এই সংখ্যায় ১২টি গল্প । লিখেছেন ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, দীপলেখা মুখোপাধ্যায়, রুখসানা কাজল, অলভ্য ঘোষ, পদ্মাবতী রায়চৌধুরী, তাপসকিরণ রায়, সুবীর কুমার রায়, শাশ্বতী সরকার, আফরোজা অদিতি, নীহার চক্রবর্তী, দেবাশিস কোনার ও সুজনা চক্রবর্তী ।

     সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন

    নীলাঞ্জনা

    পঞ্চাশ বছরের জীবনটাকে কোন চেনা ছকেই বাঁধতে পারেনি মনোতোষ । চুলে পাক ধরেছে অনেকদিন । লেখালেখি আর নাটক নিয়েই চলে গেলো দিনগুলো । কোন বিষাদ, বিষন্নতা কোন দিন তার মনে বাসা বেঁধেছিল কি না কেউ জানে না, হয়তো কাউকে জানতেই দেয়নি । একটা মাত্র পেট, কটা টিউশানি করে বেশ চলে যায় । টিউশানির বাজারে বেশ চাহিদা আছে মনোতোষের । তবে খুব বেশি টিউশানি করে না । দল বেঁধে পড়ুয়ারা পড়তে আসা তাও নয়, অত সময় কোথায় ? ক্লাস টেনের নিচের কাউকে সে পড়াতে চায় না । লেখালেখির সূত্রে কিছু উপার্জন হয় । এই দুই মিলে একলা জীবন বেশ চলে যায় । মনোতোষের নিস্তরঙ্গ জীবন-জলে কেউ কোন ঢিল ফেলেনি যে সামান্যতম ঢেউ খেলবে ।
     
পাড়ার চায়ের দোকানে বাপ্পার  সঙ্গে দেখা । বাপ্পা রবীন্দ্রপল্লীতে থাকে । দশ থেকে বারো  তিন বছর মনতোষ অঙ্ক শেখাতো বাপ্পাকে, এখন বোধয় কলেজের পাট চুকিয়েছে । ‘কেমন আছেন স্যার’ বলে মনতোষকে প্রণাম ঠুকে বললো -

স্যার আমাদের পাড়ায় একজন তার ছেলেকে অঙ্ক দেখানোর জন্য আপনাকে চাইছিলেন । ক্লাস সেভেনে পড়ে, যাবেন স্যার ? আমাদের পাড়ায় নতুন এসেছেন উনি, আগে বাইরে থাকতেন । 

- তুমি তো জানো বাপ্পা, আমি ক্লাস টেনের নীচের কাউকে পড়াই না ।
- বলেছিলাম স্যার ।
 - তাহলে ?
- বললেন, আমার কথা উনি না করবেন না, তুমি ওনার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও । উনি আপনাকে  চেনেন বলে মনে হলো স্যার । 

    অবাক হয়েছিল মনতোষ, তাকে কি করে চিনবে ! বাপ্পা তো বললো নতুন এসেছে, আগে বাইরে থাকতো । মনতোষ চুপ করে আছে দেখে বাপ্পা বললো ‘ঠিক আছে স্যার আমি কাল সকালে আপনাকে নিয়ে যাবো, কাল তো রবিবার । মনতোষ হ্যাঁ বা না কিছুই বললো না ।

