গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

বুধবার, ১৫ আগস্ট, ২০১২

৩২ তম সংখ্যা ৩টি গল্প 'অথঃকামিনী আখ্যান / মিত্রপক্ষ সাই, অল্প-স্বল্প গল্প গাথা' / মৌ দাশগুপ্তা, ও 'সময়' / ডঃ কাকলী মুখোপাধ্যায়




অথ : কামিনী আখ্যান


মিত্রপক্ষ সাই









কামিনী গাছটার আজকাল বড্ড দেমাক হয়েছে।


দুষ্টু মিষ্টি এমন একটা নাম নিয়ে আজীবন সুড়সুড়ি দিয়ে গেছে আমায়। এখনও বুঝলাম না এই সাদা ফুলটার নাম কামিনী কে রেখেছিল। এমনটাও হতে পারে নির্ঘাত সদ্য বিধবার প্রেমিক ছিল ব্যাটা। সিনেমার নায়িকাদের সাদা শিফনের শাড়ি পরে বৃষ্টি ভিজতে দেখেছি। এছাড়া আমি কস্মিনকালেও কোন সাদা কামিনীকে দেখিনি আমার ইঁদুর চোখে।
আসলে সোজাসুজি কামিনীর দিকে তাকাতে লজ্জা পাই। বেবাটের মতো লাগে আমায়। আবেগের ট্রাফিকে অকারনে হাজির হয় সার্জেন্ট। ড্রাইভিং লাইসেন্সটা দেখান তো!
গত দুই দশক ধরে এপ্ল্যাই ফর স্ট্যাটাসে আছে! হাজার টাকা ফাইন। কোনমতে তিনশ তে রফা করে নমস্কার দেই। এ বড়দের জিনিষ, তোমার জন্য নিষিদ্ধ বাছা, কষ্ট পেয়োনা। আরেকটু বড় হও, স্ট্যাটাস কনফার্ম হবে, তখন দেখ।
তাই আমি বলি আমার মন ইঁদুর চোখা। ঈশ্বর চোখটাও দিলেন না ঠিকঠাক। সব অনাসৃষ্টি আমার মধ্যে ঢেলেছেন অকাতরে। কে জানে কোন কালে ওনার প্রেমিকাকে দেখেছিলাম কিনা কোন ট্রাফিক সিগন্যালে। তাই আমি শাপগ্রস্ত ইঁদুর চোখা হলাম কিনা! স্বপ্নেও দেখতে পাইনা কামিনীর শরীর, সমস্যা একটাই ঐ আমার ইঁদুর চোখ আর ট্রাফিক সার্জেন্ট এন্ড হারু স্যার।


একবার ক্লাশ এইটে বর্ণালীর বইয়ের পাতায় রেখে দিয়েছিলাম কামিনি ফুলের গুচ্ছ। ঐ বয়সটায় এতো আইন কানুন জানতাম না তো! সে তখন ক্লাশ ফাইভ। জলে বাঁশের অঙ্ক মুছে গিয়েছিল। আমার জল বাঁশের খেলা সেদিন পাক্কা করেছিল এই কামিনী ফুলের গুচ্ছ। বর্ণালীর বই হয়ে আমার পিঠে হারু স্যারের বাঁশের কঞ্চি, কামিনী ফুলের পুষ্প বৃষ্টি বলার কোন কারন নেই। মা তেল মাখাতে মাখাতে অভিসম্পাত করেছিলেন হারু স্যার কে। আমার ছেলের গায়ে হাত! দেখে নিস কি হয় তার। নিজের তো একটা ছেলে নেই। মায়ের অভিসম্পাতে ব্যাথা কমে গিয়েছিল, ভ্যাবলার মতো কেঁদেছি আমার কামিনী ফুলের জন্য। মার খেয়েও সেদিন মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ক্লাশে ফিরেছিলাম আমার কামিনী ফুল। লাল চোখে কামিনী ফুল হাতে নিয়ে বসেছিলাম কাঠের বেঞ্চে। কেউ ছিল না, পিকলুদা এসে তেঁতুলের আচার দিয়েছিল কাগজে করে। তখন খাইনি রাগে, তবে ও চলে যেতেই কাগজ শুদ্ধ পকেটে পুরেছি। আর শুধু কেঁদেছি। ভেবেছিলাম কাঁদলেই আমার সামনে এসে দাঁড়াবে বর্ণালী, বলবে আর কেঁদোনা, আমি তখন ওকে আদর করে দেব পত্রিকায় মোড়া তেঁতুলের আচার।


টিফিন টাইম চলছিল, আড় চোখে বর্ণালী এসে উঁকিও দিল। আধ খোলা বেতসের মতো পিঠে বেত মারার দাগ। ঠিক পঞ্চাশ বেত, গুনে গুনে। পিকলুদা গুনেছে আর আমি পিঠ পেতেছি, হারু স্যার মেরেছে, মধ্যে একবার জিরিয়েছে নিভু বিড়ি জ্বালাতে। সেদিন অভিশাপ দিয়েছিলাম আজ সাইকেল এক্সিডেন্টে মরবে হারু। দিব্যি বেঁচে আছে আজও। তিন ছেলের বাপ হয়েছে।


সেদিনও চোখ তুলে তাকাতে পারিনি বর্ণালীর দিকে। জিভ বের করে ভেংচে দিয়ে বলেছিল, এত্ত বড় ছেলে কেমন কাঁদে দেখো। একটা চকোলেট ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়েছিল। ব্যাথা আরও বাড়ে, আমার চোখের তরল, নাকের ঘন পদার্থের সঙ্গে মিলেমিশে ঠোঁটে গড়াগড়ি খায়। স্যার এসে অংক ধরবে শুনেই অবশ্য পরের ক্লাস পর্যন্ত এই শোক রাগ চালিয়ে গেছি। অ্যা... অ্যা...। পড়া ধরতে হারুর ব্যাটা সামনে এলেই আবার রাগরাগিণী সঙ্গে তরল পদার্থের ফ্যাত ফ্যাত।
সেদিন থেকে কামিনী ফুল আমার সঙ্গী। এরপর অনেকদিন আর দেখিনি বর্ণালীর দিকে। দেখলেই মনে হতো তাকিয়ে আছে হারু স্যার।


বাইশে শ্রাবনের সন্ধ্যায় মঞ্চে হঠাৎ দেখি আমার ক্লাস সিক্সের বর্ণালীকে। দীর্ঘ দুই যুগ উত্তীর্ণ। এখনও বুকের ভেতরটা কেমন জানি কেঁপে কেঁপে উঠে। আজকাল একটু বড় হয়েছে আমার চোখ। মানে মেয়েদের দেখলে চোখ ঘুমিয়ে থাকেনা, পিটপিট করে। উন্নতি যে হয়েছে নিজেই টের পাই। চুলে সেই কামিনী লতা জড়িয়ে গাইছে 'তোমার কাছে এবর মাগি...মরণ...' আমার অনেক কাল আগেই মরণ হয়েছে সখী, আর ফিরেও তাকাই না তো। আবার কেন! আরেকবার চাইছে নাকি হারু পর্ব! আমার চোখে চোখ রেখে গেয়ে যাচ্ছে কেন! মরণ চাহি...। কি সাঙ্ঘাতিক! বাতাসে বারুদের গন্ধ! ঈশ্বর কোথা যাই এবার! আমার বাইশে শ্রাবন টের পেয়ে কেটে পড়লাম। যদি চেয়ে বসে সত্যি সত্যি ঐ মরণ টাইপ কিছু!
পিঠের ব্যাথা এখনও হয় সুন্দরী। তাই আর চান্স নেবোনা। সিগারেট ছাড়া নিজের সঙ্গে কেউ থাকেনা এইসব দুখ্যু দুখ্যু মুহূর্তে। ইঁদুর চোখে বর্ণালীর গ্রাফিকাল একটা ইমেজ তৈরী করে নিলেও, খুব বেশী একটা পাত্তা দিইনি। নিজেকে বেশ ড্রাইভিং লাইসেন্স টাইপ লাগছে। এখন আমি ফলন্ত। আজকাল কামিনী, জুঁই, জবারা আমায় সারাদিন ইনবক্সে আদর করে। আমার কাতুকুতু লাগে সারাদিন। বৌদি আর নেবা মানে আমার পোষা একটা ইঁদুর আছে দুজনেই আমার সাক্ষী।
কেমন আছো?
এই রে! ঘাবড়ে গেলাম। আমার সামনে যমদূতের বউ। তবে সুন্দরী। এই প্রথম বর্ণালীর মুখোমুখি আমি। প্যানেল ডিসকাশনের অফার দেবে নাকি! শুনেছি একটা চ্যানেলে খবর পড়ে। আমি যা ভাবি তাই হয়। আজ আমার বাইশে শ্রাবন হবে পাবলিকলি। আমি নিশ্চিত। হারু স্যারের বেত মনে পড়ে গেল। আশেপাশে কেউ নেই তো!
না আজ অন্য ভাষায় কথা বলছে ক্লাশ ফাইভের বর্ণালী। আবার ছলকে উঠলো আমার বুকের মধ্যে একগাদা মুরগীর বাচ্চা। মনটা কোনদিন আমার বশে থাকেনা। যখন খুশী ঝরে পড়বেই, লাজলজ্জা নেই এতটুকু। তবে আজ আমার ইঁদুর চোখ সামলালাম, পিটপিট করছে না টের পাচ্ছি।
- হুম ভালো, মুরগী টাইপ উত্তর দিলাম কোনমতে। পাল্টা একটা কালাম মিশাইল আমিও ছাড়লাম। বিয়ে হয়ে গেছে!
- এখনও তাকাতে পারো না আমার দিকে নাহ! মোবাইল নম্বরটা দাও।
- ভুলে গেছি।
- কি! নিজের নাম্বারটাই ভুলে গেছো? হারু স্যারকে মনে আছে!
এ দেখি মনমোহিনী ইস্তেহার। ভরিয়ে দিচ্ছে একদম। নির্বাচন তো হয়েই গেছে, আবার কেন বাপু! আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে নিজেই টিপল নম্বরগুলি বেশ নিপুন হাতে। নিজেই মিস কল দিল নিজের মোবাইলে। আমি তখনও ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছি মাথা নিচু করে। সিগারেটের ছ্যাঁকায় মুখ বেঁকে গেল।
- ওটা শেষ হয়ে গেছে, কাউন্টার পার্ট নেই আর! ফোন করলে রিসিভ করো কিন্তু। মুচকি হেসে লাল শাড়ি উড়িয়ে চলে গেলেন। আস্কারা, মাশকারা সব পেয়েছি, আমার আবার সেই চিকেন টাইপ স্বপ্ন দেখা শুরু। জবাই এবার হবই আমি নিশ্চিত।
মেয়েদের সামনে দাঁড়ালে পুরুষকূল মুরগী টাইপ বিহেভ করে। তবে একটু আস্কারা পেলে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞাপনও বেমালুম ভুলে যায়। পুরুষের এই হল সবচেয়ে বড় রোগ। হাইব্রিড দিল আমার, যায় কোথায়! কি দারুণ মিলিঝুলি রসায়ন, আহা, কামিনী, বর্ণালী আর আমার হাইব্রিড মুরগী হৃদয়ের!


এরপর থেকে আবার কামিনী ফুলের প্রেম। কিচ্ছু ভালো লাগেনা। মা বলেন, চোখটা দেখা তো একবার। খুব বেশীই পিটপিট করছে আজকাল। বৌদি বলে, এতো ধকল সইবে কেমন করে এইটুকু বুকে। মানে আমার টেনেটুনে চব্বিশ ইঞ্চির বুক। কিচ্ছু বাদ দিইনি সেবনে। ছাগলের বড়ি দুধ সহযোগে আমার এক দাদার পরামর্শে। সকালে উঠে বাদাম, ভেজা ছোলা, লিভোসিন কিচ্ছু বাদ দিইনি। মধ্যে জগিংও শুরু করেছিলাম। কিন্তু এক সকালে ঘুম চোখে উঠতে গিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে ঠ্যাঙ ভেঙ্গেছি। তিনমাস বিছানায়। যখন ফিরলাম তখন প্রথমেই রিফিউজ করলেন আমার চীফ এডিটর। আরেকটু জিরিয়ে নাও, স্বাস্থ্যটার যা অবস্থা। মুচকি হেসে এন্ট্রি নিয়েছে বিল্লু সুন্দরী। মানে আমার সিনিয়ারের গার্ল ফ্রেন্ড। বেশ দেখতে, আবার চোখ পিটপিট। এতো কৃচ্ছ্রসাধন করেও গায়ে এক চড়ুইয়ের মাংস লাগাতে পারিনি। স্নানে গেলেও জামা খুলিনা। আয়না যদি লজ্জা পায়! শুনেছি আয়না নাকি স্ত্রীজাতীয়।


