গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

মঙ্গলবার, ১৫ মে, ২০১২


‎স্বার্থপর
কাশীনাথ গুইন
রাতে ঘুমের ঘাটতি ঘটাতাম তাই দুপুরে দুঘন্টা ভাতঘুমের একটা অভ্যেস ছিল আমার । তারপর একঘন্টা শরীরচর্চার বরাদ্দ ছিল বাঁধা। বাড়ীর কেউও ঐ সময়টা কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করেনি কখনও ।
মাধ্যমিকের টেষ্ট মনের মত হওয়ায় খুশীমনে সেদিন সকাল থেকে শুধু আকাশবানীর নানা অনুষ্ঠানেই সময় কাটিয়েছি-সারা পাড়ায় তখন শুধু হেডস্যার এর - মানে তপতীদের বাড়ীতেই দূরদর্শনের অবাক বাক্সটা ছিল । প্রাইমারী থেকেই তপতী আমার ক্লাসমেট । কিন্তু খেলা আর পড়াশুনা ছাড়া অন্য কোন অনুষ্ঠান দেখাশোনার ছাড়পত্র তপতীও পেতো না কখনও । আমি কিন্তু পড়ার সময়েও রেডিওতে গান,নাটক কোন অনুষ্ঠানই ছাড়তাম না-সব বন্ধুদের মত তপতীও হিংসেই করত। কারণ এরপরও আমাকে ডিঙিয়ে কেউ ফার্স্ট হতে পারত না। ঘুম চোখ ধুয়ে ফেরার সময় দেখি তপতী বোনের সাথে কথা বলছে। আমার ঘরটা আমার জগত- বোনেদেরও ঢুকতে দিই না খুব একটা । হঠাৎ তপতীকে ঢুকতে দেখে তাই অবাক হতে যাচ্ছি তখনই ওর চোখের জলে থমকে গেলাম। ---- ‘এখনই একবার দিঘীর পাড়ে আয়’

কোন প্রশ্নের সুযোগ না দিয়েই ঝড়ের মত বেরিয়ে গেল। কিছু বোঝার অবকাশ ছিলনা,অগত্যা পিছু ধাওয়া করতে হল। দিঘীর পাড়ে একটা বুড়ো বট আছে –ঠাকুর্দাও ওটার বয়স জানতো না। বাগাল ছেলেরা গরু চড়াতে এসে দুপুর তক ওর ছায়া দখল করে-গরুগুলো দিঘীর পাড়ে ঘাস খায় । সন্ধ্যে পর্যন্ত কাকীমা-বৌদি আর পাড়ার সব মহিলাদের পেট ও মগজ সাফাইয়ের ঠাঁই এ জায়গাটা আমি সজত্নে এড়িয়ে চলি। এখনও বোধহয় সময় হয়নি ওদের আসার তাই জায়গাটা শুনশান। মেয়েটা মরতে এখানেই জায়গা পেল ভেবে মগজ আমার ঝাঁঝাঁ করছে-নেহাৎ চোখভরা জল আমাকে আসতে বাধ্য করলা। এসে ওকে না দেখে আরও রাগ বাড়ল আমার। পালানোর জন্য পিছন ফিরতেই পিছন থেকে কে যেন দুহাতে জড়িয়ে ধরল। ফোঁসফোঁসানি শুনে ঝুঁটি ধরে সামনে টানতেই ওই সাপ আমাকে আরও কঠিন বাঁধনে বাঁধল।
----
আমি মরে যাব তোকে ছাড়া । তুই আমাকে বাঁচাবি, কথা দে। নাহলে ছাড়বো না – এই দিঘির জলে এখনই ডুবে মরব তোকে নিয়ে ।
----আরে বাবা, বলবি তো কি হয়েছে। নাহলে আমি কি করব। তাড়াতাড়ি বল। এখনই সব গেজেটের দল এসে হাজির হবে, আমি পালাব কিন্তু। 
----কাল আমাকে দেখতে আসছে। ছবিতে পছন্দ করে রেখেছে। বৌদির মাসীর ছেলে-ক্লাস ওয়ান গেজেটেড অফিসার। দেখলেই গিলে খাবে-ছোটবেলা আমি দেখেছি হিরোকে। আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না। কথা দে তুই আমাকে নিয়ে পালাবি কিনা।
----আচ্ছা মুশকিল ! পছন্দ হলে এমন পাত্র কেউ হাতছাড়া করে । হিরোর উপযুক্ত হিরোইন হবি । তোর এই পিঙ্গল আঁখি,শুভ্র ত্বক-হিরোইন হয়েই তো জন্মছিস । আমাকে জ্বালাসনে,যা লক্ষ্মী মেয়ের মত বাড়ি গিয়ে কাকিমার বেনারসী ট্রায়াল করগে । নাহলে আমি গিয়ে সব বলছি স্যারকে-আমি বিশ্বাসঘাতক হতে পারবো না । জানিসতো আমাকে সবাই কত বিশ্বাস করে ।
----অহংকারে কোনদিন চোখতুলে তো আমাকে দেখলিনা । আমার কটা চোখ নিয়ে আবার ঠাট্টা করছিস,সব বলার কি ভয় আমাকে দেখাচ্ছিস- নিজেই বইখেকো ভীতুর ডিম একটা । আমার এই অপমানের শাস্তি থেকে কেউ তোকে বাঁচাতে পারবে না দেখিস । তোকেও কাঁদতে হবেই – আমি জানি তুই আমাকে ছেড়ে আর কাউকে ভালবাসতেই পারবি না। মনের কথা বলার সাহসই নেই তোর মত ভিতুর ডিমের । সারাজীবন বই নিয়েই থাকবি, বউ জুটবে না দেখে নিস।

আরেক দফা গর্জন ও বর্ষণ এবং আমার বুকের মাঝে ওর নিজেকে লুকোনোর নিষ্ফল চেষ্টাকে বাধা দিতে পারিনি সেদিন । ওর কান্নার কাঁপুনিটা অজান্তে কখন আমার সিস্টোল-ডায়াস্টোলে মিশিয়ে দিয়েছে মেয়েটা তা টের পেতে সত্যি কদিন দেরী হয়েই গেল। হেডস্যার ভাল ছাত্রটিকেই পাত্রের রিসেপশনের জন্য বাসস্ট্যান্ডে রেখেছিলেন। পছন্দ সেরে যাওয়া পর্যন্ত সারাক্ষণ তপতির মুখোমুখি হয়েছি অনেকবার-ওকে অদ্ভুত কাঠিন্য দিয়ে নিজেকে বাঁধতে দেখে ভিতরে কেঁপে উঠেছি,জানুয়ারির বিকেলেও ঘেমেছি গেঞ্জী ভিজিয়ে। খেতে পারিনি -সুখাদ্যের থালা ককুরে খেয়েছে আমি অভূক্ত থেকেছি মনখারাপকে পেটখারাপ প্রমাণিত করে। ও পারেনি খেতে-কাকিমা আন্দাজে চেপে ধরেছেন পাত্রকে বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে আসতেই,জরুরী কাজের অজুহাতে পালিয়েছি। ওর মুখের দিকে আজ সত্যি সত্যি এই প্রথম দেখলাম - ফর্সা মুখটা যেন রক্তহীন মনে হল।

রাতে সত্যি জ্বর এল । ব্যথায় ছটফট করেছি। সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি বিছানায় নিমপাতা - ডালসুদ্ধ। মা এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল--– এখনও জ্বর আছ,বেরোবি না,তোর পক্স হয়েছে। সারাদিন সমাজসেবা করে এসব যে বাধালি - সামনে পরীক্ষা বুঝে নিয়ম মেনে তেরটা দিন কাটালে নিম হলুদ দেব,তারপর বাইরে যাস। তেরাত্রি এখন বইও ছুঁবি না,বুঝলি।  মা বেরোতেই বোন এসে জানাল একটু আগেই কলকাতা থেকে ফোনে তপতীর বিয়ের তারিখ পাকা হয়েছে পরের রবিবার । আমি একবার তপতীকে ডাকার কথা বলতে গিয়েও পারলাম না