    বাপ্পা মনতোষকে নিয়ে এলো । কলিং বেলে চাপ দিয়ে বললো,  আমি আর যাচ্ছি না স্যার, আপনি কথা বলে নিন । কাজের মেয়েটি দরজা খুলে আসুন বলে ভেতরে নিয়ে গেলো, বসতে বললো । বসার ঘর আভিজাত্য আর রুচির ছাপ স্পষ্ট । দামি সোফাতে রাখা খবরের কাগজে ডুব দিল মনতোষ । মিনিট তিনেক পরে তেরো চোদ্দ বছরের ছেলেকে নিয়ে গৃহকর্তৃ এলেন । বললেন “এর কথাই বলেছিলাম, আমার ছেলে শুভ্রদীপ, ক্লাস সেভেনে পড়ে । মনতোষের চোখ তখনো খবরের কাগজে । চোখ না তুলেই বললো, কিন্তু আমি তো নীচু ক্লাসের ছেলেদের পড়াই না । মৃদু কন্ঠে উত্তর, “তাও জানি, আর জানি, মানে বিশ্বাস করি আমার অনুরোধ আপনি ফেলবেন না । উত্তর পেয়ে অবাক হল মনতোষ । এমন অধিকারবোধ কোথায় পেলেন উনি ? বললো আমি বরং  ভালো কাউকে যোগাযোগ করিয়ে দিই । “না আমি চাই আপনিই আমার ছেলেকে পড়ান মনতোষ দা । কথায় ঘনিষ্ঠতার সুর, দৃঢ়তাও, যেন অনেকদিনের চেনা । চমকে উঠলো মনতোষ । চোখ তুলে তাকালো  “আপনি... । কথা শেষ হলনা,একই কন্ঠ বললো, আমাকে নীলাঞ্জনা বলেই ডাকতেন। আর ছাত্রীকে কেউ আপনি সম্বোধন করে না” ।
     
মুহুর্তে যেন একটা পর্দা সরে গেলো । অনেক কথা মনে পড়ে গেল । মনতোষ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল । বিস্ময় আর হতবাক মনতোষ কোন কথা বলতে পারলো না। নিজের অজান্তেই তার প্রিয় একটা কবিতার পংক্তি “জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার”... গলার কাছে এসে থেমে গেলো, উচ্চারণ করতে পারলো না । সাহস হল না ।

    খুব উজ্বল ছাত্রী ছিল নীলাঞ্জনা । মনতোষ তখন সবে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে, নীলাঞ্জনার অঙ্কের টিউটর । অঙ্কে লেটার নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ওর বাড়িতেও মনতোষের খাতির বেড়ে গিয়েছিল । ওর মা চেয়েছিলেন গ্রাজুয়েশন পর্যন্ত মনতোষই নীলাঞ্জনাকে পড়াক । মনতোষ রাজী হয়নি । তারপর নীলাঞ্জনাদের আর কোন সংবাদ মনতোষের কাছে ছিল না, শুধু জানা ছিল গ্রাজুয়েশনের পরেই ওর বাবা মা নীলাঞ্জনার বিয়ের ব্যবস্থা করেন আর স্বামীর চাকুরীর সূত্রে এলাহাবাদে চলে যায় । ওর বাবাও বদলি হয়ে যান বিহারের জামালপুর না কোথায় । সেই নীলাঞ্জনা তার সামনে দাঁড়িয়ে । কুড়ি বছর পরে যেন আরো স্নিগ্ধ, আরো পবিত্র । কপালে সিঁদুর না দেখেও কিছু জিজ্ঞাসা করলো না । অশোভন কৌতুহল মনতোষের কোনদিনই ছিল না । সন্বিত ফিরলো নীলাঞ্জনার কথায় “ এখনও থিতু হতে পারলেন না মনতোষ দা ! এ কথার কি উত্তর দেবে মনতোষ ? ঠোটের কোণে এক ঝিলিক শুকনো হাসিতে কোন উত্তর ছিল কি না, জানে না সে । নীলাঞ্জনাই আবার বললো “আপনার জন্য তো কেউ অপেক্ষা করলো না, শুধু আপনিই কার জন্য অপেক্ষা করে গেলেন মনতোষদা” ?

এ কথার কোন উত্তর মনতোষের জানা ছিল না । প্রসঙ্গ পালটাতে বললো “ কিন্তু তোমরা এখানে ...?
“তোমরা, মানে আমি আর আমার ছেলে শুভ্রদীপ । সে অনেক কথা মন্তোষ দা । গ্রাজুয়েশনের পরেই বাবা বিয়ের জন্য চাপ দিল । বিয়েতে তোমার আসার কথা ছিল না, আমিই বারণ করি তোমাকে বিয়েতে নিমন্ত্রণ করতে । সংসার আমারও হয়নি ।  শুভ্রদীপের জন্মের দু বছর পরে ওর বাবা চলে গেল, আমি ছেলেকে নিয়ে জামালপুরে চলে গেলাম বাবা মায়ের কাছে । গত বছর ক মাসের তফাতে দুজনেই চলে গেলেন আর আমি ভাসতে ভাসতে আমার পুরনো ভূমিতেই ফিরে এলাম” ।

