গল্পগুচ্ছতে প্রকাশিত লেখার বিষয়ভাবনা বা বক্তব্যের দায় লেখকের । সম্পাদক কোনভাবেই দায়ী থাকবেন না ।

শুক্রবার, ৯ মার্চ, ২০১২

দুটি গল্প 'বাতিক' মৌ দাশগুপ্তা এবং 'অনিকা' - আফরোজা অদিতি


অনু গল্প

                                                           বাতিক
                                                                 মৌ দা শ গু প্তা

ফটিকের ডাকনাম বাতিক। না এটা ওর বাপ মায়ের দেওয়া নাম নয়, তবে কিনা লোক মুখে ওই নামটাই চালু হয়ে গেছে!
আজ ফটিকের বিয়ে, কোথায় আনন্দ খুশীতে ডগমগ করবে, তা নয় , ঘরের কোণে গোমড়ামুখে গোঁজ হয়ে বসে ভাবছে যদি ওর ভাবী বউয়ের কোন প্রেমিক ট্রেমিক থাকে, যদি ওর সেই ভাবী বউ বিয়ের আগে- ই পালিয়ে যায়, যদি ফুলশয্যার রাতে সিনেমার নায়িকাদের মত বলে বসে সেই প্রেমিক ছাড়া আর কাউকে সে স্বামী মানতে রাজী নয় , যদি বলে স্বামী হিসাবে ফটিক তার আদৌ পছন্দ নয় ! যদি...

ফটিক ভাবছে আর দুশ্চিন্তায় কাঁটা হয়ে আছে , কিন্তু মনের ভাবনাটা বলবে কাকে ? বাড়ীর কাউকে, কিংবা বন্ধু বান্ধব যাকেই বলতে যাবে সে নির্ঘাত মাথায় একটা চাঁটি মেরে মুচকি হেসে বলবে  বাতিকবাবু!’ ঘরের দেওয়ালের পোকাখেকো টিকটিকিটাই তাই ওর একমাত্র এবং একনিষ্ঠ শ্রোতা

      ফুলশয্যের রাতে বরবধূকে নিভৃতে রাত কাটানোর সুযোগ করে দিয়ে সবাই বিদায় নিলো , ফটিক দরজা বন্ধ করে দিয়ে দেখলো , ওর নতুন বউ সুনয়না ঘোমটা খসিয়ে  পা মুড়ে বেশ গ্যাঁট হয়ে খাটের ওপর বসে  ওকে মাথা থেকে পা অবধি জরিপ করছে লজ্জায় লাল ফটিক কিছু বলার আগেই  শুনতে পেল - তা বলি , দেখতে তো বেশ খোলতাই লাগছো , আর ভাবগতিকও মন্দ নয় , তো বিয়ের আগে ইন্টু- মিন্টু কটি ছিলো শুনি ? মিথ্যে বলে পার পাবেনা ,বুঝলে ? কতদূর এগিয়ে ছিলে ? চুমু টুমু খাওয়া অবধি নাকি আরো বেশী ? ঘরের লোকজনকে লুকিয়ে আগেই আবার বিয়ে থা করে বসোনি তো ? বোবা কালা নাকি গো ? মুখেতে রা টি নেই যে ! তার মানে , ঠিক ধরেছি , তাই তো ?

     ফটিক তো হাঁ , কি উত্তর দেবে ! ফিচেল টিকটকিটা খালি দেওয়াল ঘড়ির পিছন থেকে মুখ বার করে দুজনকে দেখতে দেখতে হেসে বললো ঠিক ঠিক ঠিক’
                              -----XX ----