হিসেব করে দেখলাম আমার কামিনী গাছের বয়েস এখন একুশ। একুশের স্বাধীনতায় হাসছে তার রুপ। তাই বেড়েছে আজকাল বিদ্রুপ। বর্ষার সময়টায় রূপে গন্ধে ওয়াইল্ড স্টোনের বিজ্ঞাপন। মোটা পাতায়ও ঢাকেনা শরীরের আনাচকানাচ।
সবুজ শাড়ীতে বর্ণালী আজ বসে আমার মুখোমুখি। বিয়েটা কবে করলো কে জানে! সাজানো সংসার। পরিপাটি সুখ। বৃষ্টি আড়াল করে রেখেছে দিনের আলো, বর্ষা দুপুরে একান্তে আমি আর আমার ক্লাস এইটের বর্ণালী।
লাইম জিনে চুমুক দিয়ে শরীরটা কেমন জানি করছে। দুজনেই চুপচাপ। সামনে পাঁঠার কুচি কুচি হৃদয়ের টুকরো গাঁথা টুথ পিকে, সাদা ডিশে।
সেদিন কতটা মার খেয়েছিলে হারু স্যারের কাছে? খুব! আজ যদি আবার কেউ এভাবে মারে তোমায়?
এই রে, আবার কামিনীদণ্ড! এই যাত্রায় গণমৃত্যু নিশ্চিত, এসমস্ত কেস বহুবার দেখেছি। এখন এতো বছর পর প্রতিশোধ নেবে নাকি নিজের ঘরে ডেকে এনে!
উড়ে গেছে শরীরের সব ক্যামন ক্যামন ব্যাপার সেপার, ফুড়ুৎ করে। আমি এখন যাই বর্ণালী, থ্যাংক্স।
ওইটুকুই শুধু বলতে পেরেছিলাম মনে আছে। শেষ বাক্য জবাই হওয়ার আগে।


যখন সম্বিৎ ফিরে এলো তখন দেখলাম, হাল্কা সবুজ বিছানায়, কামিনীর শরীরে লেপ্টে আছি আমি। আমার পিঠে হাত রেখেছে বর্ণালী। অজস্র চুমুতে আমার পিঠ আজ সত্যিই সুস্থ। আমার ঠোঁটে বর্ণালীর নিভৃত অত্যাচার।
কামিনী ফুলের এই মৃত্যুই ছিল আমার জন্য ঈশ্বর প্রদত্ত। সেই প্রথম নিজেকে দেখলাম, প্রকৃতি কোন খেয়ালেই আমার সাথে কোন প্রতারণা করেননি বিশ্বাস করলাম। আমি উন্মুক্ত এক বিহঙ্গ, মিশে আছি আমার প্রথম প্রেম বর্ণালীর শরীরে। জানি শুধু বেঁচে আছি আমি আর আমার বর্ণালী।
মরেই সুখ এই বর্ষায়। ফুলের গন্ধ নিয়ে তো যাওয়াই যায় স্বর্গ অথবা নরকে। বর্ষাস্নান শেষে আমি আজ পুরুষ হলাম। এমন মরণ আমি মরতে রাজি আছি বারবার, তোমার খোলা হাওয়ায় বর্ণালী।
আমার চিকেন হৃদয় আজ পুরুষ হলো। বলেছিলাম না আস্কারা পেলেই পুরুষ ভুলে যায় জন্মনিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞাপন।
ফিরে আসার সময় ও আমায় শুধু বলল, কিছু যদি হয়ে যায়!
- হতে দাও।
- তারপর! কি বলব ওকে!
বলবে, আমিই দায়ী ছিলাম।


এরপর অনেকদিন কেটে গেছে। কষ্ট হতো কিন্তু ফোন করিনি ওকে আর কোনদিন। অপেক্ষা করছিলাম। হটাৎ একদিন সক্কাল বেলায় একটি ফোন আসে শহরের একটি পরিচিত নার্সিং হোম থেকে। রিসেপশান থেকে কেউ একজন বললেন, গুড মর্নিং মিস্টার সাঁই, মিসেস রায় অন লাইন... প্লিজ হোল্ড অন। ঘাবড়ে গিয়েছি। ভুল করে আবার কেউ আমায় স্বামীটামি বানিয়ে দিল না তো! আরে রং নাম্বার... শুনুন আমি এখনও অবিবাহিত, মা পাত্রী দেখছেন সকালে, বৌদি দুপুরে, আমি মধ্যরাতে দেখছি অনলাইনে। চন্দ্র, কেতু, মঙ্গল মিলছে না... বলতে বলতেই
ওপার থেকে মিষ্টি আওয়াজ, হ্যালো! এই তোমার মেয়ে হয়েছে।
এই রে এই সাত সক্কাল বেলায় ইয়ার্কি, আমি এখনও বিয়েই করলাম না, আর হবেও না কস্মিনকালে, কোনদিনই। আমার আবার মেয়ে! আপনি বোধহয় ভুল করছেন ম্যাডাম। অন্য কোথাও বাবা খুঁজুন মিসেস রায়, প্লিজ।
ওপার থেকে আবার সেই শান্ত মিষ্টি হাসির গলা, সাঁই আমাদের প্রথম সন্তান। মেয়ে হয়েছে তোমার মতোই। তবে চোখ গুলি বড্ড পিটপিট করছে।
এই কি রে... কি শান্ত গলায় মহিলা বলেই যাচ্ছে শুধু, মেয়ে হয়েছে মানে, আমার মতো... মানে!
এইবার আমি দেশি মুরগীর মতো কক্কক... ক্ক... একবারই করলাম। বিশ্বাস করুন আপনি ভুল করছেন কোথাও। আমি আপনার মেয়ে, মা বউ কেউ না। প্লিজ...
- কি সাঙ্ঘাতিক আমার কথা শুনলই না, কি শান্ত ভাবে বলে গেল, জানো ও দারুণ খুশী। তুমি আসবে না! দেখবে না তোমার মেয়েকে! সিগারেটটা শেষ করে চলে এসো জলদি। আমি অপেক্ষা করছি...। লাইন হ্যাস বিন ডিস্কানেক্টেড। কেটে গেল লাইনটা!
সক্কাল বেলায় টয়লেটে গেলেই আমি আর্কিমিডিস টাইপ কেউ হয়ে যাই। বুঝলাম, সেই হারু স্যারের কেস!
এই প্রথম আমার কামিনী ফুলেদের আমি ছিঁড়লাম। এতদিন শুধু ঝরে পড়তে দেখেছি। একথোকা কামিনী হাতে নিয়ে ছুটলাম নার্সিং হোমে।
- তোমার জন্য বর্ণালী।
-এই নাও তোমার জন্য। দুদিনের নরম শিশু আমার কোলে তুলে দিল বর্ণালী, আমি ভয় পাচ্ছিলাম। এতো নরম আর মিষ্টি যারা তাদের কি স্পর্শও করা যায়!
- বিনিময়!
- নাহ, আমায় দিলাম।
কি তুলতুলে! হাত বাড়িয়ে নিলাম। টের পাচ্ছিলাম আমার চোখ আজও সাবালক হয়নি, যেকোন সময় ঝড়ে পরবে।
- ওর নাম রেখেছি কামিনী... পছন্দ হলো নামটা! তোমার প্রিয় ফুলের নাম।
খুশি খুশি মুখ করে ঘরে ঢুকলেন মিস্টার রায়। বর্ণালীর স্বামী। আমার দিকে তাকালেন শুধু একবার। সৌজন্যে, মুচকি হাসলেন একটু।
- গুছিয়ে নাও এবার, তোমার ডিসচার্জ হয়ে গেছে বর্ণা, সবাই অপেক্ষা করছে তোমাদের।
ইশ আজ যদি আবার হারু স্যার আমায় বেত্রাঘাত করতেন আরেকবার! হয়তো আজীবন বেঁচে থাকতে পারতাম। এভাবেও কেউ কিছু দেয়!











অল্প-স্বল্প গল্প-গাথা




মৌ দাশগুপ্তা

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সিনহা বাড়ীর মহিলা মহলে সাজ সাজ রব, অথচ দেখতে গেলে ব্যাপারটা এমন কিছু আহামরি নয়। প্রতি মাঘী পূর্ণিমায় এ বাড়ীর আরাধ্যা কমলা কিশোরীর পূজো হয়। এ বছর একে মাঘী পূর্ণিমা বৃহস্পতিবারে পড়েছে, তারওপর বাড়ীর গিন্নী সুশীলা দেবীর বিচ্ছিরি ধরনের ডায়াবেটিস ধরা পড়ায় নতুন বউ রাই এর ওপর পুরো ঝঞ্ঝাটটা এসে পড়েছে। সে বেচারা এমনিতেই একটু ধীর স্বভাবের , তায় মেজাজী শাশুড়ীকে একটু ভয়ই পায়, কখন কোন কাজে কি খুঁত ধরা পড়বে আর মিষ্টি কথার হূল খেতে হবে, সেটা ভেবেই একটু তফাত থাকে, আজ আর বেচারীর রেহাই নেই।






বাড়ীর লোকসংখ্যা যে অনেক তা নয়, গৃহকর্তা কেশব বাবু, বাড়ীর গিন্নী সুশীলাদেবী, তাঁদের ছেলে কৃষ্ণমোহন, ছেলে-বৌ রাই, কলেজ পড়ুয়া দুই মেয়ে কান্তা আর করুণা, কেশব বাবুর দূর সম্পর্কের বিধবা ভাগ্নে-বৌ বনলক্ষ্মী (বাড়ীর বিনা পয়সার রাঁধুনী), আর সব সময়ের কাজের লোক সাবিত্রী, কূল্যে আটজন। বাড়ীর পুরুষমানুষরা অত ভক্তিমান নন, দুজনেই যথানিয়মে এবং যথাসময়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন অতএব মহিলা মহল সোৎসাহে ভীড় জমিয়েছেন দোতলার ঠাকুরঘরে। আজ ঘরের হেঁসেলে নিত্যকালীন ভাতডাল রান্নার পাট নেই, ছেলেরা পূজোয় ভাগ নেবেন না, তবে ঘরেও ভাত জোটেনি তাই আজ অফিস ক্যান্টিনেই খেয়ে নেবেন। ঠাকুরঘরের পাশের একফালি ছাদটাই ধুয়ে মুছে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে,নতুন তোলা উনুনে পূজোর হাঁড়ি পাতিলে ভোগ বানানোর প্রস্তুতি চলছে।





রান্নাবান্নার দায়িত্ব রোজকার মত বনলক্ষ্মীর ওপর, রাই-র ওপর ঠাকুরঘরের কাজ,যে যার কাজে লেগে পড়েছে। সাবিত্রীর রোজকার ঝাঁটপাট,মোছামুছি,ধোয়াধুয়ি চলছে, বাড়ীর বড় মেয়ে কান্তার সাথে সকালেই তর মায়ের একচোট লড়াই হয়ে গেছে, আজ বাড়ীর পূজোর অজুহাতে সুশীলাদেবী কান্তাকে ঘরবন্দী করেছেন, এদিকে ওর বন্ধু, (ইয়ে, মানে বিশেষ ছেলেবন্ধু) মাধব আজ একটু বিশেষ ধরনের জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে সারপ্রাইজ দিতে চাইছে, এখন কান্তা কি করে? মাকে বলতে পারছে না মাধবের কথা, আর মাধব বুঝছে না বাড়ীর অসুবিধার কথা। তাই দুজনের উপর রাগ করে দোতলাতেই নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে । ছোট মেয়ে করুণার ঠাকুর দেবতায় অত ভক্তি-শ্রদ্ধা নেই, নেহাত কলেজে সেমিষ্টার পরীক্ষা চলছে, কলেজ বা বন্ধুর বাড়ী গিয়ে বসে থাকতে পারছে না, আর দিদির সাথে মায়ের ঝামেলার বহরটাও দেখে নিয়েছে,তাই কানে হেডফোন গুঁজে বইপড়ার ভান করছে। সুশীলাদেবী ঠাকুরঘর আর রান্নার জায়গার মাঝে চেয়ার পেতে বসে সবদিকে নজর রাখার মহান কাজটি করছেন।






কথায় বলে কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম, এখানে সেটা একটু পাল্টে কর্ত্রীর ইচ্ছেয় হয়ে থাকে। পূর্ণিমা লাগবে সন্ধ্যা নাগাদ, ততক্ষণ অবধি সব নির্জলা উপোষ। না খেয়ে থাকলে একদিনে কেউ চোখে অন্ধকার দেখে না, বা অসুস্থ হয়ে পড়ে না সেটা ঠিক-ই, খালি পেটেয় ছুঁচোর দঙ্গল ডন-বৈঠকি মারে। তবে নিজের থেকে মন স্থির না করলে, মানে, বাধ্য হয়ে, বা অন্যের কথামত উপোষ করে আছি ভাবলেও খিদে তেষ্টা বুঝি বা মানুষকে একটু বেশীই কাবু করে তোলে।এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।সবাই যে যার বরাদ্দ কাজ মুখ বুঁজে করে যাচ্ছে বটে, অন্যদিকে ইন্দ্রিয়গুলো কিন্তু পূজোর পাকশালাতেই ঘোরঘুরি করছে। সাবিত্রী আবার সুশীলাদেবীর খাস লোক। ঘরের সবার গোপন এবং নির্ভরযোগ্য খবরটি যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছানোটাও ওর কাজের মধ্যেই পড়ে। বয়স খুব বেশী না হলেও বোঝে খুব বেশী,তাই সময় থাকতেই উঁচু ডালে মই বেঁধে রেখেছে। বাড়ীতে রান্নার পাট নেই, কেউ যাতে লুকিয়ে খাবার খেয়ে উপোষ ভেঙ্গে বাড়ীর অকল্যাণ না করতে পারে তার জন্য গিন্নী স্বয়ং রান্নাঘরে, ভাঁড়ারঘরে,তালা দিয়ে চাবি আঁচলে বেঁধে রেখেছেন।সকালে যেখানে কর্তামশাই দাদাবাবু না খেয়ে বেরিয়েছেন সেখানে কে আর হেঁচিপেচি সাবির জন্য খাবার কোলে বসে আছে? অথচ সাবির মত কাজ সকাল থেকে কে করছে? সেই কোন কনকনে ঠান্ডা ভোর রাত থেকে গোটা দোতলা বাড়ী ঝাঁটপাট,মোছামুছি, এতগুলো লোকের গত রাতের এটোঁ বাসন ধোয়াধুয়ি, কাপড় কাচা চলছে, হাত-পা ভেরে গেছে, কিন্তু পেটে দানাটি অবধি নেই। গিন্নীমাটির রোগজনিত কারণে খাই খাই ভাবটা ইদানীং খুব বেড়েছে, আসল খিদে কি চোখের খিদে বলা মুশকিল , ডাক্তারের কড়া নির্দেশে খাবারের পরিমানতো অনেক কমেছেই, তার সাথে না খেতে পারার তালিকায় অধিকাংশ প্রিয় খাবারের অন্ত্রভুক্তি ঘটায় মনোকষ্টটাও বেড়েছে বই কমেনি। আজ হয়ত তাই সেগুলোই ভোগে উৎসর্গ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যেগুলো এখন ওনার নাগলের বাইরে বললেই হয়। কমলাকিশোরীর পরিতৃপ্তির থেকেও কিছুটা নিজের রসনাতৃপ্তির ব্যাপারটাই বোধহয় অবচেতনে কাজ করেছে এদিকে লিস্টি বানিয়েছে যজ্ঞিবাড়ীর,কিন্তু কার যে লোভের পরিতৃপ্তি হচ্ছে দেবতার নামে, সে কি আর কারো জানতে বাকি আছে? । খিচূড়ী, লাবড়া, চরু, নারকোলের নাড়ু,তক্তি,মোয়া,মুড়কি,পুলি পিঠে, মুগতক্তি, রাঁধিয়ে একমনে ঘাড় গুঁজে সকাল থেকে ঘেমে নেয়ে বানিয়ে যাচ্ছে, আর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘ্রাণে অর্ধভোজন তো হচ্ছেই সাথে মুখের ভিতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে যা জল কাটছে তাতে তেষ্টাটাও পাবে না বোধহয়।






