিয়েই ও কেটে পড়লো।আমার সন্দেহ হলো।ক্লাশরুমেই বইটি খুললাম। দেখতে পেলাম একটি চিঠি আর সদ্য ছেঁড়া গোলাপের কয়েকটি পাঁপড়ি। আমার হৃৎপিন্ডের গতিবেগ বেড়ে গেল। প্রচন্ড তেষ্টা পেলো। এক দৌড়ে স্কুলের সামনের টিউবওয়েলে চাপ দিয়ে দুই গ্লাস পানি ঢক্ ঢক্ করে খেয়ে নিলাম্ । বাড়ি ফেরার পথে কয়েকবার আছাড় খেয়েছি। পথে এক মুরুব্বী জিজ্ঞেস করলেন,” কিরে তন্ময় তুই অত দ্রুত বাড়ি ফিরছিস ! বাড়িতে কিছু হয়েছে নাকি ?  আমি বললাম না চাচা, এমন । “বাড়ি এসে আমার রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক্ করে এক নি:শ্বাসে চিঠিটা পড়ে ফেললাম।পর পর দশ বারো বার পড়লাম । আরও পড়তে ইচ্ছে হলো। হঠাৎ কেমন এক অজানা শিহরন আমার সমস্ত অস্তিত্বে ঢউ খেলে গেল। আমি না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম্ । স্বপ্নে দেখলাম,  দু’জন পাশাপাশি বসে গল্প করছি। পেছন থেকে স্কুলের সবচেয়ে কড়া শিক্ষক নরেন বাবু আমার কান টেনে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “এই ছেলে এখানে কী হচ্ছে ? চলো লাইব্রেরিতে চলো , তোমাদের বিচার হবে।” আমরা দু’জন স্যারের পায়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। দুপুরে খাওয়ার পর মা পাশের রুমে ঘুমুচ্ছিলেন। আমার কান্নার শব্দ শুনে উঠে পড়লেন। বাইরে থেকে দরজা ধাক্কা দিয়ে জোরে জোরে বলতে লাগলেন , “ কিরে তন্ময় , কাঁদছিস কেন ?দরজা খোল ।” মায়ের ডাকাডাকিতে আমার ঘুম ভেংগে গেল। দরজা খুলে দিয়ে মায়ের সামনে বোকা বনে গেলাম। শণিবার একটু আগে ভাগেই ক্লাশে গেলাম দেখলাম সবেমাত্র দশ-বারো জন ছাত্র-ছাত্রী ক্লাশে এসেছে।


আমার চোখ বা্র বার ও কে খঁজে ফিরছিল। বন্ধু বান্ধবীরা আজ আমার চোখে কী যেনো দেখতে পেলো।আজ আমার স্বভাব সুলভ চঞ্চলতা নেই। অন্য যে কোন দিন হলে ক্লাশে ঢুকেই বেঞ্চে থাপ্পড় মেরে সবাইকে জিজ্হেস করতাম,” কীরে ক্যামন আছিস সবাই ?” আজ তেমন কিছুই করছি না । ক্লাশের পেছনে একটি সিট নিয়ে নিরিবিলি বসে আছি।আমার এমন দূরবস্থা দেখে এক সহপাঠী কৌতুকের সুরে জিজ্ঞেস করলো , কিরে তন্ময় ,একেবারে চুপচাপ; আলমারি থেকে টাকা চুরি করে আজও খালাম্মার মার খেয়েছিস ?!” আমি একটু হাসলাম মাত্র। কিছুক্ষন পরে উর্মিলা ক্লাশে ঢুকলো। ওর দিকে ক্যানো জানি তাকাতে পারলাম না।ক্লাশে মুখ নিচু করে বসে রইলাম। মনে হতে লাগলো “ কে যেন আমার হাতে-পায়ে শেকল পড়িয়ে দিয়েছে। আমি ইচ্ছে করলেই নড়ে-চড়ে বসতে পারিনা। কারো দিকে তাকাতে পারিনা। কিংবা স্বভাব সুলভ ভংগিতে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারিনা ‘আজ মানিক মিয়ার বেলগাছ থেকে ক’টি বেল চুরি করেছিস ? “স্কুল ছুটি হলো । আমি আনমনে বাড়ির পাণে হাঁটছিলাম্।ক্লাশে বসে বার দুয়েক ওর দিকে তাকাতে গিয়েও চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি।আর লক্ষ্য করেছি , আজকে ও অন্যদিনের মতো চঞ্চলা নয়।কতদূর বাড়ির দিকে এগুতেই দেখলাম,মৌটুসিকে নিয়ে উর্মিলা আমার বাড়ি ফেরার পথের কিছু দূরে দাড়িয়ে আছে। ওদের দেখেও না দেখার ভান করে হন হন করে ওদের অতিক্রম করে যাচ্ছিলাম্।পেছন থেকে মৌটুসি ডাক দিল, “ এই তন্ময় , শোন।” আমি দাড়ালাম । দূরে একটি নির্জন যায়গার ইংগিত করে ওরা দু’জন আমার আগে আগে হাঁটতে লাগলো। আমি ওদের অনুসরন করলাম্ । কিছুদূর গিয়ে ওরা থামলে আমি জিজ্ঞেস করলাম,কিরে মৌটুসি, এখানে আমাকে ডেকেছিস কেন ? মৌটুসি প্রশ্নবোধক হাসি দিয়ে আমাকে আর উর্মিলাকে রেখে দৌড়ে পালালো। আমি উর্মিলাকে কি বলবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না ।