       অনিকা
রো জা অ দি তি , ঢাকা

         বাস চলছে। মায়ের পাশে চুপচাপ বসে আছে অনিকা । বাসে ওঠার পর থেকে মা একটা  
কথাও বলেনি । মা কেন চুপচাপ তাই ভাবছে অনিকা । ওর মা কথা কম বলে কিন্তু এতোটা চুপচাপ তো থাকে না ! আনিকা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ , তারপর  প্রশ্ন করে, মা, কথা বলছো না কেন ? আর কেনই বা যাচ্ছি আমরা ?
মা এতোক্ষণ জানালার বাইরে চলন্ত বাসের সঙ্গে সমান তালে চলে যাওয়া দৃশ্যগুলো দেখছিল
ঠিক দেখছিল নয়, ভাবছিল
বড় বোন ডেকে পাঠিয়েছে । অনেকদিন এ-ভাবে ডেকে পাঠায়নি বোন । বোনের সঙ্গে যোগাযোগও প্রায় ছিন্ন হওয়ার মতো । বোন চিঠিও লেখে না ফোনও করে না , চিঠি লেখা ওর ধাতেই নেই ফোন করার সময়ও হয়ে ওঠে না । তাছাড়া অবাক কান্ড যে, বোনের ফোন নম্বরও নেই ওর কাছে । অনিকার মা ভাবছিল, এতোদিন পর মিতিশা বুয়া ডেকে পাঠিয়েছে । নিশ্চয় বড় কোন বিপদ ঘটেছে । খুব বড় বিপদ না ঘটলে বোন ডেকে পাঠাতো না ।
        অনিকার কথায় চমকে ওঠে মা, ভাবনায় ছেদ পড়ে , মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, কিছু বলছিলে । অনিকা বলে, তুমি খুব অন্যমনস্ক মা , কেন বল তো , কী হয়েছে ? আমরা কেন যাচ্ছি তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম ? মা, মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ তারপর বলে, তোমার খালা যেতে বলেছে তাই যাচ্ছি
আমাকে কেন নিয়ে যাচ্ছো মা ? মেয়ের অবুঝ প্রশ্ন
এ কী কথা বললে অনিকা । আমি কী তোমাকে ছাড়া কোথাও যাই । তাছাড়াও মিতি বু নিয়ে যেতে বলেছে তোমাকে
মায়ের কথায় চুপ করে যায় অনিকা , ও জানে মা, ওকে ছাড়া কোথাও যায় না । অবশ্য বিশেষ কোন প্রয়োজন ছাড়া যায় না কোথাও । অনিকার মা- মনিকা চৌধুরী প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী । চাকরি আর বাসা, বাসা আর চাকরি করে যেটুকু সময় থাকে সেটুকু সময় তিনি গরীব মেয়েদের সেলাই শেখানোর কাজে ব্যয় করেন । একটা ছোট নার্সারি আছে, যেটা অনিকা এবং অনিকার মা দুজনেই দেখাশুনা করে।
        অনিকা মাএর একমাত্র সন্তান । অনিকার বয়স যখন এক তখন ওর বাবা মারা যায় । সেই এক বছরের মেয়েকে আজ চব্বিশ বছরের করেছেন একাই । মনিকা চৌধুরী একাই মা-বাবা উভয়ের ভূমিকা পালন করেছেন । মা খুবই ভালোবাসেন মেয়েকে। মেয়ের জন্যই এতোটা বছর কোন সঙ্গী খোঁজেননি তিনি, মেয়ে নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন
   আর অনিকা, ওর তো মা ছাড়া চলেনা , মা-কে ছাড়া সময় কাটতেই চায় না । মা-ই একমাত্র বন্ধু অনিকার । মা ছাড়াও ইদানিং হয়েছে একজন । মা ছাড়া যেমন দিন যায় না রাত কাটে না, তেমনি ওকে ছাড়াও দিন-রাত কাটতে চায় না। ওর নাম রাইন, রাইন আহমেদ
    অনিকা, কোন কথাই মায়ের কাছে গোপন করে না । অথচ দুই মাস ধরে মা-কে বলি বলি করেও রাইনের কথাটা মা-কে বলতে পারেনি । বলতে পারছে না বলে খুব অস্বস্তি হচ্ছে ওর না বলতে পারার জন্য যে সংকোচ হচ্ছে, কেন হচ্ছে তা-ও ভেবে পাচ্ছে না।
   আজ ভেবেছিল মায়ের সঙ্গে রাইনের পরিচয় করিয়ে দিবে কিন্তু গতকাল জরুরি খবর পেয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে রাইন । যাওয়ার আগে ফোন করেছে , কেন যেতে বলেছে তার কিছুই জানে না রাইন।
    বাস চলছে । অনিকা কিছুক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে  থেকে মায়ের কোলে হাত রেখে আদুরে কন্ঠে বলে, ও মা, কেন যাচ্ছি বলো না।
   কি বলবো বল, আমি তো জানি না। যেতে বলেছে তা-ই যাচ্ছি । তোর মিতিশা খালার কথা ফেলতে পারি না কখনও তাই যাচ্ছি । কথা বলতে বলতে মা, তার ব্যাগ থেকে চিঠি বের করে অনিকার দিকে বাড়িয়ে ধরে । অবাক হয় অনিকা । তুমি কি রাগ করলে মা! তোমার চিঠি পড়বো কেন আমি!
  মা হাসে। বলে, না রাগ করিনি । তুই পড়। পড়লেই বুঝতে পারবি । আমার ভালো লাগছে না । কথা বলতে ইচ্ছা করছে না, শুনতেও ইচ্ছা করছে না । অনিকা জানে, মা এখন খুব চিন্তা করছে । অজানা বিষয় হলে মা এরকম হয়ে যায় । অনিকা চিঠির ভাঁজ খোলে । এই প্রথম মায়ের চিঠি পড়ছে । ছোট চিঠি
প্রিয় মনি
অনেকদিন পর লিখছি । আমার খুব বিপদ । এই বিপদের দিনে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে মনে এলো না । আর আমার বিপদে আর কেউ না আসুক তুমি তো এসেছো, এবং আমি জানি তুমি এবারেও আসবে । আমি খুব অসহায় বোধ করছি । রাইনও এখানে নেই । ওকেও আসতে বলেছি । তুমি এলে বিস্তারিত বলবো । ভালোবাসা নিও
মিতিশা বু
পুনশ্চঃ অনিকাকে সঙ্গে এনো, দেখিনি অনেকদিন