গিন্নীমাটি অবশ্য গতর নেড়ে কাজটিওতো করেন না, হাঁটাচলাও তো ঘরের মধ্যেই, এ ঘর থেকে ওঘর। বেশী খেলে হজম হবে কি করে? শকুনির দৃষ্টি মেলে সক্কাল থেকে থানা গেড়েছে সামনে, যেন রাঁধতে রাঁধতে লক্ষী বউদিই আধা পেসাদ পেটে লুকিয়ে রাখবে! সবাইকে নিজের মত নিখাউন্তী ভাবছে ! এদিকে ঠাকুরকে দেবার আগে যে নিজেই চোখ দিয়ে গিলছে সে কি আর কেউ টের পাচ্ছে না? পূজো যাদের ঘরের, উপোষও বাপু তারাই করুক না, কি দরকার অন্যদের জোরজার করে নিয়ম মানানোর?



তারপরে ঐ লক্ষী বৌদি, নিজের বলতে সেরকম কেউ কোথাও নেই বলে, বলতে গেলে একরকম দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া পরার বিনিময়ে এখানে আছেন, বদলে সংসারের হেঁসেল সামলাচ্ছেন। তাতেও কথা তো আর কম শুনতে হয়না! কিন্তু এই যে এ বাড়ীতে ওনাকে ঠিক পরিবারের একজন বলে মানা হয়না । বরং মাঝে মধ্যে বোঝাই যায় যে ওনার জায়গাটা সাবিত্রীর থেকে খুব একটা আলাদা না, তাও তো সাবির না পোষালে অন্য বাড়ীতে কাজ নিয়ে বেরিয়ে যাবে, বনলক্ষ্মী তো সেটাও পারবেন না। অথচ বাড়ীর পূজোর বাহানায় এই শীতে কাঁপতে কাঁপতে ভোর রাতে স্নান সেরে সারাটি দিন জল অবধি না খেয়ে সেই যে পাকশাল সামলাচ্ছেন তাতে কারো কিন্তু সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকু অবধি নেই। তা ওনার তো কারণে অকারণে ব্রত পার্বন,সাত-সতেরো, তার ওপর ছোঁয়াছুয়ি, মানামানিটাও লোক দেখিয়ে একটু বেশী করতে হয়, পূর্ণিমা, অমাবস্যা, একাদশী সবই মানেন, উপোষ করাটা ওনার কাছে হাঁচি কাশির মত নিত্যি ব্যাপার ।অথচ সারাদিন তো রান্নাঘর আর ভাঁড়ারঘরেই খুচখাচ চলে, তা মুখ কি আর চলে না? খুব চলে। নয়তো অত টুসটুসে চেহরাটা থাকে কি করে? আজও সব নিয়ে যে ভাবে সবার দিকে পিছু ফিরে মুখ গুঁজে বসেছে দু এক গাল মুখ চালালেও কেউ টেরটি পাবেনা।

বড়দি তো সাতসকালেই মায়ের সাথে ঝগড়া করে গোঁসাঘরে খিল দিয়েছে, ও প্রায়ই হয়।বাপের আদুরী কিনা, যতক্ষন না বাপে এসে “বাবা বাছা” বলে ডাকাডাকি করবে, ততক্ষন দরজা খুলবে না, আজকাল তাই বড়দি ঘরে দোর দিলে কর্তাবাবু না ফেরা অবধি কেউ ডাকেও না।আর রাগ হলে বুঝি ওদের খিদে টিদেও পায় না।ওদের আর কি? খিদের জ্বালা জিনিষটা কোনদিন ভুগতে হয় নি কিনা! এই যেমন ছোড়দি, খেলে মোটা হয়ে যাবার ভয়ে সেধে একবেলা খায়, ভাত রুটি খায়না, ভাজভুজি,মশলাদার খাবার, মিষ্টি এসব কিচ্ছু খায় না। সারাদিন তো ঐ লেবুর রস, টকদই, ফল, স্যালাডই খায়, সপ্তাহে একদিন নিয়ম করে কারণ ছাড়া উপোষ।






দুই মেয়ের পর ঐ টিংটিং চেহারার কনে বৌটি, আলালের ঘরের দুলালী কিনা, রীতিমত খুঁটে টিপে ফেলে ছড়িয়ে ছাড়া খেতে পারেনা। না খাবার লিস্টিটাই এত বড় যে, কি খায় কে জানে,ডাল খেলে পেট ফাঁপে,ফল খেলে অ্যাসিড হয়,শাক দেখলে বমি আসে,মাটির নীচে হওয়া সব্জিতে অ্যালার্জি আছে।কত ঢং যে জানে। ঘনঘন পেটের প্রবলেমে ভোগে আর খাওয়া দাওয়া ছেড়ে চোখ উল্টে পড়ে থাকে।নেহাত বাপে ডাক্তার , তাই রক্ষে।নয়ত ঐ রক্ষাকালীর অসুখ সারাতেই সব ফতুর হয়ে যেত।
তা সাবির তো আর অত সুখের জীবন না,শখেরও না, রীতিমত গতর খাটিয়ে পেটের ভাত জোগাতে হয়।সাবিকে নিজের ভালোটা নিজেকেই বুঝতে হবে। কাজপাট সেরে গিন্নীমার পা টিপে দেবার আছিলায় বসে থাকতে হবে, ঐ দুই পথের কাঁটা নিজেদের এলাকা থেকে একটু সরলেই টুক করে হাত আর মুখের কাজটা সেরে নিতে হবে, এমনিতেও সকাল থেকে এতপদ রান্না হলে কি হবে, সাবিকে দিতে করো হাত সরবে না তখন সাবির ভাগে যত গুঁড়ো-গাড়া ফেলা-ছড়া জিনিষ!






ভাবনা চলে ভাবনার মত আর সময় চলে সময়ের মত, দুজনেই নিরন্তর বহমান কিন্তু একসঙ্গে যে গতিশীল তা নয়।সময়ে ছেদ পড়ে না, ভাবনায় পড়ে। পুরোহিত এসে পড়ায় সাবিকে চিন্তায় যতি দিতে হল। রাই,করুণা,পুরোহিতের সাথে ঠাকুরঘরে ঢুকলো, বনলক্ষ্মী সারাদিনের ক্লান্তি সরিয়ে নীচে গেল একটু গরম জলে স্নান সেরে সে অঞ্জলি দেবে, সাবির বাবা ত পূজো পাটে ভক্তি নেই।দুমুঠো পেটের ভাত জুটলেই হোল,তা পূজো শেষ হতে এখনও অনেক দেরী, সকালের উপোষী শরীর আর টানছে না অতএব সাবি গায়ে কাপড়টা টেনে গুড়িসুড়ি মেরে নীচের বৈঠকখানায় বসতে গেল, টিভি দেখতে , সুশীলা বোধহয় বড় মেয়েকে ডাকার বৃথা চেষ্টায় যাচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ বনলক্ষ্মীর আর্ত চিৎকার। জল গরম করতে গিয়ে বেখেয়ালে শাড়ীতে আগুন ধরে গেছে, বিপদের ওপর বিপদ,চিৎকার শুনে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে সুশীলা সেই যে আছাড় খেয়ে পড়েছেন আর উঠতে পারছেন না।এদিকে পূজো শুরু হয়ে গেছে, থামাতে গেলে অমঙ্গল। নেহাত কান্তা গাড়ী চালাতে জানে,গোঁসা ঘর থেকে বার হয়ে কান্তা তৎক্ষণাৎ মা,বোন,বনলক্ষ্মীকে নিয়ে কাছেই রাইয়ের বাবার নার্সিংহোমর দিকে রওনা দিল, রাই ও চললো সাথে, দু’জন আহতকে সামলাতে দুটো লোক তো লাগবে, নাকি? সপুত্র কেশব বাবুকেও খবর দেওয়া হোল।






যথাবিহিত পূজো-পাঠ, হোম-আহূতি সেরে পুরোহিত মশাই অঞ্জলি দেবার জন্য ডাকলেন যখন, তখন বাড়ীতে সাবি ছাড়ার কেউ নেই। খুব মন দিয়ে পুষ্পঞ্জলি দিল সাবি।“সবার মঙ্গল কোর ঠাকুর, সবার মনের ইচ্ছা পূর্ণ কোর।“







সময়






ডঃ কাকলী মুখোপাধ্যায়






নর্দমার ধারেই সেলুনটি। স্কুলে মেয়েদের ভীড়ে উকুন এসেছে ছোট্ট মানুর মাথা ভরে। মা’তো রেগে মেগে আগুন। ঘাড় ধরে পাঠিয়ে দিল সেলুনে । মাথা ন্যাড়া করতেই হবে। নাপিত ধনঞ্জয়ের সাথে মানুর বিশেষ সখ্যতা। অন্য সাহেবদের বাচ্চাদের মত মানুর মধ্যে হাম্বড়া ভাবটা একেবারেই নেই বললেই চলে। খুব সহজ সাধা সিধে এই মেয়েটি। এসেই খলবল করে কথা বলতে শুরু করে--এই যেমন আয়নাটা কোথা থেকে কিনেছো ? চেয়ারটা এরকম ঘোরে কেন ? তোমার মাথায় চুল নাই কেন? চুল কাটলে আবার কবে চুল উঠবে এইরকম নানান কথা । বড্ড মিষ্টি মেয়েটি। আজকে বেশ মন খারাপ নিয়ে মানু এসেছে । পিঠ পর্যন্ত ঘন কালো চুল গুলো উকুন হওয়ার অপরাধে কেটে ফেলতে হবে। স্কুলে গেলেই সবাই টাক বেল বলে খ্যাপাবে। ধনন্জয় মানুর মনের কথা বুঝতে পারে। বলে দিদিমণি চিন্তা করোনা এমন চাঁছ দেব দেখবে তিন দিনেই চুল গজিয়ে যাবে। কিছুটা আস্বস্ত হয়ে চুল কাটতে বসে গেল মানু। বাড়ির ছাদে চুল শুকোতে শুকোতে তিরিশ বছর আগের ধনন্জয় দার কথা মনে পড় গেল মানুর। ঐ সামান্য নাপিত তারও কত স্নেহ কুড়িয়েছে মানু অথবা মনতোষের বাবা সেই বৃদ্ধ মাছওয়ালা। তার কথা ভাবলে আজও চোখে জল আসে মানুর। মনতোষ মানুদের বাড়িতে কাজ করতো ও মানুর সমবয়সী ছিল। কাজ শেষে মনতোষ আর মানু খেলায় মশগুল হয়ে উঠতো। কখনও মনতোষ গাইতো আর মানু নাচতো। একবার মানুর পা মচকে গেলে মনতোষের সেকী কান্না। আবার মনতোষের জ্বর, মানু চুপিচুপি ঘুম থেকে উঠে মার ঘর থেকে কমলালেবু চুরি করে মনতোষকে দিয়ে এসেছিল। মনতোষের বাবা গুড়ো, মাছ বিক্রী করতো। মানুদের বাসায় ছেলেকে দেখতেও আসতো মাছও বিক্রি করে যেত। ছেলেকে ভালোবাসে বলে মানুকে বিশেষ স্নেহ করতো বৃদ্ধ।






