গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

সাঈদা মিমি

জাতিস্মর

         মিমব্রেস পার্বত্যভূমি পাহাড়ের ঢালে জাগুয়ারের চামড়া বিছিয়ে বসে আছেন গোত্রপ্রধান কোচাইজা, একজন চিরিকাহুয়া অ্যাপাচি অ্যাপাচিদের সেরা সমরনেতা রেড স্লিভসের জামাতা সে গোল হয়ে বসা নারী পুরুষ শিশুদের মাঝখানে বিশাল ক্যাম্পফায়ার রোস্ট করা হচ্ছে মোষের মাংশ কিশোরেরা তুলনামূলক গম্ভীর, কেননা, কিশোর নয়, নিজেদের সদ্য যুবক ভাবছে তারা শিশুদের কোলাহলে উপত্যকা সরব পিপিলিকা ওড়ার চন্দ্রকলা (রেড ইণ্ডিয়ানদের মাসের হিসেবে জানুয়ারি) এখন অ্যাপাচি গিরিপথে কুয়াশার দেবতা অথবা দেবতারা জেঁকে বসেছেন গোত্রের কৈশোরপ্রাপ্তদের শিকারে যাওয়ার অভিষেক হবে আজ শুরু হয়েছে পূর্বপুরুষদের নিয়ে বীরগাঁথা কাব্যগীত লাল মদের সুবাস, ঝলসানো মাংসের ঘ্রাণ, দূরের সান পেদ্রো নদীর বাতাস আমাদের পূর্বপুরুষের মাটি, আমাদের দেশ, এই ভূমির জন্য জীবন দেবো তবুও, একে পরিত্যাগ করবো না পাথরের পেয়ালা তুলে প্রতিজ্ঞা করছে দূর্ধর্ষ অ্যাপাচিরা

         ঈশানের ঘুম ভেঙে গেলো তিনটে চল্লিশে এরকমটাই হচ্ছে প্রতিরাতে! বাদামী ডিস্টেম্পার করা চারদেয়াল, নরম বিছানার অস্তিস্ব, অতি আধুনিক এয়ারকণ্ডিশনড ঘর, এসব তার কাছে অচেনা লাগছে কিছুক্ষণ আগেও সে ছিলো মিমব্রেস পার্বত্যভূমির পাদদেশে, আরাভাইপা খাঁড়ির দূর্ধর্ষ ধনু পা এস্কিমিনজিন এখন আবিষ্কার করছে, সে ঈশান রায়হান, ধনাঢ্য বাবার একমাত্র সন্তান এরকম কেনো হচ্ছে? তার সাথেই কেনো? বাবার অফিসের প্রধান শাখায় অ্যাকাউন্টস দেখে সে, সব কাজে অসংখ্য ভুলভাল হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন দিনের আলোয় সে বর্তমান শতকের অতি সুদর্শন যুবক রাত গভীর হলে এস্কিমিনজিন প্রবেশ করে তার দেহে, গ্রাস করে নেয় কোষ; মগজ আসে যোদ্ধার তেজ, মেসকাল চিবুতে চিবুতে সে তুলে নেয় পালক লাগানো তীর ধনুক অ্যাপাচিদের ঘোড়াগুলি তাদের মতই ক্ষিপ্র সব অদৃশ্য হয়েছে, ঘুমটা আর আসবে না নোটবুকটা টেনে নিলো সে, লিখছে, সাদারা এসেছিলো শরণার্থী হয়ে তখন আমরা বুঝতে পারিনি, কিছুদিনের মধ্যে আমরা হাজারে হাজারে মরবো এবং আমাদের শরণার্থী হতে বাধ্য করা হবে