মনতোষ নীলাঞ্জনার সেই কথাটা বুঝতে চাইলো, বুঝতে চাইলো তার নিস্তরঙ্গ জীবন-জলে নীলাঞ্জনার কথাটা কোন ঢেউ তুলে দিল কি না । 

 যাবার জন্য উঠলো মনতোষ । দরজার দিকে যেতে যেতে শুভ্রদীপের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো “আমি তাহলে সোমবার থেকেই আসছি’ । পেছনে নীলাঞ্জনার উজ্বল মুখমন্ডলে চিকিচিক করা চোখদুটো দেখতে পেলো না মনতোষ ।

মুটে ও বাবু

শিয়ালদহ বাজারে এক মুটে বাবু টিকে দশ টাকা বেশি চাইলেন।বাবু দিতে নারাজ যেন কি ভীষণ ঠকে যাবে সে।অগত্যা দশ টাকা কমেই নব্বই টাকায় রাজি হয়ে মাথায় করে মোট নিয়ে চলল মুটে। লাফিং বুদ্ধের মতো দেখতে মোটা বাবুটি ব্যাঙের মত থপ থপ করে চলেছে আগে আগে মুটে চলেছে পিছনে পিছনে। মোট মাথায় মুটে বলল;- বাবু থোরা জলদি চলিয়ে। বাবু রেগে অস্থির। -বেটা সিরাজউদ্দৌলার নাতি।ডাক্তার নিষেধ করেছেন দৌড়ঝাঁপ।হার্টের অসুখ, হাই ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, কোলেস্টেরল সব একসাথে ধরে নিয়েছে। মুটে বলল;- আপকা উমর কেয়া হ্যাঁয়? বাবু বললেন;-সামনের বছর পঞ্চাশ হবে। মুটে বলল;- উমর মে আপ হামসে ছোটা হ্যাঁয় । বাবু বললেন;- তোমার কোন তকলীফ আছে? মানে শরীর ঠিক আছেত? মুটে হাঁটতে হাঁটতে বলল;- হ্যাঁ! ঠিক আছে বাবু।লেকিন বহুত ভুখ লাগে।জাদা নিঁদ ভী আতা হ্যাঁয়। বাবু মনে মনে বললেন কি জ্বালা।বেটার খাবার নেই খিদে পায়।ফুটপাতে থাকে বেটার শোবার জায়গা নেই তবু ঘুম পায়।আর আমার সব আছে অথচ আমার খিদেও পায়না ঘুমও পায় না। ইনফ্যান্টের বাচ্চার মত ডাক্তারের রুটিং মেপে চলতে হয়। বাবুটি আগে আগেই চলছিল মুটেটি বাবুকে অনুসরণ করেই চলছিল পেছনে।কিন্তু বাবুটি বেশ বুঝতে পারছিল তার পকেটে হাজার টাকা থাকলেও সে মুটে টির চাইতে এ জীবনে অনেক টা পিছিয়ে রয়েছে। তবু বাবু টক অম্বলের ঢেকুর তুলতে তুলতে;ঠিক কতটা পিছিয়ে রয়েছেন মেপে দেখার জন্য; বললেন;- যা খাও হজম হয়তো? মুটে এক গাল হেসে বলল।-লোহা ভী হজম হয়ে যায় বাবু। মুটে টাকে হিংসা হতে লাগল বাবুটির।তবু গন্তব্যে পৌঁছে একশ টাকা দিলেন বাবু। মুটে অতিরিক্ত দশ টাকা না নিয়ে লুঙ্গির তলা থেকে ময়লা কাপড়ের বটুয়া ব্যাগ বার করে তা ফিরিয়ে দিতে গেলে। বাবু বলেন;- থাক। মনে মনে বললেন অতিরিক্ত খেয়ে কি লাভ;হজম করতে না পারলে! গাড়িতে মাল তুলে সেলাম করে মুটেটি চলে গেলে বাবু টি সিটে বসে ফর্দ মিলিয়ে হিসেব কষে চলল।গাড়ি যখন মৌলালির মোড় পার হচ্ছে;বাবুটির মনে হল ওই মুটে বেটা যদি তার থেকে একদিনও বেশি বাঁচে তাহলে সে লাভবান হবে ।বাবু তবু কখনো মুটে হবার কথা ভাবতে পারলেন না। এদিকে মুটে বেটার এতো কিছু ভাবার সময় নেই । সে আবার একটা বাবু খুঁজতে লাগলো আর একশো টাকা পেলে সে আজ গোস বিরিয়ানি দিয়ে রাতে দারু খাবে চ্যামেলির ঠেকে। বেশ খোশ মেজাজে । মুটেটা নিজের অজান্তেই যেন বাবু হতে চাইল।






