গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

রবিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৮

প্রদীপ ঘটক

কোল

নীলিমার আপত্তি ছিল। বিভূতি বলে 'শেষ পাতের ভাত কুকুরকে দুটো দিতে হয় জানো, তাতে স্বর্গবাস হয়। জানো যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে…………" নীলিমা খিঁচিয়ে ওঠে " মরণ নাই ঢুকো, কুকুরকে ভাত দিয়ে বাবু স্বর্গে যাবেন। তার উপর পেনি কুকুর। বাড়িতে খাবে, হাগবে,বাচ্ছা পাড়বে, ভাগার আনবে। তোমাকে তখন সব ঘোচানো করাব।" বিভূতির প্রায় পাকা গোঁফ, সামনে অদৃশ্য হয়ে আসা চুল, ঠায় রোদে দাঁড়িয়ে দেখে লেজ নাড়তে নাড়তে পরম তৃপ্তির খাওয়া। মনে মনে ভাবে, কত অল্প সন্তুষ্ট। বাড়ির দুয়োরে জবাগাছের তলাতেই সারাদিন পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকে। মাঝে মাঝে অন্য কুকুর এলে ভুক ভুক। বেশ ডাগর-ডোগর হয়ে গেছে দু'এক মাসেই। ক্রমে ভাদ্র হল, আনাগোনা শুরু হল পুরুষ সঙ্গীরটকবিভূতিকেও অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে। সে ঢিল মারে। কিন্তু পাড়া সরগরম হল যেদিন সকালে দুয়োরে জল দিতে গিয়ে নীলিমা আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলল, "কই গো, দেখে যাও তোমার পেনির কীর্তি। সক্কালবেলা, ঠাকুর দেবতার নাম করব তা না……………, ছি ছি ছি ছি ছিঃ।বারো বছরের মুড়ো ঝেঁটা মেরে দূর করতে হয়।" বিভূতি উঠে আসে। কোনক্রমে চোখ আড়াল করে। চা খেতে খেতে শান্ত করে নীলিমাকে "ওরাও তো আমাদের মতই জীব,…………"কিন্ত নীলিমার মুখের তোড়ে চুপ করে যায়।
পৌষের এক দুপুরে পেনি ভাত খেল না। নধর শরীরটা নিয়ে নড়তে পারছে না। জবাতলায় শুয়ে হাঁফাচ্ছে। রাতে বিভূতির ডাকে সাড়া দিল বাড়ির পিছন থেকে। কিন্তু এল না। শোবার আগে বাড়ির পিছনে বাঁশতলায় প্রস্রাব করতে গিয়ে বিভূতি দেখল, সারকুরে অনেকটা খাল করে তার ভিতর শুয়ে। পরদিন সকালে নীলিমাকে রাগানোর জন্য বিভূতি বলে "তোমার চারটে নাতি-নাতনি হয়েছে গো।" আজ আর নীলিমা কিছু বলল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস। রোদ চড়া হলেও প্রথম মাঘের দুপুরটায় বেশ ঠান্ডা। নীলিমা একটা শতরঞ্চি আর বালিশ এনে পশ্চিমে মাথা করে চুলটা এলিয়ে দিয়ে রোদে শোয়। চোখ লেগে এসেছে। পাড়ার বুড়োর মা গল্প করতে এসে দেখে নীলিমার বুকের কাছে শুয়ে ছোট্ট ফুটফুটে পেনির একটা বাচ্ছা। মাথার অদূরে পেনি। বুড়োর মা চিৎকার করে বলে "ও দিদি, কেমন ঘুম ঘুমোচ্ছো? বলি তোমার পাশে কুকুরের ছানা এসে শুয়েছে, সে খেয়ালও নেই?" ধড়মড় করে উঠে বসে নীলিমা। পরম মমতায় বাচ্ছাটাকে কোলে নিয়ে বলে "এজন্মে আমার কোলে তো কেউ এল না, তাই……………" একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীলিমা।



সুধাংশু চক্রবর্ত্তী

গোটা একটা রাত চুরি হয়ে গেল

রাত সামান্য গভীর হয়েছে । সুযোগ বুঝে মগন চোর চুরির মতলবে শহরে এসে ঢুকে বেজায় চমকে গেল । সর্বনাশ ! কে বা কারা যেন নিঃশব্দে এসে গোটা একটা রাত চুরি করে নিয়ে গিয়েছে শহর থেকে ! সর্বত্র দিনের আলো ছড়িয়ে আছে ! রাতের অন্ধকার না থাকলে চুরি করা যায় নাকি ?

ওদিকে বিশু ডাকাতও ডাকাতির মতলবে শহরে এসে ঢুকেছে এই একই সময়ে । ওর দশাও মগন চোরের মতো হলো । আরিব্বাস, কে বা কারা যেন শহর থেকে আস্ত রাতটাকেই চুরি করে পালিয়েছে ! দেখে বিশু ডাকাত মাথা চুলকোতে চুলকোতে ভাবছে এই দিনের আলোয় ডাকাতি করবে কীকরে ।

সহসা বিশু ডাকাতের চোখে পড়ে মগন চোর গুটিগুটি পায়ে ফিরে যাচ্ছে নিজের ডেরায় । মগনকে গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে দেখে কিছু একটা সন্দেহ হয় ওর । বিশু ডাকাত আর সময় নষ্ট না করে ছুটলো মগন চোরের পিছনে । পিছন থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসতে শুনে মগন চোর ঘুরে তাকিয়ে দেখে বিশু ডাকাত । দেখেই ওর আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় হলো । বিশু ডাকাতকে হাড়ে হাড়ে চেনে বলে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের প্রাণ বাঁচাতে ছুট লাগালো সম্মুখের দিকে ।

মগন চোর দিকবিদিক ভুলে সমানে ছুটছে সামনের দিকে । পিছনে বিশু ডাকাত । ছুটতে ছুটতে দুজনে চলে এলো শহরের জাঁদরেল দারোগা বীরপ্রতাপ সিংয়ের বাড়ির সামনে । চোর এবং ডাকাত দুজনেই বোমকে গেল ওখানে এসে । দিনটা যেন বড় বেশী ঝলমল করছে এখানে । কেন !