   অনিকার খালা ওই একজনই । মিতিশা-খালু ব্যবসায়ী অনিকা, খালার বাড়ি যাচ্ছে দ্বিতীয়বার ,  প্রথমবার গিয়েছিল তখন ওর বয়স চার , তখনকার কথা মনেই পড়ে না ওর । কিন্তু খালার চিঠির মধ্যে রাইনের নাম লেখা! এই রাইন কে ? একি ওর রাইন ?
   রাইনকে দেখতে ইচ্ছা করছে অনিকার । রাইনের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর বেহালার সুর বেজে ওঠে । বুকের ভেতরের সব ঘরবাড়ি খুশিতে হেসে ওঠে । মন আনন্দে উচ্ছ্বল হয়ে ঝিকমিক করে ওঠে চোখের নীলতারা প্রথম দেখাতেই ছন্দোবদ্ধ দু’টি লাইন বলেছিল যা মনে হলেই রাইনের জন্য গভীর টান অনুভব করে অনিকা , মনে মনে লাইন দু’টি আওড়ে যায়  তোমার ওই দু’টি চোখের তারাতে/ভালোবেসে ইচ্ছা আমার হারাতে’।
   রাইনের কবিতার কথা মনে হতেই ওর মুখ লাল হয়ে যায় । কোথা থেকে লজ্জা এসে ঘিরে ধরে ওকে । ও বুঝতে পারে রাইনের জন্য ওর মনে গভীর ভালোবাসার জন্ম নিয়েছে । এই জন্যই মায়ের কাছে রাইনের কথা বলতে পারছে না , এই জন্যই এতো দ্বিধা, এতো সংকোচ । কিন্তু বলতে তো হবেই । ওর ওপর মায়ের অগাধ বিশ্বাস , এই বিশ্বাসের অমর্যাদা  কিছুতেই করতে পারে না ও। , পারবে না , করাও উচিত নয়।
   ওদের বাস চলছে। বাস যদি ঠিকঠাক  যায় তাহলে খালার বাড়ি পৌঁছাতে সন্ধ্যা হবে । বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশ খানিকটা পথ রিকশায় যেতে হবে । অনিকা ঘড়ি দেখলো, দুপুর দুটো । বাসা থেকে আনা পরোটা, ডিম ভাজি আর চা খেয়ে একটা পত্রিকা মেলে ধরে চোখের সামনে
  