মহল্লায় বাপের আদুরে মেয়ে হিসেবে মানুর বিশেষ পরিচিতি ছিল। তাই মানুর অনেক আবদার অনেকেই নীরবে হজম করতো। অনেকদিন হল মনতোষের বাবা আর আসেনা। মনতোষ মানুদের বাড়ী ছেড়েছে প্রায় দশ বছর। মানুর বাবা মারা যাবার এক মাস পর হঠাৎ একদিন মাছ নিয়ে মনতোষের বাবার আগমন। মানুকে দেখে গদগদ গলায় বললে মানু কেমন আছ সোনা। “এদিকে আসা হয়না, তাই বলে মনে করোনা যে তোমাকে ভুলে গেছি। মাছ নিবা”? মানু সম্মতি জানায়। “কয় ভাগ দিব? দুই না তিন? বাবা কোথায়” ? “বাবাতো নেই”। মানুর গলাটা কেঁপে যায়। বজ্রাহতের মত তাকায় বৃদ্ধ। ডালার ওপরে যত মাছ ছিল মানুর খোলুইএ ঢেলে দিয়ে ধূতির খুঁটে চোখ মোছে বৃদ্ধ। আহারে বাপের আদরের মেয়ে আজ বাপ ছাড়া। “নাও সোনা এই সব মাছ তোমার, পয়সা লাগবেনা। আমিতো তোমার বাবার মতই”, বলে ঝরঝর করে কাঁদতে থাকলো বৃদ্ধ। মানুর চোখেও জলের বান ডেকেছিল আজও চোখ জলে ভরে উঠলো। মনে পড়ে গেল গরফুলের কথা। মেথর গরফুল মদ খেয়ে টাল হয়ে মহল্লার রাস্তা ঝাড়ু দিত। বাচ্চা ছেলেমেয়ে দেখলেই তেড়ে আসতো। একদিন গরফুলের তাড়া খেয়ে মানু ছুটতে ছুটতে বাড়ির বাথরুমে ঢুকে মালিনী ঝিকে জড়িয়ে ধরেছিল। পরে বড় হয়ে জেনেছিল নিঃসন্তান গরফুলের এ ছিল এক মজার খেলা। বাবা মারা যাবার পরদিন গরফুল দুটো কলা নিয়ে হাজির। কাঁদতে কাঁদতে বললো “মাইজী বাবু নাই, তুমাক আদর করবে কে”? আবার চোখ ভিজে উঠলো মানুর ।


জীবন ভর মানুষের ভালোবাসাকেই মানু দাম দিয়ে এসেছে। কিন্তু আজ কোথায় ভালোবাসা ? সামান্য সহানুভূতির সুরেও অনেক দিন কেউ মানুর সাথে কথা বলেনা। সিজারিয়ান অপারেশন করে মানুর মৃত সন্তান বের করে আনে ডাক্তার। সমীর খুব রূঢ় ভাবে বলে “তোমার দোষেই এটা হল”। কিছুদিন পর কোন এক বাসায় বেড়াতে গিয়ে একটা ফুটফুটে বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়ে খুব আদর করছিল মানু সমীর মুখ বাঁকিয়ে বলেছিল “যোগ্যতা থাকলে তো নিজের বাচ্চাকেই আদর করতে”। অপারেশনের ঘা শুকোতে না শুকোতেই রান্না ঘরে চুলার পাড়ে বসতে হয় মানুর। দশ বারো জনের রান্না করে হাসি মুখে পরিবেশন করার পরেও শুনতে হয়েছে “সোয়ামণ পাপ না করলে পেটের মধ্যে বাচ্চা মরেনা”।






সোয়ামণ পাপের খোঁজ আজও মানু পায়নি। অনেক হাতড়ে সোয়ামণ পাপের ফিরিস্তি পায়নি মানু। মাঝে মধ্যেই জুয়ায় হেরে এসে সমীর ধাক্কা দিয়ে মানুকে ঘর থেকে বের করে দেয়,অনেক দিনই মানুর রাত কাটে বাড়ির ছাদে। একদিন হঠাৎ ফোন করে মিঠু। মানুর স্কুল কলেজের বন্ধু,“কেমন আছিস মানু ? তপুদার কাছ থেকে তোর মোবাইল নাম্বারটা পেলাম”। অনেক কথা মনে পড়ে যায় মানুর, বলে “বিশাল সংসার সামলাচ্ছিস বল? বড় ছেলে ক্লাস টেনে পড়ে, মেয়ে ফাইভে, তাও শুনেছি দাদার কাছ থেকে। তোর সেই ঘণ কোঁকড়া চুল গুলো আছেতো? মনে আছে চুইংগাম লাগিয়ে দিয়েছিলাম তোর চুলে তারপর ছিঁড়ে কেটে বের করতে হয়েছিল”। হঠাৎ ঘরে ঢুকে সমীর। হ্যাঁচকা টান দিয়ে মানুর হাত থেকে ফোন নিয়ে নেয়। ‘কে আপনি’ ? ‘আরে সমীর দা নাকি। আমি মিঠু। মানুর সাথে আমার আদ্যি কালের প্রেম। হা হা হা’। সমীর বেশ মিষ্টি স্বরে কথা বলে মিঠুর সাথে। ফোন রেখেই প্রচণ্ড জোড়ে থাপ্পর মারে মানুর গালে। মানু ঘুরে পড়ে যায়। তার অপরাধটা কি মানু বুঝতে পারেনা। সমীর খিস্তি করতে থাকে। বিরবির করে বলে “কত নাঙ যে লাগে মাগীদের”। সমীর চলে যায়। বারে জুয়ার আড্ডা বসবে। বড় ছেলে তন্ময় এসে পাশে বসে। ক্ষোভে দুঃখে কাঁদছিল মানু। ছেলে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে নীরবে উঠে যায়। দিন দিন সমীরের ব্যবহার ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। জুয়া খেলে বাড়ি ঘর সব বেচে দিয়েছে। ব্যাঙ্কেও টাকা নেই। ব্যবসা পাতি লাটে উঠেছে। মানুর চাকরীর টাকা দিয়ে ছেলে মেয়ের লেখাপড়া,খাওয়া দাওয়ার খরচ মেটে। বাদ বাকি নির্ভর করে জুয়ার দানে জেতার ওপর। হারলেই সেদিন মানুর উপর নির্যাতন চলে। যেদিন জিতে এসে মানুর পা ধরে মাফ চায়। সমীরকে ঘেন্না ভক্তি কোনাটাই মানু করতে পারেনা। খালি দিন গোনে কবে মেয়েটিকে পাত্রস্থ করবে আর ছেলেটি পাশ করে একটা চাকরী নিবে আর তারপর মানু বেরিয়ে পড়বে অবাধ জ্যোৎস্নার, খুঁজবে মনতোষকে,মিঠুকে, ঝালমুড়িওয়ালাকে,অথবা সেই কেষ্টাকে। আরও আরও কত মানুষ আছে যাদের খুঁজতে হবে পেতে হবে মানুকে। সেই রিক্সাআলার বাড়িতে যেতে হবে-মানুর এক ছাত্রী ছিল অমি। মাঝে মাঝে মন খারাপ হলে ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তো মানু। একদিন রিক্সায় ঘুরতে ঘুরতে অমির মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হল । যেই বলা সেই কাজ। মিষ্টির দোকানে ঢুকে পড়লো দুজন রিক্সা বাইরে দাঁড় করিয়ে। মানু বেশ কয়েকটা দামী সন্দেশ কাগজে মুড়ে রিক্সাঅলাকে দিল। ওমা রিক্সাআলা কোথাথেকে মিষ্টি পান কিনে এনে মানুকে দিল। অমিতো হেসে বাঁচেনা। রিক্সা থেকে নেমে মানু বেশ জমিদারি চালে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট রিক্সাআলাকে ধরিয়ে দিল। রিক্সা আলা বলল,”আফা আপনি যা দিলেন তা আমার পাওনার থেকে অনেক বেশী কিন্তু আমি খুশি হইছি আপনার সন্দেশ কয়খানের জন্য। আমি যহন বাড়িত যামু আমার পোলাপান খুশিতে বাকবাকুম হইয়া সন্দেশ কয়খান খাইবো”। মানু পরাজয়ের গ্লানি অনুভব করলো। ওর খালি মনে হল বাচ্চাগুলোকে হাড়ি ভরা সন্দেশ কেন কিনে দিলামনা। যাবার সময় রিক্সাআলা তার ঠিকানাটা দিয়ে গিয়েছিল,বলেছিল 'আফা একদিন গিয়া বালবাচ্চাদের দেইখা দোয়া দিয়া আইয়েন'। মানু যাবে সেই আলাদিনের দৈত্যের মত রাশি রাশি খাবার নিয়ে। অথবা অম্বিকা পুরে গায়েন হাজেরাবিবির সন্তানরা কেমন আছে তা দেখতে চলে যাবে। হাজেরা বিবি মানুকে মা ডেকেছিলেন। একদিন এক দুঃস্বপ্ন দেখে লাঠি ভর দিয়ে মানুর বাসায় এসে হাজির। দোয়া পড়ে ফু দিয়েছিলেন মানুর গায়ে। আবার চোখে জল আসলো মানুর। মানুর ভাসুরের মেয়ে জলিকে ছোট বেলা থেকে কোলে পিঠে বড় করেছে মানু। ওর পড়া লেখা ,বিয়ে সংসার সব কিছুই মানুর করে দেয়া। একবার বাড়িতে চুরি হল মানু বুঝতে পারে এ জলির মায়ের কাজ। জলি এবং জলির মা দোষ ঢাকবার জন্য অন্যায় ভাবে দোষ চাপিয়ে দেয় অনাথ কাজের মেয়ে আলোর ওপর।






মানু তখন গলব্লাডার অপারেশন করে বিছানায় শয্যাশায়ী। গলস্টোন এতই বড় হয়েছিল যে ডাক্তাররা ক্যানসার হবার আশঙ্কা করছিলেন। জলি যখন দেখলো কাকী কিছুতেই তাদের পক্ষহয়ে কথা বলছেননা ঘরে ঢুকে বিছানায় শয্যাশায়ী মানুকে লক্ষ করে বললো ‘আপনি আমার মাকে চোর বানালেন, আপনি মরলেও আপনাকে দেখতে আসবোনা’। মানু তাকিয়ে থাকলো স্তব্ধ হয়ে,এ কে কথা বলছে? যার পরীক্ষার ফি ভরার জন্য মানু দুপুরে না খেয়ে ছাত্র পড়িয়েছে? যার সংসারের প্রতিটি জিনিস মানুর দেয়া? মাত্র কয়েকদিন আগে যার বাচ্চা হবার সময় হাসপাতালের বিল চড়াসুদে টাকা ধার করে ভরেছে মানু? এই সেই জলি? এই মানুর প্রাপ্তি? মানু ঠিক চলে যাবে। জ্যোস্নায় খোলা মাঠের বুকে। হা করে জ্যোৎস্না সোমরস পান করবে। ওর সাদা চুল গুলোতে জ্যোস্নার মেয়েরা এসে হেসে মিশে যাবে। মিঠুর ঘাড়ে হাত রেখে বসে বলবে জীবনের সাত কাহন। হঠাৎ বৃষ্টি এল, মানু শুকনো কাপড় গুলো নিয়ে দ্রুতবেগে নীচে নেমে আসলো। দেখলো সমীর অনেক বাজার করে নিয়ে এসেছে। জুয়ায় জিতলে লোকটা মহাত্মা হয়ে ওঠে। রূপ বদলাতে এক সেকেণ্ডও সময় লাগেনা। মানু কৃত্রিম হাসি হেসে তাকায় সমীরের দিকে। মানুর চোখে মুখে উপর্যুপুরি চুমা দিয়ে বলে এরকম জিতলে মাইরি বলছি তোমাকে চীনে ঘুরতে নিয়ে যাব। একটু অবাক হয় মানু,ভোলেনি তাহলে! সেই প্রথম জীবনের কথা। কোন এক সন্ধ্যায় সমীর গলা জড়িয়ে ধরে খুব আহ্লাদ করে মানু বলেছিল ‘আমাকে চীনের পাথুরে ফুলের পাহাড় দেখতে নিয়ে যাবে’? বিস্ময়ে বিহ্বল মানুর চোখ দিয়ে অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ে। ভেজা গলায় মানু বলে কি খাবে? কুমড়ার মোরব্বা,দুধকদু, চিতল মাছের কোপ্তা আর? সমীর উচ্ছসিত হয়ে ছেলে মেয়ের গাল টিপে দেয়। ছেলে মুখ বেঁকিয়ে মাথা নিচু করে ঘরে চলে যয়। মানু মেহেদী বাটা নিয়ে এসে সমীরের চুলে লাগাতে থাকে। ভালোবাসে বলে নয় এই সেবা করার স্বভাব মানুর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। অনেকবার সমীরের মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মানু কিন্তু বাচ্চাদেরকে লোকে বাপ তুলে কথা বলবে এই ভেবে ডাক্তারকেও মিথ্যা কথা বলেছে মানু। অনেক সময় রাতে সমীর অত্যাচার শুরু করলে বাসার সবার অগোচরে ছাদে চলে গেছে মানু। সারারাত ছাদে কাটিয়ে দিয়েছে বাবার স্নেহমাখা স্মৃতি গুলো মনে করে। সমীর খেয়ে দেয়ে বের হয়ে গেল। আর কত বছর লাগবে সব ঠিক হতে?