        “এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত না হলে এখানে বসবাস করতো বহু সংখ্যক মানুষ সাদাদের মাথায় ঘিলু নেই, এমনকি অন্তঃকরণও আমাদের রক্ত পান করাটাই যেনো ওদের একমাত্র নেশা!” শিঁউরে উঠলেন এস্কিমিনজিন। আমরা সুখে ছিলাম, আজ আমাদের মাতৃভূমি হুমকির মুখে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য রক্ত আর লাশের স্তুপে হারিয়ে যাচ্ছে সাদা চামড়ার মানুষেরা এখানে অতিথি হয়ে এসেছিলো, তারপর তারা ব্যবসা করতে চাইলো এখানে আমরা জানতাম না আমাদের তীরের ফলার বিষের চাইতেও বিষাক্ত তাদের মন! তারা এখানে আবাস গড়তে শুরু করলো, দূর্গ বানালো, দাগী খুনি সৈনিক আমদানী করলো! যখন ওরা আরিজোনায় এসেছিলো, কোচাইজ কেনো স্বাগত জানিয়েছিলো ওদের? এস্কিমিনজিনের মনে পড়লো, ওরা একটি মিথ্যে চুরির ঘটনা সাজিয়েছিলো নিজেরা চুরি করে দোষ দিয়েছিলো চিরিহুয়াদের হত্যা করেছিলো একজন ইণ্ডিয়ান রাখাল বালক কে অ্যাপাচিরাও প্রতিশোধ নিয়েছিলো, হত্যা করেছিলো তিনজন শ্বেতাঙ্গ কে; বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে স্পেনীয় সাদাদের কাছে এই নিষ্ঠুরতা ওরা শিখেছিলো পরিস্থিতী নিয়ন্ত্রণে আনতে সাদা পতাকা নিয়ে ফোর্টে গিয়েছিলেন রেড স্লিভস কূট শেতাঙ্গরাও এসেছিলো সাদা পতাকা নিয়ে দূর্গে ঢোকার পরপরই বন্দী করা হয় রেড স্লিভস কে, সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে উঠতেই হত্যা করা হয় তাকে ধড় থেকে আলাদা করে দেয়া হয় মুণ্ডু একটি স্বর্ণালী জীবনের করুণতম সমাপ্তি ঘটে

        দক্ষ ফিন্যান্স ডিরেক্টর ঈশান যারা বলতো, এই খ্যাতি যা সে অর্জন করেছিলো মাত্র কয়েক বছরে, সব ধূলিস্মাৎ হয়ে গেছে তার রুচি খাদ্যে অনীহা প্রকট আকার ধারণ করেছে রাতস্বপ্ন দিনের বুকে পা রেখেছে কখন, কোথায়, কিভাবে সে আরাভাইপার খাঁড়িতে পৌঁছে যায় বোঝা দুস্কর! মিমব্রেস পর্বতমালায় দাঁড়িয় তাক করে ধনুক,ছিলার মত টানটান হয় বাদামী শরীর, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কালো চুল মরুভূমির বাতাসে উড়তে থাকে হাসপাতালের এই নির্জন কেবিনে যখন তাকে কড়া ঘুমের অষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে যায় নার্স, একটু পরেই কর্তব্যরত কোনো ডাক্তার এসে দেখতে পায়, সব যন্ত্রপাতি থেকে নিজেকে মুক্ত করে শিরাজাগা লাল চক্ষু মেলে সে তাকিয়ে আছে তার দীর্ঘ নাক প্রসারিত, মুখে ক্ষিপ্ত গোঙানি! ঈশান কে নিয়ে নানা দেশ ঘুরছেন বাবা নামের একজন মানুষ, একমাত্র সন্তানের এক ধনী পিতা। বিত্ত এই মূহুর্তে যখন সমাধান কিনতে অক্ষম কোনো ঘুমিয়ে থাকা ডিপ্রেসন তার মধ্যে জেগে উঠেছে, দুটো সত্ত্বায় বসবাস করছে ঈশান সম্ভাব্য সবরকম উন্নত চিকিৎসা চলছে ঈশানের বাবা জানেনও না, তার স্ত্রী পীর ফকিরের কাছে নিয়মিত ধর্ণা দিচ্ছেন অবিরাম কু-নজর আর বদ জ্বিনের ভর করা কিংবা এমনও হতে পারে কেউ তাকে কালো যাদু করেছে! নয়তো এমন পরিবর্তন কেনো? যে ছেলে কথা বলতো শান্তস্বরে, মা বলতে অন্ধ ছিলো, সে মায়ের দিকে জ্বলে ওঠা চোখ নিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলে, ‘যাবো না হোয়াইট মাউন্টেনে, আমাদের দেশ থেকে চলে যা রক্তখোর সাদার দল সব শুনে অনন্তবাগীর পীরসাহেব বলেছেন, কোন সাহেব জ্বিন, এর সাথে পারা মুশকিল কিন্তু আমিও ছাড়বো না ম্লেচ্ছ দেউ? মা জায়নামাজে পড়ে থাকেন