শিরোনাম

"হ্যালো,এটা ক্লাস ফাইভের অর্ঘ্য ঘোষের বাড়ি?"
"হ্যাঁ, আমি ওর মা, বলছি,বলুন।"
"আমি অর্ঘ্যর স্কুল থেকে বলছি,ওর ফি বুকে কিছু প্রবলেম আছে, আপনাকে ১২টার মধ্যে একবার আসতে  হবে।"
একটু ইতস্তত করে ইন্দু বলল,"কাল গেলে হবে না ? আজ ওর বাবা আউট অফ টাউন।,"
"না না, আজই আসতে হবে, কাল সব সাবমিট করে, রেজাল্টের কাজ শুরু হবে,না হলে আপনার ছেলের কিন্তু রেজাল্ট পেতে অসুবিধে হবে।"
"ওও, আচ্ছা আচ্ছা, আমি আসছি।"

ইন্দু খুব তাড়াতাড়ি পোশাক পাল্টে, তার আঠেরো মাসের মেয়েকে সেরোল্যাক গুলে খাইয়ে,পাশের ফ্ল্যাটের মাসিমার কাছে দিয়ে এসে, অটোর লাইনে দাঁড়াল। গুড্ডি মাসিমার কাছে ভালোই থাকে। মাসিমা আর মেসোমশাই ভীষণ ভাল মানুষ। এক ছেলে আইটিতে আছে, দক্ষিণে সেটেলড, দুজনের একাকিত্ব গুড্ডি ভরিয়ে দেয়। মাসিমাকে দেখলেই মেয়ের মুখে একমুখ হাসি, মেসোমশাইকে একটু ভয় পায়,  গোঁফ জোড়া আর চশমাই কারণ বোধহয়।
এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে, তার গন্তব্যের রুটের অটো এসে গেল। অটোতে বসেও চিন্তা পিছু ছাড়ে না। সুভাষ কি বলবে আবার কে জানে?  মেয়েকে কারুর কাছে ছাড়তে চায়না একদম। মেয়েকে  ছাড়া তো বাবুর চোখে অন্ধকার। আর মেয়েও হয়েছে তেমনি, বাবা পেলে আর কিচ্ছুটি চায়না। মাঝে মাঝেই সুভাষ বলে,' যাই বল, গুড্ডি এসেই বাড়িটা আমাদের আনন্দে ভরে দিয়েছে, আমার কেমন এত দিনের আটকে থাকা প্রমোশনটা টপ করে হয়ে গেল, লটারিতে হাউসিং এর ফ্ল্যাট পেয়ে গেলাম।
ইন্দু হাসে, আসলে মেয়েটা সবাইকে জাদু করেছে। কলেজ মোড় আসতেই, অর্ঘ্যর ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এসে গেল। ইন্দু সব কাজ মিটিয়ে ঘড়ি দেখল এগারোটা পঁয়ত্রিশ,ভাবল আর পনেরো মিনিট পরেই  অর্ঘ্যর ছুটি হবে, তবে ছেলেটাকে নিয়েই যাই সাথে করে। প্রায়ই বলে 'মা, তুমি আর আমাকে নিতে আসো না। সবার বাবা মা আসে, আমার শুধু পুলকার কাকু। মাসিমার বাড়ি ফোন করল, রিং হয়ে যাচ্ছে, কেউ ধরল না। একটু চিন্তায় পড়ল, আসার সময় অটো থেকে নেমেই ফোন করেছিল, মাসিমা হেসে বলেছিলেন, "হ্যাঁ গো, তোমার মেয়ে ঠিকই আছে, আমার কোলে চড়ে ঘুরে এল, তোমার মেসোমশাই তার সাথে ভাব করার জন্য ক্যাডবেরি আনতে গেছে।"
স্কুল থেকে বেরিয়েই অর্ঘ্যর আনন্দ আর চিপসের বায়না উপভোগ করতে করতেই, ট্যাক্সি  নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল ইন্দু। অর্ঘ্যকে নিয়েই পাশের ফ্লাটে গিয়ে বেল বাজাল, একবার, দুবার,তিনবার, চারবার। কোনো সাড়া নেই। এবার দরজাটা ধাক্কা দিল, ওমা দরজাটা তো খোলা,ভেজানো!! ঘরে ঢুকে দেখল ঘরে কেউ নেই। মাসিমা,মাসিমা!! করে ডাকতে ডাকতে বেড রুমে ঢুকেই দেখে