এই সংখ্যায় ১০টি গল্প । লিখেছেন - সুবীর কুমার রায়, সৌমিত্র চক্রবর্তী, তাপসকিরণ রায়, উদয় চক্রবর্তী, নিবেদিতা পুণ্যি, তৈমুর খান, উত্তম বিশ্বাস, মৌমিতা ঘোষ, জয়িতা ভট্টাচার্য ও ব্রততী সান্যাল ।
     লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন
একাল-সেকাল

ছেলের চাকরির জন্য তার মার্কশীট ও অ্যাডমিট কার্ডের কপির অ্যাটেষ্টেশনের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল তার চারিত্রিক প্রশংসা পত্রের। তাঁদের সময় তাঁরা এগুলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা কলেজের অধ্যক্ষকে দিয়েই করিয়ে নিতেন। কিন্তু অনেকেই জানালো যে এখন নাকি তাঁদের দিয়ে কাজটা করালে, গ্রহণযোগ্য হিসাবে বিবেচিত হয় না। কিন্ত ছেলের অসুস্থতার জন্য কাজটা সুদীপ বাবুকেই করতে হবে, আর হাতে সময়ও বিশেষ না থাকায়, ছেলের স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দিয়েই কাজটি করাবার মনস্থ করে ওর স্কুলে গিয়ে হাজির হলেন। সুদীপ বাবুর ধারণা কাজটা প্রধান শিক্ষককে দিয়ে করিয়ে নিতে তাঁকে বিশেষ কোন বেগ পেতে হবে না, কারণ ঐ স্কুল থেকেই তাঁর ছেলে অত্যন্ত ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি নিজেও তো ঐ স্কুল থেকেই একসময় পাশ করেছিলেন। স্কুলের সকলেই তাঁকে চেনেন, সম্মান করেন।

স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলে বেয়ারা জানালো যে প্রধান শিক্ষক একটা মিটিং-এ ব্যস্ত আছেন, তিনি যেন পরে আসেন। সুদীপ বাবু তাকে একটু জেনে আসতে অনুরোধ করলেন যে কখন তিনি আসবেন। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে তাঁকে প্রধান শিক্ষকের ঘরে যেতে বলায়, সুদীপ বাবু তাঁর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
ঘরে প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকরা ছাড়া আরও জনা পাঁচ-ছয় ব্যক্তি আলোচনায় ব্যস্ত। এদের মধ্যে একজনকে তিনি চিনতে পারলেন, তিনি স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে গিয়ে চার শত টাকাকে fore hundred লিখে হাসির খোরাক হয়েছিলেন। সুদীপ বাবুর উপস্থিতিতেও তাঁদের আলোচনা বন্ধ না হওয়ায়, তিনি তাঁর প্রয়োজনের কথা বলে কাগজগুলো প্রধান শিক্ষকের হাতে দিলেন। প্রধান শিক্ষক তাঁর অনুরোধ রক্ষা করে, তাঁর কাজটি করার অবসরে উপস্থিত সকলের বক্তব্য সুদীপ বাবুর কানে গেল।

স্কুলের একটি নবম শ্রেণীর ছাত্রের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার হওয়ায় অঙ্কের শিক্ষক মৃগেন বাবু তাকে গোটা কতক চড় কষিয়ে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখায়, অভিভাবকরা যারপরনাই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ। বেশিরভাগ শিক্ষক ও অভিভাবকরা এর তীব্র নিন্দা করে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় রীতিমতো তাঁকে ধমক দিচ্ছেন। পরিচিত ভদ্রলোকটি দীপ্ত ভাষায় জানালেন, যে মৃগেন বাবু তাঁর স্কুলের শিক্ষক হলে সরকারি নিয়মের বিরোধিতা করে ছাত্রের গায়ে হাত তোলার জন্য তিনি কী কী করতেন। সুদীপ বাবুর মনে হ’ল, তিনি বোধহয় কোন অভিভাবক অথবা এই স্কুল কমিটির সদস্য।
  
বৃদ্ধ মৃগেন বাবু, যাঁর হাত দিয়ে স্কুলের বহু ছাত্র অঙ্কে অসাধারণ সব মার্কস নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, ন্যায় বিচারের আশায় চুপ করে মাথা নীচু করে খুনের আসামির মতো বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখ দুটি চিক্ চিক্ করছে। শিক্ষিত, ভদ্র, নম্র, প্রধান শিক্ষকও বোধহয় ঐ প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মতো ডাকাবুকো না হওয়ায় আদালত অবমাননার ভয়ে অসহায়, নীরব।
 
কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এতদিন পরে সুদীপ বাবুর হঠাৎ বেত হাতে নবীন বাবুর মুখটা মনে পড়ে গেলো। অত্যন্ত বদ রাগি নবীন বাবু তাঁদের বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে সবাই ভয় করলেও, শ্রদ্ধা করতো শুধুমাত্র তাঁর ছাত্রদের আন্তরিক ভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য। একদিন ছুটির সময় শ্রেণী কক্ষে বেঞ্চ ভাঙ্গার অপরাধে পরদিন তিনি সুদীপ বাবুকে তিনি দোষী সাব্যস্ত করে ভীষণ ভাবে বেত্রাঘাত করেন। সুদীপ বাবু তাঁকে বোঝাবার সুযোগই পেলেন না, যে গতকাল তিনি স্কুলেই আসেন নি।

ঘটনার দিন দুয়েক পরে টিফিনের সময় তাঁকে দেখে সমস্ত ছাত্র ও শিক্ষকদের সামনেই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “আমি জানতাম না রে যে তুই সেদিন স্কুলেই আসিস নি। পরে শুনে আমি রাতে ঘুমোতে পারি নি। তুই আমায় ভুল বুঝিস না। রাগ করিস না রে, তুই আমার ছেলের মতো, তবু পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস”।
বিষণ্ণ মনে সুদীপ বাবু দ্রুত পায়ে বাড়ির পথ ধরলেন।




মান্ডলার হান্টেড কাহিনী--

ওরা কারা !
(অলৌকিক, সত্য ঘটনা আধারিত)
                               