         অ্যাপাচিরা ভাগ হয়ে পড়েছে খণ্ড খণ্ড উপদলে যতবারই তারা শান্তির প্রস্তাব নিয়ে গেছে, ততবারই সাদা গভর্ণর তাদের কে নিজ এলাকা ত্যাগ করে, বসবাস অযোগ্য সরকারী আবাসনে যাওয়ার কথা বলছে সাদা গভর্ণর! এই সেদিন অন্য ভূখণ্ড থেকে আসা নরপিশাচেরা এখন তাদের নেতা? কি নির্মম নির্লজ্জতা! এই পর্বতভূমি, হ্রদ, নদী, শস্যপ্রান্তর, নিজ ভিটা ছেড়ে তারা যাবে না; কখনই না এস্কিমিনজিনের রক্তে অ্যাপাচি যোদ্ধার কোষ বিস্ফোরিত হয়, ‘ভিজুক, এই মাটি আমার রক্ত শুষে নেবে, এখানেই হবে কবর ঘ্রাণ শুঁকে এস্কিমিনজিন বলতে পারে, লু হাওয়া কবে বইবে, কেবল একটা অক্ষমতা তাকে ঘুন হয়ে কাটে, সাদাদের মত কামান নেই আমাদের, রাইফেল, গাদা বন্দুক তবুও কেউ বলতে পারবে, অ্যাপাচিরা লড়তে জানে না!মরুঝড়ের মত রক্তের গন্ধও পায় এস্কিমিনজিন যেদিন টাকসন শহরের রেড ইণ্ডিয়ান পল্লীতে ধ্বংসের উল্লাস চালিয়েছিলো সাদারা, অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আসতে আসতে প্রথমে তার চোখে পড়েছে ধোঁয়া, তারপর ভৌতিক নির্জনতা কয়েকশনারী, পুরুষ, শিশুর বিকৃত লাশ পড়ে আছে, বালি আর শুষে নিতে পারছে না রক্ত সাহসী এস্কিমিনজিন এই প্রথম কেঁপে উঠলো ভয়ে পালালো সে কাপুরুষের মত কোথায় শান্তিচুক্তি? গোত্রনেতা কোচাইজ? সাদাদের যে একদিন বলেছিলো, তোমাদের ঈশ্বর তো আমাদেরও, আমরা আমাদের ভিটা ছাড়বো না, তোমাদের ক্ষতির কারণও হবো না, আমাদেরকে আমাদের ভিটায় থাকতে দাও সেটা হলো না, ঈশ্বর বিভক্ত হয়ে গেলেন।