খালার বাড়ি নেমেই দেখতে পায় দরজা খুলে খালা দাঁড়িয়ে আছে । মা-কে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করে,।এই বুঝি অনিকা ? অনিকাকে জড়িয়েও চুমু খায় খালা । অনেক বড় হয়েছে । সেই চার বছরের দেখেছি । তা মামণি, পথে কষ্ট হয়নি তো ? খালা শুধায় ।
   না, না, খালা । খালার পা ছুঁয়ে চুমু খেয়ে হাত রাখে মাথায়,  বাড়ির ভেতর নিয়ে যায় যেতে যেতে ডাকে ফজিলা, ও ফজিলাতুন নেছা, এদিকে আয়
   খালার ডাকে ছোটখাটো শ্যামলা একটা মেয়ে ওদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছালাম দেয় । মিতিশা খালা পরিচয় করিয়ে দেয়, তোমার দুলা ভাইয়ের দ্বিতীয়পক্ষ । ওকে বিয়ে করেছে আটমাস।
   মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অনিকা অবাক হয় ! এদেশে কি মেয়ে এতোই বেশী, এতাই সস্তা যে একটা মেয়েকে এভাবে বেঁচে থাকতে হয় ! মেয়েটার পরিবারের ওপর রাগ হয় অনিকার । হঠাৎ ঘরটা গুমোট মনে হয় , ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে , অসহ্য লাগে । বাইরে বের হওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে মেয়েটা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে , ওর দিকে তাকিয়ে মনে হয় ওর জীবনটাও আলো-বাতাসহীন গুমোট একটা ঘরের মতোই
   অনিকা মাকে বলে, মা আমি একটু বাড়িটা ঘুরে দেখি । ওর কথা শুনে মিতিশা খালা বলে, আগে কিছু খাও তারপর ঘুরে দেখ । তারপর মিতিশা খালা ফজিলাকে ডাকে, এই ফজিলা, শোন, ওর নাম অনিকা,ও আমার এই বোনের মেয়ে । ওকে নিয়ে হাত-মুখ ধোওয়ার জায়গা দেখিয়ে দাও । তারপর সবাইকে চা দাও
   চলেন খালা । ফজিলার সঙ্গে ও বের হয়। বলে, এখন চা খাবো না, বাইরে যাবো
   ভয় পাওয়া কন্ঠে বলে ফজিলা, না, খালা তাহলে বুবু রাগ করবে । পরে বেড়াবেন । অনিকার একটা হাত ধরে ফজিলা । মেয়েটি খুব সপ্রতিভ,খুব অল্প সময়ে মানুষকে আপন করে নিতে পারে  । ফজিলার সঙ্গে কল-পাড়ে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই শুনতে পায়, খালা, মা-কে বলছে, তোর দুলাভাই আবার বিয়ে করবে , কিন্তু যে মেয়েটাকে বিয়ে করার কথা সে গতরাতে বিষ খেয়েছ, বাঁচে কিনা সন্দেহ
   কি বললে ? মনিকা  অবাক !
   হ্যাঁ, সেই মেয়েটা এবারে পনেরোতে পা দিয়েছে । এখন যদি মারা যায় কী হবে তাই ভাবছি
   দুলাভাই কী পাগল ?
   পাগল না-রে, সেয়ানা পাগল।
   দুলাভাই বিয়ে করবে, তো আমাকে ডেকেছো কেন!
   এসব সামাল দেওয়ার জন্য । রাইনের একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব না । তোকে একা কিছু করতে হবে না, রাইনকে বুদ্ধি পরামর্শ্ দিতে হবে । আর তোর দুলাভাইয়ের বিয়ের সাধ মিটিয়ে দিতে হবে রাইন গেছে হাসপাতালে, মেয়েটার বাবার সঙ্গে কথা বলবে