তখনই সহসা লোকাল থানার একদল পুলিশ এসে পড়ে ওদের সামনে । কাজের সুবাদে এদের সঙ্গে পুলিশদের অনেক কালের জানাশোনা থাকায় একটা পুলিশ ওদের ডেকে বলে এ্যাই, তোরা যাচ্ছিস কোথায় ? জানিস না থানায় আজ তালা পড়েছে ? 
 কেন হুজুর ? দুজনেই একসঙ্গে শুধোয় ।
 আজ যে দারোগা সাহেবের মেয়ের বিয়ে । দেখছিস না আস্ত একটা রাত উধাও করে দেওয়া হয়েছে এই শহর থেকে ? আজ তোদের রাতের কারবার যে লাটে উঠলো রে জগাই মাধাই
 জগাই মাধাই নয় মগন - বিশু বিশু ডাকাত রাগ ফলাতে কশুর করে না


দীপলেখা মুখার্জী

সুর্মা 

সুর্মা, জন্মের পর মা বাবা নাম দিয়েছিল বটে। ময়াল সাপের মতো কালো ছিপছিপে চকচকে ভরন্ত চেহারার বছর একুশের সুর্মা।টানাটানা কাটা কাটা চোখ, মুখ। কালোর এত জৌলুষ যখন,তখন সুর্মা ছাড়া আর কিইবা নাম হতে পারত? বুকেরপাটায় সাহসও ছিল বাঘিনীর মতো। পাশ দিয়ে কেউ ফুটকাটলে, কোমড়ের উপর থেকে মাথা পর্যন্ত ঘুরিয়ে, সাদা ঝকঝকে দঁাতের ফঁাকে জিভ আটকে,"শালা, হিম্মত হ্যয় তো, সামনে আ, পিছে কিউ বোলতা হ্যায় রে?" বলে যেই ঘুরে দাঁড়াত,  ওয়াগানবেকার কোমরে চাক্কু নিয়ে ঘুরনেওয়ালা, তাজুর ও সব হিম্মত শুকিয়ে ছোট হয়ে যেত। 

কারুর দরকারে ঝঁাপিয়ে পড়ত কে?এই সুর্মা। ছাগলের জন্য তরতর করে,কাঁঠালগাছের মগ ডালে অনাযাসে উঠে যেত সুর্মা। কৌশলার বাবার রাত বিরাতে বুকে ব্যাথা উঠলে,কে ভ্যানরিক্সা চালিয়ে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছিল? এই সুর্মা। সারাদিন রাজমিস্ত্রির যোগার খেটে বাপ মায়ের ছোট ভাইএর পেট ভরাতো সে। কোনো মাইকে লালের হিম্মত ছিল না,ওর দিকে ফিরে তাকায়।পেছন থেকে সবারই নজর ওর উপর আছে, তা সে জানত। 

সামনের জি. আর. পি এর ব্যারাকে প্রায়ই জাম পাতা, কয়েতবেল চুরি করতে যায় সুর্মা।সকাল ১১/১২ টার সময় ব্যারাক ফাঁকা থাকে। সে দিনও গেছিল।জানতো না,মরন লেখাছিল কপালে। কয়েৎবেল গুলো কোচড়ে ভরে, লেবু গাছটার দিকে হাত বাড়াতেই একটা শক্ত হাত ওর হাতটাকে পিছমোড়া করে ধরে ফেলল, কানে এলো "শালী চোরনি,লেবু চুরি করছিস?" সুর্মা কোনরকমে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে সেই যে দেখল, সেখানেই মরল মনে হয়।টকটকে ফর্সা রং, মোটা গোঁফ, পাতলা লাল ঠোঁট  তারচেয়ে প্রায় এক হাত লম্বা পেটানো চেহারা, চোখে ঘোর লাগার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট ছিল।মন বলল, এইভাবেই তাকে ধরে থাকুক, কোঁচড় থেকে চারটে কয়েৎবেল গড়িয়ে পড়ল। হাতটা ছাড়িয়ে সেই যে দৌড় দিল, সোজা পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে,বার তিনেক এপার ওপার সঁাতরে দম নিল সুর্মা। তারপর থেকেই কি যেন হয়েছিল গেল,  মা বলতো জিনপরী তে ধরেছে তাকে, সারাক্ষণ ওই ব্যরাকের চারপাশেই ঘুরঘুর করত মনটা। মাঝে সাঝে দেখতে পেত সেই সাহেবের, মনে হত পুলিশের এই সাজ ওকেই মানায়। হঠাৎ ই একদিন চৌকিদার তাকে ডেকে, নিয়ে গেল বলল, "তোকে বিশাল সাহিব বুলাচ্ছে, আমার সাথে চ"। চৌকিদারটা কে একদম সহ্য করতে পারে না সে। কিন্তু নামটা যখন 'বিশাল সাহেব' সুর্মার না করার জোর কোথায়?!গিয়ে দেখল, খাটিয়ায় বসে আছে সাহেব। তার সাথে,  আরো চারজন। 
তিনদিন ধরে সুরমার খোঁজ নেই, মা এক নাগাড়ে কেঁদেই চলেছে, ল্যাংড়া বাপ দাওয়ায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে আকাশে দেবতাকে খুঁজছে বোধহয়। পুলিশে রিপোর্ট ও লিখিয়েছে। তবু কেউ কোনো  খোঁজ পেল না মেয়েটার। হঠাৎ অনেক রাতে দাওয়ায়, ধুপ করে শব্দ! দরাজা খুলে বাপ দেখে , সুরমা!!! তুই!একি অবস্থা! সারা শরীর রক্তাক্ত। ঠোঁটের কষে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, একটা চোখ বিভৎস রকম ফুলে আছে, কাপড় জামা শতছিন্ন। ওর মা দৌড়ে এসে জড়িয়ে কেঁদে উঠল। বাপ ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে  চাদর নিয়ে এসে ঢেকে দিল।
তারপর থেকেই জিন্দা লাশ  হয়ে বেঁচে রইল সুরমা। না কাঁদে, না হাসে, না কারুর সাথে কথা বলে। খালি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। অনেক চেষ্টা করেও কি হয়েছিল, বা কারুর নাম জানা গেল না। নয় মাস পরে একটা ছেলে জন্ম দিল সে।  কয়েক ঘরে বাসন মেজে, ছেলে কে বড় করতে লাগল, সবাই বলত,ওর বাপ কে রে সুরমা? এত রহিস আদমিদের মতো তোর ছেলের চেহারা!! সেই সময়, হ্যঁা কেবল সেই সময়ই সুর্মার মনে হতো, মা হয়েও ছেলেটার গলা টিপে দি।  অতটুকু বাচ্চাও মায়ের সেই দৃষ্টিটাকে ভয় পেত। বছর সাতেক পর সেই ছেলেও গেল। সুর্মা গেছিল বাসন মাজতে, তার বেটা একটা  কুকুর ছানা পুষে ছিল। খেলতে খেলতে একদিন কুকুরটা রেলগাড়ির তলায় ঢুকে গেছিল। তাকে বের করতে গিয়েই শেষ।  সবাই সান্তনা দিতে ছুটে আসলো, সুর্মা শুধু বলল, বদ রক্ত ছিল,বয়ে গেছে, ধুয়ে গেছে। তারপর থেকে সেই কুকুরটা কে খুব আদর করত সুর্মা। অনেক রাতে ভাত আর তার ছেলের প্রিয় আলুর চোখা থালায় করে রেল লাইনের ধারে দিয়ে আসতে এখনো দেখা যায় সুর্মা কে।

খালি তাকে সুর্মা নামটা আর মানায় না, সে এখন কালি, কলঙ্ক এর অন্যরূপ,শখ করে আর কেউ চোখে পড়ে না।