–যদি আবার ছোঁয়াচে রোগটা ওর বিপদ ঘটায় ! একটু পরে শুনতে পেলাম যে নিম হলুদের পরদিন মা তপতীকে আইবুড়ো ভাতে ডেকেছে, আর সময় কৈ তাই – মনটা ভাল হয়ে গেল শুনেই। ও এসে ভাত খেয়ে গেল কিন্তু মা নাকি আমার ঘরে আসতে দেয়নি পরের মেয়ের দায়িত্বের কথা মনে রেখে। বাইরের জানালা থেকে একটা কঠোর চাউনি ছুড়ে দিয়ে পালাল কোন কথা না ব’লে। বিকলে ওর মা এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে তাকাল একচোখ জিঞ্জাসা নিয়ে-আমার দুচোখের জলে কিছু বুঝল হয়তো--- আমি কিছু করতে পারলাম নারে তোদের জন্য। মাষ্টারটাও সব জেনেও এমন করবে ভাবিনি রে। মাষ্টারটারও তোকে পছন্দ করে কিন্তু আরও পাঁচটা বছর এই আগুনে মেয়েকে ঘরে রাখতে রাজী নয় তাই জানাশোনা পাত্রটা হাতছাড়া করতে চাইছে নারে, নহলে তোর মাও তো অরাজী নয় রে! মেয়েটাও গুমরে মরছে – আমার হয়েছে যত জ্বালা। রোগটা না বাধালে.... এখন পালাতেও তো পারবি না। মুখপোড়া বিধাতাটা যে কি চায় । বিড়িবিড় করতে করতে পালিয়ে বোধহয় চোখের জল আড়াল করল ককিমা। এরা আমাদের নিয়ে এত ভাবে – টেরটিও পাইনি শুধু আমিই । কি নির্বোধ আমি !
আমার এই বন্দীত্বের ন’দিনের মাথায় ওর গায়ে হলুদ নিয়ে পুকুরঘাটে যাওয়ার সময় বাইরের জানালায় মুহূর্তের স্যিলুট দর্শন দিয়ে যাওয়ার সময় একটা শব্দ শুধু হাওয়ায় ছুড়ে দিল – স্বার্থপর ।

মগডাল বাহাদুর

মুহসীন মোসাদ্দেক


হাতের লাঠিটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে হুংকার ছুড়লো মা, ‘নেমে আয় বলছি রাজু, তোর হাড়-হুড্ডি কিন্তু গুঁড়ো করে ছাড়বো !’ গাছের মগডালে চড়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে রাজু। পা নাড়াতে নাড়াতে রাজু এমন ভাব করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো যে, 
এসব হুংকাফুংকারে তার কোনো কেয়ার নেই!
মা এবার লাঠিটা উঁচিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে বললো, ‘কি হলো, কথা কানে যায় না তোর? নেমে আয় বলছি। তোর পিঠের চামড়া কিন্তু ছিলে ফেলবো!’

পা নাড়াতে নাড়াতে রাজু একবার মাকে ভেঙচি কাটলো। তারপর মনে মনে বললো, ‘আসো, উঠে আসো, দেখি কেমন পারো! পিটবা তো উঠে আসো, উপরে উঠে এসে পিটো, যতো খুশি পিটো!’ কিন্তু মুখে কিছু বললো না । আরেকবার ভেঙচি কেটে পা নাড়াতে নাড়াতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো ।
মা এখন ক্ষেপে আছে খুব । ক্ষেপে থাকে না কখন! সারাক্ষণই তো ক্ষেপে থাকে। থাকে! না কী রাখে! দুটোই, মা যেমন ক্ষেপে থাকে, রাজুও তেমন ক্ষেপিয়ে রাখে। ক্ষেপিয়ে দিয়েই মগডালে চড়ে বসে।
মায়ের লম্বা লাঠি থেকে বাঁচতে এ মগডালই রাজুর বড় আশ্রয়। বাড়ি থেকে হাত পঞ্চাশেক দূরের বিশাল এই শিমুল গাছের মগডালটা রাজুর ছোটখাটো একটা সংসার। মা ক্ষেপে গিয়ে লম্বা লাঠিটা নিয়ে তাড়া করলেই রাজু এই মগডালে চড়ে বসে ।

নিচে দাঁড়িয়ে মা লাঠি উঁচিয়ে হুংকার ছোড়ে, কিন্তু নিজে চড়তে পারে না, রাজুর তাই নাগালও পায় না। মা শান্ত না হওয়া পর্যন্ত রাজুকে এই মগডালেই চড়ে থাকতে হয় । মায়ের রাগ পড়ে শান্ত হতে কখনো আধা ঘণ্টা, কখনো দুই ঘণ্টা, কখনো সারাদিনই কেটে যায়! এই পুরো সময়টা যে মা লাঠি হাতে নিচে দাঁড়িয়ে থাকে, তা নয়। বাসা থেকে তীক্ষ্ণ চোখে গাছের দিকে নজর রাখে। রাজু নামতে গেলেই লাঠি হাতে তেড়ে আসে। রাজুকে তাই মায়ের রাগ পড়ে শান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হয়। এই সময়টা তো আর ডালে বসে শুধু পা নাড়িয়ে কাটানো সম্ভব না। এক-দুইদিন না হয় কাটানো গেলো, কিন্তু বিষয়টা যখন নিত্য-নৈমিত্তিক তখন সেটা অসম্ভব। আর তাই দিনে দিনে রাজু তার খেলনাপাতিগুলো এই মগডালে জড়ো করে সংসার পেতে নিয়েছে । আশেপাশের ডালগুলোতেও তা বিস্তৃত হয়েছে। মায়ের রাগ পড়ার অপেক্ষায় তাকে মুখ ভার করে তাই শুধু পা নাড়াতে হয় না। খেলনাপাতিগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে পুরোটা দিনও পার করে দেয়া যায়। মা গাছের নিচ থেকে সরে গেলেও আজকাল আর রাজু নামার চিন্তা করে না। খাওয়া-দাওয়ার প্রতি তার এমনিতেই অনাগ্রহ, সেটা নিয়েও তাই ভাবনা নেই। মগডালেই তার সুন্দর সময় কেটে যায়। নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকগুলো তাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসে, কেউ কেউ বান্দর বলে টিটকারি মারে, তাতে রাজুর পাত্তা দেয়ার সময় হয় না।