   অনিকার ওই ঘরে ঢুকতে ইচ্ছা করে না । ওড়না দিয়েই হাত মুখ মুছে ফেলে । হা হা করে ওঠে ফজিলা । আরে খালা, গামছা আমি দিতাম , আসেন তো । ফজিলার সঙ্গে ওর ঘরে গিয়ে বসে । ফজিলা, ক্ষীর মুড়ি এগিয়ে দিয়ে বলে, আপনি খাইতে থাকেন, আমি ও ঘরে দিয়া আসি
   আমার খেতে ভালো লাগছে না খালা  
    কেন, আপনার কী শরীর খারাপ লাগছে
    না, খালা আপনাদের দেখে আমার কিছুই ভালো লাগছে না । একটা কথা জিজ্ঞাসা করি খালা, কিছু মনে করবেন না তো।
    না, করেন
    আপনি এই বুড়া মানুষটাকে কেন বিয়ে করলেন, প্রতিবাদ করলেন না কেন !
   কে শুনবে আমার কথা বলেন, আমি এই মানুষটার সাথে ঘর করবো না বললেই কী সব হবে ! হবে না খালা, এসব আমার কপাল!
    কপালের দোষ দিচ্ছেন কেন খালা ?
    কপালের দোষ না দিয়া আর কী করবো বলেন ? আমি তো বেশি লেখাপড়া জানি না, আমার লেখাপড়া ফাইভ ক্লাস । এই লেখা-পড়ায় নিজের খাওয়া-পরার খরচ, পরিবারের খরচ কেমনে চালাবো ? আমরা এক ভাই, এক বোন চুপ করে যায় ফজিলা ,আঁচলে চোখ মুছে । তারপর আবার বলতে শুরু করে, আমার ছোট ভাইয়ের বাড়াবাড়ি অসুখ ছিল । রক্তের মধ্যে অসুখ, সবাই বলে ক্যানসার জমি বিক্রি করেও কিছু যখন হলো না, তখন আপনার খালুর কাছ থেকে টাকা ধার করছিল আমার বাবা । কিছুই হলো না । টাকাও গেল, ভাইও গেল । ভাইয়ের শোকে বাবাও চলে গেল আর আমারে নিয়া মা অকুল পাথারে ভাসলো । টাকা দেওয়ার সামর্থ্ নাই। সেই সময় আপনার খালুর প্রস্তাব । মা, রাজি হলো---।
   অনিকার চোখেও পানি এসে যায় । ওর মা এ কোথায় নিয়ে এলো ওকে । ও ঘর থেকে খালার ডাক আসে
  অনিকা, অনি-মা এ ঘরে আয় । ঘরে যেতেই খালা কাছে টেনে নেয়। কত্ত বড় হয়েছিস । একটু দেখি তোকে । আমার রাইনও বড় হয়েছে । মানাবে ভালো । মনি, তোর মেয়েটারে আমায় দে । আমার রাইনকে দেখলে তোর ঠিকই পছন্দ হবে
  খালার কথা শুনে অবাক অনিকা । মা-ও একটু ক্ষোভের সঙ্গে বলে, তুমি কী আপা। তোমার সমস্যার আগে শেষ হোক, তারপর না অন্য কথা
   আমার সমস্যা তো আছেই, থাকবেও । ছেলেটাকে একটা বিয়ে দিয়ে এ বাড়ি থেকে দূরে রাখবো । তোর মেয়ে হলে সেটা রাইনের জন্য ভালো হবে । বউ এর সঙ্গে সঙ্গে গুরুজনও পাবে
যে ওকে বিপদে-আপদে পরামর্শ্ দিয়ে সাহায্য করতে পারবে তোমার অপছন্দ হবে না। এখনই চলে আসবে রাইন ,অনিকার সঙ্গে বে-মানান লাগবে না
   একটু থেমে কী যেন ভাবে মিতিশা, তারপর বলে, এতোদিন হলো ঢাকায় আছে, তোদের বাড়ি যায়নি একদিনও, বলে কিনা লজ্জা লাগে। রাইন, আমার খুব লা---
   মিতিশা খালার কথা শেষ হয় না। ঘরে ঢোকে রাইন , বলে মা দুঃসংবাদ ।
  