ভিলাই থেকে জবলপুরের দিকে ট্যাক্সি ছুটে চলেছে। ট্যাক্সিতে আমার মেয়ে, জামাই, ছেলে আর দুই নাতনী। তখন রাত প্রায় বারটার কাছাকাছি। ড্রাইভার পথ ভুলে শর্টকাট ছেড়ে লম্বা রাস্তা ধরে ছিল। ওরা তখন নয়ন পুরের কাছাকাছি, নয়নপুর মান্ডলা  জেলার এক তহসীল শহর। মানে, জবলপুর তখনও আড়াই শ কিলোমিটার দূরে। ওদের ট্যাক্সির পেছনে পেছনে নেভিব্লু রঙের একটা মিনি ট্রাক বেশ কিছু সময় ধরে পিছু পিছু আসছিল।   

হঠাৎ এক জাগায় ওদের রাস্তা ব্লক দেখা গেল ! সামনে রাস্তা জুড়ে উঁচু ঢাই মারা বালির স্তূপ। পেছনের গাড়িটাও দাঁড়িয়ে গেল। দেখা গেল, রাস্তার পাশে ডান দিক কেটে একটা কাঁচা অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তা চলে গেছে। অগত্যা ট্যাক্সি ঘুরিয়ে ড্রাইভার সেই কাঁচা রাস্তায় এসে নাবল।  
কাঁচা পথ ধরে গাড়ি চলেছে। এত সময় ট্যাক্সির সবাই হালকা ঘুম দিয়ে নিয়ে ছিল। এখন সবাই সজাগ। গাড়ি ধীরে ধীরে চলেছে। পেছনে নীলাভ গাড়িটাও আসছিল। কিন্তু এ কি ! এক গ্রামের কাছে এসে রাস্তা যে শেষ হয়ে গেল! ওদের সামনে ঘুমন্ত এক গ্রাম--একেবারে নিঝুম পড়ে আছে। গ্রামের এক পাশ ধরে কয়েকটি কবর চোখে পড়ল—সাদা বর্গাকৃতি স্মৃতিসৌধ। আবছা চাঁদের আলোয় সব কিছু দেখা যাচ্ছিল। চারদিক নিঃশব্দ—জনপ্রাণীর টু সাড়াটুকু নেই ! মনে হল কোন প্রাক ঐতিহাসিক কালের কোন মৃত গ্রাম ওদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে আছে।

ঠিক এমনি সময় হঠাৎই যেন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে এলো। শন শন হওয়া, ঝড় শুরু হয়ে গেল। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো। এদিকে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো সে সাথে বাজ পড়ার শব্দ হল । এবার কি হবে ? সবার মনে সে প্রশ্নই নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে দেখা গেল সেই কাঁচা রাস্তার ডান দিকে একটা ট্রাক ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। তার মানে ও দিকে আরও একটা রাস্তা আছে হবে। সেই রাস্তার কাছাকাছি এসে ট্যাক্সি দাঁড় করালো ড্রাইভার। হয় তো দেখে নিতে চাইল বাস্তবেই কোন রাস্তা আছে কি না। পেছনে নীল রঙের গাড়িটাও এসে দাঁড়িয়েছে। নীল রঙের গাড়িটা আসলে ছিল মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ভেন। 

ঝড় ঝাপটার মধ্যে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, মাঝে মধ্যে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে এক আধবার বজ্র পাতের আওয়াজ হচ্ছে। ঠিক এমনি সময় গুড় গুড় গুড় ভারী একটা আওয়াজ পেছন দিকের সেই মৃত গ্রামের দিক থেকে আসছিল। কিসের শব্দ শুরুতে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। ট্যাক্সি একটু সময় আগে ট্রাক নেমে যাওয়া রাস্তায় মোড় নিতে গিয়েও থেমে গেল। তখন পেছনের গুড় গুড় শব্দে বোঝা যাচ্ছিল কোন গাড়ি আসছে বলে। সেই আগত, অজ্ঞাত গাড়িটিকে পাস করে যাবার সময় দিয়ে থাকবে ড্রাইভার। খড়র খড়র খটারা গাড়ির শব্দ করে একটা এম্বাসেডর গাড়ি এসে থামল ট্যাক্সির ডান দিকের পাশটাতে। জামাই তখন তন্দ্রাতে ছিল,নাতনী দুজন তখন ঘুমিয়ে। মেয়ে, আমার ছেলে, আর ড্রাইভার এক সাথে ভয়ে আঁতকে উঠল পাশে এসে দাঁড়ান এম্বাসেডরের দিকে তাকিয়ে। গাড়িটার এ কি অবস্থা--সমস্ত গাড়িটা ভেঙ্গে চুরে দুমড়ে আছে !

গাড়ির ওপরে ছাদ নেই আর ওরা করা বসে আছে তার মধ্যে ? সবার শরীর সাদা ব্যান্ডেজে ঢাকা--পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা প্লাস্টারে মোড়া। সবার তখন পিলে চমকানো অবস্থা। ডাকাত ! এবার কি তবে ডাকাতের পাল্লায় পরেছে ওরা ? তা না হলে এমন পোশাক কেন ? পাঁচ পাঁচটা লোক বসে আছে এম্বাসেডরে, তাদের প্রত্যেকের চেহারা লম্বা-চওড়া, চোখ দুটো ছাড়া বাকি দেহ ব্যান্ডেজে একেবারে প্যাক করা!

ভয়ে ট্যাক্সির দর্শকরা বোবা হয়ে গেছে--স্বপ্ন আর বাস্তবতার এক মাখামাখি অবস্থা। শারীরিক অনুভূতি সবার মধ্যে যেন অনেক কমে গেছে। একদম সামনে ডান দিকের সিটে বসে ছিল আমার মেয়ে। ভয়ে তার মুখের কথা ফুরিয়ে গেছে, আমার ছেলে ড্রাইভারের বাম পাশে বসে, সে অজানা কোন আশঙ্কায় মুহূর্ত গুনে চলছিল--এই বুঝি কোন অঘটন ঘটে যাবে--এমনি অবস্থা। এ দিকে ঝড়জল, বিদ্যুৎ চমক, বজ্রপাত সব কিছু হয়ে চলেছে। জামাই পেছনের দিকে বামদিকের সিটে বসে--তাঁর ঘুমের ঝিম ঝিম ভাব ছিল—এ দৃশ্য-চমকের বাইরেই ছিল সে। নাতনীরা ঘুমে তখন অচেতন। ড্রাইভার নির্বাক, সেও ভয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তোবড়ান গাড়ি আর প্ল্যাসটার জড়ান তার পাঁচ আরোহীর দিকে। এমনি অবস্থায় একবার সেই অলৌকিক গাড়ির ড্রাইভার ওদের ট্যাক্সির দিকে মুখ ফেরালো। তার শুধু মাত্র দু চোখের অংশটুকু খোলা। এমনিতে চোখ দেখা যাচ্ছিল না, তাকাবার পরে মনে হল দুটো ঘোলাটে চোখ জ্বলে উঠে আমার নিভে গেল। আর কয়েক মুহূর্ত পর হুস শব্দ করে চোখের সামনে দিয়ে সে গাড়ি সামনের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল!