মগডালে রাজুর সংসারের মূল অংশটা টেলিভিশন রাখার বাক্সগুলোর মতো বড় একটা বাক্সে। আরো তিনটা ছোট ছোট বাক্স আছে আশেপাশের তিন ডালে। বাক্সগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধা যাতে বাতাসে বা ঝাঁকিতে পড়ে না যায়। এ বাক্সগুলোতেই তার খেলনাপাতিগুলো রাখা। যখন যেটা নিয়ে খেলতে মন চায় সেটা বের করে নেয় বাক্স থেকে। কখনো এ ডালে বসে খেলে, কখনো খেলে ও ডালে বসে। এ ডাল থেকে ও ডালে যাওয়ার সময় তাকে অবিকল বান্দরের মতোই লাগে! বড় বাক্সটা যে ডালে, রাজুর সংসারের মূল অংশ যেটা তার ওপরের দিকে মোটা পলিথিন ছাউনির মতো করে বাঁধা। সব মিলিয়ে সাজানো গোছানো খুব সুন্দর সংসার রাজুর। কিন্তু, রাজুর এই সাজানো সংসার মাঝে মধ্যে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় । না, মাকে কিছু করতে হয় না। মা আর কী-ই বা করবে! সে তো গাছে চড়তে পারে না! কোনোভাবে রাজুর কোনো খেলনা যদি নিচে পড়ে যায়, গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছেলে-ছোকড়া-লোকজন কেউ তা ছোঁয় না, সেভাবেই পড়ে থাকে। এমনকি গাছে চড়ে খেলনাপাতিগুলো নিজের সম্পত্তি বানানোর চেষ্টাও কেউ কখনো করে না। রাজুর সংসারে ভিলেন হয়ে দাঁড়ায় ঝড়-বৃষ্টি। পুরো বর্ষাটাই রাজুকে তার সংসার গুটিয়ে রাখতে হয় । আর বৈশাখী ঝড় প্রায়ই লণ্ডভণ্ড করে রেখে যায় তার সংসার। দিনের বেলা ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে রাজু অবশ্য আগাম সব গুটিয়ে ফেলে, কিন্তু মধ্যরাতে উশখুশ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। অনেকগুলো বাক্স এবং খেলনা তার এ কারণে নষ্ট হয়েছে।

মা লাঠিটা উঁচিয়ে রেখে নাড়াতে নাড়াতে এবার মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, ‘কি, নামবি না? মগডালে চড়ে বাহাদুরি দেখাস! সাহস থাকে তো একবার খালি নেমে আয়, দেখি কেমন তুই বাহাদুর!’
রাজু বাহাদুরি দেখানোর বোকামি করলো না । কোনো জবাবও দিলো না। মাকে আবারো ভেঙচি কেটে মগডালে বসে পা নাড়াতে থাকলো ।

রাজু তার খেলনাপাতিগুলো মগডালে জড়ো করে সংসার পাতলেও সারাক্ষণ মগডালে বসে খেলা করে না। অন্য সময় বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট-ফুটবল-গোল্লাছুট-কানামাছি খেলে। কেবল মা লাঠি নিয়ে তাড়িয়ে বেড়ালেই সে এই মগডালে আশ্রয় নেয়। মায়ের তাড়িয়ে বেড়ানোর পেছনে সব সময়ই একটা ঘটনা থাকে। আজকের ঘটনাটা দুপুরের খানিক আগের। রাজুর স্কুল আজ ছুটি ছিল। এই একটা দিন ছুটিতেই বন্ধুরা সব গায়েব। আশেপাশে যাদের মামা-খালা-চাচার বাড়ি, তারা সেখানে বেড়াতে গেছে। কেউ বাড়ির বড় কারো সঙ্গে শিশুপার্ক না হয় চিড়িয়াখানায় গেছে । একজন তো বাবার সঙ্গে অফিসেই গেছে ! আশেপাশে রাজুর কোনো মামা-খালা-চাচার বাসা নেই। বাড়িতে মা ছাড়া বড় কেউ নেই যে শিশুপার্ক বা চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাবে। মাকে সঙ্গে করে যাওয়া যাবে না, রান্না করবে তবে কে? আর বাবার সঙ্গে অফিস যাওয়া? সে কল্পনার বাহির! বাড়ির উঠোনে ফুটবল নিয়ে রাজু অগত্যা তাই খেলছিল একা একা। একপাশের দেয়ালে সপাটে শট করছিল বলটাকে। মা অনেকক্ষণ থেকে বলছিল বাইরে গিয়ে খেলতে। কিন্তু একা একা ফুটবল নিয়ে খেলতে দেখলে লোকজন হাসতে পারে, এই ভয়ে রাজু রাইরে যেতে চাইছিলো না। শটগুলো সব সোজা দেয়ালে করছিল রাজু। বল দেয়ালে লেগে সোজা ফিরে আসছিলো রাজুর পায়ে। ভালো জমেছিল খেলাটা। হঠাৎ একবার আচমকা একটা শটে বল গিয়ে লাগলো দেয়ালের কাণায়। তারপর সোজা রান্নাঘরে ঢুকে চুলোয় থাকা কড়াইকে ডিগবাজি খাইয়ে দিলো। হাঁড়ি-পাতিল, পেঁয়াজ-মরিচের ঝাঁকা, চাল-ডালের বাসন সব কিছুকে টর্নেডোর মতো মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে বেরিয়ে আসলো বলটা । আর রাজু এক দৌড়ে মগডালে !

তখন থেকেই রাজু মগডালে। দুপুর থেকে এর মাঝে মা কয়েকবার লাঠি হাতে নিচে এসে দাঁড়িয়ে হুংকার ছুড়েছে, রাজু কানে তোলে নি। এখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। সূর্য পুরোপুরি ডুবে গেছে। আকাশের পশ্চিম কোণে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। মাগরিবের আজান এই দিলো বলে। দুপুরে রাজুর আজ খাওয়া হয় নি। ক্ষিদেও অবশ্য পায় নি। মা-ও খায় নি দুপুরে। খুব সম্ভবত তার ক্ষিদে পেয়েছে । ক্ষিদের জ্বালাতেই বোধহয় মা লাঠিটা নামিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, ‘রাত হয়ে যাচ্ছে রাজু, নেমে আয় এক্ষুনি।’
রাজু শর্ত জুড়ে দিলো, ‘তাহলে বলো মারবে না।’
‘মারবো না মানে! একবার খালি নেমে আয়, তারপর দেখ তোকে কী করি !’ আবার মায়ের হুংকার ।
‘তাহলে আর নামছি না। সারারাত গাছে থেকে যাবো। এ ডালেই ঘুমোবো। ঘুমের ঘোরে যখন ধুপ করে পড়ে টুপ করে মরে যাবো তখন বুঝো মজা!’

রাজু ঠোঁট উল্টিয়ে ভেঙচি কেটে কথাটা বলতেই মা ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কেঁদে ফেললো, কান্না জড়ানো কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, ‘আর একটা কথাও বলবি না রাজু। সোজা নেমে আয় বলছি এক্ষুনি।’ রাজু এবার সুড়সুড় করে নেমে এলো। মা কেঁদে ফেলেছে, মানে মামলা ডিসমিস। মায়ের থেকে যথেষ্ট দূরত্বে লাফ দিয়েই দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে গেলো রাজু।
মগডালে যেখানে যা ছিলো, সেভাবেই থাকলো । কখন আবার চড়ে বসতে হয় কে জানে।




বুধবার, ৯ মে, ২০১২


ভ্রান্ত-মুক্তি
পৃথা রায় চৌধুরী
·
           মোবাইলটা চুপচাপ আমার পাশে শুয়ে আছে। একটু আগেই এসএমএস নিয়ে এসেছে। আমি খুনি। দূরে বসেই নিরীহ সুন্দর পাখিটাকে মেরে ফেললাম। ভাবছেন আমি পাগল ? আমি দীপ্তিমান - ২২ বছর বয়েস। বাড়ি নবদ্বীপ। সেখানে মা-বাবা, ভাইকে নিয়ে আছেন। আমি থাকি সোনারপুরের একটি মেসে। ওখানকার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ি। বছরখানেক আগে সকলের দেখাদেখি ফেসবুকে একখানা প্রোফাইল বানাই ও মাঝেমাঝেই অন্তর্জালের আড্ডায় মশগুল হই, যদিও নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়িনি। ভালই ছিলাম। মাঝেমাঝে একটা চিনচিনে দুঃখ ভেসে উঠত মনে...বৃষ্টি কে মনে পড়লেই। সে আমার প্রথম ভালবাসা ছিল; যদিও সে কোনোদিনই আমায় ভালবাসেনি।