   ওকে দেখে চমকে ওঠে অনিকা, রাইন, তাহলে ওর খালার ছেলে । রাইন, অনিকাকে দেখেনি । ও, অনিকার দিকে পিছন ফিরে কথা বলছিল । ওর মুখের দিকে মিতিশা খালা তাকিয়ে আছে
    মা, ওই মেয়েটা, যাকে বাবা--- কথা শেষ না করে চুপ করে বলে, ওই মেয়েটা মারা গেছে ।  রাইনের কন্ঠে বেদনার ছোঁয়া। এখন মেয়েটার বাবা কেস করতে চাচ্ছে। জানি না কী হবে।
   ঘরের ভেতর বরফ শীতল নীরবতা নেমে আসে । মিতিশা খালার চোখে পানি দেখতে পায় অনিকা । মিতিশা খালা কাঁদছে । সান্ত্বনা দেয় মা
   কেঁদে কি করবে আপা । চুপ করো। ওই মেয়েটার আত্মার জন্য শান্তি চাও, দোয়া করো
   মিতিশা খালা কান্না বন্ধ করে,  ছেলেকে ডাকে
   আয়, বস এখানে । লজ্জা কি, এই তো মনিকা খালা । ঢাকায় থাকে । তুই তো যাওয়ারই সময় পাসনি । তোর বাবার সমস্যার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি
   রাইন ছালাম করে । মাথা চুলকে বলে, তাইতে মা, লজ্জা দিও না কেমন আছেন খালা ?
   ওদের কথার মাঝখানে ঘর থেকে বের হয়ে যায় অনিকা । রাইন ওর খালাতো ভাই । ওদের মাঝে আত্মীয়তার যোগ আছে, এখানে না এলে জানতেই পারতো না । অনিকা ফজিলার কাছে যায় । ফজিলা এশার নামাজ আদায় করে জায়নামাজ তুলে রেখে ওর কাছে এসে বসে । কথা বলে দু’জনে । এমন সময় ছোটমা, ছোটমা ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢোকে রাইন । অনিকাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে।  তোতলাতে তোতলাতে বলে, তু---তু---তুমি এখানে ?
   হ্যাঁ আমি এখানে । তা, তুমি তোতলাচ্ছ কেন, আমি কি ভূত ?
    খালাকে চেনেন নাকি বাপজান!
    হ্যাঁ, আমরা একই কলেজে পড়ি, তবে আমার নিচে পড়ে অনিকা
    আর কিছু জানেন না
    নাতো ! বিস্মিত রাইন তাকিয়ে থাকে ফজিলার মুখের দিকে
    ও যে আপনার মনি খালার মেয়ে । আপনারা কথা বলেন, আমি,  খাবার নিয়া আসি
    ফজিলা ঘর থেকে বেরিয়ে যায় । রাইন হাত ধরে অনিকার , তোমরা এখানে আসবে বলোনি তো
   হঠাৎ আসা , গতকাল খালার চিঠি পেয়ে মা এলো , মায়ের সঙ্গে আমিও
   রাইন মুখ নিচু করে বলে, কী বিশ্রি এক পরিবেশের মধ্যে এসেছো । আমাকে তো খুব খারাপ ভাবছো
   তোমাকে খারাপ ভাবতে যাবো কোন দুঃখে । তাছাড়া, তোমার কী দোষ! এতাক্ষণ ভালো লাগছিল না, এখন ভালোই লাগছে
   ভালো লাগাটা ঠিক আছে। কিন্তু আমার দোষ না থাকলেও, এ লজ্জা তো আমার । আমার
বাবা---
ওকে কথা শেষ করতে দেয় না অনিকা, বলে, রাইন, নিজেকে দোষী ভেবে লজ্জা পেও না দোষ তোমার বাবার, তোমার নয়, তবে তোমার দোষ না হলেও একটা কাজ করতে হবে তোমাকে
  কী কাজ। রাইন ওর মুখের দিকে তাকায়
  তোমার বাবাকে শোধরাতে হবে। আর এ দায়িত্ব নিতে হবে তোমাকেই
  আমাকে! বিস্মিত হয় রাইন । বাবার সঙ্গে কথা বলতেই তো ভয় পাই
   ভয় পেলে তো চলবে না । তোমার সঙ্গে আমিও থাকবো আর এই সমস্যার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঢাকায় ফিরবো না  
   সত্যি ! থাকবে তো ? অনিকার দিকে ভয় ভয় চোখে তাকিয়ে থাকে রাইন , যেন ওর কাছে আশ্রয় খুঁজে পেতে চায় ওর ভয়ার্ত্ দৃষ্টি দেখে সহাস্যে হাত বাড়িয়ে দেয় অনিকা । রাইন শক্ত করে সেই হাত ধরে
   দরোজায় দাঁড়িয়ে ফাজিলা দেখে ওদের । ওদের দেখে নিজের দুঃখের কথা ভুলে যায় । মন ভরে যায় নির্মল আনন্দে । সেই আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ে ফজিলার মুখে         
                 