কিছু সময় সবাই স্তম্ভিত হয়ে ছিল। সম্বিত ফিরতে ট্যাক্সির ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ডানদিকে মুড়ে আগের চলে যাওয়া ট্রাকের পথ অনুসরণ করল। গাড়িতে বেশ স্পিড--এবড়ো খেবড়ো কাদা মাটির মেঠো রাস্তা ঘুরে শেষে আবার পাকা রাস্তায় গিয়ে উঠেছে। ভয়ে ভয়ে সবার চোখ বারবার ফিরে তাকাচ্ছে পেছনের দিকে, সেই তোবড়ানো এম্বাস্যাডার ওদের পিছু তো করছে না! না কাউকে দেখা গেল না, কেবল সেই নীল গাড়িটা তখনও পিছে পিছে আসছে। আর আশ্চর্য, আকাশে তখন একটুও মেঘ নেই, একটু আগে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত হয়ে গেছে কে বলবে ! পাকা রাস্তায় এসে কিছুটা ভয়ের জড়তা কাটিয়ে নেবার চেষ্টা করে মেয়ে আমার ছেলেকে ডেকে ভীত চাপা স্বরে বলেছিল, ভাই, দেখলি ? 
ভাই তখন ভয় পেয়েছে খুব, সে চাপা গলায় বলল, এখন কথা না--ড্রাইভারকে বলল, গাড়ি তেজ ভাগও ! 
জামাই তখনও বোধহয় ঘুমের মধ্যেই ছিল। ট্যাক্সি তখন খালি রাস্তা পেয়ে শ কিলোমিটার স্পীডে ছুটে চলেছে। পেছনের নীল গাড়ি তার চেয়েও বেশী স্পীডে ট্যাক্সিকে পাস করে আগে আগে ছুটছে। ব্যাস, এই পর্যন্ত ঘটনা।  

এখন প্রশ্ন হল--ওরা কারা ? সমস্ত শরীর ওদের প্লাস্টারে মোড়া কেন ছিল ? ওরা কি ডাকাত ছিল ? আতঙ্কবাদী ছিল ? ডাকু বা আতঙ্কবাদী হলে অমন ভাবে প্লাস্টারে সারা শরীর মুরে থাকবে কেন ? বেশী হলে চিনে নেবার ভয়ে মুখ ঢেকে আসবে। আর এম্বাস্যাডার তো ও রকম ভাংচুরের পর সচল থাকার কোন কথাই নয়! ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে একাকার--জড়ো বস্তুর মতই দেখাচ্ছিল ওটাকে। চলছিল, তাই গাড়ির আকৃতি ভেবে নিতে পেরেছিল সবাই। তাও আবার সে গাড়ির মাথার দিক নেই সব কটা লোককে সশরীরে দেখা যাচ্ছিল! তবে কি কখনও কোন দিন এখানে ভয়ঙ্কর কোন এক্সিডেন্ট ঘটে ছিল—যাতে কিনা ওই ড্রাইভার সহ ওই পাঁচজনই মারা গিয়েছিল! কি এর আসল রহস্য তা এখনও পর্যন্ত মনের মাঝে প্রশ্ন হয়েই থেকে গেছে--ওরা করা!
                                                          

    
    


ঝরা হলুদ পাতা


সকালে কোনোক্রমে নাকে মুখে গুঁজে দৌড়ে স্টপে এসেই দেখল একটা অটো বেরিয়ে যাচ্ছে। এক হাতে অফিসব্যাগ সামলে অন্য হাত তুলে চিৎকার করে অটোটা থামাল অনীশ। পড়ি কি মরি করে সামনের সিটে নিজেকে গুঁজে দিতেই অটোওয়ালা ধাঁই করে ছেড়ে দিয়েই স্পিড বাড়িয়ে দিল।

আর ওরকম বিদঘুটে অবস্থায় শার্টের পকেটে ঝনঝন করে বেজে উঠলো মোবাইলটা।
কোনো রকমে সামান্য কাত হয়ে যন্ত্রটাকে পকেট থেকে বার করে রিসিভ করল।
শুনতে পেলো ও পাশ থেকে ভয়ঙ্কর চিৎকৃত গলায় সাইমা বলছে, 

"এক্ষুনি তোমার ফেসবুক পাসওয়ার্ড দাও,এক্ষুনি।"

ফেসবুক! সকালের অফিস যাওয়ার ব্যস্ততায় রাতের এন্টারটেইনিং জগতের কথা মাথায় ছিলনা অনীশের। দিনের বেলায় ও ওইসব ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ্ করার সময় পায় না। ওই রাত্রেই কয়েক ঘন্টা। কিন্তু সাইমার হলো টা কি? গতরাতে ইনবক্সে বেশ ঝগড়া হয়েছে ওর সঙ্গে। সাইমার অভিযোগ অনীশ নাকি আজকাল সেরকম রেসপন্স করছে না। অন্য মেয়ের দিকে ঢলেছে। আজব ব্যাপার সব। ভাবলো অনীশ।

"কি হলো? তুমি দেবে কি না? উত্তর দিচ্ছ না যে? এক্ষুনি তোমার ফেসবুক ইউজার আইডি আর পাসওয়ার্ড দাও বলছি।"

ফের চিৎকার করে বললো সাইমা। এত জোরে বললো যে স্পিকার ঝনঝন করে উঠলো। মনে হলো পাশের লোক সব শুনতে পাচ্ছে।