       দূর কোনো এক দেশের স্যানাটোরিয়ামের আঠারো নম্বর ঘরে ঈশান বন্দী কারণ প্রায়ই সে ভয়ংকর হিংস্র হয়ে ওঠে এবং নির্দোষ কোনো অস্ত্র দিয়েও মানুষ খুন করার চেষ্টা করে ঈশানের বাবা জানেন না, যে শেতাঙ্গদের দেশে তিনি ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন, তাদের দেখলে আরও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে।, জানলে হয়তো নতুন করে ভাবতে হতো তাকে শতবছরের বেশি সময় আগের এস্কিমিনিজিন এখন তার পুরোটাই দখল করে নিয়েছে মনোজগতে সে আরেকজন, যাকে ত্রিমাত্রিক চেহারা দেখে চেনা যাবে না সে কথা বলে না, কেবল গোঙায় অন্ত্যঝড় তীব্র হয়ে এলে পাশবিক স্বর ভেসে আসে, ‘চলে যা আমার জন্মভিটা ছাড় বাঙালী সত্ত্বা হারিয়ে গেছে তার এখন সে একজন অ্যাপাচি যোদ্ধা, যে জানে, যাদের স্পষ্টতই বলে দেয়া হয়েছে, চিরিহুয়া অঞ্চলটি এখন তাদের নয় মিমব্রেস পর্বতশ্রেণী অ্যাপাচি গিরিপথ সান পেড্রো নদী আর গ্যালিউরো পর্বতমালার মধ্যাঞ্চল আরাভাইপা খাঁড়ি নিজ দেশে তার দলনেতা, দল এবং সে আজ উদ্বাস্তু ঈশানের হিংস্র গোঙানি অন্যান্য ওয়ার্ডে প্রতিধ্বনিত হয় কোনো উন্নতির খবর নেই যেনো চূড়ান্ত রায় প্রস্তুত, এখন পড়ে শোনানোর অপেক্ষা ঈশান নামের এক সুদর্শন যুবক আজ চামড়ায় জড়ানো কঙ্কাল

        আক্রান্ত হয়েছে অ্যাপাচিদের আরেকটি নিবাস তোবড়ানো লাশের স্তুপ পড়ে আছে বালিতে বন্দিদের পাঠানো হয়েছে সরকারী হোয়াইট মাউন্টেন ক্যাম্পে পলাতক অ্যাপাচিরা সংগঠিত হচ্ছে সান কার্লোস, টন্টো অববাহিকা, ক্যাম্প গ্রান্টে. যতবারই ফসল বোনার মৌসুম আসে, ততবারই নতুন অভ্যুত্থান শুরু হয় এই অনাহার, পালিয়ে বেড়ানো আর নয়। যদি মরতে হয়, নিজের মাটিতেই মরবো; সিদ্ধান্তে আসে এস্কিমিনজিন সাদাদের আগ্রাসন আরও বাড়তে থাকলো, ধরা পড়ে ধনু পা আরাভাইপার হাতে, গলায়, লোহার শেকল পরিয়ে ওকে ঠেলে দেয়া হয় অন্ধকার তলকুঠুরিতে এটাকে বেঁচে থাকা বলে? মরুর বাঁজ কে কেউ কি খাঁচায় পুরতে পারে? ধনুকের মত গঠন ছিলো বলে তার নাম ছিলো ধনু পা এস্কিমিনজিন ভেঙ্গে পড়তে থাকে তার সুঠাম শরীর কত চন্দ্রমাস আগে তারা মিমব্রেসের নিচে বসেছিলো? ছিলো লাল মদ, মোষের রোস্ট, কুয়াশা দেবতাদের আশির্বাদ, যুগ যুগ ধরে চলা বীরদের গীতোপখ্যান এস্কিমিনজিনের রক্তগতি স্লথ হয়ে আসে; নিঃশ্বাস এদিকে আঠারো নম্বর কামরায় ডাক্তার নার্সদের ব্যাস্ততা চলছে ঈশান কে ইলেকট্রিক শক দেয়ার প্রস্তুতি চলছে হঠাৎ তার হৃদয়, বিট দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে





তাপসকিরণ রায়

ফুটপাতের চাঁদ

সুখ দুঃখের মানসিকতা বোধহয় প্রত্যেক মানুষের কম বেশী একই রকমের। রমাকান্ত ভাবেন, সময়ের অবসরে ভাবতেই থাকেন। 
কয়েকদিন যাবত তিনি ফুটপাতের এক পরিবারের প্রতি নজর রেখেছেন। এক ছেলে নিয়ে বাপ মা ওরা তিনজনে বেশ কিছু দিন ধরে ফুটপাথে থাকে। এমনিতে ওরা যে সহায়-সম্বলহীন একথা কাউকে আলাদা ভাবে বুঝিয়ে দেবার নয়। টিনের জংধরা একটা থালা, মাটির হাঁড়ি, পাতিল, আর ছেড়া ময়লা কাঁথা কাপড় নিয়ে ওদের সংসার। ওদের দুঃখ তা হলে কত দূর, কতটা বড় হতে পারে? আর সুখ, ওদের কি আদৌ সুখ বলে কিছু আছে ? একমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে ওরা বেঁচে আছে।
পেটের তাগিদে দিন ভর ওরা ঘুরে বেড়ায়। ছেলেটাকে দেখেন রমাকান্ত। এর ওর সামনে হাত পাতে, দু দিন কিছু খায়নি, বলে পয়সা চায়। কেউ দেয়, কেউ দেয় না। ওর বাবা যখন যা পায় টুকটাক কাজ করে। কুলি-মজুরি করে, অনিয়মের ফাঁকে কখনো ভিক্ষার হাত পেতে দেয়। আর কিছু না পেলে ফেলে দেওয়া খাবারের পোটলা খুঁজে দেখে অবশিষ্ট কিছু আছে কি না। এঁটোকাঁটার বালাই ছেড়েছে ওরা। ও সব মানসিকতা থাকলে ওরা পেটে বাঁচবে কেন ? কি ভাবে জীবনকে শেষ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাবে ?
ছেলেটার মা কি করে ? ওই একই কাজ, ভিক্ষা চাওয়া, পোটলা কুড়িয়ে ফেরা, কিম্বা সপ্তাহে এক আধ দিন কাঠকুটো কুড়িয়ে এনে তিন ইটের পাতা উনানে ফুঁ দিয়ে দিয়ে আধ ফোটান ভাত রান্না করা। বলে না পাপী পেট ! সত্যি তো তাই--ফুটপাতের এই জীবন যাত্রা যে কতখানি দুর্বিষহ রমাকান্ত তা ভেবে পান না। 
রমাকান্ত ছেলেটিকে একবার ডেকে ছিলেন। ছেলেটি প্রায় দৌড়ে তাঁর কাছে এসে গিয়ে ছিল। ওর কতই বা বয়েস হবে, বার চোদ্দর বেশী না। ও জানে কিছু না কিছু ও পাবে, খাবার কিম্বা পয়সা। 
--কি নাম তোর ? রমাকান্ত প্রশ্ন করেছিলেন।  
ছেলেটা চুপ করে ছিল। 
রমাকান্ত আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোর নাম কি ?
অংছ
কি ? অংশ ? 
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ছিল অংশ। 
-অংশ মানে কি জানিস ? প্রশ্ন করতে গিয়েও করেননি রমাকান্ত, জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোরা তো ফুটপাতে থাকিস ?
হ। 
কি খাস ?
যা পাই--
রাত্রে ফুটপাতেই থাকিস ?
অসুবিধা হয় না?
না
জানি তোদের খুব দুঃখ--
অংশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
রমাকান্ত ভেবেছিলেন, দুঃখে বোধহয় সে চুপ হয়ে ছিল। 
তুই পড়তে জানিস ?
- বই পড়তে পারিস ?
- কিছু কিছু--
- স্কুলে পড়েছিস ?
চাইর ক্লাস তক
-তোর বাবা পড়া লেখা জানে ?
-বাবা পাঁচ ক্লাস পাস। উসখুস করছিল অংশ। আর যেন দাঁড়াতে পারছিল না ও। 