সুর্মা 
দীপলেখা মুখার্জী।
সুর্মা, জন্মের পর মা বাবা নাম দিয়েছিল বটে। ময়াল সাপের মতো কালো ছিপছিপে চকচকে ভরন্ত চেহারার বছর একুশের সুর্মা।টানাটানা কাটা কাটা চোখ, মুখ। কালোর এত জৌলুষ যখন,তখন সুর্মা ছাড়া আর কিইবা নাম হতে পারত? বুকেরপাটায় সাহসও ছিল বাঘিনীর মতো। পাশ দিয়ে কেউ ফুটকাটলে, কোমড়ের উপর থেকে মাথা পর্যন্ত ঘুরিয়ে, সাদা ঝকঝকে দঁাতের ফঁাকে জিভ আটকে,"শালা, হিম্মত হ্যয় তো, সামনে আ, পিছে কিউ বোলতা হ্যায় রে?" বলে যেই ঘুরে দাঁড়াত,  ওয়াগানবেকার কোমরে চাক্কু নিয়ে ঘুরনেওয়ালা, তাজুর ও সব হিম্মত শুকিয়ে ছোট হয়ে যেত। 

কারুর দরকারে ঝঁাপিয়ে পড়ত কে?এই সুর্মা। ছাগলের জন্য তরতর করে,কাঁঠালগাছের মগ ডালে অনাযাসে উঠে যেত সুর্মা। কৌশলার বাবার রাত বিরাতে বুকে ব্যাথা উঠলে,কে ভ্যানরিক্সা চালিয়ে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছিল? এই সুর্মা। সারাদিন রাজমিস্ত্রির যোগার খেটে বাপ মায়ের ছোট ভাইএর পেট ভরাতো সে। কোনো মাইকে লালের হিম্মত ছিল না,ওর দিকে ফিরে তাকায়।পেছন থেকে সবারই নজর ওর উপর আছে, তা সে জানত। 

সামনের জি. আর. পি এর ব্যারাকে প্রায়ই জাম পাতা, কয়েতবেল চুরি করতে যায় সুর্মা।সকাল ১১/১২ টার সময় ব্যারাক ফাঁকা থাকে। সে দিনও গেছিল।জানতো না,মরন লেখাছিল কপালে। কয়েৎবেল গুলো কোচড়ে ভরে, লেবু গাছটার দিকে হাত বাড়াতেই একটা শক্ত হাত ওর হাতটাকে পিছমোড়া করে ধরে ফেলল, কানে এলো "শালী চোরনি,লেবু চুরি করছিস?" সুর্মা কোনরকমে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে সেই যে দেখল, সেখানেই মরল মনে হয়।টকটকে ফর্সা রং, মোটা গোঁফ, পাতলা লাল ঠোঁট  তারচেয়ে প্রায় এক হাত লম্বা পেটানো চেহারা, চোখে ঘোর লাগার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট ছিল।মন বলল, এইভাবেই তাকে ধরে থাকুক, কোঁচড় থেকে চারটে কয়েৎবেল গড়িয়ে পড়ল। হাতটা ছাড়িয়ে সেই যে দৌড় দিল, সোজা পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে,বার তিনেক এপার ওপার সঁাতরে দম নিল সুর্মা। তারপর থেকেই কি যেন হয়েছিল গেল,  মা বলতো জিনপরী তে ধরেছে তাকে, সারাক্ষণ ওই ব্যরাকের চারপাশেই ঘুরঘুর করত মনটা। মাঝে সাঝে দেখতে পেত সেই সাহেবের, মনে হত পুলিশের এই সাজ ওকেই মানায়। হঠাৎ ই একদিন চৌকিদার তাকে ডেকে, নিয়ে গেল বলল, "তোকে বিশাল সাহিব বুলাচ্ছে, আমার সাথে চ"। চৌকিদারটা কে একদম সহ্য করতে পারে না সে। কিন্তু নামটা যখন 'বিশাল সাহেব' সুর্মার না করার জোর কোথায়?!গিয়ে দেখল, খাটিয়ায় বসে আছে সাহেব। তার সাথে,  আরো চারজন। 
তিনদিন ধরে সুরমার খোঁজ নেই, মা এক নাগাড়ে কেঁদেই চলেছে, ল্যাংড়া বাপ দাওয়ায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে আকাশে দেবতাকে খুঁজছে বোধহয়। পুলিশে রিপোর্ট ও লিখিয়েছে। তবু কেউ কোনো  খোঁজ পেল না মেয়েটার। হঠাৎ অনেক রাতে দাওয়ায়, ধুপ করে শব্দ! দরাজা খুলে বাপ দেখে , সুরমা!!! তুই!একি অবস্থা! সারা শরীর রক্তাক্ত। ঠোঁটের কষে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, একটা চোখ বিভৎস রকম ফুলে আছে, কাপড় জামা শতছিন্ন। ওর মা দৌড়ে এসে জড়িয়ে কেঁদে উঠল। বাপ ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে  চাদর নিয়ে এসে ঢেকে দিল।
তারপর থেকেই জিন্দা লাশ  হয়ে বেঁচে রইল সুরমা। না কাঁদে, না হাসে, না কারুর সাথে কথা বলে। খালি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। অনেক চেষ্টা করেও কি হয়েছিল, বা কারুর নাম জানা গেল না। নয় মাস পরে একটা ছেলে জন্ম দিল সে।  কয়েক ঘরে বাসন মেজে, ছেলে কে বড় করতে লাগল, সবাই বলত,ওর বাপ কে রে সুরমা? এত রহিস আদমিদের মতো তোর ছেলের চেহারা!! সেই সময়, হ্যঁা কেবল সেই সময়ই সুর্মার মনে হতো, মা হয়েও ছেলেটার গলা টিপে দি।  অতটুকু বাচ্চাও মায়ের সেই দৃষ্টিটাকে ভয় পেত। বছর সাতেক পর সেই ছেলেও গেল। সুর্মা গেছিল বাসন মাজতে, তার বেটা একটা  কুকুর ছানা পুষে ছিল। খেলতে খেলতে একদিন কুকুরটা রেলগাড়ির তলায় ঢুকে গেছিল। তাকে বের করতে গিয়েই শেষ।  সবাই সান্তনা দিতে ছুটে আসলো, সুর্মা শুধু বলল, বদ রক্ত ছিল,বয়ে গেছে, ধুয়ে গেছে। তারপর থেকে সেই কুকুরটা কে খুব আদর করত সুর্মা। অনেক রাতে ভাত আর তার ছেলের প্রিয় আলুর চোখা থালায় করে রেল লাইনের ধারে দিয়ে আসতে এখনো দেখা যায় সুর্মা কে।

খালি তাকে সুর্মা নামটা আর মানায় না, সে এখন কালি, কলঙ্ক এর অন্যরূপ,শখ করে আর কেউ চোখে পড়ে না।