চাপা গলায় ও বললো,এখন কি করবে? আমি তো অফিস যাচ্ছি। রাতে দেব। কিন্তু কি করবে ওটা নিয়ে?
কথা শেষ করার আগেই বস্তির ভাষায় আবার চিৎকার করে উঠলো সাইমা,ঢ্যামনামো ছাড়। তুমি কি মাল সেটা আমি বুঝে গেছি। এক্ষুনি দাও পাসওয়ার্ড। আমি তোমার ইনবক্স চেক করব। দেবে?
-কিন্তু কি পাবে ওখানে? কয়েকটা হাই হ্যালো আর তোমার সঙ্গে কনভার্সেশন। ব্যস আর...
-শোনো, তুমি যদি না দাও দু মিনিটের মধ্যে, তাহলে আমি ওপেন স্টেটাস দেব যে তুমি সব মেয়েদের সঙ্গে শুয়ে বেড়াও...
মুখটা তেঁতো বিস্বাদ হয়ে গেল অনীশের। আর একটাও কথা না বলে কলটা কেটে দিয়ে ফোন ক্রিয়েট মেসেজ বার করে টাইপ করতে লাগলো, অন ডট ইশ ডট...। শেষে লিখল,দিলাম। যা দেখার দেখে নাও। কিন্তু আর কোনোদিন ফোন বা মেসেজ কোরোনা। গুডবাই।
অফিসের চাপে ব্যাপারটা ভুলেই গেছিল সে। রাতে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে নেট খুলতেই অবাক।
কয়েকজন ভালো মহিলা বন্ধু, যাঁরা কখনো ইনবক্সে আসেন না,তাঁরা মেসেজ করেছেন,
"আমাকে আনফ্রেন্ড করলেন কেন?"




সঙ্গতি

নেই। নেই । কোথাও আনন্দ নেই । বারবার ওরা মিলিত হচ্ছে , কিন্তু মিলনের সেই আনন্দ শিহরন কোথায় ? শরীর আছে । ইন্দ্রিয় আছে । রূপ আছে। যৌবন আছে । মন আছে। তবু প্রেমিকা বলছে —
“ভালো লাগে না !"
প্রেমিক জানতে চাইছে — "কেন ?"
প্রেমিকা বলছে — "জানি না ! তোমার কাছে এসে শান্তি পাব ভাবি,কিন্তু যেই আসি অমনি শান্তি কোথায় চলে যায় !"
প্রেমিক কিছুতেই এর কারণ খুঁজে পায় না । তার মনেও শান্তি নেই। বলবে কাকে? পাছে প্রেমিকা যদি দুঃখ পায়   !
হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে । জড়িয়ে ধরে। কিন্তু পরক্ষণেই কীযে হয় তার!  ছেড়ে দেয় । শরীরে স্বাদ নেই। চুম্বনে মধু নেই। হাতের আঙুলে জাদু নেই ।
অথচ এতদিন শুনেছে সব শূন্যতা ভরে যাবে । প্রাণের মহিমায় শূকরীও তার প্রিয় কাদায় খাদ্য অন্বেষণ করে  । মাছরাঙা ঝুপ করে জলে পড়ে প্রিয় মাছ শিকার করে। কালো রাত বৃষ্টিতে নূপুর পরে ফরসা হয়। ঘন জঙ্গলের মধ্যে সবুজ ঘাসে ময়ূর নেচে চলে।
তবে তাদের মিলনে কেন উষ্ণতা নেই আজ ?
পথিক সাদা ভাতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে আকাশকে হাঁড়ির মতো ভাবে আর তারাপুঞ্জ তাতে সাদা ভাত হয়ে ফুটে ওঠে । ভুলে যাওয়া গানের কলি মনে পড়ে ।
তবে তারা কেন প্রথম যৌবনের উৎসুক আবেদনে মেতে উঠতে পারে না?

নবজোয়ান সৈনিকদের কুচকাওয়াজে ব্যারাক ভরে যায় । ক্ষুধার্ত বাঘ নীল গাইয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঠান্ডা বাতাসে মেয়েলি গানের কলি ফিরে আসে একান্ত দু'জনের কাছে। কীযে কী হয় যেন ! মিলনের আবেগে এত ফাঁক কেন  ?
আবার জড়িয়ে ধরে ওরা। ঠোঁট ঠোঁটের উপর নামে। বুক বুকের উপর  । তবু মনে হয় দুটি মরুর পাহাড় । কোথাও ঝরনা বয়ে যাচ্ছে ।তবু তাদের পিপাসা কিছুতেই মিটছে না।
এই কি সঙ্গতি ঈশ্বর !