এরকমই একদিন গত বছর মধ্য জুলাইএ নিজের প্রোফাইলে লগইন করে বন্ধুদের দেওয়াল পরিক্রমা করছি, এমন সময় চোখ আটকে গেল দুটো চোখের চাউনিতে। ছবির মধ্যে থেকে এত জীবন্ত ভাবে চেয়ে থাকা যায়, তা এই প্রথম বুঝলাম । বন্ধু হবার অনুরোধ পাঠাতে, তা মঞ্জুরও হল। এরপর শুধু রাইয়ের সাথে কথা। বলতে ভুলে গেছিলাম, ওর নাম রাই। কথায় কথায় জানলাম যে ও বিবাহিতা,এক ছেলের মা, আর ও আমার থেকে প্রায় এক যুগ আগে এই পৃথিবীতে এসেছিল। বুঝতাম সারাদিন আমি বকবক করি বলে মনেমনে বিরক্ত হত ও, কিন্তু আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সারাদিন ওর ইনবক্সে কথা বলতাম; ও কখনও উত্তর দিত, কখনও দিত না। একদিন সাহস করে বলেই ফেললাম ওকে ভালবাসি। ভাবলাম, এবার বুঝি বিতাড়িত হলাম, কিন্তু তা হলনা। ও শুধু চুপ করে গেল। পরের দু-তিন দিন ও আমার সাথে কোনও কথা বলল না। তারপর যেদিন কথা বলল, শুধু বোঝাতে লাগলো যে আমি ভুল করছি। রাই আমায় তাড়ায়নি, তার কারণ ও আমার কোনও ক্ষতি চায়নি...... ওর স্কুলের বন্ধু ছিলেন আমার শিক্ষিকা। কিন্তু আমি কি করব? ওকে হাজারটা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে লাগলাম যে এতে দোষের কিছু নেই। ওর মোবাইল নং চাইলাম; কিছুতেই দিলনা... উলটে বকল আমায়। ভীষণ কষ্ট হতে লাগল, প্রায় মাসখানেক ওর সাথে কথা বললাম না। কিন্তু একদিন ওর বার্তা এলো আমার ইনবক্সে। ও জানতে চাইল আমি কেমন আছি। সব অভিমান উগরে দিলাম উত্তরে। আর তখন রাই দিল নিজের মোবাইল নং ।

এরপর তো সব বাঁধ ভেঙ্গে গেল। ওর নাম দিলাম, পাখি। সারাদিন ধরে চলত শুধু কথা আর কথা, আর নিজের সংসারের সাথে আমাকেও সাঙ্ঘাতিক ভালবাসত। একটা অদ্ভুত আত্মসন্তুষ্টি আর ওর প্রতি টান অনুভব করতাম। ওকে বৃষ্টির কথাও বলেছিলাম; ক্যাম্পাস ইন্টার্ভিউতে চাকরি না পেয়ে বাবার কাছে বকুনি খেয়ে মাঝরাতে ওকে ফোন করে সারারাত কথা বলেছি । সব সহ্য করত ও । ওর ছেলের স্কুলের শীতের ছুটির সময় ওরা গেল কেরালা বেড়াতে। ওখানে থাকাকালীনও ও রোজ ফোন করে আমার খোঁজ নিত। এবার আমার একটা অপরাধবোধ জন্ম নিল। খালি মনে হত, নিজের ভালবাসার জন্য ওর সুখী জীবনটাকে তছনছ করে ফেলেছি।ওকে একদিন খুব শান্ত ভাবে আমি বললাম আমায় ভুলে যেতে, ও ভাবল ওর প্রতি আমার ভালবাসা শেষ। বহুকষ্টে ওকে সে যাত্রা সামলেছিলাম, নাহলে হয়তো ......।

ফেসবুকে আসা কমিয়ে দিলাম, ফোনে কথা বলা কম করলাম, এসএমএসও কমিয়ে দিলাম যাতে ও আমায় ভুলতে পারে; আমার কষ্ট হত ওকে এরকম করতে, কিন্তু ভাবতাম , এই ভালো। বুঝিনি ও আমায় ক্রমাগত আঁকড়ে ধরেছে এমনভাবে, যে আমার এসব উপেক্ষার ভান ও সত্যি বলে ধরে নিয়েছে। আজ ৩০শে এপ্রিল... আমার জন্মদিন। পাখি আমায় ভালবাসার চরম উপহার দিয়ে উড়ে গেছে... " আমার গতবারের কেনা বিষ এবার কাজে এলো। ভালো থেকো।"


"আমায় ক্ষমা কোর সৌর, আমি তোমার যোগ্য ছিলাম না। তোমার সাথে আমি আরও একজনকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। তাই সরে গেলাম। তোজোকে মানুষ কোর আর ওকে কখনও জানতে দিও না তার মার মানসিক কলঙ্কের কথা......... রাই।"

পুলিশও তার চিঠি পেল..."আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয় - রাই মুখার্জি।"



প্রতিদান
সায়ক চক্রবর্তী

ঘুমিয়েছিলাম অনেকক্ষণ। কখন যে অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে এসেছি হুঁশ নেই। চোখে তখনও ঘুম লেগে আছে। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা বাচ্চা – আমার কামরার দরজার পাশে বসে তার গায়ের নোংরা জামাটা খুলে ফেলল। খুলে কামরার মেঝে ওই পরনের জামা দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলো। চোখ থেকে জল না বেরোলেও সামান্য একটু কষ্ট হল। সাফাই হয়ে গেলে লোকজন খুচরো পয়সা দিল। সে ওই পয়সাগুলো হাতের মুঠিতে খুব শক্ত করে চেপে ধরলও। এরপর জামাটা পরে নিল। এরপরের দৃশ্যটা আমি ভুলিনি – বাচ্চাটা যতগুলো পয়সা পেয়েছিল সেগুলো বার বার করতে গুনতে শুরু করল দরজার পাশে বসে। দেখে মনে হল না যে গুনতে জানে না – হয়তো আজ একটু বেশি কামাই হয়েছে আর তাই যাচাই করার জন্য বার বার করে গুনছে ! আমার কাছেও এসেছিল কিন্তু খুচরো ছিল না। একটাই দশ টাকার নোট ছিল বটে কিন্তু অত টাকা দিতে গায়ে লাগলো আর অন্যরা তো দিচ্ছেই !

ট্রেন থামল শেয়ালদা স্টেশনে, আমি লাগেজ নিয়ে নেমে গেলাম। একটা দোকানে এলাম সিগারেট কিনব বলে। পকেটে হাত দিয়ে দেখি মানিব্যাগ উধাও! আমার তো তখন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবার উপক্রম! কারণ ওই মানিব্যাগে ছিল আমার তিন হাজার টাকা, এ.টি.এম কার্ড আর ভোটার কার্ড। আমি দিশেহারা হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি সারা স্টেশন। এদিকে আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে গন্তব্যে না পৌঁছলে আমার ব্যবসার বারো বেজে যাবে।

হঠাৎ দেখি সেই ছেলেটা দৌড়ে আসছে আমার দিকে । এসেই আমার হাতে মানিব্যাগটা গুঁজে দিয়ে বলল – ‘আপনার টাকা পরে গেসলো, আমি কামরায় পাইসি। আপনি তো নাইমে গেইলেন, তারপর আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে পাইলাম’। কথাটা বলেই সে একটা ট্রেনের দিকে ব্যস্ত দৃষ্টিতে তাকাল, যেভাবে শকুন থাকে তক্কে তক্কে । আমি বুঝলাম এটা ওর পরবর্তী কাজের জায়গা । মাথা নিচু করে মানিব্যাগটা খুলতেই দেখি সেই দশ টাকার একটা কোণ বেরিয়ে আছে । আমি বুঝে গেলাম এটা ওরই প্রাপ্য। ওকে টাকাটা দিয়ে ট্যাক্সি ধরলাম। এরপরেও অনেকবার ট্রেনে চেপেছি কিন্তু ঘুম ভেঙে আবার চোখ বন্ধ করে নিয়েছি । 



সোমবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১২

দুটি গল্প - মধুছন্দা পাল ও ওয়াসিকুজ্জামান অনি


দিদি


      


দিদি  বাবার  সবচেয়ে  আদরের ছিল । হয়তো  প্রথম সন্তান তাই । মার কথা অনুযায়ী   দিদি যাই করুক  বাবা কখনই  দিদির দোষ  দেখতোনা ।  এই কথা বলে  মা বিরক্তি প্রকাশ  করতো ।

       খেয়ালি ছিল খুব  ।   হরদম   জিনিষ পত্র হারাত ।  মার বিয়ের সময়  মামারবাড়ী থেকে  অনেক রকম গরম জামা দিয়েছিল ।    সুন্দর সুন্দর জ্যাকেট  ছিল । কোট ছিল । আমরাও  বড় হয়ে পরেছি ।এর মধ্যে  সবচাইতে  সুন্দর আর দামী  ছিল একটা  ফার কোট ।  মা আবার দিদির  বিয়েতে  ওটা দিদিকে  দিয়েছিল ।  দিদি কাঁধের ওপর সেটা নিয়ে  কোথাও গিয়েছিল , সেটা আর ফিরে এলনা । পড়ে  গিয়েও  থাকতে পারে । কেউ তুলেও নিতে পারে ।  মা বকাবকি  করাতে  বাবা  বলতে লাগলো “আহা , বোকনা বোকনা ।  আমি আবার করিয়ে দেব ।” এসব  কথা মার কাছে শোনা । এই রকম আরও ছিল ।

        খোলা  দেরাজে  গয়না রেখে  চলে এলো ভাগলপুর ।  বেশ কিছুদিন পর হয়তো মনে পড়লো ।  বাড়ীর  কারো চোখে  পড়লে  তুলে রাখতেন ,অনেক সময় হারা । ভুলো,  অন্যমনস্ক ।

       শুনেছি , খুব  ছোটবেলা  থেকেই  বই ভালবাসতো  খুব ।  যখন  খুব ছোট ছিল, হয়তো  বছর  দুই বয়স  হবে , বাড়ীর  বড়  দাদা  দিদিদের  পড়ানোর  জন্যে  একজন  মাস্টার মশাই  আসতেন । উনি  যতক্ষন    পড়াতেন  সমানে  বসে থাকতো  ওখানে । নিয়ে আসা যেতনা ।

     ছোট থেকে একটু বেশী সাহসী । নিজের খেয়ালে চলার স্বভাব ছিল , যা নিজে ঠিক মনে করতো  তাই করতো ।  সাহসের কথা বলছিলাম ।  একবার  স্কুলে পড়ার  সময় প্রেয়ারের পর একজন টিচার  বললেন  “তুমি প্রেয়ারের সময় চোখ বন্ধ  করনি কেন ?” দিদি উত্তর দিয়েছিল  “আপনি কি করে জানলেন মিস্‌ , আপনিও কি চোখ খুলে রেখেছিলেন ?” এরপরে টিচারের  উত্তরটা  ছিল খুবই  হাস্যকর ।  উনি বলেছিলেন  ঈশ্বর ওঁকে  জানিয়েছেন ।

    আমাদের বাড়ীর একটা বেশ  ভালো নিয়ম ছিল ।  প্রসব হওয়ার পর  প্রসূতিকে সন্তান ও বাড়ীর  দুএকজন  মহিলা ও কাজের লোক  দিয়ে  আশপাশের  কোন  স্বাস্থ্যকর  যায়গায়  পাঠিয়ে দেওয়া হতো বিশ্রাম আর  হাওয়া বদলের জন্যে । মাস  দুই তিনের জন্যে ।   বাড়ীর  একজন পুরুষ  এবং  একজন বয়স্ক মহিলা থাকতেন ।     এরমধ্যে  সুবিধে অসুবিধে অনুযায়ী  কেউ চলে আসতেন  তার জায়গায় অন্য কেউ যেতেন ।  বয়স্ক  মহিলাদের  মধ্যে  সাধারণতঃ  পিসিমা   বা  বড়মাসীমা  থাকতো ।


       এখানে বড়মাসীমার  কথা একটু  বলি ।  বড়মাসীমা মায়েদের সবচেয়ে বড়দিদি । ১৮ বছর  বয়েসে একটি পুত্র সন্তান  কোলে  করে বিধবা হয়ে  বাপের বাড়ী  ফিরে এসেছিল ।  তারপর  আস্তে আস্তে  সংসারের  সমস্ত  ভার  নিজের  হাতে  তুলে নিয়েছিল ।  বড়মাসীমা ছাড়া সংসার অচল ।  সেই ছেলে  আমাদের  কমলুদার   বয়স  যখন  ২১  কলকাতায় এসেছিল  চাকরীর  ইন্টারভ্যু  দিতে।  আর ফিরলনা  ।দুদিনের জ্বরে  চলে গেল ।  আমাদের  শোবার  ঘরের  দেওয়ালে  কমলুদার  একটা ছবি টাঙানো থাকতো ।  খুব ভালো দেখতে ছিল ।  ঘাড়টা  একটু  বাঁদিকে  বেঁকিয়ে হাসছে ।  ডানদিকের মাড়িতে  একটা  গজদাঁত  উঁকি মারছে । কি প্রানবন্ত  ছবি !

               বড়মাসীমা  কিছুদিন  পরে  শোকতাপ  নিজের  মধ্যে  আড়াল করে আবার সংসার  নিয়ে ব্যস্ত হয়ে  পড়েছিল ।  বোনেদের  দেখাশোনা  করা ।  তাদের সংসারের  প্রয়োজনে  কাজেলাগা এছাড়া মা,দাদার  সংসার  তো   ছিলই ।  সমস্ত  কিছু গোছগাছ  করে দিয়ে জীবনের  একটা ইচ্ছে  মেটাতে  তীর্থ  করতে গেল । কাশী , বৃন্দাবন , মথুরা ।  দলের সঙ্গে ।  ঈশ্বরের  বোধহয়  এতো শোকাতাপা   মানুষের  এতো  স্পর্ধা  সহ্য  হলনা । পথে কলেরা  হয়ে  কোন এক স্টেশনের  প্ল্যাটফর্মে  মারা গেল ।

        যাইহোক , দিদির কথা বলতে গিয়ে এতো কথা । তো একবার আমার ছোড়দির  জন্মের পর  মাকে নিয়ে  হাওয়া বদলের জন্যে  যাওয়া হয়েছে  , কহলগাঁও  বলে একটা জায়গায় । যে বাড়ীতে ওঠা হয়েছে সেটাতে  একটা বড়  বাগান  আর সেই বাগানে  আবার একটা  কুঁয়ো । দিদি  ভীষণ  দুরন্ত ।  একদিন  দুপুরে  অনেকক্ষণ  দিদিকে  দেখতেনা পেয়ে  বড়মাসীমা    খুঁজতে  খুঁজতে  বাগানে  এসে  দেখে  দিদি  কুঁয়োর  একদম  ধারে  শুয়ে আছে ।  বড়মাসীমাকে  দেখেই  গান গেয়ে উঠলো “জানি তুমি আসবে প্রিয় / গভীর  যখন হবে  রাতি ।।” আট, ন’ বছরের  বোনঝির  মুখে এই গান শুনে  বড়মাসীমা তো  রেগে  কাঁই । হাত ধরে  হিড়হিড়  করে টেনে নিয়ে  মার কাছে হাজির ।  “দ্যাখ , বাপের আদরে কি সব গান শিখেছে !”