শান্তিময় কর


শুধুই গল্প নয়                          

সেই কোন ছোটবেলা থেকে এরকমটা হয়ে আসছে । ঘুমিয়ে পড়লেই যত রাজ্যের স্বপ্ন এসে আমার সামনে ভিড় করে । এমন একটা রাত যায় না, যেদিন আমি স্বপ্ন না দেখি । অদ্ভুত অদ্ভুত কিম্ভুত কিমাকার সব স্বপ্ন । এক একটা স্বপ্নে আমিতো ভয়ে আতঙ্কে পাগলের মত হয়ে যাই । কিন্তু রেহাই নেই, স্বপ্নেরা সব আসবেই এবং এটা আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে । এমনি একটা বীভৎস স্বপ্নের কথা বলতে চাই। মারাত্মক ঘটনা,এবং ঘটেছিল আমার ঘুমের মধ্যে ঐ স্বপ্নেই । এটাকে দুঃস্বপ্ন বলবো না অন্য কিছু, ভেবে পাই না । তবে এটুকু বলতে পারি, ঐ ভয়ংকর স্বপ্নের কথা ভাবলেও এখনও কেমন যেন সারা শরীরটা শিরশির করে ওঠে -- ভয়ে আতঙ্কে সিটিয়ে যাই । কদিন ধরেই প্রচণ্ড জ্বর, সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বিছানায় পড়ে ছিলাম । জ্বর ও ব্যথার কাতরানির মধ্যে মাথায় মায়ের হাতের কোমল স্পর্শে কখন এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । আর তার পরেই সেই বীভৎস, ভয়ঙ্কর স্বপ্নটা । সবার যা হয়, স্বপ্ন দেখার সময় মনে হয় সমস্ত ঘটনা বাস্তবে ঘটছে । তাই স্বপ্নে যা যা ঘটে, সবই সত্য মনে হয় । আমার বেলাতেও তাই হয়েছিল । এখনও আমি চোখের সামনে সমস্ত ঘটনাটা দেখতে পাই । একা থাকতে পারি না --- মূর্তিমান বিভীষিকা যেন আমায় তাড়া করে ফেরে ।
স্বপ্নটা এইরকম --- দেখলাম অনেকগুলো লোক মাঝরাতে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে " বল হরি হরিবোল " চিৎকার করতে করতে দড়ির খাটিয়ায় একটা মৃতদেহ কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে শ্মশানে । ঐ চিৎকারে ধড়মড়িয়ে উঠতে গিয়ে মাথাটা কেমন যেন বনবনিয়ে ঘুরতে লাগলো । যাই হক, কোন রকমে নিজেকে সামলে নিলাম । লোকগুলো প্রবল উৎসাহে নেচে নেচে ' বল হরি হরিবোল ' আর ' রাম নাম সত্য হ্যায় ' বলতে বলতে একটু এগিয়ে পথের ধারে বুড়ো শিব মন্দিরের সামনে মৃতদেহের খাটিয়াটা নামালো । বোধ হয় শিব ঠাকুরের কাছ থেকে লোকটার জন্য শেষ আশীর্বাদটুকু পাইয়ে দেওয়ার জন্যই । আমি সামনে এগিয়ে গেলাম । মুখটুকু বাদ দিয়ে মৃতের পুরো দেহটা সাদা চাদরে ঢাকা । গ্রামের  সবাইকেই চিনি, তাই ঐ লোকগুলোকে কোন প্রশ্ন না করে এগিয়ে গেলাম কে মারা গেছে স্বচক্ষে দেখার জন্য এবং মৃতের উদ্দেশে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর ইচ্ছায় ।

কিন্তু  সামনে গিয়েই যা দেখলাম তাতে আমার সারা শরীরের রক্ত হিম হয়ে যাবার জোগাড় । মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে যেতে থাকলো । থরথর করে কাঁপতে লাগলো আমার পা দুটো । মনে হল শরীরটা অবশ ঠাণ্ডা হয়ে জমে যাচ্ছে । চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে । এ কী দেখছি আমি ? কে ঐ মৃত লোকটা, কার মৃতদেহ ওটা ? আমি কি ভুল দেখছি ? আমি বিহ্বল আর অবাক বিস্ময়ে দেখছি সামনের খাটিয়ায় আমারই মৃতদেহ শোয়ানো আছে --- আমিই শুয়ে আছি মৃতদেহ হয়ে । এটা কি করে সম্ভব ? আমি তো জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছি । তবে ঐ লোকটা কি করে আমি হল বা আমি কি করে ঐ লোকটা হলাম ? আর তা ছাড়া আমার তো কোন যমজ ভাই নেই । অথচ ও আর আমি হুবহু একই লোক । ' আমি ও ', ' ও আমি ' ভাবতে ভাবতে মাথাটা আমার ঝিমঝিম টলমল করে উঠলো । মনে হল মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাচ্ছি । পড়েই যাচ্ছিলাম সত্যি সত্যি, হঠাৎ কে যেন আমাকে পিছন থেকে জাপটে ধরলো --- " কি হল ঘণ্টা দা, এমন করছো কেন, কি হল তোমার ?" এই বলে ও আমাকে গাছতলায় শুইয়ে দিল । পাশ থেকে আর একজন কে টিপ্পনী কাটল , " শালার কলজের জোর নেই তো ভড়ং করে মড়া দেখতে আসা কেন ? দে মাকড়াটাকে তুলে দে খাটে, এক সাথেই পার করে দিই "
এই রকম ডায়ালগ বাজির মধ্যেই আমি আস্তে আস্তে জ্ঞান হারালাম --- কিন্তু অবচেতনে মানসচক্ষে সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম । মৃত ভেবে নিয়ে ওরা সবাই মিলে আমাকেও ঐ একই খাটিয়ায় তুলে দিয়ে দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললো । কিন্তু এ কী অবাক কাণ্ড রে বাবা ? একটু আগে যে লোকটা এই খাটিয়ায় শুয়েছিল, সে গেল কোথায় ? যেন কর্পূরের মত উবে গেল । আর আমি তো বেঁচে আছি, আমাকে এরা কাঁধে চাপিয়ে হরিবোল বলতে বলতে নিয়ে যাচ্ছে কেন ? আমি একবার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে চাইলাম, " আমি বেঁচে আছি ", কিন্তু গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরোল না, শুধু ফসফস করে কিছুটা হাওয়া বেরিয়ে গেল । হাত, পা, সারা শরীরে বজ্র আঁটুনি, নড়াচড়ারও উপায় নাই । পালানোর কথা তো ভাবাই যায় না । নেহাৎ নিরুপায় অসহায়ের মত চুপচাপ পড়ে থাকলাম । ভাবলাম, যা হবার হক --- কী আর করতে পারি আমি । জন্মেছি যখন, মরতে তো হবেই একদিন । বেশী ভেবে কি লাভ ? তাছাড়া এই বেহেড মাতালগুলোর হাত থেকে তো নিস্তার নাই কোনমতেই । কিন্তু তবুও আমার দুচোখ দিয়ে ভরা শ্রাবনের ধারা বইতে লাগলো । এমন বেঘোরে জীবনটা যাবে ? আমি ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না এটা কি রকম উদ্ভট ব্যাপার ? একটু আগে যে এই খাটিয়ায় বিরাজমান ছিল, সে উধাও । সে আর আমি দুজনই এক, কোন তফাৎ নেই  । ওরা নেচে নেচে সুর করে হরিবোল গাইতে গাইতে শ্মশানের বুড়ো বটগাছ তলায় আমার খাটিয়াটাকে নামিয়ে দিয়েই যে যার বোতলের ছিপি খুলে বসে গেল গোল হয়ে একটু দূরে গাছতলায় । আমি হাত পা বাঁধা অসহায়ের মত পড়ে রইলাম একধারে একলা, একটু পরে নিজের অন্ত্যেষ্টির স্বাক্ষী হয়ে থাকার জন্য । আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছিল না । আমি ভাবছিলাম আমার শেষ পরিণতিটা এই ছিল ! নানা ভাবনা আমার মাথায় ভিড় করে আসছিল । হঠাৎ দেখি সেই উধাও হয়ে যাওয়া লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে ----