এই জন্যে


হেটে চলেছি... হেটেই চলেছি...পথের আর শেষ নেই। চলেছি কি ঠিক পথে? হবেও বা...তবে হেটে যেতে ভালই লাগছে। সবুজ ধানের ক্ষেতে হাওয়ায় ঢেউ খেলে যাচ্ছে। দোলা লাগে মনে। এত ধান... এত ধান... মাটির আশির্বাদ যেন ঝরে পড়ছে। দেশে তবু আকাল আধ-পেটা ভাত জোটে না গরীবের। আমাদের রেলপারের বস্তিতে কজন পেট পুরে খেতে পায়? আমরাই কি খেতে পেতাম! বাবা গাড়ি খালাস করে যা পেত... সাতটা পেট। আমি রিক্সা চালাতে শিখলাম। বাঁচল পরিবার। -এই যে শুনছেন? হ্যাঁ, আপনাকে বলছি -দেখে তো মনে হচ্ছে শহুরে ছোকরা, গাঁয়ে কি মনে করে? দেখ বাপু কিছু মতলব থাকলে বলে ফেল। -না না মতলব কিছু নয় মুকুন্দপুর গ্রামটা কোন দিকে বলতে পারেন? -পারব না কেন? মুকুন্দপুর যাবে কেন? চুরি-ডাকাতির মতলব আছে নাকি। -ছিঃ ছিঃ কি যে বলেন। ওখানে আমার শ্বশুর বাড়ি। -বল কি তোমার শ্বশুর বাড়ি! নিজের শ্বশুরবাড়ি চিনতে পারছ না? এমন গাড়োল লোক তুমি? ...কোথায় থাকা হয়? -বারুইপুর। আমার সদ্য বিয়ে হয়েছে। অষ্টমঙ্গলে বউ বাপের বাড়ি এলো, আর ফেরার নাম নেই! বাবা পাঠালে আনতে। -বিয়ে করতে তুমি এসেছিলে তো? নাকি অন্য কেউ... -গাড়ি করে এসেছিলাম। তারপর হেটে, ঠিক চিনতে পারছি না। -ঠিক পথেই যাচ্ছ। আর আধ মাইল পথ। তবে সাবধানে যেও বাপু। -কেন সাবধান কেন? মুকুন্দপুর গ্রামে পরুশু রাতে ডাকাতি হয়েছে। গুলি, বোমা, মারধর...একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে ডাকাতরা। -ও তাই নাকি? -আর বেশি পথ নেই পা চালাও। সন্ধ্যে হয়ে এল। এখন গাঁয়ের লোক অচেনা দেখলেই ভাবে ডাকাত। -কাকা যাই তবে। -এসো, তবে সাবধান। পথে বেফাস কিছু বলে বসো না যেন। কি জানি গোলমেলে লাগছে সব। শ্বশুরবাড়ি গরীব, সামান্য মুদিখানা দোকান, ও বাড়িতে নিশ্চয় ডাকাতি হয় নি। গরীবের বাড়ি ডাকাত আসবে কেন... এসে গেলাম মনে হচ্ছে... এবার চেনা চেনা লাগছে... ওই টালির বাড়ি... হ্যা, ওইটাই তো। ভিতরে যাই... দুয়ার ফাঁকা, খাঁ খাঁ করছে। ঘরের শিকল টানা। শুনশান...দেখছিনা তো কাউকেই। সন্ধ্যে হল, আলো জ্বলছে না। -শুনছেন? কেউ আছেন? শুনছেন... না- কোন সারা নেই। গেল কোথায় সব... এমন সময় কোলাহল করতে করতে কয়েকজন লোক বাইরে থেকে এসে দাড়াল দুয়ারে। শ্বশুর বাড়ির লোকজন... গাঁয়ের লোকও। আমায় দেখতে পেয়ে চুপ হল ভিড়। -এসে গেছ বাবা। শ্বাশুড়ি ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বললেন আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি বিশ্ময়ে হতবাক। চেয়ে আছি। - সর্বনাশ? -থানা পুলিশ সব ফেল। কোথাও তার কোন খবর পাওয়া গেল না। -কিসের খবর? কার খবর পাওয়া গেল না? -বাড়িতে এত বড় ডাকাতি হয়ে গেল...খবর পাওনি? -কই না তো। -বিয়ের গয়না সমেত বাড়িতে যা কিছু ছিল সব নিয়ে গেল। যাবার সময় কাজলকে ওরা তুলে নিয়ে গেল। কাজল! আমার বৌ কাজল। মনে পড়ে গেল পথের লোকটির কথা। গরীবের বাড়ি ডাকাতি... আশ্চর্য... -একি বলছেন আপনারা! -হ্যাঁ বাবা... পুলিশ, গায়ের সব লোক, সেই থেকে চারিদিকে খোজ করছি। কিন্তু কাজলের কোন খবর পাওয়া গেল না। আমার কাজল.. নেই! ডাকাত ধরে নিয়ে গেছে। 

পরিণতির কথা ভেবে গায়ে আমার কাঁটা দিয়ে উঠলো। ওরা আমার দূর-সম্পর্কে আত্মীয়... বিয়ের আগে দেখাশুনোও হয় নি। একেবারে বিয়ের পিড়িতে প্রথম দেখা। কাজল। গরীব ঘরের হলেও কাজল ম্যাট্রিক পাশ। আর আমি কেলাস ফোর। গায়ের রঙ কালো হলেও দেখতে ভারি ভাল। স্বপ্নেও ভাবিনি এমন ভাল বৌ জুটবে আমার। ফুলশয্যা রাত... অল্প দুএকটি কথা... আমায় সরিয়ে দিয়ে বলেছে- পরে। শ্বশুর বাড়িতে চাপা কান্নার রোল। একটা বিভীষিকার রাত... তাকিয়ে রইলাম আকাশের দিকে চেয়ে...মনের আনাচে কানাচে কাজল...কাজল...শুধুই কাজল। সকালে খবর আনল পুলিশ... মাইল দূরে হাইরোডের ধারে এক যুবতীর লাশ পাওয়া গেছে। পুলিশের সন্দেহ-গণধর্ষণ ও খুন। ডাক পড়ল শনাক্তকরণের। আমার ভিতরের চাপা কান্না দপ করে উঠল জ্বলে। হাসপাতাল-মর্গ। বাড় হল দেহ। সকলে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমি দাঁড়িয়ে আছি দূরে। ডাক পড়ল। শনাক্ত। হ্যা। কাজল। দুটো চোখ বোজা। মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে... একটা বলিষ্ঠ নিরবতা যেন সমাজের বুকের মাঝখানে হাতুড়ি মারছে। পৌরুষের কাপুরুষতার দিকে আঙুল তুলে ও যেন বলতে চাইলো-- -আমার জন্ম কি, এই জন্যে?
ক্ষতি পূরণ
                                   


সন্তানহারা রশিদা আজকাল স্বামী জাফরের আদর সোহাগের কথা শুনলে, পানি পড়া গরম ছাইয়ের মতো অমনি ফোঁস করে ঠেলে ওঠে! কিন্তু ও মুখে কিছু না বললেও, ওর ঘোলাচোখের চাহনি, আর পুরনো হাপরের মতো ছেড়াফাটা বুকের দীর্ঘশ্বাস শুনলে তা কতকটা অনুমান করা যায়--- পোড়া বাসনার শরীরের ভাজে ভাজে কতটা আগুন এখনও লুকোনো রয়েছে!  

বেশ কয়েক মাস হল, ওদের একমাত্র পুত্র সন্তান জহিরুল মরেছে! সবাই বলে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ওর জীবন কেড়ে নিয়েছে।--- সরকারও বলে তাই! কিন্তু জহিরুলের মা রশিদা একথা মানে না।--ও বলে আমার বাছা পাটীপুটি বুঝত না গো! কচি আমার একশ দিনের মাটি কাটায় কাজ করতি গেছেলো; গিয়েই কাল হল!  এখন আর কোন সন্তানহারা মাকেই বেশি কা্ঁদতে দেওয়া হয়না; এটাই এখন সারাদেশের নিয়ম! তার আগেই ওদের হাতে গুজে দেওয়া হয় দুলাখ টাকার চকচকে একখানা চেক! মায়ের চোখের জলে যা মোটেই ছেঁড়ে না! রশিদাও পেল। কারা যেন ওর অশক্ত বিদ্ধস্ত শরীরটাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে, খানিকটা ভ্যানে, খানিকটা হা্ঁটিয়ে খানিকটা কা্ঁদিয়্‌ খানিকটা হাসিয়ে,--- এক ধাক্কায় মঞ্চে তুলে দিল।   