গুড্ডি বিছানায় ঘুমোচ্ছে। একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলে ভাবল, কি বেয়াক্কেলে লোক এরা বাব্বা! মেয়েটাকে একা ঘরে রেখে দুজনে কোথায় চলে গেল?! আর কোনো দিন মাসিমার কাছে গুড্ডিকে  রাখব না। মনে মনে গজগজ করতে করতেই বিছানায় এসে, মেয়েকে কোলে তুলতে গিয়ে একটু চমকে গেল। মেয়েটা কেমন নেতিয়ে ঘুমোচ্ছে না!! গুড্ডি! গুড্ডি! চোখের পাতা একটু নড়ল! ঢাকা চাদরটা সরিয়ে দেখল, ডবল ডায়পার পরানো, আর সে যে ব্রান্ডের ডায়পার পরায় সেটাও নয়! চাদরটায় একটু পটি আর রক্তের দাগ ।  মেয়েটার পায়েও খানিকটা মোছানো ফিকে রক্ত। কোলে নিতেই, হাত পাগুলো ঠান্ডা ঠেকল। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠল বুক। ডান পায়ের পাশ দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। প্রচন্ড ভয়ে দুশ্চিন্তায় প্রথমে মাথা কাজ করছিল না ইন্দুর। তারপর প্রথম যে শব্দটা মাথায় এল, সেটা "ডাক্তার "। চিৎকার করে অর্ঘ্যকে বলল, "বাবু লিফটে চ।" পড়িমরি করে পাড়ার ডাক্তারের কাছেগিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ওর কি হয়েছে কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা ডাক্তারবাবু, আমার মেয়েটা কে বাঁচান!!" ডাক্তার মেয়েটাকে পরীক্ষা করেইবললেন,'কুইক, হাসপাতাল নিয়ে যান। সাথে পুলিশকেও খবর দিন। ইট'স দা কেস অফ রেপ।" কি কি!!. ঠিক শুনছে তো ইন্দু? নাকি ভয়ে কানটাই খারাপ হয়ে গেল ওর। গুড্ডি, গুড্ডি...গুড্ডি.. তখন চোখও  নাড়াচ্ছে না আর। তারপর পাড়ার কয়েকজনের সাহায্যে গাড়িতে হাসপাতাল, ডাক্তারের ডেথ সার্টিফিকেট, পোষ্টমর্টেম এর জন্য গুড্ডির ছোট্ট শরীরটা কোল থেকে নিয়ে চলে গেল ওরা।
তখন....
অর্ঘ্য মায়ের আঁচল জড়িয়ে ধরে ভাবছে, বোনের ঠিক কি হয়েছে? জ্বর?  ও কি খুব পটি করছে? মা কাঁদছে কেন?
সুভাষ তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার জন্য প্লেনের চেক ইন এর লাইনে। তার খুব তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরা দরকার, গুড্ডি কি 'পাপা' 'পাপা' বলে কাঁদছিল তখন? অসহায় মেয়েটার বড় প্রয়োজন ছিল তখন বাবার। সুভাষ ভাল বাবা হতে পারলনা।
ইন্দু এক ঘন্টার মধ্যে দশ বছর বয়স বাড়িয়ে মাথায় হাত দিয়ে ভাবছে, আমি তো ফুলপ্যান্ট পরিয়ে দিয়েছিলাম, ফুল হাতা জামা, মোজা,এমন কি টুপি অবধি, তবে?  তবে?... মাত্র তো আঠেরো মাস ওর বয়স,  তবে?.. কবে যেন খবরে শুনেছিল, "দিল্লীর হাসপাতালে এক বছরের বাচ্চার রেপের কারণে মৃত্যু!"
কাল খবর ছিল, আজ সেটা ঘরে। কাল গল্প ছিল, আজ সেটা কঠিন বাস্তব। আজ তার বুক খালি, কোল খালি করে চিরতরে চলে গেল,আদরের গুড্ডি।