-কি ঘণ্টা দা, কেমন লাগছে ?
- আমি ঘণ্টা হলে তুমি কে ? ' আমি তুমি, তুমি আমি তো মিলে মিশে একাকার --কি করে হয় ?
- হ্যাঁ হয়, ঘণ্টা দা, হয় । এ রকমটাই হবার ছিল । বিদায় বন্ধু, বিদায় -- তোমার স্বর্গের পথ সুগম   ', হ্যাপি জার্নি ।    
- কি বলছো তুমি ?
-তা নয়তো ? আমি মরে মরা, তুমি না মরেও মরা । ওপারে তোমার সাথে দেখা হবে।
- আচ্ছা, তুমি আমায় মুক্তি দিতে পারো না ?
- মুক্তি কোথায় হে দাদা ? মুক্তি নাই । সব শালার তোমার আমার মতই বেঘোরে প্রাণ যাবে ।

কথোপকথন শেষ হয় না । তার মধ্যেই মুর্দাফরাস মাতালগুলো হৈহৈ রই রই করতে করতে এসে আমার দড়িদড়া খুলে আমাকে চ্যাংদোলা করে চিতায় তুলে ফেলে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল । আমি হাউমাউ করে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠলাম ----- বাঁচাও, বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও ।
আর ঠিক তখনই সেই মুহূর্তে আমার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল । শুনতে পেলাম মা চিৎকার করে বলছেন, " খোকা, ওরকম করছিস কেন, কী হল তোর ? " এই বলে মা আমার চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে সম্বিত ফিরে পেলাম । মনে হল যমলোক থেকে ফিরে যেন নবজীবন প্রাপ্তি হল আমার । 
                          




তন্ময় বসু

দিনযায়

খাবার টেবিলে বসে জেকব্ আর এ্যঞ্জেল নিয়ে কথা হচ্ছিল, ইস্রায়েল হয়ে চলে এল মোজেস। হিব্রু শব্দের মানেগুলো আলোচনা হতে ছেলে বলে বসল - আগে তুমি প্রচুর বই পড়তে! আর্য আর কথা বাড়াতে না চাইলেও বউ মোজেসের গল্প শুনতে চাইল। শোনার পর যথারীতি বলে দিল - দুর, যত্তসব গাঁজাখুরি! আর্য চেপে গেলেও বউ নাছোরবান্দা হয়ে বলে - তুমি বিশ্বাস কর এসব? এগুলো সত্যি হয় কখনো? অগত্যা মুখ খুলতেই হল। বলে যখন ছোট ছিলে, গ্রামের তাঁবুতে সিনেমা দেখতে, সেদিন যদি আজকের মোবাইলে সিনেমা দেখার গল্প শোনাতো কেমন লাগতো? মোবাইলে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে কথা বলার গল্প শুনতে - কেমন লাগতো? এক মিনিটে একটা অাস্ত সিনেমা এক যন্ত্র থেকে আরেক যন্ত্রে লেনদেন - কেমন লাগতো? আসলে কি জান আমরা যাকে কল্পনা বলি, তা ভীষণ রকম বাস্তব! অবাক হচ্ছো? কল্পনা করার সীমারেখা নির্ধারন করে আমাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতা। তা পরিয়ে আমরা যেতেই পারি না। যখন বয়স কম ছিল, তখন এককথায় কত কি নস্যাৎ করে দিতে পারতাম। এখন পারি না, মনেহয় আমার কিই বা জ্ঞান আছে! বিরোধীতা করতে গেলে তা নিজের কাছে অজ্ঞতার আর্ত চিৎকার শোনায় যে। অন্তরা বলে - তাবলে বিজ্ঞান নেই! মানে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বলে কিছু নেই। ছেলে ধ্রুব তখন হেসে বলে - মা সেভাবে যদি বল তাহলে সবাই যে অর্থে বিজ্ঞান বলে তা নেহাৎ সরলীকরণ। যে কম জানে সে যেটাকে বলে আরে এটা হতে হবে বা আরো জোর দিয়ে বলে এটাই হবে, সেটাকে বিজ্ঞান কার্যকারণ ব্যাখা দিয়ে বলে এটা হলে ওটা হয় বা ওটা হতে পারে। এটা একটা মনন। বিজ্ঞান আসলে একটা দর্শন, ফিলোজফী। ফিলোজফী ছাড়া কিচ্ছু নেই - যদি কিছু থাকে শুধু ধু ধু শ্যুনতা আর আত্মপ্রতারণা। আর্য বরাবর এই লাইনেই ভেবে এসেছে, আজ টুয়েলভে পড়া ছেলের কথা শুনে ভাবতে থাকে কোথা থেকে এসব শিখলো! কত বড় হয়ে গেছে! সেও তার মানে যথেষ্ট বুড়ো হয়েছে।



পারমিতা কর বিশ্বাস

বাঁশী বাজে অভিমানে, প্রাণে


এক শহরে এক ছোট্টো ছেলে ছিলো, নাম অর্ক। সুবিধে মত যাকেই একটু বাগে পেতো, তাকে ধরে বলতো - "আমায় একটা গল্প বলো না।" মা তাকে গল্প বলে ঘুম পাড়াতো। গল্প বলতে বলতে মা যখন ঘুমিয়ে পড়তো, ছেলেটি মাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে জিজ্ঞেস করতো -" তারপর?" বড় হয়ে একদিন নিজেই সে লিখতে শুরু করলো - কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও তার কলমের প্রতিটি আঁচড় খুঁজে ফিরল জীবনের নির্যাস। তার নচিকেতার মত জিজ্ঞাসু মন দর্শনের দরজায় দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে জীবনের গান শুনতে শুনতে একদিন পৌঁছে গেলো আপাত a অনাবিষ্কৃত সেই আকাশের কাছে। সে জানে এই আলো আঁধারে ঢাকা আকাশের মাঝেই লেখা আছে তার সব গল্পের শেষ কথা, সব প্রশ্নের উত্তর। তাই সে ঠিক করলো সে এই আকাশের সামনেই দাঁড়িয়ে রইবে - চিরকাল। আর এক শহরে এক ছোট্টো মেয়ে ছিলো। বড় ভালোবাসার কাঙাল ছিল সেই মেয়ে। তার সাথে কেউ একটু ভালোবেসে কথা কইলে সে তার বাগানের সেরা ফুল সেরা ফল ছুটে গিয়ে তাকে দিয়ে আসতো। তার মনে হত - যদি আরো কিছু দিতে পারতো সে। মেয়েটির নাম ঊষা। ঊষা ও একদিন বড় হলো। অর্ক তার অনির্বাণ জ্ঞানের আলোয় সত্যকে খুঁজতে খুঁজতে ও সব কিছু হারাতে হারাতে নিরুৎসাহী জ্ঞানভিক্ষুর মত সেই আকাশের নীচে এসে দাঁড়ালো। আর ঊষা! সোনার হরিণ, অরূপ রতন ধন ভালোবাসার খোঁজে পথ হারাতে হারাতে এক আকাশ সজল মেঘ হৃদয়ে নিয়ে ঐ আকাশের নীচে এসে দাঁড়ালো। এই প্রথম ঊষার সাথে অর্কর দেখা হলো। এই প্রথম মুগ্ধতার স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেলো কিছু। তারপর গল্প ও ভালোবাসার মোহনার খোঁজে তারা একসাথে কোথায় যে হারিয়ে গেলো কেউ জানে না।