খবর শুনে জাফরও ছুটে এলো বিদেশ থেকে! উঠোনে হাতপা ছড়িয়ে সে অনেকটা কা্ঁদল। অনেকটা বুক চাপড়ালো।অনেকটা মাটি আঁচড়াল। পাড়ার লোক এসে সান্ত্বনা দিল।পার্টির লোক এসে ওর পিঠ চাপড়ে গেল! আর পরবর্তী প্রতিবাদ কর্মসূচী কি হবে; কোথায় হবে,--- এটাও ঠান্ডা মাথায় জানিয়ে গেল!   রশিদা এক ঘটি জল এনে জাফরের মাথায় হাত দিয়ে থাবিয়ে থাবিয়ে ঠান্ডা করার চেষ্টা করল! কিন্তু জাফরের অস্হির বুকের জ্বালা যেন কিছুতেই জুড়োল না! সরকার থেকে পাওয়া দুলাখি চেক খানার কথা রশিদা মুখে একবারও আনল না! এই সময় গায়ে হাতও তোলা যায় না! চড়ে কথা বললেও মানুষে মানুষ বলে না! সমাজে মন্দ হবার ভয় পুরুষেরও আছে যে! দিনের খেয়ালে দিন চলে যায়; কিন্তু এই আটপৌরে জীবন একঘেয়ে শোক আর কতদিন বইতে পারে? জাফর অঙ্ক কষে নেয় মনে মনে! আর ভাবে খালেক মিঞার কাছে তার ধানের জমিটা বা্ঁধা আছে বহুদিন, ওটা ছাড়াতে হবে! ঘরখানার অবস্হাও খুব খারাপ! বর্ষার আগে ভাটা থেকে দুশো টালি আনাতে হবে! মাঝে মাঝে ওর এখন কাশতে গেলে কফের সাথে রক্ত ওঠে।--- এটাও একবার চেক আপ করিয়ে নিলে ভালো হত! সবখানেই যে মুঠো মুঠো টাকার দরকার! জাফর আরও ভাবে, ‘একজোড়া বলদ কিনে লাঙলা করে মাঠে নামাতে পারলেও দিনের রোজগারটার জন্য এমন বিদেশ বিভু্ঁয়ে সেন্টারিং কাজে বিশতলা বিল্ডিংয়ের ওপর এমন প্রাণ হাতে করে ঝুলতে হয়না! দুটো জার্সি গাই গরু কিনলেও তো ঘরে বসে দিনে বিশ লিটার দুধ পাওয়া যায়! মেয়েছেলের বুদ্ধি বলে কথা! কোথায় কোন বালিশের তুলোর মধ্যে কোন ন্যাকড়া-চোকড়ার পুটলিতে এমন বহুমূল্যবান চেক খানা গুজে রাখল কে জানে!রাগে ক্ষোভে জাফরের ইচ্ছে হল, ‘ শুধু ক্যা্ঁতা বালিশ নয়,--গোটা ঘরখানাই উঠোনে আছড়ে এনে ওতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বেলগে দিই!   

রশিদার সাথে গ্রামের মেয়েরা এখন আর খুব একটা কথা বলতে চায় না। দুলাখ টাকার অহংকারে ওর পা নাকি এখন আর মাটিতে পড়ে না! একদিন যারা ওর সন্তান হারানোর ব্যথা ভাগ করে নিতো, উঠোনে বসিয়ে ত্যালাকুচোর পাতার রসের সাথে সর্ষের তেল ফেটিয়ে মাথার বেম্মতলায়জা্ঁপ দিয়ে সান্ত্বনা দিতো; আজ এখন তারাও ভ্রু কুচকে বলে, ‘বাব্বা! টাকা এমন জিনিস পুত্তুর শোকও চাপা দিয়ে দেয়! দ্যাখো না পুড়ার চোখে আজ এক ফোঁটা পানি গড়ায়?
রশিদারও যেন সকল কথা ফুরিয়ে গেছে! বোবার মতো সে একা একা পুকুর ঘাটে বাসন মাজে, একপাশে সরে গিয়ে কাপড় কাচে। আজ সেও যেন স্বঘোষিত একঘরে নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছে। আর সুযোগ পেলেই ও এখন উনোনে পোড়া মাটি খায় মড়মড়িয়ে।
     
বিকট চামড়া পচা দুর্গন্ধে জাফরের পেটের নাড়ী পাক খেতে লাগল! তবুও সোহাগ ভায়ের কাছ থেকে উঠতে মন চায় না। সোহাগ ভাই কত কথাই না জানে! দুর্দিনের একমাত্র সান্ত্বনা; ছোটবেলার বন্ধু। জাফর বসে বসে সোহাগের কার্য কলাপ দ্যাখে আর মনে মনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, ‘ বলি ও সোহাগ ভাই কর কি? মরা বাছুরের চাম ছুলে এনে ওর মধ্যে বিচলি পুরে দিলিই কি আর জ্যান্ত হয়!’‘কি করব বল! গাইডা আমার দিনে বিশ লিটার দুধ দেয়! সাদেক মিঞার ষা্ঁড়ের গু্ঁতো খেয়ে সাত দিনের মাথায় আমার বুধি বাছুরটা মারা গেল! সেই শোকে গাভী একেবারে পাগলা হয়ে গেল! বালতি নিয়ে বাটে হাত ছোঁয়ালেই মারে উড়ো লাথি! কোন দিশে-বিশে না পেয়ে ছুটে গেলাম পশু ডাক্তারের কাছে; উনিই তো এই পরামর্শ দিলেন।‘
সোহাগের মুখনিঃসৃত মৃতসঞ্জিবনীর ইতিহাস অবাক হয়ে শোনে জাফর। ‘বাড়ি ফেরার আগে এক দৌড়ে ভাগাড়ে ছুটলাম
, যেখানে আমার বুধিকে ফেলে দিয়ে এসেছিলাম। গিয়ে দেখি শকুন আর শেয়ালে অনেকটাই ছিঁড়ে ফেলেছে! ওর চোখ ফেটে তখনও পানি গড়াচ্ছে! আমারও চোখে আর পানি ধরে রাখতি পারলাম না! লুঙ্গির খুট থেকে চাকুটা বের করে নাকে ভাল করে গামছা জড়গ্যে নিলাম!-- বড় কঠিন ছিলো সেই জল্লাদের কাজ! এখন বেশ দিব্যি দুধ পাচ্ছি! এই ঝুটা বাছুরটা ওর সামনে এনে ধরলে গাই প্রাণভরে ওর পেছনটা শু্ঁকে নেয়; তার পর চোনালেই পালান একেবারে দুধ ভারে টনটন করে উঠবে। বল এমন গাভীকে বেচা যায়? আর বাছুর ছাড়া ওকে কেই বা নেবে? বিয়োনে গাই গোসের দরেও বিকোয় না যে! তারপর বল, চেকটা ভাঙালি? ভাবি দিতে রাজি হলো?
  