দীর্ঘক্ষণ নিরবতার পর ও শুরু করলো,” আমাকে ক্ষমা করো তন্ময়।আমি হয়তো একটা ভুল করে ফেলেছি। “ ওর প্রতি আমার এক অজানা সহানুভূতি জেগে উঠলো । বললাম, না, তুমি কোন অন্যায় করোনি ।” এই বলে ওর দিকে তাকাতেই দেখলাম,ওর মায়াবী চোখ দুটো সজল হয়ে উঠেছে।কিছুক্ষন পরে ও আমার হাত ধরে কেঁদে কেঁদে বললো , “ তন্ময়, আমি তোমাকে ভালোবাসি ।” এরপর ক্যানো যেনো ওর কাঁন্না দেখে আমিও কেঁদে ফেললাম। এরপর থেকে রোজ ওর জন্যে আগে-ভাগে ক্লাশে আসতাম। ক্লাশ শুরুর আগে ও পরে দু’জনে মিলে এটা-সেটা নিয়ে গল্প করতাম।লক্ষ্য করলাম,আমরা দু’জন অন্যদের থেকে আস্তে আস্তে আলাদা হয়ে যাচ্ছি । এরপর সময়ের বহমানতার সাথে সাথে আমরা ভালোবাসার প্রবাহমানতাকে নানা জিজ্ঞাসা,অভিব্যক্তি ও অংগীকারের পিঞ্জরে আবদ্ধ করলাম । বলে রাখা ভালো যে, আমরা দু’জন ভিন্ন ধর্মের।ও হিন্দু আমি মুসলমান। ধর্মের ব্যবধান আমাদের ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র রেখাপাত করতে পারেনি। ছোটকাল থেকেই ধর্মের ব্যাপারে কোথায় যেনো একটা খটকা আমার মধ্যে কাজ করে আসছে।অবশ্য এর মর্মোদ্ধার আমি আজও করতে পারিনি। তবে আমরা দুই অপরিপক্ক হৃদয় অন্তত: এতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে ধর্মের দেয়াল ডিঙিয়ে ভালোবাসা কোন অপরাধ নয়।

এরপর আস্তে আস্তে সমাজের জটিলতাগুলো আমাদের দিকে শানানো ছুরির মতো এগিয়ে আসতে থাকে। আমি একটু একরোখা স্বভাবের বলে ওসব বাঁধা পরোয়া করিনি এবং দেখতে পেয়েছি সমাজের সবাই অন্যদের ব্যাপারে তেমনটি নয়। । জানিনা আমি মারমুখী স্বভাবের ছিলাম বলেই এমনটি হয়েছিল কিনা। তখন আমরা এস,এস,সি দেবো। গভীর রাতে আমি ওদের বাড়িতে গেলাম দেখতে, “ ও পড়ে কিনা ।”একলা এক বাড়ি। চারিদিকে বাগান। আমি ছোটকাল থেকে ভূতের ভয় পেতাম। কিন্তু প্রেমে পড়ার বছর দুয়ের মধ্যে এই ভয়টা আমার মাথা থেকে পালিয়ে যায়। জানিনা প্রেমকে ভূত ভয় করে কিনা ! আমি ওদের পেছনের দরোজায় হাল্কা টোকা দিলাম। ও আমার সাংকেতিক করাঘাতে সাড়া দিয়ে চুপিসারে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো।বাড়ির কিছুদূরে একটা খালের কিনারায় চাঁদনী রাতে দু’জন হাত ধরাধরি করে বসলাম। এখন আমরা অনেককিছু বুঝি। ভালোবাসার দূর্দান্ত লাগামহীন টান অনুভব করতে পারি।মিলনের আকাংখা উপলব্ধি করি। এরই মধ্যে আমি কিভাবে যেনো বুঝে ফেলেছিলাম “ বিবাহ পূর্ব শারিরীক সম্পর্ক প্রেমের পাঁপড়িকে ম্লান করে দেয়্।” তাই চাঁদনী রাতে মহাবিশ্বের পাণে তাকিয়ে দু’জন বলেছিলাম----
”
যদস্থ হৃদয়ং মম তদস্থ হৃদয়ং তব” 