মনোজিত্‍কুমার দাস

প্রেম অপ্রেম 

কঙ্কাবতীর সাথে বিজনের প্রথম পরিচয় টিএসসিতে । বিজন সেজেছিল কচ আর কঙ্কাবতী দেবযানি ।নাটক ট্র্যাজেডির মাঝে পরিসমাপ্তি ঘটলেও উভয়ের মাঝে প্রেম ভালবাসা একদিন গভীর থেকে গভীরতর হয়। পরিণতিতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুখেই দিন কাটাছিল ।কারোই কাল চিরদিন সুখে কাটে না । ওদের জীবনেও সুখ বেশি দিন স্থায়ী হলো না । বিজন এক সময় নাটক নিয়ে এতোই মেতে উঠল সংসারের প্রতি মন নেই, এমন কী কঙ্কাবতীর উপরও দায়ছাড়া ভাব । এমনটা দেখে কঙ্কাবতী ভাবে, এমনটা তো হবার কথা নয়! তার দেহমন থেকে যৌবন তো মরে যায়নি । বিয়ের পর কঙ্কবতী নাটকপাড়া মাড়ায়নি । বিজন নাটক নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিক সেটা কঙ্কাবতী চায়নি । সে একদিন স্বামীকে বলেই বসল,'আমি আমার কথা রেখেছি ,তুমি কিন্ত তোমার কথা রাখনি । এখন তুমি নাটকপাড়ার হিরো । আমি চেয়েছিলাম তুমি আমারই শুধুমাত্র হিরো হয়ে থাকবে । বিজন দেবযানির কথা কানেই তুলল না । দেবযানি জানে নাটকপাড়া কিচ্ছা কাহিনি। বিজনকে নিয়ে বড় ভয় ! ইদানিং বিজন রাত করে বাড়ি ফিরছে ,একটু একটু মদ গিলছে , দেবযানির মনে শঙ্কা । সে ভাবে. তার প্রতি বিজন কেন অনীহা দেখায় ভার কুলকিনারা খুঁজে পায় না! বিজনের নাটকপাড়ায় আগমন কঙ্কাবতীর হাত ধরে,সেকথা ঢাকার বেইলি রোডের নাট্যজগতের কারোই অজানা নয়। সেই বিজন এখন কঙ্কাকে ভুলতে বসেছে ! কঙ্কাবতী অবাক হয় বিজনের চরিত্রের নৈতিক খলনের কথা জানতে পেরে । গত পহেলা বোশেখের পর থেকে বিজনের মাঝে পরিবর্তন লক্ষ করে কঙ্কার মাথায় একরাশ চিন্তা ভীর জমায় । সে বিশ্বাসই করতে পারে না, তাকে না নিয়ে বিজনের রমনা বটমূলের যাবার কথা ! ওইদিনের দুদিন আগে অনেক রাতে বাড়ি ফিরে বিজন বলে, ' কঙ্কা ,তোমার শরীর ভাল না তুমি আর এবার বটমূলের অনুষ্ঠানে যেও না ।' বিজনের কথা শুনে সে অবাক হয় । সে ভাবে , মাতৃত্বের লক্ষণ তার শরীরে ফুটে উঠতে শুরু করলেও সে অনুষ্ঠানে যেতে পারবেনা এমন অবস্থা তো তার হয়নি । সে ইতস্তত ভাব দেখিয়ে কিছু একটা বলতে যাবার আগেই বিজন বলে,' এদিকে আজ রাতের ২টার ট্রেনে আমাকে চিটাগাং যেতে হচ্ছে, আমিও থাকতে পারছি না ।' বিজনের কথা বলার ধরনে কঙ্কাবতীর মন শংকিত হয় । স্বামীকে কিছু বলার আগেই বিজন খালি হাতে ঘর থেকে বের হয়ে যায় ।অগত্যা তাকে এটা মেনে নিতে হয় । সে বিজন ছাড়া বটমূলে যাবার কথা ভাবতেই পারে না । কঙ্কবতীর মন পরদিন সকাল থেকে বিষণ্নতার মাঝে ডুবে যায় । নাস্তা খাবার পর স্থির করে সে দিনটা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেবে । ফোনের আওয়াজ শুনে কঙ্কবতী জেগে গিয়ে দেখে দুপুর গড়িয়ে গেছে । বিরক্তর সাথে সে রিসিভারটা তুলে নেয় । ওপ্রান্ত থেকে সুরাইয়া যা বলে তাতে সে যেন আকাশ থেকে পরে । বিজন তাকে মিথ্যা বলে অন্য একটা অল্প বয়সী মেয়ের সাথে .... । সে আর কিছু ভাবতে পারেনা ,মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে । এটা কী করে সম্ভব ! তারপর অনেক ঘটনা ঘটে যায় । কঙ্কাবতী একসময় ভাবে , একদিন তাদের মাঝে যে প্রেম ছিল ,তা আজ অপ্রেমের রূপ নিয়েছে ।