অন্ধকারে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় মানু। সমীর যাচ্ছে, লাইটপোস্টের আলোতে একঝলক দেখতে পেল ওকে। ছেলেটা গতকাল একটা ইন্টারভিউ দিয়েছে চাকরীটা পেলেই একদিন মিঠুকে নিমন্ত্রণ করবে। সকালে বেশ দেরী করে ঘুম ভাঙে মানুর। বারোটার দিকে মাতাল হয়ে টলতে টলতে বাড়ী ফেরে সমীর। হাসতে হাসতে বলে দাদা ফোন দিয়েছিল তোমার একটা দোস্ত ছিলনা ওই যে টিচার মিঠু গতকাল ব্রেইন স্ট্রোকে মারা গেছে। শালা হতভাগা নিরামিষ! মদ ছুঁলোনা, মাগী ছুলোন্‌ জুয়ো খেললোনা, তবুও কেমন অকালে পটল তুললো। তাইতো বলি বাবা যতদিন বাঁচ ফূর্তি করে বাঁচ। হয়তো আর কেউই থাকবেনা। মনতোষ রিক্সাআলা কেউ না। মানু নিরবে ছাদে চলে যায়। মাঘী পূর্ণিমা। চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে। মানু তাকিয়ে থাকে।



মঙ্গলবার, ৭ আগস্ট, ২০১২

৩১তম সংখ্যা ৪টি গল্প (১) অসমিয়া গল্প 'আলো' / অরূপা বরুয়া । অনুবাদ নন্দিতা ভট্টাচার্য ,(২) 'মানুষজনের গল্প' / সরদার ফারুক ।


প্রতিবেশি সাহিত্য : অসমিয়া গল্প
আলো / অরূপা বরুয়া

অনুবাদ – নন্দিতা ভট্টাচার্য

[অসমিয়া সাহিত্যে বর্তমান প্রজন্মের এক সংবেদনশীল  লেখিকা অরূপা বরুয়া । প্রবল জীবন বোধ ও আধুনিক মনন তাঁর লেখায় মূর্ত । সমাজ ও মানুষের ভন্ডামি , আমাদের বিষন্ন জিজ্ঞাসা অরূপার লেখাকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে । ]

আড়াই মাসের বাচ্চাটার গোলাপি রঙ যেন জমকালো মহিলার পাশে আরো বেশি উজ্বল হয়ে জ্বলে উঠেছে । সিস্টার দেবিকা ওর কোলে বাচ্চাটাকে তুলে দেওয়াতে ওর মুখখানি এক অনাবিল আনন্দে ভরে গিয়েছিল । এই মুহুর্তটাই সত্যি । হাহাকার, শূন্যতাহীন এক মুহুর্ত ।

মহিলার স্বামী ডাঃ বরার দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় সই করে একটু অনভ্যস্ত হাতে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল । এমন সন্তর্পনে তুলে নিল যেন মনে হয় খুব হালকা কাঁচের জিনিস সে নিজের দুই বাহুর মাঝখানে নিয়ে নিল তার চারপাশে থাকা নার্স, ডাক্তার, ওয়ার্ড বয় সকলে সশব্দে হেসে উঠল । লোকটির চেহারা দীর্ঘ ও বলিষ্ঠহাস্পাতালের কাছেই তার চামড়ার জুতো সারাইয়ের নানান সাজ-সরঞ্জামের দোকান আছে । লম্বা সরু একটা ঘর । সেখানে একরাশ জিনিসের মধ্যে সারাদিন বসে থাকে । দূর দেশ থেকে জিবীকার খোজে নিজের গ্রাম, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত পরিবেশের নিরাপত্তা – সবকিছু ছেড়ে একরকম উদবাস্তু মানুষ সে । রামনাথ তার মা বাবার কাছ থেকে নিজের নামটার বাইরে আর কিছুই পায়নি । বহু কষ্টে ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বর্তমানে স্থিতি পাওয়া রামনাথ, খালি পেটে কোন দোকানের বারান্দায় নেড়িকুকুরের সঙ্গি হয়ে কত রাত কাটিয়েছে । বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলায় থাকা বাড়ির কথা মনে করে উথাল পাথাল হয়েছে তার মন । কত রাত কাটিয়েছে এভাবে ।

‘ওর নাম কি রাখবে ? মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কিছু একটা রাখতে হবে তো’, রাধা সিস্টারের কথায় মুখ তুলে চাইলো রামনাথ । নিবিষ্ট হয়ে সে তার সন্তানকে দেখছিল । নামতো একটা কিছু রাখতেই হবে । পুরো ব্যাপারটা রামনাথকে এমন উদ্বেলিত করেছে যে সে নাম রাখার মত একটা অসাধারণ ব্যাপারও ভুলে গিয়েছে ।

-      রাখতে হবেই - আপনারটা বলুন, আমিও ভাববো । যেটা ভালো লাগে সেটা রাখব আরকি । বলে রামনাথ বোকার মত হাসলো । আশ্চর্যের  কথা এই ছত্ত প্রাণীটি হঠাৎ তাদের জীবনকে নাড়া দিয়ে দিল

রামনাথের মায়ের কথা মনে হ’ল । নাতির মুখ দেখার সদিচ্ছা নিয়ে চোখ বুজেছেন । বাচ্চাটাকে দেখলে মা’র কত আনন্দ হ’ত । কথাটা ভেবে রামনাথের চোখ জলে ভরে উঠল ।

মা থাকতে রামনাথকে প্রতিবছরই বাড়ি যেতে হ’ত স্ত্রী রুক্মিনী বিহারী হলেও জন্ম কর্ম সব অসমেরামনাথের সঙ্গে বিয়ের পরই প্রথম বিহারে গেছে । ওর মা বাবার কোন নিকট আত্মীয় বিহারের গ্রামে ছিলেননা বলে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি ।রুম্মিনীর ময়ূখে অসমিয়া ভাষা শুনলে তাকে হিন্দিভাষী বলে কেউ ভাববেনা ।

মায়ের মৃত্যুর পর দুবছর সে বাড়ি যায়নি । রামনাথের পরিবারের অন্যদের প্রতি রুক্মিনীর কোন টান তৈরি হয়নি । তা্র কারণও আছে । বিয়ের আট বছর পরও রামনাথ নিঃসন্তান ছিল । রুক্মিনী তিনটি মৃত সন্তান প্রসব করে । রামনাথ অশিক্ষিত হলেও এ নিয়ে কোন কথা শোনায়নি । স্বাভাবিক বিশ্বাস নিয়েই ঘটনাকে নিজের অদৃষ্ট ও দুর্ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে । কিন্তু আত্মীয় স্বজনরা রুক্মিনীকে রেহাই দেয়নি – অলক্ষুণে অপবাদ জুটেছে । রামনাথকে ভালোবাসে বলেই যে তারা এরকম বলেছে তা নয় । এতে তারা এক ধরণের বিকৃত আনন্দ পায় । তাকে নিয়ে ঠট্টা মস্করা করাতে রামনাথ আত্মীয় পরিজনদের থেকে দূরত্ব বাড়িয়েছে । গত দুবছর তাই তারা আর গ্রামে যাওয়ার তাগিদ বোধ করেনি ।

আজ গোলাপ ফুলের মত এই বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে মনে হচ্ছে এক্ষণি ছুটে গিয়ে বিহারগামী কোন গাড়িতে চেপে বসে ।যেন মনে হচ্ছে বিকৃত হিংসায় নীল মুখের সামনে দিয়ে গোলাপসুন্দরীকে কোলে করে সে ও রুক্মিনী দুজনে রাস্তায় রাস্তায় প্রদর্শনী করবে, এসো , দেখো ! অনেক কথাইতো বলেছিলে ! রামনাথ না পেরে বাচ্চাটাকে এমন ভাবে চেপে ধরলো যে বাচ্চাটা না কেঁদে পারলনা ।

সিস্টার রাধা বলল – “আমি এতদিন ভীষণ আদরে রেখেছিলাম ওকে, যত্ন নিও । একটু ঠান্ডা পড়ছে । মাথায় তেল দিওনা, ঠান্ন্ডা লাগবে” । রাধার কথা শেষ হওয়ার আগেই রঙ্গিলী বলল “ এ কিন্তু কিছুক্ষণ থেকে একবারও পেট ভরে খায়নি ঘন ঘন খায়, কিন্তু কম খায় ।দেখবে যাতে ক্ষিদেতে কষ্ট না পায়” । আহ্লাদে আহ্লাদে দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে বলে সে বাচ্চাটার গাল টিপে টিপে লাল করে দিল ।

ভীষণ যত্নে রেখেছিল গত দুমাস হাসপাতালের ডাক্তার নার্স সকলে । যেন ওর দুর্ভাগ্য থেকে বাঁচাতে চাইছিল, ওর প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছিল । বাচ্চাটা রুক্মিনীর নয় । বাচ্চাটার মা ওর জন্মের পরই মারা যায় । বাড়ির কোন মানুষ আর খবর করতে আসেনি । এমনকি মৃতদেহ নেবার জন্যও কেউ আসেনি । কয়দিন মর্গে পড়ে থাকার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মিঊনিসিপালিটির হাতে মৃতদেহটি তুলে দেয় । নোংরা ফেলার গাড়িতে করে মৃতদেহটি নিয়ে যাবার সময় ডিউটিতে থাকা সকলের মুখই আঁধার হয়ে যায় , চোখে জল এসে যায় ।

সবাই ভেবেছিল বাচ্চাটাকে নিতে কেউ না কেউ আসবে । কিন্তু আড়াইমাস কেটে গেলেও কেউ আসেনিইতিমধ্যে ম্যালেরিয়ায় ভোগা রুক্মিনী সব কথাই শুনতে পেয়েছিল । খাসিয়া সিস্টার ইন চার্জ হঠাৎই যেন রুক্মিনীর মনের কথা বলে ফেললেন , “রুক্মিনী বাচ্চাটাকে তুমিই নিয়ে নাও , তোমারতো বাচ্চা-কাচ্চা নেই ।  পূণ্য হবে । তোমার ভালো হবে , নিয়ে যাও”। 

পূণ্য হবে ক হবেনা সেটা রুক্মিনী ভাবেনা জানেওনা । কিন্তু বাচ্চাটাকে নিয়ে যাবার যে একটা অদম্য ইচ্ছে তার মধ্যে তৈরি হয়েছে সেটা থেকে মন সরাতে পারছেনা । বৃদ্ধা সিস্টারের কথাতেই সে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে সমর্থ হল ।

বৃষ্টির পরই আকাশ পরিস্কার হ’ল । বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে রুক্মিনীর সাথে হাসপাতাল ত্যাগ করার সময় ডাঃ বরার সঙ্গে সকলে এসেছে তাদের বিদায় জানাতে । সবার মন একই সঙ্গে হরষিত-বিষাদ গ্রস্ত ! কার পরিত্যক্ত সন্তানকে কে যে অমূল্য রতনের মত বুকে আগলে নিয়ে যাচ্ছে ! এই দেশ কি বিচিত্র ! সত্য সেলুকাস !

বাচ্চাটির বাবার চেহারা এখনও মনে আছে ডাঃ বরার । সুন্দর চেহারার পেছনে এক পশু যেন । মেয়েটিকে হাসপাতালে আনার সময় কাগজের মত সাদা ও দুর্বল ছিল ।বহু চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি । বয়স বেশি ছিলনা । পরপর তিন কন্যাসন্তান হয়ার জন্য হয়তো অনাদর অবহেলায় স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিল । পুত্রসন্তান হওয়ার আশায় তৃতীয়টি একবছর হওয়ার আগেই আবার গর্ভবতী হয়ে পড়ে । বাচ্চার মায়ের অন্তিম সময়টি বড় মর্মান্তিকবারবার স্বামীর খোঁজ করায় ডাঃ বরা বলে উঠেছিলেন –‘এরকম পাষন্ড মানুষও থাকে পৃথিবীতে ! যদি কখনও দেখা হয় ধরে প্রচণ্ড চড় মারব । কি অমানুষ’ !