এস,এস,সি পরীক্ষায় দু’জনেই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলাম। ও আমাকে পরামর্শ দিলো , “ আমি যেন ঢাকার কোনো ভালো কলেজে ভর্তি হই।” আমি মানতে পারলাম না। বললাম, “দু’জন একই কলেজে পড়বো।” ও আমাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মানতে বাধ্য করলো যে, আমাকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য ঢাকার কোনো নামি দামী কলেজে পড়তে হবে। ওর কথা মতো ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজে চান্স পেয়ে গেলাম্ । ভর্তি হওয়ার আগে ওর সাথে দেখা করে বললাম, “ জানি না , তুমি আমাকে কোথায় ঠেলে দিচ্ছো ।” ও প্রত্যুত্তরে নানা কথায় জীবন গড়ার পরামর্শ দিলো। আমাকে ঘিরে ওর যে বাসনা পল্লবিত হচ্ছে তাতেই নাকি ,তা ষোলকলায় পূর্ণ হবে। আমার প্রতিবাদ ধোপে টিকলো না্ । ওর কথা মতো দু’জনে দু’যায়গায ভর্তি হলাম্ । কলেজে ক্লাশ শুরুর আগে যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই তখন দু’জনেই দীর্ঘক্ষন কেঁদেছিলাম। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব ছিলনা। জানিনা, তারপরেও আমি কেন যেন আমার বুকের ভেতরে মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা কিংবা ব্যাবিলনীয় সভ্যতার শশব্দ বিলুপ্তির বিশাল কম্পন অনুভব করলাম।

      অনামিকা
                               

পা রো মি তা চ ট্টো পা ধ্যা য়

তার নাম অনামিকা । অনামিকার জীবনে বলার মত তেমন গল্প নেই । তবু অনামিকা ভাবে অনেক না বলা কথা জমা হয়ে আছে – সেগুলো থেকে অনেক গল্প হতে পারে । কিন্তু অনামিকা জেনে গেছে মেয়েদের নিয়েতো গল্প হয়না – গল্প হয় তার শরীর তার রূপ তার ভোগ্য সামগ্রী হয়ে ওঠার কাহিনি নিয়ে । অনামিকার বয়স এখন প্রায় প্রোঢত্ব ছুঁই ছুঁই । দুই সন্তানের জননী, স্বামী ভালো কাজ করেন, মোটামুট সচ্ছল সংসার । তবু নিজেকে ফিরে দেখতে ইচ্ছে হয় অনামিকার । আর তখনই সূবর্ণলতার কথা মনে পড়ে যায় অনামিকার –আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস সুবর্ণলতার কথা । ভাবে, সুবর্ণলতা কি তার চেয়েও বেশি অসহায় ছিল ? রবীন্দ্রনাথকে কেন আকুতি জানাতে হয়েছিল ‘একটা মেয়ের গল্প লেখ শরৎবাবু’ বলে ? এসব কথাই মনে আসে অনামিকার ।