তাপসকিরণ রায়

ধারাবাহিক হ্যান্টেড কাহিনী২৮

রবীন্দ্রসদন, মেট্রো রেলওয়ে স্টেশনের রহস্য  

ইউ.টিউব চ্যানেলের সন্ধান পাবার পর থেকে শশী ভূষণ তা মাঝে মধ্যে খুলে বসেন। এবার ওঁরা ভূত দেখতে কোথায় যাবেন মনের মধ্যে এমনি একটা প্রশ্ন তাঁর লেগে ছিল। দেখতে দেখতে তাঁর মনে পড়ে গেলো কলকাতার মেট্রো রেলওয়ে স্টেশনের কথা। তিনি সার্চে লাগালেন, কলকাতার মেট্রো স্টেশনের ভূত, লিখে। বেড়িয়ে এলো বেশ কিছু অডিও-ভিডিও। কিছু কিছুতে স্টেশনের, ট্রেনের ও ট্রেন যাত্রীদের চলমান দৃশ্যছবি রয়েছে। কোনটাতে আবার রহস্য ভৌতিক ছায়ার স্পট ফেলে তার ওপর বক্তব্য রাখা হয়েছে। এমনি এক ভিডিও থেকে তিনি পেলেন এ মত এক বিবৃতি--
দক্ষিণ কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরের কাছে অবস্থিত রবীন্দ্রসদন কলকাতা মেট্রোর ব্যস্ততম একটি রেলওয়ে স্টেশন, কিন্তু কলকাতার ভুতুড়ে জায়গাগুলির মধ্যে এটি একটি। উইকিপিডিয়া অনুসারে কলকাতা মেট্রোর অধিকাংশ আত্মহত্যা ঘটেছে এই স্টেশনে এবং সে কারণেই হবে এ স্টেশন ভুতুড়ে স্থান হিসেবে পরিচিত।  ইতিহাস বলে, ২০১৫ সালের ৭ই মেতে স্টেশনের কাছে একটি ড্রাইভার ইমার্জেন্সি ব্রেক ব্যবহার করায় তাকে কিছু দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। পরে ওই ড্রাইভার জানায় যে টানেল চ্যানেলের মধ্যে সে কোন আত্মাকে দেখে ব্রেক কষে কিন্তু তার পরেই তার চোখে কিছুই পড়ে না। এমন কি ওই মাসে আরও একবার এই রকম ঘটনা ঘটেছে।এ ধরণের ঘটনার ফলেই হবে এই স্টেশন মাঝে কিছুদিনের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
লাস্ট ট্রেনে যাওয়া যাত্রীদের মুখে শোনা যায় যে প্রায়ই ওই সময় স্টেশনে কারও ছায়া দেখতে পাওয়া যায় কিছুক্ষণ পরে আবার সেগুলো মিলিয়ে যায়। এমন কি অনেকের মতে যখন লাস্ট ট্রেন স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যায় তখন কিছু ছায়া তারাও লক্ষ্য করেছেন। এত কিছুর পরেও আপনি কি বলবেন যে ভূত বলে কিছু নেই ?”
মোবাইল পাশে রেখে এবার শশী সোফায় গা এলিয়ে বসলেন। বোধহয় মেট্রো রেলের অলৌকিক ঘটনা নিয়েই তিনি কিছু ভাবছিলেন। এমনি সময় অর্ণব এসে হাজির হল। অর্ণব সোফায় বসে শশীকে কিছু ভাবতে দেখে বলে উঠলেন, এবার থেকে তোকে শশিভূষণ বলে ডাকবো।
--কেন ? কৌতূহলী প্রশ্ন করেন শশিভূষণ।
--এই নাম থেকে বড় কোন ডিটেকটিভের গন্ধ আসে, অর্ণব হেসে বললেন। 
--এ সব কথা ছাড়, শশী চুপ করালেন অর্ণবকে। 
--কেন গুরু--তুই সত্যান্বেষী আর তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট হল জনান্তিক, জনান্তিক নামটাও তোর সহকারী হিসাবে কি জমেছে দেখ ?
এমনি সময় জনান্তিকের ফোন এলো, শশী কি করছিস ?
শশী--এই অর্ণবের সঙ্গে গল্প করছি।
জনান্তিক--বলছিলাম অনেক দিন হল চুপচাপ বসে আছি, কিছু একটা প্রোগ্রাম কর! শশী--আগামী রবিবার চল তা হলে-- 
জনান্তিককোথায় ?  
শশী--রবীন্দ্রসদন মেট্রো রেল স্টেশনে। 
তারপরই তিন বন্ধু ঠিক করলেন আগামী রবিবার রাতে ওঁরা মেট্রো রেল স্টেশনে যাবেন। এখানেও রাতের অভিযান থাকবে, শেষ মেট্রো রবীন্দ্রসদন পাস করার সময় থেকেই নাকি সব অলৌকিক ঘটনাগুলি সেখানে ঘটতে থাকে। রাত দশটা কুড়িতে রাতের শেষ ট্রেন।
শশী বাবু ওঁরা রাত দশটার মধ্যেই পৌঁছে গেলেন রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশন।  এখানে চার-পাঁচজন প্যাসেঞ্জার হাঁটাচলা করছে, যারা শেষ ট্রেন ধরে দমদমের দিকে এগোবেন। তিনটে প্লাটফর্ম টিকিট কেটে তিন বন্ধু গিয়ে হাজির হলেন স্টেশনে। দিনের হৈহল্লা এখানে আর নেই। রাত শুরুর ব্যস্ততা এখানে নেই।  গোনাগুনতি কয়েক জন যাত্রী প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের অপেক্ষা করছে।
--চল আমরা ঐ দিকে এগোই, শশী বাবু বললেন।
--কেন ওই দিকে কেন ? অর্ণব জিজ্ঞাসা করলেন।
ওদিকে স্টেশনের শেষ দিকেই নাকি টানেল চ্যানেলের পাশটায় ভৌতিক ঘটনাগুলি ঘটে, শশী ভূষণ বলে চলেছেন। ওঁরা তিন জন  নিঃশব্দে সে দিকে এগিয়ে গেলেন। এ দিকে অপেক্ষাকৃত আলোর প্রভাব বেশ কম হবে। স্টেশন কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ বাঁচাতে এদিকের লাইটগুলির কিছু নিভিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন হবে। কয়েক জন যাত্রী এই বিরাট স্টেশনের নির্জনতাকে ভাঙতে পারেনি।  মাঝে মধ্যে দূর থেকে দু-এক জন যাত্রীর কথাবার্তা শশী বাবুদের কানে এসে ঠেক  ছিল।
হঠাৎ ট্রেনের সামান্য গমগম আওয়াজ শোনা যেতে লাগলো। জনান্তিক বললেন, ট্রেন আসছে।
শশীভূষণ বললেন--হ্যাঁ, কিছু সময় আগে থেকেই ট্রেন আসার আওয়াজ পাওয়া যায়। ট্রেন আধ মিনিটের মধ্যেই প্লাটফর্মে এসে ঢুকল। আর পনের কুড়ি সেকেন্ডের মত দাঁড়িয়ে আবার হুশ করে বেরিয়ে গেল।
--কেউ কেঁদে উঠল কি ? শশীবাবুর কান খাড়া করলেন।
জনান্তিক বলে উঠলেন, আমিও যেন শুনলাম, একটা মেয়েলি আওয়াজ মনে হল। 
--না, অর্ণব ভয় পেলেন। তিনি দুই বন্ধুর মাঝখানে এসে বলে উঠলেন, কিন্তু আমার তো মনে হল গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ! ট্রেনকে  স্লো করার চেষ্টা করলে সামান্য ব্রেক লাগলে যেমনটা শব্দ হয়--অর্ণব বন্ধুদের বোঝাবার চেষ্টা করলেন।
না, ওঁরা স্পষ্ট কেউ ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না।
বন্ধুরা বেশ কিছু সময় স্টেশনের চ্যানেল সুড়ঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মনে হচ্ছে, বেশ কিছু সাদাকালো ছায়ারা যেন সেখানে নড়েচড়ে উঠছে !  কিন্তু এ ব্যাপারটা অলৌকিক নাও হতে পারে, হতে পারে স্টেশনের আলো ও ছায়ার মিলিত কারসাজি !