          মা তো বুঝলো  একেবারে না বুঝে গেয়েছে গায়িকা । তবু  একটু  বকাবকি  করলো মাসিমাকে  শান্ত করতে ।

       আমাদের মায়ের ধারনা  ছিল  আমাদের বাড়ীতে  মেয়েদের  বড় বেশী  আদর দিয়ে বড় করা হয় ।  কোন কাজকর্ম  শেখানো  হয়না ।  কোন ডিসিপ্লিনের  ভেতর  থাকতে  শেখেনা তারা ।  এই চিন্তা কিছুটা  যথার্থ ছিল । সত্যি  করেই  কিছু কিছু  সংস্কার  আর নিয়ম  মেনে  চলা ছাড়া  মেয়ে আর  ছেলেতে  কোন  তফাৎ  ছিলনা  আমাদের  বাড়ীতে ।  মেয়েরা  সবাই  পড়াশোনা করতো ,  বোনা, সেলাই ,  খেলা ধুলো  করতো ।  কাউকে  কোনদিন  সংসারের  কাজ  করতে দেখিনি । আমরাও করিনি সেভাবে ।

       এটা ভালো না মন্দ জানিনা । তবে  বিয়ের পর  পিসিমাকে  দেখেছি  দিদিদের  মিষ্টি  তৈরি  করতে  শেখাতে । অনান্য  সাংসারিক  কাজ শেখাতে ।  বাচ্চা জন্মানোর   পর  যত্ন  করতে, স্নান  করাতে   শেখাতে ।  পিসিমার আঁতুরের শিশুকে  স্নান করানো ছিল দেখার মতো । হাঁটু  পর্যন্ত  থান গুটিয়ে  মোটা  মোটা  পায়ের ওপর  বাচ্চাটাকে  কখনও চিত করে কখনও  উপুড়  করে শুইয়ে  ,  কখনও বা  অনায়াসে  এক হাতের  তেলোর  ওপর  বাচ্চাটাকে  নিয়ে যেন  একটা  ন্যাকড়ার  পুতুলের  মতো করে নাড়াচাড়া  করতো । স্নান  করাতো ।  বাচ্চাটাও  বেশ  আরামে  থাকতো  বলেই মনে হতো ।

       যাইহোক্‌ ,  এই   চিন্তা  থেকে  মা  দিদিকে  মামারবাড়ী  পাঠিয়ে দিল । যাতে  দিদিমা আর মামীমার  ট্রেনিং এ  থেকে   ঠিকমতো  তৈরি হয় । দিদি  ওখানে  গিয়ে  স্কুলে  ভর্তি  হোল ।

      কিছুদিন  পর   দেখা  গেল  একটি বাড়ীর সামনে   এক ভদ্রলোক  ও যখন  স্কুলে যায়  রোজই  দাঁড়িয়ে  থাকেন ।  কয়েকদিন  পর উনি  এগিয়ে এসে  দিদির  সঙ্গে  কথা বললেন ।  কোথায় থাকে , বাবার নাম কি  ইত্যাদি ।   মামারবাড়ীর  ঠিকানা  ভালো করে  বুঝে  নিলেন  উনি ।  সেদিন  স্কুল থেকে বাড়ী  এসে  দিদি দেখে ,  ভদ্রলোক  বৈঠকখানায়  বসে  মামাবাবুর  সঙ্গে  কথা বলছে ন।  দিদিকে  ডেকে  দুএকটি  কথা বলে,  উনি  ওঁর  বড়ছেলের  সঙ্গে   দিদির  বিয়ের  প্রস্তাব করলেন । জামাইবাবু  ডাক্তারি  পড়ছেন তখন ।  জামাইবাবুর বাবা  বার্মায়  ওকালতি  করতেন । দেশে ফিরে এসেছেন । কলকাতায়  বাড়ী কেনার  ব্যবস্থা হচ্ছে । তার আগে চন্দননগরে  শ্বশুরবাড়ীতে  কিছুদিন আছেন । ভাগলপুরের  ঠিকানায় চিঠি গেল । তারপর  যাযা  করনীয়  করা হোল ।  মার  প্রবল  আপত্তিতে  বড়রা  কান দিলনা । হয়ে গেল বিয়ে  ধূমধাম করে । দিদির বয়স  তখন  ১৪ ।

       কয়েক বছর  পর দিদি একবছর  ভাগলপুরে  থেকে  ম্যাট্রিক  দিয়ে ফিরে গেল  কলকাতায় । যেদিন  ম্যাট্রিকের  রেসাল্ট  বেরল , তখন  গেজেট  বেরত । আমাদের জ্যাঠতুত দাদা  কাতুদা  স্টেশন  থেকে  রেসাল্ট  দেখে এসে  খুব ভোরে  আমাদের ঘুম ভাঙালো ।  ফার্স্ট  ডিভিসনে  পাস করেছে দিদি ।   ফার্স্ট ডিভিসন  পাওয়া খুব সহজ ছিলনা। বিশেষ করে এতো কিছুর মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল দিদি । সকলে খুশী হোল খুব ।

         পাস করে কলেজে  ভর্তি  হোল ।  পরে নামকরা  ইংরেজি মিডিয়াম  স্কুলে  পড়িয়েওছিল ।
কখনও দিদিকে দেখেছি  একদম  সংসারে ডুবে  থাকতে। কখনও সংসার সম্পর্কে একবারে উদাসীন ।  কখনও  সদ্যপরিচিত  কারো  বোনের  বিয়েতে  দরাজ হাতে   সাহায্য   করতে  দেখেছি  কখনও  ছোট্ট কোন বিষয়ে  এমন একটা আচরণ  করলো , মনে হোল  এই কি সেই  দিদি!  

           আমাদের  গান শেখাত ,যখন ভাগলপুরে  থাকতো । যত গান শিখেছি  সব  দিদির কাছে ।  সারাবিকেল  ছাদে  বসে  শেখাতো গান ।  কখনও  দাদা   তবলায় ঠেকা দিত। ছোটথেকে দেখে এসেছি  আমাদের  ফ্রকের  ডিজাইন  দিদি করতো । মনে আছে  বাবা  চলে যাওয়ার আগে  আমাদের দুই  বোনের জন্যে  ফ্রকের  কাপড় কিনে রেখে  গিয়েছিল ।  করিয়ে দেওয়ার সময়  পায়নি ।  দিদি  যখন এলো  কলকাতা থেকে,  ফ্রক গুলো  তৈরি  করালো  নিজের  ডিজাইনে ।  ঐ জামাগুলো  অনেক দিন রাখাছিল ।  আমাদের  ছোট হয়ে যাওয়ার  পরও । আমাদের  জন্যে বাবার  হাতে  করে আনা শেষ  উপহার ।

          তারপর থেকে  সবসময়ই  দিদি  নিজে আমাদের  ফ্রক তৈরি করাত । বাড়ীতে  খলিফা আসতো । তার  আগে খাতা পেন্সিল   নিয়ে বসতো ।  ডিজাইন করতো ।  কতো  রকম  ফ্রক যে পরেছি ।   প্রত্যেকটাই  হতো  দারুন ।  একদম নতুন ধরনের  । কেউ  যদি কলকাতা থেকে আসতো । অনেক কিছু পাঠাতো । বাড়ীতে  তৈরী কেক্‌।  মরটন কোম্পানির  নীল রঙের  লজেন্সের  টিনের গোল  কৌটো ওপরে  মা ,মেয়ের  ছবি । সেই কৌটো ভরে । গল্পের  বই ।   সোয়েটার ।  আমার  ছোড়দির  রঙ  একটু  ময়লা  ছিল  ।  ওর জন্যে  দিদির  ভালবাসা   ছিল  খুব বেশী ।  রঙ ফর্সা  করার জন্যে  কতো কিছু  পাঠাতো ।