শিশুটি সবার আদরে আহ্লাদে চন্দ্রকলার মত দিনে দিনে বাড়ছিল । ডঃবরার মনে একটা কথা ধীরে ধীরে আকার পাচ্ছিল । তার দাদা ইঙ্গিনীয়ার সীমান্ত বরা নিঃসন্তান । বিয়ের প্রায় বারো বছ হল । স্ত্রী বন্দনা দুবারই রুক্মিনীর মত মৃত সন্তান জন্ম দিল । এখন সকলেই ওদের নিয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছে

ডাঃ বরা সেইজন্য শিশুটিকে সীমান্ত ও বন্দনাকে দিয়ে দেবার কথা ভেবেছিল। বলেওছিল । বন্দনা বড় আগ্রহ নিয়ে সীমান্তর সম্মতি খুজেছিল। কিন্তু সীমান্ত শিশুটির জন্মের বৃত্তান্ত শুনে ঘোরতর আপত্তি জানাল ।
-নিজের যখন নেই, অন্যের সন্তান নিয়ে লাভ কী ? অন্যের সন্তান কখনো আপন হয়না । আমি অন্তত পক্ষে বিশ্বাস করিনা । এসব বাদ দে দিগন্ত । বন্দনা ও আমি শান্তিতেই আছি । আমাদের কোন অশান্তি নেই ।

পরে আবার বোঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল ডাঃ দিগন্ত বরা । সে একটা কথা বুঝেছিল যে সীমান্ত যেভাবে ভাবছে বন্দনা সেভাবে শান্তিতে নেই মোটেই ।সে উপলব্ধি করতে পারেনা, বা ওর চোখে ধরা পড়েনি যে বন্দুনা আস্তে আস্তে শামুকের মত গুটিয়ে যাচ্ছে । এত নিবিড় ভাবে কাছে থেকেও নারীর মনবেদনা বোঝার জন্য যে সংবেদনশীল মন দরকার সে মন সীমান্তর নেই ।

আসলে ডাঃ বরা দাদার থেকেও বৌদির কথা বেশি ভেবেছিল । ভেবেছিল একটি শিশুই পারে বৌদির জীবনে আনন্দের জোয়ার আনতে । সীমন্তর জাত্যাভিমান, বন্দনার পরিপূর্ণতার সম্ভাবনার মূলে আঘাত করেছিল । বলার কিছু ছিলনা ।

জীবনের খেলায় জিতে গেল রুক্মিনী। প্রায় অশিক্ষিত একজন স্বামী যেভাবে পত্নীর মনবেদনাকে উপলব্ধি করে সেই বেদনাকে একান্তভাবে নিজের করে নিতে পারল, উচ্চশিক্ষিত সীমান্ত বরা সেটা পারলনা । আর তাতেই হেরে গেল সীমান্ত ও বন্দনা ।

গভীর বিষাদপূর্ণ মন নিয়ে ডাঃ দিগন্ত বরা ডিউটি রুমে ঢুকে গেল । একটা সিজারিয়ান সেকসন আছে । কেসটা জটিল । অপারেশন করতেই হবে । কাল বিকেল থেকে ভদ্রমহিলা বড়ো কষ্ট পাচ্ছেন । আগে দুটো ছেলে । ভদ্রমহিলার স্বামী নারাঙ্গীর পাথর কারখানায় কাজ করে । কাল মজা করে ডা বরা জিজ্ঞেস করেছিলেন –
-      কী চাই বলুন , মেয়ে না ছেলে ?
এভাবে জিজ্ঞেস করার জন্য ভদ্রমহিলা অত্যন্ত লজ্জা পেলেন । একটু নীচু গলায় বললেন “দুটো ছেলে আছে । এবার মেয়ে হলে ঘরে আমার লক্ষী এলো বলে ভাববো” । ঘর আমার আলো হবে” ।

         লেবার রুমে ঢুকে যাওয়ার আগে কথাগুলো মনে করে ডাঃ বরার হাসি পেল । মানুষের বিচার, বিবেচনা ভালো-মন্দের ধারণা কত বিচিত্র । অবাক লাগে । কেউ কন্যাসন্তান হয়েছে বলে নিজের পত্নীর মৃতদেহ পর্যন্ত নিতে আসেনি ! কন্যাসন্তান বলে আত্মজকে পরিত্যাগ করতে পারে ! হয়তো মানুষ বলেই পারে । এরা কী মানুষ । পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব ! নরাধম পশু ! পশুও তার সন্তানকে ভালোবাসে, স্নেহ করে, রক্ষা করে । আর মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য সন্তানকে পরিত্যাগ করে । অথচ লেবার রুমে যে চিৎকার করছে সেই মহিলার স্বামীতো কন্যাসন্তান চেয়েছেন তার ঘর আলো করে রাখবে বলে ।

         মহিলার চিৎকারে সন্বিত ফিরে পেয়ে তড়িৎগতিতে ডাঃ বরা ঘরে ঢুকে গেলেন । ঘড়ির দিকে তাকালেন । তিনি দুটো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন । চেয়েছিলেন স্বাভাবিক ভাবে সন্তান হোক । এখন সময় পেরিয়ে যাওয়ায় আর অপেক্ষা করতে চাইলেন না । একরাশ আলোর জন্য কী ভয়ানক যন্ত্রণা পচ্ছেন মহিলাটি । এই যন্ত্রণা সব নারীর । প্রতিটি মানুষ জন্মে একই যন্ত্রনার ইতিহাস । ডাঃ বরা ভাবলেন পারব কি এই যন্ত্রণার পরিবর্তে একমুঠো সোনা-রোদ আলো এনে দিতে পৃথিবীতে ! গোলাপ ফুলের মত ছোট্ট কোমল শিশু । একঝাঁক আলোর রোশনাই । যা রামনাথ ও রুক্মিনীর জীবনে বিদ্যুতের ঝলক এনেছিল তেমনি সোনালি আলোমাখা ভোর আনার উদ্যোগ নিলেন ডাঃ দিগন্ত বরা ।
                                                   


মানুষ জনের গল্প  
সরদার ফারুক

সীমান্তের কাছের এক মফস্বল শহর । থানা শহরে যেরকম থাকে - একটা ছন্নছাড়া রেলস্টেশন , ঘেয়ো কুকুরের ঘোরাঘুরি , ব্যস্ত বাস স্ট্যান্ডের পাশে চা সিঙ্গাড়ার দোকান ,কয়েকটা টিনের বেড়ার আড়তের পরেই একমাত্র সিনেমা হল । হলে শো শুরু হবার আগে দর্শক টানতে মাইকে গান বাজে - তুমি যে ডাকাত , তুমি যে চোর / চুরি করেছো হৃদয় মোর । কেবলমাত্র আজানের সময়ে কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে । স্টেশনের দিকের রাস্তায় কিছুদূর এগুলেই বড় বড় শিরিষের তোরণের পাশেই করাতকল ।করাতকলের লাগোয়া চায়ের দোকানটাই ইয়াসিনের । দুপুরবেলা ইয়াসিনের দোকানে রাতজাগা মানুষেরা আস্তে আস্তে অসময়ের ঘুম থেকে উঠে ভিড় জমায় । আজকের আড্ডাটা অনেকক্ষণ জ্বাল দেয়া দুধের মতোই ক্রমশ গাঢ় আর স্বাদু হয়ে উঠছে ।মমিনের বউয়ের লুজ ক্যারেকটারের গল্প (মমিন আড্ডায় অনুপস্হিত ) ,দেশে কেয়ামতের আলামতের নানাবিধ বিবরণ থেকে আড্ডার বিষয়বস্তু এখন পুলিশ সংক্রান্ত নানা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনার দিকে মোড় নিয়েছে । দেখা যাচ্ছে প্রায় সবারই একটা করে বলবার মতো দারুণ সত্য ঘটনা আছে ,আর একজন আরেকজনের আগে সেই গল্প বলার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছে । সম্মিলিত কোলাহলে আড্ডা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে বেল্টু মিয়া আর বসে থাকতে পারেনা , ফ্যাঁসফেঁসে গলায় চেঁচিয়ে ওঠে -সুমুন্দির ছেইলেরা থাম , তুরা কি মানসির পয়দা ? একজন একজন কইরে কতি পারিসনে ?’ ধমকে কাজ হয় বেল্টু মিয়াকে সমীহ না করে উপায় নেই - কষ্টিপাথরের মতো নিকষ কালো বিশাল দেহ , ধবধবে সাদা বুকপকেটওয়ালা পাঞ্জাবীর ফাঁক থেকে উঁকি দেয়া গোল্ডলিফের প্যাকেট আর পাঁচশো টাকার নোট তাকে একটা অন্যরকম মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে ।

         কিছুক্ষণ নীরবতার পর ল্যাংড়া আজিবর গলা খাকারি দ্যায় , মনে হয় কোন একটা কথা বলার জন্য সে সাহস সঞ্চয় করছে । বেল্টু বলে ওঠে -এই শালা ন্যাংড়া তুই আগে ক’ ,তোরতো শালা অনেক অভিজ্ঞতা-পুলিশের বাখারি খাইয়েই তো তুই ন্যাংড়া হয়ছিস ! আজিবর বলে ওঠে -সিডা সত্যি কতা , কিন্তু আমরা যারা বর্ডারের এদিক ওদিক ঘুইরে পেট চালাই তাগের সগলেরই মাঝেমদ্যি কচন খাতি হয় ! এখেনে কিডা আছে বুকি হাতদিয়ে কতি পারে একবারো পুলিশির ঠাপ খায়নি ?’
আবারো নীরবতা নেমে আসলে ,বেল্টু মিয়াই নীরবতা ভেঙে নরম স্বরে বলে - কদিনি ,এ্যাতো তত্ত্ব কতা বাদ দিয়ে ।

         আজিবর নেভী সিগারেটে একটা জোর টান দিয়ে বলে -একবার সাইকেলের টিউবের মদ্যি ফেনসিডিল আনতিছিলাম ।বর্ডার পার হতিই এ্যাক শালা হাবিলদার ধইরে বইসলো - মনে হয় আমাগের মদ্যিই কোনো বাইনচোত খবর দিয়িলো !অবশ্যো হাবিলদারডা খুব ভালো ,আমারে কিছু না কইয়ে সুজা এসপি সাহেবের কাছে নিয়ে গেলো । আমারে পরথম লাথিটা মাইরেলো স্বয়ং এসপি সাহেব , কোন কনেস্টবাল আমার গায় হাত দ্যায়নি ! বারবার এসপি সাহেবের কথা উল্লেখ করতে করতে একধরনের অহংকারের ভাব ফুটে উঠছিলো আজিবরের ভাঙা চোয়ালে আর ঘোলাটে বাল্বের মতো চোখে ।

         আজিবরের গল্প শেষ হতেই টেকো শমসের বলতে শুরু করলো তার দেখা এ্যাক সত্যি ঘটনা । এ্কবার নাকি সে ট্রেনে করে কালিগঞ্জ থেকে খুলনা যাচ্ছিলো ,পথে শুরু হল চেকিং । মেয়েছেলেদেরও গায়ে হাত দিয়ে চেক করছিলো জি আর পি ।এমন সময় একজন যুবতী মেয়ে পুলিশকে বলে উঠলো -দ্যাকো বাবা , তুমার সুমান একটা ছেইলে আমারও আছে পুলিশ ডিপারমেনে -গায় হাত দিবানা !

         পুলিশটি হতবাক হয়ে প্রশ্ন করে -তোমার এই বয়সে আমার মতো ছেইলে ?’
যুবতীটি উত্তর দেয় -সিডা অবশ্যি আমার বিয়ের আগের ছেইলে , আর শুনিছি বিয়ের আগের ছেইলে ছাড়া তোমাগের ডিপারমেনে ন্যায়না !

         ঠা ঠা হাসিতে ফেটে পড়ে ইয়াসিনের দোকান । বেল্টু মিয়া একটা গোল্ডলিফ এগিয়ে দেয় টেকো শমসেরের দিকে ।