    

     

বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২


টুবুদির বিয়ে ।
 মধুছন্দা পাল
        জ্যাঠামনির  বড়  মেয়ে  আমাদের সবাইয়ের বড়দি । কলকাতার  আশেপাশে  কোন ছোট   আধা শহরে থাকতো,   মাঝে  মাঝে বাপের বাড়ী আসতো । খুব ভালো মানুষ , শান্ত শিষ্ট  ছিল অনেক গল্প বলত  আমাদের । । জামাইবাবু  ছিলেননা   আমার যখন থেকে মনে পড়ে  সাদা শাড়ীতেই  দেখেছি । বেশ কয়েকটি ছেলে মেয়ে ছিল বড়দির ।  দুএকজন  আমাদের কাছাকাছি  বয়সের ছিল , আমাদের ওখানে থেকেই পড়াশোনা  করতো ।
        সেই বড়দির  মেয়ে  টুবুদি । যতদুর  মনে হয় আমার দিদি,রাঙ্গাদিদের বয়সি কারণ ওদের সঙ্গে  খুব ভাব ছিল । তো সেই টুবুদির বিয়ে । আমাদের বাড়ী থেকেই হবে । দিদিদের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল , টুবুদির বিয়ে একটু দেরি করেই ঠিক হয়েছিলো মনে হচ্ছে ।
        পাত্র, বিহারের গ্রামের ডাক্তার , নাম গোপাল ।  বোধহয় আত্মীয় স্বজন তেমন কেউ ছিলনা,  কারণ বিয়ে করতে একলাই এসেছিল যতদুর মনে পড়ছে । আর আমাদের বাড়ীতেই  বৌভাত, ফুলশয্যা  ইত্যাদি  হয়েছিল 
                 গোপাল যে অতি সুবোধ বালক  একেবারে অক্ষরে অক্ষরে  প্রমাণ করে দিল বর   মুখে কোন কথা নেই । সেটা অবশ্য বহুদিন বিহারের   দেহাতে থেকে   বাংলা ভাষা বলার অভ্যেস চলে যাওয়ার কারনণও হতে পারে ।  বিয়ের  নিয়ম কানুন  করাতে গিয়ে  নানারকম  হাস্যকর   পরিস্থিতি তৈরি করছিল , আর  জোরে জোরে হাসির হররা উঠছিল ।  একটা ব্যাপার মনে আছে । বিয়ের সময় কয়েকবার শিলের ওপর দাঁড়ানোর  নিয়ম আছে,  বর শিলের ওপর উঠেই ধপ করে বসে পড়ছিল । একবার নয় বারবার , পিঁড়িতে উঠেও    একই ঘটনা । সেই সব  নিয়ে খুব হাসল মেয়েমহল
        আমরাই বা  পিছিয়ে থাকি কেন ? বরের কাছাকাছি  গিয়ে গোপাল গোরুর পাল নিয়ে যায় মাঠে ......বলে তার যাকে বলে ঠ্যাং টানা  তার  চেষ্টা করা । তবে বর কিছু  বুঝছিল বলে মনে হয়না । আমরা বললাম বটে,আমি সঙ্গে থাকা ছাড়া আর কিছু করিনি , মায়ের কানে গেলে  যে কপালে দুঃখ আছে তা জানতাম ।  টুবুদির ভাই বোনেরাই  অনেক ভাবে হয়রান করার চেষ্টা  করছিল । ওদের অধিকারও ছিল অবশ্য । বয়স যাই হোক সম্পর্কে আমি শ্বাশুড়ী ।  
 যা হোক , বিয়ে  মিটে  গেলো ভালোয় ভালোয় ।  আগেই বলেছি   টুবুদির ফুলশয্যা আমাদের বাড়ীতেই  হয়েছিল । সেদিন গভীর  রাতে চোর ঢুকলো বাড়ীতে ।     