বাইরে তখন সংবাদমাধ্যমের ভীড়, শিরোনামের খোঁজে, নতুন তাজা খবর পাওয়া গেছে।


মোতি

খিদে নাগে যে। তাই বলে চলে আসবি? কেমন কথা বল তো! এই সেদিন বিয়ে করলি, আজই সব ফেলে চলে আসলি। কি যে করিস ! সর, সরে বারান্দায় গিয়ে বস। চাল ডাল মরিচ রসুন পেঁয়াজ, তেল মাখানো খিচুড়ি থেকে সুগন্ধ ছুটছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে সরে বসে মোতি। মা মিটসেফের ভেতর মাথা গলিয়ে বিস্কিটের কৌটা বের করে একটা বাটিতে ঢেলে দেয়, নে এগুলো খেয়ে গোসল করে আয়। খিচুড়ি হতে আর কতক্ষণ! মোতি দু হাতে হামলে নেয় বিস্কিটগুলো। শিশুর মত একটা হাসি ভেসে যায় ওর মুখে। শুকনো বয়সি মুখ। পুরানো জুতার মত থ্যালথেল করছে মুখের মাংস। চোখের কোণে নির্ঘুম ক্ষুধার সাদাটে দাগ। অনেকগুলো বিস্কিট মুখে পুরে মোতি আমাদের বাড়ির সভ্যতা ভুলে গবগবিয়ে বলে, সত্যি কতিছি বড়ভাবি, এজম্মে আর বিয়ে করবো না। এই খিদের কিরে ! পেটের উপর হাত রেখে ছলছল চোখে মোতি শপথ করে। মা হাসে না। গম্ভীর মুখে চুলোর কাঠ নেড়ে চেড়ে মতির গ্লাসে পানি ভরে এগিয়ে দেয়। ঠোঁটের উপর অস্বচ্ছ লোমে লেগে থাকা বিস্কিটের গুঁড়ো মুছে মোতি পানি খায়। নতুন শাড়ির কড়কড়ে আঁচলে ঠোঁট মুছে ককিয়ে ওঠে, হুজুর আমারে মারিছে। কয়িছে নাস্তিক ডাক্তারের বাড়ি থাকি তুই নাস্তিক হয়ি গিয়িছিস হারামজাদি। কি ইইই --? রহমত মেরেছে এটা সত্যি ? মোতির ফর্সা পিঠে চাক চাক দাগ। আমার মা ছোট ছোট তারার মত চোখে চেয়ে থাকে। মার চোখে বিশ্ব মা। 