                     রুদ্রাক্ষ
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী
ছোট্ট গ্রাম, নাম তার হরিনারায়ানপুর কৃষি প্রধান গ্রাম , অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নেই বললেই হয় যে বছর ভাল বৃষ্টি হয় ফসল ভাল , নাহলে কপালে হাত   ফি বছর বন্যা তে গ্রাম প্লাবিত হয় আর ফসল হানিহয় গ্রামে কুঁড়ে ঘরই বেশি যারা গ্রাম ছেডে সহরে চলে গিয়েছে তারা প্রায় গ্রামের মুখ দেখেনা বললেই চলে দুর্গা পুজর সময় আসে , কদিন থেকে চলে যায়  এমনই এক গ্রামের বাসিন্দা কুঞ্জ বিহারি প্রধান তার এক মাত্রছেলের নাম রুদ্রাক্ষ প্রধান ডাক নাম রুদ্র শিব রাত্রীর দিন  রুদ্রাক্ষ র জন্ম তাই নামরুদ্রাক্ষ  ছেলেটা ধীর স্থীর মিষ্ট স্বাভাবের  কুঞ্জ আর তার স্ত্রী , লক্ষ্মী দুঃখে কষ্টে দিন কাটাত রুদ্রাক্ষ গ্রামের স্কুলে ক্লাস থ্রী তে পডত পড়াশুনায় ভালো মাস্টার মশাই রুদ্রাক্ষ কে খুব স্নেহ করতেন 
একদিন গ্রামেতে লোকের ভিড অনেক গাডি তার সঙ্গে কিছু নেতা , গ্রামের মোডল নিশিকান্ত চৌধুরী বাবুদের দেখে গ্রামের ছেলে ছোকরা, বুড বুডি সকলেইএকজোট হল। নিশিকান্ত বাবু  বললেন, এই গ্রামের সুদিন এল আপনাদের  আর দুঃখকষ্ট থাকবে না আপনারা  এবার গাডি ঘোঁড়া চোডে বাবুদের মত থাকবেন   এখানে বাঁধ হবে সরকার আপনাদের  জন্য এখানে বাঁধ করলে কৃষির উন্নতি সাধন এরসঙ্গে অর্থনৈতিক সাচ্ছলতা আসবে ৭২৬ পরিবারকে যাদের জমি নেওয়া হবে, পুনর্বাসন দেওয়া হবে । তাদের জন্য সরকার আলাদা বসতি নির্মাণ করবেন স্কুলের এক শিক্ষক পঞ্চানন প্রধান বিরধিতার সুর আরম্ভ করে বললেন,সরকার আগে বিস্থাপিতদের জন্য নতুন বসতি,রাস্তা,স্কুল,ডাক্তারখানা,পানীয় জলের ব্যাবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ করুন  তারপর আমরা এই বিষয়ে সম্মতি জানাবো নিশিকান্ত চৌধুরী খেঁপে লাল। শিক্ষক মহাশয় বিনম্রতার সঙ্গে বললেন আপনারা এই গরীব গ্রামবাসীদের জমি নিয়ে নেবেন আর তার বিনিময়ে যা যা ঘোষণা করছেন তার ... বিধায়ক মাহাশয়  নিশিকান্ত কে থামিয়ে বসতে বললেন তার পর শুরু করলেন ‘আমি এখানে কারুর পেটের দানা ছিনিয়ে নিতে আসিনি বরং কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে এসেছি আপনারা ধৈর্য্য ধরে শুনুন সমস্ত বিষয়টা, তারপর আপনাদের কথা শুনব। গ্রামে আর কি কি হবে সে সব প্রতিশ্রুতিও দিলেন বিধায়ক মশাই । এর মধ্যে কিছু লোক চেঁচা মিচি শুরু করে দেয়  নিশিকান্ত সরকারী দালাল আমরা এ ভিটে মাটি ছাডবোনা। আমাদের বাপ দাদার ভিটে মাটি ছেডে কোথাও যাবনা’ ছেলেদের চিৎকারের সঙ্গে অন্যরাও সুর মেলাল বিধায়ক মহাশয় যত বোঝালেও কেউ রাজি হলনা কি চিৎকার থামল না অগত্যা সরকারি বাবুদের নিয়ে সবাই ফিরে গেলেন  পরদিন পুলিশ এসে পঞ্চানন বাবুকে ধরে গেল । প্রথমে পঞ্চানন বাবু ওয়ারেন্ট দেখতে চান কিন্তু পুলিশ কিছু না দেখিয়েই ধরে নিয়ে যায় তাঁকে   সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকে যে যার ঘরে  চলে গেল রুদ্রাক্ষ সব দেখে নির্বাক বয়স অল্প হলেও তার মনে প্রতিবাদের বহ্নিশিখা জ্বলতে থাকে , বুঝল যা হচ্ছে সেটা অন্যায় পেছনথেকে পুলিশ এর জীপ কে লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়ে রুদ্রে । বাড়ি ফিরে বাবাকে বলাতে,  বাবা গুম হয়ে বসে থাকেন, মা কিছু বললে বিরক্ত হন আকাশ পানেচেয়ে কিছু বিড় বিড় করেন। 
এর পরের ঘটনা - গ্রামেতে ক্যাম্প বসে তাহসিলদার, আর আই,আমিন চেন নিয়ে মাপ জোক আরম্ভ করে দেয় পল্লিসভা হল, কিন্তু নিশিকান্তবাবুর গুণ্ডাদের ভয়ে টুঁ শব্দটি করেনা কেউহঠাৎ কুঞ্জ বাডি থেকে একটা কাটারি নিয়ে নিশিকান্তর দিকে দৌডয় রাগে গজরাতে গজরাতে, বলেন ‘তোর চোদ্দ পুরুষের বাপের জমিদারী যে আমাদের জমি নিতে এসেছিস’ সবাই রে রে করে তাকে আটকায় তহসিলদার কাগজে সই করতে বলেন, কুঞ্জ কাগজটা কুচিকুচি করে ছিড়ে ফেলে বলে ‘অমন টাকা আমরা চাই না’ । পরের দিন পুলিশ এসে কুঞ্জকেও নিয়ে গেল কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই ।  কুঞ্জর নিজের জন্যে চিন্তা  হয়না । তার বউ ছেলের যদি কোন ক্ষতি হয় তারচেয়ে মৄত্যু ভাল হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে কুঞ্জ । নিশিকান্ত আর বিধায়ক ভগবান চৌধুরী,কুঞ্জ কে বল্লেন ,দেখ কুঞ্জ আমরা তোমাকে ইচ্ছে করলেই জেল হাজতে পাঠাতে পারি কিন্তু তাতে কি লাভ তোমার বউ ছেলে না খেয়ে মারা যাবে । তুই কি তাই চাস ?”  কুঞ্জ হাউ হাউ করে কেঁদে বলে,না বাবু ওরকমটি করবেন না ! আমি আপনারা যা  চাইবেন তাই করব দারোগা বাবু বল্লেন , বাবুদের অশে দয়া তা নাহলে তোর নামে ৪ টে দফা লাগিয়ে তোকে জেলে ভরতাম বুঝলি ? বিধায়ক মশাই নিজে এসেছেন তোকে ছাড়াতে আর তুই কিনা কাটারি নিয়ে গিয়ে ছিলিশ মারতে’ ? বিধায়ক দারোগাকে থামিয়ে বলেন ‘আমি যে জন্য এসেছি সেটা করুন’ । 
ই সময় বাইরে লক্ষীর গলার আওয়াজ এল। কুঞ্জর বৌ লক্ষী গজরাতে গজরাতে ভেতরে ঢূকলো ‘আ মরণ , পোড়ার মুখোরা , বলি আমার সোয়ামী ছাড়া গেরামে কি আর লোক ছিলনা যে মিনসে তাকে ধরে নিয়ে এলি’ ? ‘দেখছিস কুঞ্জ তোর বউ এর চোপা’ ! দারোগা বাবু বলে উঠলেন । লক্ষীকে বলে ‘এই কে তোকে থানাতে আসতে বলেছে ? যা এক্ষুনি । নাহলে এক্ষুনি তোকেও লক আপ এ  ভর্তি করে দেব’ লক্ষী কাঁদতে থাকে । বিধায়ক সান্তনা দেন ‘আমরা এখানে  কুঞ্জ কে ছাডাতে এসেছিআপনি ঘরে যান, সব ঠিক হয়ে যাবে’ কুঞ্জ ভাবে – সেতো ঘরে ফিরবে, কিন্তু মাষ্টার মশাই ? কে জানে এরা কি করবে । লক্ষীর ওপরও রাগ হয় কুঞ্জর ,মেয়েমানুষ হয়ে ও থানায় এলো কেন ?
কুঞ্জ বাড়ি ফিরল, তার পরদিন মাষ্টার মশাইও  ফিরে এলেন । মাষ্টার মশাইয়ের এখানে কেউ থাকেন না, উনি একাই এই গ্রামে প্রায় বছর দশেক আছেন । তিনি নিজে ছাত্রদের শিখিয়েছেন অন্যায়কে সহ্য করা এবং অন্যায় করা দুটোই  অপরাধ । অন্যায়কে প্রতিবাদ কর হিংসা দিয়ে নয় যুক্তি  দিয়ে । কুঞ্জ যেটা করল সেটা ভূল । সে ভূলের মাসুল তাকে দিতে হল। 
সকাল সকাল কুঞ্জ ক্ষেতের অবস্থা দেখার জন্য স্প্রে মেসিন নিয়ে বেরিয়ে পডল । দু দিন হল খেত খামারের কাজ না হওয়াতে ফসলের ক্ষতি হতে পারে । আজকাল যা  পোকার উৎপাত কোন কিটনাশক ই কাজ করে না । গ্রামের কৄষিগ্রাম সেভক যে কিটনাশক এর চিরকুট টা লিখে দিয়েছিলেন সেটা কিনে এনেছিল কিন্তু  স্প্রে করা হয়ে ওঠেনি । আজকে দেখা যাক ফসলের অবস্থা বুঝে স্প্রে করবেরাস্তায় যেতে যেতে রুদ্রর জন্য ভাবে । ওকে এই গ্রাম থেকে সহরে পাঠিয়ে দেবে ওর কাকার কাছে । বলাবাহুল্য ভাইকেঅনেক কষ্টে ডাক্তারি পড়াতে পেরেছে । এখন সে মস্ত ডাক্তার রুদ্র পডাশুনাতে ভালো তাই ওর সম্ভাবনা বেশি ডাক্তার হবার। ভাইএর ডাক্তারি পডার খরচ সামলাতে না পেরে কুঞ্জ জমি বন্ধক রাখে নিধিরাম বেনের কাছে । আজ সাত বছর হল সুদ গুনছে । এই সব চিন্তার সঙ্গে সব ঘোট পাকিয়ে যায়, জমির জন্য কেন শকুনের নজর পড়েছে !
          কুঞ্জ অবাক হয়  তার বাপ দাদার আমলের জমি  নিধিরাম এর নামে কি করে ? কি করে হয় আমিন জানালো ‘তোর ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেশ কর সব  বুঝে যাবি । তুই যখন জেলে ছিলি, ও তখন কাগজে সই করে দিয়েছে । কুঞ্জর মাথায় বজ্রাঘাত হলো যেন ! কুঞ্জ বিশ্বাস করতে পারলোনা গ্রাম থেকে কিছু দূরে একটা টেলিফোন বুথ আছে সেখানে  কুঞ্জ সাইকেলে যায় টেলিফোন করতে । রাত প্রায় দশটা, কুঞ্জ নম্বর মিলিয়ে ডায়াল করল । অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপার থেকে নিতাইএর কন্ঠ স্বর ভেসে এল হ্যালোকুঞ্জ উৎসাহেরসঙ্গে বললো ‘হ্যাঁরে তুই ভাল আছিস নিতাই ?
-      হ্যাঁ কেন ?
-      না মানে আমি বলছিলাম কি তুই আমাদের জমির কোন কাগজে সই করেছিলি কি?
-      হ্যাঁ আমার ভাগটা আমি বেচে দিয়েছি।  আমাদের মানে ? ওটা কি একা তোমার জমি নাকি ?  আমার ভাগ আমি বেচে দিয়েছি। কাল অপারেশন আছে ঘুমতে দাও
কুঞ্জ আর নিজেকে সামলাতে পারলনা হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো । ফোনটা হাত থেকে পডে গেল । বাডিতে ফিরে এলো । যে কিটনাশক কিনে এনেছিল পোকা মারার জন্য সেটা সকলের অজান্তে গলায় ঢেলে দিলো রাত্তিরে । কুঞ্জ বমি করতে করতে নেত্যে পড়ে, লক্ষী সর্বনাশের আঁচ পেয়ে ডুকরে কেদে ওঠে । এ গ্রামে ডাক্তার নেই আছে এক কম্পাউন্ডার, সে  এসে দেখেন মুখ থেকে গেঁজা বেরুচ্ছে, বুঝতে পারে শেষ হয়ে গেছে , বলে ‘এটাতো সুইসাইড কেস ।  পুলিস কে খবর দিতে হবে’ ।  লক্ষীর বুক ফাটা কান্নাইয় ভোরের আকাশ তখ ভারি হয়ে গেছে ।
          রুদ্রাক্ষ সব দেখছিল শুনছিল কিছুই মুখ থেকে শব্দ না করে গুম হয়ে বসে ছিল । হঠাৎ তার বাবা যে  কাটারটা দিয়ে নিশিকান্ত কে তাডা করেছিল সেটা নিয়ে দৌড়তে লাগলো । সবাই কে মেরে ফেলব । আমার বাবাকে আমায় ফিরিয়ে দাও নাহলে সকলকে মেরে ফেলব রুদ্রাক্ষ  কোথায় গেল কেউ জানেনা । নিশিকান্তদের নাগাল সে কোনদিন পাবে কি না তাও কেউ জানে না। শুধু পঞ্চানন মাষ্টার মনে মনে বলে ‘দৌড়ক , রুদ্রাক্ষ দৌড় লাগাক , তবে যদি... ।
পঞ্চানন রুদ্রাক্ষকে খুজতে বেরোলেন । তাকে বুঝিয়ে ঘরে নিয়ে এলেন , অভয় দিলেন ‘আমিতো আছি রুদ্র , ঘরে চল, মার কাছে যাও, অনেক কাজ তোমাকে করতে হবে’ । রুদ্রর ভেতরের আগুনটা পঞ্চানন চিনতে  
         রুদ্রকে নিয়ে পঞ্চানন কুঞ্জর বাড়ি ফিরলেন , ওখানে জড়ো হওয়া মানুষজন মনে বল পেল । পঞ্চানন কুঞ্জর নিথর দেহ ছুয়ে তাদের শপথ নিতে বললেন ‘আর কোন কুঞ্জকে যেন আত্মহত্যা করতে না হয়,আর কোন কুঞ্জর জমিতে যেন শকুনের নজর পড়তে না পারে’
          পরদিন দৈনিক সংবাদ পত্রে একটা ছোট খবর বেরোল ‘হরিনারায়ণপুর গ্রামে এক কৃষকের আত্মহত্যা’ এই শিরোনামে ।


বিরহী বাঁশিতে সুহাসী ফুঁ
অনুপম চৌধুরী 
      
আজ অবেলার সূর্যটা যাবে যাবে করেও কেন জানি যাচ্ছে না, বারংবার উঁকি দিচ্ছে জানলার কাঁচে। বিকেলের সোনারোদ যা মিষ্টি, কতদিন তাকে ছোঁয়া হয় না । সেই কবে তাকে ছুঁয়েছিলাম বেভুল বনে গেলো, আর আনমনা ভালো লাগা আমার করিডোরে হেঁটে বেড়াতো অলস সময়ে। ল্যাপটপটা অন ছিল, হঠাৎ শুনলাম ফেইসবুক ম্যাসেজের শব্দ। কিরে পাগলী আমার, কি  করিস? মিশু একি সঙ্গে পড়ে, খালি ক্ষ্যাপায়। সেই কলেজ লাইফ থেকে এখন অবধি, ইউনিভার্সিটি শেষের পথে, পিছু যেন ছাড়বে না । অবশ্যই সে না থাকলে এতদিন হয়তো এইভাবে বেঁচে থাকা যেতো না।কত আড্ডা , ঘুরা , খাওয়া, মাস্তির কোন শেষ রাখি নি ।  যখন রাইয়ানের সঙ্গে বিয়ে হল- তারপর খানিক নিরুদ্দেশ । এখন আবার পাইছে আমারে । অবশ্যই এই রকম একজন ভালো বন্ধু প্রতিটা মানুষের জীবনে শতভাগ দরকার। নাহলে জীবন কি তা উপলব্ধি করা অনেক মুশকিল ।