জাফর কোন কথার উত্তর দিল না। সে আজ সোহাগের কাছ থেকে চরম একটা উত্তর পেয়ে গেছে। সে দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিল। মাঝ পথে যেতেই খানিকটা থমকে দা্ঁড়াল সে। আজ হাটবার।হাটে যেতে হবে। কতদিন হয়ে গেল রশিদাকে একটা নতুন শাড়ি দেওয়া হয় নি! আজ তার জন্যে একটা নতুন শাড়ি কিনবেই! কিন্তু টাকা কোথায় পাবে? ‘ধুর! এত ভাবলে চলে না কি? পুরনো সাইকেলটা আছে না ওটাই বেচতে হবে!


সন্ধ্যা বেলা ল্যাম্পের আলোয় পা ছড়িয়ে খে্ঁজুর পাতার চাটাই ভাঙাতে বসেছে রশিদা। জাফরের জোরাজুরিতে অঙ্গে জড়িয়েছে নতুন ছাপাশাড়ি। কি অদ্ভুত এক মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে ওর সারা শরীর থেকে! জাফর হাট থেকে ফিরে হাতে মুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওর গা ঘে্ঁষে বসল। আজ একান্ত ইচ্ছে রশিদাকে খুব আদর করবে, মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনাবে। এমনকি আজ যদি কোন পার্টির লোকও আসতে দ্যাখে অমনি ল্যাম্পটা এক ফু্ঁ দিয়ে নিভিয়ে দেবে সে! কতদিন সে বাইরে বাইরে কাটিয়ে যৌবনটা মাটি করে ফেলেছে! কিন্তু রশিদার কোন উৎসাহ নেই এতে! জাফর মনে মনে নিমপাতা হয়ে ওঠে, ‘সত্যিই কি রশি বুড়ি হয়ে গেল? না কি শোকে ইচ্ছেটা চাপা পড়ে গেছে? রশিদার কোন সাড়া না পেয়ে অগত্যা জহিরের কথা পাড়ল!
‘শুনেছিস রশি? চল আজ আমরা একটু খোকার কাছে যাই! মনটার মদ্দি বড় খামচি মারা ব্যথা রে! আর সহ্য করতি পারছি নে কো!জাফরের চোখেও আজ সত্যিই পানি দেখতে পেল রশিদা। স্বামীকে কাছে টেনে নিয়ে নতুন শাড়ির খসখসে আ্ঁচলে জাফরের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল, ‘ ব্যাটাছেলে অমন কা্ঁদলে হয় না কি! চলো! কনে যাবা চলো!

আজ আর ঝমঝমিয়ে শ্রাবণও নামল না। মায়াময় জ্যোত্স্নাও এল না! শুধু নিকষ কালো অন্ধকারে পাথরের মূর্তির মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল দুইজন! জহিরের কবরের পাশে! সহসা শুকনো বা্ঁশ পাতায় হাওয়া খেলে গেলে যেমন শব্দ হয়, এমন একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জাফর রশিদার গায়ে ঝাকুনি দিয়ে বলল, ‘কা্ঁদ প্রাণ খুলে কা্ঁদ রশি! মনের ভার কমবে কথা বল!-- ওর আত্মা জুড়োক! তুই কি কিছুই বলবি নে? একটি মাত্র সন্তান তাও তুই আগলে রাখতি পারলি নে!---আমি কোন অভিযোগ করেছি? বল এত জেদ কেন বল? মিয়াদ ফুরোলি মানষির তাই কোনও দাম নেই!----আর তো সামান্য একখান কাগজ! কিছু তো এট্টা বলবি না কি?
‘কি বলব? এই অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে আর কতক্ষণ! ঘরে চলো! আমার কিরাম এট্টা অঞ্জালা হচ্ছে!
জাফর পুলকিত হয়ে উঠল, ‘চল রশি ঘরে যাই! আজ তোকে খুব খুব আদর করতে ইচ্ছে করছে’!

আজ বহুদিন পর গভীর রাতে জাফরকে এক অন্যরকম দেখে রশিদা ডুকরে কে্ঁদে উঠল! চেকটা পাওয়ার জন্য ওর স্বামী ওর মোটেই গলা টিপে ধরেনি; শুধুমাত্র ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে আর একটি খনন কাজ চালিয়েছে! সেই মর্মভেদি কান্না ভাঙা বেড়া ভেদ করার আগেই জাফর একাই বুক দিয়ে আটকানোর চেষ্টা চালাতে লাগল!


রশিদা এখন সকাল সন্ধ্যা আকার গরম পোড়া মাটি খায়, আর ফচ ফচ করে ছ্যাপ ফ্যালে! পাড়ার ছাপিয়া খালা রশিদাকে দেখে আৎকে ওঠে ,‘বলি ও পুড়ার মরণ! এই বুড়ি বয়সে পেটে আবার একটা কা্ঁটা ঢুকোলি? বলি তোর মরণের ডানা গইজেছে? তোর পেটের ঢক দেখে মনে হচ্ছে জহির আবার ফিরে আসছে দেখিস! তোর শূন্য কোল পূন্ন হোক মা! আমার মতো আবাগী যেন আর কেউ না থাকে! এক মাত্র ছেলেডা আমার বজ্জাত বৌডার সাথে দ্ন্দ্ব করে নিজের জীবনডা শেষ করে দেলে! ঝদি বাইরে এসেও দ্বন্দ্ব করতিস তাও আজ আমার খালি পেটে হাউ হাউ করে কে্ঁদে বেড়াতে হতো না! বলি ও মা তোর ছেলে হলে আমার একখান শাড়ি দিস! তোর তো শুনি অনেক টাকা সরকার দিয়ে রেখেছে! এই ভিখারীর ভিখারীকে একটু দয়া করিস মা! তোর ভালো হবে!