কত সাত সকালে বিয়ে দিয়ে দিলেন তাঁর অতি শিক্ষিত বাবা। যিনি সারাজীবন বিদ্যাসাগরের আদর্শ নিয়ে দিন কাটালেন ,ব্যাস্ত থাকলেন নিজের জীবন আর বিদ্যাসাগর নিয়ে। খালি একটা চিন্তা তাকে ঘিরে রাখত কোথায় লেখা বার হল, কটা বই বার হল। সংসারের প্রতি তাঁর খেয়াল থাকতোনা । না স্ত্রীকে বোঝার চেষ্টা করেছেন না মেয়েদের । বড়ো মেয়ের ভাগ্যগুণে এক শিক্ষিত পরিবারে বিয়ে হয়েছিল । ছোট-অনামিকার বিয়ে হল এক সংষ্কার আচ্ছন্ন ব্যবসায়িক পরিবারে । বিশাল পরিবার, অফুরন্ত অর্থ , কিন্তু সেটুকুই আর কিছু ছিলনা । ছোট পরিবারের মেয়ে অনামিকা হারিয়ে ফেলেছিল তার অস্তিত্ব । সে যে ভালো ছাত্রী ছিল , ভালো গান গাইতে পারত, ভালো লিখতে পারত সব ,সব মূল্যহীন হয়ে গেল; যেন সে নিজেই ভুলে গেল এসব কথা । শ্বসুরের প্রবল প্রতাপে মেয়েদের শিক্ষা দীক্ষার কোন মূল্য থাকলোনা । দাসীর মতোন সবার ফরমাস খাটত । তার স্বামী অজয়কেও  পাসে পায়নি অনামিকা । পিতৃবাক্য ছিল তার কাছে বেদবাক্য।

যথা নিয়মে দুই কণ্যা সন্তানের মা হল অনামিকা। এইখানে সে যেন নিজেকে আবিষ্কার করল, কি ছিল আর কি হয়েছে। সংসারের প্রবল চাপে স্বামীর সাথে একটা দূরত্ব এসে গেল তার। যখন মুখ ফেরাবার অবকাস হল তখন দেখল স্বামীর জীবন তার প্রয়োজন শুধু সংসারের রান্না এবং তার পরিবারের লোকজনদের সামলাবার জন্য । এক উচ্চমানের আয়া ছাড়া আর কিছু নয় সে । একদিন ঝগড়ার সময় বলেই ফেলল তুমি রান্না বান্না সংসার সামলানো এসব ভালো পার আর তোমার দ্বারা কিছু হবেনা। তার জীবনে তখন নতুন বন্ধু অতি আধুনিকা কবিতা, যারসাথে দিনের বেশীর সময় কাটত।

বন্ধুবান্ধবের ফোন আসতে লাগল অনামিকার কাছে অজয়কে দেখলাম কবিতার সাথে গাড়ী করে যাচ্ছে, অমুক ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছে ইত্যাদি । অজয় তা লুকানোর বিশেষ চেষ্টাও করছেনা । এমন কি অনামিকা এবং মেয়েদের সামনে দিয়েই কবিতাকে নিয়ে সেজেগুজে বেরিয়ে যেত। অপমানে অসন্মানে অনামিকা অসুস্থ হয়ে পড়ল তাতেও অজয়ের কনো পরিবর্তন এলোনা ।

আস্তে আস্তে অনামিকা মাথা তুলে দাঁড়াল, তার দুই মেয়ে সুশিক্ষিত হয়ে চাকরি নিয়ে বাইরে চলে গেল , মায়ের পাশে দাঁড়াল সব শক্তি দিয়ে। মায়ের জীবনের দুঃখ তাদের অন্তরকে স্পর্শ করেছিল। অনামিকা নিজেকে মেলে ধরল। নিজের শিল্পসৃষ্টি দিয়ে গড়ে তুলল বুটিক , খুব অল্প সময়ের মধ্যে বুটিকটি দাঁড়িয়ে গেল। স্ব নির্ভর হল । স্বামীর গণ্ডি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারল। তার সুন্দর চেহারা শিক্ষা রুচি ব্যাক্তিত্ব দিয়ে অনেকের কাছে সন্মানিত হল । বরাবর তার পাশে ছিল তার মায়ের মতন বড়ো দিদি আর তার দুই সন্তান।

এদিকে মনযোগের অভাবে অজয়ের ব্যাবসার অবস্থা অনেক খারাপ হল । কবিতাও তার বড়োলোক স্বামীর অর্থের দম্ভে অজয়ের থেকে দূরে সরে গেল। সেদিন অজয় স্ত্রী মেয়েদের কাছে পেতে চাইল , কিন্তু তারা তখন মানসিক ভাবে অনেক দূরে চলে গেছে। আজও অনামিকা থাকে স্বামীর সাথেই , কিছুটা সন্তান্দের স্বার্থে , তাদের সুস্থ জীবন থেকে বঞ্চিত করতে ইচ্ছা হয়নি, কিন্তু দুজনের দুটি ভিন্ন ভিন্ন জগত। দু প্রান্তে থাকে । খাবার সময় স্বামীকে ডাকে ‘খেতে দেওয়া হয়েছে’, বা অজয়ের খিদে পেলে স্ত্রীর কাছে এসে বলে ‘খেতে দেবে নাকি?’এইভাবেই বয়ে চলেছে সংসার সমুদ্রে অনামিকার হালভাঙা নৌকা । দুই মেয়ে শুধু এই ভাঙা নৌকার সফল যাত্রী।