      হঠাৎ   হয়তো  এক সকালে  উঠে  দেখলাম  দিদি হাজির ।  আগে থেকে খবর  দেওয়া নেই ।  ছেলেমেয়েরা  সঙ্গে  নেই । হারমনিয়ামের  বাক্স  আর  একটা  ব্যাগ নিয়ে  চলে এলো । আমাদের  কথা খুব মনে পড়ছিল তাই চলে এসেছে । ছেলেমেয়েরা  ভালোই থাকতো অবশ্য  ওদের  ঠাকুমা , পিসিদের  কাছে ।  মা বকাবকি  করলো  এভাবে আসাতে । গম্ভীর  হয়ে রইলো দিদি ।

      কোন সন্দেহ নেই দিদির স্বভাব  আর  পাঁচজনের থেকে  একটু  অন্যরকম ছিল ।  কোন কিছু  রাখঢাক  করার  ব্যপারই  ছিলনা  । যা নিজের ঠিক মনে হতো  তা  আর  সকলের পছন্দ না হলেও  ওর কোন  পরোয়া ছিলনা ।  আমদেরও  ওর  অনেক  আচরণ  পছন্দ  হয়নি ।  তাতে  ওর  কিছু যেত আসতনা  যা করতো জোরের সঙ্গে । ভয় ডর ছিলনা বলেই হয় ।   বড় হয়ে অনেক সময়  ওর আচরণের জন্যে  প্রশ্ন  করেছি ।   ওযা বিশ্বাস  করে  উত্তর দিয়েছে ।

       যখন   সংসার  করতো মন দিয়ে ।  সুন্দর করে রান্না করতো ।  মাথা থেকে বার করে  নতুন রকম ।  ঘর সাজাত খুব সুন্দর করে ।  বাতিল জিনিষ  দিয়ে  ঘর সাজানোর  জিনিষ বানাত । মাটি দিয়ে  পুতুল গড়তো ।  হয়তো কারো বিয়েতে গেছে তত্ত্ব  যাবে ।  দিদি বসে গেল।  প্রত্যেক  ট্রে তে একটা করে  চার লাইনের ছড়া লিখে  সঙ্গে  প্যাস্টেল বা ক্রেয়ন দিয়ে  ছবি  এঁকে  আলপিন দিয়ে আটকে দিল ।

       পিঁড়িতে আলপনা  দিয়েদিল  নিখুঁত  করে ।  তত্ত্বের  লিস্ট করলো  অভিনব  একদম ।এক  বিলেত ফেরত  মাসতুতো দেওর ছিল    দিদির  গুণগ্রাহী ।  কতযে ছবি  তুলেছিল  ।  সব ছবির  সঙ্গে ক্যাপশন থাকতো  মানানসই ।    ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ , কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা  পাগলা  হাওয়ার  বাদলদিনে ।‘’  এমনই সব মানানসই  ক্যাপশন । দিদি  যেটা পারতোনা সেটা  অভিনয়  । জীবনের রঙ্গমঞ্চতেও নয়  সাজানো  রঙ্গমঞ্চতেও নয় । যাচ্ছেতাই  অভিনয় করতো ।

      দিদির শ্বশুরবাড়িতে  আমরা খুব আনন্দ করেছি ।  জামাইবাবুর   বড়দির  দুই মেয়ে আমার কাছাকাছি  বয়স ।  ওদের সঙ্গে খুব ভাব ছিল ।  ওরা থাকতো  নবদ্বীপে । ওখানেও  বেড়াতে যেতাম ।
 আর আমাদের জামাইবাবুর  আমাদের সম্পর্কে  বক্তব্য ছিল  “ওরা আমার সন্তানের মতো।”
 যখন দিদির  বিয়ে হয় , আমি দু’ বছরের  ছিলাম ।

      লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে দিদিকে  নিয়ে লেখা  ফুরবেনা ।  কি জানি  কেমন হোল লেখা । একটা ঘটনা লিখে ইতি করবো ।

      কোন একসময়  ভাগলপুরে  আমাদের শোবার  ঘরের  মেঝেতে  বসে কিছু করছিল দিদি । আমি কাছে বসে । একটা কালো পিঁপড়ে  ওখান দিয়ে যাচ্ছিল , আমার কি মনে হোল ওটাকে আঙুলের চাপে  মেরে ফেললাম । দিদি মুখ তুলে  আমার দিকে চেয়ে  জিজ্ঞেস  করলো “মারলি কেন ওকে , কি করেছিল ? ছোট বলে তোর সাত খুন মাফ , না ?’  দিদি  কোনদিনও  বকেনি আগে । আমি একটু হকচকিয়ে  গিয়ে বললাম “হুঁ , মাফই তো !”  দিদি  বলেছিল "  ঠিক আছে  মার তুই আরও ছটা , তারপর দেখছি মাফ কিনা "। শুধু  কৌতূহলের বশে অনেক খুঁজেছিলাম আরও ছ’টা পিঁপড়ে । পাইনি ।

     ( দিদি একটা প্রশ্ন  মনে রয়েই গেছে,  যদি  সাতটাকেই  মারতাম । কি করতে তুমি । বড্ড জানতে ইচ্ছে করে! )!

       মনে পড়ে  দিদি  চুল বেঁধে দিচ্ছে , বিয়েবাড়ি  যাবার  সময় সাজিয়ে দিচ্ছে , শাড়ী  পরিয়ে  দিচ্ছে ।
 ২০০১  সালের এক এপ্রিল মাসের  সকালে  দিদির  ঘরে  এসে দেখা গেল । পাখী উড়ে  গেছে  শূন্য  খাঁচাটা পড়ে  আছে ।  তেমন করেই গেছে যেমনটা  ওকে মানায় । কাউকে  ভোগায়নি  নিজেও  ভোগেনি  তেমন ।



শিশুতোষ গল্প

রাগ করলেই ভুল হয়

ওয়াসিকুজ্জামান অনি
      
তোমরা কি ইঁদুরগঞ্জের নাম শুনেছো ? ইদুরগঞ্জ শহরের এক পাশে থাকতো ছোট্ট ইঁদুর কুটুস। তার বাড়িতে তার বাবা মা আর দুই ভাই বোন ছিলো। বড় ভাইয়ের নাম মুটুস আর বোনের নাম পুটুস। কুটুস ছিলো সবার ছোট আর খুব বুদ্ধিমান। সে সব সব ধাঁধার উত্তর দিয়ে দিতো খুব সহজেই। আর পড়শোনাতে ছিলো তুখোড়। ক্লাসে সব সময় ফার্স্ট। তার গুনের শেষ ছিলোনা। কিন্তু তার একটা মারাত্মক বদগুণও ছিলো। সে ছিলো প্রচন্ড রাগী। একটুতেই যেত রেগে। আর রেগে গেলে তার হিতাহিত জ্ঞ্যান থাকতনা । সে হয় মারামারি করতো না হলে জিনিষপত্র ভাংতো। এ নিয়ে তাকে সব সময় বকা খেতে হত।