রশিদার এখন সবসময় গা বমি বমি করে। আর পাড়ার নাছোড় নেতাগুলো যখন উঠোনে এসে বসে, তখন ওর পেটের নাড়ি একেবারে উল্টে আসে! ওদের মরণ কি আর কোথাও নেই!’--- রশি ভাবে। ঘন ঘন আসে আর খোঁজ খবর নিয়ে যায় চেকটা ভাঙানো হলো কি না! আর প্রতি মাসে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মঞ্চ বেঁধে ষা্ঁড়ের মতো চেঁচিয়ে আবেগে খোঁচা দ্যায়, আর কাঁদতে বলে; আর পেছন থেকে হাততালির ঝড় ওঠে! কিন্তু ইদানিং রশির পেটটা ফুলে একেবারে কুমড়োর মতো হয়ে উঠেছে! এই ঢাক ঘাড়ে করে ওই শেয়াল গুলোর সামনে আর সে কি করেই বা দা্ঁড়াবে, এই ভেবে তার সারা শরীর চিন চিন করতে থাকে!

খুব যন্ত্রণা! ঘরের ভেতর কাতরাচ্ছে রশিদা। আর উঠোনে অস্থির ভাবে পায়চারি করছে জাফর! গ্রামখানা আজ বড় থমথমে! গোটা তল্লাট একেবারে পুরুষ শূন্য! তবে কি আবার দাঙ্গা বা্ঁধল? কাল বিরোধী দলের লোকজন এসে সদরে যাওয়ার রাস্তাটা কেটে দিয়ে গেছে।কালবাটটাও ভেঙে গুড়ো হয়ে পড়ে আছে খালের জলে! জহির মরেছে কোন কালে! কিন্তু গ্রামের মানুষ গুলো রোজ একটু একটু করে মরতে বসেছে! পাড়ার প্রতিটি ঘরের মাটির দেওয়ালে, দোকানের চালাঘরে বড় বড় গাছের গুড়িতে এক একটি পার্টির লোক এক এক রকম ভাবে জহিরের ছবি সা্ঁটিয়ে গেছে। আর নানারকম ইস্তাহার লিখে গেছে! সকাল সন্ধ্যা মানুষ পথে বেরুতে ভয় পায়! রশিও বেরোয় না! মাঝে মাঝে পার্টির বড় বড় নেতাদের গাড়ি ঢোকে গ্রামে! ঝোপের আড়ালে মেয়েরা উ্ঁকি দিয়ে ফলো করে, ‘আবার একখানা চেক দিয়ে গেলো কি না!মাঝে মাঝে খালা আম্মা চোখ টিপে জিজ্ঞেস করে, ‘ও পুড়া! কখান চেক হলো? এইবার একখানা ভাঙ! অঙ্গে দুটো দে!--- তারপরে শোক তাপ করিস!    


একটি সদ্যোজাত শিশুর কান্নার ছন্দে আজ আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল! জাফর গা খুলে আজ ভিজছে! বিরাট এক তৃপ্তি সুখ সব পাবে সে! কত কাজ তার হাতে বাকি, কাল থেকে আবার শুরু করতে হবে! হঠাৎ খালাম্মার ডাকে ওর ধ্যান ভাঙল, ‘ও জাফর আব্বা ঘরে আয়! রশিকে সদরে নে।----- ওর অবস্হা খুব খারাপ!জাফর নির্বিকার! আজ মনটা তার ব্যথা ভারে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে উঠল, ‘ কি করে সদরে যাব বোঝ না! বাইরে বেরুলেই এখন গুলি খেতে হবে!

রাত্রে জাফরের দুই চোখের পাতা এক হলো না! শুধু পাশের কামরা থেকে ঘু্ঁটে পোড়ার এক অদ্ভুত চেনা আ্ঁতুড়ের গন্ধ অনুভব করলো সে!

বিহানে পাখি ডাকার আগেই খালাম্মা হাউ মাউ করে যখন কে্ঁদে উঠল, ঘুমচোখে জাফর ধড়ফড়িয়ে রশিকে একটা ঝাকুনি দিয়ে ডাকার চেষ্টা করল; তারপর ওর সারা শরীর, পাশের ন্যাকড়া চোকড়া হাতড়ে একেবারে আর্তনাদ করে কে্ঁদে উঠল! খালাম্মা ভীষন ঘাবড়ে গেল, ‘ও বাপ তুই অমন করে কি খুঁজছিস? তোর জহির এই তো আমার কোলে!
জাফর কপালে করাঘাত করে বলে উঠল, ‘আমার সব্বনাশ হয়েছে খালা! এতো দামী একখানা কাগজ ও কোথায় রেখে গেলো!’‘ওর মুখের মদ্দি দ্যাখ তো বাপ! ত্যাকন কি একটা চাবাতি চাবাতি ও খুব গোঙানি দে কে্ঁদেই অজ্ঞান হয়ে গেল!
জাফর তড়িৎ গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, রশিদার মুখটা হা করে দেখল; সেই চেকটা চিবিয়ে চিবিয়ে একেবারে আঠালো লালার সাথে ওর গায়ে লেখা নম্বর ওর টাকার অঙ্ক সব পিষে একাকার করে ফেলেছে! খালাম্মা দৌড়ে একঘটি পানি এনে বলল, ‘নে বাপ শিগগির ওর মুখে একটু পানি দে ওর ভেতরটা জুড়োক!

জাফরের চোখ দুটি কাচের গুলির মতো দেখাচ্ছে! বহু কষ্টে খালাম্মার উদ্দেশ্য সে বলল,‘কাকে দেব পানি রশিকে? ও বে্ঁচে আছে? -----মরেনি?’

রণক্লান্ত একজোড়া শুষ্ক ঠোঁটে জলের স্পর্শ পড়তেই বার কয়েক ওয়াক! ওয়াককরে থেমে গেল। নাহ! চেকটা শুকনো বমির সাথে উঠে এল না। শুধুমাত্র ময়লা কাঁথা মাদুর ফুঁড়ে অদ্ভুদ একটি কান্নার আওয়াজ ফেটে পড়ল ঘরময়!---- ঠিক জহিরের প্রথম কান্নার মত!    


About