      পত্রমিতালি
          
দে বা শি স দে

কেউ কেউ বলে অনিরুদ্ধ পাড়ার সেরা ছেলে । লেখাপড়ায় খুব ভালো । কিন্তু কেন কে জানে, ও নিজেও হয়তো জানেনা কারণটা , ওর কোন ভালো বন্ধু ছিলনা । বাবা মা ওকে খেলা ধুলো তেমন করতে দিতেননা । অনিরুদ্ধও তার পড়াশোনা নিয়ে থাকতো, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খুব একতা মিশতোনা । ছেলেবেলাটা কাটিয়ে এসেছে অনিরুদ্ধ, এখন গ্রাজুয়েশনও হয়ে গেলো । অনিরুদ্ধ কবিতা লেখেনা, গল্প-কবিতার বইও পড়েনা , সিনেমা দেখাতেও তেমন উৎসাহ নেই । এহেন অনিমেষের বন্ধু না থাকাটাই স্বাভাবিক ।

ইদানিং অনিরুদ্ধর নিজেকে খুব  নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে । অনিরুদ্ধ জানে আর দুএকবছরের মধ্যে মা বাবা তাদের পছন্দমত কোন মেয়ের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করবেন । কলেজ ছুটি হতো, অনিরুদ্ধ দেখতো ওর পরিচিত ছেলে মেয়েরা কেমন কলকল মুখরিত করে রাস্তা দিয়ে যায়, বাড়ি ফেরে , কত কথা বলে। তারওতো অনেক কথা আছে , কিন্তু বলবে কাকে ? তেমন বন্ধু যে নেই অনিমেষের ।  অনিরুদ্ধ নিজেকেই অবাক করে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির পর কফি হাউসে ধুকে গেল একাএকা । দেখলো এককাপ চা নিয়ে  ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে চলেছে তারা । একদিন ‘নন্দন’ চত্তরেও একাএকা চলে গেলো । অনিরুদ্ধ ভাবে এরা এতো কথা বলছে , তারও তো অনেক কথা আছে সেগুলো বলবে কাকে । একটা সময়ের পর মা বাবাকে তো সব কথা বলা যায়না । কিন্তু আগ বাড়িয়ে কোন মেয়েতো দুরের কথা কোন সমবয়সী ছেলের সঙ্গেও  আলাপ করবে এরকম মনের জোরও অনিরুদ্ধর নেই ।

এই সব ভাবতে ভাবতে অনিরুদ্ধ ভাবলো চিঠিতে বন্ধুত্ব করলে কেমন হয় ? ধীরে ধীরে আলাপ হবে ,মনের অনেক কথা বলতে পারবে । আজইতো রবিবার । অনিরুদ্ধ আনন্দবাজার পত্রিকায় চোখ রাখলো পত্রমিতালি কলমে । একটা বিজ্ঞাপনে চোখ আটকালো ।
“স্মার্ট, উচ্চশিখিত ব্যবসায়ী, সাক্ষাতেচ্ছু উদারমনা বন্ধু / বান্ধবীরা ফোন করুন । 

অনিরুদ্ধ তাড়াতাড়ি বাঁ হাতের চেটোয় ফোন নাম্বারটা টুকে নিল । এক ঝটকায় সিড়িগুলো  কোন রকমে টপকে খোলা ছাদে, খোলা মনে, মোবাইলে ডায়াল করে ভয় কাটিয়ে জিজ্ঞাসা করলো  ‘হ্যালো,আজ আনন্দবাজার পত্রিকায় আপনার বিজ্ঞাপন দেখলাম ‘আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই’ ।

ওপার থেকে ভেসে এলো – কিন্তু আমি তো ওটা ফিমেলদের জন্য দিয়েছি, বিজ্ঞাপনটা দেবার সময় ওরা বলল ‘বন্ধু’ না লিখলে এই কলমে দেওয়া যাবে না তাই...... আসলে আমি নিজে দেখে যাচাই করে বিয়ে করতে চাই ।