         গরমকাল , যে যেখানে পেরেছে  শুয়ে পড়েছে । টুবুদিরা  তিনতলায় জ্যাঠাইমার ঘরে । বাকি দুটো ঘর  খালি, বাইরে থেকে বন্ধ । ওরাও  দরজা খোলা রেখেছিল মনে হয় । তো চোর  ঢুকলো  গিয়ে  টুবুদিরা যে ঘরে  শুয়েছে সেই ঘরে ।  ঘরে ঢুকে  খাটের নীচ থেকে যখন টেনে বার করেছে স্যুটকেশ সেই আওয়াজে  ঘুম ভেঙে  উঠে  টুবুদি দেখে   মেঝেতে  চোর  বসে  চোর  নাকি টুবুদিকে  দেখেই  এক বিরাট  দাঁত খিঁচুনি  দিয়েছিল ভয়  দেখানোর  জন্যে ।  টুবুদি    তারস্বর  চোর চোর  চিৎকার শুনে বাড়ীর  লোকজন উঠে  চোর ধরার জন্যে   ছোটা ছুটি শুরু করলেও  ধরা তত সহজ ছিলনা । সব জায়গার আলো  তেমন জোরাল  ছিলনা   ছোটকাকার  একটা  পাঁচ ব্যাটারির  টর্চ ছিল, সেটা দিয়ে  চোর  খোঁজাখুঁজি চলল  মাঝে মাঝে দেখা যায় আবার কোথাও লুকিয়ে পড়ে।
        আমাদের মেজজ্যাঠা বাবুর  সারারাত জেগে বই পড়ার  অভ্যাস ছিল  একটু অদ্ভুত  মানুষ ছিলেন  ভালো ডাক্তার  হওয়া সত্ত্বেও  কোনদিন  প্র্যাকটিস  করেননি । এক পিসিমা ছাড়া  কারো সঙ্গে কথা বলতেননা  বড় একটা ।  তো বারান্দায়   আড় হয়ে  শুয়ে কাছে একগাদা  মেডিক্যাল  জার্নাল , পড়ে রয়েছে , মাথার কাছে একটা লন্ঠন   বারান্দার আলো যথেষ্ট  জোরাল  নয় পড়ার পক্ষে তাই একটা লন্ঠনের  ব্যবস্থা থাকতো   শেষ  পর্যন্ত চোরকে দেখা গেলো হাতে একটা ছোট ছুরি সেটা   ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে  মেজজ্যাঠাবাবুকে  ডিঙিয়ে  যে পথে এসেছিলো সেই দিকে দৌড়ল  বাধ্য হয়ে আর সবাইও অগত্যা  মেজজ্যাঠা বাবুকে ডিঙিয়েই।  ছোটোকাকা  লন্ঠনটা তুলে নিল  ছুটল  চোরের পেছনে ।  মেজজ্যাঠাবাবু নির্বিকার । চোর  দোতলার  ছাদের  পাঁচিল  ডিঙিয়ে  পাশের বাড়ীর  পোড়ো জমিতে লাফিয়ে পড়ে  পালানোর  আগে  যে হাত দিয়ে  ছাদের পাঁচিল  ধরে রেখেছিল   ছোটোকাকা  সেই হাতের ওপর  লন্ঠনটা  বসিয়ে দিল । চোর অনায়াসে  হাত টেনে বার করে  নীচে  লাফিয়ে  পড়ে পালিয়ে গেলো
        চোর পর্ব মিটতে মিটতে প্রায় ভোর  আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখিকা  লীলা মজুমদার  বলেগেছেন  ছোটদের নাকিবিশেষ  রকম  বড় বড় কান থাকে  তাই দিয়ে তারা অনেককিছু শুনতে পায় । সেই কান দিয়ে আমি শুনলাম  এবং দেখলামও   টুবুদির হাতে একটা নতুন আংটি । ওটা নাকি বরের   দেওয়া । আংটি  পরানোর  কাহিনীও  আমার  বিশেষ  কান দিয়ে শুনেছিলাম  যখন দিদি, রাঙাদিরদের চাপাচাপিতে ওদের  কাছে গল্প করছিল ।  টুবুদির সঙ্গে বরের আলাপ হয়নি । রাতে মটকা মেরে পড়ে থাকা টুবুদি হঠাৎ  টের পেল  বর হাত ধরে টানছে  তাকিয়ে দেখে  বর উঠে বসে   আংটি পরানোর চেষ্টা করছে  টুবুদিকে  ধড়মড় করে উঠে বসতে দেখে  বর নাকি কাজ অসমাপ্ত রেখেই ধুপ করে শুয়ে পড়েছিল , আর  টুবুদি নিজেই বাকিটা কাজটা নিজেই সেরে নিয়েছিল ।
        টুবুদি খুব সুখী হয়েছিলো ।  দুটো ছেলে হয়েছিল একদম বিহারের মানুষ । বড়টার নাম ছিল কুমার । লালচে চুল , ফুটফুটে  দেখতে । নাম জিজ্ঞেস করলে  বলত  “কুমার বাওখানে  গ্রাম্য লোকেরা  ঐ ভাবেই নাম বলে থাকে । আমরা মজা করে বার বার নাম জিজ্ঞেস করতাম ।
[মধুছন্দা পাল - জন্ম বিহারে, এখন থাকেন বরোদা, গুজরাটে । নিজেকে কবি, গল্পকার বা লেখক কিছুই বলতে এখনও অনীহা মধুছন্দার, কিন্তূ দারুণ সাহিত্য অনুরাগী লেখেনও হৃদয় দিয়ে । কৈশোরের টুকরো টুকরো স্মৃতি গদ্যের আকারে নিয়মিত লিখে চলেছেন তিনি । সেই স্মৃতির কোনো টুকরো কখনোবা গল্পের রূপ নিয়ে নিচ্ছে , 'টুবুদির গল্প' সেরকমই এক টুকরো স্মৃতি ।]