প্রায় আধ ঘনটা কেটে গেল লাস্ট ট্রেন চলে গেছে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম একেবারে ফাঁকা। প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি একটা টি-স্টল এখনো খোলা মনে হচ্ছে।  শশী বাবু সে দিকে তাকালেন, মনে হচ্ছে স্টল বন্ধ করে লোকটা এখনই বাড়ির দিকে রওনা দেবে। আর হ্যাঁ, স্টল ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। ওদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। 
--চল এক কাপ করে চা পাই কিনা দেখি, শশী বাবু বললেন।
--হ্যাঁ, চল, ও দোকান বন্ধ করছে মনে হয়, অর্ণব বললেন। ওরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেলেন টি-স্টলের দিকে। জনান্তিক হাঁক দিলেন, , ও ভাই, আমরা চা খাব।
টি-স্টলের লোকটা ওঁদের দিকে খানিক তাকিয়ে থাকল। ও বোধহয় ঠাহর করার চেষ্টা করলো, সামনের মানুষগুলি সত্যি মানুষ, না কি অশরীরী ? কিছুটা আস্বস্থ হয়ে হবে সে বলল, তাড়াতাড়ি আসুন, আমি স্টল বন্ধ করছি।
জনান্তিক ওঁরা পৌঁছে গেলেন স্টলের কাছে। কফি-কাম-টি মেকারে চা দুধ চিনি দিয়ে সুইচ অন করতেই, চার দিকের স্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ, স্যাঁ স্যাঁ আওয়াজ করে চা তৈরি হয়ে গেল। বাহ বেশ লাগছে, এই চায়ের যেন খুবই প্রয়োজন ছিল ওঁদের কাছে। ঠাণ্ডা-গরমের মাঝামাঝি একটা মরশুম চলছে, তবুও ওরা শরীরে বেশ ঠাণ্ডা ভাব অনুভব করছিলেন। ভয়-আশঙ্কায় এমনটাই বুঝি হয়!
--আমি যাচ্ছি, স্টলওয়ালা বলল, আপনারা এখানে বেশি সময় থাকবেন না যেন-- 
--কেন ? কেন ?? অপূর্ব যেন ভয় পেয়ে প্রশ্ন করে উঠলেন।
স্টলের লোকটা বলল, ওই, এখানে নাকি ভূত আছে !
--আপনি দেখেছেন নাকি কোন কিছু ? শশী বাবু প্রশ্ন করলেন।
লোকটা যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরে দাঁড়িয়ে বলল--না, আমার চোখে কিছু পড়েনি, তবে ওই রেল লাইনের টানেল থেকে আমি  কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। অবশ্য কান্নার আওয়াজ আমার কানে এসেছে বটে তবে সে আওয়াজ কোন প্যাসেঞ্জারের ছিল কি না তা হলফ করে বলতে পারবো না। তবু বেশি রাতে ফিরতে আমার গা ছমছম করে। আর দাঁড়ালো না স্টলের লোকটা, অনেকটা দ্রুতপদে সে যেন প্লাটফর্ম  পার করছিল।   শশী বাবু ঘড়ি দেখলেন। রাত এগারোটা বাজতে এখনো পাঁচ মিনিট বাকি। তাঁর মনে হল, আরও ঘন্টাখানেক তাদের তো অপেক্ষা করতেই হবে।
অর্ণব বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, ঐ যে ঐ যে দুজন লোক আমাদের দিকে--হ্যাঁ দুজন লোক এদিকে এগিয়ে আসছে। এবার স্পষ্ট তাদের দেখা যাচ্ছিল। ওরা রেলের পুলিশ, ওরা সামান্য দূর থেকেই শশীবাবুদের স্পষ্ট ভাবে দেখে নেবার চেষ্টা করছিল। পুলিশ দুজন এবার ওঁদের সামনে এসে দাঁড়াল, ওদের একজন বলে উঠল, আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে ?
--এই তো চা খেলাম, তাই--শশী বাবু বললেন।
--ঠিক আছে, এবার যান, এখানে থাকবেন না, পুলিশ বলল।
জনান্তিক কৌতূহলী হয়ে বলে উঠলেন, শুনেছি এই জায়গার বদনাম আছে ?
পুলিশ বলল--হ্যাঁ, আছে তো, লোকরা প্রায়ই এখানে এসে সুইসাইড করে। এই তো সাত দিন আগের ঘটনা, আমাদের চোখের সামনে একটা মেয়ে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিল-- পুলিশ দম নিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক এমনি সময় আচমকা কেউ যেন ট্রেনলাইনের দিক থেকে তীব্র চিৎকার দিয়ে উঠলো। শশী বাবু ও তাঁর বন্ধুরা একসঙ্গে চমকে উঠলেন। ভীত সন্ত্রস্ত পুলিশ দুটো ওই দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আবার সুইসাইড ? ওরা যেন খানিকটা ভয়ে ভয়ে নিজেদের টর্চ জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। শশী বাবুরাও ওদের পেছনে পেছনে গিয়ে হাজির হলেন। হাতের টর্চ জ্বেলে জ্বেলে লাইনের উপর দেখছে পুলিশরা। কোন মেয়েছেলে হয়ত ট্রেনে কাটা পড়েছে। কিন্তু কৈ ? কাটা-ছেঁড়া রক্তপাতের কোন চিহ্ন যে লাইনে নেই ! বেশ অনেকটা সময় ধরে লাইনের উপর খুঁজে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পুলিশরা। হঠাৎ ওদের মনে প্রশ্ন এলো, তা হলে এটা কোন অতৃপ্ত আত্মার চিৎকার হবে না তো ?
পুলিশরা এবার ভয়ে পালিয়ে যেতে যেতে শশী বাবুদের ডাক দিয়ে বলল, আপনারা এখান থেকে তাড়াতাড়ি পালান-- 
--না, আর থাকা ঠিক হবে না, জনান্তিক বলে উঠলেন, পুলিশরাই যদি ভয় পায়!
শশীভূষণ বললেন, চল আমরা ফিরব !
ভয়ে অর্ণবের মুখের কথা বুঝি জড়িয়ে আসছিল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, চল চল, আমার গাটা কেমন শিউরে উঠছে রে !
ব্যস্ততার সঙ্গে তিন বন্ধু ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। পেছনে আলোকিত স্টেশন পড়ে আছে। স্তব্ধতা ঘেরা এক অন্য লোকের নিঃশব্দ গাড়ি যেন এখানে এসে থামবে আর অশরীরীর দল তাতে চেপে বসবে!
ফিরতে ফিরতে হঠাৎ চমকে উঠলেন শশী। স্টেশনের খাম্বায় একটা সাদা ছায়া। মনুষ্য আকৃতির ছায়াটা বারবার নড়েচড়ে উঠছে না! কে জানে কোন আলোর ফোকাস এসে খাম্বার ওপর পড়েছে কিনা। একবার কাছে গিয়ে দেখবেন কিনা ভাবলেন শশী। তারপর অর্ণব ও জনান্তিকের কথা ভেবে আর এগোলেন না তিনি। আজ স্টেশনের যেটুকু দেখার ছিল সব টুকুই যেন তাদের দেখা হয়ে গেছে। তার জের যেন এখনও তাঁদের গায়ে লেগে আছে, তাই বুঝি তাঁদের শরীর মাঝে মাঝেই ভয়ে ছমছম করে উঠছে।