তার এ রাগের কথা খুব ভালো জানতো তার দুই ভাই বোন মুটুস আর পুটুস। তারা এ জন্য তাকে সব সময় ক্ষেপাত। কুটুস যখন পড়তে বসে তারা তখন পেছন থেকে এসে তার কান ধরে টান দিত। নাহলে তার চুল ধরে টানত। এমন করলে কুটুস খুব রেগে যেত আর তারা তাতে মজা পেয়ে খুব হাসতো। তারা ঠি বুঝতে পারতো কুটুস কখন রেগে যায়। রেগে গেলে সে চুপ হয়ে যেত আর চোখ বড় বড় করে তাকাত। তার একটু পরেই ঘটতো রাগের বিস্ফোরণ। তখন সে রেগে মেগে তার ভাই বোনকে মারতে যেত। সাথে সাথেই মুটুস আর পুটুস এক দৌড়ে চলে যেত তাদের মায়ের বা বাবার সামনে। ব্যাস আর যায় কোথা বড় ভাই বোনকে মারার অপরাধে তাকে অনেক শাস্তি পেতে হত। রেগে গেলে সে খারাপ ব্যবহার করতো সবার সাথে তাই পেতে হত অনেক শাস্তি। কুটুসের স্কুলের সহপাঠীরাও এ ব্যাপারে খুব মজা পেত আর যখন তখন কুটুসকে রাগিয়ে দিত। আর কুটুস রাগলে যা হয় আর কি, তাদের সাথেও লাগিয়ে দিত মারামারি বা ঝগড়া। ব্যাস আর যায় কোথা টিচাররা দিয়ে দিত তাকে শাস্তি না হলে বিশাল হোমোয়ার্ক।

এমনভাবে চলতে থাকায় কুটুস পড়ল মহা চিন্তায়। একদিন এমনি এক ঘটনার পর অনেক শাস্তি হলো কুটুসের। শাস্তি শেষে কুটুস বাড়ী ফিরছিলো বনের ধারের রাস্তা দিয়ে । তার খুব কান্না পাচ্ছিলো । সে তখন একটা বিশাল গাছের নিচে বসে একা একা কাঁদতে লাগল । সেই গাছে থাকতো প্রকান্ড এক বৃদ্ধ প্যাঁচা । পাখী সনাজে তার খুব নাম ছিল জ্ঞ্যানের জন্য। কান্না শুনে সেই প্যাঁচাটা তার বাসা থেকে বেরিয়ে এসে গাছের ডালে বসে নিচে তাকালো । তাকিয়ে দেখে ছোট্ট কুটুস বসে কাঁদছে। তার কান্না দেখে খুব মায়া লাগল প্যাঁচাটার। সে কুটুসকে শুধালো কি হয়েছে তোমার ? কাদছো কেন এমন করে ?

কুটুস বলল - আমার রাগ বেশী, আমি একটুতেই রেগে যাই । এ নিয়ে সবাই আমাকে খ্যাপায় । আর আমি ক্ষেপে গেলে তাদের মারতে যাই তখন বড়রা আমাকে খারাপ বলে আর আমি শাস্তি পাই অনেক। তখন সবাই আমার দুরবস্থা দেখে হাসে ।

প্যাঁচা যে ছিল জ্ঞ্যানি সে শুনে মুচকি হেসে বলল - তোমার সমস্যা আমি বুঝতে পেরেছি। দেখো রাগ করে কোন কিছুর সমাধান হয়না। রেগে গেলে তুমি ভুল করবে। আর তখন সবাই তোমাকে অপছন্দ করবে। কেউ তোমার সাথে খেলবেনা । বড়রা তোমাকে শাস্তি দেবে।

কুটুস তখন প্যাচাকে বল্লঃ তাহলে আমি কি করব ?

প্যাঁচা বল্লঃ দেখো আমার অনেক বয়েস হয়েছে । তাই আমার অভিজ্ঞতা বেশী । তোমাকে একটা কাজ যদি দেই করতে পারবে ?

কুটুস বললঃ আমার যদি ভালো হয় নিশ্চয়ই করবো ।

প্যাঁচা তখন তাকে একটা চিকন সুই আর সুতো দিয়ে বলল তুমি কি সুইয়ের ভেতর এ সুতোটা পরাতে পারবে। কুটুস ভাবলো এ আর এমন কি কাজ সে তাড়াহুড়ো করে সুতোটা সুই এ লাগাতে গেলো। কিন্তু যতবারি লাগাতে যায় সে কোন ভাবেই পারছিলনা । অনেক অনেক বার চেষ্টা করে না পেরে তার খুব রাগ হলো, সে ছুড়ে ফেলে দিলো সুতো আর সুঁই । তার আবার কান্না পেল।

তখন প্যাঁচা তাকে বলল - দেখো তুমি খুব তাড়াহুড়ো কর কোন কাজে আর সে জন্য তোমার ভুল হয়। আর এতে তুমি রেগে যাও তাই তুমি এমন কিছু করে যাতে তোমার উপর সবাই বিরক্ত হয় বা মজা পায় ।

কুটুস তখন একটু ভাবলো, তারপর প্যাচাকে বলল - তাহলে আমার কি করা উচিত ?

প্যাঁচা তখন বলল তুমি ঠান্ডা মাথায় সুতো আর সুঁইটা হাতে নাও তারপর সুঁই এর ফুটো টা দেখে খুব সাবধানে আস্তে করে সুতোটা পরিয়ে দাও । দেখবে খুব সহজ লাগবে। তাড়াহুড়ো করলে পারবেনা এবং তোমার রাগ হলে আর কিছুতেই হবেনা ।

কুটুস তখন প্যাঁচার কথা শুনে আবার সুঁই সুতো হাতে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চেষ্টা করল । খুব ভালোমত মনযোগ দিয়ে সে চেষ্টা করল আর আশ্চর্য্য হয়ে দেখলো সে একবারেই এ কাজটা করতে পেরেছে যা আগে অনেকবার চেষ্টা করেও পারেনি । সাথে সাথেই সে বুঝতে পারলো যে রেগে গেলে কিছুই হবেনা, সব কিছু করতে হবে শান্তভাবে চিন্তা করে ।

তখন প্যাঁচা তাকে বললঃ তুমি কি এবার বুঝতে পেরেছো কেন তোমার দুরবস্থা হয়েছে ?
কুটুস তখন প্যাচাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল-আমি এবার বুঝতে পেরেছি । এখন আর আমার অসুবিধা হবেনা । আমি রাগ না করে সব ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করব ।

কুটুস তখন প্যাঁচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার বাড়ী চলে গেল আর মনে মনে বার বার বলল আজকে থেকে আমি আর রাগ করবোনা, তাড়াহুড়া করবোনা। সেদিন রাতে সে যখন সে পড়তে বসেছে তখন তার ভাই বোন সেই মুটুস আর পুটুস আবার তাকে জালাতে এলো। এসে তাকে নানা কথা বলল, তাকে নিয়ে মজা করল কিন্তু কুটুস কোন কথা বললোনা । যদিও মনে মনে তার খুব রাগ হচ্ছিলো কিন্তু সে ধিরে ধিরে মন কে বাগে আনলো আর মনে মনে বলল আমি আর কখোনই রাগ করবোনা। বরং সে তাদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটা হাসি দিল । আর যায় কোথায় কুটুসের এ আচরন দেখে মুটুস আর পুটুসের খুব রাগ হলো । তারা যে মজার জন্য এসেছিল তা না হওয়ায় তারাই আজ রেগে মেগে কুটুস কে মারতে এলো । ঠিক সে সময়ে কুটুসের মা আসলেন সেই ঘরে আর দেখে ফেললেন পুটুস আর মুটুস কিভাবে কুটুস সোনা কে জালাচ্ছে। ব্যাস এতদিন যে শাস্তি কুটুস পেত সেই শাস্তি বরাদ্দ হলো মুটুস আর পুটুসের জন্য আর মা কুটুসকে অনেক আদর করলেন। এমনি করে স্কুলেও যারা কুটুসকে জালাতে এলো বরং তারাই শাস্তি পেলো । কুটুসের আর কোন সমস্যা থাকলোনা ।

কুটুস খুব করে সেই প্যাঁচাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলো এবং সারা জীবন এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অনেক বড় হলো ।