মোতি এক শিশু মানুষ। কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে। যে বা যারা ফেলে দিয়েছিলো কাক শকুনের খাদ্য করে সেখান থেকে ওকে তুলে এনেছিল গ্রামের এক অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। কপাল জুড়ে কালো কালো কাক ঠুকরে দেওয়ার দাগ। কতবার যে বিয়ে হয়েছে বা করেছে তার হিসাব রাখা কঠিন। রহমত হুজুর একা থাকে। খাওয়া দাওয়ার বড় কষ্ট । ষাট পঁয়ষট্টি বয়সে আর শরীর কি ! একজন পরিচর্যাকারী স্ত্রী রেধেবেড়ে ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখবে এরম হলে চলবে এই শর্তে মোতিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে চারদিন আগে বিয়ে করেছে। কারো নিষেধ বারণ না শুনে মোতি বিয়ে করেছে স্বেচ্ছায়। বড়ভাইজান ইফতার করতি আসলি একটা কথা কবো । কি কথা? ভাইজানরে কবো আপনি রোজা নামায পড়েন। কত মাইনসেরে কত উপকার করেন। রহমত হুজুরের লাহান একখান টুপি পরি ওষুধের দোকানি যাতি পারেন না। তালি কেউ আর আপনেরে নাস্তিক কতি পারবি নানে। 

এতক্ষণে মা একটু হাসে। নিভে যাওয়া চুলোর আগুনের মত দু চোখ ভরে আশ্চর্য জ্বলন রেখে বলে, ধর্ম কোনো দেখানেপানা জিনিস নয় রে মোতি। নামায রোজা হজ্জ্ব যাকাত কে কেমন করছে তা তো আল্লাহ দেখছেনই। লোক দেখিয়ে বা জোর করে ধর্ম পালন করতে, করাতে নেই। যা গোসল করে আয়। খেয়ে ঘুম দে। মোতি বিশাল দৈর্ঘ্যের সুললিত সুন্দর শরীরটা তুলে উহ করে ওঠে, তয় বড় ভাবি এটা তো সত্যি তাই না, নামায, রোজা হজ্জ্ব ,যাকাতের লাহান খিদেও আল্লাহ বানাইছে? তয়? যে পারবি সে রোজা করবি, না পারলি না করবি। আল্লাহ্ যা শাস্তি দিবার তাই দিবিনে মাইনসের এত কি ! 

আমি জুট ইজ দ্য গোল্ডেন ফাইবার অফ বাংলাদেশমুখস্থ করার ফাঁকে আল্লাহকে ডাকি, হে জগৎপিতা পরমেশ্বর, হে এক ও অদ্বিতীয় খোদা, সমস্ত শাস্তি ও পুরষ্কার দানের অধিকার একমাত্র আপনার। এ বিশ্ব আপনার সৃষ্টি। দোযখগুলোও। আর অই ইবলিশ শয়তান। যে কিনা আপনার বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করার ক্ষমতা ও সাহস রাখে, আমাদের মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানুষ তাকে কি করে ঠেকাই! আর এই ক্ষুধা? সে তো আপনারই দেওয়া। পবিত্র এই মাগফেরাতের দশ দিনে আপনি দোযখগুলো চিরতরে গুঁড়িয়ে দিন, সব মানুষের অন্তর চিরদিনের জন্যে ভালোবাসায় পূর্ণ করে দিন। আমরা যেনো সবাই সবাইকে সাম্যে, সাধ্যে, ধর্মে, আচরণে সমানভাবে ভালবাসতে পারি। দারিদ্যের কষাঘাতে পেটপিঠ মিশে যাওয়া কল্যাণপুরের অই রিকশাচালক, কর্মক্লান্ত মানুষ যেনো এই তপ্ত দুপুরে এক গ্লাস পানি ও খাদ্য খেতে পারে ! আপনার অজ্ঞাত এবং অসাধ্য তো নয় কিছুই। হে মহাক্ষমতাশালী মহা সৃষ্টিধর, আপনাকে ভালোবেসে ডাকতে চাই। জোরজুলুম নির্যাতনে নয়। আমার মোনাজাত কবুল করুণ আল্লাহ্।