রমাকান্ত তবু প্রশ্ন করেছিলেন, তোরা ফুটপাতে থাকিস কেন ?
কি করমু--কাকা জ্যাঠারা আমাগো ঘর ছাড়া করছে--আমি যাই--
রমাকান্ত পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করেছিলেন, অংশর হাতে তুলে দেবার আগেই অংশ হাত বাড়িয়ে সেটা খপ করে ধরে নিয়েছিল। মনে হয়েছিল দেরী হলে টাকাটা কেউ তার হাত থেকে বুঝি ছিনিয়ে নেবে ! রমাকান্ত লক্ষ্য করছিলেন অংশকে। টাকা পেয়ে ওর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যেন একটা আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ভাব ওর মধ্যে থেমে আছে। আর না দাঁড়িয়ে নির্বাক সে ছুটে গিয়েছিল ওদের ফুটপাতের দিকে।
রমাকান্ত দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন, অংশ তার মার হাতে তুলে দিয়েছিল টাকা। ওর বাবা তখন সেখানে ছিল না। ছেলেটা হাসছিল, ওর মায়ের মুখেও হাসি ফুটেছে বলে মনে হয়েছিল রমাকান্তর। তার মানে ওরাও হাসতে জানে ! ওরাও বাঁচতে জানে ?
রাতের জীবন ওদের কেমন দেখা হয়নি রমাকান্তর। বড় ইচ্ছে হল ফুটপাতে গিয়ে ওদের রাতের কথা জানতে। রাতের খাওয়া সেরে তিনি বেরিয়ে পড়লেন ফুটপাতের দিকে। অংশদের গুটানো গাঁটরি পোঁটলার জাগা ঘিরে এখন ছেঁড়া কাঁথা-কাপড় টাঙানো। কোন মত একটু আবডাল করার চেষ্টা আর কি--ওদের রাতের ডেরা এটা। বোঝা গেল, ওরা শুয়ে পড়েছে। তবে ওরা তখনও ঘুমায় নি। রমাকান্তর দেখলেন, ডেরার বাইরে চার পা বেরিয়ে আছে, আর, আর পায়ে পায়ে কেমন জড়াজড়ি চলছিল ! রমাকান্ত ভাবলেন, তা হলে এ সুখটাও ওরা নিতে পারে ! এ মানসিকতাও ওরা খুঁজে পায় ? তিনি বুঝতে পারলেন অংশ ডেরায় নেই। ও তবে কোথায় ? আরও কয়েক পা এগিয়েই অংশকে দেখতে পেলেন রমাকান্ত। ও দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। লাইট পোস্টের আলোয় অংশকে দেখা যাচ্ছিল। রমাকান্ত এগিয়ে গেলেন, ডেকে উঠলেন, অংশ !
অংশ চমকে উঠলো। তাকাল রমাকান্তর দিকে, বলে উঠলো, বাবু ?
তুই কি করছিস এখানে ?
উত্তর দেওয়ার আগে অংশ একটু সময় চুপ করে দাঁড়ালো, তারপর ঈষৎ সঙ্কোচ নিয়ে বলল, চাঁদ দেখছিলাম।
রমাকান্ত ভীষণ আশ্চর্য হলেন, চাঁদ !
মাথা নাড়ল অংশ, ধীরে ধীরে বলল, আমার বন্ধু জামাল কইছে, কবিরা নাকি চাঁদ দেইখা কবিতা লেখে, তাই দেখছিলাম--
রমাকান্ত এবার যেন হতবাক। এই ফুটপাতের ছেলে আকাশের চাঁদ দেখে ? তার মধ্যে কবিতার ভাবনা ঢুকে পড়তে পারে !
রমাকান্ত বুঝলেন, অর্থ-কড়ি, যশ, নামডাক এ সব কিছুই মানুষের সুখের আধার নয়। এ সবের মধ্যেও মানুষের মনে নিরন্তর ভাবনার টানাপড়েন থেকেই যায়। আরও ,আরও পাবার লক্ষ্য তাদের দুঃখাতুর করে তোলে। ভগবানের নিক্তি মাপের সুখ দুঃখ তা হলে কি প্রত্যেক মানুষই সমান ভাবে উপভোগ করে ?  হ্যাঁ, সবটা না হলেও অনেকটাই তাই।