          আজ কেন জানি মনের গোপন কুঠরিতে কার জন্য চিনচিনে ব্যাথা শুরু হল । কেমন আনমনা খারাপ লাগা চেপে বসলো হৃদের বারান্দায়। ইউনিভার্সিটির বড় ভাই হিসেবে রাইয়ানের সঙ্গে পরিচয়। তারপর দেখা, নাম্বার আদান প্রদান, ফোনে কথা, দেখা করা এবং চুটিয়ে প্রেম করা। পরে বাবা- মার অসম্মতিতে বিয়ে। এরপরে অবশ্যই সবই ঠিক হয়েছিল, বাবা মেনে নেয়ার পরে জামাই হিসেবে স্বীকৃতিও পায়। সেই দুবছর আগে যাকে ছাড়া একবিন্দু কল্পনা করা দুরুহ ছিল, তাকে ছাড়া আজ ছটা মাস কিকরে যে কাটল টের পাওয়াটাই মুশকিল । প্রেমের প্রথম দিকে কি রোমান্স- সারাদিন রিকশা ভ্রমণ, ঘোরা, খাওয়া, এবং ছেড়ে যাওয়ার বেদনা সবই এখন অতীত। ফুচকা ছিল আমার খুব প্রিয় খাবার, বের হলেই ফুচকা আমার চাইই- চাই । আবার ফুচকার সাথে বেশি কাচা লংকা না হলেও চলত না, একদিন ফুচকা  আমি মরিচ একটু বেশি খেতে পছন্দ করতাম।কিন্তু সে জানত যে আমি অসুস্থ আর ডাক্তার আমায় মরিচ কম খেতে বলেছে। তাই রাইয়ান আমাকে মরিচ খেতে বারণ করত , আসলে ও আমার অনেক খেয়াল করতো, প্রতিটি কাজে যে আমায় কত সাহায্য করতো তার কোন ইয়ত্তা নেই।
         
           প্রেমে পড়ার পর প্রতিটা কাজে সে আমায় খবর রাখত। একদিন খুব ভোরে রাইয়ান ফোন করে , অবশ্যই এতো সকাল সে ফোন করে না আমি চোখে ঘুম নিয়ে ফোন ধরি প্রাচী, জানো, কাল রাতে তোমায় নিয়ে সারাদিন ঘুরেছি স্বপ্নে। শহরের এপার ওপার সব দৌড়েছি, তারপর দুপুরে লাঞ্চ করে বাসায় ফিরি। এবং সব শেষে তোমায় একটা..... না থাক দেখা হলে বলব। জান, ঐ স্বপ্নের পর থেকে আর ভালো লাগছে না। আচ্ছা শোন, আজ একটু শীঘ্র বের হবে । আমি ঠিক ১০.৩০ এ ইউনিভার্সিটির সামনে এসে তোমায় কল দেব, তারপর আজ সারাদিন আমি এবং শুধু তুমি। আর শোন আসার সময় লাল ফতুয়া আর জিন্স, কানে বড় দুল হাতে কাঠের চুড়ি ও বড় একটা কালো টিপ পরে আসবে .কে এখন রাখছি এলে সব কথা হবে। ফোনের লাইন কাটার পর আমি ভাবলাম, রাইয়ান আমাকে অনেকবার বলেছে তাকে একটা কিস করতে, আমার জানি কিন্তু কেন জানি ওসব ব্যাপারে মন আগায় না। মাঝে মাঝে করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু আবার কেন জানি অন্য এক ভাবনায় দূরে চলে আসি। আর আমার হাবাগোবা প্রেমিকটাও একবারের জন্যও জোর করে কিস করে না। আরে ও কি বোঝেনা যে মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফাটে নাহাঁদারাম, এক্কেবারে গালি দিতে ইচ্ছে করে, আমার কি সব বলে কয়ে দিতে হবে। ফোনের মধ্যে কত্ত মুরুব্বী মার্কা কথা, আমার সামনে আসলে যেন কিছুই বোঝে না।
          ঠিক ১০.৩০ হতেই এসে হাজির আমার মহারাজা! ও আবার সময় সম্পর্কে অনেক সচেতন। সেইদিন রাইয়ান জিন্স, টি-শার্ট ও গলায় একটা মালা এবং হাতে চেইনের বড় ঘড়ি পরেছে। আর একটা খয়েরি গ্লাস মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটিকে আমি ভালবেসেছি। আমি যে এরকম একটা রাজপুত্রের সাথে প্রেম করি তা কিন্তু আগে জানা ছিল না। এই ভেবে নিজে একটু গর্ববোধ করলাম। সময়ের করিডোরে কত কিছুই পালটায়, শুধু পালটায় না আমাদের ভালোবাসা, আবেগ সবই ... রাইয়ান রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি কিছুক্ষণ দেখলাম আমার আপন পৃথিবীর দিকে, রাইয়ান বলল- এই ওঠ না , দেরী হচ্ছে তো ? আজ সারাদিন ঘুরবো। আমি আবার আড্ডাবাজিতে, ঘুরাঘুরিতে অনেক চটপটআমি উঠে বসলাম, রিকশা চলছে । চলেছে মনের অনেক কথন, রাইয়ান আবার মাঝে মাঝে দুচার লাইন বলে কি সব ছাইপাঁশ-
শিখণ্ডী শরীরে, আবেগি অম্বরে                         
স্রোতস্বিনী তরঙ্গ বাজায় মাদল।
বিটপী সমীরণ, অধরা রঙ্গন,
পোড়ায় কুহরমাঠ ফাটা আদল।                           

         আমি হাত তালি দিলাম, ঘুরতে ঘুরতে আমাদের অনেক কিছুই খাওয়া হল। রিকশা ওয়ালাও আমাদের সাথে খেল, রাইয়ান দুটা আইসক্রিম নিল । ওর একটা বদভ্যাস কিছুতে পাল্টানো গেলো না, আজো তার ব্যাতিক্রম হল না, খেতে খেতে আমার নাক কে আইসক্রিম না খাওয়ালে মহারাজার ভাত হজম হয় না। রাইয়ান বলল মহারাণী আমার, এবার একটু রাজার হাতটা ধরো তো? আমি বললাম , না মহারাজ এই পাবলিক যায়গায় হাতটা ধরতে না পারার জন্য খুবই দুঃখিত। হঠাৎ আকাশেরও দেখি কেমন জানি মন খারাপ হল, গুড়ুম গুড়ুম শব্দে তার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। মনে হচ্ছে একটু পর তার কেরামতি আমাদের সামনে সামিল করবে। যেই কথা সেই কাজ, শুরু হল অঝোর বরিষণ। রিক্সার ঝাঁপি যেন বেসু্রে ড্রাম বাজাচ্ছে। শুনতেও খারাপ লাগছে না , একটু রোম্যান্টিক ভাব লাগছে। আর মনটা কেমন জানি আবেগী হল , ইচ্ছে করছে রাইয়ানের গালে আলতো একটা চুমু দেই। কিন্তু সাহসে হচ্ছে না। আর বেয়াদবটাও নিজ থেকেও দিতে পারছে না। বৃষ্টিও যেন থামছে না, এমন ভিজা ভিজলাম মনে হচ্ছে এই মাত্র পুকুর থেকে ডুব দিয়ে আসলাম। রাইয়ান কেমন জানি আমার দিকে অপলক চেয়ে রইল, জিজ্ঞেস করলাম ‘কি দেখ অমন করে’ ? বললো ‘কেন তোমায় দেখি , আমার পাশে যে আর কেউ নেই দেখার । শুদ্ধতার মাতমে তোমার চেহেরায় কি অনাবিল পেলব ভাব, আহারে! চোখে নেশা শরীরে আবেগী জিনিসগুলো মাত্রা বেড়েছে দিগুণ। আমার আবেগি পেয়ারির আবেগ গুলো যেন এখনি ঝরে পড়বে’
-শোনো রাইয়ান এখন ফাজলামির সময় নয়।
-ও কে আমার আদুরে ডল, বুঝলাম, এখন ফাজলামি করা চলবে না। চুপ রাইয়ান এখন চুপ, কোন কথা হবে না। অবলিলায় বলে রাইয়ান।
বৃষ্টি থেমে গেলো, বৃষ্টির পর মেঘেদের ফাঁকে সূর্য কথা বলছে, অমনি আমার কবি সাহেব বলে উঠলেন-
শুভ্র বিকেলে মেঘেদের আনাগোনা,
আনমনা রোদ ক্ষণে দেয় হানা ।
মলিন ভাঁজে হৃদপুরের চিক্কুর,
অগোছালো সময় বড়ই নিষ্ঠুর।।

          এক পশলা বৃষ্টির পরে সূর্যের এমন হাসি দেখে নিজেরই ভালো লাগছে, রাইয়ান পকেট থেকে রুমাল বের করে আমার মাথা মুছে দিল। আমি কেমন জানি আনমনা ভালো লাগা অনুভব করলাম। আমি বুঝতে পারছি না, পুরুষের স্পর্শ এতো কি মধুর? এটাই কি প্রেম নাকি ভালোবাসা নাকি দেহের চাহিদা বুঝতে পারছি না। শুধু এইটুকু বুঝলাম রাইয়ান আমাকে অনেক ভালবাসে।
রাইয়ান বলে ‘প্রাচী একটু নামতো’?
-কেন?
-বুথে যাব, টাকা নাই?
-তো তুমি যাও, আমার যাওয়ার প্রয়োজন কি। আমি রিকশায় বসি তুমি গিয়ে টাকা নিয়ে আস?
-বেশি কথা বললে এক্কেবারে ভালো লাগেনা, কালরাতের স্বপ্ন এখনও শেষ হয় নি যে? নামো তাড়াতাড়ি নামো?
আমিও নেমে বুথে ঢুকলাম, রাইয়ান মানিব্যাগ থেকে কার্ড বের করে আমায় দিল, আর বলল এটা দাও। আমিও কথা মত দিলাম, রাইয়ান আমার পিছনে ছিল- কার্ড দেওয়ার পর মেশিন বলল- প্লিজ টাইপ দা পাসওয়ার্ড। তখন রাইয়ান আমাকে জড়িয়ে ধরা স্টাইলে আমার ডান হাত চেপে কী বোর্ড টিপলো, আর আমি অনুভব করলাম অনেক ক্ষুধার্ত একটা ঠোঁট আমার ঠোঁটে আলতো ছুঁয়ে আছে। আনমনা আবেগী ভালোবাসা আমার চারপাশ ঘিরে ধরল।নিদারুণ এক ভালোলাগায় জর্জরিত আহত পাখির মত দাঁড়িয়ে রইলাম। বুঝতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো। আমার অবোধ বালকটি এতো সাহস পেল কি করে তা ভেবে?
-প্রাচী চল, রিকশা দাঁড়িয়ে আছে?
-কেন, তুমি টাকা নেবে না?
-আরে কি যে বল তুমি, সেই কখন যে টাকা নিলাম।
-তুমি আবার কখন টাকা নিলে ?
-কি বলে আমার মহারাণী, এইযে ঠোঁটে আলতো দুটো ঠোঁট পড়লো তাতেই আমার টাকা নেওয়া শেষ হল।
-যা, টাকার সাথে আমার তুলনা, তাই না ? আর তুমি এমনিতেই একটু বেশি কর।
-আচ্ছা করি , চল এবার ।ঃ

         সে দিনের প্রথম কোন পুরুষের সুহাসী চুম্বন আজো নাড়ায়। আর এই অবোধ নরাধমটি আমায় ফেলে এতোদিন কেমন আছে কে জানে? সামান্য ভুলের জন্য ৬ মাস পার হল। ওই দিন এমন ঝগড়াটা না করলে কি চলত না। আমার ফেইসবুক খোলা ছিল, এক অপরিচিত বন্ধু, যার সাথে ফেইসবুকেই আমার ভালো আলাপ, এমন কি আমার আদ্যোপান্ত সে জানে, আর আমিও তার আদ্যোপান্ত সব জানি। সেই দিন রাইয়ান আমার পাশে বসা ছিল, হঠাৎ ম্যাসেজের শব্দ শুনেই দুজনেই তাকালাম। অ্যাই লাভ ইউ জানু। আমার চোখ কপালে উঠলো। কি সাহস, রাইয়ানের সামনে আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না। এই নিয়ে অনেক ঝগড়া হল। তারপর দুজনেই এমন উত্তেজিত হলাম, রাইয়ান আমাকে ফেলে বের হয়ে গেলো। আমিও কাপড় চোপড় নিয়ে বাবার বাসায় উঠলাম , মামলা খতম।

         এখন মনে হচ্ছে এমন করাটা আসলেই উচিৎ হয় নি। একটু ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে দিলে রাইয়ান বুঝত। আর এই ৬ মাস কেউ কাউকে একটা ফোন পর্যন্ত করে নি, এমনকি এসএমএস ও না। আজ মনটা খুবই খারাপ, রাইয়ান কে ভেবে আরও খারাপ হল, আমি যে আর পারছি না। হাতে মোবাইল নিয়ে এস এম এস লিখলাম- ‘খুবই ভালো আছ না, আমাকে একা ফেলে’ ?
সঙ্গে সঙে রাইয়ানের এসএমএস।
-হ্যাঁ , খুবই ভালো আছি।
আমি আবার লিখলাম- কম্প্রোমাইজ ইস এ স্টলিং বিটউইন টু ফুলস এন্ড সরি , এগেইন সরি’
-আবার সঙ্গে সঙ্গে রাইয়ান উত্তর  দিল- ‘আমি আসছি, তোমায় নিতে। আধ ঘণ্টা পর’
         
          আমার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল বইছে, আর ভাবলাম এবং বুঝলাম ভালোবাসার প্রধান শর্ত হল খানিকটা আপোষ আর খানিকটা পারস্পরিক বোঝাপড়া ।