শূণ্য

মনিরুল গ্রামে ভাগচাষি ছিল৷ অন্যের জমিতে চাষ করত ৷ অত অল্পে সংসার চালানো বড় কষ্ট৷ । এখন সে পার্ক সার্কাসের বস্তিতে বউ ছেলে নিয়ে থাকে ৷ আর ঘরামির কাজ করে নানা জায়গায় ৷ নর্দমার উপর কাঠের পাটাতন রেখে তার দরমার ঘর ৷ এখানে বর্ষায় রেললাইন টপকে ঘরে ময়লা জল ঢুকতে থাকে ৷ নিচটুকুতে ময়লা পোকামাকড় সাপখোপ নোংরা জল ভাসতে থাকে ৷ তক্তপোষের উপরে চাদর বিছিয়ে অনায়াসে তারা মাংস ভাত রসিয়ে খায় ৷ আগে পারত না, ঘেন্নায় খাবার ভিতর থেকে উগরে আসত, এখন অভ্যাস হয়ে গেছে ৷ 

আজ তিনবছর ধরে যে বিল্ডিংটা তাদের কম্পানী তৈরী করছিল , চল্লিশ তলা...আজ তার শেষ ছাদ ঢালাই ৷ কত নতুন মানুষ আসবে ৷ খোপে খোপে তৈরী হবে সুখী গৃহকোণ ৷ মনিরুলদের মত ছাপোষা শ্রমিককে তখন কেই বা মনে রাখে ! বড় যত্ন করে এখানকার প্রতিটা ইঁটে তার ছোঁয়া রেখেছে সে ! কোম্পানী তাদের নুন ভাত জোগায়, তাদের ক্ষতি করবে না সে৷কাজ শেষ করেই আজ নিচে নামবে মনিরুল ৷ সকালেই বড়সাহেবের কাছে গিয়েছিল সে ,কিছু টাকা ধারের বড় দরকার ! এখন যে টাকা সহজে মিলবে না তাও বুঝে এসেছে ৷ 

এদিকে সন্ধ্যা নেমে আসছে ৷ হাত লাগিয়ে শেষ সিমেন্টের পোঁচ মারতে লাগলো মনিরুল৷ সব ঘরামি রাজ মিস্তিরিদের মনে আজ উৎসব লেগেছে...নিচে গ্যারেজের কাছে বড় তোলা উনুনে একটু আগেই আঁচ পড়েছে, সে দেখে এসেছে ৷ ছাদ ঢালাইয়ের খাসির মাংসের গন্ধ ভুরভুর করে বাতাসে সুবাস ছড়াচ্ছে ৷ এতদিনের কষ্টের পর কত দামি লোক এসে এখানে থাকবে ৷ আবার জীবনের কত অজানা গল্প তৈরী হবে ৷ ইঁটটা গেঁথে সে দড়িতে বাঁধা ভারায় পা রাখলো...আজ অসম্ভব হাওয়া ৷ নীচ থেকে সব বলছে, - দেকে লাব মনিরুল ! এটুকু হলেই কাজ শেষ... -এ কোন ব্যাপার নয় ...এত হাজারবার উঠলাম লাবলাম...আর এটুকু হলেই তো কাজ শেষ৷ কিন্তু এত উঁচু থেকে পৃথিবীটা এত সুন্দর, এই মায়া ছাড়তে সাধ যায় ! হাত থেকে মাখা সিমেন্টের পাতিলাটা পড়ে গেলো হড়কে ৷ নীচে পড়ছে পাতিলা...আর সেটা ছড়িয়ে মাটিতে কাদার মত লেপ্টে গেলো কয়েক সেকেন্ডে ৷ একি ! এসব দেখতে গিয়ে এত অভিজ্ঞ মনিরুলেরও হিমশীতল ভয়ে পা কেঁপে যায়... সবাই আর্তনাদ করে দেখছে...এবার মনিরুল পা স্লিপ করে চল্লিশতলা থেকে সজোরে নীচে পড়ছে... আর মনিরুল শূন্যে ভাসতে ভাসতে শেষবারের মত হিসাব করে নিচ্ছে ...এখান থেকে পড়ে মরার পর কোম্পানী ছেলেকে একটা চাকরী দেবে, বৌ পাবে দু লাখ টাকা...ছোট ছেলেটার হার্টে ফুঁটো...কাল রাতে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে ৷ অপারেশনটা একসপ্তাহের মধ্যে হলে বাচ্চাটা বেঁচে যাবে... শুধু এখন একটাই আক্ষেপ...ছাদ ঢালাইয়ের মাংস ভাতটা আর খাওয়া হলো না তার...

About